চোখে কমলা শেডের সানগ্লাস। হুডির টুপি পড়ার দরুণ ঈষৎ লম্বা চুল গুলো কপালে শোভা খাচ্ছে। হাতে গাড়ির চাবি ঘুরিয়ে ঠোঁট চোখা করে সিটি বাজিয়ে সরকার বাড়ির ভেতরে প্রবেশ করে অরুণাভ সরকার। তাঁর আগমন খবর টের পেতেই চার পায়ের ছোট্ট প্রাণীটি ছুটে আসে লেজ নাড়িয়ে। মিউ মিউ ডেকে শত শত অভিযোগ শোনায়। অরুণাভ মুচকি হেসে দুই হাতে তুলে নেয় তাকে। গায়ে হাত বুলিয়ে বলে,
“অ্যানা! মায় লিটল বেইবি! হাউ আর ইয়্যু? ডিড ইয়্যু মিসড মি আ লট?”
বিড়াল শাবকের নাম অ্যানা। পাতাবাহারের একমাত্র বংশধর, সাথে অরুণাভের চোখের মনি। অ্যানা মালিকের আদরে শান্ত হয়ে মিহি সুরে মিউ মিউ ডাকে। অরুণাভ তাকে কোলে নিয়েই ড্রয়িংরুমের দিকে এগোয়। প্রতিবারের মতো সর্বোচ্চ গলা হাঁকিয়ে ডাকে,
“আম্মুউউ?”
মিনু আপার সাথে বসেছিল পাতা। নয়নটার কাল রাত থেকে জ্বর। সকালের দিকে কমলেও বিকেল হতেই আবার গা কাঁপিয়ে জ্বর আসছে। মিনু আপা এতেই ভয়ে কান্না জুড়ে দিয়েছে। আভারি ভাইয়ার মুখের দিকেও তাকিয়ে থাকা যাচ্ছে না। পাতা হাসলো তাদের উদ্রেক দেখে। একমাত্র বুকের ধনকে কতটা চোখে হারায় মিনু আপা আর আভারি ভাই। শুধু অরুণ সরকার একা না; আরও অনেক পিতা-মাতা আছে যাঁরা পারে না কলিজা কেটে ছেলে মেয়ের হাতে তুলে দিতে। ছেলের ডাকে পাতা মিনু আপাকে সান্ত্বনা দিয়ে বেরিয়ে আসে। তন্মধ্যে অরুণাভের চার পাঁচবার হাঁক ছাড়া হয়ে গেছে। পাতা তড়িঘড়ি পা চালায়। ছেলের দর্শন মিলতেই ভুবন ভোলানো হাসি দেয়।
“দেখো দেখো আমার ছোট্ট বাবা এসে গেছে।”
মায়ের কথায় অরুণাভ হেসে বলল, “পাঁচ ফুট নয় আমি। আর তুমি আমাকে ছোট্ট বলছো আম্মু?”
পাতা এগিয়ে আসে। তাঁর কোমড় জড়িয়ে ঘার উঁচু করে উঁকি দেওয়া ছেলেকে দেখতে এখন পাতাকেই ঘার উঁচু করতে হয়। কি লম্বা হয়েছে! সে হাত বাড়িয়ে গাল চেপে ধরে এদিক ওদিক ঘুরিয়ে বলল,
“আমার কাছে তো তুমি সেই ছোট্ট ভোর সোনাটিই। চেহারার কি হাল হয়েছে বাচ্চাটার! চাপা বেরিয়ে এসেছে আমার ছেলের! হায় আল্লাহ!”
“কতদিন তোমার হাতে খাই না! আমার বড্ড ক্ষুধা লেগেছে আগে আমাকে খাইয়ে দাও।”
অরুণাভ মিষ্টি হেসে আবদার জুড়লো। পাতা নিষ্পলক দৃষ্টিতে ছেলের দিকে তাকিয়ে হাসে। তাঁর চোখে জলকনা জমতে সময় নেয় না। অরুণাভ ক্লান্ত চোখে চায়। কোলের অ্যানাকে নামিয়ে দিয়ে হুডিতে হাত মুছে নেয়। মায়ের মুখখানি আঁজলায় ভরে কপালে চুমু দিয়ে বলল,
“আম্মু এতো ইমোশনাল কেন তুমি? এখানে ইমোশনাল হওয়ার কি আছে পাগলী?”
“দুই মাস পর সুরত দেখালে ইমোশনাল হবো না? এখন তো বড় হয়ে গেছো। আম্মু আব্বু না হলেও তোমার চলে। কিন্তু তোমাকে ছাড়া যে আমাদের দিন গুলো কাটতে চায় না।”
অরুণাভ ভ্রু কুঁচকে বলল, “রাগ তো আমার করার কথা। কত করে বললাম আজকের ম্যাচটা দেখার জন্য। আব্বু এলেও তুমি এলে না। তুমি তো আমার একটা ম্যাচও দেখো নি।”
“আমি যেতে চেয়েছিলাম। অরুর স্কুলে ফাংশন ছিল তাই তোমার আব্বু অরুর সাথে পাঠিয়ে দিলো। আমি প্রতিবার যেতে চাই তোমার আব্বু যেতে দেয় না। তোমার বন্ধুরা নাকি উগ্র! এ্যাই ভোর, তুমি বাজে ছেলেদের সাথে মিশো?”
পাতার কণ্ঠে তেজ ফিরে এসেছে। অরুণাভ গলা খাঁকারি দেয়। এই আব্বুও না! সে বলল,
“প্রথমত আমার একটাই বন্ধু সে টুটুল। বাকি সব যেমন তেমন ধরে নাও। আর আব্বু যাদের কথা বলেছে ওরা আমার টিম মেট। অধিকাংশই সিনিয়র বাট মিশুক। ওরাও যথেষ্ট ভদ্র। প্রচন্ড ফান লাভিং। আব্বুর সাথেও মজা করে আর আব্বুকে তো জানোই!”
