কামিনী - পর্ব ৪৮ - মম সাহা - ধারাবাহিক গল্প

কামিনী - মম সাহা
          রাজকন্যা লিলির কক্ষ সবসময় থাকে প্রায় আবছায়া অন্ধকারে ঘেরা। প্রাসাদের কোথাও তার চঞ্চল ছায়া নেই বহুদিন। একটি কক্ষকেই সে তার সমগ্র পৃথিবী বানিয়ে ফেলেছে অনেকদিন হলো। 
 আজ লিলির শারীরিক অসুস্থতা একটু গুরুতর। হাতের তীব্র যন্ত্রণায় ছটফট করছে। প্রায়ই তার এমন হয়। হাতের যন্ত্রণায় সে নড়তে চড়তে পারে না। 

তার কক্ষে উপস্থিত তার মাতা, মামাশ্রী, তার ভ্রাতা হেমলক ও রানি কামিনী। লিলি ছটফট করছে এতটাই যে রাজমাতা তাকে শান্ত করতে পারছেন না। লিলি মুচড়ে ফেলছে বারে বারে তার শরীরটা বিভিন্ন ভঙ্গিমায়। 
 রাজমাতা নিজের মেয়েকে নানান কথায় শান্ত রাখার আপ্রাণ চেষ্টাটুকু করছেন।

“রাজকন্যা আমার, চাঁদ আমার, ধৈর্য ধরো আমার কন্যা। তোমার সুস্থতা মিলবে। একটু অপেক্ষা করো। রাজবৈদ্য একটা ব্যবস্থা করবে।”

  সেই শুকনো সান্ত্বনায় থামে না লিলি। জোরে জোরে চিৎকার করতে থাকে। চিৎকার করতে করতে মনের ক্ষোভ ঢালে,
“ঐ হিংস্র রানিকে এমন ভয়ংকর মৃত্যু দেওয়া যেতো যেন মৃত্যুও ভয় পেয়ে যায়, তবেই বোধহয় আমার আত্মার সন্তুষ্টি মিলতো।”

রাজমাতা আশকারা দিলেন মেয়েকে, “ঠিক বলেছো কন্যা আমার। কিন্তু আনন্দের বিষয় হলো ধরণীতে তার চিহ্নটুকুও নেই। তার কতটা খারাপ ভাগ্য ভাবো যে তার মৃত্যু তার প্রজারা অব্দি দেখতে পেলো না! তার মৃতদেহটি অব্দি রাজ মর্যাদায় দাহ্য হলো না।”

তাদেন কথোপকথন এতটাই স্পষ্ট এবং পরিষ্কার যে সেই সকলই শুনতে পারছেন রানি অনায়াসেই। হেমলকের বিশেষ পছন্দ হলো না এসকল কথা। পছন্দ না হওয়াই অবশ্য যৌক্তিক। যেই মানুষ জীবিত এবং তার সঙ্গে সংসার করছে তার নামে এমনটা কেই-বা শুনতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করবে?
হেমলক তীব্র প্রতিবাদ করল, “থামুন দু'জনেই। এমন খারাপ সময়েও অন্যকে নিয়ে কথা বলতে হবে?”

 “কেন কথা বলব না, পুত্র? রানি কামিনীকাঞ্চন কি তোমাকে একেবারেই অন্ধ করে দিয়ে গিয়েছেন? তুমি দেখছো না তোমার ভগিনী কতটা কষ্ট পাচ্ছে?” হেমলকের প্রতিবাদে রাজমাতার তীব্র ক্রোধ হানা দিলো যেন।

“আজকে ও যেটা ভোগ করছে সেটা ওরই কর্মফল নয় কি?” 

