বসন্তের সকাল। গ্রামে বোরো ধান কাটার হিড়িক পড়েছে। দাদাজানের ত্রি-তল নিবাসের বিশাল উঠোনে সুর ব্যঞ্জক বাদ্যের মতোন গমগম আওয়াজ তুলে চলছে ধান মাড়াইয়ের কাজ। বাতাসে কাঁচা ধানের সৌরভ। হাতিশালের মক্তব থেকে ভেসে আসছে শিশুদের সমস্বর চিৎকার। কোমল স্বরে তাদের আরবি হরফ মুখস্থ করাচ্ছে মিশকাত।
ছাতিম গাছের মাথায় চড়চড়ে রোদ উঠেছে। শীত এখনও পুরোপুরি বিদেয় না হলেও বেশিক্ষণ রোদে থাকলে গা জ্বালা করে। গায়ের শীত চাদরটা একপাশে ফেলে রেখে গাছের ছায়ায় একটা হাতাওয়ালা চেয়ারে বসে আছেন দাদাজান। মাঝে মাঝে মুখ তুলে তাকিয়ে ধান মাড়াইয়ের কাজের তদারকি করছেন। তাঁর থেকে একটু দূরত্ব রেখে বেতের মোড়ায় আসন পেতেছেন গ্রামের কয়েকজন প্রবীণ। তাদের কারো কারো হাতে পানির বোতল। আলাপচারিতা শেষে ফেরার পথে দাদাজানের থেকে ঔষধ নিয়ে যাবে এমনই তাদের বাসনা। ইশতিয়াকের চার চাকার গাড়িটা ফটক পেরিয়ে দক্ষিণের মস্ত কামরাঙা গাছের তলায় এসে থামতেই তারা সকলে ঘাড় ফিরিয়ে তাকালেন। ইশতিয়াক গাড়ি থেকে নেমে আদবের সাথে দাদাজানের কাছে গিয়ে দাঁড়াল। একটু ঝুঁকে তাঁর পা ছুঁয়ে সালাম করে বলল,
‘ আপনার শরীর ভালো, দাদাজান?’
দাদাজান গম্ভীরমুখে মাথা নাড়লেন। ইশতিয়াককে দাদাজানের পাশে দাঁড়াতে দেখেই একটা চেয়ার নিয়ে ছুটে এলো চৌকিদার মনসুর। ইশতিয়াক হাতের ইশারায় তাকে থামিয়ে দিয়ে সকলের থেকে বিদায় নিয়ে ভেতর বাড়ির দিকে হাঁটতে লাগল। প্রতি শুক্রবার দাদাজানের হাসপাতালে বসতে হয় তাকে। সকাল নয়টা থেকে রাত আটটা— টানা এগারো ঘন্টা বিনামূল্যে রোগী দেখা তার কাজ। আগে অবশ্য এতো দায়িত্ব ছিলো না। ভাই-বোনদের সঙ্গে বাড়ি এলে টুকটাক রোগী দেখত ইশতিয়াক। কিন্তু হাতের যশ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বেড়ে গিয়েছে দায়িত্বের চাপ। তাছাড়া কয়েকমাস হলো হাসপাতালে ছোটখাটো একটা অপারেশন থিয়েটার চালু করেছেন দাদাজান৷ ইশতিয়াকের মা আর আগের জেনারেশনের দুই-একজন ভাই-বোন হাসপাতালের দায়িত্বে থাকলেও ইশতিয়াক তাদের মধ্যে একমাত্র সার্জন। প্রতি শুক্রবারে তাকে একের পর এক অপারেশন চালিয়ে যেতে হয়। ইশতিয়াক লম্বা লম্বা পা ফেলে বারান্দা পেরিয়ে বসার ঘরে ঢুকতেই চোখ পড়ল আলুথালু মৌনির উপর। বাম পায়ে বেঢপ ধরনের ব্যান্ডেজ। পরনে ঢিলাঢালা একটা শার্ট, যা মৌনির মোলায়েম কাঁধের সীমানা পেরিয়ে নেমে আসতে পারে যেকোনো সময়। ইশতিয়াক একশো ভাগ নিশ্চিত এই শার্ট সে কারো থেকে উদ্ধার করেছে। খুব সম্ভবত পরনের টাউজারটাও তার নিজের নয়। মসৃন চুলগুলো এলোমেলো করে ঝুঁটি বাঁধা। এই রকম ভয়াবহ চেহারা নিয়ে সে ধুমধাম করে বাড়ির বাইরের দিকে রওনা দিয়েছে। চোখে-মুখে গনগনে রাগ। ইশতিয়াক এই রণচণ্ডীকে মাঝপথে থামিয়ে দিয়ে বলল,
‘ এই তুড়বুড়ি! এমন তড়বড় করে যাচ্ছিস কোথায়? তোর না পা ভাঙা?’
মৌনি ইশতিয়াকের ডাকে থামল। নিজের পায়ের দিকে একবার তাকিয়ে উদাস গলায় বলল,
‘ ভাঙেনি। মচকেছে।’
‘ মচকানো পা নিয়েই-বা তুই এতো ছুটছিস কেন? রেস্ট না করলে ঠিক হবে পা? ব্যথা করছে না?’
