মাথার উপর উত্তপ্ত ভানুর প্রবল তেজ। বিশাল প্রসস্থ ভূমি জুড়ে নিপাট মুখরতা। উত্তেজনায় সকলেই কাঁপছে। রাজ্যের নতুন রাজবধূর সাথে তাদের আনুষ্ঠানিক ভাবে পরিচয় সম্পূর্ণ হবে বলে।
সারি সারি আসনের পূর্ব দিকের শেষ মাথায় বসে থাকা যামিনীকে হাওয়া করছে শশী। হ্যাব্রো পেছনে দাঁড়িয়েই তাকিয়ে আছে হেমলকের নব্য বধূর দিকে।
হেমলক তার নব্য বধূর হাত ধরে এগিয়ে এলো। তাদের সুউচ্চ দালানের মধ্যিকারের বড়ো বারান্দাটার সামনে নিয়ে দাঁড় করালো রানি কামিনীকে। তার সাথে এক পা পিছিয়ে দাঁড়ালো হেমলক। এবং তার পেছনে তাদের বাকি পরিবার বর্গ।
নিচে প্রজাদের উপচে পড়া ভিড়। রানিকে দেখার জন্য উৎকণ্ঠা সকলের ভেতরে।
যামিনী বিশেষ তাকালো না সে দিকে। সে ব্যস্ত হ্যাব্রোকে দেখতে। কিন্তু হ্যাব্রো টান টান হয়ে, বুক উঁচিয়ে তাকিয়ে আছে হেমলকদের পানে।
শশীপূর্ণা যামিনীর এক ধ্যানে তাকিয়ে থাকা দেখে মিটমিটিয়ে হাসলো। চাপা স্বরে বলল,
“আজ তো রাজা হেমলক পিয়ার্সের বধূকে দেখতেই এই রাজ্যে এসেছেন। তাকেই না-হয় দেখুন। আপনার মনের রাজা তো সবসময়ই আপনার সাথে থাকে। তাকে না দেখলেও হবে।”
শশীর চাপা স্বরের মশকরায় লাজুক হাসলো যামিনী। মিছিমিছি চোখ রাঙিয়ে বলল,
“ঠাট্টা করছো আমার সাথে?”
“সেই আস্পর্ধা আমার কি আছে?”
“অবশ্যই আছে। তুমি আমার কাছের লোক বলে কথা।”
যামিনীর আশকারায় আনন্দে আপ্লূত হয়ে উঠল শশী। বুকের বাম দিকে নিজের ডান হাতটা রেখে কুর্নিশ করে বলল,
“সবই আপনার কৃপা।”
রাজপ্রাসাদের বিশাল প্রাঙ্গণ জুড়ে এত লোক সমাগাম, রাজা-রানিদের আগমন, প্রজাদের উল্লাসিত ধ্বনি, বাদ্যযন্ত্রে সুর, তালও বোধহয় ফিকে লাগতে আরম্ভ করল রানি কামিনীকাঞ্চনের কাছে। ঘোমটার আড়ালে তার দৃষ্টি কেবল যামিনীর হাস্যরত মুখটির দিকে। পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা হ্যাব্রোকে দেখতেও ভুল করছেন না। নিবিড় পর্যবেক্ষণ করে যাচ্ছেন অনবরত। আজ বহুদিন পর এই মানুষগুলোকে চোখের সামনে দেখেছে। কত দিন হবে?
আনুমানিক তিন, সাড়ে তিন মাস হবে নিশ্চয়। যামিনীর মুখের সেই হাসি রানির রন্ধ্রে রন্ধ্রে যেন বিষক্রিয়া ঘটাতে আরম্ভ করেছে। রাগে ভেঙেচুরে দিতে ইচ্ছে করছে পুরো পৃথিবী। মনে হচ্ছে এখুনি গিয়েই বিশ্বাসঘাতকতার অপরাধে যামিনীর মস্তক সেই ঘাড় থেকে আলাদা করে দিতে। কিন্তু তিনি তা মোটেও করবেন না। যেই মানুষটার জন্য এতগুলো দিন তিনি গভীর যন্ত্রণা ভোগ করেছে তাকে এত তাড়াতাড়ি মৃত্যুদণ্ড দেওয়া মানে তো মুক্তি দিয়ে দেওয়া। আর যামিনীর এত দ্রুত মুক্তি হবে না যে। তাকে এতটাই নেক যন্ত্রণা ভোগ করতে হবে যে সে নিজে নিজের মৃত্যু ভিক্ষা করবে কিন্তু মৃত্যু পাবে না। তাছাড়া এই এত বড়ো খেলা যামিনী নির্ঘাত একা খেলেনি। নিশ্চয় তার পেছনে অন্য কেউ ছিল কিংবা আছে। সে কে তা তো বের করতে হবে। যে খেলা যামিনী শুরু করেছে সে-ই খেলা শেষ হবে রানি কামিনীকাঞ্চনের হাতে। আর এই মরণফাঁদ সৃষ্ট খেলা এত দ্রুত যে শেষ হতে পারে না!
