ক্যামিলাস রাজ্যের শেষ সীমানার দিকে যেই খোলা জায়গাটি, সেখানেই বন্দোবস্ত করা হয়েছে রেবেকার শেষ কার্যের। দু'টো দিন আগেও যেই মেয়েটির দেহে প্রাণ ছিলো, রানির সাহায্যে নিজেকে সঁপে দিয়েছিলো, সেই মেয়েটির চিতা জ্বলছে আজ দাউদাউ করে। আগুনের ফুলকির দিকে তাকিয়ে আছেন রানি।
হেমলক পাশে এসে দাঁড়ালো রানির। এক রাতের ভেতর কীভাবে ছুটোছুটি করে রানি রেবেকার দাহ্য কার্য সমাপ্তি করার বন্দোবস্ত করেছেন তা দেখে সে অবাক না হয়ে পারেনি। যদিও কতবার বলেছিলো রেবেকাকে প্রাসাদ অব্দি নেওয়া হোক! কিন্তু রানি দিলেন না। রানির ভাষ্যমতে প্রাসাদে নিশ্চয় এমন কেউ আছে যে এই খবরটা যামিনী অব্দি পৌঁছে দিতে পারে। তাই তিনি নিজের সাধ্যে যতোটুকু সম্ভব ততটুকুতেই রেবেকার শেষ কাজটুকু করলেন।
রানিকে এক ধ্যানে রেবেকার জ্বলন্ত চিতার দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখল হেমলক। রানির কঠিন মুখ চোখের অন্তরালে থাকা ভাষা বুঝার চেষ্টা করল। কিন্তু বুঝতে শেষমেশ সক্ষম হয়ে উঠল না।
তার কাছে রানিকে মনে হয় সবচেয়ে অদ্ভুত মানব চরিত্র। যার সুখ, শোক কিংবা দুঃখ… কারো সাথে ভাগযোগ্য নয়। যিনি পৃথিবীর সমস্ত কিছু গিলে নেন একটি দীর্ঘশ্বাসে। একটু কি ভাগাভাগি করা যায় না কষ্টটুকু? একটু কি ভরসা করে মাথা রাখা যায় না?
কীসের এত অভিমান মানুষটার সবার প্রতি? কীসের এত প্রতিযোগিতা নিজেকে পাথর প্রমাণ করার?
নিজের ভেতরের প্রশ্নগুলো দমিয়ে রাখতে পারল না হেমলক,
“রেবেকার মৃত্যুতে তুমি শোকাহত তা আমি বুঝতে পারছি। তুমি চাইলে সেই শোক প্রকাশ করতে পারো। কাঁদতে পারো। বলতে পারো চারটি দুঃখের কথা। কেন তবে সেসব না করে নিজেকে কঠিন বানিয়ে রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করছো? একটু নরম হলে কোনো ক্ষতি হবে না, সুধাকান্তা।”
হেমলকের দীর্ঘ কথাতেও নড়চড় হলো না রানির ভাব ভঙ্গির। তিনি আগের মতন শক্ত মুখে দাঁড়িয়ে রইলেন। তা দেখে হতাশ হলো হেমলক,
“একটু কাঁদলে কিছু হয় না, সুধাকান্তা। কাঁদো নাহয় খানিক।”
“কাঁদবো? কেন? কাঁদলে ফিরে আসবে কি রেবেকা? যদি বলেন ফিরে আসবে, তাহলে আমি কাঁদবো। ফিরবে?”
তাকালেন রানি এবার হেমলকের দিকে। দু'জনের চোখের মণি পরস্পরের দিকে স্থির।
“মানুষ ফিরবে না, কিন্তু দুঃখ তো কমবে!’
“আমায় এই পৃথিবীর কোনো নিয়ম দুঃখ দিতে পারেনি কখনো। পারবেও না। আর কান্না হলো দুর্বলতা। আমি দুর্বলতা ঘৃণা করি। আমায় কাঁদতে বলে দুর্বল করতে চাচ্ছেন? কিন্তু আমি তো দুর্বল হচ্ছি না। এই প্রতিটি ঘটনা, প্রতিটি স্মৃতি আমাকে কঠিন থেকে কঠিন করে তুলছে। কাঁদলে আমার মনের ঘৃণাও ধুয়ে যাবে। আমি সেটা হতে দিতে পারি না। ঘৃণা ধুয়ে গেলে নিজের প্রাণপ্রিয় সখীর গলায় তলোয়ার ধরার সময় হয়তো আমার হাত কাঁপবে কিঞ্চিৎ। আমি চাই না আমার হাত কাঁপুক। তাহলে ওকে কঠিন থেকে কঠিনতম মৃত্যু আমি দিতে পারব না।”
“তোমার কণ্ঠ এক কথা বলছে, কিন্তু চোখ? সে যে অন্য কথা বলছে, সুধাকান্তা!”
