“আব্বু কলিজা, ভোর লাভস ইয়্যু সোওওওওও মাচ!”
দুই হাত মেলে দিয়ে সর্বোচ্চ প্রসারিত করে বলে অরুণাভ ভোর সরকার। কুট্টি দাঁত বের করে মিষ্টি করে হাসে। সম্মুখে দন্ডায়মান গম্ভীর মানবের মুখে ব্যাপন প্রক্রিয়ায় হাসি’রা ছড়িয়ে পড়ে। বগল দাবা করে বুকের উপর তুলে নেয় আদুরে ছানাকে। ফুলো টসটসে গালে ঠোঁট ডাবিয়ে চুমু দেয়। ভরাট স্নেহময় স্বরে প্রত্যুত্তরে বলে,
“আব্বু অলসো লাভস কলিজা ভেরি ভেরি ভেরিই মাচ!”
আদর পাগল ভোর আদর পেয়ে খুব খুশি। বাবার দুই গাল চেপে বাবার ঠোঁট স্বীয় কপাল, থুতনি, নাকের ডগায় ছুঁইয়ে ছুঁইয়ে আদর আদায় করে। অরুণ সরকার হাসে ক্ষীণ। ভোরকে শুকনো বাথ টাবে বসিয়ে পানি ছাড়ে। ভোর টাবে থুতনি ঠেকিয়ে বাবাকে পলকহীন দেখে যায়। অরুণ ভ্রু উঁচিয়ে শুধায়,
“কি? ওভাবে কি দেখছো মানিক সোনা?”
“তুমি এত্তো বড়, আমি এইটুকুন কেন?”
“কারণ আমি তোমার আব্বু। আর তুমি আমার আদুরে ছানা।”
ভোর বিজ্ঞ ভঙ্গিতে মাথা নাড়লো। বাবার পেটানো উদরের দিকে তাকিয়ে চিন্তিত বদনে প্রশ্ন ছুঁড়ে,
“আব্বু, আমি কি তোমার টাম্মি থেকে হয়েছি? ছোটবেলায় এই টাম্মির ভেতর ছিলাম?”
বাবার উদরে আঙুল ঠেকায় ভোর। অরুণ সরকার শব্দ করে হেসে ওঠে। ভোর হা করে দেখে যায় বাবার প্রাণবন্ত হাসি। অরুণ হাসতে হাসতেই স্বীয় গালে শেভিং ক্রীম মাখায়। কোণা চোখে ছেলের দিকে চেয়ে বলে,
“একদম ঠিক ধরেছো মানিক সোনা। তুমি আমার টাম্মি থেকেই এসেছো।”
বাবা সম্মতি জানালেও ভোর জানে সে বাবার না বরং মায়ের টাম্মি থেকে এসেছে। তবে তাঁর ধারনা মায়ের টাম্মি থেকে না এসে বাবার টাম্মি থেকে আসলে ভালো হতো। ভোর মিষ্টি মিষ্টি হেসে আদুরে গলায় ডাকে,
“আব্বু কলিজা, ওটা কি লাগাচ্ছো?”
“দাঁড়িতে মুখ ভরে গেছে। কেমন বুড়ো বুড়ো ফিল পাচ্ছিলাম। ভোরের বাবাকে বুড়ো লাগলে তো চলবে না, তাই না? ভাবলাম শেভ করি। এটা হচ্ছে শেভিং ক্রিম।”
ভোর হা করে বাবার কথা গিলে। অরুণ হেসে ঠোঁট দুটো চেপে দেয়। ভোর মিষ্টি করে হেসে চিবুক উঁচিয়ে আবদার জুড়লো,
“আব্বু, আমিও।”
অরুণ হেসে ছেলের চিবুকেও ফোম লাগিয়ে দেয়। ব্লেড হীন রেজারে ভোরের গালে চিবুকে লেগে থাকা ফোম চেঁছে ফেলে। ভোর মজা পায় বেশ। বাবার চিবুক থেকে ফোম নিয়ে নিজ গালে লাগিয়ে বলে,
“ভোরের অনেক মজা লেগেছে। আবারও?”
অরুণ নাক টেনে দিয়ে আবারও ছেলের আবদার পূরণ করে। ভোর পরপর একই কাজ করে। অরুণ হেসে বলে,
“আমার জান, এমন করলে তো অফিসে লেট হয়ে যাবো!”
“তোমার অফিস তুমি লেট করে গেলে কেউ বকবে না আব্বু।”
“কিন্তু ময়না পাখি, বস লেট করলে তো অফিসের সবাই কাজে ফাঁকি দিবে। তখন লস তো আমারই, তাই না সোনা?”
বুঝদার ভোর বুঝে যায় সব। অরুণ শেভ করে মুখ ধুয়ে নেয়। পান্ডা ব্রাশে পেস্ট লাগিয়ে ভোরকে ‘ই’-কারান্ত মুখ বানাতে বলে। ভোর কুট্টি দাঁত বের করে দিলে অরুণ সরকার দাঁত ব্রাশ করিয়ে দেয়। ভোর বাবার ক্লীন শেভ করা গালে হাত বুলিয়ে বলে,
“আব্বু তোমার গালে দাঁড়ি আসে, আমার কেন আসে না? আমারও দাঁড়ি চাই। তোমার মতো বড় হতে চাই। এখন থেকে আমিও তোমার মতো বেশি বেশি হরলিক্স খেয়ে ইয়া বড় হয়ে যাবো। তোমার থেকেও বড়। আইডিয়াটা দারুণ না?”
গম্ভীর অরুণ সরকারের মুখে আবারও হাসি ফুটে ওঠে। ছেলের চোয়াল আলতোভাবে চেপে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে ব্রাশ করায়। বলে,
“আমার ছানা, আমার কলিজা এরকমই থাকুক একটুও বড় না হোক। এরকমই আদুরে ছানা; যাকে আদরে সোহাগে ভরিয়ে রাখতে পারবো। বড় হলে তো আদর করতে পারবো না মানিককে।”
"কেন কেন? বড় হলে আদর করবে না কেন?"
ছেলের উদ্বেগ দেখে অরুণ ঠোঁট চেপে হাসে। কুলকুচি করিয়ে দিয়ে হাত মুখে পানি দিয়ে বলে,
“শুধু কি আদর? খাইয়ে দিতে পারবো না। গোসল করিয়ে দিতে পারবো না। প্রাণভরে চুমু খেতে পারবো না। বুকে জড়িয়ে ঘুম পাড়াতে পারবো না। এমনকি তুমি তো আমার জ্যাকেটের ভেতরেও লুকোতে পারবে না।”
ভোরকে বেশ চিন্তিত দেখায়। ফুলো গালে অভিমানের ছায়া। পিটপিট করে তাকিয়ে ঠোঁট ফুলিয়ে বলে,
“তাহলে আমি বড় হবো না।”
“দ্যাটস লাইক মায় কলিজা”
ভোর হাত বাড়িয়ে দিলো। অরুণ ছোট্ট হাত দু'টো ধরে বাথটাবে নামে। সহনশীল গরম পানিতে বাবা ছেলে গোসল সেরে রেডি হয়ে নেয়। শীতের মৌসুম! ভোর সোয়েটারে পুরো প্যাকেট হয়ে আছে। তবুও দাঁতে দাঁত লাগিয়ে ঠক ঠক আওয়াজ তুলে যেন শীতে কূল পাচ্ছে না। অরুণ সরকার ছেলের মনোভাব বুঝে হাসে।জ্যাকেট গায়ে জড়িয়ে ছেলেকে ইশারায় ডাকে। ভোর আদুরে বিড়াল ছানার মতো বাবার বুকে লুকিয়ে যায়। অরুণ জ্যাকেটের চেইন আটকে বলে,
“এখন শীত লাগছে বাবার কলিজার?”
“থোরা থোরা”
বলেই ভোর খিলখিলিয়ে হেসে ওঠে। তাঁর হাসির রূনঝুন ধ্বনি রুমের দেয়ালে বাড়ি খেয়ে পুনরায় ফিরে আসে কর্ণগহ্বরে। সেই প্রাণখোলা হাসির বাক্স অরুণ সরকারের বড্ড প্রিয়। স্মৃতির পাতায় ভেসে আসা সেই হাসির সুর এখনো হৃদয়ে দোলা দেয়। তবে বুকটা প্রশান্তিতে ভরে ওঠে না। ইশ্ তাঁর কলিজা সেই পুরনো কথাটা যদি রাখতে পারতো! যদি কখনোই বড় না হতো। সে সেভাবেই জ্যাকেটের ভেতর বুকের মাঝে লুকিয়ে পুরো দুনিয়ার নজর থেকে রক্ষা করতো। আদুরে মুখটায় চুমুতে ভরিয়ে দিতো। ছোট্ট ছোট্ট আঙুল মুখে পুরে আলতো কামড়ে দিতো। পেটে কাতুকুতু দিয়ে হাসতে বাধ্য করতো। কিন্তু তা যে নিয়মের বাইরে। ফেলে আসা সেই দিনগুলো এখন স্মৃতির পাতায় বন্দি থাকবে শুধু।
“আঙ্কেল, ভোর আরও একটা উইকেট ফেলেছে। ওই যে দেখুন?”