প্রশ্নটা শুনেই মৌনির চোখ-মুখের রাগ ফিরে এলো আবার। প্রচন্ড মেজাজ খারাপ করে বলল,
‘ এই বাড়িতে কেউ আমাকে ভালোবাসে না বুঝেছ? আমি যে এই বাড়িতে কেন জন্মেছি, বুঝতে পারছি না। তার চাইতে কমলাপুর রেলস্টেশনে জন্মাতাম তাই ভালো হতো। কী লাভ এতো আত্মীয়-স্বজনের মধ্যে জন্মে যেখানে অসুস্থ হয়ে পড়ে থাকলেও কেউ একবার চোখ তুলে তাকানোর সময় পায় না!’
ইশতিয়াক গায়ের জ্যাকেট খুলতে খুলতে ভীষণ আশ্চর্য হয়ে বলল,
‘ বলিস কী! কেউ তোর খবর নিচ্ছে না নাকি?’
মৌনির চোখে-মুখে এবার অভিমানের ছায়া পড়ল। টলটলে চোখ তুলে তাকিয়ে বলল,
‘ নিচ্ছে না-ই তো। এক সপ্তাহ ধরে আমি বাড়িতে এসেছি অথচ কেউ আমাকে একটা ক্যামেরা জোগাড় করে দিতে পারল না। আজ সকালে মিস্টার জহিরুল্লাহ বললেন, আমার ক্যামেরার কথা নাকি সে ভুলে গিয়েছে। মানে আমি এই বাড়িতে ভুলে যাওয়া সদস্য? আমার কোনো দাম নেই? আমি কামরাঙা তলার পাকা কামরাঙা? যার ইচ্ছে হবে পায়ে মাড়িয়ে চলে যাবে? আজ দাদাজান এর হেস্তনেস্ত না করলে আমি এই বাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেব। আমার সাথে ফাজলামো…!’
বলতে বলতে অতি আবেগে প্রায় কেঁদে ফেলল মৌনি। ইশতিয়াক কী বলবে ভেবে পেল না। এই বাড়িতে সাধারণত ছেলে-মেয়েদের কোনো আবদারেই কর্ণপাত করা হয় না। আবদার যার, পূরণের দায়িত্বও তার। ইশতিয়াক জিজ্ঞাসা করল,
‘ ক্যামেরা দিয়ে কী হবে?’
‘ ক্যামেরা দিয়ে ছবি তোলা হবে। আসার সময় আমার কিছু পেইনটিং এনেছি সঙ্গে করে। পঞ্চগড়ে আঁকা। নিজের পা হারিয়ে এই পেইনটিং গুলো বাঁচিয়েছি আমি। অথচ এগুলোকে কেউ দুই আনার মূল্য দিচ্ছে না! আমার পেইন্টিংকে তারা ভেবেছেটা কী! এতো সস্তা আমার কাজ?’
কণ্ঠের আবেগ কেটে ফের ক্ষিপ্ত হয়ে উঠেছে মৌনি। ইশতিয়াক বুঝল আজ মিস্টার জহিরুল্লাহর কপালে স্বয়ং শনি নাচছে। এই বাড়ির কারো আহ্লাদ-আবদার গ্রাহ্য না করলেও মৌনির আবদার দৈববাণীর মতো অবধারিতভাবে পালনীয়। তার কথার প্রকোপে দাদাজানও ‘তথাস্তু’ বলে গা বাঁচান। ইশতিয়াক তাকে ফের বাড়ির বাইরের দিকে যেতে দেখে থামাল। এই মেয়েটা নিজের প্রতি এতো উদাসীন! কোথায় আছে, কার সামনে যাচ্ছে, কী করছে কিচ্ছু নিয়ে তার মাথাব্যথা নেই। এই পোশাকে বাইরে যাওয়া যে ঠিক নয়। গেলে দাদাজান যে তাকে কত রকমের শাস্তি দিতে পারেন সেই সম্পর্কে আশ্চর্য রকম নিরুত্তাপ সে। ইশতিয়াক তাকে পোশাক সম্পর্কে কিছু বলল না। খাবার টেবিলের চেয়ারের উপর কে জানে কার একটা চাদর পড়ে থাকতে দেখে সেটি তুলে এনে মৌনির গায়ে জড়িয়ে দিয়ে বলল,
‘ এই পাতলা জামায় তোর শীত করছে না? চাদর গায়ে দে। এমনিই পা ভাঙা, তারওপর ঠান্ডা লাগলে ঝামেলা না?’