রানির শক্ত দেহভঙ্গিমা এবার কোমল হয়ে গেলো। হেমলকের কাছে নিজের কঠিন ব্যক্তিত্ব প্রমাণ করতে না পেরে চোখ ঘুরিয়ে নিলো। আমাদের দেহের সকল অঙ্গ আমাদের কথামত চললেও চোখ সদা বেইমানি করে। তাই রেবেকার জন্য হওয়া দুঃখ রানির চোখ হয়তো লুকাতে ব্যর্থ হলো! দুঃখ হবে না-ই বা কেন?
এই জীবনে তিনি যামিনীকে যতটা ভালোবেসে ছিলেন, ততটাই ভালোবেসে ছিলেন রেবেকাকে। রেবেকা তার সাথে বেইমানি করার পরেও তিনি তার সকল নিয়ম ভঙ্গ করে এই রেবেকাকেই পালিয়ে যেতে সাহায্য করেন। সেই রেবেকার এমন মৃত্যু তিনি মানবেন কীভাবে? ভালোবাসার মানুষের জন্য কারই বা মায়া না হয়?
“চোখ সরিয়ে নিয়ে কী হবে? আমি কি বুঝবো না তুমি কতটা ভালোবেসেছো নিজের প্রজাদের? তোমার কাঁধে থাকা রেবেকার মৃতদেহই ছিলো সে ভালোবাসার বড়ো প্রমাণ। আচ্ছা, কখনো প্রজা হিসেবে আমাকেও কি এতটুকু ভালোবাসবে? নিজের অর্ধাঙ্গ নয়, কেবল প্রজা হিসেবেও যদি তুমি আমায় ভালোবাসো তাহলেও বোধকরি আমি ধন্য হবো। আমি আজ বুঝতে পেরেছি, তুমি এই রাজ্য কিংবা প্রজার জন্য সব ছেড়ে দিতে পারবে। এমনকি আমাকেও! ওরা তোমার অস্তিত্বে মিশে গেছে।”
“রাজত্ব অস্তিত্বে না মিশলে রানি হওয়া যায় না। আমার সবচেয়ে বড়ো পরিচয়ই হলো, আমি রানি।”
—————
এ্যাজেলিয়া রাজ্যে দুর্ভোগের সময়গুলো তীব্রতর হচ্ছে প্রজাদের কাছে। প্রতিটি ঘরে ঘরে হাহাকার করছে দারিদ্রতা, অভাব। তার মাঝে ছড়িয়ে পড়ছে একটি ভয় ও আতঙ্ক।
রাজ্যের এক কাঠুরে জঙ্গলে কাঠ কাটতে গিয়ে আবিষ্কার করে একটি শিশুর মৃতদেহ। প্রথম অবস্থায় কাঠুরে ভীষণ ভয় পেয়ে যায়। চিৎকার করে উঠে। যেহেতু সে জঙ্গলের বেশি গভীরে ছিলো না সেহেতু অনায়াসেই তার চিৎকার শুনতে পায় আশেপাশের লোক। এরা সকলেই জড়ো হয়ে দেখে একটি নবজাতকের হৃৎপিণ্ডহীন দেহ পড়ে আছে। তীব্র পশুর মতন খুবলে খাওয়া শরীর।
সেই আতঙ্কে সকলে উপস্থিত হয় রাজ দরবারে।
যামিনী তীব্র নিদ্রায় ডুবে ছিলো। আশেপাশের কোনো বিষয় নিয়েই তার ভাবাবেগ নেই। এদিকে রাজ্যের বেহাল দশা নিয়ে তার ভেতরে উদ্বেগের ছায়াটিও দেখা যায়নি।
প্রজাদের আগমনের খবরটি নিয়ে যামিনীর কাছে হন্তদন্ত হয়ে ছুটে আসে তার খাসদাসী- শশী।
চিন্তায় বিন্দু বিন্দু ঘাম তার কপাল জুড়ে উপস্থিত হয়েছে। এসেই রানিকে দ্রুত গতিতে ডাকতে লাগল,
“রানি, উঠুন। রানি, রানি…”
গভীর রাত অব্দি মদ্যরসে নিমজ্জিত থাকায় যামিনীর মাথা ভার হয়ে আছে। চোখ টেনে মেলতে পারছে না এতই করুণ অবস্থা। তবুও যথাসাধ্য চোখ দুটি মেলে তাকানোর চেষ্টা করতে করতে শুধালো,
“হয়েছে কি? বিরক্ত করছো কেন?”
