নবোঢ়া - পর্ব ৫৯ - ইলমা বেহরোজ - ধারাবাহিক গল্প

নবোঢ়া - ইলমা বেহরোজ
          কাঠের তৈরি পুরনো চৌকিটির এক কোণায় বসে আছে জুলফা। তার মৃৎপাত্রের মতো গোলাকার মুখের সবচেয়ে আকর্ষণীয়, পটলের মতো লম্বাটে আকৃতি নিয়ে, কালো কাজলের রেখায় সুসজ্জিত চোখ দুটি চিকচিক করছে জলে। শরীরে জড়ানো রেশমি কাপড়ের বেগুনি রঙের শাড়ি। বৈশাখি দীর্ঘক্ষণ ধরে সেই শাড়ির উপর আদর করে হাত বুলাচ্ছে আর বলছে, 'কী সুন্দর দামী শাড়িরে। কি কপাল তোর বইনে।'

তার চোখ দুটো চকচক করছে জুলফার পরনের শাড়ি দেখে। অথচ রূপে-গুণে বৈশাখি নিজে জুলফার চেয়ে কোনো অংশে কম নয় বরং বেশি। কিন্তু নিয়তির নিষ্ঠুর পরিহাসে তার ভাগ্যে জুটেছে এক অকর্মণ্য, স্বার্থান্ধ মানুষ।

জুলফা কোনো উত্তর দেয় না বৈশাখির কথার। তার ঠোঁটদুটি যেন সেলাই করে দেওয়া। বিমর্ষ মুখে সে ভাবছে, লোকটা প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল বিয়ে ভেঙে দেবার। হয়তো খুব স্পষ্ট করে, সরাসরি কথাটা বলেনি, কিন্তু মাথা নেড়ে সম্মতি তো জানিয়েছিল! অথচ সে তার নিজের কথা রাখেনি। এমন একজন অবিশ্বস্ত, দ্বিচারী মানুষের সাথে বিয়ে হতে যাচ্ছে! যে প্রতিশ্রুতি দিয়ে ভাঙতে জানে, আশা দিয়ে হতাশায় ডুবিয়ে রাখতে পারে।

অসহায় বেদনায় তার চোখের কোণ থেকে অশ্রুধারা বইতে শুরু করে। নিজের অজান্তেই বার বার মনে ভেসে উঠছে নাভেদের মুখ। যার নামে তার হৃদয় নিজেকে তালাবদ্ধ করে নিয়েছে, সে জানতেই পারল না, কেউ একজন তাকে নিঃশব্দে ভালোবেসেছে দূর থেকে, গোপনে। তার অজান্তেই সে অন্য কারো হয়ে যাচ্ছে।

এমন সময়ে ঘরের দরজার চৌকাঠে এসে দাঁড়ায় মান্নাত। তার পরনে সাদামাটা শাড়ি। দুই হাতে ধরা একটি পুরনো অ্যালুমিনিয়ামের প্লেট, যার চারপাশে বছরের পর বছরের ব্যবহারের দাগ। প্লেটের মধ্যে ধোঁয়া ওঠা গরম সাদা ভাত আর মুরগির গোশত। 

মান্নাত স্নেহভরা কণ্ঠে প্লেট এগিয়ে দিয়ে বলেন, 'দ্যাখ মা, মুরগির গোশত আইনছি। খা একটু। হা কর তো, মা খাওয়ায়া দেই।'

জুলফা মুখ ফিরিয়ে নেয়। দুইদিন যাবৎ সে কিছুই খাচ্ছে না। না খেয়ে থাকার কারণে তার মুখ শুকিয়ে গেছে, চোখের নিচে কালো দাগ পড়েছে।

মান্নাত ধৈর্য হারিয়ে কিছুটা কঠোর স্বরে বলেন, 'তুকে কতবার কইছি, বিয়েটা হয়া যাক আগে। তারপরে তুকে নিয়া আইবো। তুই কি চাস না মোদের ঘর হোক? তুর ভাইয়ে ব্যবসা করুক? আমাগো দুখের দিন শেষ হোক?'

জুলফা অভিমানী গলায় বলে, 'সেইজন্য মোরে বেইচা দিবি?'

মান্নাত বিস্মিত হয়ে প্রতিবাদ করেন, 'বেইচা দিবো মানে কি রে? বলি নাই তুকে মোরা পরে নিয়া আইবো? সব কিছু ঠিকঠাক হয়া গেলে তুকেও আইনা নিবো কাছে।'

'তাইলে কি ওই মানুষটারে ঠকানো হইবো না? এইডা কি ঠিক হইবো?'

