এ্যাজেলিয়া রাজ্যের একটি সুস্থ ভোরের বাতাস ছুঁয়ে যাচ্ছে প্রজাদের ক্লান্ত হৃদয়। সজীবতার সুঘ্রাণ ছড়িয়ে পড়ছে যেন। ওদের শরীরে আলাদা শক্তি সঞ্চার হয়েছে। নতুন করে বাঁচার ইচ্ছে টগবগ করছে দেহে।
সেই সজীব প্রাণের আভাস এসে রানির দেহে লেগেছে। কর্ণগোচর হয়েছে প্রজাদের তাকে পেয়ে কতটা আনন্দ হচ্ছে সেসব কথা। এই তো কিছুক্ষণ আগেই তিনি তার কক্ষের বিরাট বারান্দাটায় দাঁড়িয়ে ছিলেন। হ্যাব্রো এলো আনন্দ নিয়ে। তার চোখে-মুখে আনন্দের রেশ দেখে রানি নিজেই আগ বাড়িয়ে জিজ্ঞেস করলেন, এহেন আনন্দের কারণ কী।
হ্যাব্রোকে আর কে আটকায়? সে ফুরফুরে মনে উৎসাহিত ভঙ্গিতে উত্তর দিলো, “আপনার জন্য খাটি দুধের ছানা এসেছে। কাঁচাগোল্লা এসেছে। এসেছে সজীব ফুলের তোড়া। এসেছে হাতে বুনন করা একটি শাড়ি। চন্দন কাঠের বাক্স। আরও অনেক কিছু।”
এত উপহারের কথা শুনে রানি একটু অবশ্য চমকে গিয়েছিলেন। এত উপহার তাকে কেই-বা পাঠাবে? যদিও কোনো রাজ্যের রাজা কিংবা কোনো বড়ো বণিক পাঠিয়ে থাকে অতীতের দিনের মতন তাহলে তো এসব পাঠানোর কথা নয়! তারা সবসময় ভাবে রানিকে দিতে হয় মূল্যবান, বিরাট অর্থের উপহার। তারা এমন মনের কাছে, ঘনিষ্ঠ উপহার আদৌ কেন দেবে?
রানি ভ্রু কুঁচকান, “কে বা কারা দিয়েছে এসব?”
হ্যাব্রো তখন ছোটো শিশুটির মতন গড়গড়িয়ে বলে, “আর কে? আপনার প্রজারা। সেই সূর্য উঠার আগ থেকেই একেকজন আসছে আর একেকটা উপহার রেখে যাচ্ছে। তাদের সবার এক কথা, তাদের রানিকে তারা এই সামান্য কিছু দিয়ে কৃতজ্ঞতা স্বীকার করতে চায়।”
“এই প্রজারাই আমাকে কত ভয় পেতো, তাই না? বলতো আমি হিংস্র কোনো জন্তুর চেয়ে কম নই। অশুচি চরিত্র আমার! অথচ আজ এরাও আমায় এতটা সাদরে গ্রহণ করেছে?” রানির আনমনা প্রশ্নে হ্যাব্রো পুনরায় বিগলিত হেসে প্রতিত্তোর করল,
“গ্রহণ না করে কোথায় যাবে ওরা? ওরা তো এখন বুঝেছে কত সাধনার পর ওরা এমন রানি পেয়েছে। এই মানবজন্ম ধন্য যে সকলের আপনাকে পেয়ে!”
রানি মৃদু হাসলেন। সচারাচর তার মুখে হাসি দেখা যায় না। সচারাচর বললে ভুলই হবে। বলা যায় দেখাই যেতো না। যতটুকুও বা হাসতেন তা তাচ্ছিল্য কিংবা হেয় করে। এমন নির্মল, নরম হাসি তার মুখে বড্ড মানায়। হ্যাব্রোর সেই যোগ্যতা কি আছে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখবে সেই হাসি? নেই। তবুও বড়ো সাধ হয় মন খুলে দেখার। মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকার।
স্রষ্টা কত যত্ন করেই না এই নারীটির সমস্ত কিছু তৈরি করেছেন। কতটা নিখুঁত ভাবে! কোথাও কোনো খুঁত নেই। ভুল নেই। কত সুন্দর তার এই সৃষ্টি রানি কামিনীকাঞ্চন!