শশীর ভীত কণ্ঠ ভেসে এলো বিপরীতে,
“প্রজা দিয়ে রাজপ্রাসাদের বৈঠকখানা ভরে গিয়েছে যে! উঠুন।”
“প্রজা! ওরা রাজপ্রাসাদে কেন?” যামিনীর নিদ্রা তখনও ভাঙেনি। মস্তিষ্ক তখনও ধরতে পারিনি হয়েছে কী।
শশী এবার অধৈর্য হলো, “রানি উঠুন। প্রজারা সব রেগে একাকার। আপনি না গেলে যাকিছু ঘটতে পারে। হয়তো রাজ আসন আপনাকে ছাড়তেও হতে পারে।”
রাজ আসন ছাড়ার কথা শুনতেই রানির গভীর ঘুম ছুটে গেলে এ লহমায়। সে লাফিয়ে উঠে বসল পালঙ্কে। অবুঝের মতন তাকিয়ে বলল, “কী? রাজ আসন ছাড়বো কেন?”
“কারণ প্রজারা আপনার উপর ক্ষুব্ধ হয়ে আছেন। তাদের বেশ ক'জন নবজাতক মারা গিয়েছে। সেটার কোনো মীমাংসা আপনি করেননি। তাই তারা হয় আজ আপনার থেকে সমাধান নিবে নয়তো আপনাকে রাজ্য ছাড়া করবে।”
রাজ্য ছাড়ার কথা শুনতেই সঙ্কিত হলো যামিনী। সচকিত হয়ে বলল, “রাজ্য.. রাজ্য ছাড়তে পারব না আমি, শশী।”
রানিকে উতলা হতে দেখে শশী আশ্বস্ত করল,
“ছাড়তে হবে না। আমি আপনার সাথে আছি। আপনি গিয়ে কেবল প্রজাদের ভরসা দিন। তাহলেই হবে।”
যামিনী হয়তো আরও কিছু বলতো কিন্তু তার আগেই হ্যাব্রো প্রবেশ করল কক্ষে। তার চোখমুখ শক্ত। এসেই দাঁড়ালো যামিনীর মুখোমুখি, প্রশ্ন করল অকপটে, “নতুন দাসীটি কোথায়? ওকে গত তিন-চার দিন যাবত পাওয়া যাচ্ছে না। আপনি কিছু জানেন কি?”
Page 2
এ্যাজেলিয়ার রাজপ্রাসাদ এক সময় ছিলো তীব্র নীরবতায় আচ্ছন্ন। সুশীল, সুশৃঙ্খল বিন্যাসে সাজানো ছিলো রাজপ্রাসাদ। রানির সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা ছিলো প্রচুর। হয়তো তার প্রতি ভয় কিংবা শ্রদ্ধাতেই সব চলতো নিয়মানুযায়ী। অথচ আজকাল নিয়মের বালাই নেই রাজপ্রাসাদের একটি কোনাতেও। শ্রীহীন হয়ে পথের পাশে বুড়ো পাখিটি যেমন ঝিমুনি কাটে তেমনই ক্লান্ত, ভঙ্গুর লাগে প্রাসাদটাকে।
অবশ্য আজকের চিত্র খানিক ভিন্ন। ক্লান্ত রাজপ্রাসাদে শোরগোল প্রচন্ড। যামিনী সদ্য ঘুমন্ত মস্তিষ্ক নিয়েই প্রায় ঘোরগ্রস্তের মতন ছুটে এলো বৈঠকখানায়। সেখানে লোক পঞ্চাশ তো জমেছে বলা যায় অনায়াসেই। এত বড়ো বৈঠকখানা অথচ পুরোটা ভরে গিয়েছে লোক দিয়ে।
যামিনীর পেছন পেছন হ্যাব্রো ও শশীও এলো। যামিনী আসতেই শোরগোল আরও তীব্রতর হলো। উপস্থিত একজন বলে উঠলেন,
“রাজ্য যাচ্ছে রসাতলে আর আপনি সদ্য নিদ্রা ভেঙে এলেন? নিদ্রা আসে আপনার?”