পাতা তীক্ষ্ম দৃষ্টি ফেলে। অরুণাভ মায়ের গাল টেনে দিয়ে বলল, “মায় সো মাচ সুইট আম্মু! জাসুসি বাদ দাও। আচ্ছা একদিন আমি সাথে করেই নিয়ে যাবো তোমাকে। সেদিন সবার সাথেই পরিচয় করাবো। তুমি ওদের সাথে দুদন্ড মিশলেই বুঝে যাবে ওঁরা কেমন। আর আব্বু কেন তোমাকে নিয়ে যায় না তাও!”
শেষের কথাটা মিনমিনে সুরেই বললো অরুণাভ। পাতা হেসে বলল, “আচ্ছা হয়েছে। ফ্রেশ হয়ে আসো আমি খাবার আনছি। ঘরে নিয়ে যাবো নাকি নিচে আসবে!”
“নিচেই আসছি। বাড়ি ফাঁকা ফাঁকা লাগছে কেন?”
আশেপাশে চোখ বুলিয়ে নেয় অরুণাভ। পাতা একে একে সবার খোঁজ দিলো, “তোমার চাচ্চু আর চাচিমনি এক কলিগের ইনভাইটেশনে গেছে। ছোট জনকে তার ফুপ্পি একপ্রকার জোর করেই নিয়ে গেছে। আনিবুড়ি আর অরু লাইব্রেরী রুমে। রূপ ট্যুরে যাওয়ার অনুমতি পায় নি বিধায় দরজা আটকে অনশনে আছেন। নয়ন’টার কাল থেকে জ্বর। তারই চিন্তায় আভারি ভাই আর মিনু আপার চোখে ঘুম নেই। সুফিয়া খালা রান্নাঘরে।”
অরুণাভের কপালে চিন্তার ভাঁজ, “আমি নয়নকে দেখে আসি একবার। তুমি এক কাজ করো, আগে ফুপ্পিকে ফোন দাও। প্রহরকে যেন এক্ষুনি পাঠিয়ে দেয়। এক্ষুনি মানে এক্ষুনি।”
পাতা হেসে বলল, “তোমার বাবা তাঁকেই আনতে গেছে।”
অরুণাভ কিছু বললো না আর। নয়নের ঘরের দিকে চলে যায়। দরজায় কড়া নেড়ে অনুমতি চায়,
“ও মিনু খালা আসবো?”
ভেতর থেকে মিনু খালার ক্রন্দনরত আওয়াজ ভেসে আসে, “কে?”
‘মিনু খালা নিজ ছেলে পেয়ে আমাকে তো ভুলেই গেছে।’ বিড়বিড় করে অরুণাভ গোমড়া মুখে বলল, “আমি অরুণাভ।”
“কেডায়?”
চোখের পলকে স্বাভাবিক মুখটা গম্ভীর হয়ে আসে। অরুণাভ চলে যাওয়ার জন্য উদ্যত হয়। তখনই আভারি দরজা খুলে ডাকে, “আরে ভোর বাবা যে! কহন আইছো?”
অরুণাভ থেমে যায়। আভারির দিকে ফিরে বললো, “মাত্রই। নয়নের জ্বর কেমন?”
আভারি ব্যাথিত মুখে ছেলের হালচাল জানায়। অরুণাভ ভেতরে প্রবেশ করে। সবার আগে নজর কাড়ে মিনু খালা। আগে যেমন ছিলো তেমনই আছে। পরিবর্তন বলতে শুধু চুলগুলোই পেকেছে। ছেলের শিয়রে বসে পরম যত্নে মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে। এককালে এই স্নেহে ডোবা হাত তাঁর মাথায়ও বিলি কেটে দিতো। অরুণাভ মিনু খালার দিকে তাকিয়ে মলিন হাসলো। সে যে এসেছে খালা মুখ তুলে দেখছেই না। সে চোখ ফিরিয়ে নয়নের জ্বর পোড়া মুখের দিকে তাকালো। এ ছেলে বারো মাসে তেরোবার অসুস্থ হয়। সে বলল,
“চাচ্চুর সাথে আগে কথা বলে ভালো একটা ডাক্তার দেখাও তোমার ছেলেকে। ঘনঘন অসুস্থ হওয়া ভালো লক্ষণ নয়।”
শেষের কথাটুকু বলে আফসোস হলো বৈ কি। মিনু খালা কেমন কেঁদে উঠলো। তাঁর বেশ খারাপ লাগে। তবে তাঁর চেয়ে বেশি খারাপ লাগে মিনু খালা একবারও তাঁর দিকে তাকালো না। অরুণাভ আর দাঁড়ায় না সেখানে। হয়তোবা মিনু খালা ছেলের চিন্তায় তাকে খেয়াল করে নি।
চমকিবে ফাগুনেরও পবনে
পশিবে আকাশ বাণী শ্রবণে
চমকিবে ফাগুনেরও পবনে
চিত্ত আকুল হবে অনুখন, অকারণ।
মায়াবন বিহারিণী হরিণী,
গহন-স্বপন-সঞ্চারিণী।
কেন তারে ধরিবারে করি পণ, অকারণ
মায়াবন বিহারিণী।
লাইব্রেরী থেকে রবীন্দ্র সংগীত ভেসে আসছে। সাথে ঘুঙুরের ছন্দপতন। অরুণাভ সেদিকেই এগিয়ে যায়। লাইব্রেরীর দরজায় ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়ে ভেতরের নৃত্যশিল্পীদের নৃত্য পরিবেশন দেখে। বোন অরুণিতা নাচের মুদ্রা ঠিকঠাক পরিবেশন করলেও তাঁর নৃত্য সঙ্গী কাঁচুমাচু মুখে অরুণিতার দেখে দেখে হাত পা ছুঁড়ছে। সেগুলোকে আর যাই বলা হোক নাচের মুদ্রা অন্তত বলা চলে না। সে মুঠো মুখের সামনে চেপে উঁহু উঁহু করে কেশে দৃষ্টি আকর্ষণ করার চেষ্টা করে।
অরুণিতা সজাগ দৃষ্টিতে দরজার পানে চাইলো। ভাইকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে মুচকি হাসলো। পরপর বড় বোন আনিকার পানে তাকিয়ে ভাইকে ভ্রু নাচিয়ে টিজ করে। অরুণাভ চোখ পাকায়। অরুণিতা নাচ থামিয়ে মিউজিক অফ করে। আনিকা ক্লান্ত ভঙ্গিতে কাউচে গা ছেড়ে দিয়ে বলল,
“অরু রে এসব মুদ্রা আমার দাঁড়া হবে না। তুই বরং সিম্পল কিছু শিখিয়ে দে। লাইক গুলাপি শারারা, শ্যাকি শ্যাকি, তেরে ভাস্তে ফালাক ছে ম্যায় চান্দ লাউঙ্গি…”
থেমে যায় আনিকা। অরুণাভ কে দেখে ভ্রু কুঁচকে নিয়ে বলল, “তুই কবে টপকালি রে! যতদূর জানি লীগে এখনো সেমিফাইনাল ম্যাচও হয় নি। তাহলে?”
