রানির চোখের পাতা ভার হয়ে আছে। ভেতরে তীব্র এক যন্ত্রণায় শরীর কেমন করছে। মাথাটাও অসম্ভব ঘুরাচ্ছে। বেশ অনেকটা সময় তীব্র চেষ্টার পর তিনি নিজের চোখ দু'টি খুলতে পারলেন।
চোখ খুলেই দেখলেন তার সামনে হেমলক বসে আছে। মাথাটা নিচু করে হাতের উপর ভর দিয়ে। কক্ষের আলো কিছুটা ঢিমে। রানি আবছা চোখে বাহিরে থাখাতে দেখলেন অন্ধকারে ছেয়ে আছে বাহিরটা। রাত নেমে গিয়েছে তা আঁচ করে ফেললেন নিমিষেই। তখনই মনে পড়লো সে ঠিক কতক্ষণ বেহুঁশ অবস্থায় ছিলেন? সেই দিনের আলোয় তিনি লোহার শিকে হাত দিয়ে নিজের ভেতরের সমস্ত শক্তি হারিয়ে ছিলেন এরপর কি আর তবে জ্ঞান ফেরেনি তার?
উঠে বসার চেষ্টা করলেন নিজে নিজে কিন্তু পারলেন না। শরীরে পর পর এত এত যন্ত্রণায় দুর্বলতাটা বেশিই বোধ করলেন। চাপা স্বরে ‘আহ্’ করে ওঠলেন।
শব্দটা অতটাও জোরে ছিলো না কিন্তু ঠিক ঠিক তা পৌঁছে গেলো হেমলকের কাছে। সঙ্গে সঙ্গে সে মাথা তুলে ফেলল। মাথা তুলতেই জাগ্রত রানিকে দেখে বুকের ভারি পাথরটা নেমে গেলো বুক থেকে। কম ভয় তো সে পায়নি! সারাদিন কত তোরজোর করেছে রানির হুঁশ ফেরানোর জন্য কিন্তু পারেনি। তবুও আশাহত হয়নি। নিজের মনে সমস্ত বল রেখেছিলো। কারণ আর কেউ না জানলেও সে তো জানতো, রানি কামিনীকে স্রষ্টা আলাদাই প্রাণবায়ু দিয়েছেন। রানি কামিনীর বেঁচে থাকার আলাদা কারণ আছে। তাই নানান ঘাত-প্রতিঘাতও তাকে দুর্বল করতে পারেনি।
হেমলক তড়িৎ গতিতে উঠে এলো। আগ বাড়িয়ে রানির কপাল, গাল ছুঁলো আলতো হাতে। কণ্ঠে তার তখনও চিন্তার রেশ, “ঠিক আছো তো? খারাপ লাগছে কি কোথাও? কেমন বোধ করছো?”
একের পর এক প্রশ্নে রানি নিশ্চুপ থেকে কেবল পরোখ করলো হেমলককে। তার এই খারাপ থাকার দিনগুলোতে হেমলকের এই বাড়িয়ে দেওয়া হাত বুকের ভেতর মায়ার জন্ম দেয়। নিজের সর্ব কঠোরতা ভেদ করে হৃদপিণ্ডটা ভালোবাসতে চায়।
“কী হলো? কথা বলছো না যে? শরীরে কী এখনো আরাম বোধ করছো না?”
“এত প্রশ্ন একসাথে করলে উত্তর দিবো কী করে? ধীরে ধীরে করুন।”
রানির স্পষ্ট কণ্ঠস্বর হেমলকের বুকে এক প্রকারের স্বস্তির আভাস দিলো। সারাদিন পর অবশেষে মানুষটার মুখে বুলি ফুটেছে।
“আচ্ছা ধীরে ধীরেই বলো। কেমন বোধ করছো?”