“তুমি একটু বেশিই বলছো না?” প্রশ্ন করেই রাজমাতা প্রাচী তাকালেন হেমলকের। 
 
এতটা সময় নীরবেই রানি পর্যবেক্ষণ করলেন কথার এই ঘাত-প্রতিঘাত। এবার আর তার অগ্নির ফুলকির ন্যায় ব্যক্তিত্ব তাকে চুপ থাকতে দিলো না। হেমলককে শেষ কথাটির উত্তর দিতে না দিয়েই, নিজে থেকে বললেন,
 “মোটেও বেশি বলছেন না উনি। বরং সঠিকই বলছেন। আপনাদের কৃতকর্মের ফলই আপনারা ভুগছেন। শুনেছিলাম আপনার কন্যাই নাকি প্রথমে হিং স্রতা দেখিয়েছিলো? সেদিন যদি আপনার কন্যা তার কণ্ঠে ও শব্দে লাগাম টানতো তবে আজ তার এই গতি কি হতো? বয়স তো সামান্যই তার কিন্তু কথার ভঙ্গিমা দেখুন! এতকিছুর পরেও তার না সেদিনের জিভে লাগাম টেনেছিলো আর না আজ টানছে। কখনো কখনো লাগাম টানা ভালো, নিজের জন্য।”

রানির কাঠ কাঠ কথা বিঁধলো গিয়ে রাজকন্যার শরীরে বিষের মতন। সে ক্রোধে জ্বলন্ত নয়ন যুগল নিয়ে ঘোমটার আড়ালে থাকা রানির দিকে তাকিয়ে উচ্চস্বরে বলল,
“বেরিয়ে যান আমার কক্ষ থেকে। এখুনি বেরিয়ে যাবেন। আপনার কথাগুলো আমার সহ্য হয় না। ঐ অহংকারী রানি আর আপনার মধ্যে আমি মাঝে মাঝে পার্থক্য খুঁজে পাই না।”

 রাজকন্যার এই উচ্চস্বর রানির শরীরের সহ্য হলো না ঠিক। তার উপরে কেউ কথা বললে তার কখনোই সহ্য হয় না যে! তিনি এগিয়ে এলেন রাজকন্যার দিকে কিছুটা। খানিক ঝুঁকে ঘোমটার ফাঁকে তাকালেন লিলির দিকে। লিলি যদিও রানির জ্বলন্ত দু'টি চোখকে দেখতে পেলো না তবুও গরম শ্বাস অনুভব করল ঠিক। 
 রানি ক্রোধ চেপে, রক্তহিম করা কণ্ঠে বললেন, 
“রানি কামিনীকাঞ্চন তোমার হাতটি কে টে ছিলেন। আমি সোজা গর্দান নেবো। তার আগে কা ট বো জিভটা। ছাড় কিন্তু মানুষ বার বার পায় না।”

রানির সাবধান করার ভঙ্গিমায় লিলি তাজ্জব হয়ে গেলো। বিস্ময়ে চোখ দু'টি তার অস্বাভাবিক বড়ো হলো। রানি অপেক্ষা করলেন না আর কোনো উত্তরের। টান টান দেহ ভঙ্গিমায় বেরিয়ে গেলেন কক্ষ ছেড়ে। পেছন পেছন ঠিক চলে গেলো হেমলকও। 
 যেহেতু রানি ফিসফিসিয়ে কথা বলেননি তাই কার সাবধানী বাক্যগুলো রাজমাতা ও মামাশ্রীরও কর্ণগোচর হলো। 

রাজমাতা মামাশ্রীর দিকে তাকাতেই মামাশ্রী শান্ত থাকার ইশারা করলেন।
 লিলি আরও উদ্ভ্রান্ত হয়ে গেলো। সেই মুহূর্তেই কক্ষে প্রবেশ করল রাজবৈদ্য। লিলিকে এমন উন্মাদের মতন করতে দেখে সে রাজমাতাদের বেরিয়ে যেতে বলল, আশ্বস্ত করে। রাজমাতা নিজের কন্যার দিকে একবার তাকিয়ে বেরিয়ে গেলেন। তার ইচ্ছে করছে হেমলকের বধূকে চিরতরে শেষ করে দিতে কিন্তু পারছেন না। উত্তেজনায় তার মুখ লাল হয়ে গেলো প্রায়।

