বাম পায়ে মস্ত এক প্লাস্টার নিয়ে বিরসমুখে বই পড়ার চেষ্টা করছে মৌনি। বইয়ের নাম, ‘দৃষ্টিপাত’। বছরখানেক আগে, এক শীতের বিকেলে লেখালেখির ব্যাপারে জানতে পেরে তাকে ছাদে ডেকে পাঠালেন বড় চাচা। দাদাজানের ত্রি-তল নিবাসে মানুষের সঙ্গে সঙ্গে আমোদ নিয়ে হুমড়ি খায় কবুতরের দল। বাড়ি থাকলে রোজ বিকেলে চেয়ার পেতে বসে সেই সকল কবুতরের নৃত্য উপভোগ করেন বড় চাচা। বাড়ির ছেলেমেয়েদের এই সময় ছাদে যাওয়া নিষেধ। মৌনি চাচার তলব পেয়ে ছাদে উঠে আসতেই মুখ গম্ভীর করে তাকালেন তিনি। সিগারেটটা অতি সন্তপর্ণে নিভিয়ে ফেলে জিজ্ঞাসা করলেন,
‘ তুই নাকি লিখিস?’
মৌনি মাথা নাড়ল। বড় চাচা জিজ্ঞেস করলেন,
‘ কী লিখিস?’
‘ গল্প, উপন্যাস, রম্য।’
‘ পড়াশোনা করে লিখিস নাকি এমনিই?’
মৌনি একটু ইতস্তত করে বলল,
‘ পড়াশোনা করে লিখি।’
‘ কয়টা বই পড়েছিস?’
এবার খুব বিপদে পড়ল মৌনি। ওমন গণনা করে বই পড়ার অভ্যাস তার নেই। যা সামনে পায় পড়ে, তারপর ভুলে যায়। বড় চাচার মতোন তুখোড় বই পড়ুয়ার কাছে তার বলা যেকোনো সংখ্যাই অত্যন্ত তুচ্ছ বলে মনে হবে। মৌনি একটু ইতস্তত করে বলল,
‘ এইতো হাজার খানেক।’
বড় চাচার মুখ আরও গম্ভীর হলো। ভ্রু কুঁচকে বললেন,
‘ দৃষ্টিপাত পড়েছিস? যাযাবরের লেখা।’
মৌনি হাপড়ে পড়ে মাথা নাড়ল। যাযাবরের নামই সে শুনেনি কোনোকালে। বড় চাচা হতাশ হলেন৷ অত্যন্ত তাচ্ছিল্যের গলায় বললেন,
‘ দৃষ্টিপাত পড়িসনি। তাহলে পড়েছিসটা কী?’
মৌনি জবাব দিলো না। লজ্জায় তার ভেতরটা টলমল করছে। বড় চাচা তাকে চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে হাতের ইশারায় চলে যেতে বললেন। মৌনির এতো মন খারাপ হলো! এক মুহূর্তের জন্য মনে হলো, ওই একটি বই পড়েনি বলে বৃথা তার মানব জন্ম। দৃষ্টিপাতের মতো বই না পড়েই সে কিনা কয়েকটা উপন্যাস লিখে বসে আছে! দেশের নামি-দামি একটা পত্রিকা তার সেই ছাইপাঁশ লেখা হাতে পেয়েই আবার ফট ফট করে ছেপে ফেলেছে। মৌনি বিতৃষ্ণা বোধ করল। এমন একটা সমৃদ্ধ পত্রিকায় এই রকম কান্ডজ্ঞানহীন সম্পাদক থাকলে সাহিত্যের উন্নতি হবে কী করে? বাংলা সাহিত্যের আসন্ন সংকট আর নিজের নিম্নমানের লেখা উভয় নিয়েই দুশ্চিন্তায় ঘুম উড়ে গেল তার। শাওনের সঙ্গে তখন মৌনির ভরপুর যোগাযোগ। তার অস্থির মস্তিষ্কের একমাত্র পাঠক শাওন বিস্তারিত শুনে বলল,
‘ তুমি অযথা অস্থির হচ্ছ। পৃথিবীতে কত মিলিয়ন বই আছে তুমি জানো? সব বই কি কারো পক্ষে পড়া সম্ভব? তুমি যেমন এই বইটি পড়োনি, তেমন অনেক বই আছে যা তোমার বড় চাচা পড়েননি। অথচ তুমি পড়ে বসে আছো।’
প্রবল অস্থিরতায় বুদ্ধিভ্রষ্ট মৌনি ঘরময় পায়চারি করতে করতে ধমকের গলায় বলল,
‘ একদম জ্ঞানের কথা বলবে না, শাওন। পৃথিবীতে মিলিয়ন মিলিয়ন বই থাকলেই কী? বাংলা সাহিত্যে তো আর মিলিয়ন মিলিয়ন বই নেই। আমি বাঙালি, বই পড়তে ভালোবাসি অথচ বাংলা সাহিত্যের প্রথম সারির বইগুলো পড়ব না? শুধু যে পড়িনি তাও তো নয়। আমি কিনা সেই লেখকের নামটাও জানি না! তুমি বুঝতে পারছ আমার মূর্খতা?’
এই পর্যায়ে হো হো করে হেসে ফেলল শাওন। এই ছেলের সম্ভবত তার ধমক শুনতে ভালো লাগে। মৌনি তার ভালো লাগাকে প্রশ্রয় দিল। রাগে অন্ধ হয়ে ফের একবার ধমক দিলো। এই শাওনের ঠেলাঠেলিতেই একদিন আঁকার সারঞ্জাম পাশে রেখে লিখতে বসেছিল মৌনি। মৌনির গল্পমুগ্ধ শাওনের চিরজীবনের ধারণা সে চাইলেই দারুণ কিছু লিখে ফেলতে পারে। কোনো এক বই নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে একদিন শাওনই খুব জোর দিয়ে বলল,
‘ তুমিই একটা গল্প লিখে ফেলো না। ধরো, তোমার আমার প্রেম হলো সেই গল্প।’
মৌনি কঠিন গলায় বলল,
‘ বাজে কথা। আমাদের কখনও প্রেম হবে না।’
‘ তাহলে আমাদের যে প্রেম হবে না সেই গল্পই লিখো। একটা ছেলে প্রতিমাসে প্রেমের কথা বলে থাপ্পড় খাচ্ছে। তারপরও আকুল হয়ে প্রেম করতে চাইছে, সেটা লেখো।’
শাওনের কথায় মজা পেয়ে সত্যি সত্যি একটা গল্প লিখে ফেলল মৌনি। তবে প্রেমের নয়, ভালোবাসা না-ভালোবাসার মধ্যকার মানসিক দ্বন্দ্বের গল্প। তারপর থেকে টুকটাক লিখতে লিখতে একদিন পত্রিকায় ছেপে গেল তার নাম।
শাওন মৌনির ধমক পরোয়া না করে বলল,
‘ মানুষ ধীরে ধীরেই শিখে, মন। তোমার বয়স মাত্র একুশ। একুশ বছরেই তো তুমি পৃথিবীর সমস্ত বই পড়ে ফেলতে পারবে না। সবকিছু একবারে জেনে ফেলতে পারবে না। তুমি লিখবে তোমার অভিজ্ঞতা থেকে। লিখতে পারা একটা বিশেষ ক্ষমতা। বই পড়ার সাথে লিখতে পারার কোনো সম্পর্ক নেই। তুমি প্লিজ তোমার লেখালেখির ক্যারিয়ারে ফোকাস করো। এখন তোমার লেখার চাহিদা আছে। তোমার উচিত একটা বই লেখার চেষ্টা করা।’