আরেকজন বললেন, “রাজ্যটিকে কি একেবারেই ডুবিয়ে দেওয়ার চিন্তা করেছেন?”
যামিনী উদ্ভ্রান্তের মতন সকলের দিকে তাকায়। চোখের মণি ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে বুঝার চেষ্টা করে ঠিক কতজন লোক জড়ো হয়েছে আজ। খুব বেশি কি? আজই কি রাজাসন ছাড়তে হবে? এসব ভেবে ভেবে মনে মনে আঁতকে উঠে। সবকিছু নিজের আয়ত্তে আনার চেষ্টা করতে করতে বলে,
“আপনারা শান্ত হোন। আপনাদের অসুবিধার কথা শোনার জন্যই তো আমি উপস্থিত হয়েছি। একে একে না বললে বুঝবো কীভাবে?”
কণ্ঠে তার বাড়াবাড়ি রকমের নমনীয়তা। অথচ এই ফিকে নমনীয়তা চট করে ধরে ফেলবে যে কেউ। হ্যাব্রোর মতন বুদ্ধিমান পুরুষ ঠিক ধরে ফেলেছে। কিন্তু সে কিছুই বলল না। চুপ করে তাকিয়ে রইল যামিনী শেষ অব্দি কি করে তা দেখার জন্য। মনে মনে তার বিশেষ আনন্দই বোধ হলো।
লোক সমাগমের ভেতর থেকে একজন বয়োজ্যেষ্ঠ বললেন,
“আপনি রানি হয়েছেন অথচ রাজ্য কোন হালে আছে তা খোঁজ রেখেছেন? আমাদের ঘরে ঘরে নবজাতক হারিয়ে যাচ্ছে। এর কয়েকদিন পর সেই শিশু গুলোর অস্বাভাবিক মৃতদেহ পাওয়া যাচ্ছে। এগুলো কি সাধারণ ঘটনা? একটি নবজাতক পাওয়ার পরই আমাদের সাবেক রানি কামিনীকাঞ্চন উদ্ভ্রান্তের মতন খোঁজ চালানো শুরু করেছিলেন। আর আপনি এতগুলো শিশুর মৃতদেহ দেখার পরেও নির্বাক! তার উপর ছোঁয়াচে সেই রোগটি বাড়ছেই। কোথায়, কোনো প্রচেষ্টাতো দেখছি না আপনার সেই অসুখ থেকে রাজ্যবাসীদের বাঁচানোর।”
যামিনীর মস্তিষ্ক উত্তপ্ত হতে থাকলো। তাকে কি-না তুলনা করছে রানি কামিনীকাঞ্চনের সাথে? অথচ এই রাজ্যবাসী না আগে সেই রানির ভয়ে কাঁপতো? পিঠ পেছনে কত বাজে কথা, শাঁপ ছুঁড়তো? এত নিমকহারাম এগুলো!
আরেকজস লোক বয়োজ্যেষ্ঠ মানুষটার কথায় সম্মতি দিয়ে বললেন, “একদম সঠিক বলেছেন। আজকাল তো মনে হচ্ছে আমাদের রানির সাথে সাথে রাজ্যের লক্ষ্মী হারিয়ে গিয়েছে। নিজের রাজ্যটিকে আর পরিচিত লাগে না। ঘরের কন্যাদের, বধূদের নিরাপত্তা নেই। নিরাপদ নেই নবজাতকেরা। রাক্ষুসে রোগ ভয়ঙ্কর থেকে ভয়ঙ্কর হয়ে প্রাণ নিচ্ছে আমাদের। অথচ বর্তমান রানি আরাম করে নিদ্রা যাপন করছেন! একেই বোধহয় বলে হাতের লক্ষ্মী পায়ে ঠেলা। আমরা সেই রানির মর্ম হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছি এখন।”
যামিনী আর সহ্য করতে পারলো না নিজের এত অপমান। তার চেয়ে বেশি তার কাছে অসহ্য লাগলো রানি কামিনীর এই গুণগান।
সে ক্ষুব্ধ হলো, বিক্ষিপ্ত ভঙ্গিতে বলল,
“সাবধান, আমার রাজ্যে, আমার প্রাসাদে দাঁড়িয়ে আপনারা আমাকে হেয় করছেন? আমার সাথে অন্য একজনের তুলনা করছেন? ভুলে যাবেন না আমি এ রাজ্যের রানি।”
