কামিনী - পর্ব ৬২ - মম সাহা - ধারাবাহিক গল্প

কামিনী - মম সাহা
          অপরাহ্নের শেষ প্রহরে সূর্য অস্ত যাওয়ার আগ মুহূর্তে যখন ধরণীর আলো থিতিয়ে গেলো তখন থেমে গেলো যুদ্ধ দ্বিতীয় দিনের মতন। 
রানি ইথুন যেই রথ দিয়ে এসেছিল সেই রথেই ফিরে গেলো বিজয়ী ভঙ্গিতে। রানি পড়ে রইলেন মাটিতে। তার জ্ঞান আছে। চার দিকে তাকিয়ে দেখলেন তার অসংখ্য সৈন্য ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। বহু সৈন্যেরই প্রাণ নেই। আর বহু কাতরাচ্ছে তীব্র যন্ত্রণায়। 
 সেনাপতি লজ্জিত ভঙ্গিতে মুখ নত করে দ্রুত এলো রানিকে তুলতে। রাজ বৈদ্যও এলো। রানির চোখের সাদা অংশ ইতিমধ্যে রক্তবর্ণ ধারণ করেছে। ঘর্মাক্ত মুখের চারপাশে তার কিছু চুল এসে লেপ্টে আছে। যেন সবচে উঁচু প্রাচীরটি ভেঙে পড়েছে। দিগন্তের লাল সূর্যটি হেলে গিয়েছে। 

“দুঃখীত, রানি। আমার জন্য আজ আপনার এমন আঘাত পেতে হলো। আপনি শীগ্রই উঠুন। আপনার জখম থেকে আরও র ক্ত বের হলে ঝুঁকি বাড়বে।”
 সেনাপতির কথাকে সম্মতি জানিয়ে রাজবৈদ্যও বলল, “হ্যাঁ, হ্যাঁ, উঠুন রানি। আমি সাহায্য করছি। আপনাকে দ্রুত চিকিৎসা দিতে হবে।”

রানি জ্বলন্ত চোখে তাকালেন, “আমি আঘাত পেয়েছি? কেবল আমি? তোমরা চারপাশে দেখছো না? আমার সৈন্যরা পড়ে আছে তা কি তোমরা দেখছো না?”

শেষ বাক্যটি এত জোরে বললেন যেন কেঁপে উঠল অন্ধকার ধরণী। কেঁপে উঠল সেনাপতি ও রাজবৈদ্যও। থতমতও খেলো। 

 “যাও দ্রুত ওদের চিকিৎসা দাও। আমার সৈন্যদের প্রাণ বাঁচাও। ওরা আমার প্রাণ। সত্যিকারের প্রাণনাশ তখন হবে আমি যখন সৈন্য ছাড়া হবো। তাই আমার সৈন্যদের বাঁচাও। যাও।”
 রানির কণ্ঠস্বর আচমকা এত উঁচুতে উঠেছে যে সেনাপতি আর রাজবৈদ্য সেই আদেশ অমান্য করার সাহস পেলো না। 

দ্রুত গিয়ে আরও অন্যান্য সৈন্যদের সাহায্য নিয়ে আঘাতপ্রাপ্ত সৈন্যদের নিয়ে গেলো নিজেদের আস্তানার দিকে। নিহত সৈন্যদেরও নিয়ে গেলো। তাদের আবার রাজ্যে পৌঁছানোর ব্যবস্থা করতে হবে। কয়েক পলকেই ময়দান খালি হয়ে গেলো। রানি বসে রইলেন ঠাঁই। তার দৃষ্টি মাটির দিকেই নিবদ্ধ। 
 সকল সৈন্যকে নিয়ে যাওয়ার পর আবারও দ্বিধান্বিত হলো সেনাপতি। ধীরে ধীরে এগিয়ে গেলো রানির কাছে। রাজ বৈদ্য দাঁড়িয়ে রইল একটু দূরে। 

“রানি, সবাইকে নেওয়া হয়েছে তো। আপনি চলুন এবার।”

  রানি তার নত মস্তক তুললেন না। কণ্ঠ এবার হলো ক্ষীণ, “তুমিও যাও। আমি আসছি।”

সেনাপতি আর জোর করল না। রানিকে জোর করার অধিকার কি আর একজন সেনাপতির থাকে আদৌ!
 সে মাথা নাড়িয়ে, কুর্নিশ করে যেই পা বাড়ালো রানি তখন পিছু ডাকলেন, “শোনো, সেনাপতি।”

  এমন মোলায়েম, স্নেহপূর্ণ ডাককে কি ফেলে দেওয়ার ক্ষমতা কারো আছে? নেই। সেনাপতিও ফেলতে পারলেন না। বরং তৎক্ষণাৎ পিছু ফিরে তাকাল। আগ্রহী কণ্ঠে বলল, “আজ্ঞা করুন, রানি।”