মৌনি শাওনের কথাকে হাওয়ায় উড়িয়ে দিয়ে বলল,
‘ পাগল তুমি! বই আর আমি? বই লেখা খুব দায়িত্বের ব্যাপার। আমি এখানে দৃষ্টিপাত না পড়ে দু-তিনটে উপন্যাস লিখে ফেলেছি এই আফসোসে মারা যাচ্ছি। আর তুমি বলছ কিনা বইয়ের কথা! পাগলের প্রলাপ।’
শাওন শান্ত গলায় বলল,
‘ তোমার সবচাইতে বড় সমস্যা কী জানো মৌনি? তুমি সমালোচনাকে খুব বেশি গুরুত্ব দাও। সমালোচনা গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু তুমি সবসময়ই সমালোচনাকে অকাট্য সত্য আর প্রশংসাকে মিথ্যা বলে মনে করো। মনের অজান্তেই সমালোচককে বসিয়ে ফেলো বিরাট জ্ঞানীর আসনে আর প্রশংসাকারীকে মূর্খ।’
মৌনি মৃদু প্রতিবাদ করে বলল,
‘ তুমি ভুল বলছ শাওন। প্রশংসাকারীকে আমি একদমই মূর্খ বলছি না। কিন্তু পাঠক হিসেবে আমি এতোটুকু বুঝি, আমার লেখা কোনো লেখা নয়। এই লেখায় সাহিত্য হয় না।’
শাওন তদ্রূপ শান্ত গলায় বলল,
‘ আচ্ছা, ধরে নিলাম তোমার লেখা কোনো লেখা হলো না। কিন্তু জীবন নিয়ে তোমার যে আলাদা একটা চিন্তা আছে, সেটা তো সত্য? সেই চিন্তাটা তুমি যত প্রকাশ করবে, যত মানুষের কাছে পৌঁছাবে, সমালোচিত হবে ততই তুমি বুঝতে পারবে তোমার ভাবনা কতটা সঠিক। কোথায় তোমার ভুল। কী করে সে ভুল শুধরে ফেলা যায়। সবার সাহিত্যিক ভাষা যে একই রকম হতে হবে, এমন তো কোনো কথা নেই। তোমার মধ্যে একটা প্রতিভা আছে। সবাই জীবন লিখতে পারে না, তুমি পারো। তুমি প্লিজ তোমার এই মেধাটাকে এভাবে অবহেলা করো না। আই রিকুয়েস্ট ইউ মন। প্লিজ!’
শাওন! শাওন! শাওন!
মাঝে মাঝে শাওনের কথা ভাবে মৌনি। মানুষের মন যে পৃথিবীর সবচাইতে বড় রহস্যপিন্ড সে কথা সে বুঝতে পারে শাওনকে ভাবতে বসলে। শিশুকাল থেকে এই ভরা তারুণ্য পর্যন্ত যে ছেলেটিকে সে দেখে এসেছে আশ্চর্য শান্ত এক মূর্তির মতো। বিশ্বস্ততা আর বন্ধুত্বের আলোয় জ্বলজ্বলে নক্ষত্রের মতোন। সেই ছেলেটি হঠাৎ একদিন অচেনা হয়ে গেল। এই চেনা আর অচেনা শাওনকে একসঙ্গে মেলাতে পারে না মৌনি। ভেবে পায় না, কেন? এই সমস্ত কিছুতে কী লাভ হলো শাওনের? কী চেয়েছিল সে মৌনির থেকে? সচেতন মস্তিষ্ক যে উত্তর দেয় তা মিলে না শাওনের ওই চোখদুটোর কথা মনে পড়ে। তার ওই চোখে কোনোদিন পাপ দেখেনি মৌনি। ওমন স্বচ্ছ, নির্দোষ চোখে আর কেউ কভু তাকায়নি তার দিকে। লোকে বলে, চোখ মনের কথা কয়। তাহলে শাওনের চোখ আর মনের সমীকরণ আলাদা কী করে?
দীর্ঘ একটা শ্বাস ফেলে খোলা জানালার দিকে তাকিয়ে রইল মৌনি। ঘরের বাইরে অতন্দ্র প্রহরীর মতো থমকে আছে রুক্ষ দুপুর। দরজায় পরপর দু'বার করাঘাত পড়েছে। সম্ভবত কেউ এসেছে। অসুস্থ হলেই ছুটাছুটি করে দেখতে আসার মতো অতিথি মৌনির নেই। অতিথি নামক বস্তুটিকে মৌনির বিশেষ পছন্দও না। অতিথি এলে তার সঙ্গে আসে আরও একটি শব্দ, আপ্যায়ন। মৌনি এই মুহূর্তে দারিদ্র্যসীমার একেবারে শেষ ধাপে পা ভেঙে বসে আছে। অতিথিকে আপ্যায়ন করার মতো অর্থ বা ইচ্ছা কোনোটিই তার নেই। মৌনির অলস কৌতূহল আর অসীম বিরক্তিতে রাশ টেনে দরজা খুলে ভেতরে এলো মিষ্টি। মৌনি এই অসময়ে বন্ধুর আগমনে মোটামুটি বিস্মিত হলো। সেদিনের বাস দূর্ঘটনায় টাকা-পয়সা, মোবাইল, ক্যামেরা সবই জলাঞ্জলি দিয়ে এসেছে। ঢাকায় ফিরে কারো সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেনি। মোবাইল নেই– কথাটিকে চমৎকার একটা বাহানা হিসেবে ব্যবহার করা যাচ্ছে।
‘ তুই কোথ্থেকে এলি?’ বইটা বন্ধ করে অবাক কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল মৌনি।
মিষ্টি মুখ গম্ভীর করে বলল,
‘ বাসা থেকে।’
‘ আমি যে ঢাকায় এই খবর পেলি কী করে?’
‘ আপনার ফেসবুক পোস্ট থেকে।’ বলে নিজস্ব কায়দায় মুখ বাঁকালো মিষ্টি।
অভিমান আর রাগের মিশেলে অদ্ভুত রুক্ষ গলায় বলল,
‘ তোর কাছে তো আমার চাইতে ফেসবুকের বন্ধুরা দামী। পঞ্চগড়ের বাস দুর্ঘটনাকে এতো মধু মেখে লিখতে পারলি। আর আমাকে একটা টেক্সট করতে পারলি না?’
মৌনি হাসল। অপ্রস্তুত হয়ে বলল,
‘ মোবাইল নেই তো। ল্যাপটপ থেকে…’
‘ তুই বলতে চাইছিস, ল্যাপটপে ম্যাসেজ অপশন নেই?’
হাতেনাতে ধরা পড়ে অপ্রস্তুত হাসল মৌনি। ল্যাপটপে তার হোয়াটসঅ্যাপ লগ-ইন করা আছে। চাইলে একটা ম্যাসেজ সে অনায়াসে করতে পারতো। করেনি। অন্যের সামনে নিজেকে অসহায় দেখাতে ভালো লাগে না মৌনির। সে প্রসঙ্গ বদলে খুব আগ্রহের সঙ্গে বলল,
‘ বাটিতে করে কী এনেছিস? খাবার কিছু?’