টুটুলের কথায় কালো ফ্রেমের চশমাটা ঠিক করে নিলো অরুণ সরকার। ক্রিজের পানে তির্যক দৃষ্টি রাখে। দূর হতে বোঝা যায় না খুব একটা। তাই বড় পর্দায় দিকে তাকায়। সেখানে ছেলের হাস্যোজ্জ্বল ঘর্মাক্ত মুখটা স্পষ্ট দেখা যায়। গালে সদ্য গজানো খোঁচা দাঁড়ি চুলকে মিটমিট হাসছে। তাঁর সহ-খেলোয়াড় এগিয়ে এসে কোলাকুলি করে বাহবা জানায়। ছেলেও দু হাতে জড়িয়ে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে। অরুণ সরকারের হৃদয় কোণে কিছু একটা পুড়ে ছাই হলো কি? হয়েছে হয়তোবা।
গ্যালারি ভর্তি ঈষৎ মানুষের ঢল। অথচ ছত্রিশ গজের মাঠ চব্বিশ জনের দখলে। দু’জন আম্পায়ার আর বাকি বাইশজন খেলোয়াড়। খেলোয়াড়দের মধ্যে এক একুশ বছর বয়সী যুবক বল ঘুরায় আঙুলের সাহায্যে। সহ-খেলোয়াড়ের পরামর্শে ব্যাটসম্যানদের দিকে সুক্ষ্ম চোখে চায়। ঘন কালো চোখের পাপড়িতে আধঢাকা বিড়াল চোখের মণিযুগলে আত্নবিশ্বাস প্রখর। অধর কোণ বেঁকে সৃষ্ট তির্যক হাসির রেখা যেন ভোর বেলায় অম্বরকোণে কমলা আলো ছড়িয়ে দেওয়া হাস্যোজ্জ্বল অরুণ! ধবধবে দাঁত কপাটির কয়েকটি দেখিয়ে সহ খেলোয়াড়ের উদ্দেশ্যে বলে,
“চায়ের বন্দোবস্ত করেন ফাহিম ভাই! সম্বন্ধি সাব শিঘ্রই ড্রয়িংরুমে গিয়ে বসে চা খাবেন!”
ফাহিম যুবকের কাঁধ চাপড়ে হাসে। চোখ টিপে কিছু ইশারা করে চলে যায় গ্লাভস হাতে স্ট্যাম্পের ঠিক পেছনে। উইকেট কিপার সে। নিজ পজিশন নিয়ে চেঁচিয়ে চিয়ার্স করে,
“বেস্ট অফ লাক অরুণাভ!”
যুবক ছেলে কপাল ঢেকে রাখা চুলের সমাহার ঠেলে পেছনে দেয়। উরুতে বল ঘঁষে নিয়ে আঙুলের সাহায্যে ঘুরিয়ে পরিকল্পনা মাফিক বল করে। বল ঘুরতে ঘুরতে ব্যাটসম্যানদের চোখ ফাঁকি দিয়ে সোজা স্ট্যাম্প ছুঁয়ে কিপার ফাহিমের হাতের মুঠোয়। গ্যালারি মৃদুমন্দ উল্লাসে ভাসে। আম্পায়ার এক আঙুল উঁচিয়ে আউটের ইঙ্গিত দিলে সবাই আনন্দে লাফিয়ে উঠে। যুবক ছেলে স্বীয় কলার টেনে একগাল হাসলো। উইকেট কিপার ফাহিম এগিয়ে এসে বুকে জড়িয়ে বাহবা দেয়,
“এই না হলো কন্ফিডেন্স! শা*লা তোর বোন থাকলে আমার। আছে নাকি?”
যুবক ছেলে কপাল কুঁচকে নেয়। বড় ভাই সম ফাহিমের কাঁধে হাত রেখে হেসে বলে,
“অরুণাভ সরকারের একটি মাত্র বোনের নাখরা সহ্য করার মতো ধৈর্যশক্তি আপনার নেই ভাই।”
ফাহিম হেসে অরুণাভের ঈষৎ বাবড়ি চুল গুলো এলোমেলো করে দেয়, “ব্রাভো অরুণাভ! এই কনফিডেন্সটাই সিনায় রাখবি। কোনো বাপেও দমায় রাখতে পারবে না।”
অরুণাভ চুলের ভাঁজে আঙুল গলিয়ে পেছনে ঠেলে দেয়। সহ খেলোয়াড়দের সাথে কাঁধ মিলিয়ে খেলায় জানপ্রাণ ঢেলে দেয় জয়ের আশায়। কিন্তু জয় তাদের ঝুলিতে আসতে নারাজ। বিপক্ষ দল জিতে যায় চার উইকেটে। একদল আনন্দে মাতোয়ারা তো আরেক দল ব্যর্থতায় মুখ লুকায়। অরুণাভ ব্যর্থ হয়ে সবুজ মাঠে হাঁটু গেড়ে বসে। তার বয়সী মোহন নামের আরেক খেলোয়াড় এগিয়ে এসে পিঠে হাত রেখে উঠতে ইশারা করে। অরুণাভ উঠে দাঁড়ায়। চোখ যায় অদূরে প্রায় জনশূন্য ছাউনিতে বসে থাকা বাবার অবয়বের পানে। মুখটা স্পষ্ট নয়। তবে সে জানে বাবা তাঁর দিকেই তাকিয়ে। মাথার স্পোর্টস ক্যাপ ঠিক করে অরুণাভ লাজুক হাসে। বাকি ফর্মালিটিজ পূরণ করে ড্রেসিং রুমের দিকে চলে যায়।
ড্রেসিং রুমের সোফায় হাত পা ছড়িয়ে বসে পড়লো অরুণাভ। লীগ থেকে ছিটকে পড়েছে তাদের দল। তাই বাড়ি ফেরার পালা। এখন নিশ্চয়ই টিম ম্যানেজমেন্ট ক্লাস নেবে সবার। সে তৎক্ষণাৎ উঠে বসে। নিজ সরঞ্জাম ব্যাগে ভরতে শুরু করে। টিম মেট সবাই নিজেদের মধ্যে ব্যস্ত। সবার মুখেই হতাশার ছাপ। অরুণাভ সরকার পরণের জার্সি খুলে নেয়। দৃশ্যমান হয় ফর্সা গতর। হ্যাংলা পাতলা হলেও বেশ পেটানো। ঘর্মাক্ত শরীরে সফেদ তোয়ালে ঘষতে ঘষতে সে বাকিদের উদ্দেশ্যে বলে,
“আমি হোটেলে ফিরছি না। লাগেজ সাথেই এনেছি। আ’ম গোয়িং টু হোম। আব্বু এসেছে সাথে বন্ধু। সো গাইস আমি টা টা!”
“মি. জুনিয়র অরুণ সরকার টিম মিটিং হবে একটু পরেই। প্রেস কনফারেন্স তো আছেই। একদম পালাবি না। তোর কিসের টেনশন? এখন পর্যন্ত তুই সর্বোচ্চ উইকেট শিকারি। সাথে রানের ঝুলিও কম না। তুই থেকে যা ভাই। আমরা অন্তত একটু কনফিডেন্ট পাবো।”
ফাহিম ভাইয়ের কথায় অরুণাভ বলল, “স্যরি ভাই। এবারের মতো ম্যানেজ করে নিন। নেক্সট টাইম পাক্কা। বিপিএল ফিক্সিংয়ের শুনানিতে দেখা হচ্ছে!”
তাঁকে আর আটকানো যাবে না। কচি খোকাটার বাবা এসেছে বলে কথা। ফাহিম জোর করে না। অরুণাভ কোমড়ে তোয়ালে পেঁচিয়ে প্যান্ট খুলতে উদ্যত হতেই সোফায় বসা এক টিম মেট টিপ্পনী কেটে বলে,
“লাজ লজ্জা দেখছি কিছুই নেই অরুণাভ। রুমে কত সিনিয়র মেট আছে! কুছ তো শারম কার মেরে ভাই?”
ছেলেটা মোহন। অরুণের সাম কাইন্ড ওফ দোস্ত বলা চলে। অরুণাভ স্বীয় কাজ অব্যাহত রেখে ভাবলেশহীন ভাবে বলল,
“লজ্জা মেয়েদের ভূষণ। আমি সেটা দিয়ে কি করবো? এখানে সবাই পুরুষ মানুষ। এই তোর ভেতরে কোনো সমস্যা আছে নাকি? ফিলিংস জাগছে মোহন? ছেঃ ছেঃ! বাট স্যরি হ্যাঁ? আই ডোন্ট হ্যাভ এনি ইন্টারেস্ট ওন আ ম্যান। আর ইয়্যু আ ম্যান ওর সামথিং…?”