মৌনি অর্থপূর্ণ দৃষ্টিতে তাকাল। তার যে ঠান্ডা লেগে যেতে পারে এই গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপারটা এতো বড় বাড়ির আর কেউ লক্ষ্য করেনি বলে কিঞ্চিৎ মর্মাহত হলো। তার চাইতেও মর্মাহত হলো যখন দেখল ইশতিয়াককে ভারি সুন্দর লাগছে আজ। মৌনি মন খারাপ করে বলল,
‘ তুমি তো দেখছি দিন দিন টম ক্রুজের চাইতেও হ্যান্ডসাম হয়ে যাচ্ছ! তুমি তো টম ক্রুজের চাইতেও দুই হাত বেশি লম্বা। কী মুশকিল! তোমরা সবাই এরকম সুন্দর হয়ে যাচ্ছ। আর আমি দিন দিন ভূতনী হচ্ছি। এমন হলে আমি তোমাদের মতো সুন্দর বর কীভাবে পাবো ? দাদাজান এখনও আমাকে বিয়ে দিচ্ছে না কেন? আশ্চর্য!’
ইশতিয়াক এবারে হেসে ফেলল। হাত বাড়িয়ে পরম স্নেহে মৌনির চুলগুলো গুছিয়ে দিয়ে বলতে ইচ্ছে হলো,
‘ পাখির মতো কথা বলা তুড়বুড়ি৷ আয় দেখি পাগলী, একটু আদর করে দেই তোকে।’
কিন্তু বলা হলো না। মৌনির অতো সময় নেই। সে ততক্ষণে উদ্দাম গতিতে দাদাজানের কাছে ছুটেছে। ইশতিয়াক নিশ্চিত সে এতক্ষণে ক্যামেরার ব্যাপারটা ভুলে গিয়েছে। এখন তার মাথায় চলছে সুন্দর বর। দাদাজান কেন যে তাকে একটা সুন্দর বর এনে দিচ্ছে না! ইশতিয়াক কয়েক মুহূর্ত মৌনির যাওয়ার দিকে তাকিয়ে থেকে সিঁড়ি বেয়ে তিন তলায় উঠতে নিতেই ফোনের ম্যাসেজ টুন বাজলো। শার্টের বোতাম খুলতে খুলতে পকেট থেকে জ্যাকেট হাতে মুঠোফোনটা বের করেই ভ্রু কুঁচকে গেল ইশতিয়াকের। প্রভা নামের মেয়েটা হোয়াটসঅ্যাপে লিখেছে,
‘ তেহারিটা কেমন হয়েছে বললেন না তো? পুরান ঢাকার স্পেশাল রেসিপি দেখে বানিয়েছি। অথচ আপনি নিষ্ঠুর লোক। একটা ধন্যবাদও দিলেন না!’
ইশতিয়াক ম্যাসেজটা সীন করে রেখে দিলো। এই প্রভা মেয়েটা কবে তার পিছু ছাড়বে কে জানে! রোজ রোজ তাকে হেনস্থা করার নতুন নতুন পন্থা সে খুঁজে বের করে। আজ সকালে বেরুনোর মুখে সে দরজায় এসে হাজির। জোর করে দিয়ে গেল এক বাটি তেহারি। যদিও ইশতিয়াক চোখ-মুখ কঠিন করে নিষেধ করেছিল। কিন্তু শুনলে তো? ইশতিয়াক আজকাল উপলব্ধি করছে, বেশি ভদ্রলোক হওয়ার সব চাইতে বড় বিপদ হলো নারী। এরা ভদ্র ছেলেদের কথা শুনতে পছন্দ করে না। নানানভাবে হেনস্তা করতে ভালোবাসে। ইশতিয়াক দীর্ঘশ্বাস ফেলল। প্রভা একই বাটিতে দুই ধরনের তেহারি দিয়েছিল আজ। একপাশে ভয়ংকর লবন, অন্যপাশে স্বাভাবিক স্বাদ। লবন দেওয়া তেহারি খেয়ে এখনও মুখ তেতো লাগছে তার। এই মেয়ের যন্ত্রণা থেকে বাঁচতে কোয়াটারটা ছেড়ে দেওয়া ছাড়া উপায় নেই আর৷
—————
ছাদের ঘরের তপ্ত বিছানায় উপুড় হয়ে ঘুমিয়ে আছে নাহিদ। সকালের নরম আলো ক্রমেই প্রখর তাপ ছড়াতে আরম্ভ করেছে। নাহিদের বিছানার কাছের জানালাটা খোলা। কড়া রোদে পিঠ ইতোমধ্যেই তাতিয়ে উঠার কথা। অথচ নাহিদ নির্বিকার। এইযে তার আর্টিকেল নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় এমন তোলপাড় শুরু হয়েছে তাতেও তার কোনো তাপ-উত্তাপ নেই। জড়বস্তুর মতো পড়ে পড়ে ঘুমাচ্ছে। সৌধ যখন সমস্তটা দেখে-শুনে হুল্লোড় দিয়ে জানাল তাদের বিজয়ের কথা। তখনও নাহিদ গভীর ঘুমে।
তার এই ঘুম ভাঙলো বেলা দুটোয়। সোশ্যাল মিডিয়া, আর্টিকেল কোনো ব্যাপারেই বিন্দুমাত্র আগ্রহ না দেখিয়ে গায়ে শার্ট চড়িয়ে চলে গেল টংয়ের দোকানে চা খেতে। আয়েশ করে এক কাপ চা খেয়ে মোবাইল নিয়ে বসল। সৌধ ভাবল এইবার বুঝি বন্ধুর সঙ্গে জমিয়ে গল্প করা যাবে। তাদের সূচনাটা যে কী দারুন হয়েছে, তা ভেবে প্রবল উচ্ছ্বাসে দুই বন্ধু সিগারেট ধরাবে। কিন্তু বিধিবাম! নাহিদ সোশ্যাল মিডিয়ায় ঢুকে এদিক-ওদিক না তাকিয়ে সোজা চলে গেল এক নারীর ইনবক্সে। মেয়েটি কিছুক্ষণ আগেই তাকে দুটো ম্যাসেজ পাঠিয়েছে,
‘ কেমন আছেন? আপনি মাঝে মাঝে কোথায় হারিয়ে যান বলুন তো?’
