এ্যাজেলিয়া রাজ্যে যামিনীর সুখ আকাশ ছোঁয়া। তার আর বিশেষ কোনো চিন্তা নেই, ভাবনা নেই। ছলনা বলে সবটাই গুছিয়ে নিয়েছে নিজের মন মতন।
হ্যাব্রো ছিলো প্রাসাদের সামনে। প্রাসাদের সামনেটাতে হাঁটছিলো নিজের মতন। হুট করেই খেয়াল করল একটি হন্তদন্ত হয়ে ছুটে আসা মেয়েকে। যে প্রাসাদে ঢুকছে ভীষণ ব্যস্ততায়। চোখে-মুখে তীব্র ভয়।
হ্যাব্রোর সন্দেহ হলো তা দেখে। দাররক্ষীরা আটকালোও না বিশেষ। প্রাসাদের কোনো দাসী নয় মেয়েটি। বাহিরের কেউই। কিন্তু সাধারণ মানুষ তো এত অবলীলায় প্রাসাদে ঢুকতে পারে না! নিশ্চয় অনুমতি আছে বলেই সহজে প্রবেশ করছে মেয়েটি। কিন্তু এমন করে হনহনিয়ে যাচ্ছে কোথায়? কার কাছে?
মনের সংশয় দমানোর জন্য মেয়োটির পিছু নিলো হ্যাব্রো। মেয়েটি চারপাশে এক প্রকার অপরাধীর মতন চোখ বুলিয়ে সোজা দীর্ঘ প্রাসাদের অসংখ্য কক্ষ পার হয়ে গিয়ে ঢুকল যামিনীর কক্ষে। হ্যাব্রোর সন্দেহ এবার তীব্রতর হলো। সে কপাটের সামনে দাঁড়ালো তাই। ভারি, মোটা পর্দা থাকায় ভেতর থেকে কেউ হ্যাব্রোকে দেখতে পাবে না।
কক্ষের সামনের দাররক্ষীদের চলে যাওয়ার ইশারা করতেই তারা চলে গেলো। পর্দার ফাঁক গলিয়ে হ্যাব্রো দেখলো মেয়েটি কাঁপছে।
যামিনী মদ্যরসে নিমগ্ন ছিলো। নিজের কক্ষে আচমকা অনুমতি ছাড়া কাউকে প্রবেশ করতে দেখে যদিও বা রাগ করতে নিয়েছিলো কিন্তু গুপ্তচরকে দেখে তার রাগ উবে গেলো। ধরা দিলো বিস্ময়,
“তুমি! তুমি এখানে কেন?”
মেয়েটির তখন হুঁশ নেই যেন। আতঙ্কিত ভঙ্গিতে বলল,
“প্রাণ নিয়ে কোনোরকমে পালিয়ে এসেছি। আপনাকেও পালাতে হবে।”
“পালাতে হবে? কিন্তু কেন?” যামিনীর ভ্রূদ্বয় আপনা-আপনি কুঁচকে এলো। সে এখনও আঁচ করতে পারছে না মূলত হলোটা কী।
মেয়েটি আগের ন্যায় ভীত কণ্ঠে বলল,
“ক্যামিলাস রাজ্যের রাজপুত্র হেমলক পিয়ার্সের বধূ তার মুখ উন্মুক্ত করেছেন।”
“হ্যাঁ, তো?”