শেষে ভয়াবহ প্রশ্ন ছুঁড়ে ভ্রু যুগলে অদ্ভুত ঢেউ তুলে অরুণাভ সরকার। উপস্থিত টিম মেট ক্ষণিকের জন্যে হলেও হতাশা ভুলে হেসে ওঠে। অরুণাভ ততক্ষণে সম্পূর্ণ তৈরি। ব্যাগ কাঁধে ফেলে মাথায় সবুজ স্পোর্টস ক্যাপ পরে নেয়। সানগ্লাস লাগিয়ে মিষ্টি হাসি উপহার দিয়ে বলল,
“বিপিএলে দেখা হচ্ছে গাইস। ভালো থাকবেন, সুস্থ থাকবেন , আমাকে স্মরণে রাখবেন। নামটি আমার অরুণাভ সরকার।”
স্টেডিয়াম থেকে বেরিয়ে আসে অরুণাভ। এক হাতে লাগেজ। অপর কাঁধে ব্যাগ। পরণে হুডি আর ট্রাউজার। পায়ে সাধারণ স্যান্ডেল। বেশভূষায় অতি সাধারণ এক যুবক। বোঝার অবকাশ নেই এক ধনীর দুলাল সে। যার বাবা তাকে প্রয়োজনের অতিরিক্ত লাট দিয়ে বড় করেছে। অরুণাভ ফোন বের করে বাবার নম্বরে কল লাগায়। হঠাৎ খেয়াল করে পেছনে কেউ আসছে। ঘার ফিরে চাইতেই হাস্যোজ্জ্বল মুখে মোহনকে ছুটে আসতে দেখে। অরুণাভ ইশারা করে জানতে চায় ‘প্রবলেম কি?’ মোহন উচ্ছ্বসিত বদনে হাজির হয়। বন্ধুর কাঁধ জড়িয়ে চমৎকার একটা হাসি উপহার দিলো।
"পাতাবাহারের সাথে সাক্ষাত করতে এলাম। আই মিসড হার ব্যাডলি। হোয়ার ইজ সি?”
অরুণাভের স্বাভাবিক মুখশ্রী গম্ভীর হতে দেখা যায়। মোহন তাতে গুরুত্ব দিলো না। ইতি উতি তাকিয়ে বলল,
“পাতাবাহার এসেছে তাই না?
অরুণাভ রাগলেও নিজেকে অতিশয় শান্ত রেখে বন্ধুকে শুধরে দিলো, “সি’জ মায় আম্মু। গিভ হার রেসপেক্ট। কল হার আন্টি।”
মোহন গায়েই লাগায় না। গা ছাড়া ভাব নিয়ে জার্সির কলার ঠিক করে বলল, “সি'জ নট আন্টি টাইপ ব্রো। সি লুকস ড্যাম কিউট। লাইক আ কিউট ক্যাট। আ'ম ক্রাশড অন হার। সো ডোন্ট ফোর্স মি টু কল হার আন্টি। ফর মি যাস্ট পাতাবাহার!”
অরুণাভ রাগ দেখিয়ে পা চালায়। মোহন হেসে তাঁর পিছু ছুটে। স্টেডিয়াম পেরিয়ে পার্কিং জোনে এগিয়ে গেলেই কালো রঙের মার্সিডিজ চোখে পড়ে। অরুণাভ এগিয়ে গেলেই দরজা খুলে যায়। ড্রাইভিং সিটে গম্ভীর মুখে বসে এক ভদ্রলোক। বাবার দর্শনে অরুণাভের গম্ভীর মুখে মিহি দানার মতো হাসি ফুটে উঠলো। সে চিরচেনা সুরে ডাকলো,
“আব্বু…”
“আসসালামুয়ালাইকুম আঙ্কেল। পাতাবাহার আসে নি? তাকে দেখতেই তো ছুটে আসা।”
বন্ধুকে একপ্রকার ঠেলে সরিয়ে দিয়ে মোহন উচ্ছ্বসিত গলায় ভদ্রলোকের উদ্দেশ্যে বলল। সাথে উঁকি ঝুঁকি দেয় গাড়ির ভেতরে। কিন্তু কাঙ্ক্ষিত ক্রাশের দর্শন মিলল না। সে হতাশ হলো। অরুণাভ বিরক্ত মুখে ডিকিতে লাগেজ তুলে এগিয়ে আসে।
অরুণ সরকার ছেলের বন্ধুকে পুরোপুরি উপেক্ষা করে গম্ভীর মুখে ছেলের দিকে তাকালো। গমগমে সুরে ছেলেকে বলল,
“এরকম লেইম মজা আমার পছন্দ নয়। তোমার সো কল্ড বন্ধুকে বলে দিও।”
মোহন এ যাত্রায়ও কথা গায়ে মাখলো না। ভোরের কাঁধে কনুই ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়ে অরুণকে বলল,
“কোথায় মজা করলাম আঙ্কেল? আ'ম ড্যাম সিরিয়াস। পাতাবাহারের কিউটনেসে তো আমি ফিদা। এই অরুণাভ ওনাকে বলবি আই মিসড হার। আমি ফোন করলে একবার কথা বলিয়ে দিস; নাহলে ওনার নাম্বারটা হোয়াটসঅ্যাপে দিয়ে দিস। তাহলে ফারুক হোসেনের মেয়েকে পটাতে তোকে সাহায্য করবো।”
অরুণাভ ঠেলেঠুলে সরিয়ে দেয় মোহনকে। গরম চাহনি নিক্ষেপ করে নীরব হুমকি দিয়ে গাড়িতে উঠে বসতে নেয়। ড্রাইভিং সিটে বসা অরুণ সরকার বাঁধা দিয়ে ফ্রন্ট সিটে বসতে ইশারা করলো। অরুণাভ কাঁধের ব্যাগটা পেছনের সিটে টুটুলের মুখের উপর ছুঁড়ে মারলো। ফন্ট সিটের দরজা খুলে বাবার পাশে বসলো। অরুণ সিটবেল্ট লাগাতে বললে অরুণাভ নাকচ করে বলল,
“সিটবেল্ট থাক না আব্বু! আজকের ম্যাচ পুরোটা দেখেছো তাই না? লাস্ট ওভারে আমি আদিল ভাইকে বোল্ড করেছি। স্ট্যাম্প উড়ে গিয়েছিল এক্কেবারে।”
অরুণ কিছু বলবে পেছন থেকে টুটুল মেয়েদের মতো শব্দ করে মুখ মুচড়ায়। ব্যাঙ্গ স্বরে বলে, “হ্যাঁ দেখেছে। আর তুইও যে ফাস্ট বলে বোল্ড হলি সেটা আরও ভালোভাবে দেখেছে। এই তোকে দলে কে নিয়েছে? ঠিকঠাক ভাবে ব্যাটটাই ধরতে জানিস না!”
অরুণাভ ফট করে পেছনে ফিরে। হাত বাড়িয়ে টুটুলের চুল মুঠোয় ভরে বলে,
“তুই তো সবজান্তা! আমার টিকিটে খেলা দেখতে এসে আমাকেই পঁচানো হচ্ছে? দে টিকিটের চার হাজার টাকা?”
টুটুলও কম নাকি! ভোরের আধভেজা চুল টেনে ধরে বলে,
“গেস্ট পাস দিয়ে ঢুকেছি আমরা। তাছাড়াও তুই ই তো হাজারবার অনুরোধ করে ডেকে আনলি যে, আয় দোস্ত আমার খেলা দেখ! আসাটাই ভুল হয়েছে। মান সম্মান কিছুই রাখিস নাই। মহল্লায় গর্ব করে বলেছিলাম আমার বন্ধু অনেক বড় ক্রিকেটার। এবার ফাইনাল কাপ তারাই নিবে। অথচ তোরা একটা ম্যাচও জিততে পারলি না। লুজার কোথাকার!”
অরুণাভ ধুরুম ধাম কয়েকটা লাগিয়ে দেয় টুটুলকে। টুকুলও ফিরিয়ে দেয় কয়েকটা। অরুণ দামড়া ছেলেদের কিলাকিলি করতে দেখে হিতাহিতজ্ঞান খুইয়ে বসে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার অবস্থা হলে অরুণ ধমকায় দু’টোকেই। কি বাচ্চামো লাগিয়ে দিয়েছে! অরুণাভ ছেড়ে দেয় টুটুলকে। সিটে গা এলিয়ে ঈষৎ বড় চুল পেছনে ঠেলে খানিকটা ভাব নিয়ে বলল,
“আব্বু আছে তাই বেঁচে গেলি। নয়তো মাথার চুল একটাও থাকতো না। আর অরুণাভ সরকার লুজার না; দেখিস তাঁর হাত ধরেই একদিন বিশ্বকাপ আসবে।”
টুটুল প্রত্যুত্তরে কিছু বলতে নিয়েও ফিক করে হেসে ওঠে। হেসে সিটে গড়াগড়ি খায় বাচ্চাদের মতো। অরুণাভ যেন রাগে ক্ষোভে ফুঁসে ওঠে। অরুণ সরকারের মুখেও চাপা হাসি ছুটে আসে। যা অরুণাভের রাগ আরও বাড়িয়ে দেয়। সে থমথমে মুখে বলল,
“খুব হাসি পাচ্ছে, তাই না? যেদিন কাপ হাতে ফিরবো সেদিন কথা হবে।”
টুটুলের অট্টহাসি বেড়ে যায়। হাসতে হাসতে চোখের কোটর জমে গেছে। সে কানি আঙুল উঁচিয়ে বলল, “তোর কথা শুনে হাসতে হাসতে আমার হিসি চলে এলো বন্ধু। আঙ্কেল গাড়িটা একটু সাইডে নিন। হিসি চাপিয়ে রাখা খুব কষ্টদায়ক। কিডনিতে সমস্যা হয়।”
অপমানে অরুণাভের গাল ভারী হয়। অরুণ সরকারও ঠোঁট টিপে হাসে। ছেলের কাঁধ চাপড়ে বলে,
“ইনশাআল্লাহ বলো।”
অরুণাভ মুখ ফিরিয়ে নেয়। উইন্ডোস্ক্রিণে বাইরের ব্যস্ত শহরে চোখ বুলিয়ে ভাবে, তাঁরাও একদিন দেশের জন্য ট্রফি আনবে; বিশ্বকাপের মঞ্চে সবাইকে তাক লাগিয়ে বাংলার বাঘ গর্জে উঠবে ইনশাআল্লাহ। অরুণ আড়চোখে ছেলের দিকে তাকায়। চুলগুলো এতো বড় করেছে কেন? একদম মানাচ্ছে না। বখাটেদের মতো লাগছে। ফর্সা মুখটা রোদে পুড়ে একটু শ্যাম বর্ণের হয়ে গেছে। মুখে লালচে ব্রণের দাগ। একটুও যত্ন নেয় না নিজের। সে ঈষৎ ঘার বাঁকিয়ে ছেলের বন্ধুর উদ্দেশ্যে বলল,
“আমার ফর্সা ছেলেটা কালো হয়ে যাচ্ছে টুটুল। মুখে ব্রণের দাগ। বখাটে ছেলেদের মতো চুল গুলো বড় করছে। ভালো জেন্টস পার্লারের খোঁজ নিয়ে এপয়েন্টমেন্ট নাও।”
বাবার কথায় অরুণাভ তড়িৎ গতিতে ঘার ঘুরিয়ে চায়। চুলগুলো কপালে আছড়ে পড়ে। ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে চাঁপা স্বরে বলে,
“একদম না আব্বু। এসব আগলা আদিখ্যেতা দেখাবে না। আমি ছোট নই আর। নিজের প্রোপার কেয়ার নিতে জানি, ওকে?”
