জাওয়াদ ঘরের দরজায় তালা দিয়ে বাইরে বেরিয়ে আসে। উঠানে এসে দাঁড়াতেই যেন পা দুটো তার শরীরের সাথে যোগাযোগ হারিয়ে ফেলে। হঠাৎ করেই সমস্ত শক্তি নিঃশেষ হয়ে যায়। হাঁটু দুটো কাঁপতে কাঁপতে ভেঙে পড়ে বসে পড়ে মাটিতে।
মাথার ভেতর অদ্ভুত একটা শব্দ। যেন কোনো পুরনো ক্যাসেট প্লেয়ারের ভেতর থেকে আসা চিড়চিড়ানি আওয়াজ। তারপরই শুরু হচ্ছে গুলনূরের কণ্ঠস্বর। শুনতে পাচ্ছে, 'তুমি যেচে বিয়ে করতে চেয়েছো আমাকে। আমি করতে চাইনি। তোমাকে আমার কস্মিনকালেও পছন্দ ছিল না।'
কথাগুলো এতোটাই স্পষ্ট শোনাচ্ছে যে মনে হচ্ছে, গুলনূর এখানেই দাঁড়িয়ে আছে এবং প্রতিটি শব্দ তার কানের পর্দায় ছুরি দিয়ে খোদাই করে দিচ্ছে।
জাওয়াদ চোখ বন্ধ করে নিজেকে শান্ত করার চেষ্টা করে। কিন্তু চোখ বন্ধ করার সাথে সাথে সেই কথাগুলো আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। বুকের ভেতরটা যেন কেউ মুঠো করে ধরে। প্রতিটি শ্বাসের সাথে সেই মুঠোটা আরও শক্ত হচ্ছে।
চোখের কোণে জলের প্রথম ফোঁটাটা জমা হয়। ধীরে ধীরে সেটা বড় হয়ে একটা, দুটো - এভাবে ফোঁটায় ফোঁটায় বেরিয়ে আসে। জাওয়াদ দ্রুত হাত দিয়ে মুছে ফেলার চেষ্টা করে। মা সবসময় বলতেন, 'পুরুষ মানুষের কাঁদতে নেই। পুরুষ মানুষ শক্ত হয়। পুরুষ মানুষ সহ্য করে।'
একসময় মায়ের কথা শুনত। এখন আর শুনে না। এখন কাঁদে। নিজের মতো করে কাঁদে। কেউ দেখছে না যখন কাঁদতে কীসের বাঁধা?
তীক্ষ্ণ ব্যথায় বুক চেপে ধরে এক হাতে৷ তার এতো কষ্ট হচ্ছে কেন? সে কি নিজের অজান্তেই গুলনূরের চোখে ভালোবাসা দেখতে চেয়েছিল? অবচেতন মনে ভেবেছিল গুলনূরের হৃদয়ের কোণে একটুখানি হলেও মায়া আছে? হয়তো সে কোনো চাপে বিয়ে করতে চায়নি। হয়তো সে আসলে জাওয়াদকে পছন্দ করে, কিন্তু প্রকাশ করতে পারেনি।
কী বোকা ভাবনাই না ছিল সেগুলো! যে মেয়ে বিয়ের আসর ছেড়ে পালিয়ে যায়, তার মন থেকে ভালোবাসার কথা আশা করাই তো ছিল চরম বোকামি! কিন্তু মানুষ তো আশা করেই। যতই অযৌক্তিক হোক, যতই অসম্ভব মনে হোক, মানুষ আশা ছাড়তে পারে না। জাওয়াদও পারেনি।
আজ গুলনূর তার সমস্ত ভুল আশার উপর বুট পরে লাথি মেরেছে। মুখের উপর নির্দ্বিধায় বলে দিয়েছে, তাকে কোনোদিন পছন্দ করেনি। কোনোদিনই না।
বড্ড হাসি পাচ্ছে। নিজেকে বিশাল নির্বোধ মনে হচ্ছে। কী করেই বা এতটা বোকা হলো সে! কীভাবেই বা এতটা স্বপ্নবিলাসী হয়ে উঠেছিল!