“যুদ্ধক্ষেত্রে নামিয়ে দেন, একটি গোটা রাজ্য জয় করে ফিরতে পারবে এতটাই সুস্থবোধ করছি।”
অসুস্থ শরীর তার তবুও কথার ভেতর কত আত্মবিশ্বাস। হেমলক হাসলো খানিক। রানিকে হাত ধরে উঠতে সাহায্য করতে করতে বলল,
“যাক, ধন্য হলাম শুনে। রাজ্যের রানি এভাবে পালঙ্কে শুয়ে থাকলে রাজ্য চালনা করবে কে?”
“কেন? আপনি। রাজ্যের রাজপুত্র করবে।”
“রাজ্য চালনা করার কোনো আগ্রহ আমার ভেতর নেই।”
“কেন নেই? থাকা উচিত। রাজ পরিবারে যার জন্ম হবে তার ধর্মই হলো রাজ্য সামলানো। প্রজাদের দায়িত্ব নেওয়া।”
“আগে আমার রানির দায়িত্ব পালন করে নিই। আমার জন্য গোটা একটি রাজ্যের সমকক্ষ হলো আমার রানি।”
আচমকা হেমলকের এত ঘনিষ্ঠ কথায় কথা থেমে গেলো রানির। চোখগুলো তার আশ্চর্য রকমের গোল গোল হয়ে গেলো। মানুষটা কথা বলতে বলতে হুটহাট যেন কেমন কথা বলে দেন!
হেমলক একটি কাপড় ভিজিয়ে এনে রানির মুখটি মুছিয়ে দিলো। মুছিয়ে দিলো গলা, হাত।
রানি নীরবে পর্যবেক্ষণ করে শুধালো, “কী করছেন? হঠাৎ শরীর মুছিয়ে দিচ্ছেন যে!”
“শরীরে কিছু প্রতিষেধক লাগানো আছে। এগুলো মুছিয়ে দিচ্ছি।”
“প্রতিষেধক?” কিছুটা বিস্ময় ধরা দিলো রানির হাবভাবে।
হেমলক একবার চোখ তুলে তাকালো রানির চোখের দিকে। আবারও নিজের কাজে মনোনিবেশ করতে করতে বলল, “হ্যাঁ। তোমার শরীরে বিষক্রিয়া হয়েছিলো। তাই রাজ বৈদ্য প্রতিষেধক তৈরি করে দিয়েছিলেন।”
হেমলকের কথার পর রানি কিছুক্ষণ মৌন থাকলেন। তার মাথার ভেতর প্রশ্নদের ছড়াছড়ি। তার শরীরে সামান্য শিক ধরাতে বিষক্রিয়া হলো কীভাবে? তাহলে কি এই বিষক্রিয়াতেই মৃত্যু হয়েছিলো এই রাজ্যের রাজার?
আর তার বেলা রাজ বৈদ্য তার বিষের প্রতিষেধক তৈরি করতে পারলেন অথচ রাজার বেলা করলেন না কেন? কেমন যেন খটকা লাগলো রানির।
আচমকা থামিয়ে দিলেন তিনি হেমলকের হাত। তীক্ষ্ণ কণ্ঠে বললেন, “আপনি এখুনি একটিবার রাজ বৈদ্যকে ডাকুন।”
রানির নির্দেশে কপাল কুঁচকালো হেমলক, “এখন তো মাঝ রাত্রি! এখন রাজ বৈদ্য কেন?”
