কামিনী - পর্ব ৬৭ - মম সাহা - ধারাবাহিক গল্প

কামিনী - মম সাহা
          রাজমাতা তার কন্যার ধৃষ্টতা দেখে অবাক না হয়ে পারলেন না। তার কন্যা কি-না তাকে বুঝাচ্ছে! তার কন্যা? যেই কন্যা কিছুদিন আগে অব্দি রানির উপর তীব্র ক্ষুব্ধ ছিলো!

“তুমি কি ভুলে যাচ্ছো তোমার আজকের এই অবস্থার জন্য ঐ রানিই দায়ী?”
 রাজকন্যা লিলির মুখমণ্ডলের দিকে রাজমাতার সঙ্গে তাকালো রাজবৈদ্যও। সে দেখতে চাইলো লিলি ঠিক কী উত্তর দেয়। কতটা রাগান্বিত হয় অতীত মনে করে। 
কিন্তু লিলি মোটেও রাগ করল না। তার সারা অঙ্গে নির্লিপ্ততা দেখা গেলো। সে বেশ স্বাভাবিক স্বরে বলল, “রানির চেয়েও বেশি দায়ী বোধহয় আমি ছিলাম, রাজমাতা। কারণ তার সঙ্গে আমি ঔদ্ধত্য দেখিয়ে ছিলাম। তার সাথে হওয়া অন্যায়কে আমি দেখিইনি। বরং তাকে দোষারোপ করেছিলাম। এবং আপনারা কেউই আমার ভুল ভাঙাননি।”

 “তুমি কোন অন্যায়ের কথা বলছো? তুমি কোনো অন্যায় করোনি। কী বলছ এসব? উন্মাদ হয়েছো, রাজকন্যা লিলি?”

“কোনটা অন্যায় নয়, রাজমাতা? একজন নারীকে জোরজবরদস্তি একজন পুরুষের কক্ষে ঠেলে দেওয়াটা কি মহৎ কাজ ছিলো?”

“তোমার ভ্রাতা মানসিক ভারসাম্যহীন ছিলো, লিলি। সে রানিকে দেখতে চেয়েছিল!”

 “ভ্রাতা মানসিক ভারসাম্যহীন ছিলো বলেই ভুল আবদার করেছিলো। অথচ আমরা সুস্থ মস্তিষ্কের হয়েও সেই ভুল আবদারকে প্রাধান্য দিয়ে একটি নারীর সতীত্বে আঘাত করেছি। আমরা তো নারী ছিলাম। তা-ও সেই স্ত্রী'র সেই মুহূর্তে করা তীব্র রাগকে বুঝতে পারিনি। বরং অন্ধ হয়ে ছিলাম ক্রোধে। আমার ভ্রাতা হোক কিংবা পিতা হোক, কোনো পুরুষের অধিকার নেই একটি নারীর অস্তিত্বে অধিকার ব্যতীত স্পর্শ করা। এতটুকু বুঝতে বড্ড দেরি হয়ে গিয়েছে।”

 রাজমাতা এবার মেয়ের আস্পর্ধা দেখে হয়রান হলেন। তার কন্যা কিনা ঐ রানির গান গাচ্ছে? যেই রানির জন্য তার ভ্রাতাকে প্রাণ দিতে হয়েছে!

রাজমাতা এবার কারাগারের দিকে না গিয়ে ছুটে এলেন লিলির দিকে। চেপে ধরলেন লিলি স্বাভাবিক হাতটি। প্রায় কিছুটা টানাহেঁচড়ার মাঝে বললেন,
“খুবই বেশি বলে ফেলছ আজকাল। কার কুবুদ্ধিতে এত অধঃপতন তোমার? যার কুবুদ্ধিতেই হোক না কেন, আমার বিপরীতে দাঁড়িয়ে একটা কথাও তুমি বলতে পারবে না।”
 শেষের চাহুনিটা তিনি রাজবৈদ্যর দিকে ফেললেন। যেন মুহূর্তেই নরখাদক হয়ে গিলে খাবেন রাজবৈদ্যকে। 

“রাজকন্যা লিলির হাতটা ছাড়ুন, রাজমাতা প্রাচী। কুবুদ্ধি না সুবুদ্ধি জুটেছে তা আমি হিসেব করি। আমি বর্তমানে এ রাজ্যের সকল হিসেবের ভার বহন করছি। ভুলে যাচ্ছেন কি?”
 তেজস্বী কণ্ঠস্বর, তীক্ষ্ণ ভাবে এসে কানে লাগলে। নীরব রাজপ্রাসাদ যেন ঝমঝমিয়ে সরব হয়ে গেলো। গহনার কী উর্ধ্ব শব্দ। যেন শিল্পী সুর তুলেছে বেহালায়। 

