অতিথিশালায় রাজকীয় আপ্যায়ন করা হচ্ছে ইনান ণেকিতান ও জৈতুন রাজ্যের রাজকন্যা মৃন্ময়ীকে। কত কত খাবারের থালা সাজানো হলো তাদের সামনে, তা হিসেব করে কূল পাওয়া যাবে না। সবটাই হলো রানির আদেশে।
সেই আপ্যায়নের ভেতরেই রানির ডাক পড়লো। হেমলক তাকে ডেকে নিয়ে গেলো নিজস্ব কক্ষে।
রানি নিজের কক্ষে যেতেই দেখলো কক্ষে আগে থেকেই উপস্থিত আছে একজন নারী। ঘোমটায় ঢাকা তার মুখটিও। মুখ ঢাকা হলেও রানির চিনতে বিশেষ বেগ পেতে হলো না। বরং অকপটেই বললেন, “রেবেকা, কখন এসেছো?”
চারপাশ নিরাপদ ভেবেই এবার ঘোমটা তুলল রেবেকা, “এইতো কিছুক্ষণ?”
“বিশেষ কোনো খবর আছে কি?” রানির প্রশ্নে মাথা নাড়ালো রেবেকা। তাকে এ্যাজেলিয়া রাজ্যে রানি পাঠিয়ে ছিলেন সেখানের খোঁজখবর নিতেই। কারণ যদি কোনো ক্রমে সে ধরাও পড়ে তাহলে বেশ সহজেই নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করতে পারবে নিজেকে রানির শত্রু বলে পরিচয় দিয়ে। কারণ তার আগের ঘটনা এ্যাজেলিয়া রাজ্যের প্রত্যেকেরই জানা।
“বিশেষ খবরটি অত্যাধিক বিশেষই, রানি।”
রেবেকার রহস্য করে বলার ভঙ্গিতে ভ্রু কুঞ্চিত করলেন রানি,
“কী সেই বিশেষ সংবাদ শুনি?”
“আপনার সখী যামিনীর আগেপিছে আপনার বিশ্বস্ত সেনাপতি হ্যাব্রোকে বেশ দেখা যাচ্ছে। এবং তাদের দেখে বেশ সুখী মনে হচ্ছে। দু'জনের প্রতি দু'জনের অন্যরকম একটি সম্পর্ক আঁচ করা যাচ্ছে।”
রেবেকার কথা শুনে হেমলক অবাক হয়ে গেলো। তৎক্ষণাৎ তাকালো রানির দিকে। হ্যাব্রোকে সে যতটুকু দেখেছে ততটুকুতে কখনো খুঁত পায়নি। রানির জন্য যেন তার প্রাণ নিবেদন করে রাখতো সদা। সেই হ্যাব্রো কি-না যামিনীর প্রতি কোমল আচরণ করছে? আগ্রহ দেখাচ্ছে? এ-ও কি সম্ভব?
রানির চোখমুখ দেখালো অত্যাধিক শীতল। ঢেউহীন সমুদ্রের মতন শান্ত। তাকে দেখে বুঝার উপায় নেই ভেতর ভেতর ঠিক তিনি কোন ভাবনায় মত্ত।
হেমলক কিছু বলার আগেই রানি রেবেকাকে নির্দেশ করলেন,
“ঠিক আছে। তুমি আবার ফিরে যাও। এবং আরও আরও গভীর ভাবে সব পর্যবেক্ষণ করো। রাজপ্রাসাদে কে আসছে, কে যাচ্ছে তা খেয়াল রাখো। কার সাথে কী কথোপকথন হচ্ছে যামিনীর তা-ও খোঁজ রেখো। আমাকে সব সঠিক তথ্য দিতে হবে।”
রেবেকা মাথা নাড়িয়ে সম্মতি প্রদান করে আবারও কক্ষ ছেড়ে বেরিয়ে গেলো। হেমলক হ্যাব্রোর কথাটি শুনে যতটা তাজ্জব হয়েছে তার চেয়ে বেশি বিস্মিত হয়েছে রানির এই শান্ত হাবভাবে। নিজের কাছের, বিশ্বস্ত সেনাপতির এমন বিশ্বাসঘাতকতার কথা শুনে মোটেও বিচলিত হলেন না রানি? এ-ও সম্ভব!