“তবে তুমি যাও, ওদের আজ আমন্ত্রণ ছিলো না আমার প্রাসাদে? সকলে আসছে তো?”
“না এলে কি আর এত উপহারের কথা বলতাম? সকলেই আসছে। রাজ উদ্যানে আয়োজন হয়েছে সকলের আহারের। উপচে পড়া ভিড়।”
“ঠিক আছে আমি আসছি। তুমি অপেক্ষা করো। আর ওদিকটা তদারকি করো।”
রানির আদেশ পেতেই কুর্নিশ করে বেরিয়ে গেলো হ্যাব্রো। রানির ঠোঁটের হাসি তখনও অমলিন।
এরই মাঝে হনহনিয়ে কক্ষে প্রবেশ করল হেমলক। তার মুখটা আজ বড়োই ম্লান লাগছে। সকালের সজীবতা ছুঁতে পারেনি তাকে। কিছু একটা ভাবনায় মগ্ন সে। কক্ষে প্রবেশ করার সময় হ্যাব্রোকে বের হতে দেখে কিঞ্চিৎ কৌতূহল জাগলেও প্রশ্ন করার ইচ্ছে পোষণ করল না। নীরবেই গিয়ে দাঁড়ালো রানির পাশে। চুপচাপ।
রানির বারান্দার এই পাশটা দিয়ে একটি হ্রদ দেখা যায়। বারান্দায় দাঁড়ালে দেখা যায়, খানিক দূরের ঐ হ্রদের নীলাভ জল টলমল করে কেমন।
রোদের আলোটা পড়লে জলগুলো অদ্ভুত সুন্দর লাগে। কল্পনার মতন চঞ্চল স্রোত সেই জায়গাটির।
রানি সেদিকেই তাকিয়ে ছিলেন। হেমলকও বিশেষ বিরক্ত না করে হ্রদের জলে মনোনিবেশ করল। এক, দুই, তিন করে বেশ অনেকটা সময় কেটে যায় নীরবে, নিশ্চিন্তে। পাশাপাশি দু'টো মানুষ দাঁড়ানো অথচ কোনো কোলাহল নেই, শব্দ নেই, কথা নেই। অন্যান্য দিন হলে হেমলক নিজ থেকে কত কথা বলতো! কত কী দরকারী-অদরকারী কথার মেলা বসাতো। অহেতুক রাগাতো রানিকে আবার হাসাতোও! কিন্তু আজ যেন সে বড়োই উন্মনা। শান্তি নেই তার দু-চোখে। কেমন বিষণ্ণ বিকেলের শেষ মেঘটি যেন ঘুরে ঘুরে বেড়াচ্ছে তার মুখমণ্ডলে। তার এই নীরবতা খচখচ করল রানির বুকে। কথা বলা মানুষ নীরব হয়ে গেলে যেন প্রকৃতির কোনো একটি নিয়মকে নিশ্চল মনে হয়। রানিরও তাই মনে হলো। তিনি সেজন্য আগ বাড়িয়ে বললেন,
“আজ চিত্রশিল্পী হেমলক পিয়ার্সের মনে বিশেষ শান্তি নেই মনে হচ্ছে! হলো কী তার?”