যামিনীর থেকে চোখ ঘুরিয়ে তিনি হ্যাব্রোকে আপাদমস্তক দেখে নিলেন। হ্যাব্রো সেই আগের মতনই মুখ গম্ভীর করে দাঁড়িয়ে আছে। রানি কামিনীকাঞ্চনের বেলাতেও তার ভেতর যেই দায়িত্বশীলতা উপস্থিত ছিলো, যামিনীর ক্ষেত্রেও তা-ই রয়েছে। আচ্ছা হ্যাব্রো কেন এখনো যামিনীকে ছেড়ে যায়নি? সে তো রানি কামিনীর প্রতি অনুগত ছিলো। তাহলে কি সে বুঝতে পারেনি যামিনী বিশ্বাসভঙ্গ করেছে? না-কি বুঝতে পেরেও থেকে গেছে অন্য কোনো কারণে?
না এই বিশ্বাসঘাতকতার পেছনে হ্যাব্রোও সমান ভাবে অংশগ্রহণ করেছে?
শেষের কথাটুকু ভাবনাতে এলেও রানির বিশ্বাসে তা অটুট থাকতে পারল না। হ্যাব্রোর মতন অনুগত প্রজা, সেনাপতি এই পৃথিবীতে খুঁজে পাওয়া কঠিন। চন্দ্র, সূর্য যেমন একটি, তা যেমন নির্মল সত্য। তেমনই নির্মল সত্য- হ্যাব্রোর মতন অনুগত প্রজা কালেভদ্রে এই একজনই জন্ম নিয়েছে পৃথিবীতে। তাকে অবিশ্বাস করার জো নেই। তবুও যেহেতু শত্রুর পেছনের শত্রুটি অপরিচিত তাই রানি কামিনীকাঞ্চন আপাত নিজের ছায়াকেও বিশ্বাস করবেন না।
রানির ভাবনার মাঝেই গমগমে পুরুষালি কণ্ঠস্বর ভেসে এলো,
“আমার প্রজারা, আমার একান্ত প্রিয় মানুষ আপনারা। তাই আপনাদের এবং আমাদের বিভিন্ন মিত্র রাজারাজড়াদের সাথে আমার একমাত্র সহধর্মিণীকে পরিচয় করিয়ে দিতেই নিয়ে এলাম। এই যে ইনি, রাজপুত্র হেমলক পিয়ার্সের বধূ এই রাজ্যের রাজবধূ। এবং আমি আশা রাখি যে, সে আপনাদের একমাত্র ভরসাস্থল হয়ে উঠবে ধীরে ধীরে। আপনারা তাকে সাদরে গ্রহণ করুন।”
হেমলকের এই বক্তব্যের পর প্রজাদের ভেতর গুঞ্জন দেখা দিলো। তারা সবটাই বুঝলো কিন্তু একমাত্র ভরসাস্থল শব্দটি কেন ব্যবহার করা হয়েছে তা-ই বুঝে উঠতে পারলো না।
কেবল প্রজারা নয়, রাজপরিবারের সকলেও বুঝতে পারল না এই সহজ-সরল কথাটির পেছনের ইঙ্গিত।
রাজমাতা প্রাচী তো পেছন থেকে প্রায় কিছুটা উচ্চস্বরেই তৎক্ষনাৎ প্রশ্ন করলেন,
“একমাত্র ভরসাস্থল মানে? কী বলছো?”
রানি কামিনীও ঘোমটার আড়ালে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইলেন বিষয়টি বুঝার জন্য। হেমলককে বিয়ে করা তার খেলার একটি চাল থাকলেও হেমলক কোন খেলায় মত্ত হয়ে তার এতটা নিকটে আসছে কিংবা ভরসা অর্জনের আপ্রাণ চেষ্টা করছে?