নাহিদ তাকে উত্তর দিলো,
‘ কেন? আপনি বুঝি খুঁজেন আমায়?’
‘ খুঁজব কেন?’
‘ তাহলে জানলেন কী করে যে আমি নেই?’
‘ চোখে পড়ে না, তাই জানি।’
নাহিদ খুব আফসোস করে বলল,
‘ তাহলে আমার হারানো বৃথা। আমি তো ভেবেছিলাম আমার হারানোতে বুঝি আপনার খুব যায় আসবে। মনে বাজবে বিরহের গান– ভ্রমর কইয়ো গিয়া, শ্রীকৃষ্ণ বিচ্ছেদের অনলে আমার অঙ্গ যায় জ্বলিয়া।’
প্রভা হেসে ফেলল তার কথায়। বলল,
‘ আপনি কি কৃষ্ণ নাকি?’
‘ নই?’
‘ আপনি কৃষ্ণ হলেও আমি তো রাধা নই।’
‘ কে বলল আপনি রাধা নন? আপনিই তো রাধা, প্রভা। রাধার ছিল বর, আর আপনার আছে প্রেম। সে প্রেম নিয়ে আপনি ছুটছেন পাশের বাসার দরজায়। আমাকে দেখছেন না। একদিন ঠিক বুঝবেন, শ্রীকৃষ্ণ বিরহে রাধার অঙ্গ যায় জ্বলিয়া আর নাহিদের বিরহে প্রভার পরাণ যায় পুড়িয়া।’
নাহিদের কথার ধরনে ফের হেসে ফেলল প্রভা। বলল,
‘ আপনি তো খুব ফাজিল! আমি আপনার কাছে এসেছি আপনার ভাইকে কী করে পটাবো সেই বুদ্ধি নিতে আর আপনি আমার সঙ্গেই ফ্লার্ট করছেন?’
নাহিদ নির্দ্বিধায় বলল,
‘ হ্যাঁ, করছি। যার যেখানে লাভ।’
‘ আপনার ভাইকে ঠিকঠাক পটাতে পারলে আমি কিন্তু আপনার ভাবী হবো।’
‘ তো? ভাবী হলেই বুঝি অনুভূতি মরে যায়?’
‘ ইশ! কত যে অনুভূতি আপনার! আচ্ছা, দেখা করবেন?’
‘কোথায়?’
‘ আমার ইউনিভার্সিটির সামনে আসতে পারবেন?’
‘ আপনার জন্য আমি পাড়ি দিতে পারি ইংলিশ চ্যানেল। এটা তো কিছুই না। অপেক্ষা করুন৷ আসছি।’
ম্যাসেজটা পাঠিয়ে ফোনটা পকেটে পুরে নিয়ে উঠে দাঁড়াল নাহিদ। বাইকে স্টার্ট দিতে দিতে সৌধকে বলল,
‘ চল। ঘুরে আসি।’
সৌধ চায়ের কাপ হাতে বিস্মিত গলায় প্রশ্ন করল,
‘ কোথায়?’
‘ পুরান ঢাকা।’
‘ ওখানে কেন?’
নাহিদ একটু হাসল। চোখ টিপে বলল,
‘ প্রভা ভাবীর সঙ্গে দেখা করে আসি।’
সৌধ ত্যক্ত বিরক্ত হয়ে বলল,
‘ এখন এসব ভাবী টাবির সঙ্গে দেখা করার সময়? আমাদের ম্যাগাজিনের প্রথম আর্টিকেল প্রকাশ হয়েছে। চারদিকে হৈ-চৈ হচ্ছে। কোথায় এসব নিয়ে আলোচনা করবি। পরবর্তী প্ল্যান সাজাবি। আর তুই আছিস ভাবী নিয়ে?’
নাহিদ হাসল। সৌধকে তাড়া দিয়ে একরোখা গলায় বলল,
‘ আরে, আয় তো! ছেলেবেলায় শিখিসনি? কাজের সময় কাজ, প্রেমের সময় প্রেম?’
সৌধ বিরক্ত হয়ে বলল,
‘ তুই ওখানে প্রেম করতে যাচ্ছিস?’
নাহিদ হ্যালমেড পরতে পরতে বলল,
‘ অবশ্যই। জানিস না? নারী ইকুয়ালটু প্রেমের কবিতা?’