নিজের উপর রাগে, লজ্জায়, অসহ্য কষ্টে জাওয়াদ নিজের ঠোঁট কামড়ে ধরে। এত জোরে কামড়ে ধরে যে ঠোঁটের কোমল মাংসে দাঁতের ছাপ পড়ে যায়। রক্তের লোনা স্বাদ মুখে ছড়িয়ে পড়ে।
হাসতে হাসতে উঠে দাঁড়ায় সে। লম্বা করে শ্বাস নিয়ে, ফুসফুসে বাতাস টেনে বুকের চাপা যন্ত্রণাটা একটু হালকা করার চেষ্টা করে। হাতের পিঠ দিয়ে চোখের জল মুছে একবার পেছন ফিরে তাকায়। বাড়িটার দিকে চোখ বোলায়।
ব্রিটিশ আমলের বাড়িটা দাঁড়িয়ে আছে নির্বিকার। বছরের পর বছর, যুগ যুগ ধরে এভাবেই দাঁড়িয়ে থাকবে। কতো মানুষের জীবনযাত্রা দেখেছে এই দেয়ালগুলো। কতো আনন্দ-বেদনার নীরব সাক্ষী হয়েছে। কতো প্রেম-বিরহের গল্প শুনেছে। সে কতদিন থাকবে এই বাড়িতে? এই পাড়ায়? এই শহরে? কে জানে!
ভেজা হাওয়া এসে লাগে মুখে। বৃষ্টির গন্ধ এখনো বাতাসে ভাসছে। দূর থেকে একটা রিকশার আওয়াজ আসছে। ঘণ্টি বাজছে টুংটুং করে। কোথাও একটা কাকও ডাকছে। জীবন তার নিজের গতিতেই চলছে। সবকিছু স্বাভাবিক। শুধু জাওয়াদের জীবনটাই আর স্বাভাবিক নেই। সেইযে দুই বছর আগে জীবনটা এলোমেলো হয়েছিল, আর ঠিক হওয়ার নাম নেই। সে হাঁটতে শুরু করে। পায়ে পায়ে এগিয়ে চলে সামনে।
প্রায় বিশ মিনিট হাঁটার পর রাস্তার মোড়ের হোটেলটা চোখে পড়ে। ভাঙা টিনের চাল, পুরনো কাঠের বেঞ্চ, তেলের কালি লেগে চকচকে হয়ে যাওয়া দেয়াল। রহিম চাচা চুলায় তেল গরম করছেন। তেলের ভেতর থেকে ফুটফুটানি শব্দ আসছে।
জাওয়াদকে দেখেই রহিম চাচার মুখে হাসি ফুটে ওঠে। স্নেহভরা কণ্ঠে বলেন, 'কয়দিন আসেন নাই কেন? কী নিবেন?'
'ছয়টা রুটি আর তিনটা ডিম ভাজি দেন।'
রহিম চাচার চোখে সামান্য বিস্ময়। 'আজ বেশি নিতাছেন যে! কেউ আইছে নাকি?'
জাওয়াদ কিছু বলে না। চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকে। তার মুখের অভিব্যক্তি দেখে রহিম চাচা আর কোনো প্রশ্ন করেন না। পাতলা রুটিগুলো তাওয়ায় সেঁকেন, ডিমগুলো কড়া করে ভাজেন। তারপর কাগজে মুড়ে পলিথিনে ভরে দিয়ে বলেন, 'কাইল কিন্তু দোকান বন্ধ থাকব!'
জাওয়াদ মাথা নেড়ে সায় দেয়।
বাড়ির কাছে এসে দেখে, কতগুলো কাক বসে আছে কূপের মুখের উপর। কা কা করে ডাকছে। সেগুলো হাত নেড়ে তাড়িয়ে দিয়ে দরজা খুলে ভেতরে ঢুকতেই চোখ আটকে যায়। গুলনূর চেয়ারে মাথা নিচু করে বসে আছে। পায়ের শব্দ শুনেই মাথা তুলে তাকায়। তার চোখে কোনো ভয় নেই, যন্ত্রণা নেই, আছে শুধু নির্বিকার বিরক্তি।
জাওয়াদ পলিথিন থেকে রুটি বের করে একটা প্লেটে সাজায়। একটা রুটি ছিঁড়ে ডিম দিয়ে মুড়িয়ে গুলনূরের দিকে এগিয়ে দিয়ে বলে, 'খেয়ে নাও।'
গুলনূর উপহাসের দৃষ্টিতে তাকায়। ঠোঁটের কোণে তিরস্কারের হাসি ফুটিয়ে বলে, 'কী দয়া!'