 রাজবৈদ্য লিলির কাছাকাছি আসতেই লিলি আরও বেশি খ্যাপাটে হলো, 
“বের হও আমার কক্ষ থেকে। আমি তোমাকে আদেশ করছি বেরিয়ে যাবার।”

  রাজবৈদ্য লিলির আদেশ শুনলো না মোটেও। বরং আয়েশ করেই এসে দাঁড়ালো লিলির নিকটে। লিলির হাতটা ধীরে টেনে নিয়ে কিছু জড়িবুটি লেপন করে দিতে লাগলো তার অর্ধেক হাতটিতে। 
লিলি টানাটানি করল হাত। রাজবৈদ্যের শক্তির কাছে তার সামান্য শক্তি হেরে গেলো বাজে ভাবে। এতে তার মনের অসুখ আরও বাড়লো। রাগে স্তব্ধ হয়ে গেলো। 

রাজবৈদ্য লিলির সেই থমথমে, স্তব্ধ মুখটির দিকে এক পলক তাকিয়ে তার কাজ চালিয়ে যেতে যেতে বলল,
“ক্রোধ সবসময় ভালো কিছু বয়ে আনে না। মন স্থির করুন। আপনার হাতের যন্ত্রণা ততদিন কমবে না যতদিন না মনের সকল রাগ, ক্ষোভ বের করছেন।”

  লিলি লাল হয়ে যাওয়া চোখগুলো রাজবৈদ্যর দিকে স্থির করল। আগের উত্তেজনা তার কমে গেলো এই অদ্ভুত জড়িবুটিতে। এর আগে কখনো এতটা শান্তি সে পায়নি। কণ্ঠের তেজ থিতিয়ে গেলো। ঢিমে স্বরে বলল, 
“আমার সাথে অন্যায় হয়েছে আমি তা চিৎকার করে বলবো না?”

 “অন্যায় হয়েছে না আপনি অন্যায় করেছেন তা আগে মনকে প্রশ্ন করুন। দেখুন তো মন কী বলে?” রাজবৈদ্য পিউলের কণ্ঠস্বর একদম স্বাভাবিক, ঠান্ডা, স্থির। লিলি লম্বাটে, পুরুষালী মুখটির দিকে তাকায়। তার বুকের ভেতর প্রশ্ন জাগে… রাজবৈদ্য তাকে একটু বিশেষ আহ্লাদ করছে না? আদুরে স্বরে সামলাচ্ছে না? নাকি সে ভুল বুঝছে? 
 দেহের আরাম ও স্বস্তিতে লিলির মস্তিষ্ক আরও ঠান্ডা হয়ে যায়। চোখবুঁজে ফেলে সে। কথা বাড়ায় না। অনেকদিন হলো চোখে নিদ্রা আসে না। আজ বড়োই নিদ্রা পাচ্ছে। এই নিদ্রাকে সে অবহেলা করতে পারছে না। তার ঘুম প্রয়োজন, অনেক ঘুম। 

পিউল লিলির ঘুমন্ত মুখটির দিকে একপলক তাকিয়ে হাসলো। জড়িবুটির ব্যবহার সে এত দারুণ ভাবেই রপ্ত করেছে যে, কাকে, কীভাবে থামিয়ে ফেলতে হয় তা এখন এক মুহূর্তের ব্যাপার হয়ে গিয়েছে। নিদ্রাহীনতায় লিলির উগ্রতা এত বেড়েছে তা তার বিশেষ খাটুনি করে বুঝতে হয়নি। তাই ব্যথা সেরে উঠার সাথে সাথে লিলির ঘুমেরও ব্যবস্থা করে দিলো।

লিলি ঘুমাতেই কক্ষ ছেড়ে বের হলো পিউল। কক্ষের বাহিরে দাঁড়িয়ে ছিলেন রাজমাতা। উঁকি দিয়ে নিজের কন্যাকে এত শান্তিতে ঘুমাতে দেখে আপ্লূত হয়ে গেলেন। মনে মনে রাজবৈদ্যের গুণের প্রশংসাও করলেন। এমন গুণ সকলের যে হয় না!

