ধূলো উড়িয়ে, চারপাশকে উন্মাদ করে রানির ঘোড়া যখন ক্যামিলাস রাজ্য ছেড়ে এ্যাজেলিয়া রাজ্যে পা রাখলো তখন তার চোখের সামনে একে একে ভাসমান হলো জীবনের সকল স্মৃতি। তার শৈশব, তার কৈশোর, তার সকল বেদনার ক্ষত। এই রাজ্য তার থেকে যেমন অনেককিছু নিয়েছিলো তেমন দিয়েছিলো অনেককিছু। তাকে বেঁধে নিয়েছে এই রাজ্যের মাটি। তার শেকড় যে এখানেই বাঁধা!
—————
একটি খোলা ময়দান। সৈন্য, ঘোড়া, রাজরথে ভরা সেই বিস্তৃত ভূমি। তার চারপাশেই গহীন বন সাথে মাঝারি, ছোটো ছোটো কিছু পাহাড়।
যামিনীর সৈন্যসামন্ত ময়দানে অবস্থান করে নিলেও যামিনী সেখানে অনুপস্থিত। নেতৃত্বে আছে রাজ্যের নতুন সেনাপ্রধান।
রানি জানতেন যামিনী এত শীগ্রই তার সামনে আসবে না। যামিনী আসবে রয়েসয়ে। রানির মনে হ্যাব্রোকে না দেখে খানিক খটকা তো লাগলোই। কিন্তু যুদ্ধের মাঠে এতকিছু ভাবার সময় কি আর আছে?
দুই দল তাদের অবস্থান পোক্ত করতেই যুদ্ধের ঢাক, শঙ্খ বেজে উঠল সমন্বয়ে। সেই শব্দ তুমুল থেকে তুমুল রূপ নিলো। রানি খেয়াল করে দেখলেন তার বিপরীতে দাঁড়িয়ে আছে তারই রাজ্যের সৈনিক। ভাগ্যের সে কী নির্মম পরিহাস! শেষমেশ নিজের রাজ্যের জন্য, নিজের সৈন্যদলের সাথেই যুদ্ধ করতে হবে? আঘাত করতে হবে!
বিপরীত পক্ষ থেকে লাল রঙের পতাকা উত্তোলন হতেই রানি উচ্চস্বরে চেঁচিয়ে নির্দেশ ছুঁড়লেন,
“তীর ছুঁড়তে শুরু করো। সকলে সারিবদ্ধ হয়ে সামনে এগোও।”
রানি ঘোড়াতে অবস্থান করা অবস্থাতেই তীব্র চিৎকারে দুই পক্ষ আরম্ভ করে দিলো মৃত্যু তাণ্ডব। ধূলো উড়তে লাগলো চারপাশে। তীরের আঘাতে কেউ কেউ পড়তে আরম্ভ করল। অসহনীয় বেদনায় চিৎকার করে উঠল কেউ কেউ। ধারালো তলোয়ারের ঘাত-প্রতিঘাত হওয়া শব্দ কানে এসে লাগলো তার। রোদের আলোয় সেই তীর, সেই তলোয়ার কথা বলল।
রানি ঘোড়ায় ছিলেন। তার পাশাপাশি ঘোড়াতেই সেনাপ্রধান, শক্ত সৈন্য কিছু জড়ো হয়ে অনবরত তীর ছুঁড়ছে। তাকে ঘিরে রেখে সবটা করছে যেন কোনো আঘাত তার শরীর অব্দি আসতে না পারে।
রানি তাকিয়ে দেখলেন, কয়েক লহমায় বিরাট ভূমি র ক্তে রঞ্জিত হতে শুরু করেছে। তার রাজ্যের সৈন্যদের তীরের তোপে এ্যাজেলিয়া রাজ্যের প্রথম সারির সৈন্য বেশ ক্ষত-বিক্ষত হয়ে গিয়েছে। রানির ঠোঁটে তখন ফুটে উঠল হাসি। প্রথম প্রহরের জয়টা তাকে দিয়েই শুরু হলো।
রানি তার সৈন্যদের নির্দেশনা দিতে লাগলেন,
“এগিয়ে যাও। তলোয়ার থামতে দিও না। এগোও তোমরা।”
ঘোড়া, বিশাল হাতিগুলো তাদের হাঁক-ডাকে যুদ্ধক্ষেত্র আরও লোমহর্ষক করে তুলল।
বনের পেছনের মাঝারি পাহাড়ের তাঁবুতেই যামিনী দাঁড়িয়ে আছে। যুদ্ধাঙ্গন এখান থেকে স্পষ্টই দেখা যাচ্ছে। অসংখ্য সৈনিক, অ স্ত্র, হাতি-ঘোড়ার ছুটোছুটি, বিশৃঙ্খলা বাদ যাচ্ছে না তার চোখের সামনে থেকে।
সবে মাত্র প্রভাত নেমেছে। এখনই সৈন্যদের এ দশা চলতে থাকলে তার যে জয় সম্ভব হবে না। তাছাড়া ক্যামিলাস রাজ্যের তুলনায় তার যে সৈন্যসামন্ত কিছুটা কম। রানির কৌশলী আক্রমণের কাছে সেই সৈন্যদল আদৌ দাঁড়িয়ে থাকতে পারবে? তাছাড়া সেনাপতি নব্য। সে বুঝবে পরিচালনা?