“এবং তিনি আর কেউ নয়, আমাদের রাজ্যের রানি কামিনীকাঞ্চন। তিনিই হেমলক পিয়ার্সের বধূ।”
যামিনী যেন প্রথমে ঠিক বুঝতে পারল না দাসীটির কথা। কিন্তু যখন তার মস্তিষ্ক ভয়ঙ্কর সেই কথাটি ঠিকঠাক আয়ত্ত করে নিলো তখনই সে কেঁপে উঠল। অবিশ্বাস্য ভাবে বড়ো হলো তার চোখ-মুখ। ভীষণ বড়ো। প্রায় চিৎকার করে উঠল,
“না, এ অসম্ভব। সখী, সখী কীভাবে আসবে? সখী তো নিখোঁজ ছিলো।”
“নিখোঁজ নন উনি। উনি আড়ালে ছিলেন। গত পরশুদিন জনসম্মুখেই উনার মুখমন্ডল উন্মুক্ত করেন।” দাসীটি পর পর সকল ঘটনা বলতে লাগলো অনবরত। প্রতিটি ঘটনা যেন কাঁটা দিতে আরম্ভ করল যামিনীর শরীরে। শরীর শিরশির করে উঠল তার অস্বাভাবিক ভাবে। চোখের মণি অস্থির ভাবে কেবল ঘুরতে লাগল।
দরজার বাহিরে দাঁড়ানো হ্যাব্রো অব্দি স্থবির হয়ে গিয়েছে। যদিও ঘটনাটি প্রচন্ড অবিশ্বাস্যকর তবুও তার মনের কোথাও একটা জানতো এমন একটি দিন পৃথিবীতে ঠিক ফিরে আমবে। কিন্তু মন যে সত্যিই জেনেছিলো তা ভেবেই তো তার উন্মাদ লাগছে নিজেকে। অতি আনন্দে সে বোধহয় দিশেহারা হয়ে গিয়েছে। সে তো জানতো। যেদিন প্রথম হেমলকের বধূকে দেখেছিলো সেদিনই বুঝেছিলো, রানি কামিনীকাঞ্চন ছাড়া এমন তেজ আর কারো কণ্ঠে থাকবে না। কিন্তু পরিস্থিতির অভাবে সে নিজের ভাবনাকে প্রশ্রয় দিতে পারেনি।
যামিনী কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে চিৎকার করে উঠলো। হন্তদন্ত হয়ে বেরিয়ে এলো কক্ষ ছেড়ে। এতটাই আচমকা বেরিয়ে এলো যে হ্যাব্রো সরে যাওয়ার সময়টুকু পেলো না। এবং দু'জনেই মুখোমুখি হলো দু'জনের। যামিনীর চোখের তীব্র আতঙ্ক হ্যাব্রো ঠিক ঠাহর করতে পারল। তবে সে দমিয়ে নিলো নিজের অভিব্যক্তি। মুখটি অসম্ভব শান্ত রেখে, কিচ্ছুটি হয়নি এমন করে বলল,
“কিছু প্রয়োজন আপনার?”
যামিনী তখন মাথা নাড়াতে লাগলো। এলোমেলো ভঙ্গিতে বলল,
“সখী, সখী ফিরে এসেছে। সখীর কিচ্ছু হয়নি।”
হ্যাব্রোর যদিও ভেতর ভেতর তীব্র আনন্দ হচ্ছিলো তবুও সে ভাব এমন করল যেন স্বাভাবিক একটি ঘটনা শুনেছে,
“সখী? কোন সখী? রানি কামিনীকাঞ্চন? উনার তো ফেরারই কথা ছিলো। উনি না চিঠি লিখে গিয়েছিলেন কোথাও একটা যাচ্ছে। কোথাও গিয়েছে যেমন নিয়ম অনুসারে, তেমন নিয়ম অনুসারে তো ফিরেও আসবেন তাই না?”
“না, না, না। ওর ফিরে আসার কথা ছিলো না। ও ফিরে আসা অসম্ভব। ও তো..”
যামিনীর ধ্যান ফিরে এলো। বাকি কথা সম্পন্ন করল না সে খুব সাবধানেই আড়াল করে ফেললো তার অপরাধটি। তবে হ্যাব্রো এই অসম্পূর্ণ কথাটি বুঝে নিয়েছি ঠিক মনে মনে। তবে তা প্রকাশ করল না। বলল,
“ও তো?”
“কিছু নয়। সখী ফিরে আসবে। ওর রাজ্য ও ছিনিয়ে নিবে তাহলে। এরপর, এরপর আমার কী হবে?”