 লালবর্ণের রাজকীয় পোশাকটিতে সূর্যের আলো প্রতিফলিত হয়ে সে আলো ছড়িয়ে পড়ছে রানির সমগ্র অবয়বে। তাই কিছুটা সোনালী রং তার দেহ উপচে পড়ছে মনে হচ্ছে। 
 তার পেছন পেছন হেমলককে আসতে দেখা গেলো। হাঁটার তালে তালে তার সামন্য বড়ো চুল গুলো লাফাচ্ছে যেন। মুখে হাসি। তার রানিকে রাজ্যে ফিরে পাওয়ার হাসি তার ঠোঁট ছাড়তে নারাজ যেন।

 রাজমাতার কপাল কুঁচকে গেলো। 
 তিনি পা থেকে মাথা অব্দি রানিকে পরখ করলেন। সাথে পরখ করলেন চারপাশ। যত প্রহরী, দাস-দাসী রয়েছে চারপাশে সকলেই মাথা নামিয়ে ফেলেছে রানিকে আসতে দেখেই। এমনকি রাজবৈদ্যসহ জানিয়েছে কুর্ণিশ। তার এত বছরের রাজ্য, রাজমাতা তিনি অথচ তাকে দেখেও তো এমন করে সবাই মাথা নামিয়ে সম্মান জানায় না! কিন্তু কিছু মাস আগে আসা এই রানি এতটা সম্মান পাচ্ছে? কেন? কী এমন করেছে? হিংস্রতা, কঠোরতা ছাড়া তো কিছুই দেখাননি তাহলে কীসের এত সম্মান তাকে করে সকলে?
 মনে মনে প্রশ্ন করে ক্লান্ত হন রাজমাতা। তিনি তো আর ক্রোধের আবরণ সরিয়ে রানির প্রজা প্রীতি আর স্নেহ দেখেননি তাই তার প্রশ্ন জাগাটাও যে স্বাভাবিক। 

তিনি সামলে নিলেন নিজেকে। রানির বিপরীতে চোখ-মুখ প্রচণ্ড গম্ভীর করে বললেন, “রাজকন্যা লিলি আমার কন্যা। তার হিসেব মাতা হিসেবে আমাকেই বুঝতে হবে বৈকি!”
 
 “বুঝবেন। অবশ্যই বুঝবেন তবে যখন সেটা আপনাদের মাতা-কন্যা কেন্দ্রীয় বিষয় হবে। বিষয়টা যেহেতু আমি কেন্দ্রিক তাই আমাকেই তো বুঝতে হবে তাই না?”

“বড্ড তর্ক আপনার! ভুলে যাবেন না আমি কে। আমার সাথে দুঃসাহস দেখাচ্ছেন।”

 “আমি দুঃসাহস দেখাচ্ছি কারণ তা তো আমার রক্তেই, রাজমাতা প্রাচী। আপনি বরং ভুলে যাচ্ছেন আমি কে। এই মুহূর্তে চাইলে আমি আপনার শ্বাস নেওয়ার ক্ষমতা কেঁড়ে নিতে পারি।”

“ভয় দেখাচ্ছেন আমাকে?” চোখ বড়ো বড়ো করে ক্ষুব্ধ হয়ে প্রশ্ন ছুঁড়লেন রাজমাতা। 

 রানি হাসতে হাসতে মাথা নাড়ালেন, “হ্যাঁ দেখাচ্ছি। ভয় পাচ্ছেন? পান, পান। ভয় পেতে হবে। ভয় পেলে আপনার জন্য ভালো।”

“কেন? না পেলে কী করবেন আপনি? প্রাণ নিবেন? কোন কারণে প্রাণ নিবেন আমার?” জিজ্ঞেস করে দাম্ভিক ভাবভঙ্গিতে হাসলেন রাজমাতা। 

 রানি তারচেয়ে বেশি হাসলেন। ভীষণ হাসির কিছু যেন বলেছেন রাজমাতা এমন করে হাসতে হাসতে রানি বললেন,
“আমার প্রাণ নেওয়ার প্রতিযোগিতায় আপনিও অংশগ্রহণকারী ছিলেন বলে!”