মিষ্টি মাথা নাড়ল,
‘ বাড়ি থেকে গরুর ভুঁড়ি রান্না করে পাঠিয়েছে আম্মু। ভাবলাম তোর জন্য আনি। গরম ভাতের সঙ্গে খেতে চমৎকার লাগবে। আজ আমরা একসঙ্গে খাব।’
ভাতের প্রসঙ্গ আসতেই মৌনির মনে পড়ল, আজ বাসায় ভাত রান্না হয়নি। তিনদিন ধরে হলুদ, মরিচ সহযোগে খিচুড়ি টাইপ একটা বস্তু দিয়ে তার পেটপূজা চলছে। ভাতের সঙ্গে খাবার মতো কিছু নেই বলেই এই ব্যবস্থা। মৌনি বলল,
‘ ভাত ফাত রাঁধিনি। খিচুড়ি দিয়ে গরুর ভুঁড়ি চললে আমি তোকে আজকের লাঞ্চটা অফার করতে পারি। তার আগে এক কাপ চা পেতে পারিস। চা খেতে হবে চিনি ছাড়া। আমার ঘরে দুধ চিনির ব্যবস্থা নেই।’
মিষ্টি এই দরিদ্র আপ্যায়ন গ্রহণ করল। মৌনি তার প্লাস্টার করা পা নিয়েই অভিনব উপায়ে চুলা জ্বালিয়ে চায়ের পানি বসিয়ে দিল স্টোভে। মিষ্টি একটু তটস্থ হয়ে বলল,
‘ একি! কী করছিস! তুই বোস। আমি চা করছি।’
মৌনি হাসল। হাত দিয়ে মাছি তাড়ানোর ভঙ্গি করে বলল,
‘ দূর! এই পা নিয়ে সুদূর রংপুর থেকে ঢাকা এসেছি। তারপর গিয়েছি মেডিকেলে। যেতেই প্লাস্টার ফ্লাস্টার করে দিল। তারপর গেলাম ব্যাংকে। যদিও খুবই যৎসামান্য টাকা ছিলো অ্যাকাউন্টে। কোনোরকমে এই মাসের বাসা ভাড়াটা উতড়ে গিয়েছে। সব যে বিকাশে সেন্ড করে রেখেছিলাম খেয়ালই ছিল না। সীম হারিয়ে এমন এক বিপদ হয়েছে, বিকাশও ইউজ করতে পারছি না। ভেবেছিলাম আজ সীমটা তোলার ব্যবস্থা করব। কিন্তু পায়ের ব্যথাটা বেড়ে যাওয়ায়…।’
মিষ্টি অবাক হয়ে মৌনির দিকে তাকিয়ে রইল। বলল,
‘ এতো কিছু তুই একা একা করলি?’
মৌনি কাপে চা ঢালতে ঢালতে বলল,
‘ দোকা কোথায় পাব?’
‘ আমাকে জানাতে পারতি।’
জবাবে মৃদু হাসল মৌনি। মিষ্টি চায়ের কাপটা হাতে নিয়ে খানিক মন খারাপের গলায় বলল,
‘ তুই তোর কোনো দরকারে কেন আমাকে ডাকিস না, বল তো? তোর ধারণা তোর প্রয়োজনে আমি আসব না?’
মৌনি চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে একটু গম্ভীর হলো। বলল,
‘ রবীন্দ্রনাথের একটা বিখ্যাত গান আছে।
যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে
তবে একলা চলো রে…
আমাদের দাদাজান নজরুল ভক্ত। তিনি প্রথম লাইনটা ছেঁটে ফেলে আমাদের কেবল শিখিয়েছেন রবীন্দ্রনাথের ওই দ্বিতীয় লাইনটা– একলা চলো, একলা চলো, একলা চলো রে। তাই আমরা একলা চলার প্রাণপণ চেষ্টা করি। দরকার পড়লে এক পায়ে চলি। দাঁড়ানোর শক্তি হারালে হামাগুড়ি দিয়ে চলি৷ যতক্ষণ একলা চলা সম্ভব আমাদের একলা চলতে হয়। আমরা এরকম করেই তৈরি। কী করি বল তো?’
মিষ্টি কিয়ৎক্ষণ এই আশ্চর্য মেয়েটির দিকে তাকিয়ে রইল। চির অলস, অকর্মণ্য মেয়েটিকে কে জানে কোন জাদুবলে হঠাৎ হঠাৎ ইস্পাতের মতোন কঠিন বলে মনে হয় তার। সে অবাক হয়। মুগ্ধ হয়। একটা অমোঘ আকর্ষণ মৌনির প্রতি আরও শক্ত করে টেনে ধরে তাকে।
মৌনি বিছানার হেডবোর্ডে হেলান দিয়ে অনেকক্ষণ ধরেই নিবিড় চোখে গণনা করছিল মিষ্টিকে। এই কয়েক মাসে অনেক বদলে গিয়েছে সে। সবচাইতে দৃশ্যমান পরিবর্তন এসেছে তার পোশাকে। ইউনিভার্সিটির প্রথম বর্ষে যে মিষ্টির সঙ্গে পরিচয় হয়েছিল সেই মিষ্টি ছিলো অন্যরকম। পোশাক, সাজসজ্জার প্রতি যে তার বিশেষ মনোযোগ ছিল তা এক নজর দেখলেই বুঝে ফেলা যেতো। ঈশানের সঙ্গে সম্পর্কে যাওয়ার পর মিষ্টি আগের সেই অভ্যাস ত্যাগ করেছে। এখন তার একমাত্র পোশাক বোরকা। ঘরের বাইরে তার সুন্দর মুখখানা ঢাকা থাকে কালো নিকাবের আড়ালে। ছেলে বন্ধুদের মুখোমুখি হতে হয় বলে ইউনিভার্সিটির সকল প্রোগ্রামেই এখন নীরব সে। ফেসবুকে কোনো ছেলে বন্ধুও আর অবশিষ্ট নেই। মিষ্টির ফেসবুক, ম্যাসেঞ্জার চলে ঈশানের দখলদারিতে। ফোনের কল লগে কে আছে, কে কখন ফোন করলো সমস্ত তথ্য ঈশান পায় মিষ্টির ফোনে ইনস্টল করা স্পাই অ্যাপের মাধ্যমে। অচেনা নম্বর থেকে কোনো কলই এখন আর রিসিভ করে না মিষ্টি। মৌনি দীর্ঘশ্বাস ফেলল। নীরবে চুমুক দিতে লাগল চাপের কাপে। চেতনার দিক থেকে মৌনি লিবারেল তরুণী। পোশাকের স্বাধীনতায় সে বিশ্বাসী। মিষ্টির এই বোল বদলে তার কোনো আপত্তি নেই। কিন্তু ঈশান ছেলেটিকে নিয়ে তার যথেষ্ট আপত্তি আছে। ছেলেটা ভয়ংকর ম্যানিপুলেটর। মিষ্টিকে সে পর্দায় ঢেকে রাখে, ছেলেবন্ধু থেকে দূরে রাখে অথচ তার নিজের অবাধ জীবনযাপন। পাবলিক বাসে কোনো ছেলের পাশে বসার অনুমতি মিষ্টির নেই অথচ ঈশানকে সামাজিকতা রক্ষার খাতিরে তার ছেলেবেলার মেয়েবন্ধুকে বাইকের পেছনে বসিয়ে ক্যাম্পাসে পৌঁছে দিতে হয়। মৌনি বুঝে পায় না, সামাজিকতা কি একা তারই আছে? মিষ্টির নেই? আর যদি নিষেধাজ্ঞা থাকেই তবে দু'জনের ক্ষেত্রেই তা সমান নয় কেন? মৌনির ভ্রু কুঁচকে গেলো। এই কয়েক মাসের পর্যবেক্ষনে সে যা বুঝেছে, ঈশান ছেলেটা দারুণ বুদ্ধিমান তার সঙ্গে ভয়াবহ ধূর্ত। মিষ্টিকে সে নিয়ন্ত্রণ করে আবেগের চাপে। মিষ্টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে সমাজ বিজ্ঞানের ছাত্রী আর ঈশান ঢাকা কলেজে ইকোনমিক্সে অনার্স। এই নিয়ে ঈশানের ইনসিকিউরিটির শেষ নেই। অবুঝ মিষ্টি বুঝে না এই ইনসিকিউরিটিই এই ধূর্ত ছেলের প্রধান হাতিয়ার। মৌনি এক চুমুকে কাপের অবশিষ্ট চা'টুকু শেষ করে বলল,
‘ তারপর? তোদের প্রেম কেমন চলছে?’