'যেই মানুষ আমাগো গরিবির সুযোগ নিয়া তুরে কিনা নিতে চাইতাছে, সেই মানুষরে ঠকাইলে কিয়ের পাপ অইবো? হে কি ভালা মানুষ? হে কি তুর খবর নিতাছে, না পয়সার হিসাব কইরতাছে?'

জুলফা ঠোঁট কুঁচকে তিক্ত স্বরে বলে, 'যদি খারাপ মানুষই হয়, তাইলে কেন মোরে ওই লোকের সাথে বিয়া দিচ্ছিচ মা?'

'তুর সাথে খারাপ করব না রে মা। তুরে মাথায় তুইলা রাইখব। দেখিস তুই, তুই রানি হইবি।'

'এই কইতেছিচ নিয়া আইবি, এই আবার কইতেছিচ রানি হইব।'

'তুই এখন হা কর, ভাত খা।'

'আমি বিয়া করতে চাইনে মা।'

মান্নাত বিরক্ত হয়ে প্লেট হাতে নিয়ে উঠে দাঁড়ান। বলেন, 'আইজ তুর বিয়া না হইলে মোর লাশ নদীতে ভাচায়া দিচ।'

মায়ের মরণপণ হুমকিতে জুলফার সমস্ত প্রতিরোধ ভেঙে পড়ে। সে ডুকরে কেঁদে ওঠে। চোখ দিয়ে অঝোর ধারায় অশ্রু ঝরতে থাকে।

বৈশাখি জুলফার চোখের জল মুছে দিয়ে আস্তে আস্তে বলে, 'কান্দিস না বইনে। তুর মায়ে ঠিকই কইতাছে। নিজের আপনজনদের জইন্যে এইটুকু না করলে আর কার জইন্যে করবি? আমাগো কথা ভাব।'

জুলফা কিছু বলে না। শুধু চোখের জল মুছে ফেলে...সাথে সাথেই আবার নতুন জলের ধারা গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়ে। 

বৈশাখি বলে, 'জিন্দেগিতে মাঝেমইধ্যে আমাগো এমন কাজ করতে অয় যেইডা আমাগো মন চায় না। কিন্তু আপন মানুসদের ভালোর জইন্যে, সবার মঙ্গলের জইন্যে সেইডাই করতে হয়। তুই দেখবি, সব ঠিক হয়া যাইব।'

চোখের জল আড়াল করতে বৈশাখি জানালার ওপাশে তাকায়। তার চোখের মণিতে ভেসে ওঠে সেই ভয়াবহ দুর্ভিক্ষের সময়কার স্মৃতি, যখন মানুষ পানির জন্য হাহাকার করেছে, এক মুঠো চালের জন্য হৃদয় বিক্রি করেছে। আর সে কয়টা টাকার জন্য দেহ বিক্রি করেছিল। মন আজও মনে রেখেছে সেই লোকটার স্পর্শের বিতৃষ্ণা, নিঃশ্বাসের গন্ধ, কামুক দৃষ্টির ভার। পরদিন সকালে যখন সে নৌকায় ফিরেছিল হাতে টাকা নিয়ে, তার স্বামী কতই না খুশি হয়েছিল! ব্যস্ত হয়ে পড়েছিল টাকা নিয়ে। একবারের জন্যও দেখেনি তার হৃদয়ের রক্তক্ষরণ, আত্মার বিধ্বস্ত অবস্থা। দেখবেই বা কেন? সেই তো পাপের পথ প্রশস্ত করে দিয়েছিল, নরকযন্ত্রণার ব্যবস্থাপনা করেছিল।

এই যন্ত্রণার কথা সে কাউকে বলেনি। জুলফাকেও না। আজও যখন কোনো পুরুষ তার দিকে একটু বেশি তাকায়, তখনই সেই রাতের স্মৃতি এসে তাকে কুরে কুরে খায়। জুলফার তো তাও বিয়ে হচ্ছে! এই বিয়ের মধ্যে অন্তত একটা সামাজিক স্বীকৃতি আছে, একটা বৈধতা আছে, একটা নাম আছে। জুলফাকে তার মতো লুকিয়ে লুকিয়ে লজ্জা বহন করতে হবে না, গোপনে কাঁদতে হবে না, নিজেকে অপরাধী ভাবতে হবে না। এই কী যথেষ্ট নয়? বৈশাখি দীর্ঘশ্বাস ফেলে। 