“এ্যাজেলিয়া ও ক্যামিলাস রাজ্যের রানি কামিনীকাঞ্চন আমার মতন সাধারণ মানবকে খেয়াল করেছেন তা আমার জন্য অভাবনীয় বিষয়।” হেমলক ঘুরিয়ে উত্তর দিলো। উত্তরের ভেতর কোনো রসবোধ নেই। এক বুক হতাশা যেন হাপিত্যেশ করছে। রানি ঘুরিয়ে উত্তর পছন্দ করেন না। তার চেয়েও বেশি পছন্দ করেন না হেমলকের অন্য রূপ। তাই একটু গম্ভীর হলেন,
“সেটা তো যে-কেউ খেয়াল করবে। আপনি সবসময় কথা বলেন আজ বড্ড চুপচাপ তাই খেয়ালে এসে যাচ্ছেন।”
“তুমি কী ঠিক করলে তবে? এখানেই থাকছো?” কোনো ভণিতা না করেই হেমলক তার প্রশ্নটি করল। প্রশ্ন করে ক্ষান্ত হয়নি সে। চোখের মণিগুলো বার বার নাড়াচ্ছে। রানির মুখের উপরই তার সেই দৃষ্টি। অমন ঘোলাটে চোখের মণির দিকে তাকালে রানি উত্তর দিতে গেলে আটকে যান। অদ্ভুত লাগে শরীরে। তাই তিনি চোখটা সামান্য ঘুরিয়ে নিলেন। তপ্ত শ্বাস ফেলে বললেন,
“থেকে গেলেও বা কী?”
“আমি আমার স্ত্রী’কে ছাড়া থাকতে পারব না, দুঃখিত।”
হেমলকের অকপটে করা স্বীকারোক্তিতে চোখ গোল গোল হয়ে এলো রানির। তবে তিনি নিমিষেই সামলে নিলেন নিজেকে। মুখটাকে কঠিন কঠিন করার ভাব করলেন,
“না থাকতে পারলে আপনিও থাকুন এখানটায়। সমস্যা কী?”
“ঠিক আছে। তবে তা-ই হবে।” হেমলক খুব স্বাভাবিক ভাবেই বলল যেন এইখানে থাকাটা তার কাছে কোনো বিষয়ই না। রানি যতই এই পুরুষটিকে দেখছেন অবাকই হচ্ছেন। অবাক না হয়ে পারেন? এমন একটা পুরুষ তিনি আরেকটি কি দেখেছেন? কেমন যেন করে! উন্মাদের মতন। জোর করে না বাক্য দিয়ে কিন্তু অনুভূতিতে এই মানুষটার কেমন যেন অধিকারবোধ! থেকে যাওয়ার বায়না!
“চিত্রশিল্পী আপনি। একটি রাজ্যের ধরা যায় বর্তমান রাজা আপনি। অথচ আবদার করছেন যেন শিশুটি। স্ত্রী ছাড়াও পৃথিবীতে আপনার অনেক কর্ম রয়েছে, দায়িত্ব রয়েছে। কর্তব্য রয়েছে।”
“দায়িত্ব, কর্তব্য, কর্ম আছে বলেই আমি স্ত্রী’কে ভুলে যাবো? সবার বেলা সঠিক বিচার করো আর আমার বেলাই অমানবিক? কেন? কী ক্ষতি করেছি তোমার?”
রানি হেমলকের বায়না করা প্রশ্নগুলোর উত্তর দিতে পারেন না। সবসময় কি আর কঠিন স্বরে প্রত্যাখ্যান করা যায়? কতবার তিনি আর একটি মনকে ভাঙতে পারেন? হেমলকেরও তো এটা মন!
রানি প্রসঙ্গ পাল্টান। তাড়া দিয়ে বলেন,
“রাজ উদ্যানে আয়োজন আছে। ওখানে যেতে হবে।” হেমলক কিছু বলার আগেই হনহনিয়ে বেরিয়ে যান রানি।
ও দাঁড়িয়ে থাকে। ওর ভেতর সংশয় ঘুরছে কেবল। রানি নিশ্চয় ওর রাজ্যে আর ফেরত যাবেন না তাহলে তারই বা কী করণীয়? সে কি রানির সাথে থেকে যাবে? রানি রাখবে তাকে? আর নিজ রাজ্যেও বা কী করবে ফিরে? ঐ রাজ্য যে তাকে শান্তি দেয় না। স্বস্তি দেয় না!