ঘরে ঢুকার পর থেকেই একটা আলতো মন খারাপ ছুঁয়ে ছিল মিষ্টির চিবুক। মৌনির প্রশ্নে সেই মন খারাপ আরও গাঢ় হলো। মৌনির মনে পড়ল পঞ্চগড় থাকা অবস্থায় টেলিফোনে কী এক কলহের কথা বলছিল মিষ্টি। তখন অতো খেয়াল করতে পারেনি। এবার জিজ্ঞাসা করল,
‘ ঝামেলাটা কী নিয়ে?’
মিষ্টি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
‘ গত সপ্তাহে মেহেরের বিয়ে ছিল।’
‘ মেহের?’ কপাল কুঁচকে একটু ভাবল মৌনি।
‘ কোন মেহের? তোর ওই হলের বন্ধু?’
‘ হ্যাঁ।’
মিষ্টি মাথা নাড়ল। বলল,
‘তুই তো জানিস, ইউনিভার্সিটির শুরুর সময়গুলোতে আমি হলে ছিলাম। মেহের, শান্তা, ইতু, আমি– আমাদের চমৎকার বন্ডিং ছিল। হঠাৎ মেহেরের বিয়ে ঠিক হলো। আমরা সিদ্ধান্ত নিলাম সবাই মিলে যাব। বাসায় বাবা-মা রাজি ছিলেন। কিন্তু ঈশান…’
মৌনি মৃদু হাসল। বলল,
‘ ঈশান রাজি হয়নি?’
মিষ্টি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
‘ না।’
এ তথ্য শুনে আশ্চর্য এক কারণে মনে মনে খুবই পুলক বোধ করল মৌনি। প্রিয় বন্ধুকে সকল পরিস্থিতিতে বুকে আগলে রাখলেও ভাইয়ের প্রতি অন্যায়ের জন্য মিষ্টির প্রতি অবচেতনেই কিছুটা ক্ষোভ সম্ভবত আছে মৌনির। ঈশানের চাইতে নাহিদ বহুগুণ ভালো ছিল সে কথা মিষ্টি উপলব্ধি করুক– এমন এক নিষ্ঠুর কামনা তার হৃদয়ে প্রকট হয়ে আছে। মিষ্টি বলল,
‘ আমি মেহেরের বিয়েটা মিস করতে চাইনি। আমাদের কত বছর ধরে কত কত পরিকল্পনা ছিল। আমি কোনোদিন কোনো বন্ধুর বিয়েতে যাইনি জানিস? তাই ঈশানকে মিথ্যা বলে চলে গেলাম গাজীপুর, মেহেরদের গ্রামের বাড়ি।’
মৌনি বিস্ময়ে চোখ বড় বড় করে তাকাল। মিষ্টি ম্লান গলায় বলল,
‘ আমি ভেবেছিলাম ঈশান টের পাবে না। ভোরে গিয়ে সকল অনুষ্ঠান এটেন্ড করে সন্ধ্যার দিকে ঢাকায় চলে আসব। রাতে থাকব না। কিন্তু সকল আনুষ্ঠানিকতা শেষ হতে হতে অনেক রাত হয়ে গেল। আম্মুও ফোন করে বললেন, এই রাতে যেন রিস্ক নিয়ে না ফিরি। তারপরও ঈশানের কাছে ধরা পড়ার ভয়ে রাতেই রওনা দিলাম।’
মৌনি হেসে ফেলল,
‘ কিন্তু তারপরও ধরা পড়ে গেলি, তাই তো?’
মিষ্টি সে কথার উত্তর না দিয়ে মুখ ভার করে বসে রইল। অনেকক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,
‘ ঈশান সেদিন আমার সঙ্গে অত্যন্ত খারাপ ব্যবহার করেছে। এতো অপমানজনক সম্বোধন ও আমাকে করেছে! আমার চরিত্র নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। আমি নাকি প্যাথলজিক্যাল লায়ার। আমার চরিত্রের ঠিক নেই। যে মেয়ে এতো বড় মিথ্যা বলতে পারে সে আরও কী কী করতে পারে তা নিয়ে তার যথেষ্ট সন্দেহ আছে। নাহিদের সঙ্গে সম্পর্ক থাকাকালীন তার কথায় ভুলেছি। এখন তার সঙ্গে সম্পর্ক থাকাকালীন অন্য কারো কথায় ভুলবো না তার কী নিশ্চয়তা আছে? আরও সব ভয়ংকর ভয়ংকর টার্ম।’
মৌনি কি বলবে ভেবে পেল না। মিষ্টি নিজেই বলল,
‘ এতোটুকু বিশ্বাস ওর নেই আমার ওপর? এতোদিনে আমাকে এই চিনলো?’
মৌনির একবার বলতে ইচ্ছে হলো,
‘ মানুষ চেনা কী এতোই সহজ মিষ্টি? নাহিদ আর তুই চার বছরের সম্পর্কে থেকেও কি একে-অপরকে চিনতে পেরেছিস?’
কিন্তু সে কথার পরিবর্তে বলল,
‘ আমি এটা ভেবেই অবাক হচ্ছি, যে ছেলেটা মুখের উপর তোর চরিত্র নিয়ে কথা বলল তুই এখনও তার সঙ্গে একটা হ্যাপি রিলেশনশিপ কন্টিনিউ করছিস? তার গালে দুটো থাপ্পড় মারিসনি? তোরা মেয়েরা এতো সাবানা কেন ভাই? আই হেইট দিস কাইন্ডস্ অব গার্লস।’
মিষ্টি বলল,
‘ কন্টিনিউ করছি না তো।’
‘ করছিস না?’ সরু চোখে তাকাল মৌনি। পরমুহূর্তেই উচ্ছ্বাসিত কণ্ঠে বলল,
‘ তারমানে তোদের ছাড়াছাড়ি হয়ে গিয়েছে? চমৎকার! বেশ করেছিস। ওই রকম একটা ছাগলের সঙ্গে তোকে একটুও মানাতো না।’
মিষ্টিও তার মনের সমস্ত বিষোদগার ঢেলে দিলো বন্ধুকে কাছে পেয়ে। দুই বন্ধু মিলে সারা দুপুর ঈশানকে গালিগালাজ করে কাটাল। খিচুড়ি ভোজন শেষে গোধূলি বেলায় এক কাপ চা নিয়ে বসতেই মৌনি খেয়াল করলো মিষ্টি স্বাভাবিক নেই। ধীরে ধীরে অসুস্থ হয়ে পড়ছে। সমস্ত শরীর ফ্যাকাশে হয়ে হাত-পা কাঁপছে। মৌনি অবাক হয়ে বলল,
‘ একি! কী হয়েছে তোর?’
