ভানুর মলিন রঙের ছোয়ায় স্পষ্ট যেই মুখটি রানির সামনে ভেসে উঠল সেটি আর কারো নয়, স্বয়ং- রেবেকার। রেবেকা, যেই মেয়েটিকে রানি অসম্ভব ভালোবাসার পরেও পেয়েছিলেন ছলনা। এ সে-ই রেবেকা, যাকে জনসম্মুখে দেওয়া হয়েছিলো শাস্তি আর গোপনে দেওয়া হয়েছিলো অনুশোচনা।
রেবেকার প্রথম দর্শনে রানি বিস্ময়ে হতভম্ব হয়ে গেলেন। চোখ জোড়াতে তার অবিশ্বাস্যকর ভাব। তবে তিনি এটা জানতেন যে, রেবেকার সাথে তার জীবনের কোনো এক কালে ঠিকই দেখা হবে। তবে সেই কালটা এত দ্রুতই আসবে রানি কি আর তা জানতেন?
রানি তাকালেন হেমলকের দিকে। চোখ জোড়াতে তার প্রশ্নের ছড়াছড়ি। ঠোঁটে কেবল উচ্চারণ করলেন,
“রেবেকার সাথে আপনার দেখা হয়েছে কোথায়? আপনি ওকে চেনেনও বা কীভাবে?”
রানির এই বিস্ময়, কৌতূহলের বিপরীতে হেমলকের চাহনি কেবলই শান্তি নদীর মতন। নরম, মোলায়েম তার কণ্ঠ,
“হয়েছে কোথাও একটা। এবার বলো তো, তাকে দেখে তোমার সর্বপ্রথম অনুভূতি কী ছিলো?”
রানি হেমলকের হেঁয়ালিপূর্ণ কথায় নীরব থাকলেন। চুপ করে তাকিয়ে রইলেন রেবেকার দিকে। রেবেকা আগের মতনই রয়েছে। কেবল গায়ের রঙটা চেপে গিয়েছে কিছুটা।
রানি বেশ অনেকক্ষণ রেবেকার দিকে তাকিয়ে থেকে অতঃপর বললেন,
“রেবেকাকে দেখে সর্বপ্রথম আমার অনুভূতি হয়েছিলো- ও কি এবার ভালোবাসতে এসেছে নাকি আবারও ছলনার জন্যই এই কাছে আসা। আসলে আমাকে এই অব্দি কোনো শত্রু আঘাত করতে পারেনি। যতবার, যতজন আঘাত করার সুযোগ পেয়েছর, তারা সকলেই আমার বন্ধু ছিলো।”
রানির শেষের বাক্যগুলোতে যেন কত জন্মের হতাশা আর তাচ্ছিল্য মিলেমিশে একাকার হয়ে গিয়েছিলো।
রেবেকা কোনোরূপ বাক্য ব্যয় না করেই হাঁটু ভেঙে বসে পড়ল রানির কাছে। দুই হাত জোড় করে, নত মস্তকে বলল,
“রানি, আমি আপনার কাছে ক্ষমা চাইতে এসেছি। আপনি আমাকে অনুশোচনার যেই পথ দিয়েছেন, সে পথে রোজ কুঁকড়ে মরছি। আপনি ক্ষমা না করলে আমি বোধহয় মরেও শান্তি পাবো না। আপনি যদি সেদিন জনসম্মুখে আমায় মেরে ফেলতেন তবে বোধহয় সেটি আমার তেমন কোনো শাস্তিই হতো না অথচ আপনি আমাকে বাঁচিয়ে রেখে সবচেয়ে বড়ো ও কঠিন শাস্তিটি দিয়েছেন। প্রতি মুহূর্তে আমি কেবল অনুভব করে গিয়েছি, কতটা অপরাধ আমি করেছিলাম। আমাকে ক্ষমা করুন।”
রেবেকার কণ্ঠস্বরে মৃদু কম্পন স্পষ্টই।
রানি দাঁড়িয়ে রইলেন চুপ করে। এই সবকিছুই তার আগে থেকে জানা ছিলো। তিনি জানতেন, রেবেকার বেঁচে থাকাটাই কত বড়ো শাস্তির হবে।
রানিকে মূর্তির মতন স্থির ভঙ্গিমায় দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে এগিয়ে এলো হেমলক। দাঁড়ালো ঠিক রানির পাশে তবে একটু পিছিয়ে। রানির একটি হাতে মৃদু স্পর্শ করে বলল,
“রেবেকা কি এখনো ক্ষমা পাবে না?”
“আগে আমি জানতে চাই আপনি ওকে চেনেন কীভাবে?”
“চিনতাম না তো। রেবেকা নিজে এসে পরিচয় দিয়েছে।”
“রেবেকা পরিচয় দিয়েছে?”
