রাজবৈদ্যকে রাখা হলো রাজ প্রাসাদের সামনে। সেখানেই তার অন্তেষ্টিক্রিয়া সম্পূর্ণ হলো। মুখ ভার ভার সকলের। মন খারাপের মেঘ জমেছে সবার মনেই। সবচেয়ে বেশি যাকে স্তব্ধ হতে দেখা গেলো সে আর কেউ নয় স্বয়ং হেমলক।
ছোটোবেলা থেকেই রাজবৈদ্যর সাথে তার আত্মিক একটি টান সকলেই লক্ষ্য করেছিলো। বাবার মৃত্যুর পর সেই মানুষটিই অগাধ স্নেহ দিয়েছেন। সবচেয়ে বেশি নিরাপত্তা দিয়েছেন। অথচ মানুষটির এমন অকাল, অকারণ মৃত্যু ঘটলো। হেমলকের মানতে না পারাটাই বেশ স্বাভাবিক।
রানির শরীর দুর্বল থাকা সত্ত্বেও তিনি সবকিছুতে উপস্থিত ছিলেন। মন্ত্রীমশাই যদিও একবার বলেছিলেন বিশ্রামের কথা কিন্তু তিনি তৎক্ষণাৎ সেই প্রস্তাব নাকচ করেছেন। সাথে বিপরীতে প্রশ্ন করেছেন,
“পরিবারের একজন সদস্য হারিয়ে কারো চোখে কি নিদ্রা আসে? এই রাজ বৈঠকখানার আপনারা সকলেই আমার পরিবার। যারা এই গোটা রাজ্যটিকে টিকিয়ে রাখার জন্য কত চেষ্টা করছেন। তাদের ভেতর একজনকে আমি হারিয়ে ফেলেছি। আমার যেই নিদারুণ ক্ষতি হয়েছে তা নিয়ে কি আমি বিশ্রাম করতে পারবো?”
মন্ত্রীমশাই উত্তর হারিয়ে ফেলেন। বাকিরা সকলেই রানির এই বিবেক-বিবেচনাবোধে আপ্লূত না হয়ে পারলেন না।
রাজ বৈদ্যের শেষকার্যের অন্তিম মুহূর্তে উপস্থিত হলেন সভাকবি। তার চোখ জোড়াতে বিন্দু পরিমাণ অশ্রু না থাকলেও কান্নাকাটির আপ্রাণ চেষ্টা করলেন। দুঃখী হওয়ার অসম্ভব নাটকীয়তাও দেখালেন।
রানি দাঁড়িয়ে থেকে পরোখ করলেন সবটা।
রাজমাতা কিছুটা পাশেই ছিলেন সকলকে নিয়ে। রাজপ্রাসাদে আবার দু'টো দল আছে বলা যায়। রাজপ্রাসাদের সকলে একটি দলে অন্তর্ভুক্ত আর রানি আলাদা একটি দল। তার পাশে দাঁড়াতেও যেন সকলের ভয়, দ্বিধা।
সভাকবি রাজমাতার কাছে গিয়ে তার মন ভোলানো স্বরে বলল, “এ কী হলো, রাজমাতা! এই রাজ্যে যে এমন ঘটনা আগে কখনো ঘটেনি। নিরাপত্তার এতটা আকাল পড়ল?”
“তা-ই তো দেখছি। নতুন রানি এসেছেন, তিনিই জবাবদিহি করুক। কেন রাজ্যের সদস্যদের তাও আবার রাজপ্রাসাদের একজন গুণী মানুষের এমন হাল হলো!”
রানি পাশেই দাঁড়িয়ে থাকার কারণে সমস্তই শুনলেন। রাজ বৈঠকের বাকিরাও ছিলেন। তাদের মুখগুলোও শুকনো ভীষণ।
সভাকবি সেই সকলের দিকে তাকিয়ে বললেন, “আমি না-হয় রানির বিপরীতে কথা বলতাম তাই আমি খারাপ। আপনারা তো বিপরীতে বলেননি। তাও আপনাদের প্রাণের নিশ্চয়তা কোথায়?”
মন্ত্রী ত্রিপাদ কুমার রাগান্বিত হলেন, “রানি নিশ্চয় জানতেন না হুট করে কার জীবনে কী ঘটবে? তাহলে এসব উস্কানিমূলক কথা কেন বলছেন?”
“আমি কি আমার জন্য বলছি? আপনাদের কথা ভেবেই বলেছি। এত বছর যাবত তো রাজ্যে কখনো এমন হয়নি। নতুন একজন রানি আসতেই এমন হয়েছে বিষয়টা আপনাদের কাছে খটকার লাগছে না?”
