ভোরের আভা ছড়িয়ে গিয়েছে সমগ্র ধরণীতলে। কিচিরমিচির পাখির ডাক ভেসে ভেসে আসছে। ভোরটি সুমধুর হতে পারতো। কিন্তু হলো থমথমে, কৌতূহলোদ্দীপক। রাজপ্রাসাদের ছোটো ঘটনাটি ছড়িয়ে গিয়েছে যেন বাতাসের বেগে। মাইলের পর মাইল হেঁটে প্রজারা এসে উপস্থিত হচ্ছে রাজপ্রাসাদের সামনে। সেখানেই অবশ্য বাঁধা আছে সেই তিনজন অপরাধীকে। যারা রানির গায়ে স্পর্শ করার মতন নোংরা অপরাধের সাথ দিয়েছে। তবে ওদের শাস্তি হওয়ার আগেই ঘটনা ব্যতিক্রম ঘটল। প্রজাদের উপচে পড়া ভিড় থেকে একজন বলে উঠল,
“শেষমেশ কিনা রানির চরিত্র হরণ হয়েছে? এই রাজ্যের মাটি অপবিত্র হচ্ছে আপনার পদ স্পর্শে।”
তার সাথে তাল মিলিয়ে ‘হ্যাঁ হ্যাঁ’ করে উঠল উপচে পড়া মানব ভিড়।
হেমলক সেই সমস্বরে উচ্চারিত ধ্বনি শুনে তীব্র ক্ষোভে ফেটে পড়ল। শান্তশিষ্ট, মোলায়েম হেমলক কণ্ঠস্বরে তীব্র হুংকার ভেসে এলো,
“খবরদার! এসব কথা কেউ উচ্চারণও করবেন না। রানির সাথে এমনকিছুই হয়নি।”
হেমলকের হুংকারের হয়তো থেমে যেতো সকলেই কিন্তু তা হতে দিলো না মামাশ্রী। ঠোঁটে অবুঝপনা হাসি রেখে সে বলল,
“পুত্র, লোককে কি আর মিথ্যে বলা যায়? সবাই তো আর অবুঝ শিশুটি নয়।”
মামাশ্রীর উৎসাহে প্রজাদের ধিক্কার আর থামল না বরং বাড়লো। দ্বিগুণ গতিতে।
রানি এতক্ষণ সবটাই নীরবে পরখ করছিলেন। তার হয়ে একাই হেমলক যেন লড়ছিলো। এছাড়া প্রত্যেকটি মানুষ নীরব ছিলো। হয়তো সবার একই অভিমত! কলঙ্ক লাগবে কেবল নারীর গায়ে।
অবশেষে রানি সামনে এগিয়ে এলেন। নির্ভয়ে, নিশ্চিন্তে প্রজাদের দিকে তাকিয়ে বললেন,
“আমার চরিত্রহনন হয়েছে তা আপনারা নিশ্চিত, তাই তো?”
রানি প্রশ্ন করলেও উত্তর এলো না কারো। ওরা যে কখনো, কোনো, চরিত্রহারা নারীকে এমন উদ্যম নিয়ে কথা বলতে দেখেনি! তাই দ্বিধান্বিত হলো। আমতা-আমতা করল। একে অন্যের দিকে চাওয়াচাওয়ি করছে।
রানি আবারও, একই রকম ভঙ্গিতে বললেন, “কী হলো? কিছু বলছেন না যে? আপনারা নিশ্চিত তো আমার চরিত্রহনন হয়েছে?”
নীরব থেকে লাভ নেই ভেবেই উপস্থিত একজন বলল, “শুনেছি তো।”
“শুনেছেন? দেখেননি? শোনা কথাতেই এত বিশ্বাস আপনাদের? এখন আমি যদি বলি, আমি শুনেছি আপনি রাজ্যের বাড়িতে বাড়িতে লুট করেছে তাই আপনাকে কঠোর শাস্তি দেওয়া হবে তাহলে সেটাও কি আপনি মেনে নেবেন?”