অরুণ প্রত্যুত্তরে কিছু বলল না। ছেলের রাগী মুখটা একপলক দেখে নিয়ে চুপচাপ গাড়ি চালানোয় মনোনিবেশ করে। তাঁর গম্ভীর মুখেও রাগের ছিটেফোঁটা। আগলা আদিখ্যেতা দেখায় সে? গাড়ির স্পীড বাড়িয়ে দেয়। স্টেয়ারিং-এ থাকা হাতের মুঠো শক্ত হয়। অরুণাভ মাথা ঘামায় না এসবে। বাইরের ব্যস্ত নাজারায় মনোযোগী হয়। টুটুল পেছনে বসে বাপ ছেলের মতিগতি লক্ষ্য করে। এদের আল্লাহ পাক কোন জমিনের মাটি দিয়ে বানিয়েছে? দুটোই একবেগে স্বভাবের। হঠাৎ গাড়ির ব্রেক কষে অরুণ। টুটুল, ভোর সামনের দিকে ঝুঁকে পড়ে। অরুণাভের কপালে আঘাত লাগে খানিকটা। অরুণ খানিকটা চড়া সুরে ধমকে ওঠে,
“বলেছিলাম সিটবেল্ট লাগাতে। আমার কথা কানে ঢোকে না, না? আগলা আদিখ্যেতা দেখাই তো।”
অরুণাভ নাক মুখ কুঁচকে কপাল ডলে যায় সমান তালে। মাথাটা ঝিমঝিম করছে এখনও। অরুণ হাত বাড়ায় কেটেছে কি না দেখতে। অরুণাভ ঝটকায় বাবার হাত সরিয়ে দিয়ে বলল,
“হালকা লেগেছে। ঠিক আছি আমি। দোষ তোমার আব্বু। হঠাৎ ব্রেক কেন কষলে?”
অরুণ সরকার গম্ভীর মুখে সামনে তাকায়। জবাব দেওয়ার প্রয়োজন বোধ করে না। অরুণাভ সিট হেলিয়ে পেছনে টুটুলের কাছে এসে বসলো। দুই বন্ধু গুটরগু আলাপচারিতা চালিয়ে যায়। অরুণ মিররের দিকে তাকায়। ছেলের সুশ্রী মুখটা ভাসে। ওই তো কপালে আঘাতের চিহ্ন! ক্ষারীয় পদার্থ উঁকি দিয়ে তাঁকে ব্যাঙ্গ করছে। অরুণ ফাস্ট এইড বক্সটা পেছনে ছুঁড়ে মারে।
অরুণাভের হাতের মুঠোয় ছোট জুয়েলারি বক্স। তাতে সাধারণ নকশার একটা রিং। টুটুল খপ করে হাতে নেয়। কিছু বলবে অরুণাভ বাবাকে ইশারা করে সতর্ক করে। টুটুল বন্ধুর ইশারা বুঝে সতর্ক হয়। রিংটা নিজ কানি আঙুলে পড়ে নিয়ে ফিসফিসিয়ে বলল,
“রূপার আংটি দিচ্ছিস? ছিঃ তুই কত কন্জুস অরুণাভ!”
অরুণাভ চোখ উল্টিয়ে বিরক্ত প্রকাশ করে বলল, “গাঁধা রূপা না, প্লাটিনামের এটা।”
টুটুলের চোয়াল ঝুলে যায়। অরুণাভ আংটি খুলে নিয়ে পুনরায় জুয়েলারি বক্সে রেখে বলল, “হা বন্ধ কর মশা ঢুকে যাবে!”
টুটুল হা বন্ধ করলো না। কৌতুহল নিয়ে শুধালো, “ডায়মন্ড দিতে পারতি শা*লা! যাইহোক প্রোপোজ করছিস কবে? আজকেই!”
“দেখি কবে করা যায়। বাট আমি নার্ভাস। ও যদি রিয়্যাক্ট করে বসে?”
“রিয়্যাক্ট তো করবেই তবে খুশিতে আত্মহারা হয়ে। ভাই আমি ড্যাম সিওর ও তোকে লাইক করে।”
“তুই সবসময় এটা বলিস। কিন্তু আই থিংক আমার জন্য ওর কোনো ফিলিং কাজ করে না। যেমনটা আমি ওর জন্য ফিল করি!”
অরুণাভ বিষন্ন মুখ বানায়। টুটুল প্রতিবারের মতো উৎসাহিত করে যায়। কিন্তু অরুণাভ কেমন ডাউন ফিল করে। বন্ধু নামক অপ্রাণীর প্ররোচনায় পরে সে আজ এক কুটনি মেয়েকে প্রোপোজ করার পরিকল্পনা করছে। উল্টোপাল্টা কিছু হলে সে বন্ধুর লেমন জুস বানিয়ে স্টেডিয়ামে বেঁচবে।
—————
অডিটরিয়ামে চাঁপা হাসির গুঞ্জন। প্রিন্সিপাল সহ সম্মানীয় ব্যাক্তিবর্গ অডিটরিয়ামের সম্মুখে বসে। হাস্যরসাত্মক পরিচালক পুরো অডিটোরিয়াম জুড়ে ছেয়ে আছে। তাঁর সেন্স অফ হিউমার সকলকে হাসতে বাধ্য করছে। তবে ব্যতিক্রম একজন। ভোঁতা নাক সিঁকায় তুলে গম্ভীর মুখে বসে আছে। পাশেই তাঁর মা জননী পেট চেপে হাসছে। তাদের পেছনের সিটে কতিপয় ছেলে মেয়ে গুসুর ফুসুর গসিপ করতে ব্যস্ত।
“আমি সিওর এটাই অরু। শুনেছি অনেক অহংকারী। ভাবে পা মাটিতে পড়ে না। ওর বাবা এই স্কুলের স্পন্সর তাই তো প্রিন্সিপাল স্যার ‘মা মা’ বলে মুখের ফ্যানা তুলে ফেলে!”
“না রে এই মোটা না। একে তো দেখেই মনে হয় দুই বাচ্চার মা! স্বাস্থ্য দেখেছিস? এ অরু না। অন্যকেউ হবে!”
তাদের আলোচনা মেয়েটার কানে বাজে। প্রথমজনের কথা সহ্য করে নিলেও দ্বিতীয় জনের মুখে নিজেকে নিয়ে এমন কটুক্তি সহ্য করা গেলো না। সে ঘার ফিরিয়ে তাদের মুখাদর্শন দিলো। চোখের চশমা ঠিকঠাক করে বলল,
“কিপ ইয়োর মাউথ’স শাট। ইয়্যু আর ডিস্টার্বিং এভরিওয়ান অ্যান্ড নো ওয়ান ক্যান হিয়ার দ্য লেকচার। দ্য ওয়ার্স্ট পার্ট ইজ দ্য ব্যাড স্মেল কামিং ফ্রম ইয়্যুর মাউথস। ডিডন্ট ইয়্যু ব্রাশ ইয়্যুর টিথস দিস মর্নিং?”
কণ্ঠে রূঢ়তা স্পষ্ট। পেছনের মেয়ে ছেলে মেয়ে গুলো থতমত খেয়ে যায়। এতো দ্রুত ইংরেজি বলায় মানে বুঝতে অসুবিধা হয়, নয়তো তাঁরা চুলোচুলি লাগিয়ে দিতো। পাশে বসা মহিলাটি বোধহয় চশমা পড়া মেয়েটার মা। সে মেয়েকে খানিকটা শাসন করে বলল, “অরুণিতা বিহেভ ইয়োর সেল্ফ!”