সৌধ হতাশ চোখে বন্ধুর দিকে তাকাল। আজকাল নাহিদকে ঠিক বুঝে উঠতে পারছে না সে। সম্ভবত নাহিদ নিজেও নিজেকে নিয়ে দ্বিধাগ্রস্ত। কখনো সে মুক্তপ্রাণ, কখনো সে গম্ভীর। কখনো সে নারীদের মুগ্ধ প্রেমিক, কখনো নারী সৌন্দর্যে উদাসীন। এতো ঘন ঘন মুড সুইং নাহিদের আগে কখনো দেখেনি সৌধ। বন্ধুর তাড়ায় বেজার মুখে বাইকে উঠে বসল সে। পুরান ঢাকায় পৌঁছে দেখা গেল, প্রভা আজ শাড়ি পরেছে। ইউনিভার্সিটির সামনে দাঁড়িয়ে বন্ধুদের সঙ্গে হাস্যোজ্জ্বল চেহারায় গল্প করতে থাকা রূপবতী তরুণীটিকে দেখে সৌধর মনে হলো, এই মেয়ে খুব শীঘ্রই নাহিদের প্রেমে পড়বে। এক ভাইকে ভালোবেসে অন্য ভাইকে প্রেম দিলে– ব্যাপারটা কেমন হবে বিধাতা জানেন!
—————
‘ আমাকে তুমি দেখিয়েছিলে একদিন—
মস্ত বড়ো ময়দান—
দেবদারু পামের নিবিড় মাথা—
মাইলের পর মাইল;
দুপুরবেলার জনবিরল গভীর বাতাস
দূর শূন্যে চিলের পাটকিলে ডানার ভিতর অস্পষ্ট হ’য়ে হারিয়ে যায়;
জোয়ারের মতো ফিরে আসে আবার;
জানালায়-জানালায় অনেকক্ষণ ধ’রে কথা বলে:
পৃথিবীকে মায়াবীর নদীর পারের দেশ ব’লে মনে হয়।
তারপর
দূরে
অনেক দূরে
খররৌদ্রে পা ছড়িয়ে বর্ষীয়সী রূপসীর মতো ধান ভানে— গান গায়— গান গায়
এই দুপুরের বাতাস।’
আম বাগানের ছায়া ছায়া দিঘিপাড়ে এক পা জলে ডুবিয়ে বসে ছিল মৌনি৷ আরেকটি পা শুইয়ে রেখেছে শান বাঁধানো বেদির ওপর। কোলের উপর কয়েক গোছা সাদা পাতা। আশেপাশে কোনো জনমানব নেই। দিঘিপাড় থেকে উঠে একটা দু'পায়ে সরু পথ পেরুলেই ওপাশে সারি সারি ফল গাছের জঙ্গল। সেখান থেকে ভেসে আসছে পাকা কামরাঙার সুবাস। নানান পাখির অবিশ্রাম কিচিরমিচিরের ফাঁকে হঠাৎ হঠাৎ কোথা থেকে ডেকে উঠছে বিরহিণী কোকিল। সেই বিরহ মনে লেগেই কিনা কে জানে কী একটা লিখতে গিয়েও হঠাৎ তার কণ্ঠে ভর করলো স্বয়ং জীবনানন্দ। তারপর আবার হুট করেই থেমে গেল ঝুপ করে আসা সন্ধ্যার মতোন। মনটা খুব একটা ভালো নেই মৌনির। এর আগে নিজেকে এতো অসহায় কোনোদিন লাগেনি তার। হাতে অজস্র কাজ কিন্তু কাজ করার ক্ষমতা যেন নির্বাসন নিয়েছে বহুদূরের কোন অজন্তা পুরে। রং-তুলি সে দু'চোখে দেখতে পারছে না। জীবন লেখার সমস্ত শব্দেরা কী এক অভিমানে একসঙ্গে আত্মঘাতীর পথ বেছেছে৷ তারা কেউ মৌনিকে চিনে না। নিজের আঁকা ছবি, লেখা দেখে নিজেই কেমন আঁতকে আঁতকে উঠছে সে। এসব সে লিখেছে? কী করে লিখতে পারল কে জানে! বই পড়া ধ্যানজ্ঞান ছিলো মৌনির কিন্তু হঠাৎ করেই একদিন আবিষ্কার করলো একটানা দুটো পৃষ্ঠাও আর পড়তে পারছে না। আঁকার ক্যানভাস খালি, লেখার খাতা ফাঁকা, সোশ্যাল মিডিয়ায় ধু-ধু শূন্যতা। মোবাইল নেই, হোয়াটসঅ্যাপে সে ঢুকতে পারছে না ভয়ে; প্রকাশক, লেখক, সম্পাদকদের ম্যাসেজে সয়লাব হয়ে আছে। সকলের কাজ আটকে আছে। প্রত্যেকেরই জিজ্ঞাসা, কবে পাবে হাতে? তার কোনো উত্তর নেই মৌনির কাছে। টাকা-পয়সার অভাবে টিকে থাকতে না পেরে সপ্তাহখানেক আগে তাকে বাধ্য হয়েই আশ্রয় নিতে হয়েছে এখানে, দাদাজানের নিবাসে। তবে এভাবে আর কতদিন? সর্বোচ্চ একটি মাস এখানে বিনে পয়সায় থাকতে