  রানির চোখগুলো তীর্যক ব্যাঙ্গ করল। রাজমাতা থতমত খেয়ে গেলেন। চুপ করে গেলেন নিমিষেই। কথা না বাড়িয়ে তিনি রাজকন্যা লিলিকে কক্ষে যাওয়ার নির্দেশ দিলেন। লিলি তা মেনে নিলো যথাযথ ভাবেই। উল্টোঘুরে হাঁটতে আরম্ভ করল কক্ষের উদ্দেশ্যে। রাজবৈদ্যও গেলো তার পেছনে। 

রাজমাতা কিছুটা সময় নিয়ে নিজেকে ধাতস্থ করতে করতে বললেন, “তাহলে নিচ্ছেন না কেন প্রাণ? করুণা করে? আপনার করুণা আমার চাই না।”

“করুণা নয়। বলুন আপনাকে দান করছি। আরও কিছু সময় প্রাণ ভরে শ্বাস নেওয়ার। আমার মনে হচ্ছে আপনি এত ছোটোখাটো বিষয়ে প্রাণ দিয়ে দিলে শোভা পাবে না। আপনার জন্য নিশ্চয় বড়ো কোন বিষয় বের হবে। যেন প্রাণ নিতে সুবিধা হয়। কী বলেন?”

 রাজমাতা কথা বাড়ানোর আর সাহস করলেন না। তার শরীর এমনিতেই মৃদু ঘামছে। ভয় জমেছে বুকে। একা হয়ে পড়েছে বিধায় ভয় সামলানোর কেউ নেই তার। তাই সে কিছু না বলে চুপ করে রইল। 

রানি নিজের কক্ষের দিকে অগ্রসর হলেন। দু'কদম গিয়ে থেমে গেলেন কিছু একটা ভেবে। অতঃপর ঘাড় ঘুরিয়ে রাজমাতার দিকে দৃষ্টিনিক্ষেপ করলেন,
“আরেকটা কথা। আপনি কি রানি ইথুনকে মুক্ত করতে যাচ্ছিলেন? যান, যান। যদি আপনাকে কারাগারে প্রবেশ করতে দেয় প্রহরী আর মন্ত্রী তবে মুক্ত করুন। আমি কিচ্ছুটি বলব না। শুভকামনা, ভ্রাতার কাছে যাওয়ার সময় হিসেব করা শুরু করুন।”
 কথা শেষ করে আর এক মুহূর্ত দাঁড়ালেন না রানি। খুব ব্যস্ত ভঙ্গিতেই হেঁটে চলে গেলেন। হেমলক তার পেছন পেছন গেলো। তা দেখে রাজমাতা মুখ ভেঙালেন। বিড়বিড়িয়ে বললেন,
“স্ত্রীর নেওটা হয়েছে ও। ছি!”

 বিড়বিড় করে বললেও কথাটা হেমলক শুনতে পেলো। শুনতে পেলেন রানিও। তবে কেউই বিপরীতে প্রতিবাদ করল না। হেমলক যেন বেশ খুশি এমন বিশেষণে!

 রাজমাতা পুনরায় সাহস করলের না আর রানি ইথুনকে ছাড়াবার। রানির ক্ষমতা ঠিক কতটা, এতটুকু তিনি বুঝে গিয়েছেন। 

—————

 মধ্যাহ্নের আহারের পর একটি ঘুম ঘুম ভাব ডানা ঝাপটায় চারপাশে। আলসেমোতে মুড়িয়ে যায় প্রকৃতি। 
সকলে খানিক বিশ্রাম নিতে গেলেও বিশ্রাম নেওয়ার তাড়া নেই হেমলকের। সে দাঁড়িয়ে আছে প্রাসাদের সামনে থাকা লাগোয়া বারান্দাটিতে। দাঁড়িয়ে আছে বললে ভুলই হবে। বলা যায় সে অপেক্ষা করছে রানির। ভোর থেকে রানিকে দেখছে না। বলেও যাননি গিয়েছেন কোথায়। তাই হেমলকের অপেক্ষা করা ছাড়া আর কীই-বা গতি?

 হেমলকের অপেক্ষা বোধহয় দীর্ঘ করলেন না রানি। তাকে ঘোড়ায় করে আসতে দেখা গেলো ধীরে-স্থিরে। হেমলক তাকে দেখে আর এক মুহূর্ত অপেক্ষা করল না। হনহনিয়ে নেমে গেলো। রানি ঘোড়া থেকে নামতে নামতেই হেমলক মুখ চোখ আঁধার করে এগিয়ে এলো। তার বিশেষ ভালো লাগে না রানির এই দূরত্ব। বিষণ্ণ স্বরে প্রশ্ন করল, “কোথায় গিয়েছিলে? বলে যেতে অন্তত!”

 রানি আয়েসি ভাবে নামতে নামতে উত্তর দিলেন, “বলে যাওয়াটা কি বাধ্যতা?”