যামিনীর গুপ্তচর এলো তখুনি। হতাশা তার চোখ-মুখে ছেয়ে আছে। এসেই ভগ্ন হৃদয় নিয়ে বলল,
“সেনাপতি হ্যাব্রো যে কোনোমতেই এখানে উপস্থিত হতে চাচ্ছেন না। উনি বলছেন এই রাজ্যের না-কি এটাই সাংবিধানিক নিয়ম যে, কোনো অপরাধীর শাস্তি বিনা কারণে মওকুফ করা হয় না। এবং বিনা কারণে কারাগার থেকে অপরাধীকে মুক্তি দেওয়া যায় না।”
যামিনী সামনের দিকেই দৃষ্টি রেখে মনোযোগ সহকারে শুনল। হ্যাব্রোর চতুরতা দেখে সে রীতিমতো অবাক না হয়ে পারছে না। ঠিক এই দিনটার জন্যই হ্যাব্রো সেদিন এমন কাণ্ড করল। ইচ্ছে করে তাকে রাগালো যেন সে তাকে কারাগারে নিক্ষেপ করে। এতে রানি কামিনীকাঞ্চনের মুখোমুখি আর দাঁড়াতে হবে না। রাজ্যের সেনাপতি থাকলে তো তার আদর্শ অনুযায়ী রাজ্যের নিরাপত্তার জন্য যুদ্ধক্ষেত্রে নামতেই হতো। এখন যেহেতু কারাগারে বন্দী তাই তার সেই দায়িত্ব পালনের আর কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। কতটা বুদ্ধি খাটিয়ে সে যামিনীকে ঠকালো! অথচ সে কি-না হ্যাব্রোর এই চাল বুঝতেই পারল না? কী বোকা সে!
মন্ত্রীমহোদয় অবশ্য ছাড়া পেয়ে যামিনীর কথানুযায়ীই উপস্থিত হয়েছে। সে অবশ্য যামিনীর সাথে আছে শলাপরামর্শের জন্য। হ্যাব্রোর সংবাদটি মন্ত্রী পাশ থেকেই শুনল। মনে মনে যদিও যামিনীর নাকানিচুবানি অবস্থানের কথা ভেবে হাসি পেলো কিন্তু উপরে উপরে তা প্রকাশ করল না সে। বরং নাটকীয় ভঙ্গিতে চিন্তা প্রকাশ করে বলল,
“সেনাপতি হ্যাব্রো পরিচালনা করলে এই যু দ্ধ আমাদের জন্য জয়ের হতো। উনার মতন বুদ্ধি যুদ্ধক্ষেত্রে কারো নেই।”
যামিনী শেষমেশ গতি না পেয়ে হ্যাব্রোকে কারাগার থেকে এখানে নিয়ে আসার নির্দেশ দিলো। তার এখন আর মাথা কাজ করছে না। যতই নিজেকে শান্ত রাখার চেষ্টা করুক না কেন, মন তো বিচলিত হচ্ছেই বারংবার। রানি কামিনীকাঞ্চনের সৈন্যদের যেই গতি, তাতে বেশিক্ষণ যুদ্ধক্ষেত্রে তাদের টিকে থাকা দায়।