অরুণিতা নামক মেয়েটা মায়ের কথা গ্রাহ্য করলো না। পেছনের মেয়ে দুটোর উদ্দেশ্যে প্লাস্টিকের হাসি ঝুলিয়ে বলল, “হোয়াটএভার! আ’ম অরুণিতা সরকার, ডটার অফ অরুণ সরকার। দিস স্কুল রান্স অন মাই ফাদার’স মানি। মাই ফিট ডোন্ট টাচ দ্য গ্রাউন্ড—ক্যান্ট ইয়্যু সি? আ’ম ফ্লাইং।”
আশেপাশের অনেকেই অট্টহাসিতে ফেটে পড়ে। পেছনের ছেলে মেয়ে গুলো অপমানে অডিটোরিয়াম ছাড়লো তৎক্ষণাৎ। অরুণিতা সরকার কাঁধ সমান চুল গুলো রেবনে বেঁধে উঁচু করে ঝুটি বেঁধে নেয়। মা’কে রাগী চোখে তাকিয়ে থাকতে দেখে ভ্রু কুঁচকে বললো,
“হোয়াট?”
পাতা মেয়ের পিঠে কিল মেরে দাঁত কটমট করে বলল, “একদম বাপের মতো হয়েছিস। ম্যানারসলেস কোথাকার! এভাবে কারো সাথে কথা বলে? ওরা তোর সিনিয়র!”
“সিনিয়র মায় ফুট!”
পিঠ ডলে বিরক্তি প্রকাশ করে অরুণিতা। পাতা হতাশ চোখে চায়। এ মেয়ে নাক উঁচু ম্যানারলেস লোকের ফিমেল ভার্সন। পাতা চোখ রাঙিয়ে জানায় বাড়ি ফিরে দেখে নেবে তাকে। অরুণিতা ডোন্ট কেয়ার ভাব নিয়ে বসে থাকে। বিজয় অনুষ্ঠানের এক পর্যায়ে নৃত্য পরিবেশন শুরু হয়। পাতা মেয়েকে বলল,
“আম্মু তুই না বললি ড্যান্স পারফরমেন্স আছে তোর! প্র্যাকটিসও করলি! তাহলে…”
বাক্য অসম্পূর্ণ রেখে মেয়ের জবাবের আশায় থাকে। অরুণিতার নজর মঞ্চের নৃত্য পরিবেশন করা তারই সহপাঠীদের মুদ্রার উপর। এই মুদ্রা তাঁর জানা। সে ছোট করে বলল,
“ভালো লাগছে না। তাই ম্যামকে বলে নাম কেটে এসেছি।”
স্পষ্টতই মিথ্যে কথা। গম্ভীর মেয়ের জ্বল জ্বল করা চোখ পাতার চোখ ঠিকই পড়ে নেয়। মেয়ের কাঁধে হাত রেখে সান্ত্বনা দেয়। অনুষ্ঠানের শেষ পর্যায়ে বিতর্ক প্রতিযোগিতার শেষ পর্ব অনুষ্ঠিত হয়। পাতা হা করে শুনে যায় মেয়ের বক্তব্য। কি সুন্দর বড়দের মতো যুক্তি দাঁড় করাচ্ছে। গুছিয়ে অতি নম্রতার সাথে প্রখর আত্নবিশ্বাস নিয়ে জবাব দিচ্ছে। আঙুল নাড়িয়ে অভিজ্ঞ ডিবেটরদের মতো ডিবেট করে যাচ্ছে। বিশাল এই অডিটোরিয়ামে শুধু তারই বাঘিনীর গর্জন শোনা যাচ্ছে। উপস্থিত বিচারক, শিক্ষক-শিক্ষিকা মন্ডলি, আগত অতিথি, অডিয়েন্সের কাতারে বসা সকল শিক্ষার্থী, গার্ডিয়ান সবার মুগ্ধ নজর তার মেয়ের উপরেই। ভোরের বাবা আসলে ভালো হতো। নিশ্চয় মেয়ের কৃতিত্বে গর্বে ছাতি চওড়া হতো। গর্বের সাথে বলতো, “দেখো পাতাবাহার আমার সোনা।”
ইশ্ মেয়েটার নজর না লেগে যায়।
মেয়ের তিনটে ট্রফি হাতে দাঁড়িয়ে পাতা। মেয়ের টিচারদের সাথে কুশল বিনিময় করে। মেয়ে তার পাশেই। একপর্যায়ে এক শিক্ষিকা বললেন,
“ওর বাবাকে ইনভাইট করা হয়েছিল। উনি আসলেন না যে?”
“ছেলের ম্যাচ আছে আজ। সেখানেই আছে…”
শুরু হয়ে গেলো ছেলের গুনগান। অরুণিতা বিরক্তবোধ করে সেখান থেকে চলে আসে। মাঠে তাঁর ক্লাসফেলোরা গোল বৈঠক বসিয়েছে। অরুণিতা তাদের কাছে যায়। ক্লাসের সকল শিক্ষার্থী একসাথে দাঁড়ালে সবচেয়ে লম্বা, সবচেয়ে স্বাস্থ্যবান মেয়েটা অরুণিতা। বয়সে সমতা বজায় রাখলেও শারীরিক গঠনের দিক দিয়ে সে নাইন টেনে পড়ুয়া মেয়েদের মতোই। তাঁকে দেখেই সহপাঠীরা জানতে চাইলো,
“এই মোটু ছুটিতে কোথায় ঘুরতে যাওয়ার প্ল্যান করেছিস?”
“ব্রো দার্জিলিং ঘোরাবে বলেছে।”
অরুণিতার সংক্ষিপ্ত জবাব। সবাই দার্জিলিং নিয়ে আলাপ আলোচনা শুরু করে দেয়। কে কার সাথে গিয়েছিল হ্যান ত্যান। অরুণিতার সেসবে কান নেই। তাঁর নজর ক্লাসমেট সায়নের উপর। একটু পরপরই তাঁর দিকে তাকাচ্ছে না? কেমন চোরা চাহনি। সেই চাহনির মানে দাঁড় করাতে সময় নেয় না অরুণিতা। সায়ন নামক ছেলেটা হঠাৎ সবার মাঝে এসে দাঁড়ালো। হাসি মুখে বলল,
“যে যেখানেই যাস আমার কথা কান খুলে শুনে রাখিস। থার্টিফার্স্ট নাইট, তার উপর আমার বার্থডে! সো সেদিন সবাইকে আমার বাড়িতে দেখতে চাই। কোনো এক্সকিউজেস শুনবো না। লিটারেলি আমি বাড়ি থেকে তুলে আনবো সব ক’টাকে।”
সায়নের মা সায়রা শেখ অত্র স্কুলের শিক্ষিকা। তাঁছাড়াও সায়ন ক্লাস টপার। তাই তাঁর ইনভাইটেশন প্রত্যাখ্যান করা বোকামি। সবাই রাজি হয়। তবে অরুণিতাকে চুপ থাকতে দেখে সায়ন বলল,
“তুই লাস্ট ইয়ার আসিস নি। এবার বাহানা দেখালে তোকে সহ তোর ভাইকে তুলে আনবো।”
অরুণিতা বিরক্তিকর মুখ বানিয়ে বলল, “ডোন্ট টক রাবিস! নিউ ইয়ারে আমার বার্থডে। সো ব্রো জীবনেও রাজি হবে না। আমার তরফ থেকে আশা না রাখাই ভালো!”
সায়ান তবুও জোড়াজুড়ি করতে লাগে। এমতাবস্থায় পাতার আগমণ। সবাই পাতাকে পাকরাও করে অরুণিতাকে পাঠানোর জন্য। পাতা স্বভাব সুলভ মিষ্টি হেসে বলল,
“ওর বড় গার্ডিয়ান ওর ভাইয়া। ওর ভাইয়াকে রাজি করালে আমার কোনো আপত্তি নেই। তাছাড়াও জানুয়ারির প্রথম প্রহরেই আমার মেয়ে এসেছে এই দুনিয়ায়। তাই সম্ভাবনা খুবই ক্ষীণ! নেই বললেই চলে! যাইহোক আমাদের যেতে হবে। ভালো থেকো সোনামুনিরা।”
পাতা মেয়েকে নিয়ে চলে আসে। অরুণিতা পেছনে ফিরে চায় একবার। সায়ন ক্যাবলাকান্তর মতো তার দিকেই তাকিয়ে আছে। অরুণিতা মুচকি একটা হাসি উপহার দিলো। কাঁধ সমান চুল হাতের সাহায্যে উড়িয়ে সামনে ফিরে মায়ের সাথে পা মেলায়।
স্বনামধন্য রেস্টুরেন্টে বসে পাতা। বিরক্ত মুখে মেয়ের দিকে তাকিয়ে। অরুণিতার সেসব দেখার সময় নেই। সে পিৎজার স্লাইডে কামড় বসিয়ে বলল,
“মাম্মাম খেতে মন চাইলে খাও। তবুও আমার খাবারে নজর দিও না।”
পাতা কটমট করে বলল, “ফাস্ট ফুট গিলবি আর বাপের কাছে ঘ্যান ঘ্যান করবি জিমে ভর্তি করিয়ে দাও। আমার ওয়েট বাড়ছে, সবাই আমাকে মোটু বলে খেপায়। আমি ডায়েট করবো।”
শেষের টুকু মেয়েকে নকল করে বলল পাতা। অরুণিতা গম্ভীর মুখটা আরেকটু গম্ভীর দেখালো। সে আধ খাওয়া পিৎজার স্লাইড রেখে দিলো। টিস্যু নিয়ে ঠোঁটের কোণে লেগে থাকা চিজ মুছে নিয়ে বলল,
“আদরের ছেলের জন্য লিভার, কিডনি সব পুড়ে ছারখার হচ্ছে নিশ্চয়ই? আমারই ভুল তোমাকে সঙ্গে নিয়ে আসা। অবশ্য যতদূর মনে পড়ে আমি তোমাকে বলি নি আমার সাথে আসতে। আচ্ছা বাদ দাও। চলো মাম্মাম আ’ম ফেড আপ।”
পাতা ফোঁস করে শ্বাস ফেলে বলল, “রাগছিস কেন আম্মু? কখন থেকে চড়ুইয়ের মতো ঠুকরে ঠুকরে খাচ্ছিস। জলদি শেষ কর। তোর বাবা ফোনের উপর ফোন দিচ্ছে। আর তুই ঢিলেমি করছিস।”
“আর করবো না। চলো উঠো?”