রানি নীরবে প্রত্যক্ষ করলেন রাজ বৈঠকখানার সকল সদস্যের মুখটি। সকলের ভিতরেই একটা আতঙ্ক, অনিরাপত্তার আভাস। মন্ত্রী ছাড়া বিশেষ প্রতিবাদ কেউই করছে না। প্রাণের ভয়ে তটস্থ সকলে।
রানির ঠোঁটে দেখা দিল তীক্ষ্ণ হাসি। রহস্য করে বললেন, “মানলাম আমি আসার পরেই এমন ঘটনা ঘটেছে। তাই সন্দেহ আমার দিকে। আমিই ঘটালাম কি-না! যদি আমার ঘটানোরই হতো তাহলে তো প্রাণ রাজ বৈদ্যর নয় আপনার যেতো, সভাকবি। তাছাড়া আমি রাতের আঁধারে কিছু করি না। আমি যা করার তা দিনের জ্বলজ্বল আলোতে করি৷ তার প্রমাণ দিয়েওছি।”
সভাকবির মুখটা বন্ধ হয়ে গেলো। থেমে গেলো তার হেঁয়ালিপূর্ণ কথা। তবে এবার সেনাপতি বললেন, “তবে রানি, এটা তো ঠিক, এমন ঘটনা এ রাজ্যে বিরল। এর আগে কখনো ঘটেনি।”
“কারণ এর আগে যে-সে তো রাজ আসনে বসেনি।” কথা শেষ করেই কুটিল হাসলেন রাজমাতা।
রানি সেই নোংরা ইঙ্গিত নিয়ে তর্ক-বিতর্কে না গিয়ে রাজ্যের সকল শ্রেণির পদস্থ সদস্যদের দিকে তাকিয়ে আশ্বস্ত করে বললেন,
“আপনারা ধৈর্য রাখুন। আমি আপনাদের সামনে দাঁড়িয়ে কথা দিচ্ছি, যে বা যারা আজ রাজ বৈদ্যর এমন অবস্থার জন্য দায়ী তারা প্রত্যেকেই এমন কঠোর শাস্তি পাবেন যে নিজেদের মৃত্যুকে দর্শন করার অভিজ্ঞতা প্রাপ্ত হবেন। বিনা কারণে কারো প্রাণ কেড়ে নেওয়ার মতো অমানবিকতা যারা দেখিয়েছেন তাদের ফল ভীষণ খারাপ হবে। ভীষণ।”
শেষের বাক্যটি বললেন রানি রাজমাতা ও মামাশ্রীর দিকে তাকিয়ে।
রানির সেই উষ্ণ দৃষ্টি, ক্রোধে ভরা কণ্ঠ শুনে উপস্থিত অনেককে ঘাবড়াতে দেখা গেলো। আর বাকিরা ভরসা পেলো কেবল।
—————
কক্ষের ভেতর এক চিলতে আলোর রেখা এসে পড়েছে। মৃদু বাতাসে কাঁপছে বাতায়নের পর্দাগুলো। রানিকে দেখালো ভাবুক। তার চোখগুলো কোন দুরন্তে তাকিয়ে আছে সেটার ব্যাখ্যা হয়তো তার নিজের কাছেও নেই। হাত দু'টো পেছনে। ভাবছেন আবার কিছুক্ষণ পর পর দীর্ঘশ্বাস ফেলছেন।
কক্ষে হেমলক এলো ব্যস্ত পায়ে। তার পায়ের শব্দ হলো। পেছন পেছন এলো আরও কিছু পায়ের ধ্বনি। কৌতূহলবশত রানি পেছনে ফিরে তাকাতেই দেখলেন হেমলকের পেছন পেছন কক্ষে প্রবেশ করছে ইনান ণেকিতান। ঠোঁট জুড়ে প্রশস্ত হাসি। ইনান ণেকিতানের পেছনেই দেখালো আরেকটি মেয়েকে। যাকে রানি চেনেন না। সাজপোশাকে রাজ পরিবারের কেউই মনে হলো।
আগ বাড়িয়ে নিজের হাতের একগুচ্ছ ফুলের সাজানো তোড়াটি রানির দিকে দিতে দিতে ইনান ণেকিতান বলল, “এই নিন আপনার প্রিয় ফুল। সেই দূর পার্বত্য থেকে আপনার জন্য আনিয়েছি বিশেষ ভাবে।”
রানি ফুলগুলোর দিকে তাকালেন। ফুলগুলো তার সবচেয়ে পছন্দের। এই ফুলগুলো থেকেই তার গায়ে মাখা সুগন্ধি তৈরি করা হয়। এত বিশেষ এই ফুলগুলো এবং এগুলো সংগ্রহ করাও ভীষণ ব্যয়বহুল। অন্যান্য সময় ইনান ণেকিতান রানিকে দিয়েছে মূল্যবান রত্ন, অলংকার। অথচ আজ কেবল ফুল?