মিষ্টি হুহু করে কেঁদে ফেলল এই প্রশ্নে। দু'চোখে অসহায়ত্ব নিয়ে বলল,
‘ আমি ওর সঙ্গে যোগাযোগ বন্ধ করে দিলাম। আর ও একবারও আমার সঙ্গে যোগাযোগ করার চেষ্টা করলো না মৌনি। ওর কি একবারও আমার কথা মনে পড়ছে না?’
সমস্ত দুপুর তার তালে তাল মিলিয়ে এই সন্ধ্যায় মিষ্টির এই বোল পরিবর্তনে হতবাক হয়ে গেল মৌনি। হতভম্ব গলায় বলল,
‘ তুই এখনও চাইছিস ওই বাস্টার্ডটা তোকে রিচ করুক? আহ্লাদ করে রাগ ভাঙাক? আশ্চর্য!’
মিষ্টি সেকথার উত্তর না দিয়ে নিজের দুর্বল শরীরটা ছেড়ে দিলো বিছানার ওপর। মৌনি ত্বরিত পায়ে মিষ্টির পাশে এসে বসল। তার হাতটা নিজের হাতে টেনে নিয়ে অবাক হয়ে লক্ষ্য করলো, মিষ্টির বরফ ঠান্ডা হাতের আঙুলগুলো বেঁকে যেতে চাইছে ক্রমশ। মৌনি দু'চোখে উদ্বেগ আর বিস্ময় নিয়ে বন্ধুর মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। মিষ্টি অসহায় গলায় বলল,
‘ আমি ওকে ছেড়ে থাকতে পারছি না, মৌনি। এই এক সপ্তাহে আমি কত সহস্রবার ফোন চেইক করেছি! দোষটা আসলে আমারই। কেন যে মিথ্যা বলতে গেলাম? কী হতো বিয়েতে না গেলে? আমি তো জানি ও আমাকে নিয়ে কত ইনসিকিউরড। তারপরও…’
কথা বলার ভাষা খুঁজে পেল না মৌনি। মিষ্টি অধীর কণ্ঠে বলল,
‘ আমিই বরং ওকে একটা ফোন করি, বল? হয়তো আমার সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করে অনুশোচনা আর লজ্জায় আমাকে কল করতে পারছে না ও? আমি কল করলে হয়তো সরি বলবে। করবো একবার ফোন?’
ঘটনার আকস্মিকতায় স্তম্ভিত মৌনি বন্ধুকে আত্মসম্মানের পাঠ পড়াতে গিয়েও থমকাল। দীর্ঘ একটা শ্বাস ফেলে বলল,
‘ কর।’
মিষ্টি বন্ধুর অনুমতি পেয়ে হুড়মুড় করে ঈশানের নাম্বারে ডায়াল করলো। মৌনি একদৃষ্টিতে তাকিয়ে দেখতে লাগল, আপনাকে ভুলে যাওয়া এই মানবীটিকে। আহারে প্রেম! আহারে ভালোবাসা! প্রেম-ভালোবাসার রূপ তাহলে এরকম?
নাহিদের কাছে ভালোবাসা একরকম। শাওনের কাছে ভালোবাসা আরেকরকম। মিষ্টির কাছে ভালোবাসা আরও ভিন্ন। কার ভালোবাসা সঠিক? সঠিক ভালোবাসা আসলে কী রকম? ভালোবাসলে এতো হীন হতে হয়? আত্মসম্মান খুইয়ে পরজীবী হয়ে বেঁচে থাকতে হয়? মৌনির কেমন ধাঁধা লেগে যায়, বোধগম্য হয় না।
—————
মধ্যদুপুর। কাওরানবাজারে, নাহিদদের অফিসের কনফারেন্স রুমে উষ্ণ আলোচনা চলছে। কর্ণেল ফতেহ সিদ্দিকি আজ প্রথম আদিব হোসেনের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে এসেছেন। কথাবার্তা বলে তিনি কতটা তুষ্ট হয়েছেন বলা মুশকিল। অফিসের পিওন দ্বিতীয় দফায় চা, সমুচা পরিবেশন করতেই আলোচনায় সমাপ্তি টেনে উঠে দাঁড়ালেন তিনি। নাহিদকে সঙ্গে নিয়ে নেমে এলেন নিচে।
নাহিদদের অফিসটা দু'তলায়। নিচ তলায় একটা ঘুবচি ধরনের ফাস্টফুড দোকান। নাহিদ সেই দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে বলল,
‘ আমাদের অফিসের নিজস্ব কোনো গাড়ির ব্যবস্থা করা হয়নি এখনও। বুঝতেই পারছেন, খুবই গরিবী হালত। আপনি কিছু মনে না করলে, আপনাকে আমি বাইকে করে পৌঁছে দেব স্যার?’
ফতেহ সিদ্দিকী সামান্য হাসলেন। বললেন,
‘ তার কোনো প্রয়োজন নেই। কিছুক্ষণের মধ্যেই আমার গাড়ি চলে আসবে। আচ্ছা, তোমার হোমটাউন যেন কোথায় বলেছিলে?’
বলে পকেট হাতড়ে সিগারেটের প্যাকেট বের করলেন তিনি। নিজে একটা ধরিয়ে নাহিদের দিকে এগিয়ে দিয়ে বললেন,
‘ অভ্যাস আছে?’
নাহিদ নিঃসংকোচে একটা সিগারেট নিলো। কিন্তু আগুন দিলো না তাতে। বলল,
‘ ময়মনসিংহ।’
‘ তোমার বাবার পেশা কী?’
‘ নাথিং।’
‘ নাথিং?’ অবাক হয়ে তাকালেন ফতেহ সাহেব। তবে দ্বিতীয় কোনো প্রশ্ন করলেন না। কয়েকবার নীরবে সিগারেটের ধোঁয়া ছেড়ে বললেন,
‘ তোমার মনে হচ্ছে, এই ম্যাগাজিনটা তুমি দাঁড় করাতে পারবে?’
এক মুহূর্ত সময় না নিয়ে উত্তর দিল নাহিদ,
‘ পারব।’
‘ তোমার মধ্যে যে প্যাশন আছে সেই প্যাশনটা কিন্তু আমি বাকিদের মধ্যে পাইনি। খুব সম্ভবত তাদের কাছে তোমার পরিকল্পনাই তেমন স্পষ্ট নয়। একলা একজন ব্যক্তি কখনও একটা প্রতিষ্ঠান হয়ে উঠতে পারে কী?’