'খাবে কিনা বলো।'
না করার কোনো উপায় নেই। ক্ষুধায় যেন পেটে ইঁদুর দৌড়াচ্ছে। গতকাল সকালে খেয়েছিল আর খাওয়া হয়নি। গুলনূর অহংকার গিলে মুখ হা করে।
জাওয়াদ ধীরে ধীরে খাইয়ে দিতে থাকে। কিছুক্ষণ চুপচাপ থেকে বলে, 'দুপুরে কোনো খাবার-টাবার পাবে না।'
গুলনূর খেতে খেতে নাক সিটকিয়ে বলে, 'রুটিটা একদম ভালো না। ডিমটাও বেশি ভাজা হয়েছে। কী খাওয়াচ্ছ আমাকে? এর চেয়ে ভালো খাবার আনতে পারোনি?'
জাওয়াদ একটু কড়া গলায় বলে, 'এটা তোমার বাপের বাড়ি নয় যে ভুল ধরবে।'
'আমি তোমার মেহমান। মেহমানদারি ভালো করে করতে হয়।'
গুলনূর খেতে খেতে পর পর চারটি রুটি শেষ করে ফেলে। জাওয়াদ পঞ্চম রুটি ছিঁড়তে উদ্যত হলে গুলনূর একেবারে জমিদারের মতো আভিজাত্যপূর্ণ ভঙ্গিতে বলে, 'বাস! পেট ভরে গেছে। পানি দাও।'
জাওয়াদের রাগ বেড়ে যায়। সে প্রশ্ন ছুঁড়ে দেয়, 'আমি কি তোমার দাস?'
গুলনূর ঠোঁট বাঁকিয়ে উপেক্ষাসূচক হাসি হাসে, 'তাহলে দিও না। তৃষ্ণায় মরে গেলে, যাব।'
এই বলে সে একটি দীর্ঘ হাই তোলে চেয়ারে হেলান দিয়ে চোখ বন্ধ করে ফেলে। তার ভঙ্গি দেখে মনে হয় যেন সে এখুনি গভীর ঘুমে তলিয়ে যাবে।
জাওয়াদের সারা গা রাগে জ্বলে ওঠে। এ কেমন মেয়ে! অপহরণ হয়েছে, হাত-পা বাঁধা, অথচ এমন নির্বিকার! ভয়ভীতির বিন্দুমাত্র লেশ নেই!
'তুমি আমাকে ভয় পাচ্ছো না কেন?'
গুলনূর এক চোখ অলসভাবে খুলে তার দিকে তাকায়, 'ভয় পাবো কেন? তুমি তো আমাকে মারবে না। মেরে ফেললে তোমার উদ্দেশ্য সফল হবে না।'
'তুমি আমার উদ্দেশ্য জানো?'
গুলনূর অত্যন্ত নিশ্চিত গলায় বলে, 'জানি। প্রতিশোধ নিতে চাও। কীভাবে প্রতিশোধ নিতে চাও সেটা জানি না। তবে যেভাবেই নিতে চাও না কেন, অন্তত খুনটুন করবে না। প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য আমাকে জীবিত রাখতে হবে।'
গুলনূর আবার চোখ বন্ধ করে ফেলে, বলে, 'তাই আমার কোনো ভয় নেই।'
জাওয়াদ কিছুক্ষণ চোখমুখ কুঁচকে তার দিকে অপলক তাকিয়ে থাকে। তার মনে হাজারো চিন্তার ঘূর্ণিঝড় বয়ে যায়। বাধ্য হয়ে সে একটি গ্লাসে পানি নিয়ে আসে। গুলনূরের সামনে পানির গ্লাস ধরতেই সে দ্রুত মুখ এগিয়ে দেয় এবং ঢকঢক করে পুরো গ্লাসের পানি শেষ করে ফেলে। তারপর আবার চোখ বন্ধ করে নিশ্চিন্ত ভঙ্গিতে বসে থাকে।
জাওয়াদের মাথায় রক্ত উঠে যায়। তার জীবনে এমন নির্লিপ্ত, নির্ভীক মেয়ে সে দুটো দেখেনি। কেউ কেন তাকে ভয় পাবে না? সে জমিদার পুত্র৷ ভূঁইয়া বাড়ির উত্তরাধিকার! তাকে ভয় পাওয়া উচিত।
অল্পক্ষণের মধ্যেই গুলনূরের শ্বাস-প্রশ্বাসের ছন্দ বদলে যায়। তার নিঃশ্বাস ধীর...গভীর হয়ে আসে। জাওয়াদ অবিশ্বাসের দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে থাকে। এমন অস্বাভাবিক পরিস্থিতিতে, হাত-পা বাঁধা অবস্থায়, একটি অচেনা জায়গায় বন্দী হয়ে কীভাবে কেউ এমন নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে পড়তে পারে!
