অপরাহ্ণের প্রথম প্রহরের সূর্যটি ধরণী থেকে বিদায়ের প্রস্তুতি নিচ্ছে কেবল। যামিনী পালঙ্কে শুয়ে আছে নরম ভঙ্গিতে। চোখের উপর একটি হাত দিয়ে। ঘুমোয়নি কেবল ঝিমুনি কাটছে।
ঠিক সেই মুহূর্তে তার কক্ষে হন্তদন্ত হয়ে প্রবেশ করল শশী। সঙ্কিত মুখমণ্ডলে তার রাজ্যের ভীতি ও চিন্তা বেশ ফুটে উঠেছে। নিজেকে সংযত করতে পারছে না কিংবা করার চেষ্টাও করছে না মোটেও।
এসেই তড়িঘড়ি করে বলল, “রানি, ক্যামিলাস রাজ্য থেকে বার্তাবাহক এসেছেন পত্র নিয়ে।”
শশী ভেবেছিলো তার মতনই বিচলিত হবে যামিনী এই সংবাদটি শুনতে পেয়ে। হয়তো নিমিষেই চোখ খুলে হম্বিতম্বি করবে। কিন্তু তেমন কিছুই হলো না। বরং যামিনী আলগোছে চোখ মেলে বলল,
“তাকে বসতে বলো। আহারের আয়োজন করো। আমি আসছি।”
যামিনীর এহেন শীতলতা ঠিক হজম হচ্ছে না শশীর তবুও সে আগ বাড়িয়ে তার সংশয় প্রকাশ করল না। নিজের ভীতি সংবরণ করার চেষ্টা করে বলল, “বলেছিলাম আহারের কথা। তিনি প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছেন এবং বলেছেন— শত্রু রাজ্যের আহার তার কাছে বিষ ভক্ষণ।”
যামিনী এবার সরাসরি দৃষ্টি রাখলো শশীর দিকে। হাসলো খানিক ঠোঁট বাঁকিয়ে। আরাম-আয়েশে পালঙ্ক ছেড়ে উঠে দাঁড়াতে দাঁড়াতে বলল,
“এই রানি কামিনীকাঞ্চন বোধহয় ছোঁয়াচে ব্যাধির মতন। যেখানেই যান সেখানেই তার মতাদর্শ ছড়িয়ে পড়ে। কীভাবে সব জায়গায় নিজের প্রভাব এত শক্তিশালী ভাবে বিস্তার করেন কে জানে! বিস্মিত হই মাঝে মাঝে।”
এই অব্দি রানি কামিনীকাঞ্চনের নামে বিশেষ প্রশংসা শুনেনি শশী এই যামিনীর মুখ থেকে। আজ তাই তার কিছুটা অবাকই লাগলো। তাছাড়া ক্যামিলাস রাজ্য থেকে বার্তাবাহক কী পত্র নিয়ে উপস্থিত হয়েছে তা বুঝতে কারোরই বিশেষ সমস্যা হয়নি। সেসব বুঝেও যামিনী কীভাবে এতটা স্থির আছে তা তার বুঝে আসছে না। কিন্তু আজকাল যামিনীর উগ্র মেজাজ এতটাই ভয়ঙ্কর হয়ে গিয়েছে যে প্রশ্ন করার সাহসটুকু হলো না তার।
—————
বৈঠকখানায় যথারীতি দাঁড়িয়ে আছে ক্যামিলাস রাজ্যের সেনাপতি। বুক উঁচু করে, নির্ভয়ে। কোনো নড়চড় নেই। তাকে বসতে বলার পরেও সে বসেনি। মূর্তির মতন নিশ্চুপ তার অবস্থান।
যামিনী এলো কিছুটা রয়েসয়েই। এসেই পত্রটি প। সকসড়তে বলল তার সভারই বিশেষ সদস্যকে। পত্রটি পড়লেন তিনি। জোরে জোরে। সকলেই শুনলো পত্রতে উল্লেখ আছে কী।
পত্র পড়া শেষ হতেই সভা সদস্য তাকিয়ে রইল যামিনীর দিকে। পরবর্তী পদক্ষেপ কী হবে তা বুঝার জন্য। যদিও সে রানি কামিনীকাঞ্চনের সময়কারই সভা সদস্য তবুও দায়িত্বের খাতিরেই জিজ্ঞেস করল,
“এখন কী করবেন?”