যুদ্ধক্ষেত্রের ঘাত-প্রতিঘাত তীব্রতর হতে আরম্ভ করেছে। এ্যাজেলিয়া রাজ্যের সৈনিকরাও কোনো একদিন রানি কামিনীকাঞ্চনের প্রশিক্ষণেই যুদ্ধের ময়দানে কীভাবে বিচরণ করবে তা শিখেছিলো তাই প্রথম তোপে কিছুটা আঘাতে তাদের প্রথম সারির সৈন্যরা আহত-নিহত হলেও পরের ধাপে তারা নিজেদের আরও শক্তিশালী ভাবে উপস্থাপন করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। রণক্ষেত্রে তখন মৃত্যুর দূত দাঁড়িয়ে হাসছে। কার জয় হবে তা অনিশ্চিত থাকলেও মৃত্যুর জয় নিশ্চিত। শত শত প্রাণ যাওয়া নিশ্চিত।
শেষমেশ হ্যাব্রোকে টেনে নিয়ে আনা হলো কারাগার থেকে। শেকল বাঁধা তার শরীরে। আসতে নাকচ করাতেই শেকল বেঁধে নিয়ে আসা হয়েছে।
তাকে এনে রাখা হলো যামিনীর তাবুতে। যামিনী সঙ্গে সঙ্গে গেলো সেখানটায়। শশী যেতে ভুলল না তারি সাথে। ওর মনে তো ভীষণ ভয়। রানি কামিনীকাঞ্চনের হাতে ধরা পড়লে কীভাবে যে মারবে তার ইয়াত্তা নেই।
যামিনী সামনে গিয়ে দাঁড়ানোর পরেও হ্যাব্রোর কোনো নড়চড় নেই। সে শক্ত, কঠিন মুখে তাকিয়ে আছে নিচে। তার কপালের একদিকটায় রক্ত ঝড়ছে। হয়তো টানাহেঁচড়া করতে গিয়ে লেগে গিয়েছে। যামিনী সেই র ক্ত দেখেই বিচলিত হয়ে গেলো। ভুলে গেলো যু দ্ধের কথা, ভুলে গেলো জয়। দৌড়ে গিয়ে মুছিয়ে দিলো হ্যাব্রোর কপাল তাও নিজের হাতের কাপড়টি দিয়ে। বিচলিত ভঙ্গিতে শশীকে আদেশ করে বলল,
“শশীপূর্ণা, এখুনি ঠান্ডা জল আনো।”
শশীপূর্ণা যামিনীর এহেন উদ্বেগ দেখে ভ্রু কুঁচকায়।
সে মাঝে মাঝে যামিনীকে বুঝে উঠতে পারে না। এই মেয়েটা পুরো পৃথিবীর সাথে কেমন যেন আচরণ করে আর এই হ্যাব্রোর সামনে এলেই পুরো যেন বদলে যায়।
যামিনী শশীর দাঁড়িয়ে থাকা দেখে ক্ষুব্ধ হলো,
“যাচ্ছো না কেন এখনো? আমার মুখে কী দেখছো দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে?”
ভয় পেয়ে গেলো শশী। দৌঁড়েই বেরিয়ে গেলো।
হ্যাব্রো চুপ করে সব পর্যবেক্ষণ করল। যামিনী কিছু বলার আগেই সে ক্ষীণ স্বরে বলল,
“আমি এই যুদ্ধক্ষেত্রে যাবো না সে আপনি আমাকে মৃত্যু দিতে পারেন। তবে আমি এখনো বলছি আপনি পালিয়ে যান। এই যুদ্ধে জয় রানি কামিনীকাঞ্চনেরই হবে।”
হ্যাব্রোর ক্ষীণ স্বরে বলা বাক্যে যামিনী নিশ্চুপ হয়ে তাকিয়ে রইল হ্যাব্রোর দিকে। প্রতিত্তোরে না রেগে প্রশ্ন করল,
“কামিনীকাঞ্চনই কেন জিতবে? আমি নই কেন?”