গাবুর বাড়িটি গ্রামের প্রাণকেন্দ্র থেকে বেশ খানিকটা দূরত্বে অবস্থিত। চারদিকে বিস্তৃত সবুজ ধানক্ষেত আর ঘন জঙ্গলের আবরণ। 

বাড়ির মাটির দেয়ালগুলো সদ্য নতুন মাটি দিয়ে লেপে দেওয়া হয়েছে। সেই লাল মাটির উপর সাদা চুনকাম করেছে গাবু আর রঞ্জন মিলে। চুনকামের উপর রঙিন আলপনার ছোঁয়া - লাল, হলুদ, নীল রঙের নকশা, রোদের আলোতে চকচক করছে। প্রবেশদ্বারের দুপাশে দুটি সতেজ কলাগাছ পুঁতে রাখা হয়েছে, যার শীর্ষে লাল-সাদা কাপড়ের টুকরো বাতাসে পতপত করে উড়ছে। 

উঠোনের ঠিক মাঝখানে একটি বিশাল প্যান্ডেল তৈরি করা হয়েছে। বাঁশের মোটা খুঁটি আর সবুজ তালপাতার ছাউনি দিয়ে সাজানো প্যান্ডেলে সুন্দর করে সাজানো হয়েছে। ঝুলছে হাতের তৈরি কাগজের লাল, গোলাপি, হলুদ ফুল। রঙিন কাগজের তৈরি নানা আকৃতির ফানুস, গোল, চারকোনা, তারা আকৃতির। বাতাসে মৃদু দুলছে। বাড়ির চারপাশে দড়ি টাঙিয়ে তাতে রঙিন কাগজের ফিতা টানানো হয়েছে।

সূর্য যখন মাথার উপরে, ঠিক দুপুর বারোটায় শব্দর এসে হাজির হয়। পরনে শুভ্র সাদা পাঞ্জাবি-পায়জামা।
সঙ্গে এসেছে পাড়ার সম্মানিত কাজী সাহেব - লম্বা, পাতলা, সাদা দাড়িওয়ালা এক ভদ্রলোক যিনি গ্রামের সব বিয়েশাদিতে কাজীর দায়িত্ব পালন করেন। গাবু এবং গাবুর এক ফুফাতো ভাই রঞ্জনও তাদের সাথে।

শব্দর উঠান থেকে ঘরের দিকে দৃষ্টি ফেলে। তার হৃদয়টা ধক্ ধক্ করছে। জুলফা যে ঘরে অবস্থান করছে, সেই ঘরের কাঠের জানালা খোলা। লাল রঙের কাঠের জানালার পাল্লার ফাঁক দিয়ে সেও তাকিয়ে আছে। জুলফার চোখদুটো আগুনের মতো জ্বলছে। তার দৃষ্টিতে রাগ, অভিমান, ক্ষোভ সব মিলে একাকার। ভ্রূদুটো কুঁচকানো, ঠোঁট শক্ত করে বন্ধ। দুজনের চোখাচোখি হয়। মুহূর্তের জন্য যেন সময় থমকে যায়।

জুলফার তীক্ষ্ণ দৃষ্টি যেন বলছে, 'অসভ্য! জানোয়ার! তুই জানিস না আমি চাই না এই বিয়ে? কেন এলি আমার জীবনটা নষ্ট করতে?'

শব্দরের ঠোঁটে মুচকি হাসি ফুটে ওঠে, তার চোখ যেন জবাব দেয়, 'কিন্তু আমি চাই তোমাকে বিয়ে করতে।'

'তোর বিয়ের কপালে লাথি। তুই একটা বেইমান।'

'কী অপূর্ব দেখাচ্ছে তোমায়।'

'চোখ সরা বেহায়া! নির্লজ্জ! তোর ঘাড় মটকে দেব আমি। এক্ষুনি চলে যা এখান থেকে।'

'এমন মনোহর চোখ কোথায় পেলে জুলফা?'