রানি এবার তাকালেন মাথা তুলে। চোখ গুলো তার ভরা বর্ষার নদীর মতন টলমল করছে। মুখ বিষণ্ণ সন্ধ্যার মতন মলিন হয়ে গিয়েছে। কণ্ঠে নেমেছে নিবিড় বৈরাগ্য, 
“তুমিও চিকিৎসা নিও। তোমার পিঠেও আঘাত রয়েছে। তোমরা আমার মাথার মুকুট। তোমরাই তো বুক উঁচু করে আমার জন্য প্রাণ দিতে পারো। পিঠ দিয়ে লুকিয়ে রাখো আমাকে যেন একটি আঁচড়ও না লাগে। তোমাদের পিঠে যদি ক্ষত হয় তবে আমায় বাঁচাবে কে? আমি রানি কামিনীকাঞ্চন, সব করতে পারি এটা যেমন ঠিক তেমন এটাও ঠিক, প্রজা ছাড়া তাদের রানি কিচ্ছু না। কিচ্ছুটি না। তোমাদের পিঠের যত্ন নিও। তোমাদের রানির জন্য হলেও নিও। কেমন?”
 কেমন- শব্দটি মমতায় উচ্চারিত। যেন ছোটো শিশুটিকে তার মাতা অঢেল স্নেহ দিয়ে মাথায় হাত বুলিয়ে যত্ন করলেন। সেনাপতি পুরুষ তার উপর বীরযোদ্ধা। সারাজীবন শক্ত খোলশকেই নিজের সর্বস্ব মেনেছিলো কিন্তু আজ ভেতর ভেতর তার বুকের জমিন ভেঙে তোলপাড় হলো। সে যদি সেনাপতি না হতো আর রানি যদি রানি না হতেন তবে সে বোধহয় আজ রানির কোলে গিয়ে মুখ লুকিয়ে বড্ড কাঁদতো। মায়ের মতন মমতার স্বাদে সে শিশুর মতন কাঁদতো। এখনই তার চোখে জল জমে গিয়েছে। সে চোখের অশ্রুটুকু লুকানোর আপ্রাণ চেষ্টা করে বলল,
 “আমরা ঠিক জয়ী হবো। এই এ্যাজেলিয়া রাজ্যও আপনার হবে রানি। আমি আপনার নগন্য সেনাপতি এই কথা দিলাম। আমার শেষ নিঃশ্বাস অব্দি আমি এই কথা রাখার চেষ্টা করব।”

 রানি মাথা নাড়ালেন। হাতের ইশারায় চলে যেতে বললেন। কথা বললে হয়তো নিজের বুকের অসম্ভব পীড়া লুকাতে পারতেন না তাই কথাও বললেন না। 
রাজবৈদ্য সেনাপতিকে ধরে জঙ্গলের ভেতর প্রবেশ করল। পুরো ময়দান জুড়ে একা বসে থাকলেন রানি। তার চারপাশের কিছু কিছু জায়গায় অল্প অল্প আগুন জ্বলছে। ঐ অগ্নিতীরের জন্য। কিছু অংশে রক্তের ছোপ ছোপ দাগ। 

চারপাশ খালি হতেই তিনি বুকের যন্ত্রণা আর লুকিয়ে রাখতে পারলেন না। চিৎকার করে উঠলেন, আসমানের দিকে তাকিয়ে তীব্র অভিমানী স্বরে বললেন,
 “হে স্রষ্টা, আমিই কেন? আমাকেই কেন সবসময় তুমি এই পরীক্ষাতে ফেলবে? কেন চিরটাকাল আমাকেই বাঁচতে হবে লড়াই করে? তুমি আমার সব কেড়েছো, স্রষ্টা। আমিই কেন? তোমার উপর বড্ড অভিমান আমার। বড্ড কষ্ট দিয়েছো তুমি আমায়। তুমি তো জানো আমি কত ভাবে ভেঙেছি। আর না ভাঙলে কি হতো না? কেন এত কষ্ট দিলে আমাকে স্রষ্টা? আমি কি এতই পাপী? আমার কি সুখী হওয়া মানা? কেন আমায় তুমি একটি নরম জীবন দিলে না। রানির মুকুট পরিয়ে কেড়ে নিলে আত্মীয়, পরিবার, বন্ধু, সখী, মাতা, পিতা সব… কেন আমাকেই এত দুঃখ দিলে? আমার যে আর সয় না। আমায় তুমি শান্তি দাও দয়াময়। শান্তি দাও আমার স্রষ্টা।”