তবে কি সে বুঝতে পেরেছে কোন উপায়ে বশ করা যায় রানি কামিনীকাঞ্চনকে?
রানি ঘোমটার নিচেই হাসলেন মৃদু। যত মন্ত্রই জপুক পুরুষ, কামের তাড়নায় রানি কামিনীকে বশ করা কখনোই সম্ভব নয়। রানি কাম আর প্রেমের চক্ষু চিনতে পারেন যে!
“বাহ্! হঠাৎ ফুল কেনো?” হাত বাড়িয়ে ফুলগুলো নিতে নিতে প্রশ্ন ছুঁড়লেন রানি।
ইনান সবগুলো দাঁত দেখিয়ে হাসতে হাসতে বলল, “যে দেবতা যেই পুজোতে সন্তুষ্ট হন তাকে তো সেই পুজোই করতে হয়।”
“সব দেবতাকেই যে পুজোতে সন্তুষ্ট করা যায় না। এতটুকু জেনে রাখা উচিত।”
রানির উত্তরে ঠোঁটের হাসিটা কিছুটা নিভে এলো ইনানের। তবে সম্পূর্ণরূপে মুছলো না।
সে বরং প্রসঙ্গ পাল্টে পাশের মেয়েটির সাথে পরিচয় করিয়ে দিলো রানির।
“ওহ্ আপনাকে পরিচয় করিয়ে দিই রাজকন্যা মৃন্ময়ীর সঙ্গে। ও রাজকন্যা মৃন্ময়ী। জৈতুন রাজ্যের রাজার একমাত্র কন্যা। আমার অতিথি সে। চিত্রশিল্পী হেমলক পিয়ার্সের বড়ো ভক্ত সে। হেমলক পিয়াসর্কে একটিবার দেখার জন্যই তার ছুটে আসা। তাই আমাকেও আসতে হলো। দেখার তাড়া কি আর একা ওর? আমারও তো কম নয়।”
শেষের কথাটির ইঙ্গিত রানি তো বুঝলেন তবে হেমলক বুঝল আরও ভালো করে। ওর ভেতর ভেতর ইচ্ছে হলো ইনান ণেকিতানের মুখটি ছিঁড়ে ফেলতে। ওর সামনে দাঁড়িয়ে ওরই রানিকে এমন ইঙ্গিতপূর্ণ কথা কীভাবে বলছে?
তবে পরিস্থিতির কাছে বন্ধ তার হাত। ণেকিতানের সঙ্গে যেকোনো প্রকার ঝামেলাই রানির জন্য বিপজ্জনক। কারণ এখনো রানির সঠিক পরিচয় বের হওয়ার সময় যে হয়নি!
মৃন্ময়ী নিজের হাত জোর করে রাজকীয় ভঙ্গিতে অভ্যর্থনা জানালো রানিকে। প্রশংসায় নিমজ্জিত হয়ে বলল, “আপনার ভাগ্য দেখে আমার ঈর্ষা হচ্ছে বৈকি।” মৃন্ময়ীর অকপটে বলা এমন অদ্ভুত কথায় রানি কপাল কুঁচকালেন। বাকিরাও প্রশ্নাত্মক দৃষ্টিতে তাকালো তার দিকে।
রানির জানামতে মৃন্ময়ী কিংবা জৈতুন রাজ্যের সাথে তার কোনোকালেই পরিচয় ছিলো না। তবে এই রাজকন্যা মৃন্ময়ী এহেন কথা বলল কেন?
“আমায় ঈর্ষা করার কারণ?”
মৃন্ময়ী হেসে হেমলককে ইশারা করল, “ঐ তো কারণ। চিত্রশিল্পী হেমলক পিয়ার্সের মতন একজন মানব আপনি পেলেন তাই। এমন গুণী মানুষ যেই গৃহে থাকে সেখানে শান্তি, স্বস্তি, স্বর্গ একই সঙ্গে বাস করে বলেই আমার ধারনা। তাই না?”