“আপনি যাকে অন্য একজন বলছেন, তিনিই আপনাকে এই প্রাসাদে এনেছিলো আপনি নিজেও তা ভুলে যাচ্ছেন। তাছাড়া আপনি রানি হওয়ার পর কোন দায়িত্ব পালন করেছেন? আপনি দায়িত্ব পালন করলে আজ আমাদের রাজপ্রাসাদে আসতে হতো না। কোথায়, আগে তো কখনো আসিনি!” উপস্থিত লোকটির কথায় যামনী তার রাগ সংবরন করার শক্তি যেন ক্রমশ হারাতে লাগল।
পরিস্থিতি হাতের নাগালের বাহিরে চলে যাচ্ছে দেখে শশী যামিনীর দিকে তাকিয়ে ইশারা করল। শান্ত হতে বলল। আজকের রাগ তাদের বড়ো ক্ষতি করে দেবে সেটা বুঝালো। যামিনী সেই ইশারা বুঝতে পারল। গিলে নিলো তার ফুটন্ত রাগ। গিলে নিলো সমস্ত বাজে কথা। চোখ বন্ধ করে বড়ো বড়ো শ্বাস ফেলল বার কয়েক।
এরপরেই তার কণ্ঠের বদল ঘটল। এক পলকেই তার অগ্নিমূর্তি শান্ত হয়ে গেল। জলের মতন সরল স্বরে সে বলল,
“আপনাদের এই উতলা, দোষারোপ ভুল নয়। ঠিকই বলেছেন আপনারা। ইদানিং রাজ্যে নিরাপত্তার খামতি দেখা গিয়েছে। আমি নিজেও তাই নিয়ে উদ্বেগ। সে জন্য সারা রাত্রি আমার নিদ্রা হয় না। এইতো প্রাতঃকালে সেসব নিয়ে ভাবতে ভাবতেই সবে চোখ দু'টি লেগে ছিলো। আপনাদের এই দুঃখ কি আমায় ছুঁতে পারছে না বলুন? আমার আহার, নিদ্রা সকলই যে ভুলতে বসেছি।”
“আহার-নিদ্রা ভুললেই তো সমাধান হবে না। আমাদের তো সমাধান চাই। আমাদের নিষ্পাপ শিশুগুলোকে নিয়ে আমরা এখন আতঙ্কে কাটাচ্ছি দিন।”
যামিনী শান্ত চোখে এবার সেই কথা বলা ব্যক্তিটির দিকে তাকালো। চোখ দিয়ে ভস্ম করে দেওয়ার ক্ষমতা থাকলে সে বোধহয় তা-ই করতো। কিন্তু সে ক্ষমতা নেই বলেই এই কড়া কথা তাকে হজম করতে হলো,
“আমাকে দু'টি দিন সময় দেন। আমি সমাধান করবো অবশ্যই। তাছাড়া দাতব্যচিকিৎসালয়ের কাজ তো প্রায় শেষ দিকে। আপনাদের চিকিৎসার জন্যই তো এই ব্যয় করে সেই চিকিৎসালয় নির্মাণ করা হয়েছে। তারপরেও আমি আজ দোষী আপনাদের কাছে?”
যামিনীর বিষণ্ণ কণ্ঠে মানুষের মন গললো। তারা যেই রাগ নিয়ে এসেছিলো তা নিভে এসেছে। তবুও বয়োজ্যেষ্ঠ লোকটি দমতে নারাজ,
“এটিও তো রানি কামিনীকাঞ্চনেরই আদেশে তৈরি হচ্ছিলো। তিনি দয়া করেছিলেন দেখে চিকিৎসালয় হচ্ছিল।”
যামিনী চোখ ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে প্রতিটি মানুষের মুখ ভালো করে খেয়াল করল। কে কে তার বিপরীতে এমন কঠোর কঠোর কথা গুলো বলছে সে তা ঠিক মনে রাখলো। কিন্তু প্রকাশ্যে রইল ভাবনাতীত নম্র,
“তা ঠিক। তা অস্বীকার করি না। আপনারা ধৈর্য ধরুন, সব ঠিক হয়ে যাবে। আমাকে কিছু সময় দিন।”
প্রত্যেকে এবার আরও নিভে গেলো। সবাই যামিনীকে সময় দেওয়ার পক্ষে মত রাখলো। যেই ভয়ংকর ঝড় তার দিকে ছুটে এসেছিলো, সেই ঝড় সে নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে নিলো কায়দা করে।