বলতে বলতে চোখে মুখে কৌতুকপূর্ণ হাসি ফুটে ওঠে। বুঝতে পারে ফিরে আসার কারণ। অরুণিতার দিকে তাকিয়ে ব্যঙ্গাত্মক হাসি উপহার দিয়ে বলল,
“অরু রে তোর লুজার ভাই আবারও বিনা ট্রফিতে বাড়ি ফিরেছে। কি যেন বলেছিল? ওহ্ হ্যাঁ কাপ ছাড়া বাড়ি ফিরলে ন্যাড়া হয়ে পুরো কলোনিতে দুই রাউন্ড দিবো।”
অপমানে অরুণাভের মুখটা থমথমে হয়ে আসে। সে তৎক্ষণাৎ হনহনিয়ে বেরিয়ে যায় রুম থেকে। আনিকা হু হা সুরে হেসে পুরো ঘর মাতিয়ে ফেলে। অরুণিতা গোমড়া মুখে বলল,
“এভাবে না বললেও পারতে আপু। ব্রো অনেক ভালো খেলেছে। লীগে এপর্যন্ত সবচেয়ে বেশি উইকেট নিয়েছে। রানও অনেক। দুই বার ম্যান অফ দা ম্যাচ হয়েছে। আমার ব্রো অলরাউন্ডার।”
আনিকা মুখ মুচড়ে বলল, “এসেছেন গরীবের অলরাউন্ডার। সেমিনার ড্রপ করে বসে আছে তোর ভাই। চাচ্চু জানলে ওর পিঠের চামড়া তুলে লবণ মাখবে।”
অরুণিতার গম্ভীর মুখে হাসির ছিটেফোঁটাও নেই। ভাইয়ের জন্য চিন্তা হয় ঢের। সে মেঝেতে বসে ঘুঙুর খুলে নেয়। আনিকা পানির বোতল হাতে নিয়ে বলল, “অরু জানিস তোর ভাইয়ের গার্লফ্রেন্ড আছে।”
অরুণিতা কোণা চোখে চায়। অতি স্বাভাবিক ভাবেই জানতে চায়, “তাই নাকি? চেনো ব্রো’র গার্লফ্রেন্ডকে?”
“চিনলে তো হতোই। একটা বালতি কিনে মেয়েটাকে সমবেদনা জানিয়ে আসতাম। দুনিয়ায় ছেলের অভাব পড়েছিল বুঝি?”
বলেই খিলখিলিয়ে হাসে আনিকা। অরুণিতার মুখে এবারও হাসি ফুটলো না। আনিকা হাসি থামিয়ে এগিয়ে আসে। অরুণিতার মাথায় গাট্টা মেরে বলল, “হাসতে ট্যাক্স লাগে? তোর ভাইয়ের গার্লফ্রেন্ড যেমন তেমন তোর মতো খাড়ুশ যার কপালে আছে সেই বান্দার জন্য সমবেদনার পুকুর খুঁড়লেও কম পড়বে।”
“আমি আর আমার ভাইকে নিয়ে না পড়ে নিজের দিকটা আগে ভাবো আপু। সেদিন চাচিমনি তোমার বিয়ের কথা বলছিলো।”
অরুণিতার অতি স্বাভাবিক চিত্তে বলা কথায় আনিকার হার্ট অ্যাটাক হবার উপক্রম। সে ধপাস করে মেঝেতে বসে পড়ে। ছোট বোনের হাত ঝাঁকিয়ে জানতে চায়, “এই অরু মজা করছিস নাকি আমার সাথে?”
“তোমার কি মনে হয় আমি মজা করছি?”
অরুণিতা মিথ্যে বলে না। না মেয়েটার মজা করার স্বভাব আছে। তবে? আনিকার সুশ্রী মুখটা পাংশুটে হয়ে আসে। অরুণিতা সবই খেয়াল করে। কিছু বলতে উদ্যত হয় কারো আগমন বার্তায় থেমে যায়। আনিকা অরুণিতার নজরের পিছু নেয়। দরজায় অরুণাভ দাঁড়িয়ে। হাতে একটা বক্স। সেও অরুণিতার মতো কৌতুহল নিয়ে তাকিয়ে রয়।
অরুণাভ ঈষৎ হাসে। এগিয়ে এসে বক্সটা আনিকার সম্মুখে রেখে বলল, “এখানে গুনে গুনে ছয়টা কাপ আছে। সবগুলোই ইম্পোর্টেট। আমি বলেছিলাম কাপ আনবো। এনেছিও। সো ন্যাড়া হয়ে কলোনিতে চক্কর দেওয়ার প্রশ্নই আসে না। আর এটা নিয়ে আরেকবার খোঁচাখুঁচি করলে তোর রূপাঞ্জেলের মতো চুল আমার হাতে কুরবান হবে। তাই সাবধান!”
আনিকা ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে যায়। কি পল্টিবাজ ছেলে! নিজ লম্বা বেনুনি শক্ত করে ধরে দাঁত কটমট করে আনিকা বলল, “আমার চুলের দিকে নজর দিলে তোর চোখ আমি উপড়ে নিবো। আর বেশি তিড়িং বিড়িং করলে চাচ্চুকে বলে দিবো। তোমার ছেলে ফিটার খাওয়ার বয়সে গার্লফ্রেন্ড নিয়ে ঘোরে।”
আনিকার কান টেনে ধরে অরুণাভ। মুখ বিকৃত করে বলল, “চাচ্চুর চামচি কিছু হলেই চ্যা চ্যা করিস! আর আমার গার্লফ্রেন্ড আছে তোকে কে বললো শুনি?”