রানির কণ্ঠে তখনও সবকিছু জানতে চাওয়ার আগ্রহ।
হেমলক মাথা নাড়ালো, “হ্যাঁ। তোমাকে যখন জঙ্গলে দস্যুরা আক্রমণ করলো এবং মৃতপ্রায় অবস্থায় বেঁধে রাখলো বৃক্ষের সাথে তখন সে-সকলই দেখেছিলো রেবেকা। তুমি রেবেকাকে কারাগার থেকে মুক্তি দিয়েছিলে যেন ও রাজ্য ছেড়ে পালিয়ে যায় এবং একটি সুখী জীবন যাপন করতে পারে। কিন্তু তোমার এই ঋণ, কৃতজ্ঞতা রেবেকার কাছে হয়ে উঠে আশীর্বাদস্বরূপ। অনুশোচনায় ও মূর্ছা যায়। তখন থেকে ও প্রতিজ্ঞা করে যে, ও আড়ালে সবসময় তোমাকে রক্ষা করে যাবে। সেদিন রাজপ্রাসাদ থেকে তুমি যখন বের হও এবং জঙ্গলে আক্রমণের স্বীকার হও তখন রেবেকা দিকশূন্য হয়ে ওর ঘোড়া নিয়ে ছুটে আসে আমাদের রাজ্যের দিকে। ওর সাথে আমার দেখা হয় আমাদের রাজ্যের শেষ দিক হুমারা নদীর তীরে। আমি প্রথম অবস্থায় ওর কোনো কথা বিশ্বাস করতে চাইনি। ও তখন প্রথম থেকে সমস্ত কিছু বলে। কীভাবে ও তোমার খাসদাসী থেকে ছলনা করে সবটা। এটাও বলে যে, কীভাবে তুমি সবার আড়ালে ওকে মুক্ত করো। তারপরেই আমি ওর সাথে জঙ্গলে গিয়ে তোমাকে উদ্ধার করি।”
রানির কাছে সমস্তটা এবার হয়ে উঠল জলের মতন স্বচ্ছ। তিনি বুঝতে পারলেন এবার কীভাবে হেমলক তার খোঁজ পেয়েছিলো। তিনি এতদিন যাবত কেবল ভেবেই এসেছেন এমন গভীর অরণ্যে হেমলক পৌঁছালোই বা কীভাবে? কীভাবে তাকে উদ্ধার করল! যেহেতু তখন তিনি ছিলেন জ্ঞানশূন্য তাই কিছুই তার জানা ছিলো না।
রানির ভাবনার মাঝে রেবেকা ভঙ্গুর স্বরে আবারও বলল, “আমায় কি আর একটিবার ক্ষমা দিবেন না? আমি যে লজ্জায়, অনুশোচনায় মরে যাচ্ছি।”
রানি রেবেকার দিকে তাকালেন।
বর্তমানে তার অনেক অনেকগুলো গুটি সাজাতে হবে। আর রেবেকার সাহায্যে সেই গুটি সাজানো আরেকটু উত্তমই হবে। ভেতর ভেতর তার দূরদর্শী চিন্তায় কতকিছু ভাবলেন। অতঃপর বললেন,
“তোমায় আমি ক্ষমা করে দিয়েছি, রেবেকা। ওঠো তুমি।”
রানির আজ্ঞা পেতেই ওঠল রেবেকা।
কৃতজ্ঞতা জানাতে লাগলো বারাংবার। রানি রেবেকার মুখ ঢাকার নির্দেশনা দিলেন। হেমলকের ভ্রু কুঁচকে এলো। সে বেশ আন্দাজ করতে পারলো রানির ভেতর ভেতর চলা কূটনীতি।
হেমলক একজন দাসীকে ডেকে রেবেকাকে যেতে বলল তারই সঙ্গে।
কক্ষ জুড়ে তখন রইল কেবল হেমলক ও রানি।
হেমলক এবার গিয়ে বসলো পালঙ্কে। হেলান দিয়ে পা নাড়াতে নাড়াতে শুধালো,
“সবই বুঝলাম, আমার সুধাকান্তা। তবে এটাই বুঝলাম না, যার শাস্তি কারাগার ছিলো তাকে তুমি নিজেই কেন মুক্তি দিয়ে ছিলে?”
রানি গিয়ে বসলেন আরামকেদারায়। পায়ের উপর পা তুলে। ঠোঁটে বাঁকা হাসি তার।
“কারাগার ওকে যতটা না শাস্তি দিতে পারতো তার চেয়ে বেশি শাস্তি ওকে মুক্তিই দিতে পারতো বলেই মুক্ত করেছিলাম। কারাগারে থাকলে ও কখনো বুঝতেই পারতো না ভালোবাসার বিপরীতে বিশ্বাসঘাতকতা করলে অপরাধটা কতটুকু ভয়ংকর হয়। কিন্তু যেই দেখলো ওকে আমি অপরাধের পরেও ছেড়ে দিচ্ছি তখন ও বুঝলো সেটা।”
“তোমার কষ্ট হয় না? এই যে লোকে তোমায় এত দুঃখ দেয়!”