যামিনী সহজ স্বরে বলল, “আর কী করবো? তলোয়ারের বিপরীতে তলোয়ারই তো ধরতে হবে তাই না? যু দ্ধেসর প্রস্তুতি নিতে হবে।”
“কিন্তু…”
“কোনো কিন্তু নয়।”
থেমে গেলো সভা সদস্য। যামিনীর বিপরীতে আর কিছু বলার সাহস হলো না তার।
যামিনী এবার ক্যামিলাস রাজ্যের সেনাপতির দিকে তাকিয়ে বলল, “গিয়ে বলবেন এ্যাজেলিয়া রাজ্য যু দ্ধের জন্য প্রস্তুত। আপনাদের রানির তলোয়ারের শক্তি এবার আমরাও দেখি।”
সেনাপতি কেবল হেলায় হাসল। বুক টান টান করেই বেরিয়ে গেলো। যাবার বেলা একটিবার যামিনীকে কুর্নিশ করারও প্রয়োজন বোধ করল না যা যামিনীর গায়ে লাগলো ভীষণ। তবুও সে সেসব কিছুকে আর গায়ে লাগালো না। এর যু দ্ধে তার মৃত্যু নিশ্চিত। যু দ্ধ না করলেও যে বেঁচে থাকবে তেমনটা নয়৷ তবে একবার রণক্ষেত্রে নামতে ক্ষতি কি? হারবার আগে যদি শেষ হিসেবটুকু মিটিয়ে ফেলা যায় তবে তা-ই হলো!
“আপনি যুদ্ধের জন্য ঘোষণা দিলেন কিন্তু আমাদের প্রধান মন্ত্রীমহোদয় ও সেনাপতির প্রধানই তো কারাগারে বন্দী। তাদের ছাড়া পরিচালনা করবে কে এই যু দ্ধ? সৈনিক প্রশিক্ষণ, প্রস্তুত সেসব তো মন্ত্রীমহোদয়ের নির্দেশে সেনাপতিই করবেন।”
সভাসদ্যসের কথা যুৎসই মনে হলো যামিনীর। খানিক চুপ থেকে সে নির্দেশ করল মন্ত্রী ও সেনাপতিকে মুক্তি দেওয়ার।
—————
আজ রাজবৈঠকের যাবতীয় আলোচনা শেষ। রানি কিছু কথা বলবেন সাধারণ সৈনিক ও তাদের পরিবারের উদ্দেশ্যে। এরপরই রওনা হবেন সৈন্যসামন্ত নিয়ে যুদ্ধের ময়দানে। তাই রাজপ্রাসাদের সামনে অসংখ্য মানুষের ভিড় জমেছে।
রানি নিজের কক্ষে তৈরি হচ্ছে বেশ সময় নিয়ে। তীব্র সুঘ্রাণ ভেসে আসছে তার শরীর থেকে। নিজেকে তিনি খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখছেন আরশিতে। খুব গভীর ভাবে খেয়াল করলে বোঝা যায় গলার একদম ডান দিকে দু-চারটা ছোপ ছোপ দাগ। গভীর ভাবে না তাকালে কেউ দেখবেও না অবশ্য। এছাড়া সারা শরীরে কোথাও সেই নোংরা অসুখটির চিহ্নমাত্র নেই। পুরোনো রাজ বৈদ্যের সাহায্যে তার চাঁদের ন্যায় শরীরে কলঙ্কের মতন ফেলা সেই দাগ গুলো মুছে গিয়েছে। রানির আজও মনে পড়ে কীভাবে তিনি ভড়কে গিয়েছিলেন নিজেকে সেই অবস্থায় দেখে। কীভাবে ভেঙে গিয়েছিলো তার আত্মা। নিজের তীব্র সৌন্দর্যতায় এমন ভয়াবহ ছাপ তার বুকে ভয় জমিয়ে ফেলেছিলো। নিজেকে দেখতেই তখন তার ঘৃণা লাগতো।
কিন্তু হেমলক কখনো সেগুলোকে ঘৃণা করেনি বরং যত্নে সেখানে লেপেছিলো পথ্য। রানিকে বারংবার এটাই বুঝিয়েছিলো, এই বাহ্যিক সৌন্দর্যই কেবল রানি কামিনীকাঞ্চনের পরিচয় নয়। রানি কামিনীকাঞ্চনের পরিচয় তার অন্তর। তার তেজ, তার অহংকার। এজন্য রানি বোধহয় হেমলকের কাছে চির কৃতজ্ঞ। ঐ বিশ্বাসঘাতকতার সময়টায় সাথে রূপে বিধ্বস্ততায় তিনি তো প্রায় আশাই ছেড়ে দিয়েছিলেন। মানুষটা না থাকলে আজ হয়তো তার জীবনের চিত্র ভিন্ন হতো। বাঁচতো কি আদৌ সে?