দৃষ্টি পড়ে গুলনূরের সারা শরীরে লেগে থাকা রক্তের দাগগুলোর উপর। মুখে, ঘাড়ে, গলার হাড়ের কাছে, এমনকি ওভারকোটের উপর দিয়ে বুকের কিছু অংশে ছোট ছোট কালচে-লাল রঙের দাগ। রক্ত! শুকিয়ে যাওয়া রক্তের দাগ! জাওয়াদের শরীরে শিহরণ খেলে যায়।
নিরীহ চেহারার এই মেয়েটা রাতের অন্ধকারে কী ভয়াবহ কাজটাই না করেছে! একটা জলজ্যান্ত মানুষকে নির্মমভাবে খুন করেছে! সেই রক্তের ছিটা লেগে আছে গায়ে। এখন এমনভাবে নির্বিঘ্নে ঘুমাচ্ছে, যেন কিছুই হয়নি।
জাওয়াদের সারা শরীর দিয়ে হঠাৎ ঘাম ছুটে যায়। পিঠের কাপড় ঠান্ডা ঘামে ভিজে যেতে থাকে। আসলে কে কার পাল্লায় পড়েছে? সে গুলনূরকে অপহরণ করেছে, নাকি গুলনূর তার জীবনে এক অশনিসংকেত হয়ে ঢুকেছে? কেন তার এত ঘাম হচ্ছে?
অস্বস্তিতে ভুগতে ভুগতে জাওয়াদ গুলনূরের সামনে থেকে সরে যায়। ঘরের এক কোণায় পুরানো পাটি বিছিয়ে একটা ছেঁড়া বালিশ এনে মাথার নিচে দিয়ে শুয়ে পড়ে। গতকাল রাত থেকে তার চোখে ঘুমের নাম গন্ধ নেই। মাথার ভেতর যেন হাতুড়ি পেটা হচ্ছে। ভোঁ ভোঁ আওয়াজে তার মাথা ভরে আছে। একটু বিশ্রাম নিতে হবে। তারপর গুলনূরের সাথে আরও কথা বলবে, আরও অনেক কিছু জানতে হবে। জানার পর কী করবে, সেই সিদ্ধান্ত এখনও নিতে পারেনি।
নিজেকে সান্ত্বনা দেয়, তাকে সাহস ধরে রাখতে হবে। সে একজন পুরুষ, তার বাহুতে বল আছে, শক্তি আছে! গুলনূর যতই চালাক হোক না কেন, শারীরিকভাবে সে তার চেয়ে অনেক দুর্বল। কিছুতেই তার সাথে পারবে না, কিছুতেই না।
কাত হয়ে শুয়ে এক নজর ঘুমন্ত গুলনূরের দিকে তাকায়, তারপর চোখ বন্ধ করার চেষ্টা করে। কিন্তু ঘুম আসে না। মনের মধ্যে নানা রকম অস্বস্তিকর চিন্তা ঘুরপাক খেতে থাকে। কিছুক্ষণ পর আবার চোখ খুলে গুলনূরের দিকে তাকায়।
নাকে এসে লাগে একটা অদ্ভুত, কটু গন্ধ। শুকনো রক্তের গন্ধ। মধ্যরাত থেকে গুলনূরের গায়ে রক্ত লেগে আছে! অন্যের রক্ত এভাবে গায়ে নিয়ে কীভাবে থাকা যায়! লক্ষ করে দেখে, রক্তের রংটাও এখন আর উজ্জ্বল লাল নেই, লালচেবাদামি হয়ে গেছে।
বড় অস্থির লাগে তার। উঠোনের কূপের পাশে গিয়ে বালতি ভরে পানি তোলে। তারপর একটি পরিষ্কার গামছা পানিতে ডুবিয়ে, নিংড়ে, গামছাটি হাতে নিয়ে ধীরে ধীরে গুলনূরের কাছে এগিয়ে আসে।
গুলনূরের মুখের দিকে ঝুঁকে গামছা বাড়িয়ে দেয় মুখের দিকে। ঠিক সেই মুহূর্তে হঠাৎই গুলনূর চমকে উঠে চোখ মেলে তাকায়। দুটো চোখের মণি সোজা গিয়ে ঠেকে জাওয়াদের চোখে। অপ্রস্তুত হয়ে বলে, 'কী করছো?'