শশীপূর্ণা ছুটে এসেছে ততক্ষণে। সে-ও রানি কামিনীকাঞ্চনের সংবাদটি মাত্রই পেয়েছিলো। তা দিতেই ছুটে এসেছিলো যামিনীর কাছে। কিন্তু এসে দেখলো যামিনী এর আগেই সবটা জেনে গিয়েছে।
হ্যাব্রো কণ্ঠ শীতল। তীব্র শীতলতায় মোড়ানো কণ্ঠে বলল, “উনার রাজ্য উনাকে বুঝিয়ে দিলেই তো সমস্যা সমাধান। এত ভাবছেন কেন? ভীত হওয়ারও বা কি আছে? এই রাজ্যটি চালনা করার ভার রানিই তো আপনাকে দিয়ে ছিলো তাই না? আপনি তো তা-ই আমাদের বুঝিয়ে ছিলেন, বলে ছিলেন।”
যামিনী অথৈজলে তখন হাবুডুবু খাচ্ছে। মনের ভেতর হিং স্র যেই উদ্দেশ্য তা অপূরণীয় রেখে সে রানি কামিনীকাঞ্চনকে কোনোক্রমেই রাজ্য দেবে না। তার উদ্দেশ্য যে গভীরে ছিলো। রানি কামিনীকাঞ্চনের মৃত্যু সেই গভীর উদ্দেশ্যের প্রধান লক্ষ্য। কোনোক্রমেই সে রাজ্য হস্তান্তর করবে না। প্রয়োজনে যু দ্ধ ঘোষণা করবে।
যামিনী কূলহারা অবস্থা দেখে মনে মনে হাসলো হ্যাব্রো। এমন একটি দিনের জন্যই সে কত কত প্রহর কেবল অপেক্ষায় কাটিয়েছে! একজন নির্বোধ প্রাণীও তো বুঝেছিলো তখন যে রানি কামিনীকাঞ্চন আড়ালে কোথাও চলে যায়নি। বরং ক্ষমতার লোভ বা অন্য কোনো কারণ তাকে দূরে সরিয়েছে। এবার সেই কারণ উন্মোচন হওয়ার পালা।
—————
রানি কামিনীকাঞ্চন বৈঠকখানাতেই ব্যস্ত। বৈঠক চলছে তার রাজ্যের মন্ত্রীমহোদয়গনের মাঝে। যেকোনো মুহূর্তে তারা আক্রমণ করবে এ্যাজেলিয়া রাজ্য। সেই ছক সাজাচ্ছেন রানি নিমগ্ন হয়ে। তাছাড়া আদৌ রাজসভার সকলে তাকে সাহায্য করবে কি-না সেটাও তো বুঝতে হবে!
রানিকে সাহায্য করতে মোটামুটি প্রস্তুত রাজসভা। প্রত্যেকের অন্তর রানি এতটাই জয় করে ফেলেছেন যে, তাদের কাছে রানির কথাই সর্বোত্তম। খরচ শ্রেষ্ঠ কিছু হতে পারে না পৃথিবীতে।
রানিদের তৈরিকৃত ছক পাশে দাঁড়িয়েই হেমলক দেখছে নিমগ্ন হয়ে। রানির যুদ্ধে মহারথী এই রানির স্বামী হবে না, তা কি হতে পারে?
ত্রিমাদ কুমার আলোচনার এক পর্যায়ে প্রশ্ন করলেন,
“অপরাধ মার্জনা করবেন, রানি। তবে একটি মনের কৌতূহল বড়োই জ্বালাতন করছে। তা কি আমি আপনাকে অবগত করতে পারি?”
রানির চঞ্চল চোখ জোড়া স্থির হলো ত্রিপাদ কুমারের দিকে। গুরুগম্ভীর স্বরে জবাব দিলেন, “অবশ্যই পারেন। আপনারা আমার জন্য রণক্ষেত্র প্রাণ বিয়োগ করতে রাজি অথচ আমি সামান্য প্রশ্নের উত্তর দিতে পারব না? বলুন।”
“এ্যাজেলিয়া রাজ্যটি তো আপনার। তবে কেন এত কলাকৌশল? আপনার রাজ্য তো আপনাকে এমনিতেই হস্তান্তর করার কথা।”
রানি এবার বসলেন টান টান হয়ে। গায়ের গহনাগুলো উজ্জ্বল রঙ বলে জ্বলজ্বল করছে। ঠোঁটে কিঞ্চিৎ তিল পরিমাণ চাপা হাসি টেনে বললেন,
“আজ এই রাজাসনে যদি আপনাকে বসানো হয় তবে আপনি কি এমনি এমনি সেই ক্ষমতা ছেড়ে দেবেন? মানুষ আটকায় লোভে। আর সব ছাড়তে পারলেও ক্ষমতার লোভ কেউ ছাড়তে পারে কি?”
“কিন্তু তিনি তো আপনার সখী ছিলেন। আমরা যতটুকু অবগত, তিনি আপনার খুব ভালো ও কাছের সখী। তবে কেন আপনার লুকিয়ে থাকা, কেনই-বা এত ছলাকলা?”
