কামিনী - পর্ব ৫৮ - মম সাহা - ধারাবাহিক গল্প

কামিনী - মম সাহা
          রাত্রি বাড়ার পরেও ঘুম ধরা দেয়নি রানির চোখে। তার চোখ জোড়া কেবল হন্যে হয়ে খুঁজছে কারণ। রানি ইথুনের কান্নার কারণটি তার কাছে অস্পষ্ট। তিনি যা ভাবছেন তা মানতে অস্বস্তিবোধ হচ্ছে। অপ্রীতিকর ভাবনা গ্রাস করে রাখছে তার মস্তিষ্ককে। গুরুতর ও জটিল ভাবে।
  শেষ অব্দি ঘুম এলো না আর। নিদ্রাবিহীন রাতটি যখন ভোর হওয়ার অভিপ্রায় তখন তিনি পালঙ্ক ছেড়ে আবারও নেমে দাঁড়ালেন। কতক্ষণ পায়চারী করলেন কক্ষেই। মনের ভেতর একটিবার উঁকি দিলো হেমলকের ভাবনাও। মানুষটা কি এখনও গল্প করছে মৃন্ময়ীর সঙ্গে? 

এরপর এক লহমায় নিজের ধ্যানকে তিনি হাতের মুঠোয় নিয়ে এলেন। কে, কার সঙ্গে গল্প করছে সেসব ভাবনা তো তার জীবনের লক্ষ্য নয়। তবে কেন তিনি তা ভেবে ভেবে হয়রান হচ্ছেন? পুরুষ কেন্দ্রিক কোনো ভাবনাই তার জীবনের সাথে কখনো সংযুক্ত নয়। ভাবতে পারেন না তিনি এসব। কখনোই না। 
 মাথা ঝাঁকালেন বার কয়েক। নিজেকে ধাতস্থ করলেন। কক্ষ ছেড়ে আবারও বেরিয়ে গেলেন ধীর পায়ে, নিঃশব্দে। প্রাসাদে ঘুম জড়িয়ে আছে। দাস-দাসীরা এখনো উঠেনি। তবে উঠে যাবে আলো ফুটতে ফুটতে। রানি ভাবলেন একটু হেঁটে আসবেন বাগান থেকে। ইথুনের কক্ষের দোর দেওয়া। তাই এটা বুঝলেন যে ইথুন চলে এসেছে বাগান থেকে। আর বাগানে যেতে বাঁধা নেই।

  ভাবনা মতেই বাগানে এলেন রানি। প্রকৃতির নীরবতায় ম্লান হয়ে গেলো তার সমস্ত জাগতিক ভাবনা। বুকের ভেতর হালকা লাগতে আরম্ভ করল। তার প্রিয় ফুলের ঘ্রাণটি তাকে উন্মনা করে তুলল। বেশ সুন্দর হয়ে ফুটছে সেগুলো। হেমলক ভীষণ ব্যয় করছে এই ফুলের পেছনে। এত এত চেষ্টা কেন? কেবল রানিকে সুখী করার জন্যই? 

বাগানের এক কোনায় দেখা গেলো হেমলকের একটি তৈলচিত্র। পুরোপুরি অঙ্কিত নয়। এক জোড়া চোখ সেই চিত্রে জীবন্ত লাগছে। রানি আরেকটু এগিয়ে যেতেই খেয়াল করলেন চিত্রটি অদ্ভুত। চোখ জোড়াতে খেয়াল করলে একটিবার দেখা যাচ্ছে আগুনের ফুলকি, অন্যবার পদ্মফুল। একটু গোলমেলে রহস্যময় চিত্র। কখন আগুন আর কখন পদ্ম আসছে বুঝার উপায় নেই। একটি চিত্রের ভেতর পুষ্প আর অগ্নি একই সঙ্গে ফুটিয়ে তুলেছে কীভাবে? কী আশ্চর্যজনক! ভেবে ভেবে হয়রান হলেন রানি। হেমলকের প্রতিভায় তিনি গুণমুগ্ধ হলেন। এ কেমন সৌন্দর্যতা?
  রানি আরেকটু এগুলেন। চিত্রটির এই রহস্য তার কাছে কিছুটা খোলসা হলো। তিনি যখন চোখ বড়ো বড়ো করে তাকাচ্ছেন তখন চিত্রের চোখগুলোতে জ্বলছে অগ্নি। যখনই চোখ মোলায়েম করছেন, সামান্য ছোটো করে দেখছেন, তখনই চিত্রের চোখ হয়ে যাচ্ছে ফুটন্ত পদ্ম। এ কেমন অদ্ভুত দৃশ্য! 