'চুপ... একদম চুপ! খাবারে বিষ মিশিয়ে মেরে ফেলব তোকে। কর শুধু একবার বিয়ে।'

কাজী সাহেব ঘাড় ঘুরিয়ে দেখেন, বর কনের ঘরের দিকে মুগ্ধ হয়ে একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে। ঠোঁটে মিটিমিটি হাসি, চোখেমুখে অদ্ভুত একটা আলো ঝলমল করছে। কোনো শব্দ নেই, কিন্তু তবুও মনে হচ্ছে, দুজন যেন দৃষ্টির ভেতর দিয়ে অন্তহীন আলাপ চালিয়ে যাচ্ছে।

কাজী সাহেব জোরে কেশে ওঠেন। তখনই জুলফা জানালার পাল্লা জোরে বন্ধ করে দেয়। 'ঠং' করে শব্দ হয়। শব্দর সচকিত হয়ে উঠে, কাজীর দিকে একটু লজ্জিত ভাবে তাকায়। তারপর উঠানের প্যান্ডেলে গিয়ে বসে মাদুরের উপর। তার হাতে একটি চামড়ার স্যুটকেস, যেটা সে রঞ্জনের হাতে তুলে দেয়।

রঞ্জন সেই স্যুটকেস নিয়ে ভেতরে চলে যায়। স্যুটকেসের ভেতরে একটি দামী লাল বেনারসি শাড়ি আর সোনার গহনা। বাকি সবকিছু - চাল, ডাল, তেল, চিনি, মিষ্টি - আগেই পাঠানো হয়েছিল। বিয়ের শাড়িটা শব্দর শহর থেকে নিজে বেছে নিয়ে এসেছে। কাজী সাহেব হাত পা ধুয়ে প্যান্ডেলে বসেন। গাবু পানের বাটা এগিয়ে দেয়। 

ঘরের ভেতরে জুলফাকে বিয়ের শাড়ি পরানোর তোড়জোড় চলছে। তার অবস্থা শোচনীয়। রগে রগে দুর্বলতা, দুই দিন ধরে একদানা খাবারও মুখে তোলেনি। রাগ, অভিমান আর প্রতিবাদের তীব্রতায় নিজেকে অভুক্ত রেখেছে। রাতভর কান্নার কারণে চোখ ফুলে গেছে, গলা বসে এসেছে। মুখের রঙ পাণ্ডুর, ঠোঁট শুকিয়ে কাঠ।

তার মনে একটিই চিন্তা অবিরত ঘুরপাক খাচ্ছে, বিয়েটা আর আটকানো গেল না! এই ভাবনার ভারে বুকটা চাপা পড়ে আসছে।

অসীম দুঃখ, অস্থির রাগ, হতাশা আর শারীরিক দুর্বলতা একসাথে চেপে বসে। হঠাৎই মাথাটা চক্কর দিয়ে ওঠে, চোখের সামনে নেমে আসে ঘন অন্ধকার। টলতে টলতে সে হঠাৎ লুটিয়ে পড়ে বৈশাখির বুকে।

'ও মাগো, জুলফা!' বৈশাখি হাহাকার করে ওঠে। তড়িঘড়ি করে জুলফার মাথাটা নিজের কোলের ওপর তুলে নেয়।

জুঁইয়ের চোখ ভূত দেখার মতো বিস্ফারিত হয়ে যায়। আতঙ্কে কাঁপতে কাঁপতে সে ছুটে গিয়ে পানির গ্লাস নিয়ে আসে। তার হাত এতই থরথর করছে যে অর্ধেক পানি মেঝেতে ছলকে পড়ে।

বৈশাখি তাড়াহুড়ো করে হাতের তালুতে পানি তুলে জুলফার গালে ছিটিয়ে দেয়। 

'জুলফা, ও জুলফা, চোখ খুল বইনে!'

পাশেই জুঁই হাতপাখা নিয়ে জোরে জোরে বাতাস করছে। জুলফার মুখ আরও বেশি পাণ্ডুর হয়ে গেছে, ঠোঁট বিবর্ণ।

আতঙ্কে টগবগ করতে করতে বৈশাখি উঠে গিয়ে দরজার কপাট খুলে বাইরে উঁকি দিয়ে দেখে, মান্নাত ঠিক সামনেই দাঁড়িয়ে ছিলেন, অন্য কাজে ব্যস্ত। বৈশাখির উৎকণ্ঠিত মুখ দেখে তিনি থমকে গেলেন। প্রথমে কিছুই বুঝতে না পেরে ভ্রু কুঁচকালেন। বৈশাখি চোখের ইশারায় তাকে ভেতরে নিয়ে আসে।

