চারপাশে গুঞ্জন পাখিদের। হেলে গিয়েছে সূর্য। হেমলক বিস্ময় নিয়ে তাকিয়ে আছে তার সামনের মেয়েটির দিকে। রানির অপরিচিত ফুলটির থেকে একটি মায়া মায়া ঘ্রাণ আসছে। হেমলকের হাতে রং-তুলি। তৈলচিত্রে শোভা পাচ্ছে একটি মেয়েলি শরীর, মুখ।
মৃন্ময়ী সেদিকটায় ভীষণ মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে বলল, “বুকে কতটা প্রেম থাকলে এতটা যত্ন করে অঙ্কন করা যায় কারো চিত্র?”
হেমলক মৃন্ময়ীর হঠাৎ উপস্থিতিতে সংকোচ বোধ করল। তার চেয়ে বেশি সংশয় হলো মৃন্ময়ীর হাতটা নিজের বাহুতে দেখে। অস্বস্তি হলো ভেতর ভেতর। একটু সরে যাওয়ার অদৃশ্য চেষ্টা করে কৃত্রিম হাসি টেনে উত্তর দিলো,
“যতটা প্রেম থাকলে বর্ণনা করা যায় না, ততটা প্রেম থাকতে হয় বোধহয়।”
হেমলকের অস্বস্তি, সরে যাওয়ার নিখুঁত চেষ্টা ঠিক মৃন্ময়ী বুঝতে পারল। বাহু থেকে তাই আলগোছে সরিয়ে নিলো নিজের হাতটি, “তা কার প্রতি আপনার এহেন অগাধ প্রেম শুনি!”
কথা শেষ করে তৈলচিত্রে নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করল মৃন্ময়ী। কিছুটা সময় তাকিয়ে রইল সে এক মনে। এক ধ্যানে। চমকে ওঠল এরপরই, “ইনি কে? বড্ড চেনা লাগছো যেন! কোথাও দেখেছি হয়তো!”
হেমলক তৈলচিত্রটিতে আবার মনোনিবেশ করল উত্তর না দিয়েই. কোঁকড়া চুলের শেষটুকু সম্পন্ন করতে করতে বলল,
“মনে করলেই মনে পড়বে। মনে করুন।”
মৃন্ময়ী মস্তিষ্কে তীব্র জোর দিলো। ঝাপসা হয়ে তার চোখে ভাসছে চিত্রের সেই টানা টানা চোখগুলো, চুলের সেই ঢেউ! যা দেখে দ্বিতীয়বার ফিরে তাকাতে চাইবে মানবহৃদয়। এমন মনোহারিণী নারীর চিত্র সে যে দেখেছে আগে! কিন্তু কোথায়?
“রাজকন্যা মৃন্ময়ী আমাদের সাক্ষাৎ না দিয়ে একেবারে বাগানেই যে চলে এসেছে! হেমলক পিয়ার্সকে দেখা দিতে ইচ্ছে হয় আর আমাদের দেখা দিতে ইচ্ছে হয় না?”
নারী কণ্ঠস্বরে নরম নরম বাক্য পেয়ে মৃন্ময়ী পেছনে ডান পাশে ঘুরে তাকালো। গহনার ভুবনমোহিনী সুর তুলে, নারীর অঙ্গের সমস্ত শোভা বর্ধন করে হেলতে দুলতে বাগানে প্রবেশ করল রানি কামিনী। মৃন্ময়ী এক দেখাতেই চমকে উঠল। হতবিহ্বল হয়ে গেলো এহেন দৃশ্যে। ওর ওষ্ঠে এসে জমা হলো ভারি প্রশ্ন, কৌতূহল, বিস্ময়।
রানির দিকে একবার তাকালো, আরেকবার তাকালো চিত্রের দিকে। চিত্রের ঐ চোখ, মুখ, চুলের নারীটি তার সামনেই দাঁড়ানো। হাসছে কী দারুণ! মুখ যেন চন্দ্রিমার এক মুঠো জোছনার মতন নির্মল। এই নারী, এই চিত্র তার চেনা। সে দেখেছে। আগেই দেখেছে।
চট করে তার মনে পড়ল কোথায় দেখেছে। তাই তো রানির উত্তর না দিয়ে, রানির থেকে সামান্য পেছনে থাকা ইনান ণেকিতানের দিকে তাকিয়ে সে কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে বলল,
“উনাকে আমি বোধহয় তোমার কক্ষে দেখেছি তা-ই না, ভ্রাতা। উনি কি তাহলে…”
কথা থামলো মৃন্ময়ীর। তার আর মাথায় ভাবনা আসছে না। সে এতক্ষণে চিনে ফেলেছে রানি কামিনীকাঞ্চনকে। তার সামনে রানি কামিনীকাঞ্চনই দাঁড়িয়ে আছেন যাকে দেখার জন্য সে উতলা হয়েছিলো। আগ্রহী ছিলো। খুঁজেছিলো মনে মনে মানুষটাকে। অথচ আজ ক্যামিলাস রাজ্যে এসেই যে দেখা পেয়ে যাবে কে জানতো?
মৃন্ময়ী আবার রানিকে উপর থেকে নিচ অব্দি পরখ করল
তার কাছে সবটাই স্বচ্ছ লাগছে। তবুও মনের সংশয় দূর করতে রানির কাছে দ্রুত এগিয়ে গেলো। আগ্রহী কণ্ঠে শুধাল,
“আপনি, আপনি রানি কামিনীকাঞ্চন না? যার চিত্র দিয়ে ভ্রাতার কক্ষ সজ্জিত! যার চিত্র হেমলক পিয়ার্স অঙ্কিত করেন নিখাঁদ প্রেম দিয়ে। আপনিই কি তবে হেমলকের বধূ? যার সাহসিকতার চর্চা চলছে বিভিন্ন রাজ্য জুড়ে?”