চিত্রের চারপাশটা খুঁজে একেবারে নিচে খেয়াল করলেন রানি দু'টি লাইন—
 ❝এরা সেই চোখ,
যেই চোখ স্বর্গ ও নরককে ধারণ করে একই সঙ্গে…❞

রানি এক ধ্যানে তাকিয়ে রইলেন সেই চিত্রের দিকে। কতটা নিখুঁত ভাবে হেমলক তাকে বর্ণনা করতে পারে? যতটা নিখুঁত ভাবে বর্ণনা করলে মাঝে মাঝে তিনি নিজেই নিজেকে চিনতে পারেন না।

—————

 প্রাতঃকালের রাজসভায় আলাদা উত্তেজনা। রানি এসে বসলেন তার রাজ সিংহাসনে। রাজ সভায় রাজ্যের গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকা সদস্যরা উপস্থিত। চাপা উদ্বেগ নিয়ে সকলে তাকিয়ে আছে রানির দিকে। আজ কেবল রানি কথা বলবেন বাকিরা সেই আজ্ঞা মেনে নিবেন। হেমলক দাঁড়ানো রানির পাশেই। বাহির ঘরে দাঁড়ানো রাজমাতা প্রাচী, রানি ইথুন, রাজকন্যা লিলি, মৃন্ময়ী, ইনান ণেকিতান, পিতামহ, মামীশ্রী। 
রানির নির্দেশেই উপস্থিত হয়েছেন সকলে। রাজ্যের বিশেষ সময়ে রাজ পরিবারের সকলে উপস্থিত থাকা বাঞ্ছনীয়। 

রানি বসেই যথারীতি কথা শুরু করলেন,
 “আমরা যু দ্ধের জন্য প্রস্তুত। তবে একটি রাজ্য বিনা পত্রে অন্য একটি রাজ্যের উপর ঝাঁপিয়ে পড়তে পারে না। তাই রীতি অনুযায়ী আজকেই আমাদের বার্তাবাহকের মাধ্যমে একটি পত্র পাঠানো হবে এ্যাজেলিয়া রাজ্যের বর্তমান রানির উদ্দেশ্যে। এবং তাকে জানানো হবে রাজ্য ফিরিয়ে দেওয়ার কথা। যদি তিনি বার্তাবাহকের সঙ্গে কোনো পত্র না পাঠান তবে আমরা ধরে নেবো যে সেই রাজ্য আমাদের সঙ্গে যুদ্ধ করতে প্রস্তুত।”

সকলে রানির কথা মনোযোগ সহকারে শুনল। মাথা নাড়িয়ে সম্মতিও দিলো। 
 রানি এবার সেনাপতিকে আদেশ করলেন একটি পত্র লিখতে এবং তার কথামতোই যেন লিখা হয়।

সেনাপতি দ্রুততার সঙ্গে সেই আদেশ মান্য করে রানির পত্রখানা লিখা আরম্ভ করল। রানি বললেন, 
“লিখো— যামিনী, আমার রাজ্য তুমি যেই ছলচাতুরীর সঙ্গে কেঁড়ে নিয়ে ছিলে তা ভীষণ লজ্জাজনক আর ঘৃণ্যতম কাজ। এই অপরাধের ক্ষমা নেই। তবুও নিয়মরক্ষার জের ধরেই তোমাকে এই পত্রটি পাঠানো হচ্ছে। আমি তোমাকে জানাতে চাই তুমি আপোষহীন ভাবে রাজ্য ফিরিয়ে দিলে আর যু দ্ধের ঘোষণা দেওয়া হবে না। সেক্ষেত্রে তুমি আমাদের বার্তাবাহকের সঙ্গে রাজ্য ফিরিয়ে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি পত্র পাঠাবে। আর তুমি যদি তা না করো আমি ধরে নিবো তুমি বেছে নিয়েছো যু দ্ধের ময়দান। তবে সেখানেই আমাদের দেখা হবে।”