ঘরে ঢুকেই জুলফার অবস্থা দেখে মান্নাত যেন মুহূর্তেই পাথর হয়ে গেলেন। চোখের পাতা কেঁপে উঠে, মুখ থেকে সব রঙ উধাও হয়ে যায়। তিনি দৌড়ে এসে মাটিতে বসে কাঁপা হাতে মেয়ের গালে আলতো চাপড় মেরে ডাকেন, 'জুলফা, মাগো, চোখ খোল… একটুখানি চা মা।'

কোনো সাড়া নেই। জুলফার শ্বাস-প্রশ্বাস ক্রমেই দুর্বল হয়ে পড়ছে।

বৈশাখি তাড়াতাড়ি মান্নাতের মুখ চেপে ধরে কাঁপা গলায় ফিসফিস করে বলে, 'কেউ শুইনবে।'

তারপর ইশারায় রঞ্জনকেও ডেকে আনে। রঞ্জন ঘরে ঢুকেই পরিস্থিতি বুঝতে পেরে হতভম্ব হয়ে যায়। কী করবে বুঝে উঠতে পারে না। চারদিকে একটা নীরবতা নেমে আসে, শুধু জুলফার দুর্বল শ্বাস-প্রশ্বাসের আওয়াজ শোনা যায়৷

ঠিক সেই মুহূর্তে উঠান থেকে ভেসে আসে কাজী সাহেবের কণ্ঠস্বর। বরের সম্মতি নেয়া হয়েছে। এখন কনের পালা। যেকোনো সময় কাজী সাহেব ভেতরে এসে তার সম্মতি চাইবেন।

পরিস্থিতি সামাল দিতে তারা তাড়াতাড়ি ঘরের দরজায় একটা সাদা চাদর টেনে দেয় পর্দা হিসেবে। বাইরে থেকে যেন কিছুই বোঝা না যায়।

কাজী সাহেব ধীর পায়ে এসে পর্দার ওপাশে মাদুরের উপর বসে বলেন, 'আস্‌সালামু আলাইকুম। জুলফা খাতুন, আপনি কি শুনতে পাচ্ছেন?'

মান্নাত, রঞ্জন আর বৈশাখি একে অপরের দিকে তাকায় উদ্বিগ্ন চোখে। ভেতরে ভেতরে আতঙ্কে তাদের বুক ধড়ফড় করছে। কয়েক মুহূর্ত আগে তারা শঙ্কিত ছিল জুলফার জীবনের জন্য, কিন্তু এখন ভয় অন্য জায়গায়। যদি শব্দর জানতে পারে যে জুলফা অচেতন, উপোসে আছে, সম্মতি দিতে পারছে না—তাহলে কি সে মত পাল্টাবে? বিয়ে ভেঙে যাবে?

তাহলে তাদের সবকিছু—ঘরবাড়ি, জমিজমা, টাকাপয়সা—ভেস্তে যাবে। এই ভয়ের মাঝেই তারা একটি চক্রান্ত করে।

বৈশাখি জুলফার হয়ে বলে, 'ওলাইকুম সালাম। 

(নোট: শুদ্ধ উচ্চারণ ওয়া আলাইকুমুস সালাম)

কাজী সাহেব তার গলা পরিষ্কার করে বলতে শুরু করেন, 'আপনার নাম জুলফা খাতুন, পিতা পলু মিয়া ও মাতা মান্নাত। আপনার সম্মতিতে পিতা মুজতবা ভূঁইয়া ও মাতা আছিয়ার পুত্র শব্দর ভূঁইয়ার সঙ্গে, ১০,০০০ টাকা মোহর ধার্য করে আপনাকে বিবাহের প্রস্তাব দিচ্ছি। সম্মতি থাকলে বলুন, আলহামদুলিল্লাহ কবুল?'

ভেতরে রঞ্জন চোখের ইশারা করে বৈশাখিকে। মান্নাতও অনুমতি দেয়। বৈশাখি গভীর শ্বাস নিয়ে কণ্ঠস্বর চিকন করে, কাঁপা কাঁপা গলায়, যতটা সম্ভব জুলফার গলার সাথে মিলিয়ে, অত্যন্ত ধীরে ধীরে বলে, 'আল... আলহামদুলিল্লাহ... কবুল।'

কাজী সাহেব সন্তুষ্ট হয়ে বলেন, 'মাশা-আল্লাহ! আবার বলুন।'

দ্বিতীয়বার বৈশাখি আরও কাঁপা গলায় বলে, 'আলহামদুলিল্লাহ... কবুল।'