ভ্যাবাচেকা খেলো সেই ব্যক্তি এবার। তড়িৎগতিতে বলল, “না। কখনোই না। এমনটা আমি কখনো করিনি।”
“আমি আপনার কথা বিশ্বাস করবো কেন? আমি তো শোনা কথায় বিশ্বাস করব। আপনারাই তো তা শিখিয়েছেন।”
রানির যুক্ততর্কে বড়ো বড়ো রাজা, মন্ত্রী হেরেছে বহুবার, এ-তো সামান্য প্রজা! সে হারবে না? রানির যুক্তিতে তার চোয়াল প্রায় ঝুলে গেলো অথচ রানি মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে রইলেন বীরকন্যার মতন। তাকে ভাঙার সাধ্যি প্রকৃতি বোধহয় কাউকেই দেয়নি।
“কী হলো আমার রাজ্যের প্রাজারা, আপনারা চুপ কেন? কথা বলুন। আমিও শুনি এই রাজ্যের মাটিতে দাঁড়িয়ে আমি ঠিক কতটা অপবিত্রতা ছড়াচ্ছি। বলুন কথা।” শেষেরটুকু রানি বললেন এক প্রকার উচ্চস্বরে। এত তীক্ষ্ণ স্বর যে মাথা নামাতে বাধ্য হলো সকলে। রানির ঐ জ্বলন্ত দেহের দিকে আর কারো তাকিয়ে থাকার সাহস হলো না। দোষারোপ করার শক্তি হলো না।
রানি নিজের শ্বাস-প্রশ্বাস নিয়ন্ত্রণ করলেন। নিজের তলোয়ারটি তুলে নিলেন দাসীর হাত থেকে। একবার সকলের দিকে তাকিয়ে, ধারালো ভঙ্গিমায় বললেন,
“আমি যদি ধরিও আমার চরিত্রহনন হয়েছে তবুও আমাকে অপবিত্র বলার অধিকার কারো নেই। কেবল আমি নই, যে-কোনো মেয়েকে অপবিত্র বলার অধিকার স্রষ্টা কাউকে দেননি। সৃষ্টির আদি থেকে নারীদের অগ্নিপরীক্ষা নিয়ে এসে এসে আপনাদের রক্তে এটাই মিশে গিয়েছে যে চরিত্র কেবল নারীরই আছে। এবং যখন-তখন সেই চরিত্রে একটি প্রশ্ন ঝুলিয়ে তাকে কলঙ্কের কালিতে একদম মাটির সাথে মিশিয়ে দেওয়া যায়। কিন্তু আমি আপনাদের সেই ধারণাটিকে আজ ভুল প্রমাণিত করছি। এই তো দেখুন, আপনাদের সামনে আমি দাঁড়িয়ে আছি। দেখি মাখুন কালি, লাগান কলঙ্ক। আমি দেখব কতটুকু লাগাতে পারেন। কী করতে পারেন আমার। আমার দাঁড়ানোতে যদি মাটি অপবিত্র হয়ে থাকবে তবে তা-ই হোক। তবুও আমি দেখবো কী করতে পারেন আপনারা। তবে, আপনারা আমার কী করতে পারবেন আমি জানি না কিন্তু আজ আমি কী করতে পারি তা আপনারা জানবেন।” এতটুকু বলেই রানি এগিয়ে হেলো সেই অজ্ঞাত পুরুষটির দিকে যে প্রবেশ করেছিলো রানির কক্ষে।
এগিয়ে গিয়ে আচমকা এত প্রকাণ্ড আঘাত করলো তলোয়ারের যে সেই পুরুষটি হাত দেহ থেকে ছিটকে পড়ল। গলগল করে ঝর্ণার জলের মতন গড়িয়ে পড়তে লাগল র ক্ত। কিছু তো ছিটকেও গেলো। লাগলো রানির শরীরেও।