রানি কামিনী আরেকটিবার ভালো ভাবে পরোখ করলেন মৃন্ময়ীকে। মৃন্ময়ীর চোখজোড়া মুগ্ধতায় নিমগ্ন। ঘুরে ফিরে বার বার দেখছে হেমলককে। ঠোঁট জোড়ায় হাসি টানা।
রানি কামিনীকে কি আর কথায় ভোলানো যায়? তিনিও হাসতে হাসতে বেশ অকপটেই বললেন, “তোমার ধারণা ভুল নয়, রাজকন্যা মৃন্ময়ী। তা বলো আমার এই স্বর্গে এসে কেমন বোধ করছো?”
রানির এই শান্ত স্বীকারোক্তি অবাক করলো রাজকন্যাকে। কোনো নারী নিজের পতির এমন প্রশংসা অন্য কোনো নারীর মুখে শোনার পর এত শীতল কণ্ঠে প্রতিত্তোর করতে পারেন বলে তো তার জানা ছিলো না। তাই রানির প্রতি তার আগ্রহ জন্মালো। মাথা নাড়িয়ে রানিকে একবার পরোখ করে বলল, “বেশ আনন্দিত অনুভব করছি।”
“সেই আনন্দকে বাড়িয়ে দিয়ে আমরা আতিথেয়তা করার সুযোগ চাচ্ছি। দেখো গুণী মানুষ এবং তার সহধর্মিণী কেমন আপ্যায়ন করতে পারে। সুযোগ দিবে বলে আশাবাদী।”
“অবশ্যই অবশ্যই। এমন করে বললে কে বা প্রত্যাখান করবে?”
সঙ্গে সঙ্গে ণেকিতানও বলল, “হ্যাঁ হ্যাঁ, ভীষণ আগ্রহী আমিও। আপনার একটু সান্নিধ্য পাই যদি!”
হেমলক আর সহ্য করতে পারছিলো না। তবুও কৃত্রিম হাসি ঝুলিয়ে রেখে একজন প্রহরীকে ডাকলো। তাদের নিয়ে গিয়ে একটি বিশেষ কক্ষে বসাতে বললো। দু'জনেই প্রহরীর সাথে বেরিয়ে গেলো। যেতে যেতে মৃন্ময়ী একবার আবারও ঘুরে তাকালো হেমলকের দিকে। রানি সমস্তটাই খেয়াল রাখতে ভুললেন না।
ওরা প্রস্থান নিতেই রানির হাত থেকে ছোঁ মেরে ফুলের তোড়াটি ছিনিয়ে নিলো হেমলক। এতটাই আচমকা যে রানির তো বুঝতেই লেগে গেলো কিছু মুহূর্ত।
ক্রোধে অন্ধ হয়ে হেমলক বলল,
“এই ইনান ণেকিতানের গলাটি কবে না যেন আমি ঘাড় থেকে আলাদা করে দিই। তুমি কেন ওর ফুলগুলো নিলে? ফিরিয়ে দিতে পারলে না?”
হেমলকের হঠাৎ রাগের বশীভূত হয়ে রানি স্তব্ধ হয়ে গেলেন। এরপর কিছুক্ষণ পর বিষয়টা তার কাছে পরিষ্কার হতেই বুঝেও অবুঝপনা করলেন। নিষ্পাপ কণ্ঠে শুধালেন,
“ফুলগুলো ছুঁড়বো কেন? আমার জন্য তো যত্ন করে এনেছিলো!”
হেমলকের রাগ বেড়ে গেল। ক্রোধে চেপে ধরলো রানির দু'টি বাহু। আগুন গরম চোখ নিয়ে তেজীয়ান স্বরে বলল,
“ওর যত্ন দেখছো তুমি আমারটা দেখছো না? ঐরকম তোড়া নয় আমি তোমার জন্য গোটা পর্বত তুলে আনবো সেই ফুলের। তবুও ওর উপহার তুমি গ্রহণ করবে না। না মানে না।”
নিজের বাহুতে থাকা হেমলকের হাত দু’টির দিকে তাকালেন রানি। নির্ভার স্বরে বললেন, “আমি আপনার না শুনবো কেন?”
“কারণ তুমি এই হেমলকের বধূ। চিত্রশিল্পী হেমলক পিয়ার্স তোমাকে সম্পর্কে আবদ্ধ করেছে। আমি ব্যতীত অন্য কোনো পুরুষের শ্বাসও তোমার জন্য নিষিদ্ধ। শুনে রাখো, রানি কামিনী, আমি ভালোবাসায় বিশ্বাসী। তাই আমার প্রেম নিয়ে খেলা তুমি করো না। তা বিশেষ ফলপ্রসূ হবে না বোধহয়। হেমলক সব ছাড়বে কিন্তু তোমায় না।”
·
·
·
চলবে……………………………………………………