নিজের ভেতরের উৎকণ্ঠা আর চেপে রাখতে পারল না সে, “হ্যাব্রোর এমন আচরণের কথা শুনে তুমি মোটেও বিচলিত হলে না কেন? ও তো তোমার কাছের ছিলো ভীষণ।”
রানির মুখে একই ভাব বিরাজমান। তিনি কণ্ঠ অধিকতর শীতল রেখে বললেন, “হ্যাব্রো কী করছে তা রেবেকা চোখে দেখেছে। এবং সবসময় চোখের দেখা সঠিক হয় না।”
“যামিনীর বেলাতেও তোমার এমন ভরসা ছিলো না?”
“ভরসা ছিলো কিন্তু হ্যাব্রোর মতন নয়। আমি হ্যব্রোকে এতটুকু চিনেছি, যতটুকু চিনলে আমি জানি হ্যাব্রো বেঁচে থাকাকালীন আমার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করবে না।”
“এতোই যদি বিশ্বাস তবে তুমি তোমার বেঁচে থাকার কথা কেন ওকে অবগত করছো না?”
“সঠিক সময়ের অপেক্ষা করতে হয়, হেমলক পিয়ার্স। সঠিক সময়ের আগে কোনো কিছুই করা সুখকর নয়।”
“তার মানে তুমি বলছো হ্যাব্রোর এই যামিনীর প্রতি আন্তরিকতায় তোমার সাথে বেইমানি হচ্ছে না?”
“না, হচ্ছে না। কারণ আমি জানি হ্যাব্রো কে এবং কী। যামিনী ওকে ভালোবেসে পেতে চেয়েছিলো বহুবার তখনই হ্যাব্রো ওকে নিষ্ঠুরতার সহিত প্রত্যাখ্যান করেছে। এখন যামিনীর স্বার্থোদ্ধত আচরণের পর তো আরও আগে ও যামিনীকে প্রত্যাখ্যান করবে। খুব সম্ভবত হ্যাব্রো নতুন কোনো গুটি চেলেছে যামিনীকে মাত দেওয়ার জন্য। আমাকে আরও বুঝতে হবে। এখনই বিচার করলে চলবে না।”
“তুমি হ্যাব্রোকে বেশিই বিশ্বাস করছো না?” হেমলকের সন্দিহান কণ্ঠে ছোঁড়া প্রশ্নের বিপরীতে হাসলেন রানি, “করছি। কারণ ও সেটার যোগ্য।”
“অথচ আমাকে আজও তুমি সন্দেহের তালিকায় ঠিক রেখে দিয়েছো।”
“সন্দেহের তালিকায় রাখা মানেই কি পুরোপুরি অবিশ্বাস করা? পৃথিবীর নিয়ম অনুসারেই একটা সময় এমন আসে যখন মানুষ নিজের ছায়াকেও বিশ্বাস করতে পারে না। আমার সেই সময়টাই বোধহয় চলছে।”
“হ্যাব্রো কি ছায়ার চেয়েও আপন?”