হেমলক এলো, তাড়া দিলো। রাজপ্রাসাদের বাহিরে থাকা জনগণের আগ্রহের কথাও জানালো। রানির যেকোনো সিদ্ধান্তে হেমলক পুরোদমে সম্মতি দিয়ে গিয়েছে চিরটাকাল। আজও অন্যথা হয়নি এর।
রানি ভাবনা বিহীন চোখে তাকাল। আজ তার চোখ মোলায়েম। তবুও নিবিড় স্বরে বলল,
“আমি আজ রণক্ষেত্রের উদ্দেশ্যে যাত্রা করব। আমি হারতে শিখিনি। তাই জয়ী হয়েই ফিরে আসব। কিন্তু যদি ফিরে না আসা হয় তাই কিছু কথা বলে যেতে চাই।”
হেমলক রানির থেকে কিছুটা দূরে দাঁড়িয়েই রানিকে ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ করছিলো। আচমকা রানির এহেন কথায় তার ধ্যান চ্যুত হলো। এগিয়ে এলো সে তৎক্ষনাৎ। রানির ঠোঁটের সামনে রাখল আঙুল,
“কিচ্ছু হবে না তোমার। রানি কামিনীকাঞ্চন জয়ী হয়ে ফিরে আসবে। তার এই পৃথিবীতে আরও বহুকাল রাজ করা বাকি।”
“মৃত্যু এমন এক সত্য যাকে অস্বীকার করার ক্ষমতা কারো নেই। তাই আমি চাই কিছু কথা জানাতে।”
“ফিরে এসে জানিও। আমি তোমার কথা শুনতে সবসময় প্রস্তুত।”
“ফিরে আসার সময় অনিশ্চিত। কথা রয়ে গেলে মৃত্যুও পরিপূর্ণতা পাবে না। আমি আপনার কাছে কৃতজ্ঞ থাকব। আপনাকে সব বলা হয়েছে, এটা বলা হয়নি যে— এই পৃথিবীতে এই প্রথম কোনো পুরুষ যার কাছে আমার কৃতজ্ঞতা স্বীকার করতে কোনো বাঁধা নেই।”
“কৃতজ্ঞতা? ভালোবাসার সম্পর্কে কোনো কৃতজ্ঞতা থাকে নাকি!”
“সম্পর্কটা ভালোবাসার হলেও এখানে আমার পক্ষ থেকে তো কোনো ভালোবাসা আদৌ ছিলো না। তাই কৃতজ্ঞতাটা জানাতেই হতো।”
কী অকপটে অ-ভালোবাসার কথাটা বলে দিলেন রানি। হেমলক তাকিয়ে রইল তার দিকে নির্নিমেষ। পৃথিবীতে এমন কঠিন বাক্য বলে হৃদয় ভাঙার ক্ষমতা এই নারী ব্যতীত বোধহয় কাউকে দেয়নি স্রষ্টা। যাক, রানি এমন জেনেই তো সে ভালোবেসেছে।
হেমলক গিলে নিলো সেই কঠিন বাক্য। হাস্যোজ্জ্বল কণ্ঠে বলল,
“আচ্ছা, কৃতজ্ঞতা মাথা নত করে নিলাম। ফিরে আসবে সেই প্রার্থনাই করি।”
এই প্রথম হেমলকের হাসির বিপরীতে খুবই সামান্য হাসলেন রানি। চোখের পলক ফেলে হেমলকের কথার সম্মতি দিয়ে বললেন,
“মৃন্ময়ী আপনার ভালোবাসার সঠিক মূল্যায়ন করতে পারবে বলেই আমি আশা রাখি। আমি পুরুষের প্রেমে এই জীবনে কখনোই আর ভুলব না। আমার অন্তর এতটাই কঠিন হয়ে গিয়েছে যে, কখনো সেটি নরম হওয়ার নয়।”
হেমলক রানির দিকে তাকালো। আজ অন্যরকম লাগছে তার রানিকে। কেমন করে যেন কথাগুলো বলছে। সে আর কথা বাড়াবে না ভাবল।