আনিকা নিজ কান ছাড়ানোর চেষ্টা না করে উল্টো অরুণাভের চুল মুঠোয় ভরে নিয়ে বলল, “ছাড় আমার কান? নইলে চুল একটাও আস্ত থাকবে না। আর চাচ্চুকে এটাও বলে দিবো তুই কান ফুঁড়ো করেছিস।”
“আমার কান আমি যা খুশি তাই করি। তোর সমস্যা কি হ্যাঁ? আমার পেছনে কেন পড়ে থাকিস তুই?”
“আমি তোর পেছনে পড়ে থাকি? নাকি তুই আমার পেছনে লাগিস সবসময়। আমি চাচ্চুকে এটাও বলে দিবো যে তুই নীলাকে লাভ লেটার দিয়েছিস!”
“ওটা লাভ লেটার না কোশ্শেন পেপার ছিলো।”
“সেটা আমি জানি, নীলা জানে, তুইও জানিস। কিন্তু চাচ্চু তো জানে না।”
“সবসময় চাচ্চু চাচ্চু কেন করিস? তোকে তো আমি…”
দু’জনে তৃতীয় বিশ্ব যুদ্ধ ঘোষণা করে দেয়। অরুণিতার ধৈর্য্যের সীমা লঙ্ঘন হয়। বাচ্চাদের মতো চুলোচুলি কানাকানি লাগিয়ে দিয়েছে এরা! সে গম্ভীর গলায় বলল,
“পাঁচ সেকেন্ড সময় দিলাম। সীদ্ধান্ত নাও তোমরা। থামবে নাকি আমি চাচিমনিকে ডাকবো?”
পাঁচ সেকেন্ড না এক পলকেই দু’জন যুদ্ধ থামিয়ে শান্তি চুক্তিতে স্বাক্ষর করে নেয়। চাচিমনিকে যেমন আনিকা আপু ভয় পায় তাঁর চেয়ে ঢের বেশি ব্রো ভয় পায়। কারণ তাঁর জানা নেই। তবে হ্যাঁ! ব্রো আর চাচি মনির মধ্যে সংঘটিত নীরব যুদ্ধ সে টের পেয়েছে। শুধু কারণ উদঘাটন করা বাকি।
—————
“ভাইটুস কি আমার জন্য বউ এনেছে? তুমি দেখেছো আমার বউকে? দেখতে মাম্মামের মতো সুন্দর তো?”
অরুণ সরকারের ভ্রু কুটি একত্রিত হয়। এক্সিলেটর ঘুরিয়ে বামে মোড় নিয়ে জানতে চাইলো, “কিসের বউ? কার বউ?”
“বললাম তো আমার বউ। এনেছে?”
অরুণ সরকার সে কথার জবাব না দিয়ে বলল, “তুমি বউ দিয়ে কি করবে?”
“বউ দিয়ে মানুষ কি করে?”
অরুণ সরকার চোখ পাকায় ফ্রন্ট সিটে বসা মানবের উদ্দেশ্যে। মানব ডরালো না মোটেই। ভ্রু উঁচিয়ে আবারও বলল, “বললে না বউ দিয়ে মানুষ কি করে?”
অনেকটা সময় নিয়ে ভাবে অরুণ সরকার। কিন্তু কাঙ্ক্ষিত জবাব মিললো না। আসলেই তো বউ দিয়ে মানুষ করে টা কি? যা যা করে তা সে এই ক্ষুদে মানবকে বলতে পারবে না। তাই শাক দিয়ে মাছ ঢাকার অভিপ্রায়ে বলল,
“প্রহর এসব কেমন ধারার প্রশ্ন?”
প্রহর গাল ফুলিয়ে বলল, “বকছো কেন? ভালো প্রশ্নই তো করেছি। তুমি জানো না বললেই তো হয়।”
অরুণ সরকার হাত বাড়িয়ে ফুলো গাল টেনে বলল, “আচ্ছা তুমি বলো বউ দিয়ে মানুষ কি করে?’
“আমি কিভাবে বলবো পাপা। আমার কি বউ আছে নাকি? তোমার বউ আছে তোমার জানার কথা!”
অরুণ সমস্ত ধ্যান ড্রাইভিংয়ে সঁপে দেয়। এই ছেলের সাথে কথা বলা যাবে না। বললেই ফাপড় আঁটকে আসবে। প্রহর সিটবেল্ট খুলে বলল, “আমার ক্ষুধা লেগেছে আমি খাবো। ফুপ্পি নুডুলস দিয়েছে ওটা দাও।”
অরুণ গাড়ির গতি কমিয়ে পেছন থেকে ছেলের ছোট্ট ব্যাগটা নিয়ে আসে। ব্যাগ থেকে টিফিন বক্স, ওয়াটার পট বের করে দেয়। প্রহর বোতল খোলার জন্য চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়ে বলল, “একটা বউ থাকলে এতো কষ্ট করতে হতো? বউ ঢাকনা খুলে মুখে ধরে পানি খাইয়ে দিতো।”
অরুণ সরকার পট ছিনিয়ে নেয়। ঢাকনা খুলে ছেলের মুখে ধরে বলল, “সুন্নতে খৎনা হয় নি উনি বউয়ের হাতে পানি খাবে।”
প্রহর চুক চুক শব্দ করে পানি খায়। পানি খাওয়া শেষ হলে সে প্রশ্ন করে, “সুন্নতে খৎনা কি? কিভাবে হয়? পাপা তোমার হয়েছে? আমার কিভাবে হবে?”