পারবে মৌনি। একেবারে যে বিনে পয়সায় থাকছে তেমনও না। এ যাবৎ কালে পারিবারিক সমিতিতে যে ডোনেশন সে দিয়েছে তারই উপহারসরূপ এই বিশ্রাম। এরপরই তাকে খুঁজতে হবে নিজের পথ। মৌনি হতাশ বোধ করলো। দুঃখ, কষ্ট, বিরহ সকল কিছু থাকলেও আফসোস শব্দটি কোনোদিন নিজের জীবনে আসতে দেয়নি মৌনি। কিন্তু আজ একটা গাঢ় হতাশা কী আফসোসের মতোই ঘিরে ধরছে তাকে? মনে হচ্ছে, পঞ্চগড়ের ট্যুরটিতে না গেলেই….! মৌনি মাথা নেড়ে চিন্তাটাকে উড়িয়ে দিলো মন থেকে। তারপরও একটা বিষণ্ণ বাতাস কালবৈশাখী ঝড়ের মতো তোলপাড় করতে লাগল বুকের ভেতর৷ তার কেবলই মনে হতে লাগল, এই পৃথিবীতে সে একলা স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। বাকি সকলেই উদ্দাম গতিতে ছুটছে। চিকিৎসা বিদ্যায় আজকাল ইশতিয়াক ভাইয়ের খুব নাম-ডাক হয়েছে। ঢাকার চাকরি, পোস্ট গ্রাজুয়েশনের পড়াশোনা, সপ্তাহে একদিন দাদাজানের হাসপাতালে অবিশ্রাম শ্রম সব কত সহজে গুছিয়ে করে ফেলছেন তিনি। নাহিদকে প্রায় প্রতিদিনই নিত্য নতুন রমণীদের সাথে হাস্যোজ্জ্বল ছবি আপলোড করতে দেখা যায়। তার পোশাক, চোখের ভাষায় কী অপরিসীম তৃপ্তি! ঋতি বিশ্ববিদ্যালয়ে হায়েস্ট সিজিপিএ হাঁকাচ্ছে। দিব্য খুব শীঘ্রই জুডিশিয়াল সার্ভিস পরীক্ষায় বসবে। মিথির জীবনের প্রথম টেলিফিল্মটিও সফলভাবে টেলিকাস্ট হয়েছে। বড় বড় সেলিব্রিটিরা তার প্রশংসায় পঞ্চমুখ। ভাই-বোনদের সকলেই যার যার লক্ষ্যে ধ্রুবতারার মতো জ্বলজ্বল করছে। কেবল একলা রিক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে আছে মৌনি। এই বাইশ বছরের জীবনে নিজের নামের সঙ্গে লেখার মতো কোনো অর্জন তার নেই। মৌনির বুক ভার হয়ে এলো হতাশায়। দীর্ঘ একটা শ্বাস ফেলে উদাস চোখে তাকিয়ে রইলো দূরের আম বাগানের মাথায়। দূর থেকে ভেসে আসছে একটি ম্লান কণ্ঠস্বর,
‘ মৌ আপামনি? ও মৌ আপামনি? ঋতি আপারা চইলা আসছে যে।’
মৌনি আগের মতোই অনড় বসে রইল। পলকহীন তার দৃষ্টি। বিকেলের হলদে আলোয় কোল থেকে একটি একটি করে খসে পড়ল সাদা কাগজ। ছাড়া পেয়ে ওগুলো ভাসছে নৌকোর মতো। যেমন করে অগাধ দুঃখে ভেসে বেড়ায় মৌনির চঞ্চল চোখ। সকলে ওই চক্ষু দেখে, ওই চোখের দুঃখ দেখে ক'জন?
আকাশে শেষ বিকেলের সিঁদুর। মৌনি সেই রাঙা আকাশের দিকে আবিষ্ট চোখে তাকিয়ে থেকে হঠাৎ ভ্রু কুঁচকে ফেলল। নিজের দুঃখ ভুলে আচমকা তার মনে হলো কোন দূর মালবনে তার চাইতেও দুঃখী আছে কেউ। এক সমুদ্দুর দুঃখ নিয়ে সে হেঁটে চলেছে ক্লান্ত পথিকের মতো। মৌনির সেই অচেনা কারো জন্য বড় অস্থির লাগল। শুষ্ক চোখে জল এলো। এই বসুন্ধরা তাকে জানে এক নিষ্ঠুর, আত্মকেন্দ্রিক রূপসী বলে। অথচ সেই নিষ্ঠুর হৃদয়ে কী অসীম মায়া সে পুরে রেখেছে কতোই না সঙ্গোপনে! মৌনি তার মায়া মায়া কণ্ঠে আশ্চর্য এক সম্মোহন ঢেলে সুর তুলল,
‘ রাঙা পায়ে কইন্যা চলে মুটুক মাথায় দিয়া।।
আমতলায় ঝামুর ঝুমুর
কলা তলায় বিয়া রে
কলা তলায় বিয়া।
ছিলো কইন্যা মায়ের কোলে
নৌকা ভাসে গাঙের জলে
মায়ের বুকে তুফান তুলে
কাইন্দা ভাসে হিয়া….’