রানি উত্তরে প্রথম মৃদু মাথা নাড়ালেন। হাসিটা আরেকটু প্রসস্থ করে বললেন,
“পিঠপিছে ছুড়িটা কাছের মানুষই মারে, মন্ত্রীমশাই। তারাই কাঁদায় যাদেরকে আমার কাঁদানোর অধিকার দিয়ে থাকি। এ পৃথিবীতে আপন বলতে কিচ্ছুটি হয় না। কিচ্ছুটি না।”
মন্ত্রী ত্রিপাদ কুমার আর কথা বাড়ালো না। এতটুকু কথাই যেন যথেষ্ট ছিলো উনার বোঝার জন্য।
—————
ভগ্ন হৃদয় নিয়ে নিজের পালঙ্কে মনমরা হয়ে বসে আছে রাজকন্যা লিলি। একটা সময় ওর হাসিতে মুক্তো ঝরতো রাজপ্রাসাদে। রঙিন প্রজাপতির মতন ওর বিচরণ ছিলো চারপাশটায়। কিন্তু একটি ঘটনা, একটি মানুষের জন্য আজ সবকিছুই কেমন এলোমেলো হয়ে গিয়েছে। ভাগ্যের অদৃশ্য বিধাতা জীবনকে করে দিয়েছে রঙ্গমঞ্চ।
নানান ভাবনায় মগ্ন থাকা লিলির কক্ষ রাজবৈদ্য প্রবেশ করার জন্য বাহির থেকে হাঁক ছেড়ে নিজেই অনুমতি চাইলো,
“রাজকন্যা লিলি, আমি কি আসবো?”
ধ্যানমগ্ন লিলি বিরক্ত হলো। রাজবৈদ্যকে তার বিরক্ত লাগে। লাগবে না-ই বা কেন? রানি কামিনীকাঞ্চন ছাড়া এই রাজবৈদ্য কিছু বুঝে না যেন। সমস্তকিছুর সর্বেসর্বা যেন ঐ রানিকে বানিয়ে রেখেছে সে।
রাজবৈদ্য আবারও হাঁক ছাড়ল, “আমি কি আসব, রাজকন্যা?”
লিলি একবার ভাবল অনুমতি দেবে না। পরক্ষণেই মনে হলো আজকাল তার হাতের যন্ত্রণা অনেকটা লাঘব হয়েছে। নিয়মিত পথ্য জুটেছে বলে কষ্ট কমেছে অনেকটাই। তাই রাগ দেখালে এখন ক্ষতি তো তারই হবে। সেসব ভেবেই সে অনুমতি দিলো, “আসো।”
রাজবৈদ্য সঙ্গে সঙ্গেই ভেতরে এলো। হাতে ঔষধি গাছের পাতা। এসেই তা বাড়িয়ে দিলো লিলির দিকে, “আপনার ঔষধ। এখুনি এটি চিবিয়ে খান।”
লিলি কপাল খানিকটা ভাঁজ করে বলল, “রেখে যাও। পরে খাবো।”
“পরে নয়, এখনই। সূর্য ডোবার আগেই খেতে হবে।”
লিলি এবার রাগ দেখালো খানিক, “তোমার কথাতে হবে? আর তাছাড়া তুমি কি আমাকে আদেশ করছো? রানি এতই ক্ষমতা দিয়েছেন তোমাকে?”
রাজবৈদ্য লিলির চোখের দিকে তাকাল। বলল, “রানিকে নিয়ে কখনো ভালো কথাও তো বলতে পারেন। এমন সাহস আর কোনো নারীর ভেতর দেখেছেন কখনো? আর কেউ, কখনো বলেছে কি নারীর জন্য?”
“উনি আজ আমার এত যন্ত্রণার কারণ। উনি আমাদের রাজপ্রাসাদ এলোমেলো করে দিলেন। উনি মামাশ্রীকেও কত ভয়ঙ্কর ভাবে মারলেন। এরপরেও উনার উপর অন্তত আমি মুগ্ধ হতে পারি না।”
রাজবৈদ্য রাজকন্যার হাত নেড়েচেড়ে দেখতে দেখতে বলল,
“সব কি কেবল রানিরই দোষ? উন্মাদও কখনো অকারণে কাউকে কষ্ট দেয় না সেখানে রানি তো তীক্ষ্ণ বুদ্ধিমতী। আপনার দুর্ভাগ্যের জন্য বোধহয় আপনি দায়ী।”
লিলি রেগে গেলো। রাজবৈদ্যর হাত চেপে সরিয়ে দিতে চাইল কিন্তু রাজবৈদ্য ধরে রাখলো জোর করে। তার ঠোঁটে চাপা হাসি।
—————
হেমলক ব্যস্ত চিত্র অঙ্কনে। এক জোড়া চোখ তার চিত্রে জ্বলজ্বল করছে।
ঠিক সেই মুহূর্তে একটি মোলায়েম হাত জড়িয়ে ধরলো তার এক হাতের বাহু। এই ছোঁয়ায় অন্য এক নারীর ঘ্রাণ। হেমলক সরার আগেই সেই নারী আরও তীব্র ভাবে ধরল তার হাতটি।
·
·
·
চলবে……………………………………………………