“এগুলা কে খাবে শুনি? খেয়ে নে ঝটপট তারপর যাবো।”
অরুণিতা উঠে দাঁড়িয়ে স্কুল ব্যাগ কাঁধে ফেলে বলল, “আমার গলা দিয়ে আর নামবে না। তুমিই খাও আমি স্কুটির কাছে।”
হনহনিয়ে চলে যায় অরুণিতা। পাতা মলিন চোখে চায়। সে তো এমনিতেই বলেছিল। মেয়েটা মাইন্ড খেয়ে যাবে কে জানতো? সে আধ খাওয়া পিৎজার স্লাইড হাতে নিয়ে ওয়েটারকে ডেকে বাকি টুকু প্যাক করে দিতে বলে। সাথে মেয়ের পছন্দের মিল্ক শেক নেয়। অবশ্য খাওয়ার যোগ্য সবই ওর ফেভারিট। কিন্তু সমস্যাটা হলো মেয়ে তাঁর একটু হেলদি। বেশি না সামান্যই। আর এইটুকু হেলদিনেস মেয়েটাকে মানায়। লম্বা চওড়া মেয়ের এটুকু স্বাস্থ্য না থাকলে বাঁশের কঞ্চি লাগবে যে। ওয়েটার খাবারের প্যাকেট পাতার হাতে দেয়। পাতা সৌজন্যমূলক হেসে বেরিয়ে আসে। বিল দেওয়ার ঝামেলা নেই। রেস্তোরাঁর নাম “অরুণিতা’স কিচেন” আর মালিকের নাম অরুণ সরকার।
পার্কিং লটে যেতেই মেয়ের শুকনো মুখটা দেখে পাতার খারাপ লাগে। বড় বড় পা ফেলে কাছে আসে। হুট করে মেয়েকে জড়িয়ে ধরে। কপালে সস্নেহে চুমু দিয়ে বলল,
“মাম্মাম অনেক স্যরি। আমার বুচুন বুড়ির মন খারাপ হবে জানলে কখনোই বলতাম না।”
অরুণিতার বোচা নাকের পাটা ফুলে ওঠে মায়ের সম্বোধনে। সে বলল, “হয়েছে আদিখ্যেতা। এবার চলো। তোমার আদরের ছেলে তোমার অপেক্ষায় শুকিয়ে যাচ্ছে।”
পাতা মেয়ের ফোলা ফোলা গাল টেনে দেয়। অরুণিতা বিরক্তি মুখে চায়। সে কি ছোট বাচ্চা নাকি যে এরকম আদিখ্যেতা দেখানো হচ্ছে। বিরক্তিতে মুখটা তেতো হয়ে আসে। পাতা ভ্যানিটি থেকে স্কুটির চাবি বের করে মেয়ের দিকে বাড়িয়ে বলল,
“আস্তে চালাবি আম্মু। এই বয়সে হাত পা ভেঙ্গে শয্যাশায়ী হওয়ার শখ নাই।”
অরুণিতার সব বিরক্তি খুশিতে রূপান্তর হয়। ভেতরে খুশিতে তা তা থৈ থৈ করলেও বাইরে স্বভাব সুলভ গম্ভীর হয়েই রয়। খপ করে চাবি ছিনিয়ে নিয়ে মুচকি হাসলো। স্কুটি স্টার্ট দিয়ে বলল,
“অরুণ সরকার আছে তো তাঁর পাতাবাহারের সেবা করার জন্য।”
পাতা মেয়ের পিঠে ধুম করে কিল বসিয়ে দেয়। স্বযত্নে হেলমেট পরিয়ে দিয়ে বলল, “ছেলে মেয়েদের দেখার পর ফুরসত মিললে তো এই অভাগীর দিকে তাকাবে।”
অরুণিতা ট্যারা চোখে তাকিয়ে বলল, “পাপা আমাদের একটু বেশিই ভালোবাসে বলে তোমার সহ্য হয় না, না? কি হিংসুটে তুমি মাম্মাম!
পাতা হাসলো। পেছনে বসে মেয়েকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে সাবধান করলো, “আম্মু সাবধানে চালাবি। এদিক সেদিক হলে তোর বাপে আমার খবর করে ছাড়বে যে চাবি কেন দিয়েছিলাম!”
অরুণিতা হেসে স্কুটি টেনে নিয়ে যায়। পাতা মেয়েকে মিনিটে মিনিটে সাবধান করে স্কুটি ধীরে আর অতি সাবধানে টানতে। অরুণিতা সেসব কানে নেয় না। সে নিজ মর্জির মালিক কি-না। এরইমধ্যে অরুণ সরকারের কল আসে। এই লোক আরেক পাগল। পাতা রিসিভ করেই বললো,
“আসছি তো ভোরের বাবা। এতোটা উতলা হলে হয়?”
“বাড়ি ফিরতে বিশ মিনিটের বেশি লাগবে না। অথচ স্কুল থেকে বেরিয়েছো ঘন্টা আগে।”
পাতা হেসে বলল, “আর পাঁচ মিনিট। আসছি তো। আমরা ছোট বাচ্চা না।”
“অরুণিতা কোথায়? আমার উপর রেগে আছে নাকি?”
অরুণিতার কপালে বিরক্তির ভাঁজ ফুটলো। পাতা বলল, “রেগে মানে! বোম হয়ে আছে। কিছু বললেই আপনার মতো ছ্যাত করে উঠছে!”
অরুণ সরকার হাসলো, “দাও ওর কাছে!”
পাতা মেয়ের কানে ফোন ধরে। অরুণিতা বিরক্ত প্রকাশ করে বলল, “মাম্মাম ক্যান্ট ইয়্যু সি আ’ম ড্রাইভিং?”
পাতার কপাল চাপড়াতে ইচ্ছে করে। অরুণ সরকারের শুরু হয়ে গেলো। বুঝতে বাকি নেই মেয়ে এই ব্যস্ত বহুল শহরে স্কুটি চালাচ্ছে। রাজ্যের চিন্তা মাথায় ঘুরপাক খায়। পাতা ভুজুং ভাজুং বুঝিয়ে কল কাটে। মেয়েকে শাসিয়ে বলল, “এই শেষ এরপর আমার স্কুটির দিকে তাকালে খবর করে দিবো।”
অরুণিতা মুচকি হাসে। ভিউ মিররে মায়ের সুন্দর মুখখানি দেখার চেষ্টা করে বলল, “মাম্মাম তুমি অনেক প্রিটি দেখতে। আমার ফ্রেন্ডসরা প্রায়ই তোমার কথা বলে। তুমি এখনও যথেষ্ট ইয়ং দেখতে। সেই দিক থেকে পাপা বুড়ো হয়ে গেছে। এ নিয়ে ওদের রাজ্যের চিন্তা।”
“হয়েছে তেল দেওয়া? সামনে তাকা দুর্ঘটনা ঘটতে কতক্ষণ!”
বলতে দেরি অঘটন ঘটাতে দেরি হয় নি। এক বিলাসবহুল গাড়িকে ধাক্কা দিয়েছে স্কুটিটা। গাড়ির পেছনের ব্রেক লাইট ভেঙে গেছে। অরুণিতা শুকনো ঢোঁক গিলে। সিগন্যাল পড়েছে তা খেয়াল করে নি বিধায় সব গাড়ি ব্রেক কষলেও সে পূর্বের গতিতেই চলছিলো। যতক্ষণে টের পায় ততক্ষণে তাঁর নিয়ন্ত্রণের বাহিরে। পাতা মেয়েকে বকে। ভাগ্য ভালো তাদের লাগে নি। মেয়েটাও না! সে মেয়ের কাঁধে হাত রেখে বলল,
“আম্মু ভয় পেয়েছিস?”