উপস্থিত লোকগুলো যামিনীকে পুনরায় ভরসা করল আবারও। সময় দিয়ে, কুর্নিশ করে বেরিয়ে গেলো। যামিনীও নিজের সমস্ত ভদ্রতা নিয়ে হাত জোর করে রেখে সকলকে বিদায় জানালো। বৈঠকখানা খালি হলো কিছু সময় ব্যবধানেই। বড়ো করে শ্বাস ফেলল সে। যা ভয় পেয়েছিলো! এই রাজাসন ছাড়ার মতন ভয়াবহ দুর্যোগ সে যে তার জীবনে চায় না। তাই ঠিক করল অন্য বুদ্ধি। তার খাসপ্রহরীকে ডাকলো তারস্বরে,
“প্রহরী দ্বৈতনাথ, এদিকে আসো শীগ্রই।”
রাজ বৈঠকখানার কপাটেই দাঁড়ানো ছিলো প্রহরী। যামিনীর আদেশ পেতেই ছুটে এলো। দাঁড়ালো এসে মাথা নিচু করে। বলল, “আজ্ঞা করুন, রানি।”
বৈঠকখানায় তখন তারা চারজন। শশী, হ্যাব্রো, দ্বৈতনাথ ও যামিনী। এবং এদের সকলকেই সে নিজের মানুষ বলেই জানে। তাই বেশ সাবলীল ভাবে আদেশ করে বলল,
“আজকে উপস্থিত সবার ভেতরে তিনজন অধিক তর্ক করেছে। আমার মুখের উপর আঙুল তুলে কথা বলেছে। সেই তিনজনের উপর নজর রাখো। তাদের সর্বোচ্চ শাস্তি আমি নিশ্চিত করব। আমার মুখের উপর কথা বলার অধিকার কারো নেই। সেই সাহস কেউ করবে না আর।”
এতক্ষণ হ্যব্রো চুপ করে সবটা পর্যবেক্ষণ করলেও যামিনীর এহেন কথায় চমকে উঠল। অবাক না হয়ে পারল না। সে যত যামিনীকে দেখছে ততই অবাক হচ্ছে। এ কোন যামিনী? যেই অসহায় যামিনীকে একদিন পথের বাঁকে কাঁদায় মাখামাখি হয়ে পড়ে থাকতে দেখে ও আর রানি কামিনী উঠিয়ে এনেছিলো এ সেই যামিনী? যে চোখের দিকে তাকিয়ে কখনো কথা অব্দি বলতো না এ সে? যে একটি পাখি ব্যাথা পেলেও আঁতকে উঠতো, এ কি আদৌ সে যামিনী আছে?
মনের ভেতরে থাকা হ্যাব্রোর এই প্রশ্নগুলোর একটিই উত্তর ভেসে এলো— না, না, না, এ সে যামিনী নয়। এ যামিনীর হৃদয় পাথর হয়ে গিয়েছে। এ যামিনী আর সাধারণ মানুষটি নেই। এ বদলে গেছে। ভীষণ ভীষণ বদলে গেছে।
নির্দোষ মানুষগুলোর ক্ষতির পায়তারাকে হ্যাব্রো যে কখনোই সফল হতে দিতে পারে না। তাই সে বাঁধ সাধলো, “কিন্তু ওদের ক্ষতি হওয়া মানেই রাজ্যবাসীর জেনে যাওয়া যে আপনি ভালো কথার অন্তরালে মূলত ভয়ঙ্কর ছলনা লুকিয়ে রেখেছেন!”
হ্যাব্রোর কথায় তাকালো যামিনী। আজকাল হ্যাব্রো তার সিদ্ধান্তে মতামত পেশ করছে। তার মানে তাকে ভালোবাসছে! আগে তো কখনো মতামত দিতো না।
যামিনীর নীরবতা ঠিক সহ্য হলো না হ্যাব্রোর। সে আবার বলল,
“আপনি সিদ্ধান্ত ভেবে নিয়েছেন তো? ওরা কিন্তু পরে ঠিক বুঝে যাবে আপনি কী!”
এবার যামিনীর চোখ-মুখে মৃদু হাসির রেখা দেখা দিলো, “আমি তো চাচ্ছিই তা জানাতে। ওরা জানুক, বুঝুক আমি কে। ওর আমায় তীব্র ভয় পাক। এতটা ভয়, যতটা ভয় পেলে আমার মুখের সামনে আঙুল তুলে কথা বলতে পারবে না। রাজপ্রাসাদ অব্দি এসে জবাবদিহিতা চাইতে পারবে না।”
হ্যাব্রো আর কিছু বলল না। অবাক হয়ে কেবল যামিনীকে দেখলো। দিন দিন যামিনীর এই তীব্র, বিষাক্ত রূপ তাকে স্তব্ধ করছে। এই যামিনীকে কীভাবে আটকাবে সে? যামিনী যে সকল ভয়ের উর্ধ্বে চলে যাচ্ছে!