—————
বিরাট একটি খোলা উদ্যান হৈচৈ, লোকজনে পরিপূর্ণ। কোলাহল প্রতিটি কোণায় কোণায় যেন হামাগুড়ি দিচ্ছে। রানি যখন প্রবেশ করলেন তখন এই বিশাল জন স্রোত দাঁড়িয়ে গেলো। এমন সম্মান এই রাজ্যে নতুন। সব প্রজাদের মনে রানি কী এক শ্রদ্ধার জায়গা জুগিয়ে নিয়েছেন!
রানি হ্যাব্রোর সাথে দূরে দাঁড়িয়ে কোনো কথায় মশগুল। কিছু ইশারা করে দেখাচ্ছেন, বুঝাচ্ছেন যেন।
হেমলক দাঁড়িয়ে আছে কিছুটা দূরত্বেই। ইনান ণেকিতান রাজ্যে ফেরত গেলেও রয়ে গিয়েছে মৃন্ময়ী। সেও হেমলকের পাশেই দাঁড়ানো। ক্যামিলাস রাজ্যের সেনাপতি আবার রানি ইথুনকে বন্দী করে ক্যামিলাস রাজ্যে নিয়ে গিয়েছে রানি কামিনীর আদেশে। ওখানের কারাগারে বন্দী করে রাখা হয়েছে তাকে। তার শাস্তি ঘোষণা করা হবে সেখানেই।
হেমলক এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে কথায় মশগুল রানির দিকে। চোখের পলকও যেন পড়ছে না। তার পাশে দাঁড়ানো মৃন্ময়ী এই সমস্ত কিছুই পরখ করছে নিশ্চুপে দাঁড়িয়ে। আজকের হেমলককে তারও বিশেষ অন্যরকম লাগছে। কেমন যেন উশখুশ করছে লোকটা। এই হৈচৈ ভরা জায়গায় মৃন্ময়ী ধীর স্বরে শুধালো,
“আপনার কী হয়েছে? কেমন যেন লাগছে আপনাকে? রানি কিছু বলেছেন কি আপনাকে?”
মৃন্ময়ীর কণ্ঠস্বরে ধ্যান ভাঙলো হেমলকের। রানির থেকে দৃষ্টি ফিরিয়ে মৃন্ময়ীর দিকে তাকিয়ে কৃত্রিম হাসি দিয়ে বলল,
“ কিছু তো নয়! কেন?”
“কিছু হয়নি এমনটা বিশ্বাস করতে পারছি না। কিছু ভাবছেন? কোনো সমস্যা?”
“না, রাজকন্যা মৃন্ময়ী। কোনো সমস্যা নেই। আর থাকলেও আমি নিজে তা সমাধান করতে পারব।”
মৃন্ময়ীর হাসি হাসি মুখটা বদলালো না। বরং সে আগের ন্যায় বলল,
“সমাধান সবাই করতে জানে। কিন্তু ভাগ করে নিতে সবাই জানে না। কথা ভাগ করতে হয়। ভার কমে যায় হৃদয়ের।”
মৃন্ময়ী ভীষণ গুছিয়ে কথা বলে। কথায় একটি নরম আবরণ জড়ানো থাকে সবসময় তা হেমলক টের পায়। একটা বন্ধুসুলভ আচরণ যেন তার বলার ভঙ্গিতে জড়ানো। তাই না চাইতেও একটু ভরসা আসে। সে ভরসার জের ধরেই হেমলক নরম স্বরে বলল,
“রানি বোধহয় এখানে থেকে যাবে। ক্যামিলাস রাজ্যের কী হবে সেটাই ভাবছি।”
ওদের মাথার উপর বিরাট ছাউনিটার ছায়া এসে পড়ছে মৃন্ময়ীর মুখে। সে ঘুরে ঘুরে দেখছে হেমলককে।
“রাজ্যের চিন্তায় মুখ শুকিয়েছে না-কি রানিকে না পাওয়ার চিন্তায়?”