তার কিণ্ণরী কণ্ঠে আচমকা থমকে গেল পাখির রব, আমবাগানের ফিসফিস, দূর থেকে ভেসে আসা ধান মাড়াইয়ের গমগম। চারদিকে সুমিষ্ট প্রসাদের মতো ভেসে বেড়াতে লাগল সুরের হিল্লোল। এই সুর কি পথ চিনে ওই বহুদূরে, ওই শ্রান্ত পথিকেরও মন ভুলাবে? জানাবে মৌনির অশেষ প্রার্থনা, ভালো থেকো। ভালো থেকো।
—————
আকাশ ভেঙে বর্ষা নামছে। দুপুর পর্যন্ত রৌদ্রকরোজ্জ্বল ছিলো ঢাকা শহর৷ কংক্রিটের দালানগুলো জ্বলে যাচ্ছিল রোদের তাপে। একটা টেলিভিশন চ্যানেলে ইন্টারভিউ ছিল মিথির। ইন্টারভিউ থেকে বেরিয়েই টেলিফিল্মের নায়িকা রিদিমা তাকে পৌঁছে দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছিল। মিথি স্মিত হাস্যে এড়িয়ে গিয়েছে সে প্রসঙ্গ। রিদিমার সঙ্গে গাড়িতে যাওয়া মানেই অজস্র মেকি কথা, হৃদ্যতা আর হাসির বাহার। মিথির আজ আর হাসতে ইচ্ছে করছে না। কারো সঙ্গে কথা বলতে ইচ্ছে হচ্ছে না। তাছাড়া সাব্বিরের কাগজ-পত্রগুলোও পাঠানো দরকার। এক সপ্তাহ হলো কাগজটিতে স্বাক্ষর করে রেখেছে মিথি। কাজের চাপে পাঠানোর ফুরসত হয়ে উঠেনি। মিথি কুরিয়ার অফিসের পথে রিকশা থামিয়ে একটা ছাউনির নিচে দাঁড়িয়ে আছে। এই বিষম বর্ষায় রিকশা এগোনো যাচ্ছে না। না এগোক। মিথির বিশেষ তাড়া নেই। এখানে এভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে ভালো লাগছে। এই এক সপ্তাহ গাধার মতো খেঁটে ভারি ক্লান্ত লাগছে দেহ। তার চাইতেও ক্লান্ত মিথির মন। একটু বিশ্রাম নেওয়া দরকার। সাব্বিরকে তালাকের কাগজটা পাঠিয়ে দিয়েই ময়মনসিংহের বাস ধরবে মিথি। ভাই-বোনেরা সকলেই বাড়ির দিকে রওনা হয়েছে। মিথিরও যাওয়া দরকার। মিথির মা নেই। চুলের ভাঁজে মমতা নেই। মফস্বলের ওই বাড়িটিকেই মাঝেমধ্যে মায়ের মতো মনে হয় মিথির৷ সর্বক্ষণ স্নিগ্ধ আঁচল পেতে ডাকতে থাকে স্নেহের হাতছানি দিয়ে। বলতে থাকে, আয়! একটুখানি বোস কোলের কাছে।
একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বৃষ্টিতে ভিজেই রিকশায় উঠে বসল মিথি। রিকশাওয়ালাকে এই মুষলধারাতেই রিকশা টানতে বলে নীরবে চেয়ে রইল আকাশে। চোখে-মুখে তার আবেগের ছিটেফোঁটা নেই। অনুভূতিহীন, ক্লান্ত চেহারা। কাঁধের ব্যাগে জীবনের সবচাইতে বড় দুঃখ নিয়ে এই এক সপ্তাহ নির্বিকার মুখে কাজ করে গিয়েছে সে। কোথাও তার কাজের ছন্দপতন হয়নি, সুর কাটেনি। সৃষ্টিকর্তা ছাড়া আর কারো কী বুঝার সাধ্য আছে, এই চেহারার বাইরে তারও একটা মন আছে? নরম তুলতুলে মন। সেই মনে কতগুলো দিন ধরে এই বিষম বর্ষার চেয়েও বর্ষা নামছে। বেশ কিছুক্ষণ নীরব থেকে কাঁধের ব্যাগটি থেকে তালাকনামার খামটা বের করল মিথি। কুরিয়ার করবে বলে খামের উপর প্রাপকের নামে গুটি গুটি অক্ষরে লেখা হয়েছে সাব্বিরের নাম। মিথি পৃথিবীর সমস্ত মায়া নিয়ে একবার হাত বুলাল ওই নামের ওপর। সাব্বির সারোয়ার জাহিদ – এই নামের সঙ্গে মিথির আজ শেষ সাক্ষাৎ। তাদের প্রথম দেখার