অরুণ শুনেও না শোনার ভান করে গাড়ি চালায়। প্রহরকে নুডুলসের বক্সের সাথে যুদ্ধ করতে দেখে হাত বাড়িয়ে খুলে দেয়। প্রহর আবারও বলে, “একটা বউ থাকলে তোমাকে কষ্ট করতে হতো না পাপা।”
অরুণ সরকার অতিষ্ট হয়ে উঠে। কি বউ বউ লাগিয়ে দিয়েছে! নিশ্চয়ই বড় জনের কাজ। নিজের বউ দরকার সে কথা বলতে না পারায় ছোট জনের মাধ্যমে প্রকাশ করছে। কি নির্লজ্জ হয়ে উঠছে দিন কে দিন। অথচ ছোট বেলায় বিয়ের কথা বললেই লজ্জায় কেঁদে দিতো। চেঁচামেচি করতো কখনো বিয়ে করবে না। সে প্রহরকে বলল,
“বউয়ের ভূত মাথায় কে চাপালো?”
“ভাইটুস।”
প্রহর নুডুলস খেতে খেতে জবাব দেয়। নিজ সন্দেহ ফলে যাওয়ায় অরুণ সরকার ফোঁস করে শ্বাস ফেললো। ছেলে মেয়ে বড় কেন হয়? ছোট বেলাটাই তো সুন্দর ছিলো। ঠিকঠাক দাঁড়ি গোঁফ গজালো না, নবাব পুত্তুরের বিয়ের ভূত চেপেছে। ক’দিন পর বিয়েও করবে। বউ আসবে তারপর বাপ কে ভুলেই যাবে।
পেট পুরে নুডুলস খাওয়া হলে প্রহর হামি তুলে। কিছু না বলে বেড়াল ছানার মতো বাবার কোল জুড়ে নেয়। বুকে মাথা পেতে চোখ বুজে নেয়। ঘুম ঘুম কণ্ঠে বলে, “পাপা শীত লাগছে।”
অরুণ একহাত ছেলের পিঠে রাখে। গায়ের কোর্ট খুলে ছেলের পিঠে দিয়ে ঢেকে নেয়। কপালে আঁছড়ে পড়া চুল সরিয়ে সস্নেহে চুমু দিয়ে মাথায় থুতনি ঠেকিয়ে বিড়বিড় করে, “বউ নামক ভুত ছোট, বড় দু’জনের মাথা থেকে নামিয়ে দাও দয়ার আল্লাহ। আমার চড়ুইদের বউ নামক পেত্নিদের হাত থেকে রক্ষা করো। বাবার ছানাদের বাবার বুকেই ফিরিয়ে দাও।”
সারা রাস্তা বাবার বুকে ঘুমেই কাটলো প্রহরের। অরুণ সরকার প্রসন্নবোধ করে। ছেলে মেয়েগুলো চোখের আড়াল হলেই তাঁর মাথায় চিন্তার পাহাড় জমে। ছেলে মেয়ে ছোট থাকলে আমরা বলি কবে বড় হবে আর বাপ মায়ের চিন্তা কমবে। কিন্তু বাস্তবতা এটাই, ছেলে মেয়ে যত বড় হয় বাপ মায়ের চিন্তার জগত তত বিস্তার লাভ করে। আফসোস ছেলে মেয়ে তা বোঝে না। অরুণ নিজেও বোঝে নি। তবে এখন বোঝে বাবা মায়ের কি জ্বালা!
অরুণ সরকার গ্যারেজে গাড়ি এনে ছেলেকে বুকে জড়িয়েই গাড়ি থেকে নামলো। ঘুম ভাঙতে দিলো না। ছেলের ব্যাগটা কাঁধে বাহুতে ঝুলিয়ে দরজা বন্ধ করে বাড়ির ভেতরে প্রবেশ করে। ড্রয়িং রুম জুড়ে হৈচৈ। বাচ্চাদের কোলাহলে বাড়ি যেন আজ নতুন সাজে সেজেছে। অরুণের চোখ পড়ে বড় ছেলের উপর। গম্ভীর মুখে বসে ফোন গুতাচ্ছে। হাতে আধ খাওয়া শসা। একটু পর পরই কামড় বসাচ্ছে। আর নবাব পুত্তুরের বিড়াল খানি কোল দখল করে ঝিমোচ্ছে। অরুণ সবার ভিড়ে পাতাকে খোঁজে। দেখা মিলে না বিধায় সে ছোট ভাইয়ের বউ রুবিকে ডেকে বলল,
“পাতাবাহার কই?”
বাবার কণ্ঠে অরুণাভ ফোন থেকে চোখ তুলে তাঁর দিকে তাকালো। চোখাচোখি হয় বাবা ছেলের। অরুণ নজর সরিয়ে রুবির দিকে তাকিয়ে। রুবি এগিয়ে এসে বলল,
“বড় ভাবী তো অরুর ঘরে। অরু’র গা টা গরম। জ্বর আসবে মনে হচ্ছে। তাছাড়াও আজ কেমন আপসেট লাগছিল ওকে।”
অরুণকে চিন্তিত দেখালো। সে মেয়ের ঘরের দিকে পা বাড়াবে ভুতের মতো উদয় হয়ে বড়জন বাঁধ সাধলো। অরুণ পাশ কেটে চলে যাবে অরুণাভ আবারও বাঁধা হয়ে দাঁড়ায়। প্রহরকে ইশারা করে বলল,
“ওকে আমার কাছে দাও।
অরুণ সরকার দেয় না। বিরক্ত হয়ে বলল, “দেখতে পারছো না ঘুমাচ্ছে?”
“তো? আমি ঘুম ভাঙিয়ে দিচ্ছি!”
বলেই প্রহরকে ধরতে নিবে অরুণ ছেলের হাত ঝটকায় সরিয়ে দেয়। গম্ভীর মুখে বলল, “সমস্যা কি তোমার?”
অরুণাভ তবুও প্রহরকে নেওয়ার জন্য জেদ করে। কিন্তু অরুণ দেয় না। প্রহরকে নিয়ে চলে যায় হনহনিয়ে। অরুণাভ কপাল কুঁচকে বাবার গমন পথ দেখে।
অরুণ নক করে মেয়ের ঘরে প্রবেশ করে। পাতা মেয়ের মাথায় তেল ঘঁষে বিলি কেটে দিচ্ছিলো। অরুণকে আসতে দেখেই বলল, “সামান্য গরম। আমি ওষুধ খাইয়ে দিয়েছে। টেনশনে প্রেসার বাড়ানোর কোনো প্রয়োজন নেই ভোরের বাবা।”
অরুণের গম্ভীর মুখে হাসিরা ফুটতে চায়।বিছানায় ছেলেকে শুইয়ে দেয়। অরুণিতা বিরক্তবোধ করে বলল, “বিছানা ভিজিয়ে দিবে আমার। পাপা তুলো ওকে!”