ধরা পড়ে গিয়ে হেমলক হেসে ফেলে,
“ঐ একই হলো। রানিই আমার রাজ্য।”
“চিন্তা করছেন কেন তবে? পেয়ে যাবেন রানিকে অবশ্যই। রানি আপনার কথা ভেবে রেখেছেন।”
“আপনি কীভাবে বুঝলেন?” হেমলক প্রশ্ন করলেও মৃন্ময়ী উত্তর দেয় না। হাসে কেবল। মনে মনে বলে— রানির চোখে এক ধরণের মায়া আছে। নারীরা গোপনীয়তা করতে সচারাচর জানে না। আর যদি করে তা পুরুষমানুষ কেন পৃথিবীর কেউ টের পায় না। রানি আপনার প্রতি মায়াটাকে গোপন করে রেখেছেন। আপনি না বুঝলেও আমি ঠিক বুঝি।
দূরে দাঁড়ানো রানি কথার ফাঁকে ফাঁকে হেমলক ও মৃন্ময়ীর এই জমে ওঠা আলাপ ঠিক খেয়াল করলেন। তার চোখের মণি ঠিক খোঁজ রাখলো কোথায় কী হচ্ছে।
প্রজাদের আহার শেষ হতেই সকলকে একত্রিত হওয়ার নির্দেশ দেওয়া হলো। রানি দাঁড়ালেন খানিক দূরে। তার এক পাশে দাঁড়ানো হ্যাব্রো অন্য পাশে হেমলক। তারপর বাকি মন্ত্রীরা, মৃন্ময়ী, প্রহরীরা দাঁড়ানো। সামনে প্রজাদের জনস্রোত। রানি তাদের কিছু বলতে চান। সেটা শোনার আকাঙ্ক্ষায় মুখিয়ে আছে সকলে।
রানি তার সামনে থাকা দীর্ঘ মানুষের সারি দেখলেন এক মুহূর্ত। অতঃপর কণ্ঠস্বর উঁচু করলেন অনেকটা। কপালের আর গলার রগ ফুলে উঠেছে তার। দেখেই বুঝা যাচ্ছে কিছু একটা গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণা দিবেন। এবং হলেও তাই। তিনি উচ্চস্বরে বললেন,
“আমি এ রাজ্যের রানি আপনারা সকলেই তা অবগত। একই সঙ্গে আপনারা এ-ও অবগত যে আমি ক্যামিলাস রাজ্যেরও রানি বর্তমানে। তাই আমি সেই রাজ্যের প্রতি দায়িত্বহীন আচরণ করতে পারি না। এমনটা আমাকে শোভাও দেয় না। তাই আমি সেই রাজ্যে ফেরত যাচ্ছি। যতদিন সেই রাজ্যের কিছু গতি না করতে পারছি ততদিন আমি ওখানেই থাকব। এখানেও আসব তবে থাকাটা হবে না এখন। আপাতত রাজ্যের ভার আমার সেনাপতি হ্যাব্রোর হাতে রইল। এবং মন্ত্রীরাও বুঝে নিবেন সমস্তটা। আর যদি সেনাপতি হ্যাব্রো তার কাজে কোনো হেরফের করেছেন তাহলে সেই নালিশ আমার কাছে আপনারা পৌঁছে দেবেন। আপনাদের সেবায় যেন খামতি না হয় সেদিকে আমার সর্বসময় দৃষ্টি থাকবে। আপনারা ভালো থাকুন। এবং মনে রাখবেন এই প্রাসাদ আপনাদের জন্য উন্মুক্ত যেকোনো শোকে-দুঃখে এখানে উপস্থিত হবেন। আমি না থেকেও আপনাদের পাশে সবসময় থাকবো। ভীত হবেন না।”
রানির কথা থামতেই জয় জয়কার ভেসে এলো। সমস্ত প্রজাদের মিলিত কণ্ঠস্বরে ধ্বনিত হলো,