—————
ক্যামিলাসের রাজপ্রাসাদ জুড়ে যেসব রূপকথার মতন মিথ্যেকে সাজানো হয়েছিলো থরে থরে। সেসব মিথ্যে আজকাল কাঁপছে তাসেরঘরের মতন। যেকোনো মুহূর্তে ভেঙেচুরে একাকার হয়ে যাওয়ার অভিপ্রায়। সকল গুটি রানি সাজাচ্ছেন একে একে। ধীরে ধীরে তিনি পতনের নামতা গুনছেন।
রানির ঘোমটার আড়ালে থাকা ঠোঁটটা আজকাল দেখা যায়। নাক অব্দি ঘোমটাটুকু দেওয়া থাকে। সেই আধ ঘোমটা নিয়েই তিনি তার সমস্ত অলংকারের শব্দ তুলে হাঁটছেন। পেছন পেছন হাঁটছে রাজবৈদ্য। হাঁটতে হাঁটতে তারা এসে দাঁড়িয়েছে হ্যাভেনের কক্ষের ঠিক সামনেটায়। বাঁশির সুরে মাতোয়ারা কপাটের কোল। বাতাসে ছড়াচ্ছে মুগ্ধতা। সেই সুর, সেই তাল! যা শুনে বহু বহু দিন আগে একদিন রানি বেড়িয়ে এসেছিলেন নিজের প্রাসাদ ছেড়ে। দেখা পেয়েছিলেন এই রাজার। যে ছদ্মবেশে হানা দিয়েছিলো তারই রাজ্যে। কী মধুর সুর রাজার! অথচ ছলনায় আচ্ছন্ন ছিলো তার দেহ। আজ আবার এতদিন পর সেই সুর শুনতে পেয়ে কিঞ্চিৎ তো স্মৃতি নড়চড় হবেই।
রাজবৈদ্য ঠাঁই দাঁড়িয়ে রইল রানির আদেশ পাওয়ার অপেক্ষায়। রানি বাঁশির সুর থেকে নিজের মনকে সংযত করলেন। রাজ্য বৈদ্যকে ধারালো স্বরে জিজ্ঞেস করলেন,
“কোনো উন্মাদ মানুষ কি এভাবে সুর তুলতে পারে?”
রানির মনের সংশয় রাজবৈদ্য ধরতে পারল। উত্তর দিলো, “পারেন। এগুলো শৈল্পিক গুণ। মস্তিষ্কের অসুস্থতা গুণ মুছতে পারে না।”
রানি মাথা নাড়ালেন। তবে তার মন বলছে অন্য কথা। মস্তিষ্কের অসুস্থতা আদতেও অসুস্থতা কি-না তা নিয়ে তার বিরাট সংশয়। বললেন,
“ঠিক আছে। উনার কক্ষে গিয়ে একটু ভালো করে উনাকে খেয়াল করবেন। আপনি নিশ্চয় অসুস্থতা ধরতে পারবেন তার মতিগতি দেখে?”
রাজবৈদ্য মাথা নাড়িয়ে সম্মতি দিতেই প্রহরীদের কপাট খুলতে বললেন রানি। প্রহরীরা হ্যাভেনের কপাট খুলতেই সচকিত হয়ে হ্যাভেন তাকাল। বন্ধ হয়ে গেলো তার বাঁশির সুর।
রানি প্রবেশ করলেন প্রথমে। হ্যাভেন কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল রানির দিকে। এরপর হুট করে শান্ত, শীতল থেকে হয়ে উঠলো দিশেহারা। আপ্রাণ চ্যাঁচামেচি করতে লাগল।
“বেরিয়ে যাও। বেরিয়ে যাও। তুমি কে? এসেছো কেন? মেরে ফেলবে আমায়? বেরিয়ে যাও।”
রানি মোটেও বিচলিত হলেন না। ঠাঁই দাঁড়িয়ে তীক্ষ্ণ চোখে তাকিয়ে রইলেন হ্যাভেনের দিকে।
রানির একই ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে থাকাটা হ্যাভেনকে আরও দিকভ্রান্ত করল। সে তেড়ে এলো মারতে।
তার সুঠাম পেশীবহুল হাত, মুষ্টিবদ্ধ করে আঘাত আনার আগ মুহূর্তে রানির হাত দু'টো আঁটকে দিলো হ্যাভেনকে। হ্যাভেনের তীব্রতম শক্তির সাথে রানির পেরে উঠার কথা নয়। অথচ রানি অকপটেই নিজের দু'হাতে হ্যাব্রোর হাত আটকে রাখলো।
রাজবৈদ্য সে দৃশ্য দেখে চরম আশ্চর্য হলো। একজন নারীর এত শক্তি সে যে আগে কখনো দেখিনি!