“আমার কিছু জানার আছে। এখুনিই তাকে আনবেন। আপনি নিজে গিয়ে নিয়ে আসুন।”
“কী এমন প্রয়োজন হয়েছে তোমার? আমায় বলো।”
“বলবো বলবো। আপনি আগে উনাকে নিয়ে আসুন।”
নাছোড়বান্দা রানিকে হেমলক কোনো ক্রমেই বুঝাতে সক্ষম হলো না। অতঃপর রানির জেদের কাছে হার মেনে তাকেই ছুটতে হলো বৈদ্যর কাছে। রানি অকারণে কিছু করেন না। নিশ্চয় কোনো না কারণ ঠিক রয়েছে। নয়তো এতটা জোর করতেন না।
গভীর নিশুতি রাত। বৈদ্যর বাড়ির বাহিরের গাছগুলোতে মশাল জ্বলছে যথারীতি। হেমলক ও তার খাস প্রহরী দু'জন গিয়ে দাঁড়ালো রাজবৈদ্যর বাড়িটির সামনে।
হেমলক তার প্রহরীকে নির্দেশ করল বৈদ্যকে ডাকার জন্য। প্রহরী বৈদ্যর বন্ধ দরজার এপাশ থেকে হাঁক ছাড়ল, “রাজ বৈদ্য, রাজকুমার হেমলক পিয়ার্স এখানে উপস্থিত হয়েছেন। আপনাকে বাহিরে আসার অনুরোধ করা হলো।”
হেমলক দাঁড়িয়ে তাকিয়ে রইল। ভাবলো রাজ বৈদ্য হয়তো এখুনি খুলে দিবেন দরজাখানা।
রাতের মিহি পবনে তাদের দেহের প্রতিটি অংশ মৃদু কাঁপুনি দিতে লাগলো। মশালের আলোগুলো নড়তে লাগলো উন্মাদের মতো। অথচ দরজা খুললেন না রাজ বৈদ্য।
এবার দ্বিতীয় প্রহরীটি আরেকটু চওড়া গলায় একই রকম ভাবে ডাক দিলেন। এবং তাদের আশাহত করে রাজ বৈদ্য খুললেন না কপাট।
হেমলকের মনে সন্দেহ হলো। রানি এই রাতে হুট করে কেনই বা ডাকতে বললেন রাজ বৈদ্যকে আর কেনই বা কপাট খুলছেন না বৈদ্য? এই দুটি প্রশ্নই তার মনে হলো সম্পর্কযুক্ত। তাই সে আর অপেক্ষা করল না। প্রহরীদের নির্দেশ করল, “দোর ভাঙো দ্রুত।”
হেমলকের নির্দেশ পাওয়ার সাথে সাথে দরজায় আঘাত করতে গেলো একটি প্রহরী এবং অবাক করে দিয়ে দরজাটা খুলে গেলো মৃদু ধাক্কাতেই। তার মানে দরজাটি খোলা ছিলো আগ থেকেই।
হেমলক ছুটে গিয়ে আগে প্রবেশ করলো ভেতরে। এবং ভেতরের দৃশ্য দেখে বিস্ময়ে সে হা হয়ে রইলো। রাজ বৈদ্য পড়ে আছেন মাটিতে এলোমেলো ভাবে। বুক থেকে গলগলিয়ে পড়ছে টাটকা র ক্ত। নামমাত্র শ্বাসটুকু নেই মানুষটার। স্থির হয়ে আছে। চোখ দু'টো খোলা নিষ্প্রাণ ভঙ্গিতে।
হেমলকের গা মৃদু কেঁপে উঠল। ছোটোবেলা থেকেই এই রাজ বৈদ্যর আগ পিছেই ছিলো কার বড়ো হওয়ার গল্প। অথচ সেই মানুষটার এমন দশা কেনই বা হলো? কীভাবে বা হলো? কেই বা করল?
—————
এ্যাজেলিয়া রাজ্যে প্রজাদের আশা জাগিয়ে আবারও শুরু হলো দাতব্য চিকিৎসালয়ের বন্ধ হয়ে থাকা কাজটি। প্রজাদের মনে হলো তাদের রানি চলে যাওয়ার পর অযাচিত যেই অভিশাপ রাজ্য জুড়ে বাসা বেঁধেছিল তা কাটতে আরম্ভ করেছে।
রাজ বৈঠকখানায় যামিনীকে দেখালো আজ উৎফুল্ল। হাসি হাসি মুখ। রাজ্য পরিচালনায় আগ্রহী।
মন্ত্রীমশাই তো তাজ্জব কণ্ঠেই বললেন, “আপনি রাজ্যের দাতব্য চিকিৎসালয়ের কার্য আরম্ভের অনুমতি দিয়ে দিলেন। অথচ আমাতের একটিবার জানানোর প্রয়োজন বোধটুকু করলেন না?”