'আরেকবার বলুন বেটি।'

তৃতীয়বারও বৈশাখি জুলফার হয়ে জবাব দেয়, 'আলহামদুলিল্লাহ... কবুল।'

কাজী সাহেব খুশিতে প্রফুল্লিত হয়ে বলেন, 'আলহামদুলিল্লাহ! বিয়ে সম্পন্ন হলো।'

তিনি হাত তুলে দোয়া করেন, 'রব্বানা আতিনা ফিদ দুনিয়া হাসানাতাঁও ওয়া ফিল আখিরাতি হাসানাতাঁও ওয়াকিনা আজাবান নার। আল্লাহ তায়ালা এই দম্পতিকে সুখী করুন। তাদের সংসারে বরকত দান করুন। সন্তান-সন্ততি দিয়ে ভরে দিন তাদের ঘর। আমীন।'

উপস্থিত সবাই সমস্বরে আমীন বলে। 

কাজী সাহেব বাইরে এসে শব্দরকে জানান, 'আলহামদুলিল্লাহ! কনে কবুল বলেছে। বিয়ে সম্পন্ন হয়েছে।'

শব্দরের মুখে আনন্দের হাসি ফুটে ওঠে, চোখে চিকচিক করে ওঠে জল। জুলফা এখন থেকে তার স্ত্রী! অস্থির উত্তেজনায় সে তাড়াতাড়ি একটি ছোট বাক্স খুলে বের করে দুটি সোনার বালা। সেগুলো তার মায়ের চুড়ি—ভূঁইয়া বাড়ির বধূরা বংশপরম্পরায় পরে আসছে। এই চুড়ি পরানোর মানেই হলো নতুন বধূকে আনুষ্ঠানিকভাবে পরিবারে গ্রহণ করা।

চুড়িগুলো রঞ্জনের হাতে তুলে দিয়ে বলে, 'এগুলো জুলফার হাতে পরিয়ে দাও। এতে আমার মায়ের দোয়া আছে।'

শব্দর জুলফাকে তখনই নিয়ে যেতে চাইলে চাইলে রঞ্জন তড়িঘড়ি করে মাথা নত করে বলে, 'মাফ কইরবেন হুজুর। বইনে কান্নাকাটি করচে। দয়া কইরে একটু সময়..'

শব্দর থমকে দাঁড়ায়, চোখে এক ঝলক দ্বিধা খেলে যায়। তারপর মাথা নেড়ে শান্তভাবে বলে, 'ঠিক আছে। তবে বেশি দেরি যেন না হয়।'

অস্থিরতা সামলাতে সে গাবুকে নিয়ে বাড়ির চারপাশে হাঁটতে শুরু করে।

সূর্য তখন পশ্চিম আকাশে হেলে পড়েছে। ঘরের ভেতরে ধীরে ধীরে জুলফার জ্ঞান ফিরতে শুরু করে। সে চোখ মেলে চারদিকে তাকায়। দৃষ্টি ঝাপসা, মাথাটা ভারি, পুরো শরীর জুড়ে দুর্বলতা। যেন অনেকক্ষণ ঘুম থেকে জেগে উঠেছে, অথচ ঘুম ভাঙেনি পুরোপুরি।

বৈশাখি তৎক্ষণাৎ তার কাছে এসে কপালে হাত বোলায়। জুলফা কষ্টে উঠে বসার চেষ্টা করে। শরীর দুর্বল হলেও জ্ঞান এখন পরিষ্কার। হঠাৎ চোখ পড়ে আয়নায়।

আয়নার ভেতরে যে মুখটা ভেসে ওঠে, প্রথমে তা নিজের বলে চিনতেই পারে না। তাকে বউ সাজানো হয়েছে। গায়ে গাঢ় লাল বেনারসি শাড়ি, গলায় চিকন মুক্তার মালা, স্তরে স্তরে ঝরে পড়ছে বুক পর্যন্ত। আলোর ঝলকানিতে পুরো শরীর ঝলমল করছে। কানে ঝোলানো ভারী সোনার দুল নড়লেই ঝনঝন শব্দ তোলে। মাথায় চাপানো ভারী গাঢ় লাল ওড়না, কিনারা জুড়ে সোনালি জরির কারুকাজ। হাতে সোনার বালা, নাকে নথ। অচেনা সাজের ভারে যেন নিজের অস্তিত্বটাই হারিয়ে ফেলেছে সে।

জুলফা হাত তুলে নিজের মুখে ছোঁয়, এ কি সত্যিই সে?