পত্র লিখা শেষ হতেই রানি সেনাপতিকে এই পত্র নিয়ে যাওয়ার বিশেষ আদেশ দিলেন। তারই সঙ্গে রাজসভার প্রত্যেকের দিকে তাকিয়ে বললেন,
 “আমি আগাম বলে দিচ্ছি, আপনারা প্রস্তুত থাকুন। যামিনী আপোষহীন ভাবে রাজ্য ফিরিয়ে দিবে না। তাই রণক্ষেত্রে আমাদের নামতেই হবে। তবে সেখানে জোরের সঙ্গে প্রয়োজন কৌশল ও একতা। আপনারা নিজেদের মানসিক ভাবে প্রস্তুত করুন। আমার জয়ে আপনারা সামিল হোন এক মনে। রানি কামিনী কখনো হারেনি, হারবেও না। আপনারা কি আমার সাথ দিতে প্রস্তুত?”

রাজসভা উৎসাহের সঙ্গে সমস্বরে বলে উঠল, “প্রস্তুত, প্রস্তুত।”

রানি প্রত্যেককে বিদায় দিলেন। জানালেন আজকের ভেতরই যদি পত্র না আসে তবে কাল উনি যুদ্ধের ঘোষণা দিবেন। এবং খুব শীগ্রই দলবল নিয়ে রওনা হবেন। পুরো রাজ্যের প্রজাদের সেই খবর কালই পাঠানো হবে। সৈনিকরা যেন প্রস্তুত হয়। 
 কেউ রানির বিপরীতে একটি শব্দও করল না। বরং রানির স্বার্থে তারা যেন প্রাণ দিতেও প্রস্তুত। 

সকলে বেরিয়ে যেতেই রানি গিয়ে দাঁড়ালেন নিজের খোলা বারান্দায়। যেখান থেকে প্রাসাদের সামনের দিকটা দেখা যায় পরিষ্কার, খোলামেলা। 

বৈঠকখানায় মৃন্ময়ী এলো তখুনি। হেমলক রানির পিছে যেতে নিলেও মৃন্ময়ী ও ণেকিতানের আগমনে থেমে যেতে হলো তাকে। 
 মৃন্ময়ী তার তীব্র বিস্ময় চেপে রাখতে পারল না আর। চোখ বড়ো বড়ো করে বলল,
“রানির এ কেমন দাপট! আমি অভিভূত। একজন নারীর এতটা দাপুটে কণ্ঠস্বর! এতটা জ্বলন্ত চোখ!”

হেমলক মৃন্ময়ীর বিস্ময় দেখে হাসল। গর্ব করে বলল, “আমার রানি বলে কথা।”
 সেই বাক্যটি বড্ড কানে বাজল রাজা ণেকিতানের। তবে সে কিছু বলল না। চুপ রইল। 

মৃন্ময়ী পরক্ষণেই আবারও বলল, “তবে একটি কথা জিজ্ঞেস করতে চাই তোমাকে, চিত্রশিল্পী হেমলক পিয়ার্স।”

 “কী কথা?”

“রানির সাথে পুরোটা সময়ই তোমাকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখলাম। সাধারণত রাজার আসন রানির পাশেই হওয়ার কথা। তবে তুমি দাঁড়িয়ে ছিলে কেন?”

হেমলকের আগের হাসিটা পূর্বের চেয়েও প্রশস্ত হলো,
 “কারণ আমার রানি সর্বোচ্চ স্থানে রয়েছে। তার সমতুল্য কেউ নেই এই রাজপ্রাসাদে। আমিও নই। তাই আমি যে তার পাশাপাশি আসনে বসার দুঃসাহসিকতা দেখাতে পারি না। আমার রানি আমার গর্ব। তার পাশে দাঁড়ানোই আমার যোগ্যতা, পাশে বসা হলো অপমান তার। রানি আমার মাথার মুকুট, তাকে মস্তকেই শোভা পায়।”