তার রাগ, ক্ষোভ, কান্না, হাহাকার ভেসে গেলো সেই চিৎকারে। যেন দূরের কোথাও একটি পাহাড় ভেঙে পড়েছে অচিরেই। ইতিহাসের কঠিন নারী চরিত্র কেঁদে উঠেছে কি-না প্রজাদের যন্ত্রণা দেখে! অথচ এ্যাজেলিয়া রাজ্যে কথিত ছিলো— রানি কামিনীকাঞ্চন নিজের বাবাকেও মৃত্যু দিয়েছিলেন এতই তার দুঃসাহসিকতা ছিলো! এতটাই নির্মম আর পাষণ্ড তিনি।
 সে কথিত কথার উপরেও তীব্র চ ড়ের মতন লাগলো এই চিৎকার। প্রজার জন্য কোথাও কখনো কেঁদেছিলো কি কোনো রানি কিংবা রাজা? হয়তো না। সবাই যে রানি কামিনীকাঞ্চন নয়। সবাই যে অস্তিত্বে রাজ্য, রাজত্ব আর প্রজাদের ধারণ করতে পারেন না। এই ক্ষমতা সবার কি হয়? হয় না। হয়নি, হয় না এবং ভবিষ্যতেও হয়তো হবে না। রানি কামিনীকাঞ্চন যে একজনই হয়। একবারই জন্মায়। 

—————

 পাহাড়ের উঁচু থেকে খুব ক্ষীণ দেখা গেলো রানিকে। অন্ধকার নামাতে স্পষ্ট দেখার জো নেই। কেবল মৃদু ভাবে আগুন বিভিন্ন জায়গায় জ্বলছিলো বলে সেই ক্ষীণ আলোয় রানির ছায়ার ছোঁয়াখানি মিলল। 

 রানি ইথুন তা দেখে মত্ত হলো উল্লাসে। হাসলো প্রাণ ভরে। গর্ব করে বলল, 
“কী রানি যামিনী, আপনার সখীকে মাত দিয়ে দিলাম তো? কেমন লাগলো বলুন?”
 কথা বলতে বলতে যামিনীর দিকে তাকালো রানি ইথুন। অথচ যামিনী যেন শুনলোই না সেসব কথা। সে এক দৃষ্টিতে তাকিয়েই আছে ঐ অস্পষ্ট রানির ছায়াটির দিকে। তার সমস্ত ধ্যান যেন সেখানটাতেই। আনন্দের লেশমাত্র নেই তার চোখে-মুখে। 

ধ্যানে মগ্ন যামিনীকে মৃদু ধাক্কা দিলো ইথুন, “কী ব্যাপার, রানি যামিনী? আপনি দেখছি আনন্দিত হোননি? কী ভাবছেন? আপনার জয়ে তো আমরা প্রায় সফল! কালকের দিনেই দেখবেন এই খেলা শেষ হয়ে যাবে।”

সেই ধাক্কাতে যামিনীর ধ্যান চ্যুত হলো। ঘোরগ্রস্তের মতন বলল, “হ্যাঁ, হ্যাঁ? কিছু বললেন!”

 উন্মনা যামিনীকে দেখে ভ্রু কুঁচকালো ইথুন, “আপনি এতক্ষণ কিছুই শোনেননি? আপনি কি খুশি নন এই জয়ে।”

 “খুশি হয়তো। কিন্তু… “

“কিন্তু কী?” উত্তরের আশায় ইথুন তাকালো যামিনীর দিকে। যামিনী মাথা নাড়িয়ে বলল, “কিছু না।” 

রানি ইথুন আর সেদিকে তেমন তোয়াক্কা না করে আবারও আনন্দে মত্ত হয়ে গেলো কিন্তু যামিনী তাকিয়ে রইল একই ভাবে অন্ধকারে রানির দিকে। বিড়বিড় করে বলল,
“কিন্তু অনেককিছু রানি ইথুন। আপনি রানি কামিনীকাঞ্চনকে চেনেনি আজও। আমি যে চিনি। এই হার যে হার নয়। এই হার রানিকে আরও ভয়ঙ্কর করে তুলবে। সেই বিকট, ভয়ঙ্করী রানির কাছে পৃথিবীর সমস্ত শক্তিই যে পরাজিত হবে। হতে বাধ্য। রানিকে আমি জানি যে! সে ভালোবাসার ক্ষেত্রেও কৃপণতা করে না, ঘৃণার ক্ষেত্রেও না। তার জন্য বোধহয় আমার আজ মায়া হচ্ছে। কিন্তু ঘৃণাটাও তো কম নয়।”