দিনও প্রবল বর্ষণে প্লাবিত হচ্ছিল চারপাশ। আজও একইরকম বর্ষণ। সেদিন সাব্বির তাকে এনে দিয়েছিল বৃষ্টিস্নাত কদম। আজ কোথাও কদম নেই। বসন্তে কদম ফুটে না। ঠিক যেমন করে মিথিরা সাব্বিরকে পায় না। মিথি আরেকবার হাত বুলাল ওই তিন অক্ষরের নামটিতে। কোনো এক দৈব্য বলে তার ওই চির অনুভূতিহীন চোখদুটোতে জল এলো। এই বর্ষা, এই গোধূলিবেলা সকলকে চমকে দিয়ে জীবনের প্রথম ডুকরে কেঁদে উঠল সে। রিকশাওয়ালা অবাক বিস্ময়ে গাঢ় ফিরিয়ে তাকাল। চিরদিন কঠিন হয়ে থাকা মিথি তাতে দমলো না। রিকশার হুড ফেলে দিয়ে সে অভিমানী কিশোরীর মতো হু হু করে কেঁদে চলল কেবল।
পশ্চিমাকাশে সিঁদুরের মতো রঙ ধরেছে। প্রিয় জনের উপেক্ষা পেয়ে ক্রন্দন ঝরিয়ে চোখ-মুখে যেমন গোলাপি আভা ধরায় অভিমানী কিশোরী ঠিক তেমনই আবহাওয়ার রূপ। একটু পর পর পুরোনো ব্যথা মনে করে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে উঠছে তার ক্রন্দন স্রোত। অনেকক্ষণ আগে ইলেকট্রিসিটি গায়েব হয়েছে। একটু পরই সন্ধ্যা নামবে। ঘরটা নিকষ অন্ধকারে ছেঁয়ে আছে। সাব্বির রান্না ঘরে গিয়ে একটা মোম জ্বালাল। সেই যে প্রথমদিন মিথি এলো তার বাসায়। সেদিনই শেষবার মোম জ্বলেছিল ঘরে। তারপর আর প্রয়োজন হয়নি। তারপরও মুদি দোকানে গেলে কেন যেন মোম কেনা ছাড়া ফিরতে পারে না সাব্বির। কেবল মনে হয় যদি একদিন মিথি আসে? ওমন মাথা ভরা বৃষ্টির দিনে অন্ধকার ঘরে মিথি থাকবে কেমন করে? পরমুহূর্তেই হতাশ হয় নিজের নির্বুদ্ধিতায়। কিন্তু বিরক্ত হয় না। এই প্রথম কারো কথা মনে করে কিছু কিনতে পারছে, এই পাওয়াই বা কম কীসে? যদি কোনোদিন মিথি বেড়াতে আসে তার স্বামী-সন্তান নিয়ে? তখন নাহয়…ভাবতে ভাবতে দীর্ঘশ্বাস ফেলে সাব্বির। চাল, ডাল ধুয়ে খিচুড়ি জাতীয় কিছু রান্নার প্রস্তুতি নেয়। বৃষ্টি-বাদলা দেখে কাজ থেকে আজ হাত গুটিয়েছে বুয়া। সাব্বিরের শরীর খুব একটা ভালো নেই। সকাল থেকে জ্বর জ্বর লাগছে। ডেঙ্গুর উপসর্গটা আবার ফিরে এলো কিনা কে জানে! চাল-ডালের হাঁড়িটা চুলোয় বসিয়ে দিতেই দরজায় কলিং বেল বাজল। এই বৃষ্টি ভেজা সন্ধ্যায় কে আসতে পারে ভেবে মনে মনে একটু আশ্চর্য হলো সাব্বির। মোমটা হাতে নিয়ে কপাল কুঁচকে দরজার কপাট খুলতেই ওপাশের মানুষটিকে দেখে ভয়ংকর চমকে গেল সে। মাথা থেকে পা অব্দি ভিজে চুপেচুপে হয়ে দাঁড়িয়ে আছে মিথি। সাদা সুতোর কাজ করা সাদা শাড়িটা থেকে পানি ঝরে ভেসে যাচ্ছে ওপাশের মেঝে। সুন্দর চোখদুটো রাঙা হয়ে আছে। ফুল পল্লবের মতো কোমল ঠোঁটদুটো শুকনো। মোমবাতির আলোয় উদ্ভাসিত হয়ে আছে তার দুধ-আলতা রঙের পেলব মুখ। এতোদিন পর হঠাৎ এভাবে মুখোমুখি হয়ে পড়ায় সহসা কোনো কথা খুঁজে পাচ্ছিল না সাব্বির। কয়েক মুহূর্ত বিমূঢ় হয়ে ওই সুন্দর মুখখানার দিকে তাকিয়ে থেকে একসময় সামান্য হাসার চেষ্টা করল সে। বলল,
‘ মিথি, আপনি! কেমন আছেন?’
·
·
·
চলবে……………………………………………………