অরুণ মেয়ের তেল চিটচিটে কপালে হাত রেখে তবেই নিশ্চিত হয়। পাতার পাশে বসে বলল, “ভেজাবে না সোনা। রাগ করছো কেন?”
“রাগ করছি না তো।”
পিনপতন নীরবতা ছেয়ে গেলো। পাতা কোণা চোখে অরুণের দিকে তাকায়। মুচকি হেসে স্বীয় গাল ফুলিয়ে বোঝায় মেয়ে রেগে বোম। অরুণ ইশারা করতেই পাতা বাহানা দেখিয়ে বেরিয়ে যায়। তেলের বাটি হাতে নিয়ে অরুণ মেয়ের কাছে বসে। হাতে তেল নিয়ে অতি যত্নে চুলে লাগিয়ে দেয়। অরুণিতা কিছু বলে না। ঠায় বসে রয়। অরুণ চুলে বিলি কেটে দিয়ে বলল,
“মা কি আমার উপর রেগে?”
“না।”
“আমার অপরাধ?”
“আমি না বলেছি কিন্তু?”
“আমার অপরাধ?”
অরুনিতা হাল ছেড়ে দিলো। গম্ভীর মুখে বলল, “তুমি প্রমিজ করেছিলে আমার সাথে যাবে। কিন্তু ব্রো ডাকতেই তুমি খেলা দেখতে চলে গেলে পাপা। এটা তো ঠিক না। প্রমিজ না রাখতে পারলে দিয়েছিলে কেন?”
অরুণ হাসলো। মেয়ের চুলে চিরুনি চালিয়ে বলল, “তুমি ডিবেট অবশ্যই জিততে। আ’ম বিলিভ ইন ইয়্যু সোনা। আমি যদি তোমার সাথে যেতাম স্কুলের আনাচে কানাচে কন্ট্রোভার্সি শুরু হতো। সবাই বলতো, আমার কারণেই তুমি জিতেছো কারণ স্কুলের স্পন্সর আমি। এসব শুনে আমার মায়ের মাথা গরম হতো। আর আমার মায়ের মাথা গরম হলে বিরাট কিছু।”
অরুণি ঘার ঘুরিয়ে মিষ্টি একটা হাসি দিয়ে বলল, “পাপা, আই লাভ ইয়্যু মোর দেন এভরিথিং।”
“মোর দ্যান ইয়্যুর মাম্মাম?”
অরুণ জানতে চায়। অরুণিতা সামনে ফিরে বলল, “ডোন্ট টেল মাম্মাম, ওকে?”
“আ’ভ কেপ্ট দিস লকড।”
অরুণ ফিসফিসিয়ে বলল। অরুণিতা মুচকি হেসে সায় দিলো। মাম্মাম জানলে তাঁর পিঠে একশ একটা কিল নিশ্চিত। অরুণ মেয়ের চুলে বিনুনি গেঁধে ছোট্ট বিনুনিতে চুমু দিয়ে বললো, “অনেক বড় হোক। ডিজনির রূপাঞ্জেলের মতো।”
“পাপা আই লাইক মায় শর্ট হেয়ার।”
অরুণ মেয়ের মাথায় আলতো চাপড় মেরে বলল, “ডান্স পারফরম্যান্স থেকে নাম কেন কেটেছিলে সোনা?”
অরুণিতার হাস্যোজ্জ্বল মুখটা থমথমে হয়ে আসে। ছোট ছোট চোখে পৌষের শিশির কণা জমছে। তবে সে নিজেকে ভাঙতে দেয় না। অতি দ্রুত নিজেকে সামলে নিয়ে বলল,
“এমনিতেই পাপা।”
“তুমি না বললেও ‘কি হয়েছে’ জানতে আমার পাঁচ মিনিটও সময় লাগবে না।”
অরুণিতা প্রসঙ্গ বদলে বললো, “আমাকে জিমে ভর্তি করিয়ে দাও পাপা। আমি ডায়েট করতে চাই।”
অরুণের কপালে নাখোশতার ছাপ। সে বলল, “সোনা তুমি মাশাআল্লাহ পার্ফেক্ট। জিমে ভর্তি হতে হবে না। ডায়েটের তো প্রশ্নই আসে না।”
“আমি পার্ফেক্ট না পাপা। আমাকে দুই বাচ্চার মায়ের মতো লাগে। সবাই আমাকে নিয়ে হাসাহাসি করে। আমার ফ্রেন্ডসরাও আমাকে মোটু বলে ডাকে। রূপ ব্রো তো তোমার সামনেই ডাকে।”
অরুণের খারাপ লাগে। মেয়ে তাঁর যথেষ্ট স্ট্রং কিন্তু এই একটা ব্যাপারে মেয়ে ইমোশনাল হয়ে পড়ে। সে বলল,
“অন্যের কথা মাথায় নিতে নেই সোনা।”
অরুণ বোঝানোর চেষ্টা করে। অরুণিতা বোঝার চেষ্টা করে না। সে পুর্বের চেয়েও জোড়ালো গলায় বলে, “ডান্স পারফরম্যান্স থেকে আমি নাম কাটি নি পাপা। আমি তো রেডি হয়ে বাকি পার্টিসিপেন্টদের সাথে প্র্যাকটিস করছিলাম। তখন সায়রা মিস এসে বলল আমি পারফর্ম করছি না। আমার জায়গায় অন্য কাউকে নেওয়া হয়েছে। এটা আমার জন্য কতটা ইনসাল্টিং হাউ ক্যান আই এক্সপ্লেইন ট্যু ইয়্যু পাপা! জানো কেন বাদ দিয়েছে? আমি আমার ক্লাসমেটদের সাথে মানানসই নই। আ’ম নট লাইক দেম। সবাই স্লিম আর পার্ফেক্ট হাইটের। অ্যান্ড আই’ম কুয়াইট চাব্বি। ওদের সাথে আমি পারফর্ম করলে মনে হবে হাতি নাচছে ঘোরা নাচছে সোনামুনির বে।”
অরুণিতা কখনোই একসাথে এত কথা বলে না। উত্তেজিত হয়ে সব উগড়ে দিয়েছে। একপ্রকার হাপাচ্ছে মেয়েটা। অরুণ সরকারের চোয়াল শক্ত হয়ে আসে। ‘সায়রা মিস’ নামটা মাথায় গেঁথে রাখে। মেয়ের মাথায় হাত রেখে মেয়েকে সময় দেয় সামলে নেওয়ার। অরুণিতা নিজেকে সামলায়।
“মে আই কাম ইন মায় লিটল সিস?”