রানি এবার প্রহরীদের ডাকলেন। আদেশ করলেন হ্যাভেনকে বাঁধার। সেই আদেশ শুনে হ্যাভেন আরও আরও হম্বিতম্বি করতে লাগলো।
তার শোরগোলে সকলে ছুটে আসতে চাইলেই রানির বজ্রকণ্ঠের নিষেধাজ্ঞা জারি হলো,
“একজনও এই কক্ষের কপাটে পা ফেলবেন না। ওখানেই থামুন সকলে।”
রাজমাতা, মামাশ্রী, পিতৃব্য, রানি ইথুন, রাজকন্যা লিলি, হেমলক… সকলই থেমে গেলো। কারও সাহস হলো না নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে পা ফেলার। কারণ রানির কণ্ঠই এতটা শক্তিশালী ছিলো।
রানি ইথুন কপাটের ওপাড় থেকেই উৎকণ্ঠা দেখালো, “কী করছো, হেমলক বধূ? ও আমার স্বামী। তারচে বড়ো কথা এ রাজ্যের রাজা..”
কথা সমাপ্ত করতে দিলেন না রানি, “রাজা নন উনি এখন৷ ভুলে যাচ্ছো, আমি এই রাজ্যের রানি বর্তমানে। রাজা হওয়ার হলে তা হবে আমার অর্ধাঙ্গ— হেমলক পিয়ার্স। বাক্যে লাগাম টানো।”
ইথুন হতভম্ব হয়ে গেলো। তাকালো রাজমাতার পানে।
রাজমাতার চোখগুলো লাল হয়ে গিয়েছে। চাপা ক্রোধে তিনি রানির দিকে তাকিয়ে আছেন। হেমলক রাজমাতার চাহুনি বেশ উপভোগ করল। যদিও তার এই রাজ্যের আসনের প্রতি তেমন টান ছিলো না কোনোকালেই কিন্তু রাজমাতার এই মুখটি দেখার জন্য না-হয় টানটুকু দেখাবেই। বহুবছর এই আসনের লোভে কম তো কাহিনি রটালেন না এই রাজমাতা। এখন যে খেলা ঘুরে গিয়েছে! কেমন লাগছে উনার তা?
প্রহরীরা হ্যাভেনকে বাঁধতে বাঁধতেই রানি সরে এসে দাঁড়ালেন রাজবৈদ্যর পাশে। খুব সাবধানে শুধালেন, “কী বুঝছেন? মস্তিষ্কের সত্যিই কি অসুস্থতা আছে?”
রাজবৈদ্য রানির কর্মকাণ্ড দেখতে দেখতে ঘোরে চলে গিয়েছিলো। রানির প্রশ্নে তার ঘোর কাটে, “আছেই তো মনে হচ্ছে। উন্মাদ না হলে এমন করতেন না।”
রানি কুটিল হাসলেন রাজবৈদ্যর অপরিপক্বতায়, “তাই? আপনি রাজবৈদ্য, শরীর সম্পর্কে আপনার জ্ঞান বেশিই থাকবে। তবে আমি একটু মানসিক ভাবে আপনাকে দেখাচ্ছি। আপনি দেখুন তো উনার চোখগুলো, কেমন ক্রোধে জ্বলজ্বল করছে না? কোনো পাগলের চোখে ক্রোধে এমন রহস্য কি থাকে? বলুন?”
রাজবৈদ্য এবার সত্যি সত্যি খেয়াল করে দেখলো, ঠিকই তো! হ্যাভেনের চোখের ক্রোধ কোনো অসুস্থ মানুষের মতন নয়! এই ক্রোধে যেন প্রকাশ পাচ্ছে বিস্তর জল্পনা-কল্পনা।
·
·
·
চলবে……………………………………………………