প্রশ্নটা নতুন নয়৷ এই একই প্রশ্ন এই কয়েক মাসে নিজেকে শত সহস্রবার করেছে নাহিদ। উত্তরটা খুব ধোঁয়াশা বলেই লাগামছাড়া ঘোড়ার মতো উন্মুক্ত তরবারি হাতে প্রবল জেদ নিয়ে এদিকেই ছুটছে নাহিদ। এই ধোঁয়াশার আড়ালে কী আছে সেই উত্তরটাই খুঁজে বের করবে সে। এই প্রশ্নটাই তো তাকে তাতিয়ে রাখছে। ভাসিয়ে রাখছে প্রচন্ড জলোচ্ছ্বাসের সন্ধ্যায়। ভাবনার চটকে কখন যে সিগারেট ধরিয়ে বসেছে খেয়াল নেই নাহিদের। সিগারেটে ধোঁয়া উড়িয়ে ক্রমেই একটা ধূসর ভাবনার দুনিয়ায় হারিয়ে গিয়েছিল সে। ঘোর কাটল গাড়ির ব্রেকের আওয়াজে৷ কপালে ভাঁজ ফেলে চিন্তা আর বাস্তবে দোদুল্যমান হয়ে সে তাকাল সামনে এসে দাঁড়ানো গাড়িটির দিকে। গাড়ির ড্রাইভিং সীটে কুর্তি- পাজামা পরা অসম্ভব রূপবতী একটি মেয়ে৷ চুলগুলো পেছনে টানটান করে বাঁধা। আড়ম্বরহীন মুখে বিশেষত্বহীন বিশেষত্বের দম্ভ। মেয়েটি জানালা দিয়ে মুখ বের করে ফতেহ সাহেবকে ডাকল। বলল,
‘ বাবা, গাড়িতে উঠে এসো।’
ফতেহ সাহেব ড্রাইভিং সীটে মেয়েকে দেখে খুবই পুলকিত হলেন। সিগারেটটা অতি সন্তপর্ণে ফেলে দিয়ে নাহিদের দিকে তাকালেন। কাঁধে হাত রেখে গাড়ির দিকে এগিয়ে গিয়ে বললেন,
‘ তোমাদের সম্ভবত পরিচয় হয়নি। এটি আমার মেয়ে, সুহানা। ভীষণ শার্প রমনী। তোমাদের ক্রিমিনোলজিতে তার খুব আগ্রহ।’
নাহিদ ধূমায়িত শলাকা হাতে শূন্য দৃষ্টিতে সুহানার দিকেই তাকিয়ে ছিল এতক্ষণ। কর্ণেল সাহেবের ডাকে সিগারেটটা ফেলে দিয়ে এগিয়ে এলো। সুহানার দিকে এক পলক তাকিয়ে মাথা নাড়িয়ে মৃদু হাসার চেষ্টা করল। সুহানা তখনও ড্রাইভিং সীটে বসে আছে। বাবার পরিচয় করিয়ে দেওয়ার উচ্ছ্বাসে এতোটুকু ধারণা করতে পারছে, ছেলেটিকে তার খুবই পছন্দ হয়েছে। কিন্তু সুহানার ঠিক পছন্দ হলো না। খালি চোখে তাকালে রূপ ছাড়া আর কিছু তো নেই এর মধ্যে। লম্বা, সুদর্শন, ধারালো চেহারা, সুন্দর পরিপাটি ড্রেসিং সেন্স — কিশোরী মেয়েরা প্রথম পুরুষ চিনতে শিখলে যে ধরনের পুরুষ প্রত্যাশা করে লজ্জায় গাল লাল করে। অথবা ইংরেজি নভেলে যে সকল নায়ককে কল্পনায় ভেবে তরুণীরা দীর্ঘশ্বাস ফেলে রাতের পর রাত ওরকম পয়েটিক চেহারা। চেহারার লালিত্য দেখে মুগ্ধ হওয়ার আবেগ অনেক আগেই পেরিয়ে এসেছে বলেই হয়তো নাহিদকে তার বিশেষ কিছু মনে হলো না। তাকে গড়পড়তা বাঙালি সুদর্শন যুবক, যাদের নিজের সৌন্দর্য আর সুপারফ্লুয়াস এটিটিউট দিয়েই সমস্ত মেয়ে পটিয়ে ফেলার আত্মবিশ্বাস, তাদের একজন মনে করে বিতৃষ্ণা বোধ করলো। বাবার যে সত্যিই বয়স হচ্ছে, তার মানুষ চেনার ক্ষমতা যে আর আগের মতো নেই, সে কথা ভেবে মনে মনে বাবার জন্য একটু সহানুভূতিও হলো।
রাতের খাবার খাওয়ার পর ঘড়ি ধরে কিছুক্ষণ এদিক-ওদিক পায়চারি করে সুহানা। এই সময়টুকু সে কাটায় সোশ্যাল মিডিয়ায়। আজ সোশ্যাল মিডিয়ার পাতা খুলতেই দেখল চারদিকে বেশ রমরমা আবহাওয়া। দেশীয় বন্ধু, আত্মীয়-স্বজন, বাংলাদেশি কৌতুকের পৃষ্ঠাগুলো সকলেই কোনো একটা বিষয় নিয়ে উত্তপ্ত আলোচনা করছে। সকলের হাসি-মজা , ব্যাখ্যামূলক আলাপে সোশ্যাল মিডিয়া সয়লাব। সুহানা প্রথমেই ব্যাপারটা ধরতে পারল না। কিছুক্ষণ ঘাটাঘাটি করার পর জানল, সম্প্রতি একটি নতুন ম্যাগাজিনের উদয় হয়েছে। এতোদিন তাদের তেমন কোনো কার্যকলাপ না থাকলেও আজ একটি আর্টিকেল প্রকাশিত হয়েছে। স্যাটায়ার ধর্মী আর্টিকেল।
‘ হিউম্যান ট্রাফিকিং থেকে মাফিয়া নেটওয়ার্কিং – সকল শাখায় বাংলাদেশের কেন এতো দৈন্যদশা? কেন নেই পৃষ্ঠপোষকতা? প্রশাসনের অবহেলাতেই কি তবে হারিয়ে যাবে এই সকল মহৎ শিল্প?’
এরকম হেডলাইন দিয়ে শুরু করে অপরাধ জগতে কেন বাংলাদেশ এতো পিছিয়ে, কেন এক নম্বরে নেই তা নিয়ে পুরো লেখাজুড়ে লেখক খুব দুঃখ ফুটিয়ে তুলেছেন। অকৃত্রিম ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন দেশের প্রতিটি নাগরিক ও প্রশাসনের প্রতি। কৌতুকপ্রিয়, রসালো লেখার ধরনে আর্টিকেলটা খুব হাস্যরসাত্মক হলেও লেখক আর্টিকেলের প্রতিটি মোড়ে মোড়ে খুব সূক্ষ্মভাবে জানিয়ে দিয়ে গিয়েছেন দেশের এই সকল অপরাধসমূহের পৃষ্ঠপোষক আসলে কারা। মাঝারি আকারের একটা আর্টিকেলে লেখক তুলে এনেছেন ছোট-বড় প্রায় পঞ্চাশটি অপরাধের কথা। প্রথমবার পড়ে অধিকাংশ পাঠক কৌতুক বোধ করলেও ভাবুক পাঠকরা ইতোমধ্যেই শুরু করেছেন বিশ্লেষণ, ব্যাখ্যা, উপব্যাখ্যা। আর্টিকেলে লেখকের নাম প্রকাশের প্রয়োজনীয়তা বোধ করেনি ম্যাগাজিন। সুহানা আরেকবার আর্টিকেলটা পড়ল। ঝরঝরে, রসালো লেখা পড়তে আরাম। এমন হাসতে হাসতে স্বল্প পরিসরে দেশের এতোগুলো অপরাধ থেকে পাঠকদের দৃষ্টি বুলিয়ে আনা যে এক বিস্ময়কর ক্ষমতা সে কথা অস্বীকার করা যাবে না। সে অনেকক্ষণ সময় নিয়ে এই বিষয়ে পরিচিতদের দীর্ঘ মতামত পড়ল। কেউ আর্টিকেলটাকে হাওয়ায় উড়িয়ে দিচ্ছে। কেউ এর নাড়িনক্ষত্র বিচার করে এর মধ্যে অসীম সম্ভাবনা দেখছে। এই তর্ক-বিতর্ক দেখার মাঝপথেই ভীষণ উচ্ছ্বাস নিয়ে নিজের ঘর থেকে বেরিয়ে এলেন ফতেহ সিদ্দিকী। মেয়ের দিকে তাকিয়ে প্রবল উত্তেজনা নিয়ে বললেন,
‘ নাহিদের আর্টিকেলটা পড়েছিস সুহা? জাস্ট মারভেলাস!’