প্রশ্নটা নেহাৎ ছোটো হলেও রানি বহুক্ষণ চুপ করে থাকলেন। তারপর আনমনা হয়ে রয়েসয়ে উত্তর দিলেন,
“দুঃখ পাবো জেনেই তো ভালোবাসি। আসলে ওরা আমাকে দুঃখ দেয় সেটা আমার শরীরে লাগে না। কিন্তু ওরা আমার ভালোবাসাটুকু কখনো বুঝতে পারে না, এই বিষয়টিই আমাকে পীড়া দেয়। আপনি বলেন ভালোবাসা দিয়ে নাকি সব জয় করা যায়? অথচ আমি যাদেরই ভালোবাসলাম তাদেরকে আর জয় করতে পারলাম না।”
হেমলক তাকিয়ে রইল উদাসী রানির দিকে। মনে হলো একটি জলজ্যান্ত তৈল চিত্র তার সামনে। স্থির অথচ কতটা জীবন্ত!
—————
রানির খাসদাসী হিসেবে রেবেকাকে স্থির করা হলো। রানির আশেপাশেই রাখা হলো তাকে।
আজ রাজ্যে ইনান ণেকিতান এসেছেন। রানির আমন্ত্রণ বার্তা তাকে ক্যামিলাস রাজ্যে এনেছে।
রানি মাত্রই তৈরি হয়ে বেরুতেই মুখোমুখি হলেন ইথুনের সঙ্গে। ইথুনের পাশে রয়েছে আরও দু'জন দাসী।
ইথুন রানিকে দেখে হাসিমুখে প্রশ্ন করল,
“কোথায় যাচ্ছেন? এত ব্যস্ততা আপনার?”
রানি দাঁড়ালেন ইথুনের প্রশ্নে। উত্তর দিলেন,
“রাজা ইনান ণেকিতান এসেছেন আমাদের রাজ্যে। তার আথিতেয়তা তো করতে হবে তাই না?”
“রাজাদের আথিতেয়তার জন্য তো প্রাসাদে অনেকে আছে।”
“প্রাসাদে অনেকে আছে তা ঠিক, তবে রানি তো আমি একাই তাই না?”
রানি কামিনীর শ্লেষাত্মক বাক্যটি বেশ গায়ে লাগলো রানি ইথুনের। সে-ও তাই প্রতিত্তোরে বলল,
“সিংহাসনের জোর একটু বেশিই প্রকাশ করছেন না?”
“জোর আছে বলেই তো প্রকাশ করছি।”
কথার বাক-বিতন্ডায় হারাতে না পেরে রানি ইথুন এবার অবলম্বন করলেন অন্য ধরণের বাক্য।
“তা এত সাজগোজ কার জন্য? অন্য রাজার মনোরঞ্জনের জন্য? তাদের মনোরঞ্জনের জন্য বাইজি আছে প্রাসাদে।”
কটু বাক্যটি বলতে বলতে নিজেকে ভীষণ বড়ো ভাবলো ইথুন।
রানি কামিনী হাসলেন উচ্চস্বরে। কণ্ঠের ধ্বনিও উঠালেন উঁচুতে। বললেন,
“যার দৃষ্টি যতটুকু সে তো ততটুকু অব্দিই দেখবে তাই না? আমার গায়ে ওসব চরিত্রের কালি লাগাতে আসবেন না। ঐ কালি তৈরিই হয় আমার থেকে।”
কথা শেষ করেই স্থান ত্যাগ করলেন রানি। ইথুন দাঁড়িয়ে থেকে দেখলো কেবল।
—————
বিশাল কক্ষে বসে আছে রাজা ইনান ণেকিতান। তার সামনে হরেকরকমের খাবার সাজানো। আয়োজনের কমতি নেই মোটেও। হেমলক বসা ছিলো তার সামনেই। রানি প্রবেশ করতেই দাঁড়িয়ে পড়ল হেমলক। হাসিমুখে দাঁড়ালো ইনান ণেকিতানও। দরজায় দিকে ভালো করে তাকাতেই তার হাসি মুখটি নিভে এলো। ঘোমটা দেওয়া রানিকে এগিয়ে আসতে দেখেই তিনি তাকিয়ে রইলেন।
রানি আসতেই হেমলক রানিকে তার আসনে বসতে দিলো। ইনান ণেকিতান তখনো দাঁড়িয়ে রইলেন। বিনা সংশয়, বিনা দ্বিধায় উচ্চারণ করলেন,
“রানি কামিনীকাঞ্চন না? আমি এই হাঁটা বেশ ভালো করে জানি। আমার রন্ধ্রে রন্ধ্রে মিশে আছে সবটা। হেমলক পিয়ার্স, আপনি আমার সাথে বেইমানি করলেন? আমি আপনাকে দিয়ে যত্ন করে আমার স্বপ্নের যেই নারীটিকে অঙ্কন করিয়েছি বারংবার, আপনি তাকেই নিজের প্রাসাদে নিয়ে এলেন? আমার সাথে চূড়ান্ত বিশ্বাসঘাতকা করলেন?”
·
·
·
চলবে……………………………………………………