মৃন্ময়ী হত-বিহবল চোখে তাকিয়ে রইল হেমলকের দিকে। এ কেমন পুরুষকে দেখছে সে? এমন মায়াময় পুরুষ এই ধরণীতে কোথায় আছে আর? কোথায় গেলে পাবে সে এমন পুরুষ? নারীকে মাথার মুকুট ভাবার মতন রুচিবোধ যার ভেতরে আছে তাকে মৃন্ময়ী কেন পেল না? এই আফসোসে তার যে ভেতর পুড়ছে। রাজা ণেকিতানও বোধহয় অবাক হলো। মৃন্ময়ীর মতনই ভ্রমে মগ্ন দেখা গেলো তাকে।

  আকাশটা গুমোট। রানি তাকিয়ে দেখলেন সেনাপতি ঘোড়ায় উঠছে বুক টানটান করে। হাতের রাজকীয় পত্রটি তিনি গুঁজে নিয়েছেন বুকে। ঘোড়ার চেপেই ছুটছে এ্যাজেলিয়া রাজ্যের দিকে। রানির বুকে বোধহয় একটু বেশিই উত্তেজনা। ক্রমশ চোখের পাতায় ভেসে উঠছে সখীর করা সকল বিশ্বাসঘাতকতার দৃশ্য। গায়ে টগবগ করছে ক্ষো ভ। ঘৃণায় তেঁতো হয়ে আসছে মুখ। সখীর শাস্তি কী ভয়ঙ্কর হবে তা ভেবেই পৈচাশিক হাসি ঝুলালেন তিনি। হেমলক যে কখন হেসে পাশটায় দাঁড়িয়েছে তা উনি দেখলেনও না। এতকিছু দেখার যে সময় নেই তার। এখন অনেক কাজ। যু দ্ধে যেতে হবে তাকে। তার অস্তিত্বের যুদ্ধে, তার শেকড়ের যু দ্ধে। 

—————

 একটি কক্ষে স্তব্ধ মূর্তির মতন বসে আছেন রাজমাতা। তার সামনেই বসা রাজকন্যা লিলি। একটি কেদারায় রানি ইথুনকে নির্জীব দেখালো। 

 সকল নীরবতা ভেদ করে সর্বপ্রথম কথা বলল লিলি,
“রাজমাতা, আপনি কি কিচ্ছুটি বলবেন না?”

  রাজমাতার মৃত চোখে তখন প্রতিশোধের নেশা জ্বলজ্বল করছে। অনীহা ভরা কণ্ঠে বললেন,
“বলবো তো। অভিশাপ দেবো। খুব বাজে ভাবে যেন হার হয় ঐ অহংকারী রানির। ধুঁকে ধুঁকে যেন মৃত্যু হয় ওর। মাটিতে যেন মিশে যায় ওর অস্তিত্ব।”

 রানি ইথুন বাঁধ সাধলো সেই প্রতিহিংসার বাক্যে,
“কেবল অভিশাপে যদি সব হতো তবে এই পৃথিবী ধ্বসে পড়তো মানব মনের শাপেই।”

“আমরা আর কী করতে পারি? কী করব? সমস্ত ক্ষমতা আমাদের হাত থেকে ছিনিয়ে নিয়েছে ঐ অমানবিক রানি। আমার ভ্রাতাকে…” আর কথা সম্পূর্ণ করতে পারলেন না রাজমাতা। কেঁদে ফেললেন। 

রানি ইথুন দাঁড়িয়ে গেলো। রাজমাতার দিকে শক্ত চোখে তাকিয়ে বলল,
 “আমায় আজ্ঞা করুন রাজমাতা, আমি আজই আমার পিতার রাজ্যে যেতে চাই।”

আচমকা ইথুনের কথা বোধগম্য হলো না রাজমাতার। তিনি ভ্যাবাচেকা খাওয়া কণ্ঠে বললেন,
“তোমার পিতার রাজ্যে? কিন্তু কেন?”

 “আপনার অভিশাপকে পরিপূর্ণতা দিতে। আমায় আজ্ঞা করুন।”
রানি ইথুনের কণ্ঠস্বর শক্ত, কঠিন, টান টান। রাজমাতা তাকিয়ে রইলেন ইথুনের দিকে। মোলায়েম ইথুনকে খুঁজে পেলেন না আজ। এ মেয়েটি কেমন যেন তার চেয়েও বেশি অন্ধ ক্রো ধে। 
·
·
·
চলবে……………………………………………………

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

WhatsApp