হেমলক রাজমাতার কথার প্রতিত্তোর করল না। বরং রাজমাতার হাতটি টেনে সামনে উপস্থিত করলো। প্রজাদের উদ্দেশ্যে বলল,
“আপনারা জানেন আপনাদের রাজা হ্যাভের বর্তমানে মানসিক অসুস্থতায় ভুগছেন। তার দ্বারা রাজ্য চালানো সম্ভবপর নয়। রাজা হ্যাভেন ব্যাতিত আপনাদের সকলের দায়ভার নেওয়ার মতন সাহস সবার নেই। তাই আমার অর্ধাঙ্গিনী, আপনাদের রাজপুত্র হেমলক বধূই আপাতত এই ভার বহন করবেন। কারণ তার মতন যোগ্যতা ও দক্ষতা আর কারো নেই। এই যে আপনাদের রাজমাতা, তিনিই এখন সেই ঘোষণা দিবেন আপনাদের মাঝে।”
কথা শেষ করেই হেমলক এক কদম পিছিয়ে গেলো রাজমাতা থেকে। যেন সে রাজমাতাকে কথা বলার জায়গা তৈরি করে দিলো। কিন্তু রাজমাতা তখনও দ্বিধান্বিত। এমন কোনো কথা তাদের পরিবারে হয়েছে বলে তো তিনি মনে পড়ছে না। তাছাড়া নতুন বধূ সম্পর্কে তো কিছুই তাদের কারো অবগত নয়। তাহলে সে এমন একটি ঘোষণা দেনও বা কীভাবে?
কিন্তু এই এত অসংখ্য লোকের মাঝে পুত্রের ঘোষণা অস্বীকারও করার জো নেই। নয়তো রাজ্যবাসী বুঝে যাবে রাজপ্রাসাদের ভেতরই একতার অভাব। এবং এই ধারণার তাদের রাজ্যের জন্যও অশোভনীয় এবং শত্রু পক্ষের জন্য একটি নতুন সুবিধা হয়ে যাবে।
রাজমাতা প্রাচী ভেতরে ভেতরে নিজের ছোটো পুত্রের কর্মকান্ডে ক্ষোভে ফেটে পড়লেন। তার পুত্র এ কেমন আচরণ করছে? এতটা মনমর্জি মতন চলছে এবং তাদেরকেও চালাচ্ছে কার কথাতে? নিজের বধূর কথাতে? কোথাকার না কোথাকার একটি মেয়েকে রাজ আসনে বসাবেন তিনি? কীভাবে সম্ভব! যেই মেয়েটির জাত, কূল, রাজ্য, পরিবার সম্পর্কে কিছুই তিনি জানেন না সে-ই মেয়েটিকে কীভাবে নিজের রাজ্যের দায়িত্ব তুলে দিবেন? কিন্তু পুত্রের কথাটা ঘুরাবেনও বা কীভাবে?
রাজমাতা হতাশ ও ক্ষোভ মিশ্রিত শ্বাস ফেললেন। রক্তচক্ষু নিয়ে তাকালেন নিজের পুত্রের দিকে। নিচে দাঁড়ানোর অসংখ্য প্রজারা তখনো তার ঘোষণার জন্য অপেক্ষা করছে।
মায়ের দৃষ্টিতে হেমলকের কোনো হেলদোল হলো না মোটেও। সে বরংচ তাড়া দিলো,
“তাড়াতাড়ি ঘোষণাটি দিন, রাজমাতা। রাজ্যবাসী অপেক্ষা করছে যে!”
রাজমাতা দাঁতে দাঁত চেপে হিংস্র কণ্ঠে বললেন,
“করুক অপেক্ষা। আমি এমন কোনো ঘোষণা দিবো না। তুমি কি আমাকে তোমার ইশারায় নৃত্য করাতে চাচ্ছো?”
“ঘোষণা না দিলে ক্যামিলাস রাজ্যের রাজপরিবারের সম্পর্কে লোকের সমস্ত ধারণা ভেঙে যাবে। তখন সবাই বলবে লোক, জনসমাগমে রাজ পরিবার তামাশা করেছে। ভালো লাগবে সেটা?”
পুত্রের চতুরতায় রাজমাতার বিস্ময় ধরে না শরীরে। আশ্চর্য হয়ে যান। বললেন,
“তুমি আমাকে ভয় দেখাচ্ছো?”