মান্নাত তখন হাসি-হাসি মুখে এগিয়ে এসে বলেন, 'বিয়ে হইয়ে গেছে মা। আমার জুলফা রানি হইয়ে গেছে।'

জুলফার চোখে অবিশ্বাসের ছায়া।
সাধারণ মানুষের বিয়ে কীভাবে হয়, সে কখনো প্রত্যক্ষ করেনি। তার জগৎ ভিন্ন। বিয়ের সংজ্ঞা তার কাছে কেবল মঞ্চের কৃত্রিমতা। নায়কের গলায় একটি সাধারণ মালা পরিয়ে দেওয়া, দর্শকদের করতালি আর পর্দা পতন।

তাদের বেদে সম্প্রদায়েও বিয়ে সম্পন্ন হয় মালা পরানোর মাধ্যমে। কিন্তু সেখানে থাকে পারস্পরিক সম্মতি, ভালোবাসা.. আনন্দ। তার গলায় তো কোনো মালা নেই! অথচ মা বলছে বিয়ে হয়ে গেছে! এতক্ষণ কী ঘটেছে? সে যতই চেষ্টা করে, ততই যেন স্মৃতির পাতা ঝাপসা হয়ে যায়। মাথার ভেতর অসহনীয় ব্যথা। জুলফা দুই হাত দিয়ে কপাল চেপে ধরে, চোখ বন্ধ করে শ্বাস নেওয়ার চেষ্টা করে।

বাহির থেকে পায়ের শব্দ ভেসে আসে৷ মান্নাত, বৈশাখি দ্রুত ঘোমটা টানে। ঘরে প্রবেশ করে শব্দর। জুলফা তার দিকে তাকায় না, মুখ ফিরিয়ে নেয় অন্যদিকে। শব্দরের হাতে ধরা একটি বিশেষ রূপার মালা। রঞ্জন মালাটি দিয়ে বলেছে, তাদের সম্প্রদায়ে এই মালাটিই হলো বিবাহবন্ধনের চূড়ান্ত ধাপ। বর-কনে সম্মতি দেবার পর এই মালা কনের গলায় পরানো হয়, তারপর থেকে তারা স্বামী-স্ত্রী হিসেবে আলাদা নৌকায় সংসার শুরু করে। যেহেতু জুলফা বেদে সম্প্রদায়ের মেয়ে, তাই এই আচার মানা তার জন্য জরুরি। 

মালাটি ভারি, মোটা রূপার তারে গড়া, চারপাশে কারুকাজ খোদাই করা। মাঝে ঝিকমিক করছে ছোট ছোট রূপার ঘণ্টি, যা নড়লেই মিষ্টি টুংটাং শব্দ তোলে। শব্দর জুলফার মনের শান্তির জন্য, তার সাংস্কৃতিক পরিচয় রক্ষার জন্য এই আচার পালনে সম্মত হয়েছে।

বৈশাখি জুলফার হাত ধরে তাকে দাঁড় করায়। জুলফার পা দুটি কাঁপছে, মনে হচ্ছে যেন মাটি তার পায়ের নিচ থেকে সরে যাচ্ছে।

শব্দর মালাটি হাতে তুলে ধরে। ঘরের সবার দৃষ্টি এখন জুলফার প্রতিক্রিয়ার দিকে নিবদ্ধ। যদি কনে স্বতঃস্ফূর্তভাবে, নিজের ইচ্ছায় মালাটি গলায় পড়তে দেয়, তবে সেটাই হবে তার চূড়ান্ত সম্মতির ঘোষণা। প্রমাণিত হবে যে এই বিবাহ তার মনের আনন্দে, স্বেচ্ছায়। আর যদি সে অস্বীকার করে, মাথা সরিয়ে নেয়, তাহলে স্পষ্ট হয়ে যাবে যে এই বন্ধন তার হৃদয়ের সম্মতি ছাড়াই।

পুরো ব্যাপারটা শব্দর খুব উপভোগ করছে। আগুনচোখি জুলফা কী করবে এবার?