সুহানা তখনও ডুবে ছিল তর্কের সয়লাবে। ফতেহ সাহেবের কণ্ঠস্বরে মনোযোগ হটিয়ে চোখ তুলে তাকাল। বিস্মিত হয়ে বলল,
‘ নাহিদের আর্টিকেল মানে? নাহিদ কে? সরি, বুঝতে পারিনি।’
ফতেহ সিদ্দিকী উত্তেজিত গলায় বললেন,
‘ আরে, আজ দুপুরে যে ছেলেটির সাথে দেখা হলো তার নাম নাহিদ। আর্টিকেলটা পড়েছিস নিশ্চয়? একটা আর্টিকেল লিখেই চারদিকে কেমন হৈচৈ ফেলে দিয়েছে, দেখেছিস? সাচ আ ট্যালেন্টেড বয়!’
সুহানা বাবার অতীব উত্তেজনা দেখে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। ফোনটা নামিয়ে রেখে বাবাকে পাশে বসার জায়গা করে দিয়ে বলল,
‘ বাবা, প্লিজ বসো। তোমার মনে হচ্ছে না, তোমার এবার সত্যিই বয়স হয়ে যাচ্ছে? তুমি যেভাবে ছেলেটির উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করছো, ছেলেটি কিন্তু তেমন প্রশংসা পাওয়ার মতো বৃহৎ কার্য সম্পাদন করেনি। এর আগেও বিশ্বে এরকম লেখা অনেকেই লিখেছে। ছেলেটা তাদের থেকে কিছুটা অনুপ্রাণিত বলেই আমার মনে হয়েছে।’
ফতেহ সাহেব মেয়ের পাশে এসে বসলেন। উদ্দীপিত কণ্ঠে বললেন,
‘ সে যদি অনুপ্রাণিত হয়েও থাকে তারপরও তার কনটেন্টে যে নিজস্ব লেখক সত্তা প্রকাশ পেয়েছে সে কথা তো অস্বীকার করতে পারবি না। পাঠকদের একটুও বিরক্ত হতে না দিয়ে ছোট্ট একটা পরিসরে রাজ্যের ব্যাপার নিয়ে আলোচনা করে ফেলা তোর কাছে খুব সহজ ব্যাপার বলে মনে হচ্ছে?’
সুহানা বলল,
‘ না, সহজ ব্যাপার না। কিন্তু তাই বলে এতো উচ্ছ্বসিত প্রশংসা পাওয়ার মতো কাজও সে করেনি বাবা। তুমি প্লিজ এই নিয়ে আমার সঙ্গে তর্ক করতে এসো না। আমি অবাক হচ্ছি এতো অল্পতে তোমার হৈচৈ দেখে। তুমি তো এমন ছিলে না বাবা।’
ফতেহ সাহেব হাসলেন। বললেন,
‘ ইট'স নট এবাউট কনটেন্ট। এই ছেলেটার মধ্যে একটা চার্ম আছে। এদের জারিজুরি যেমনই হোক আমি সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছিলাম এদের সঙ্গে কাজ করব না। আর না করাটাই খুব স্বাভাবিক আমার জন্য। কিন্তু এই ক্যারিশম্যাটিক ছেলেটির জন্য আমাকে দ্বিতীয়বার ভাবতে হচ্ছে।’
সুহানা অবাক হয়ে বলল,
‘ ছেলেটা তোমাকে কীসে এতো মুগ্ধ করলো আমি আসলেই বুঝতে পারছি না। তুমি তো দেখি কিশোরীদের মতো প্রেমে পড়ে গিয়েছ, বাবা।’
মেয়ের কথায় হো হো করে হেসে উঠলেন ফতেহ সিদ্দিকী। বললেন,
‘ এটা এক রকম প্রেম বৈকি! তবে এই প্রেমটা তার ক্যারিশম্যাটিক পার্সোনালিটি আর এফোর্টের প্রতি। ছেলেটার বয়স আর কত হবে? বড়জোর বাইশ/ তেইশ। অথচ তার মনোবল এতো দৃঢ়! সত্যি বলতে, তাদের টিমের কাউকে দেখেই আমার মনে হয়নি তারা তাদের পরিকল্পনা মতো ম্যাগাজিনটা দাঁড় করাতে পারবে। সেখানে নাহিদ একাই দৃঢ় ইস্পাতেের মতো দাঁড়িয়ে আছে। মেরুদণ্ড সোজা। নিজের প্রতি প্রবল আত্মবিশ্বাস। তারপরও আমি ভেবেছিলাম, এটা নাহিদের অল্প বয়সের ঝোঁক। অল্প বয়সে রক্ত গরম থাকলে আমরা বিভিন্ন বিষয়েই ওভার কনফিডেন্ট হয়ে যাই। কিন্তু আজকের আর্টিকেলটা পড়ে আমার সেই ধারণাটা অনেকখানি ম্লান হয়ে গিয়েছে। ছেলেটা কেবল আত্মবিশ্বাস নিয়ে বসে থাকেনি এর পেছনে যে কঠোর শ্রম দিয়েছে সেটাও স্পষ্ট। আমার ধারণা, আর্টিকেল লেখা, তথ্য সংগ্রহ, মার্কিটিং ম্যানেজমেন্ট সকল কিছু তার একলার কাজ। একটা ছেলের জন্য একা এতো দিক চিন্তা কা এবং সেই চিন্তা অনুযায়ী কয়েক ঘন্টার মধ্যে সবার আলোচনার বিষয়বস্তু হয়ে যাওয়া। তোর কী মনে হয়, এটা চারটি খানি কথা? ছেলেটা এখনও গ্রাজুয়েশন শেষ করেনি। তুই চিন্তা কর, সুযোগ পেলে ও ঠিক কোথায় কোথায় পৌঁছাবে! ছেলেটা একটা বারুদ, সুহা। হি ইজ এন এক্সেপশনালি গিফটেড বয়। দেখিস, ও একদিন সবার ঘুম হারাম করে দেবে।’
সুহানা প্রত্যুত্তরে কিছু বলল না। তার স্যাপিওসেক্সুয়াল মন এইবার নাহিদের প্রতি কিছুটা কৌতূহল বোধ করলো। বাবার কথা সে পুরোপুরি বিশ্বাস করতে পারছে না, ছেলেটা কী আসলেই এরকম? এমন সুদর্শন, লাল্টু টাইপ চেহারার সাথে এই বারুদ-ভাবনা কী আসলেই সম্ভব? আশ্চর্য!