“না তো। মানবিকতা। হেমলক নামের পুরুষটি যেন অপেক্ষা না করে, চিন্তা না করে তাই সামান্য মানবিকতা দেখানো বলে সেটাকে।”

রানি বাঁকা চোখে তাকালেন। সূর্যের রশ্মি এসে ছুঁয়ে যাচ্ছে তার শুভ্রাঙ্গ। সোনালি চুলগুলো ঝলমল করছে। 
“আমার ভেতর মানবিকতা কম।”

 “অন্তত মায়া তো করতে পারো না-কি? আমার তো চিন্তা হয়!”

“কীসের চিন্তা? এত দ্রুত আমি যাচ্ছি না।” বাতাসে রানির সোনালি চুলগুলো উড়ে দুই-চারটি এসে লেপ্টে গেলো মুখে। হেমলক বিনা দ্বিধায় সেই চুলগুলো সরিয়ে দিলো। রানি একটু ভ্যাবাচ্যাকা খেলেন। মলিন হলো তার চোখগুলো। আড়ষ্টতা কাটাতে এদিক-ওদিক তাকাতেই চোখ গেলো কোণার একটি কক্ষে। মনে হলো যেন কেউ ওখান থেকে সরে গিয়েছে কেউ চট করে।

“বললে না কোথায় যাচ্ছো?” হেমলক পুনরায় প্রশ্ন করল। রানি প্রথমে ভেবেছিলেন বলবেন কিন্তু মনে হঠাৎ সংশয় হলো। তার মনে হলো আশেপাশে কেউ উপস্থিত আছে। তৃতীয় পক্ষের উপস্থিতি অনুভব করা যাচ্ছে ভীষণ। তাই তিনি বললেন না আর যে গিয়েছিলেন সেই নিষিদ্ধ পল্লীতে। চারপাশে যে কে শত্রু আর মিত্র বুঝা বড়ো দায়!
 রানি মিথ্যে বললেন, “গিয়েছিলাম রাজ্যের কিছু কাজে। প্রশ্ন করবেন না। আমার বিশেষ পছন্দ নয়।”

 হেমলকের যত্ন, চিন্তা যে সেই প্রশ্নের আড়ালে লুকানো ছিলো তা রানি বুঝতে পারেনি বলে হেমলকের কিঞ্চিৎ মন খারাপ হলেও সে তা প্রকাশ করল না। নিজেকে সামলে নিয়ে হাসিমুখে বলল,
“বড়ো একটি চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা আয়োজিত হবে। সেটার আমন্ত্রণ এসেছে। তুমি কি যাবে আমার সঙ্গে?”

 রানি গা করলেন না সে কথা, “আমি গিয়ে কী করব? আমি কি চিত্রাঙ্কন পারি?”

“আমার সঙ্গীনি হবে!”

 “আমার সময়-সুযোগ হবে না। শুভকামনা। যাই, আহার করব। খিদেতৃষ্ণা পেয়েছে।” কথা শেষ করেই হেমলককে কিছু না বলতে দিয়ে প্রাসাদে চলে গেলেন রানি। 
 হেমলক বলতে নিয়েছিলো সবে যে সে-ও আহার করেনি একসঙ্গে করবে বলে কিন্তু রানির শোনার সময় কোথায়? কিংবা জানারও বা আগ্রহ কোথায়?

মন ছোটো হয়ে আসে হেমলকের। বুকের ভেতর সংশয় জাগে। যেই মানুষটার ভালোবাসা পেতে সে মরিয়া আদৌ সেই মানুষটা তাকে ভালোবাসবে তো? 

  রানি প্রাসাদে প্রবেশ করে খানিক আবার ফিরে তাকালেন। হেমলকের শুকনো মুখটি দেখে যে বেশ বুঝা যাচ্ছে কিচ্ছুটি খাইনি সে। তবুও রানি আগ বাড়িয়ে আর লোকটার মায়া বাড়াতে চান না। মায়া বাড়লে বিচ্ছেদে মৃত্যু সমান কষ্ট হবে। রানি পাষাণ, কিন্তু এতটা পাষাণ নন যে, যারা তাকে ভালোবাসে তাদের কষ্ট দিতে পারেন এতটা। দীর্ঘশ্বাস ফেললেন তিনি। বিড়বিড় করলেন,
 “আপনার একটা গতি ঠিক হবে। আমি প্রেম, ভালোবাসায় বিশ্বাসী যদিও নই তবে আমি কথা দিচ্ছি, আপনাকে ভালোবাসা আমি ফিরিয়ে দিবো। হয়তো অন্য কোনো ভাবে, অন্য কারো মাধ্যমে।”
·
·
·
চলবে……………………………………………………

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

WhatsApp