অরুণিতা সামনের গাড়ির দিকে তাকিয়ে। গাড়ির ভিউ মিররে কেউ তাকঝাক চালাচ্ছে। গাড়ির ভেতর থেকে মেয়েলী আওয়াজ ভেসে আসছে, ‘বাবু নেমে দেখতো কোন ইডিয়ট ধাক্কা দিলো। টেনে দু’টো চর লাগাতে ভুলবি না।’
অরুণিতা স্কুটি থেকে চটজলদি নামে। মা’কে তাড়া দেয়, “মাম্মাম তুমি সামনে আসো।”
পাতা মেয়ের কথামতো কাজ করে। অরুণিতা মায়ের আড়ালে লুকিয়ে যায়। গাড়ি থেকে নেমে আসে সেই বাবু নামক মানব। নামে বাবু হলেও সে শারীরিক কাঠামোতে বাবু মোটেই না।
“আপা সামনে সিগন্যাল পড়েছে। চোখ কান খোলা রেখে রাস্তায় নামা উচিত।”
গম্ভীর আওয়াজে অরুণিতা উঁকি দিয়ে দেখে মানবকে। চোখাচোখি হয় চার চোখের। বাবুর জোড় ভ্র যুগল ঈষৎ কুঁচকে যায়। হেলমেট পরে আছে মানে এই স্কুটি চালাচ্ছিল। আসল মুজলিম এই মেয়েটাই। পরণে স্কুল ড্রেস, মানে বাচ্চা মেয়ে! কি দিনকাল এলো ভাই! বাচ্চা মেয়ে স্কুটি চালাচ্ছে! এই বয়সে তাঁরা সাইকেলের টায়ারে ধাক্কা দিয়ে পেছন পেছন দৌড়াতো।
পাতা অপরাধী মুখে ভদ্রলোককে জানালো, “আসলে সিগন্যাল খেয়াল করি নি। ভাইয়া আ’ম সো স্যরি। যদি কিছু মনে না করেন গাড়ির সার্ভিসিংয়ের টাকা আমি পে করছি।”
দ্বিধায় পড়ে পাতা। টাকার কথা বলা অনুচিত হয়েছে! যদি তার জনের মতো নাক উঁচু হয় তাহলে তো রেগে যাবে। তবে সামনের ভদ্রলোক রাগলেন না। মিষ্টি হাসি উপহার দিয়ে অরুণিতার দিকে তাকিয়ে বললেন,
“সেসবের দরকার নেই। তবে হ্যাঁ বাচ্চাই মনে হচ্ছে ওকে। রোডে বাচ্চা মেয়ের হাতে স্কুটি না দেওয়াই উত্তম। এ তো কিছুই না বড় দূর্ঘটনার কবলে পড়তে পারেন।”
থেমে অরুণিতার উদ্দেশ্যে বললেন, “হেয় ইয়্যু প্রিটি গার্ল! তুমি তো ভারী পাকা। নিজে অপরাধ করে বড় বোনকে ফাঁসিয়ে দিচ্ছো। হাউ সেলফিস ইয়্যু আর!”
অরুণিতার নাকের পাটা ফেঁপে ওঠে। চোখ উল্টিয়ে বিরক্তিকর প্রকাশ করে। এতো বকবক করছে কেন লোকটা? পাতা মেয়ের দিকে একপল তাকিয়ে ভদ্রলোকের কথায় হেসে বলল, “আমার একমাত্র আদরের মেয়ে। আপনি ভুল ভাবছেন।”
“কি বলছেন! আপনার মেয়ে হয়? অবিশ্বাস্য!”
লোকটার চোখে মুখে অগাধ বিস্ময়। পাতা হেসে সম্মতি দিলো। বাবু প্রাণখোলা হাসি উপহার দিয়ে বলল, “আ’ম রিয়েলি স্যরি। বাট ট্রাস্ট মি আপনাদের মা মেয়ে লাগে না। হেয় প্রিটি গার্ল আপনার আব্বাকে বলবেন হি’জ দা লাকি ওয়ান!”
শেষোক্ত বাক্য অরুনিতার উদ্দেশ্যে ছিলো। পাতা ঢের লজ্জায় পড়ে। লোকটা ঠোঁট কাটা স্বভাবের বুঝতে বাকি রইলো না। অরুণিতা নিজ বিরক্তি ধরে রাখতে না পেরে খানিকটা রুঢ় স্বরে বলল,
“সিগন্যাল ছেড়েছে আপনিও গাড়ি ছাড়ুন। রাস্তায় দাঁড়িয়ে ফ্লার্ট করছে যত্তসব ফালতু লোকজন।”
লোকটার হাস্যোজ্জ্বল মুখের পরিবর্তন ঘটে। কি মেয়েরে বাবা! সত্যিই সিগন্যাল ছেড়েছে। লোকজনের হর্ণের তোপে থাকা যাচ্ছে না। সে গাড়িতে গিয়ে বসলো। গাড়ি স্টার্ট দিয়ে ভিউ মিররে আরেকবার দেখে নেয় মা মেয়েকে! অরুণিতা চোখ রাঙায়। নিঃশব্দে ঠোঁট নাড়িয়ে বলে, ‘ক্যারেক্টারলেস!’
এক্সিলেটরে থাকা হাত শক্ত হয়। মেয়েটার ঠোঁট নাড়ানো শব্দের মানে দাঁড় রাতে কষ্ট করতে হয় না। সেও বিড়বিড় করে, ‘বেয়াদব’
অরুণিতা হেলমেট খুলে মায়ের মাথায় দেয়। পাতা ত্যক্তবিরক্ত হয়ে বলে, “আম্মু তুই এতো খাড়ুস কেন? লোকটা যথেষ্ট ডিসেন্ট। অন্যকেউ হলে কেলেংকারি বাঁধাতো। আর তুই কিসব বললি!”
“লোকটা দিনদুপুরে ফ্লার্ট করছে আর তুমি লাল নীল বেগুনী হচ্ছো। বাড়ি চলো। পাপাকে বলছি সব।”
পাতা কনুই মারে। এই মেয়ে পুরাই বাবার কার্বন কপি। সরকার বাড়ির আলিশান গেইট পেরিয়ে স্কুটি ভেতরে প্রবেশ করে। দারোয়ান মুচকি হেসে হাত তুলে লম্বা সালাম দেয়। পাতা প্রত্যুত্তরে হেসে সালামের জবাব নেয়। চোখ বুলিয়ে দেখে নেয় নিজ বাড়ির চত্বর। সেই আগের মতোই সবুজে ঘেরা। একটুও বদলায় নি। দেখলেই চোক্ষু শীতলায় ভেসে যায়। বাড়ির ভেতরে প্রবেশ করে পাতা। অরুণিতা তাঁর পিছু পিছু হাঁটে।
অরুণ সরকার বৈঠকখানায় বসেছিল। সঙ্গে ভাতিজা রূপক সরকার। কথা হলো, রূপক সরকার শীতকালীন ছুটিতে বন্ধুদের সাথে কক্সবাজার ঘুরতে যাবে। মা রুবি আর বাবা আরিয়ান সরকারের থেকে অনুমতি না মেলায় প্রাণপ্রিয় চাচ্চুকে জেঁকে ধরেছে। সরিষা, সয়াবিন, নারিকেল, অলিভ সব তেল ঢালা শেষ তবুও চাচ্চুর মুখ দিয়ে হ্যাঁ বেরোলো না দেখে হতাশ হলো। অভিমানী স্বরে বলল,
“গেলাম না কক্সবাজার। কি হলো? এবারের ছুটি আমি ঘরে বসেই কাটিয়ে দিবো। ভোর ভাইয়া বন্ধুদের সাথে দার্জিলিং যাবে। তাঁকে অনুমতি দেওয়া হলো আমার বেলাই সকলের গড়িমসি আসে।”
“তো তুই যা ওদের সাথে।”
টিভিতে চলমান নিউজে চোখ রেখেই বলল অরুণ সরকার। রূপক রাগ দেখিয়ে বলল, “তোমার ছেলে নিবে না আমাকে। আনিপু, নয়ন, অরু সবাইকে নিবে। আমাকে ভাইয়া সহ্যই করতে পারেনা। যেন তাঁর গার্লফ্রেন্ডকে নিয়ে ভেগেছি আমি।”
অরুণ সরকার তৎক্ষণাৎ ঘার মুড়িয়ে তাকায়। কৌতুহল দমাতে না পেরে শুধায়, “ওর গার্লফ্রেন্ড আছে?”
রূপক থতমত খেয়ে গেল। ভোর ভাইয়া জানলে তাঁকে উল্টো লটকিয়ে পেদাবে। সে হৈ হৈ করে বলল, “চাচ্চু ওই দেখ আ’মা আর অরু এসেছে!”
অরুণ সরকার সেদিকে তাকাল। পরপর ঘার বাঁকিয়ে ভাতিজার দিকে ফিরতেই বান্দা হাওয়া! অরুণের খটকা জাগলো মনে। কাহিনী কি সত্যিই? সে টিভি মিউটে দিয়ে এগিয়ে যায়। মেয়ের কাঁধ জড়িয়ে অনুতাপের সাথে বলল,
“পাপা অনেক স্যরি সোনা।”
“নো নীড পাপা। ব্রো কোথায়?”