“আমি মূল্যায়ন চাইনি। ভালোবাসার বিপরীতে ভালোবাসা চাইনি। তাই কোথায় গেলে ভালোবাসা পাবো সেই পথ না-হয় না-ই দেখালে। তুমি আমাকে ভালোবাসবে না তা আমি হাসিমুখে মেনে নিবো। কিন্তু তোমার দিকের ভালোবাসা তাই বলে অন্য কারো থেকে নিবো, এমন কথা আমার মেনে নিতে কষ্ট হয়। বলো না কখনো।”
রানি কামিনী নির্ভার চোখে হেমলকের দিকে তাকিয়ে রইলেন। পূর্বের হাসি বজায় রেখেই মৃদু নাড়লেন মাথা। এরপর আস্তে ধীরে বেরিয়ে গেলেন।
প্রজাদের উপচে পড়া ভিড়ের সামনে দাঁড়ানো রানিকে লাগলো বৃহৎ পর্বতশৃঙ্গ। মাথা উঁচু অদম্য পাহাড়। চোখে উত্তপ্ত ভানুর প্রতাপ। কণ্ঠে মেঘের তীব্র গর্জনের মতন কণ্ঠস্বর। প্রবল আত্মবিশ্বাসী স্বরে তিনি বললেন,
“আমরা আজ যুদ্ধের উদ্দেশ্যে রওনা হবো। যাওয়ার আগে আমি সকলকে বলে যেতে চাই, এই ক্যামিলাস রাজ্য আমাকে অসংখ্য ভালোবাসা দিয়েছে। সেই ভালোবাসা আমার কাছে নতুন একটি জীবন পাওয়ার মতন। আজ আমরা সকলে যুদ্ধক্ষেত্রে যাচ্ছি। আমরা অবশ্যই ফিরে আসবো। আপনারা কেবল এই বিশ্বাসে অপেক্ষা করবেন যে, আমি, রানি কামিনীকাঞ্চন কখনো আমার প্রজাদের দুর্ভোগ পোহাতে দিবো না। আমাদের জন্য আপনারা প্রার্থনা করবেন। জয় আমরা ছিনিয়ে আনবোই।”
প্রজারা সমস্বরে চেঁচিয়ে জানালো তারা সঙ্গে আছে।
রানি অতঃপর ঘোড়ায় চড়ে বসল। হেমলক হাঁটু ভেঙে বসে রানিকে ঘোড়ায় উঠতে সাহায্য করল। যদিও তার প্রয়োজন ছিলো না এই সাহায্যের কিন্তু হেমলক প্রত্যাখ্যান করার সুযোগই দিলো না।
সারি সারি সৈনিক যথারীতি প্রস্তুত। সাথে সারি সারি অস্ত্র। অসংখ্য তলোয়ার। রানি রইলেন সবার আগে। প্রজাদের বাঁচাতে তিনি মৃত্যুর দিকে দাঁড়ালেন সর্বপ্রথমে। যেন সমস্ত বিপদ আছড়ে যায় তার বুককে।
হেমলক রানির দিকে তাকিয়ে রইল। রানি সেই তাকানোর বিপরীতে বলল,
“গেলাম।”
“যাই বলতে নেই। আসছি বলো।”
“চলে যাওয়ার নামে আসছি বললে মিথ্যে আশ্বাস হবে না কি?” কঠিন কথা অথচ হাসিমুখে বলল রানি। আজ যেন স্বর্গীয় হাসি নেমে এসেছে তার ঠোঁটে। হেমলক চুপ করে থাকল। তার বুকে বাসা বাঁধল রানির ফেরার অপেক্ষা।
চারপাশে বেজে উঠল ঘণ্টা, শঙ্খ। উড়ল পতাকা। যুদ্ধের প্রথম নিশানা উড়িয়ে রানির ঘোড়া টগবগিয়ে প্রস্থান নিলো। সঙ্গে সঙ্গে অসংখ্য সৈন্যবাহিনী ছুটলো বিকট শব্দে। পেছনে রেখে গেলো কিছু উড়ন্ত ধূলো ও হেমলকের পলকহীন দৃষ্টিকে।
·
·
·
চলবে……………………………………………………