 হ্যাব্রো দূরে বসে ঠিক যামিনীর ঠোঁট নাড়ানো দেখল৷ যামিনীর উদাসীনতা খেয়াল করল নিপুণ ভাবে। হাসি ফুটে উঠল তার ঠোঁটে। হাসিমুখে চেঁচিয়ে বলল,
“আপনার হার নিশ্চিত যামিনী। আপনার হার নিশ্চিত। আপনার পরাজয়ের শুভারম্ভ হয়ে গিয়েছে। আপনি প্রস্তুত হোন। আপনার বন্ধুত্বকে আপনি মেরেছিলেন এবার সেই প্রায়শ্চিত্ত আপনাকে প্রাণ দিয়ে করতে হবে।”

  হ্যাব্রোর সেই চিৎকার আশেপাশের পাহাড়ে প্রতিধ্বনিত হলো। ফিরে ফিরে এলো বারে বারে যামিনীর কানে। তার শরীর শিরশির করছে। মরমে এক অদৃশ্য টান অনুভব করছে সে। কার জন্য এই টান? বন্ধুত্বের জন্য না-কি এককালের সখীর জন্য? নাকি অন্য কারো জন্য? অতীতের কোনো মানুষ কিংবা স্মৃতির জন্য? 

—————

প্রজাদের তীব্র বেদনার স্বর ভেসে আসছে গহীন জঙ্গল ভেদ করে। কাতরাচ্ছে তারা রীতিমতো। রানি একবার রাজবৈদ্যর কাছে যাচ্ছেন, একবার পথ্য নিয়ে ছুটছেন আঘাতপ্রাপ্ত সৈন্যদের দিকে। তিনি নিজেও যে এক হাতে এতটা যন্ত্রণা পেয়েছেন তা যেন অনুভব করতে ভুলে গিয়েছেন। 
 সৈন্যদের নিজের হাতেই সেবাযত্ন করছেন। কোনো সৈন্যর পায়ে জড়িবুটি লেপে দিচ্ছেন। সৈন্যরা তীব্র যন্ত্রণার মাঝেও নিষেধ করছে কিন্তু তিনি সেসব শুনছেন না। তাকে আজ বড়ো উদ্ভ্রান্ত লাগছে। নিজের শেষ আশ্রয়টুকু হারিয়ে ফেলার পর পথের কাঙাল যেমন মরিয়া হয়ে উঠে তিনি যেন তেমনই মরিয়া হয়ে উঠেছেন। 

 রাজবৈদ্য এই অদ্ভুত রানিকে দেখে অবাক না হয়ে পারছে না। এতদিন সে অবাক হয়নি তেমনটা নয় কিন্তু আজ যেন সকল কিছু ছাড়িয়ে গিয়েছে। এ কেমন নারী এই কামিনীকাঞ্চন? এ কেমন মানুষ তিনি! তার যেই কাঠিন্যতার গল্প ছড়িয়ে আছে লোকমুখে সেসব এক লহমায় মিথ্যে হয়ে গিয়েছে। এই রানিকে চেনার সাধ্যি সাধারণ লোকের নেই। হবেও না কখনো। রানিকে বোধহয় ঠিকঠাক চিনতে পেরেছে হেমলক পিয়ার্স। সে আগে ভাবতো কেন হেমলক পিয়ার্স রানির প্রতি এত দুর্বল। আজ সে বুঝতে পারছে তার কারণ। এই মহীয়সী নারীকে যে একটিবার অন্তর চক্ষু দিয়ে জানবে সে শতকোটি প্রণামে লুটিয়ে পড়বে রানির পায়ের কাছটায়। এই মানুষটার মতন মূল্যবান কিছু এই পৃথিবীতে আর নেই। আর না।

 
 রাত বাড়তেই প্রজাদের আহাজারি ধীরে ধীরে কমে আসতে লাগলো। চারপাশটা শুনশান নীরবতায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়ল। মশাল জ্বলছে চারপাশে। রানি গতরাতের মতনই বসে রইলেন এক ধ্যানে। কল্পনায় ভেসে উঠল হেমলকের মুখটি। আচ্ছা, এই যন্ত্রণার রাতটির কথা জানবে কি মানুষটা? জানবে কি তার রানি ভুগছে অস্থিরতায়? 
 নিজের ভাবনায় নিজেই অবাক হলো রানি। আগামীকাল বোধহয় তার একটি অনিশ্চিত জীবন অপেক্ষা করছে। সৈন্যদের একাংশ আজ ঝরে গিয়েছে। কালকের যুদ্ধটা আরও ভয়ঙ্কর হবে। কী হবে পরিশেষে তিনি জানেন না। তাই হয়তো এত মনে পড়ছে হেমলককে! কী অদ্ভুত! সামান্য চিত্রশিল্পী মনে এ কেমন জায়গা করল যে তীব্র দুঃখে রানির তার কথা মনে পড়ছে? কেন চারপাশে অনুভব করছে তাকে?
·
·
·
চলবে……………………………………………………

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

WhatsApp