তার কপাল, কান এবং গালের রক্তাক্ত দাগ মুছে দিতে শুরু করে জাওয়াদ। গুলনূর সেই স্নেহের স্পর্শ প্রত্যাখ্যান করে। নড়েচড়ে বসে বলে, 'লাগবে না, দূরে যাও।'
জাওয়াদ তার প্রতিবাদে কর্ণপাত না করে বরং কঠোর স্বরে উত্তর দেয়, 'এতো দরদ নেই আমার! বাজে গন্ধ বের হচ্ছে। ইয়াক থুহ।'
গুলনূর কটমট করে জাওয়াদের দিকে তাকায়, যেন তার দৃষ্টিই জাওয়াদকে ভস্ম করে দেবে।
জাওয়াদ গুলনূরের গলার কাছের রক্তের দাগ মুছে দিতে এগিয়ে এলে গুলনূর আরও জোরে প্রতিবাদ জানায়, 'দূরে যাও, একদম ছুঁবে না।'
জাওয়াদ ব্যঙ্গাত্মক হাসি হেসে বলে, 'তোমাকে ছোঁয়ার জন্য মরে যাচ্ছি যেন!'
বলেই সে গুলনূরের গলা, ওভারকোটের রক্তাক্ত অংশ এবং হাতের পাশের দাগ জোর করে মুছে দেয়।
চুলেও রক্ত জমাট বেঁধে জট তৈরি করেছে। জাওয়াদ যখন সেই চুলের রক্ত পরিষ্কার করতে যায়, গুলনূর শ্বাস আটকে রেখে অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে নেয়। তার হৃদয় প্রবল গতিতে স্পন্দিত হচ্ছে। সে নিজেই অবাক হয়ে ভাবে কেন এমনটা হচ্ছে। জাওয়াদের স্পর্শে কেন তার দেহ এবং মন এমন প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছে।
জাওয়াদ রক্ত মুছতে মুছতে হঠাৎ থমকে দাঁড়ায়। তার বুকের ভেতরে একটা অদ্ভুত আলোড়ন অনুভব করে - যেন কিছু একটা লুটোপুটি খাচ্ছে।
পূর্বের মতোই সে গুলনূরের থুতনি ধরে তার মুখ তুলে ধরে। তার চোখের দিকে তাকিয়ে কৌতূহল নিয়ে প্রশ্ন করে, 'কে তুমি?'
'অভিশাপ।'
'কার অভিশাপ?'
'যখন যার জীবনে যাই।'
জাওয়াদ ধীরে ধীরে দূরে সরে দাঁড়ায়। প্যান্টের পকেটে হাত রেখে গুলনূরকে নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করতে থাকে। তারপর অত্যন্ত শান্ত কণ্ঠে প্রশ্ন করে, 'কেন করেছ এমন? কী দোষ ছিল আমার?'
গুলনূর একটি তিক্ত হাসি হেসে বলে বলে, 'তোমার দোষ... তোমার দোষ হলো তুমি ভূঁইয়া বাড়ির উত্তরাধিকার।'
জাওয়াদ আবেগপ্রবণ হয়ে প্রশ্ন করে, 'আমার ইচ্ছায় কি ভূঁইয়া বাড়িতে জন্মেছিলাম?'
গুলনূর নীরব থাকে। সে মুখ ফিরিয়ে রাখে, যেন উত্তর দিতে অনিচ্ছুক বা অক্ষম। জাওয়াদ তার নীরবতা সহ্য করতে না পেরে এগিয়ে আসে। চেয়ারের হাতলে দুই হাত রেখে গুলনূরের দিকে ঝুঁকে পড়ে, দাবিজনক স্বরে বলে, 'জবাব দাও। আমি কি ইচ্ছে করে জন্মেছিলাম?'
গুলনূর কুৎসিত হাসি হেসে অত্যন্ত নিষ্ঠুরভাবে বলে, 'তোমার ইচ্ছে-অনিচ্ছা পরের ব্যাপার। আমি কখনোই এমন কোনো ছেলেকে বিয়ে করতাম না, যার বাবার পরিচয়ের ঠিক নেই! যে একটা জারজ, বেজন্মা...'
গুলনূর কথা শেষ করার আগেই জাওয়াদের মধ্যে একটা ভয়াবহ পরিবর্তন ঘটে। তার কপালের শিরা ফুলে ওঠে, চোখ রক্তবর্ণ ধারণ করে। ক্রোধে সমস্ত সংযম হারিয়ে যায়। সাপের মতো দ্রুততায় তার হাত গিয়ে গুলনূরের গলা পেঁচিয়ে ধরে। ঠোঁট বিড়বিড় করে হুমকি দেয়, 'নিমকহারামের বাচ্চা! জিভ ছিঁড়ে ফেলব।'
·
·
·
চলবে……………………………………………………