তাচ্ছিল্য হাসল হ্যাব্রো। বলল,
“রানি কামিনীকাঞ্চন ঐ রণক্ষেত্রে দাঁড়ানো আর আপনি নিজেকে দেখুন! এই তাবুতে দাঁড়িয়ে আছেন। আপনাদের পার্থক্য এখানেই। আর এই পার্থক্যের জেরেই উনি জিতবেন আর আপনি হারবেন। উনি জাত রানি। উনার রক্তে রাজত্ব, রাজনীতি ছুটে বেড়াচ্ছে। উনার সাথে নিজের তুলনা করার বোকামি করবেন না। উনি ঐ যুদ্ধক্ষেত্রে দাঁড়ানো মানেই উনাদের সৈন্য সবচেয়ে বেশি সাহস ও শক্তি নিয়ে যুদ্ধ করা। কারণ তাদের সাথে তাদের সবচেয়ে বড়ো অস্ত্র- রানি আছেন। রানি তাদেরকে যুদ্ধের ময়দানে পাঠিয়ে নিজে নিরাপদ দূরত্বে নেই। বরং তাদেরই মতন তাদেরই সাথে প্রাণ দিতে চলে এসেছেন। অথচ আপনি নিজেকে দেখুন! আপনার সৈন্য কেনই বা আপনার জন্য প্রাণ দিবে? যেখানে তাদের প্রাণের মূল্য আপনার কাছে নেই। আপনাদের ভেতর পার্থক্য ছিলো, আছে ও থাকবে।”
এই গাঢ় সত্যি কথা গুলো চুপচাপ শুনল যামিনী। হ্যাব্রোর সারা মুখে একবার চোখ বুলিয়ে বেরিয়ে গেলো তাবু থেকে। সে যতই রানি কামিনীকাঞ্চন হতে চাইল ততই আরও আরও বুঝতে পারল সে কতটা অযোগ্য। এবং তা বুঝালো কে? তারই প্রিয় পুরুষ হ্যাব্রো। হাহ্!
—————
অপরাহ্ন নামতেই যুদ্ধের বিরতি ঘোষণা করা হলো। অন্ধকার নামলে যুদ্ধের রথের ঘোড়া, হাতিরা ভীত থাকে। তারা বেসামাল আচরণ করতে আরম্ভ করে। তাছাড়া সঠিক আলো না পেলে কার সৈন্য কে মারছে বোঝারও উপায় কী! তাই সকল সৈন্য নিজ নিজ মতো নিজস্ব তাবুতে ফিরে যাচ্ছে।
এ্যাজেলিয়া রাজ্যের আহত সৈন্যদের নেওয়া হচ্ছে তাদের রাজ্যের দিকে আর ক্যামিলাস রাজ্যের সৈন্যদের নেওয়া হচ্ছে উত্তর জঙ্গলের দিকে। ওখানেই তাদের অসংখ্য তাবু টাঙানো। রাজ বৈদ্য ও তার সাহায্যকারীরা ছুটোছুটি করে সাহায্য করছে আহতদের। অদ্ভুত বিষয় হলো ক্যামিলাস রাজ্যের নিহত সৈন্য নেই। কিন্তু এ্যাজেলিয়া রাজ্যে সেই সৈন্য সংখ্যা আনুমানিক পচাত্তর তো হবেই। ক্যামিলাস রাজ্যের সৈন্যদের ভেতরে আলাদাই আনন্দ দেখা গিয়েছে। এত নিখুঁত যুদ্ধ এর আগে তারা করেছে বলে মনে হয় না। রানির এত সুন্দর পরিচালনা তাদের রেখেছে অক্ষত। যে ক’জনই আহত হয়েছে তা গুরুতর নয়। সেরে উঠবে।
অন্যদিকে এ্যাজেলিয়া রাজ্যের অবস্থা খারাপ। যামিনী ঘুরে ঘুরে দেখতে লাগল আহত, নিহত সৈন্যদের। নিহতদের পাঠানো হচ্ছে রাজ্যের ভেতর। আহতদের চিকিৎসার ব্যবস্থা করেছে। মশাল জ্বলছে ঢিমে আলোয়। তার সাথে তার বুকের আতঙ্ক বৃদ্ধি পাচ্ছে। সে চোখ মেলে সেসব দেখছে। কী করবে বুঝতে পারছে না। হ্যাব্রোর বুদ্ধিই কি কাজে লাগাবে? পালিয়ে যাবে কি?
ঠিক তখুনি যামিনীকে কেউ ডাকল পেছন থেকে,
“কী ভাবছেন? নিজের সৈন্যদলের এমন দুর্দশায় যু দ্ধ থামানোর কথা ভাবছেন কী?”
নিজের মনের অবস্থার কথা অন্য কারো মুখে শুনে চমকে উঠল যামিনী। পিছু ফিরতেই দেখলো বিরাট জৌলুশ নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন একজন রানি। যামিনী চেনে তাকে। বিস্ময় নিয়ে বলল,
“রানি ইথুন?”
“হ্যাঁ, আমিই। এলাম আপনার সাহায্য করতে। রানি কামিনীকাঞ্চনের জন্য এই যু দ্ধই হবে শেষ যু দ্ধ। আগামীকাল থেকে তিনি দেখবেন কীভাবে ঘুরে গিয়েছে ভাগ্যের চাকা।”
·
·
·
চলবে……………………………………………………