হেমলকের প্রশ্নে এক পলক রানি তাকালেন ওর মুখের দিকে। ওর স্তব্ধ মুখটির দিকে তাকিয়ে তিনি নিজের কঠোর কণ্ঠটি ফিরিয়ে এনে দম্ভের সঙ্গে বললেন, “তা আপনাকে বলার প্রয়োজন বোধ আর করছি না আমি।”
হেমলক রানির অতীতের মতো করে বলা সেই বাচনভঙ্গি শুনে কিছুটা ব্যথিত হলো। রানির মতন এমন মুখের উপর প্রত্যাখ্যান ছুঁড়ে ফেলতে বোধহয় আর কোনো মানুষ পারবেন না।
—————
রানি অতিথিশালায় পুনরায় প্রবেশ করে দেখলেন সেখানে রাজমাতা প্রাচী, মামাশ্রী ও রাজকন্যা লিলি দাঁড়িয়ে আছে। রাজপ্রাসাদে লিলির বিচরণ সামান্যই দেখা যায় কিংবা দেখা যায় না বললেই চলে। হুট করে ইনান ণেকিতান ও মৃন্ময়ীকে পেয়ে লিলিকে উপস্থিত হতে দেখে রানি কিছুটা সন্দেহপ্রবনও হলেন।
রাজকন্যা মৃন্ময়ীর হাত দু'টো ছিলো রাজমাতার হাতের মুঠোয়। খুব আন্তরিকতার সঙ্গেই ধরে রেখেছিলেন তিনি হাত দু'টো। রানিকে আসতে দেখেই তড়িৎগতিতে সরিয়ে নিলেন নিজের হাত দু'টো। খাস দাসীদের সঠিক ভাবে আপ্যায়ন করার আদেশ দিয়ে নিমিষেই চোখের পলকে বেরিয়ে গেলেন মামাশ্রী আর উনি। রইল কেবল রাজকন্যা লিলি। সে আগ বাড়িয়ে ইনান ণেকিতানের কী প্রয়োজনীয় তা বারংবার জানতে চাইলে। যেই হাতটির অর্ধেকাংশ সে হারিয়েছে তা ঢেকে রেখেছে নিজের পোশাকের অন্তরালে।
মৃন্ময়ী নেহাৎই হাতটি সম্পর্কে অবগত ছিলো না বিধায় স্বাভাবিক স্বরে জিজ্ঞেস করল, “কী হয়েছে তোমার হাতে, রাজকন্যা লিলি?”
লিলির ঠোঁটে তখন ভোরের প্রথম কিরণের মতন হাসি লেপটে ছিলো। ইনান ণেকিতানকে আপ্যায়ন করতে পেরে তার ভিতরের স্বতস্ফুর্ত ভাবটি ফুটে উঠেছিলো। কিন্তু মৃন্ময়ীর প্রশ্নে সেই হাসি উবে গেলো তৎক্ষণাৎ। মুখ কালো করে ফেলল সে। এবার ইনান ণেকিতানেরও দৃষ্টি গেলো আড়ালে, পোশাকের ভেতর গুটিয়ে রাখা হাতটিতে। সে-ও বেশ আগ্রহ নিয়ে শুধালো,
“তাই তো! তোমার হাতটি লুকিয়ে রেখেছো কেন, রাজকন্যা লিলি?”
লিলি আশেপাশে চোখ ঘুরাতে লাগলো। প্রসঙ্গ পাল্টানোর ভাবনা এলো তার মাথায়। কিন্তু বাকি দু'জন ব্যক্তি এতটাই আগ্রহ নিয়ে জেঁকে বসেছে যে সে অপারগ হয়ে যায়। বয়সের পরিপক্বতার অভাবে সে ছিল করতে সক্ষম হলো না। শেষ হাতটিকে আরও গভীর ভাবে ঢাকতে ঢাকতে শক্ত কণ্ঠে উত্তর দিলো, “হাতটি নেই।”
মৃন্ময়ী দাঁড়িয়ে থাকলেও বসা ছিলো ণেকিতান। লিলির বলা কথা ঠিক বুঝতে না পেরে এক মুহূর্তেই দাঁড়িয়ে পড়ল সে। ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে বলল, “কী বলছো! হাত থাকবে না কেন?”
রানি কামিনী চুপ করে পর্যবেক্ষণ করছিলেন লিলিকে। লিলির চোখের শুভ্র ভাব মুহূর্তেই হারিয়ে গেলো। সাদা অংশটুকু ধারণ করলো লাল বর্ণে। ঘৃণা আর ক্রোধে ফেটে পড়ে বলল,
“থাকবে না কারণ আমার রাজপ্রাসাদ বয়ে এসে রানি কামিনীকাঞ্চন আমার হাতটি কেটে ফেলে দিয়েছেন। ঐ উগ্র, হিং স্র, পাষণ্ড রানি আমার সাথে এই ঘৃণিত অন্যায়টা করেছেন।”
ণেকিতান মুখ হা হয়ে গেলো কথাগুলো শুনে। তার বড়ো বড়ো হয়ে যাওয়া চোখের মণিগুলো ঘুরেফিরে গিয়ে ঘোমটা আঁটা রানির দিকে নিবদ্ধ হলো। গোলকধাঁধায় চারপাশটা ভ্রমের এক খন্ড পৃথিবী মনে হলো। যেই রাজপ্রধানের রাজকন্যার হাত অব্দি কেটে ফেলেছেন রানি, সেই রাজপ্রাসাদেই কি-না আবার এমন করে আসন তৈরি করে নিয়েছেন? এ-ও কি সম্ভব?