অরুণ সরকার মেয়ের গম্ভীর মুখ পানে তাকায়। খারাপ লাগে তাঁর। তাঁরই যাওয়া উচিত ছিলো। কিন্তু ছেলেটা এতো অনুরোধ করলো তাই! সে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
“এসেই বেরিয়েছে টুটুলের সাথে। ওর ঘরে থাকার সময় কই! এসেছে ফোরটুয়েন্টি করে ঘুরে বেড়াবে বন্ধুদের সাথে। তুমি যাও ফ্রেশ হয়ে নাও।”
অরুণিতা মাথা নেড়ে চলে যায়। কয়েক কদম এগোতেই অরুণ সরকার পিছু ডাকে। অরুণিতা পিছু ফিরলে অরুণ বলল,
“আমি তোমার ডিবেটিং পারফরম্যান্স দেখেছি। তোমাদের স্কুল গ্রুপে কেউ ভিডিও ছেড়েছে। সোসাল মিডিয়ায় বেশ চর্চা হচ্ছে। অনেক ভালো ডিবেট করেছো। শুধু মুখে হাসিটা মিসিং ছিলো।”
এখনও হাসিটা মিসিং। অরুণিতা ছোট্ট পরিসরে ধন্যবাদ জানিয়ে চলে যায় ঘরে। কাঁধের ব্যাগ বিছানায় ছুঁড়ে পায়ের শু উদ্দেশ্যহীন ছুঁড়ে ফেলে। একাধারে পায়ের মুজো, গায়ের কোর্ট, টাই, হাতঘড়ি! হঠাৎ ছোট ছোট গম্ভীর চোখ বিছানায় আটকায়। মস্ত বড় টেডি। টেডির পেটে গোটা অক্ষরে ‘SORRY SHONA’ লেখা। গম্ভীর মুখে হাসি ফুটে ওঠে। টেডি টেনে বুকে জড়ায়। খেয়াল করে বিছানায় আরো কিছু আছে। রেপিংয়ে মোড়ানো বক্স। উপরে লেখা ‘CONGRATS SHONA’ অরুণিতা কৌতুহল নিয়ে বক্স খুলে দেখে। নিমিষেই চোখের আঁকার বড় হয়। ঘুঙুর, তা-ও স্বর্ণের জরিতে বানানো!
—————
পাতা গলা খাঁকারি দেয়। অরুণের বাহু জড়িয়ে ধরে সেথায় মাথায় ঠেকিয়ে বলল,
“একদম বাপের মতো হয়েছে। গোমড়ামুখো নাক উঁচু ম্যানারলেস।”
অরুণ পাতার দিকে তাকায়। পাতা খিলখিল করে হেসে দেয়। অরুণ সরকার চেয়ে চেয়ে দেখে তাঁর হাসি। একসময় রাশভারী গলায় ডাকলো,
“পাতাবাহার?”
“হুঁ?”
‘পাতাবাহার’ ডাকে নিত্য পরিচিত পাতা। তবুও লোকটা যখন গমগমে সুর তুলে ‘পাতাবাহার’ ডাকে বুকের ভেতর দুমড়েমুচড়ে যায়। নতুন অনুভূতি সদা জাগ্রত হয়। সে কৌতুহল নিয়ে তাকিয়ে থাকে পরবর্তী কথা শোনার জন্য। গম্ভীর অরুণ সরকার চিরচেনা সুরে বলল,
“পাতাবাহার হাসলে আমার পুরো পরিবারই হাসে। আমার পাতাবাহারের মুখে সর্বদা সুখের হাসি লেপ্টে থাকুক।”
—————
রোলার কোস্টারে মানুষের গগনবিদারী চিৎকারে অরুনাভের কানের পর্দা ফেটে যাবার উপক্রম। তন্মধ্যে পাশে থাকা বন্ধু টুটুল তো ভয়ে বাচ্চাদের মতো হাউমাউ করে কাঁদছে। এবার রোলার কোস্টারের আসল মজা উপভোগ করে সে। রাইড শেষ হলে টুটুল বন্ধুর পিন্ডি চটকায়। গড়গড়িয়ে বমি করে মাটিতেই বসে পড়ল। অরুণাভ বিরক্ত মুখে বলল,
“সেম অন ইয়্যু! মানসম্মান সব শেষ। ওই দেখ মেয়েরা এদিকে তাকিয়ে হাসছে।”
“রাখ তোর মেয়ে! এদিকে আমার জান যায় যায় আর ও মেয়েদের নিয়ে পড়েছে। যাই বলিস লাল টপস পড়া মেয়েটা কিন্তু হেব্বি দেখতে। পাশের জনও কম না।”
ভোল পাল্টাতে সেকেন্ড সময় নেয় না টুটুল। অরুণাভ পানির বোতল ছুঁড়ে মারে, “কি জঘন্য পছন্দ তোর। আড়াই হাজার টাকার মেকআপ আর কিছুই না। ওরকম মেকআপ তোর উপর এপ্লাই করলে তোকে আরও হেব্বি লাগবে।”
“তা ভুল বলিস নি। তবে আমি খেয়াল করেছি আমার কোনো মেয়েকে ভালো লাগলেই তুই একশ একটা কারণ দেখিয়ে আমার মনটা ভেঙে দিস। তোর সমস্যা কি হ্যাঁ? আমার লাভ লাইনে ভিলেন কেন হচ্ছিস?”
অরুণাভ হুডির চেন লাগায়। কমলা শেডের সানগ্লাস পড়ে নিয়ে হিংসুটে সুরে বলল, “জাহির সি বাত আ’ম ফিল জেলাস। আমার বেস্ট ফ্রেন্ডের সম্পূর্ণ প্রায়োরিটিতে আমিই থাকবো। আমি তোকে ভালোবাসি। সেরকম ভালোবাসা না যেরকম তুই ভাবছিস। আমি তোকে বন্ধু বন্ধু ভালোবাসি। এই টুটুল কোথায় যাস?”
টুটুল পেছনে ফিরেও তাকায় না। গলা চড়িয়ে বলে, “শা*লা তোর হাবভাব সুবিধার না। আমি আমার ইজ্জত খোয়াতে চাই না। মনে- প্রাণে ফুসফুসে, কলিজায়, পিত্তথলি সবেতে আমি আমার না হওয়া বউয়ের।”
অরুণাভ দাঁত কিড়মিড় করে। ছুটে এসে বন্ধুর পশ্চাতে লাথি মারে। দুই বন্ধুর ঠোকরা ঠুকরি শুরু হয়ে গেলো তো গেলো থামলো না।
“ক্ষুধা লেগেছে চল কিছু খাই?”
“আমি আপাদত ফতুর। যা ছিলো রিং নিতেই খতম।”
“আজকের ট্রিট আমার তরফ থেকে। তবে হ্যাঁ কম কম খাবি। তোর মতো ধনীর দুলাল না আমি। তার উপর আমার কিপ্টুস বাপ হাত খরচ দিতেই চায় না।”
অরুণাভ হাসলো। তাঁরা কাছের এক রেস্টুরেন্টে গিয়ে অর্ডার কাটে। টুটুল বন্ধুকে খাওয়ানোর সুযোগ লুফে নেয়। তবে অরুণাভ এক কাপ কফিতেই সীমাবদ্ধ। টুটুল চোখ রাঙাতে অরুণাভ ফোঁস করে শ্বাস ফেলে বলল,
“আ’ম অন ডায়েট। আর এসব খাবার খাওয়া টোটালি নিষেধ। বোঝার চেষ্টা কর!”
টুটুল বুঝতে পারে। তবুও মোরগ পোলাওয়ের প্লেট ঠেলে দেয়। ব্যস হয়ে গেলো ডায়েট। মোরগ পোলাওকে নিষেধ করার সাধ্যি তাঁর নেই। খাওয়ার এক পর্যায়ে অরুণাভ বলল,
“যদি রিজেক্ট হই তখন কি করনীয়?”
টুটুল বিরক্ত মুখে বলল, “তুই সবসময় নেগেটিভ ভাবিস কেন? রিজেক্ট হলেও কিচ্ছুটি যায় আসে না। আঙ্কেলকে বলে সোজা বিয়ে, তারপর হানিমুন, দেন বাচ্চা কাচ্চা।”
অরুণাভ টেবিলের নিচ দিয়ে পা বাড়িয়ে বন্ধুর পায়ে পাড়া দেয়। কটমট করে বলে, “আমার এখনও বিয়ের বয়স হয় নি আর উনি হানিমুন, বাচ্চা বাচ্চা নিয়ে পড়ে আছে।”
টুটুল অদ্ভুত চোখে তাকালো। লেগপিসে কামড় বসিয়ে শুধালো, “বিয়ের বয়স হয় নি তোর? ক’দিন আগে না বার্থডে গেল?”
“টুয়েন্টি রানিং। নেক্সট ইয়ার টুয়েন্টি ওয়ান, যদি বেঁচে থাকি।”
টুটুলের মুখে চিন্তা। তবুও বন্ধুকে আশ্বাস দেয়, “তুই অহেতুক চিন্তা করছিস। ও এক্সেপ্ট করে নিবে।”
অরুণাভ আশ্বস্ত হয় না। চিন্তা হয় ঢের। ফোনের রিংটোনের আওয়াজে চিন্তার দরজা বন্ধ হয়। টুটুল ভ্রু উঁচিয়ে জানতে চায়, “কে? আঙ্কেল?”
অরুণাভ না বোধক মাথা নেড়ে মুচকি হাসলো। রিসিভ করে বলল,
“হ্যাঁ প্রহর বলো শুনছি?”
·
·
·
চলবে……………………………………………………