এই ভয়ঙ্কর দৃশ্যে চিৎকার করে উঠল প্রায় সকলে। লিলি তো সবচেয়ে বেশি। কারণ এই তলোয়ারের ভঙ্গি, আঘাতের ভঙ্গি তার চেনা। বহুচেনা।
সে কাঁপতে লাগলো। রাজমাতার হাত নিজের বা'হাতটি দিয়ে ধরে কাঁপতে কাঁপতে অস্ফুটস্বরে বলল, “উনি, উনি অন্যকেউ। উনি, উনি…” ওর মুখ দিয়ে বাক্য এলো না। রাজমাতা তখন ভয়ে তটস্থ। মেয়ের কথা কানে ঠিকঠাক বোধহয় পৌঁছালোও না।
অজ্ঞাত ব্যক্তিটি অনবরত চিৎকার করতেই থাকলো। নিজে কা টা হাতটির দিকে তাকাতেই তার কলিজা মোচড় দিয়ে এলো।
“আমি কিছু করিনি। আমাকে বলা হয়েছিলো। আমি করিনি।”
প্রজারা পিছিয়ে গেলো কয়েক কদম। ভোরে তীব্র বাতাসে উড়তে লাগলো চারপাশের সব। তান্ডবলীলা যেন। হেমলক দাঁড়িয়ে রইল ঠিক পাশটায়। সরলো না, নড়লোও না এক ফোঁটা। কেবল শক্ত ভাবে দাঁড়িয়ে রইল।
রানি হাসলেন, “বলা হয়েছিল তা আমি বেশ জানি। কিন্তু বলা হয়েছিলো বলেই আমার কক্ষে প্রবেশ করে আমাকে ছোঁয়ার আস্পর্ধা করার অপরাধ করেছিস তুই। যেই হাত আমাকে ছুঁয়েছে আমার অনুমতি ব্যতীত, সে হাত যে থাকবে না।” কথা শেষ করেই রানি আরেকটি হাতও ঠিক একই ভঙ্গিতে কে টে ফেললেন। যেন কিছুই না তার কাছে এইসব।
প্রজারা আঁতকে জড়োসড়ো হয়ে গেলো।
রানি এবার দুই দেহ রক্ষীর দিকে গেলেন। ওরা ইতিমধ্যে ভয়ে প্রায় আধমরা হয়ে গিয়েছে। রানিকে নিজেদের দিকে আসতে দেখেই আকুতি মিনতি করতে লাগলো অনবরত,
“আমরা কিছু করিনি, রানি। মামাশ্রী আমাদের বলতে বলায় আমরা তা বলেছিলাম।”
মামাশ্রীর নাম আসতে সকলে যেন চূড়ান্ত অবাক হলো। হেমলক তো সঙ্গে সঙ্গে মাথা ঘুরিয়ে তাকালো অব্দি। মামাশ্রী রীতিমতো তখন ভয়ে কাঁপছেন। কাঁপতে কাঁপতেই নিজেকে বাঁচানোর আপ্রাণ চেষ্টা করতেই বলল,
“সমস্ত মিথ্যে। আমি এসব কিছুই অবগত নই।”
রানি সে সমস্ত কথাতে কান দিলেন না। বরং মন্ত্রীকে বললেন,
“কসাইকে খবর দাও। সকলের সামনে, এই মুহূর্তে দুই দেহরক্ষীর জি ভ আলাদা করতে বলো। এখুনি। আমার নামে বলা মিথ্যের শাস্তি এটা।”
প্রজারা যারা দুর্বল তাদের ভেতর কয়েকজন তো মাথা ঘুরিয়েই পড়ে গেলো। কেউ ছুটল বাড়ির পানে। মানুষ অবশ্য কমার বদলে বাড়তেই লাগলো। আলোও ফুটতে লাগলো। তবে বাতাস যেন বাড়লো দশগুণ। রানির মনের ভেতর হওয়া ভয়ঙ্কর প্রলয়ের সাক্ষ্য দিচ্ছে যেন পরিবেশ।