—————

 হেমলক একটি চিত্র আঁকায় নিমগ্ন। ও যখন চিত্র আঁকতে নেয় তখন দিনদুনিয়া যেন ভুলে যায় নিমিষেই। ডুবে যায় তার শিল্পতে আনমনে। 
রানি হেমলকের পেছনেই পায়চারি করছেন। একবার হেঁটে পূর্বে যাচ্ছেন তো আরেকবার পশ্চিমে। চিত্রে বিভোর হেমলকের ধ্যান চ্যুত হচ্ছে বারংবার। রানির অলংকারের শব্দ, দেহের অদ্ভুত সুবাস তার মনোযোগে বিঘ্ন ঘটাচ্ছে কেবল। সবশেষে চিত্র আঁকা স্থগিত করে সে রানির দিকে তাকালো। 

রানির মুখটিতে চিন্তার রেশ। ভাবুক চোখগুলো বার বার পলক ফেলছে। মণিগুলো এদিক সেদিক ঘুরিয়ে কী যেন খুঁজছেন। হেমলক সে দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করল, “কী সমস্যা? আমায় বলো। চিন্তিত লাগছে তোমায় বড়ো!”

 রানির ব্যস্ত পদচারণে বিরতি মিললো। তিনি তাকিয়ে বোধহয় ভাবলেন তার সমস্যার কথাটি হেমলককে বলা যায় কি-না! 
হেমলক সেই ভাবনাটি চট করেই বুঝে ফেললো। তুলিতে আবার রঙ নিলো। নিজের চিত্রটির দিকে মনোনিবেশ করতে করতে বলল, “এতটাও অবিশ্বাস করো না। দুঃখ হয় তোমার অবিশ্বাস পেলে। আমাকে বোধহয় একটু আধটু বিশ্বাস করা যায়।”

 মায়াময় কণ্ঠে অসহায়ত্বের ছোঁয়া লোকটার। 
রানিরও হেমলকের সাহায্য প্রয়োজন একটু। তাই তিনি ঠিক করলেন তার সমস্যার কথাটি হেমলককে বলবেন। 

 “গত পরশু রেবেকার পত্র পেলাম যে, সে নাকি যামিনী সম্পর্কে দুর্দান্ত কোনো সংবাদ পাঠাবে। খোঁজ নিয়ে আসবে আমার কাছে। অথচ আজ দু'টো দিন হলো তার কোনো নামনিশানা নেই। আমার মন বলছে খারাপ কিছু হয়েছে।”

  রানির কথা থামতেই ভ্রু কুঞ্চিত করল হেমলক, 
“আমায় আগে বলতে! তাছাড়া ওর সাথে একজন প্রহরীও তো পাঠিয়ে ছিলাম। খারাপ কিছু হলে প্রহরী জানাতো না?”

“বুঝতে পারছি না। রেবেকা পত্রতে বলেছিলো রাতে কিছু করবে যামিনী। সে তা খোঁজ নিয়ে আসবে। আসলো না তো এখনো!”

রানির দুশ্চিন্তা দেখে হেমলক উঠে দাঁড়ালো। রানির কাছে এসে রানিকে আশ্বস্ত করে বলল,
“চিন্তা করো না। আমি দেখছি।”

  অদ্ভুত ভাবে ঠিক তখনই এ্যাজেলিয়া রাজ্যের প্রহরীর আগমন ঘটলো। অনুমতি নিয়ে হন্তদন্ত হয়েই কক্ষে প্রবেশ করলো। তার ভীত চোখ, কম্পনরত পা দেখে রানির ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় ঠিক ধরে ফেলল কোনো খারাপ সংবাদ রয়েছে। 
·
·
·
চলবে……………………………………………………

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

WhatsApp