অরুণিতা, অরুণ দু’জনেই দরজার দিকে তাকায়। অরুণাভ সরকার দাঁড়িয়ে আছে। অরুণিতা মেঝে থেকে উঠে দাঁড়িয়ে বলল, “কাম ব্রো।”
অরুণাভ ভেতরে প্রবেশ করে। বোনের বোচা নাক টেনে দিতেই সর্দি বেরিয়ে আসে। অরুণিতা হাতে নাক চেপে ধরে। কিঞ্চিত লজ্জাও পায়। অরুণাভ নাক মুখ কুঁচকে বলল,
“ভাবনাআআ ছিঃ এখন বড় হয়েছো তুমি। নাকে সর্দি কেন থাকবে?”
অরুণিতার লজ্জা তরতরিয়ে বাড়ে। সে ছুটে যায় ওয়াশ রুমে। অরুণাভ দাঁত কপাটি দেখিয়ে হেসে সামনে তাকাতেই বাবার শাণিত চাহনিতে মিইয়ে যায়। কান চুলকে অস্বস্তি লুকিয়ে রাখার চেষ্টা করে। কিন্তু বাবাকে অবিচল ভঙ্গিতে তাকিয়ে থাকতে দেখে ভোঁতা মুখে বলল,
“ওভাবে কি দেখছো?”
“সর্দি দেখে নাক ছিটকানো ছেলেটার নাক দিয়েই টপ টপ করে সর্দি পড়তো।”
অরুণ শান্ত স্বাভাবিক গলায় প্রত্যুত্তর করে। নিজ ফোনটা বের করে ছেলের দিকে বাড়িয়ে বলে, “আমার কাছে ভিডিও আছে অন্নেক। সর্দির সাথে তার বারো মাসের সম্পর্ক ছিল কি-না!”
অরুণাভের মুখটা দেখার মতো হয়েছে। সে ঈগলের মত থাবা দেয় ফোন ছিনিয়ে নিবে বলে। অরুণ সরকার অকপটে ফোন পকেট রেখে বলল,
“ওই কি যেন বলে না হিন্দিতে? রিসতেমে হাম তুমহারা বাপ লাগতেহে নাম হে অরুণ সরকার। তাই আমার সামনে অন্তত ভাব দেখাতে এসো না। তোমার থেকেও তোমাকে ভালো ভাবে চেনা আছে আমার।”
অরুণাভ কপাল চুলকে এদিক ওদিক তাকিয়ে নজর লুকায়। শেষ মেষ টিকতে না পেরে পালানোর ফন্দি আঁটে। সেখানেও বাঁধ সাধলো অরুণ সরকার। পিছু ডেকে বললো,
“কানে রিংয়ের মতো ওটা কি ঝুলছে?”
অরুণাভ কানে হাত দেয়। মাথার কালো টুপি আরেকটু টেনে না শোনার ভান করে দ্রুত পা ফেলে পালিয়ে যায়। অরুণ সরকার গলা উঁচিয়ে ডাকে,
“এ্যাঁই ছেলে? ভোর? এ্যাঁই কলিজা?”
নাহ্ অরুণ সরকারের কলিজার হদিশ পাওয়া গেলো না আর। অরুণ সন্দিহান চিত্তে ভাবে। কানে ওটা রিংয়ের মতো কিছু একটা তো ছিলো। আর তাঁর জন্যই পালালো। কোনো ব্যাপার না। ছেলে এক শেয়ানা হলে, সে শেয়ানা চারে চার শেয়ানা।
—————
বৈঠকখানায় বড়দের বৈঠক বসেছে। সবার মুখে সিরিয়াসনেস। অরুণাভ কানে হেডফোন লাগিয়ে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামছিলো। সবাইকে সিরিয়াস হয়ে আলাপ করতে দেখে হেডফোন কাঁধে ফেলে এগিয়ে যায়। ডায়নিং টেবিলের দিকটায় রূপক সরকার বসেছিল ভোঁতা মুখে। অরুণাভ তাঁর কাছে গিয়ে বসলো। একটা আপেল তুলে নিয়ে কামড় বসায়। বৈঠকখানায় দৃষ্টি সজাগ রেখে জানতে চাইলো,
“কিসের ফিসফাস চলছে রে? সিরিয়াস কিছু?”
“তোমার শত্রু নিধন করার প্ল্যান করছে সবাই।”
রূপক গালে হাত রেখে অলস্য চিত্তে বলে। অরুণাভ তাঁর গালে ঠাস করে চড় মেরে বলল, “বউ মরেছে তোর?”
রূপক গালে হাত রেখে ফ্যালফ্যাল করে চায়, “বউ কই পাবো যে মরবে?”
“তাহলে গালে হাত দিয়ে রেখেছিস কেন? আর কিসের শত্রু নিধনের কথা বলছিস?”
রূপক গাল থেকে হাত সরায়, “মারলে কেন? বলবো না। খবরদার আরেকবার মারার কথা ভাবলে। আমি আ’মাকে বলে দেবো।”
অরুণাভ হাত তুলেছিল কিন্তু মারতে পারলো না। তবে ছাড়লোও না। পিঠে ধরাম শব্দে চাপড় মেরে বলল, “চাচিমনি বলতে মুখ চুলকায় তোর?”