“মোটেও না। বাস্তবিকতা বুঝাচ্ছি।”
রাজমাতা এবার দ্বিধাহীনভাবে তাকালেন রাজ পরিবারের বাকি সদস্যদের দিকে। বাকিরাও তারই মতনই কিংকর্তব্যবিমুঢ় হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। এ যেন অথৈ জলে পড়ে যাওয়ার মতন অবস্থা।
রাজমাতার একমাত্র কনিষ্ঠ ভ্রাতা নিজের ভগ্নিকে আশ্বাস্ত করলেন চোখ দিয়ে। বুঝালেন আপাতত ভাগ্নের বলা সিদ্ধান্তকেই শিরোধার্য হিসেবে সমগ্র রাজ্যবাসীর নিকট ঘোষণা দেওয়ার জন্য।
ভ্রাতা নোমানের বুদ্ধি সম্পর্কে রাজমাতা অবগত। তাই নোমানের আশ্বস্ততায় তিনি খানিক স্থির হলেন। নিজেকে ধাতস্থ করলেন বেশ কিছুটা সময় নিয়ে। অতঃপর পুত্রের দিকে শেষবারের মতন অগ্নি চক্ষু ফেলে প্রজাদের উদ্দেশ্যে ঘোষণা দিলেন,
“আমি সকল রাজ্যবাসীদের কথা বিবেচনা করেই আমার ছোটো পুত্র হেমলক পিয়ার্সের বধূ, হেমলক বধূকে রাজ আসনে বসানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছি। এবং আমি আপনাদের ভরসা দিয়ে বলছি- আপনাদের জন্য সে হবে উত্তম পরিচালনাকারী। আমরা শীগ্রই রাজ অভিষেক শেষ করে তার উপর সমস্ত দায়ভার ন্যস্ত করবো। ঠিক আছে? সবশেষে বলবো, সকলের প্রতি প্রীতি রইল। নমস্কার।”
রাজমাতা তার কথা শেষ করেই হনহনিয়ে সরে গেলেন। মাথায় দপদপ করে তার আগুন জ্বলছে। নিজের পেটে এমন একটি শত্রু জন্ম দিয়েছেন ভেবে নিজের মাথা নিজেরই ফাটিয়ে ফেলতে ইচ্ছে করছে তার।
রানি কামিনীকাঞ্চন মিটমিটিয়ে হাসলেন এবার ঘোমটার আড়ালে। রাজ আসন না পেলে যামিনীর সাথে তার যুদ্ধটা সমানে-সমানে হতো না। এবার যুদ্ধটা হবে সমানে সমানে। কিন্তু হেমলকের তো এতটা সাহায্য করার কথা ছিলো না!
রানির ভেতর হেমলকের জন্যও সন্দেহের বীজ রইল। কারণ ক্যামিলাস রাজ্যের সাথে তার মিত্রতা কোনো কালেই ছিলো না। তাই শত্রু রাজ্যের হেমলক তার মিত্র হবে সেই কথা সে কোনো ভাবেই বিশ্বাস করল না।
সবার কথোপকথন শেষ হতেই এবার রানি কামিনীকাঞ্চনকে রাজ্যবাসীর জন্য বক্তৃতা দিতে। রানি এগিয়ে এলেন। সেই আগের মতন জৌলুশ, বুক ভরা দৃঢ়তা, ঠোঁটে ক্রুর হাসি এঁটে। চারপাশে চোখ বুলিয়ে বুক ভরে শ্বাস টেনে নিলেন। ঘোমটার আড়ালেই তার আকর্ষণীয় বাচনভঙ্গিতে বললেন,
“ক্যামিলাস রাজ্যের প্রজাগণ, আমি, হেমলক বধূ আপনাদের সমস্ত রকমের সুখ ও শোকের ভার বহন করবো বলে প্রতিজ্ঞা করলাম। এবং আপনাদের কথা দিলাম একটি চমৎকার রাজ্য উপহার দেওয়ার। কেবল এতটুকুই বলবো আমাকে ভরসা করবেন। এবং যেকোনো অন্যায় থেকে দূরে থাকবেন। কারণ আমি সমস্ত ক্ষমা করি কিন্তু অন্যায়ের ক্ষমা কখনোই করি না।”
রানির ধ্বনি উচ্চারিত বীজমন্ত্রের মতন। এমন আত্মবিশ্বাসী নারী কণ্ঠ এর আগে এই রাজ্যের লোকবাসী কখনো শোনেননি। সকলে সেই কণ্ঠের জয়ধ্বনি করতে লাগলো। রানি যেন আবার নিজের সমস্ত শক্তিকে উপলব্ধি করতে পারল। আবার নিজের সমস্ত কিছু দ্বিগুণ রূপে ফিরে পাওয়ার যুদ্ধে নিজেকে আবিষ্কার করলো শক্তিশালী সৈনিক হিসেবে।
তবে হেমলক বধূর কণ্ঠ শুনে হ্যাব্রো কিঞ্চিৎ কেঁপে উঠলো। এই ভাষা, এই ধ্বনি, এই দৃঢ়তা যে তার বড্ড চেনা! বড্ড পরিচিত লাগলো। হাঁসফাঁস লাগলো ভেতরটায়। হেমলক বধূর মুখটি একবার দর্শনের জন্য মনটা অস্থির অস্থির করল।
·
·
·
চলবে……………………………………………………