মৃন্ময়ী কৌতূহল দমলো না। বরং আরও বেড়ে গেলো, “রানি কামিনীকাঞ্চন? তার কথা শুনেছিলাম বহু আগে। তিনি তোমার সাথে এটা করেছেন? তা-ও তোমাদের রাজ্যে প্রবেশ করে! তার দুঃসাহসিকতা কথা শুনেছিলাম আগে আজ আবারও নিজের চোখে পরখ করে বিস্মিত হচ্ছি!”
“ওর দুঃসাহসিকতায় ওর ধ্বংস এনেছে। দেখো, আজ ওর কোনো নামনিশানা নেই। কোথাও নেই সে। ধ্বংস হয়ে গিয়েছে। একেবারে ধ্বংস।”
ক্রোধের অগ্নি জ্বলতে লাগলো লিলির চক্ষু যুগলে। ঠোঁটে তাচ্ছিল্যের হাসি।
তা দেখে রানি ভেতর ভেতর না হেসে পারলেন না। মেয়েটার এমন অজ্ঞতা দেখলে কেই-বা না হাসবে?
ণেকিতানের নাকেমুখে উঠল। কাঁশতে লাগলো সে অনবরত। এই তীব্র কথার ধাক্কা তার মস্তিষ্কের বোধ হয় সহ্য হলো না।
রানি দাসীর থেকে নিয়ে জলের পাত্র এগিয়ে দিলেন ণেকিতানের দিকে। ণেকিতানের হাত কাঁপছে অনবরত। রানিকে যে তার ভয় লাগছে ভেতর ভেতর তা অঙ্গভঙ্গিতেই প্রকাশ পাচ্ছে।
লিলি ণেকিতানের এই ভ্যাবাচ্যাকা অবস্থা দেখে রাগে-দুঃখে বেরিয়ে গেলো সেখান থেকে। কক্ষ জুড়ে কিছু দাসী, প্রহরি আর উনারা তিনজন উপস্থিত রইলেন।
ণেকিতানের চোখ-মুখে ভয় থাকলেও তার দ্বিগুণ আগ্রহ দেখা দিলো মৃন্ময়ীর মুখে। সে ণেকিতানের দিকে অগ্রসর হয়ে আবদার করল, “যে করেই হোক আমাকে রানি কামিনীকাঞ্চনের সঙ্গে সাক্ষাৎ করিয়ে দিবে। তার পরিবর্তে তোমার যা প্রয়োজন তা-ই আমি দেবো। তা-ও আমাকে সাক্ষাৎ করাবে।”
ণেকিতান জোরে জোরে শ্বাস ফেলে নিজেকে সামলাতে সামলাতে বলল, “বেশি কৌতূহল ভালো নয়, মৃন্ময়ী। রানি কামিনীকে দেখলে তুমি সহ্য করতে পারবে না বোধহয়।”
“অবশ্যই পারবো। অমন দুঃসাহসিক নারীকে না দেখতে পেলে আমার আফসোস থেকে যাবে।”
ণেকিতান তপ্ত শ্বাস ফেলল মৃন্ময়ীর কথায়। মনে মনে রানির ঘোমটা দেওয়া মুখটির দিকে তাকিয়ে বলল, “দেখতে পারলে আরও বেশি আফসোস করবে হয়তো!”
—————
রাজ্যে যে নতুন বৈদ্যটিকে নিয়োগ দেওয়া হলো সে তরুণ। অত্যন্ত ধুরন্ধর ও সৎ। লোহার শিকের সমাধান রানি ন্যস্ত করে ছিলেন তারই উপর।
এবং লোহার শিকের সর্বশেষ ফলাফল নিয়ে সেই রাজ বৈদ্য উপস্থিত হলেন।
·
·
·
চলবে……………………………………………………