রূপক পিঠ বাঁকিয়ে ব্যাথাতুর চোখে চায়। ছোট ভাইয়ের উপর অরুণাভের একটু দয়া হলো বৈ কি! আধখাওয়া আপেল হাতে ধরিয়ে নিজেই বৈঠক খানায় যোগদান করে ঘটনা জানার জন্য।
মায়ের পাশে সোফার হাতলে বসে। পাতা একটু সরে তাঁকে বসার জায়গা করে দিলো। অরুণাভ বসে সেখানে। নিচু স্বরে মায়ের কাছে জানতে চায়,
“কিসের কথা হচ্ছে?”
“আনিকার আকদ নিয়ে কথা হচ্ছে।”
“হোয়াট?”
স্বাভাবিকের চেয়ে উঁচু স্বরে চেঁচিয়ে উঠলো অরুণাভ। পাতা ট্যারা চোখে ছেলের হাবভাব বোঝার চেষ্টা করে। উপস্থিত সকলের বাঁকা চাহনি অরুণাভের উপর। রুবির কপালটা সবার চেয়ে বেশিই কুঁচকে আছে বলা যায়। সে তীর্যক স্বরে শুধালো,
“কি হয়েছে ভোর? কোনো সমস্যা”
অরুণাভ তাঁর দিকে তাকালো। খানিকটা জড়তা নিয়ে বলল, “আনি’র আকদ? মানে সিরিয়াসলি? বয়স কত ওর? পাগল তোমরা হয়েছো নাকি আমি ভুল শুনলাম।”
রুবি হাসি উপহার দিয়ে বলল, “তুমি ঠিকই শুনেছো ভোর। ছেলের বাবা জেলা হাইকোর্টের জজ। তোমার চাচ্চুর পরিচিত। তাঁরই ছেলে তৈমুর নেওয়াজ। ল পাশ করেছে। এখন বাইরে পড়তে যাবে।”
অরুণাভ ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে নিঃশব্দে শুনে যায় চাচি মনির কথা। পরের টুকু চাচ্চু আরিয়ান বলে,
“ছেলেটা যথেষ্ট ভদ্র। এ যুগে এমন ছেলে কমই পাওয়া যায়।”
অরুণ আর অরুণাভের চোখাচোখি হয়। আরিয়ান হেসে বলল, “তারিকুল ভাই প্রায়ই বলতেন আমার ছেলেটার সম্পর্কে একটু খোঁজ খবর নিও। পরে বুঝলাম কেন খোঁজ খবর নিতে বলে। তৈমুর ওর বাবাকে দিয়ে আনিকার জন্য প্রস্তাব পাঠিয়েছে। আমি তো মানা করে দিয়েছিলাম আমার ছোট মেয়ে বিয়ে টিয়ে দেবো না। কিন্তু উনি নাছোড়বান্দা। শুধু আকদটা করিয়ে রাখতে চায়। এখনই তুলে নেবে না। আমাদের যেদিন মনে হবে মেয়েকে শ্বশুরবাড়ি পাঠানোর বয়স হয়েছে সেদিন পাঠাতে। এসব কোনো কথা বলো? তাও আমি অমত দিয়েছিলাম। কিন্তু ওনারা ভাইকে ধরেছে। আমি আর ভাই মিলে বেশ কিছুদিন হলো ছেলেটার সম্পর্কে খোঁজখবর নিয়েছি। কোনো রিপোর্ট পাই নি। সিগারেট অবদি খায় না। খুব পড়াকু ছেলে। সবসময় বই নিয়েই পড়ে থাকে।”
অরুণাভ বৈঠকখানায় উপস্থিত সকলের মুখ দর্শন করে। চাচি মনি, চাচ্চু, আব্বু, আম্মু, আভারি কাক্কু সবার মুখ উজ্জ্বল। মানে তৈমুর নামক অপদার্থটাকে মনে ধরেছে। অরুণাভ কিছুটা ভেবে বিজ্ঞদের মতো জ্ঞান দিলো,
“বই নিয়েই যদি পড়ে থাকে তাহলে আনি’র উপরে পড়লো কখন? চাচ্চু এই ছেলে ভালো হবে না। অতি সাধুবেশে থাকা ছেলেরা খুব ডেঞ্জারাস হয়ে থাকে। তাছাড়াও তুমি এতোবার মানা করার পরও ওনারা কেমন ছ্যাচড়ামো করছে। নিশ্চয়ই ঘাপলা আছে।”
“তোমাকে জ্ঞান দিতে বলে নি কেউ। ছোট ছোটদের মতো থাকো বড়দের মধ্যে কথা বলতে এসো না।”
অরুণ ছেলের উদ্দেশ্যে বলে আরিয়ানের সাথে কথা বলে এ বিষয়ে। বাবার কথা অরুণাভের গায়ে লাগলো খুব। সে একদন্ডি বসলো না। থমথমে মুখে উঠে গেলো বৈঠকখানা থেকে। রুবি কোণা চোখে তাঁর প্রস্থান দেখে। তারপর হেসে অরুণকে উদ্দেশ্য করে বলল,
“আমার কিন্তু ছেলেটাকে বেশ লেগেছে। আমি তো আমার মেয়ের জন্য এমন কাউকেই খুঁজছিলাম। যে নরম শোভা হবে। কোনো উগ্রপনা থাকবে না। তাছাড়াও সেরকম ছেলে হলে আগে আনিকার সাথে ভাব জমানোর চেষ্টা করতো। কিন্তু ছেলেটা তা না করে পরিবারকে জানিয়ে বিয়ের প্রস্তাব পাঠিয়েছে। এই দিকটা আমার মন কেড়েছে। বাকি আপনারা ভাইয়েরা বুঝেন।”
অরুণাভের পা থেমে যায় সিঁড়ির মাঝপথে। চাচিমনির সব কথাই কানে পৌঁছেছে। সে বিড়বিড় করে, ‘নরম শোভা! তার উপর উইদাউট উগ্রপনা। ভেরি ইন্টারেস্টিং!’
·
·
·
চলবে……………………………………………………