যামিনী আত্ম অহংকারে বুক ফুলিয়ে সেই কথার বিপরীতে উত্তর দিলো,
“আপনি রাজ্যের সামান্য মন্ত্রী আর আমি হলাম রানি। আমি কী করবো, না করবো কা কৈফিয়ত আপনাকে দেবো?”
মন্ত্রীর গায়ে লাগলো এই অপমান। সামান্য শব্দটি তীরের মতন বিঁধলো তার বুকে। যেই যামিনীকে রানি কামিনী পথ থেকে তুলে এনে রানির সখী করেছিলেন সেই যামিনী কি-না তাকে সামান্য বলল? একটি পরিচয়হীন, পথের মেয়ের এত স্পর্ধা?
ক্রোধে ফেটে পড়লেন মন্ত্রী। ধিক্কার করে বললেন, “বহু বছর যাবত আমি এই রাজ্যের মন্ত্রী। এটি কোনো সামান্য পরিচয় নয়। সামান্য পরিচয় বরং আপনার। কারণ আপনি উঠে এসেছেন পথ থেকে। যার কোনো পরিচয় ছিলো না। যাকে রানি কামিনী দয়া করে পরিচয় দিয়েছেন।”
নিজের তিক্ত সত্যি কেউই শুনতে পছন্দ করে না। তাই স্বভাবতই যামিনীও পছন্দ করল না। আসন ছেড়ে উঠে দাঁড়ালো। রুক্ষ স্বরে সাবধান করল মন্ত্রীকে, “কথায় লাগাম টানুন আপনি। নয়তো আপনার পরিণতি ভালো হবে না।”
“আপনি কতটা খারাপ পরিণতি করতে পারেন তা কি আমরা কেউ অবগত নই ভেবেছেন? যেই রানি আপনাকে রাজপ্রাসাদে থাকার অধিকার দিলো আজ সেই রানিই রাজ্যহারা। এমনি এমনি কেউ রাজ্য ছাড়ে তা কখনো হয়েছে? আপনি নিশ্চয় বিশ্বাসঘাতকতার সর্বোচ্চসংখ্যক পর্যায়ে গিয়ে কিছু করেছিলেন।”
রাগ মানুষকে অন্ধ করে দেয়। তখন মানুষ ঠিক কী বলে তা নিজেরাও অনুভব করতে পারে না। মন্ত্রীমশাইয়ের ক্ষেত্রেও হলো তাই। রাগে তিনি তিক্ত সত্যি কথাগুলো বলে দিলেন অকপটে। যামিনীর বুকে তাই ভয় জমলো।
সে এই কথা আর এগুতে দিলো না। তৎক্ষণাৎ প্রহরীকে ডেকে নির্দেশ করলো মন্ত্রীমশাইয়ের সমস্ত ক্ষমতাচ্যুত করে কারগারে নিক্ষেপ করার।
রাগে, দুঃখ মন্ত্রীমশাইয়ের মস্তিষ্ক ভুল করে আরও আরও তিক্ত সত্যি বলল। প্রহরীরা তাকে টেনে নিয়ে গেলো বিশ্রী ভাবে। বৈঠকখানার সকলে যামিনীর এই হিংস্র আচরণে তেঁতো ঢেঁকুর তুলল। রানি কামিনী কঠোর ছিলেন কিন্তু অমানবিক তো ছিলেন না!
এই সমস্ত ঘটনাতেই হ্যাব্রো রইল নির্লিপ্ত। ভেতর ভেতর যে তার কী আনন্দ হলো! মনে হলো আনন্দে খানিক নৃত্য করা গেলে ভালো হতো। কীভাবে কাঁটা দিয়ে কাঁটা তুলতে হয তা যে তার বেশ জানা আছে। তাই মন্ত্রী নামক কাঁটাটিকে সে যামিনীর মাধ্যমেই তুলে ফেলল। রাজ্যের ভারে থেকে যারা যারাই রাজ্য নিয়ে উদাসীন থাকবে প্রত্যেককে এভাবেই সে উপড়ে ফেলবে। এরপর সবচেয়ে বড়ো বিষকাঁটাকে উপড়াবে।
·
·
·
চলবে……………………………………………………