যথারীতি কসাই এলো। এবং অমানবিক ভাবেই কা টা হলো দেহরক্ষীদের জিভ। হড়বড়িয়ে বমি করে দিলো রাজকন্যা লিলি। রানি কাটা জিভ দু'টো আর হাত দু'টো নিজের পায়ের সামনে রাখলেন। সমস্ত প্রজাদের দিকে তাকিয়ে সরিয়ে দিলেন নিজের মুখের ঘোমটা। ধূলো উড়া বাতাসে, শুকনো পাতার মড়মড় শব্দের মাঝে রানির তীব্র, তেজস্বিনী, ভুবনমোহিনী মুখটি বজ্রপাতের মতন আকাশ ভেঙে যেন পড়ল সকলের চোখের সামনে।
রাজমাতা হতে শুরু করে ইথুন সকলেই কেঁপে উঠলো। হাঁটু ভেঙে বসে পড়ল মামাশ্রী।
রানির সূঁচালো দৃষ্টি বিঁধলো সকলের অন্তরে। তিনি তীব্র স্বরে চিৎকার করে সকলের উদ্দেশ্যে বললেন,
“আমি, রানি কামিনীকাঞ্চন। এ্যাজেলিয়া রাজ্যের রানি আমি। আমাকে আপনারা ভুলেননি আমি জানি। আপনাদের রাজাকে আপনাদের সামনে হারিয়ে আমিই জয় ছিনিয়ে নিয়ে গিয়েছিলাম। আমি সেই রানি। যার কথা শুনলে শত্রুপক্ষ কাঁপে। আমি সেই রানি, যাকে চরিত্রের ভয় কিংবা মৃত্যুর ভয়েও দমানো যায় না। আমি সেই রানি, যার কথা স্মরণ করলে নিদ্রা ছুটে যায় শত্রুর। আমাকে, এই আমাকে চরিত্র নষ্ট করার মতন অপবাদ দেওয়ার ভুল করেছেন এই মামাশ্রী, এই দেহরক্ষীরা। আজ আমি সমস্ত বিশ্বের কাছে উদাহরণ রেখে যাবো, নারীকে দমাতে নারীর চরিত্রের উপর হাত দিলে কী হয়।”
এতটুকু বলে থামলেন রানি। পরক্ষণেই মন্ত্রী ত্রিপাদ কুমারের দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করে নির্দেশ করলেন,
“মন্ত্রীমশাই, আশেপাশে যত যত নারী, কন্যা আছে সকলকে এই সূর্য মাথার উপর আসার আগে এখানে উপস্থিত করো। এই মামাশ্রীর শাস্তি কেবল আমি নই রাজ্যের সকল নারী দেবে। যেন মামাশ্রীর সাথে সাথে রাজ্যের প্রত্যেকটা পুরুষ এরপর নারী দেখলে চোখ নামায়। কলঙ্ক দেওয়ার আগে একটিবার ভাবে, এই রাজ্যের রানি কে। এই রাজ্যের ঘরে ঘরে একজন করে কামিনীকাঞ্চন রয়েছে। যাও শীঘ্রই। আজ এই মামাশ্রীকে বৃক্ষের সর্বোচ্চ ডালে উলঙ্গ করে ঝুলিয়ে পাথর নিক্ষেপ করা হবে। জনসম্মুখে। যতক্ষণ না উনার শরীর থেতলে যায় ততক্ষণ। এমনকি তোমার কন্যাকেও এখানে উপস্থিত করাবে। আশেপাশের সমস্ত নারী মানে সমস্ত নারী। মামাশ্রীর পত্নীও যেন বাদ না যায়।"
চিৎকার করে উঠলেন রাজমাতা। রানির পায়ের কাছে এসে লুটিয়ে পড়লেন। মামাশ্রী ততক্ষণে বন্দী হয়ে গিয়েছে। হেমলক তাকিয়ে তাকিয়ে কেবল দেখল রানি কামিনীকাঞ্চনকে। আজ যেন সেই রানি ভিন্ন রূপ ধারণ করেছে। প্রলয়ঙ্কারী দেবী হয়ে উঠেছে। গোটা পৃথিবী মূর্ছা যাবে যেই দেবীর পদতলে। নারীর চরিত্র কতটা নারীর প্রিয় হলে এমন হতে পারে? কতটা প্রিয়?
·
·
·
চলবে……………………………………………………