পর পর প্রশ্ন করেও মৃন্ময়ীকে স্থির হতে দেখালো না। ও আরও উদগ্রীব হয়ে পড়ল সবটা বুঝার জন্য। তখন ণেকিতানই গুছিয়ে বলে সবটা। একে একে তার জানা সবটুকু। শুনতে শুনতে কাঁটা দেয় মৃন্ময়ীর গায়ে। কখনো কখনো ভয় হয়, কখনো বা বিস্ময়। একটি নারী এমন হতে পারে! তার বিশ্বাস হয় না।
ণেকিতানের কথা থামলেও মৃণ্ময়ীর কৌতূহল থামে না। সে অকপটেই রানির দু-হাত চেপে ধরে। উত্তেজিত স্বরে বলে,
“আপনি অনন্য, অনন্য, অসাধারণ। সবসময় কেবল শুনে গিয়েছি কিন্তু বিশ্বাস হতো না। আজ দেখলাম, বুঝলাম, যা শুনেছি আপনি তার চেয়েও অধিক বিশেষ। ভ্রাতা কেন তৈলচিত্রের মাঝে আপনাকে পুষতেন আজ তা বুঝতে পারছি। এমন দুর্দান্ত ক’জনই বা হয়!”
রানির কণ্ঠ স্থির, “তুমিও কম অসাধারণ নও।”
“আপনার ধারেকাছে আমি কিচ্ছুটি নই। হেমলক পিয়ার্স আপনাকে পেয়ে বোধহয় আসলেই ধন্য।” শেষ কথাটি বলল মৃন্ময়ী চাপা স্বরে। গলায় বাঁধলো একবার খুব ক্ষীণ ভাবে। কিন্তু তা সাধারণ ভাবে কেউ ধরতে না পারলেও রানি ঠিক বুঝলেন।
হেমলক রং-তুলি হাত থেকে নামিয়ে নিজের রানির পাশে দাঁড়ালো। তাও রানির একটি বাহু জড়িয়ে। গর্বিত ভঙ্গিতে বলল, “অবশ্যই ধন্য আমি। এমন রানি একজনই। যাকে আমি জয় করে নিয়েছি।” শেষটুকু সে আড়ালেই ইঙ্গিতে বুঝালো ণেকিতানকে।
হেমলকের রানিকে ধরে রাখার দৃশ্যের দিকে আঁড়চোখে তাকিয়ে রইল মৃন্ময়ী। তার বিশ্বাস হচ্ছে না রানি কামিনীকাঞ্চন এত সৌন্দর্যতার অধিকারীণি হবেন। এতটাই তেজ থাকবে তার রূপ ও বুদ্ধিতে। হেমলক পিয়ার্স কিংবা ণেকিতান ভ্রাতাও বা কীভাবে ভালো না বেসে থাকবেন? ওর নিজেরই তো আকর্ষণ জন্মেছে। আবার বোধহয় কোথাও একটা রয়েছে হিংসের আভাস! কেন সে এমন নারী হতে পারল না! পাহাড়ের মতন অটল।
—————
এ্যাজেলিয়া রাজ্যে বৈঠকের পর বৈঠক হচ্ছে। ধাপে ধাপে আলোচনা চলছে। বিভিন্ন রাজ্যের সাহায্যের জন্য যামিনী দূত পাঠাচ্ছে। ক্যামিলাস রাজ্যের সৈন্য অপেক্ষা তাদের সৈন্য কম। যু দ্ধ লাগলে আর গতি নেই। হার নিশ্চিত। এই এতকিছুর মাঝেও যামিনী আবিষ্কার করল হ্যাব্রোকে নিশ্চুপ। রানি আসার আনন্দ তার ভেতরে দেখা গেলো না। দেখা গেলো না উৎকণ্ঠা। বরং সে যামিনীর কথামতো কাজ করছে। ছোটাছুটি করছে। মনে মনে তার ভাবনা উদয় হলো। হ্যাব্রো তো সব মেনে নেওয়ার মানুষ নয়। তাছাড়া রানি কামিনীকাঞ্চনের একমাত্র বিশ্বস্ত মানুষ ছিলো সে। তার কেন আজ নেই কোনো আগ্রহ? কৌতূহল? একদিকে রানির চিন্তা অন্যদিকে হ্যাব্রোর। অকূলপাথারে খড়কুটোর মতন নিজের জীবনটিকে লাগলো তার। কোনো কূলকিনারা নেই। যা কিছু হতে পারে। কিন্তু তবুও সে ডুবে যেতে চায় না।
হ্যাব্রো ছিলো ব্যস্ত কাজে। হুট করে দেহরক্ষী এসে খবর দিলো বন্দীশালায় যাওয়ার। হ্যাব্রো ঠিক বুঝতে পারল না হুট করে হলো কি। এত তাড়া কেন।
ধপধপিয়ে ছুটে গিয়ে দেখলো বন্দীশালার রক্ষীরা অজ্ঞান হয়ে আছে। একটি দরজা খোলা। হ্যাব্রো চমকে গেলো। বহু বছরেও এই বন্দীর দরজাটি কেউ খুলেনি। রানির কোনো এক ক্ষোভ ছিলো এই কারাগারে আটকে থাকা বন্দী লোকটির উপর। কিন্তু কে তাকে পালিয়ে যেতে দিলো? কেনই বা দিলো? যামিনী কি এ কাজ করল! এত পুরোনো বন্দী লোকের প্রতি তার কীসের অধিকার ছিলো? কেনই বা পালাতে দিলো?
·
·
·
চলবে……………………………………………………