—————
কংক্রিটের শহরে সন্ধ্যা নেমেছে অনেকক্ষণ হলো। মিথির হাতিরঝিলের অফিসে এখনও বেশ রমরমে আমেজ। চা, সমুচা হরদম চলছে। আজ রাত্রির আটটায় মিথিদের টেলিফিল্মটা ওটিটিতে টেলিকাস্ট হবে। টেলিফিল্মের প্রায় সকল আর্টিস্ট আজ মিথির অফিসে উপস্থিত হয়েছে। সবাই মিলে অফিসের কনফারেন্স রুমে টেলিফিল্ম দেখা হবে। টেলিফিল্ম টেলিকাস্ট নিয়ে সবার চাইতে উত্তেজিত হয়ে আছে সাফাত। তরুণ অভিনেতা প্রথমবার অভিনয় করলে যেমন উত্তেজিত থাকে, নার্ভাস থাকে সর্বক্ষণ তেমন একটা অস্থিরতা চেপে রাখছে তাকে। ক্যারিয়ারের স্ব-উচ্চ পর্বতে দাঁড়িয়ে তার হঠাৎ এই সন্ধ্যায় মনে হচ্ছে, এটাই যেন তার প্রথম কাজ। এই অভিনয় শক্তিতেই নির্ভর করছে তার সমস্ত জীবন, সকল সম্ভাবনা। মিথির চোখ-মুখ অবশ্য নির্বিকার। সাদা জমিনে নীল সুতার কাজ করা একটা শাড়ি পাট পাট করে পরে এক পৃথিবী গাম্ভীর্য নিয়ে সে ল্যাপটপের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে আছে। চেহারায় সামান্য দুশ্চিন্তার ছটা। আজ তাদের টেলিফিল্ম টেলিকাস্ট হওয়ার কথা আর আজই সোশ্যাল মিডিয়া গরম করে রেখেছে নতুন এক ম্যাগাজিন কোম্পানি। সকলের দৃষ্টি এখন ওদিকে। এমন টানটান উত্তপ্ত আলোচনা থেকে মিথির স্থির, শীতল টেলিফিল্মের দিকে নজর টেনে নেওয়া ভারি মুশকিল হবে। টেলিকাস্ট হওয়ার পরপর একটা সাড়া না পড়লে…. মিথির কপালে দুশ্চিন্তার বলিরেখা পড়ে এবার। সামনের চেয়ারে বসে সাফাতও একই দুশ্চিন্তার কথা বলছিল মিথিকে। এমন সময় দরজা খুলে ভেতরে এলো হৃদয়। তার হাতে একটা খাম। খামটা মিথির দিকে এগিয়ে দিতেই মুখ তুলে জিজ্ঞাসু চোখে তাকাল মিথি।
‘ আপনার নামে এসেছে আপু।’
মিথি হাত বাড়িয়ে খামটা নিলো। রেজিস্ট্রি করা খাম। কোনো নাম ধাম নেই। মাথায় পাহাড় সমান দুশ্চিন্তা নিয়ে আনমনেই খামটা খুলল মিথি। অন্যমনস্ক চোখে ভেতরের কাগজটিতে চোখ বুলাতেই ধীরে ধীরে স্থবির হয়ে গেল তার শরীর। সাফাত মিথির ফ্যাকাশে চেহারা দেখে কৌতুহল দমন করতে না পেরে জিজ্ঞাসা করলো,
‘ ইজ এভ্রিথিং অলরাইট মিথি?’
কলের পুতুলের মতো মুখ তুলে তাকাল মিথি৷ কপালে চিন্তার ভাঁজ। ভেতর ভেতর ভয়ংকর ঝড়ে লন্ডভন্ড হয়ে গেলেও স্বাভাবিক রাখল মুখ। সাব্বিরের সঙ্গে সংসার সম্ভব নয়, এ সত্য মিথি বুঝে ফেলেছে অনেকদিন হলো। তারপরও কোথাও একটা অপেক্ষা ছিল তার। সংসার না হলেও এতো দ্রুত সাব্বির সম্পর্কচ্ছেদের ব্যবস্থা করে ফেলবে ভাবতে পারেনি মিথি। এয়ারকন্ডিশনের নিচে বসেও ঘামতে লাগল সে। সাফাত ফের শুধাল,
‘ তুমি ঠিক আছো, মিথি?’
প্রত্যুত্তরে ম্লান হাসল মিথি। কাগজটা ভাঁজ করে খামে ভরে রাখতে রাখতে বলল,
‘ ঠিক আছি। আপনি কিছু মনে না করলে আমি কিছুক্ষণ একা থাকতে চাই, সাফাত ভাই। আপনারা একটু কনফারেন্স রুমে বসুন? আমি আসছি।’
সাফাত মাথা নাড়ল। মিথির ফ্যাকাশে, চঞ্চল মুখের দিকে একবার তাকিয়ে বেরিয়ে গেল অফিস থেকে। চারদিকে অদ্ভুত এক নিস্তব্ধতা নিয়ে নিজের চেয়ারে পাথরের মতো বসে রইল মিথি। ঠোঁটের কাছে হাত ঠেকিয়ে অবসন্ন চোখে তাকিয়ে রইল শূন্য দেয়ালে। সাব্বিরের এই পদক্ষেপের বিপরীতে কী করা উচিত বোধগম্য হলো না। একটা মানুষ তার উপস্থিতিতে প্রবল বিষাদে ডুবে যাচ্ছে। তার চোখের সীমানা থেকে ছুটে পালাতে চাইছে। এমন একজনের কাছে কী প্রত্যাশা রাখবে মিথি? কীসের জবাব চাইবে? সাব্বির কী আগেই জানিয়ে দেয়নি, এটাই তাদের সম্পর্কের ভবিতব্য? সাব্বিরকে সে প্রচন্ড ভালোবাসে কিন্তু সেই ভালোবাসাই সাব্বিরকে মানসিক অশান্তিতে ফেলে দেয় জানার পরও তাকে প্রেশার দেওয়া কি ঠিক হবে? উত্তর খুঁজে পায় না মিথি। তাছাড়া প্রেশার দেবেই বা কী করে? মিথি তো অন্যান্য সাধারণ মেয়েদের মতো নয়। সংসার বাঁচানোর জন্য ছেলেমানুষী পাগলামো সে করতে পারে না। যদি পারতো তাহলে হয়তো…! মিথি মুখ ফিরিয়ে খামটির দিকে তাকায়। কয়েক মুহূর্ত অপলক চোখে তাকিয়ে থেকে ফের বের করে আনে সেই কাগজ। ঝাপসা চোখে নিরুপায় হয়ে সে তাকিয়ে থাকে ওই কাগজগুলোর দিকে। প্রবল ঝড়ে বরফের মতো শীতল হয়ে যাওয়া হাতটা বাড়িয়ে তুলে নেয় কলম। নিজের লাভ-লোকসানের হিসেবে তুখোর হিসেবি মিথি এই প্রথম উপলব্ধি করে ভালোবাসায় সব চাইতে বড় স্বার্থ হলো অপরজনকে সুখী দেখা। দীর্ঘ অভিশপ্ত জীবন বয়ে বেড়িয়ে ক্লান্ত সাব্বির মিথির থেকে মুক্তি চায়। একলা, নিবৃত্তে কাটিয়ে দিতে চায় একটা জীবন। মিথি আর তাকে ক্লান্ত করতে চায় না। খাঁচার পাখিকে আকাশে উড়তে দেওয়া যেমন পাখির প্রতি সত্যিকার প্রীতির সাক্ষর। সাব্বিরকে ভারমুক্ত করাও সাব্বিরের প্রতি মিথির ভালোবাসার সাক্ষর। ওই দিঘি চোখের ছেলেটি একটু স্বস্তি পাক। তার একটু স্বস্তির জন্য মিথি বিসর্জন দিতে পারে নিজের সমস্ত স্বার্থ।
·
·
·
চলবে……………………………………………………