জুলফা কয়েক মুহূর্ত পাথরের মূর্তির মতো নিথর দাঁড়িয়ে থাকে। মাথা এখনও প্রচণ্ড যন্ত্রণায় স্পন্দিত হচ্ছে। বুকের গভীরে চাপা কান্নার একটি পিণ্ড জমে উঠেছে, যা গলা দিয়ে উঠে আসতে চাইছে। চোখে জল জমেছে, কিন্তু পড়ছে না।

তার নীরবতা দীর্ঘ মনে হলেও আসলে কয়েক সেকেন্ডের ব্যাপার। শেষমেশ গভীর নিঃশ্বাস ফেলে, বিরসমুখে, সম্পূর্ণ নিরুপায় হয়ে জুলফা তার মাথা সামান্য ঝুঁকিয়ে দেয়। 

শব্দর ধীরে, যত্ন নিয়ে রূপার মালাটা পরিয়ে দেয় তার গলায়। মালার ছোট ঘণ্টিগুলো টুংটাং শব্দ তোলে। সঙ্গে সঙ্গে বৈশাখি, মান্নাত আর রঞ্জনের মুখে ফুটে ওঠে স্বস্তির হাসি। তাদের বুক থেকে যেন একটা বিরাট পাথর সরে যায়। এতক্ষণের দুশ্চিন্তা, অনিশ্চয়তা সব এক নিমিষে উবে যায়। তারা একে অপরের দিকে তাকিয়ে নির্বাক সম্মতি জানায়। অবশেষে সব ঠিকঠাক হয়েছে।

জুলফার শরীর এই মানসিক ধকল সহ্য করতে পারে না। মালা গলায় পরার সাথে সাথে তার চোখের সামনে আবারও ঘন অন্ধকার নেমে আসে। মাথা ঝিমঝিম করতে থাকে, পা দুটো সুতোর মতো নরম হয়ে যায়। শরীর দুলতে দুলতে সে প্রায় পড়ে যাওয়ার উপক্রম হয়।

শব্দর তৎক্ষণাৎ এগিয়ে এসে তাকে ধরে ফেলে। 

'জুলফা!'

জুলফার আর কিছু বলার কিংবা প্রতিক্রিয়া জানানোর শক্তি অবশিষ্ট নেই। তার চেতনা ধীরে ধীরে লোপ পাচ্ছে। অচেতন দেহটিকে শব্দর অপার মমতায় নিজের কোলে তুলে নেয়। পাঁজাকোলা করে, অত্যন্ত সাবধানে সে দ্রুত বাইরের দিকে এগিয়ে যায়।

তার মনের ভেতর আনন্দ আর পূর্ণতার অনুভূতি লুটোপুটি খাচ্ছে। জুলফা এখন থেকে শুধু তার! সদ্যজাত শিশুকে যেমন মা বুকের সাথে আঁকড়ে ধরে রাখে, তেমনি করে সে জুলফাকে ধরে রেখেছে। এমন ভঙ্গিতে পালকির দিকে ছুটে যাচ্ছে, যেন কোনো মুরগির ছানাকে মায়ের থেকে ছিনিয়ে নিয়ে পালাচ্ছে। বুকের গভীরে একটি অদ্ভুত মিষ্টি অনুভূতি! আজ থেকে তারও একজন নিজের মানুষ হলো, যাকে সে ভালোবাসতে পারবে, যত্ন করতে পারবে! যার জন্য বাড়ি ফেরার তাড়া থাকবে৷ 

জুলফাকে পালকির ভেতরে রেখে শব্দর ঘাড় ঘুরিয়ে পেছনে তাকায়। মান্নাত শাড়ির আঁচল দিয়ে মুখ ঢেকে কাঁদছে। একজন মায়ের মুখে মেয়ে বিদায়ের যে চিরায়ত কষ্ট ফুটে ওঠে, সেই একই বেদনা তার চোখেও। অন্যদিকে রঞ্জন ও বৈশাখি দাঁড়িয়ে আছে হাস্যোজ্জ্বল মুখে, তারা সন্তুষ্ট যে সবকিছু সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হয়েছে।

শব্দর সাদা ঘোড়ায় চেপে বসে। ঘোড়াটি অস্থির পায়ে মাটি খুঁড়ছে, যাত্রা শুরুর জন্য উন্মুখ হয়ে আছে। সে বেহারাদের ইশারা করে হাঁটতে বলে। ধীরে ধীরে রওনা হয় শোভাযাত্রা - গন্তব্য কান্তারপুরের জমিদার বাড়ি।।

পালকির ভেতরে আধা-সচেতন অবস্থায়, ভেজা চোখ আর বিপর্যস্ত মনে চুপচাপ পড়ে থাকে জুলফা।
·
·
·
চলবে……………………………………………………

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

WhatsApp