“জয় রানি কামিনীকাঞ্চনের জয়। জয় রানি কামিনীকাঞ্চনের জয়।”
এই ঘোষণা সবচেয়ে বেশ আনন্দিত করল যেন হেমলককে। সে এতটাই খুশি হলো যেন হাতে মহাকাশের কোনো মূল্যবান নক্ষত্র ধরা দিয়েছে। রানি আঁড়চোখে সেই আনন্দাও খেয়াল করলেন। তার অবশ্য মায়া হলো হেমলকের জন্য। যদিও হেমলক ভাবছে রানি তার কথা ভেবে যাচ্ছেন কিন্তু মূলত বিষয়টি তো তা নয়। রানি যাচ্ছেন ঐ রাজ্যের রহস্যের খোঁজে। তাছাড়াও তিনি এ্যাজেলিয়া রাজ্যকে উন্নত করতে চান। তাই আপাতত ঐ রাজ্যের শক্তি তার দরকার। ভীষণ দরকার। হেমলক ভুলে গিয়েছে, রানির কাছে সবার আগে তার এ্যাজেলিয়া রাজ্য। এরপর বাকি সব। সব।
—————
ক্যামিলাস রাজ্য মাত্রাতিরিক্ত শীতল। রাজপ্রাসাদ জনমানবশূন্য। অথচ এই রাজপ্রাসাদেই আগে বহু অতিথির রমরমা উৎসব চলতো। বারোমাসই যেন অনুষ্ঠান থাকতো। সেসব অদরকারী অতিথিরা আজকাল লেজ গুটিয়ে পালিয়েছে। নিস্তব্ধতা যেন গিলে খেয়েছে সমস্ত কোণা।
রাজকন্যা লিলি হাঁটছে প্রাসাদে। তার গায়ের গহনায় শব্দ হচ্ছে মৃদু। চারপাশটা নীরবতায় আচ্ছন্ন আছে বিধায় সেই শব্দ শোনালো স্পষ্ট। তার পাশাপাশি হাঁটছে রাজ বৈদ্য। রাজকন্যা লিলি যদিও মাঝে মাঝে রাগ দেখাচ্ছে কিন্তু রাজ বৈদ্য সেসব গায়ে মাখালো না। লিলির থমথমে মুখটির দিকে তাকিয়ে বরং সে ইচ্ছেকৃত ভাবে রাগানোর জন্য বলল,
“এমন মুখটা করে আছেন যেন বিষ খেয়ে ফেলেছেন!”
লিলি রাগান্বিত চোখ নিয়ে তাকায়, “খবরদার বুঝে কথা বলো। আমি এ রাজ্যের রাজকন্যা। ভুলে যাচ্ছ।”
“রাজকন্যা হয়েছেন তো সেভাবে থাকুন। সবসময় তো মনে হয় মাথার উপর আগুন নিয়ে ঘুরেন!”
“তোমায় ভস্ম করে না দিই সেটা দেখো।”
“ওসব আপনার দিবাস্বপ্ন।”
লিলি আরও থমথমে হয়ে যায়। এই ছেলেটির সাথে তর্কে পারে না সে। তাদের এই কথোপকথনের মাঝেই রাজমাতা প্রাচীকে হনহনিয়ে আসতে দেখা যায়। কারাগারের দিকে যাচ্ছেন তিনি।
লিলি পেছন থেকে ডাকে, “রাজমাতা, কোথায় যাচ্ছেন?”
রাজমাতা থতমত খেয়ে থেমে যান। লিলিকে দেখে যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচেন। দাঁত কিড়মিড়িয়ে বলেন,
“ইথুনের পিতার পত্র এসেছে। ইথুনকে না ছাড়লে উনি ক্যামিলাস রাজ্যের সঙ্গে সকল চুক্তি বাতিল করবেন।”
লিলি কিছুটা অবাক হয়ে শুধালো, “তাই ওকে ছাড়াতে যাচ্ছেন!”
“হ্যাঁ।”
রাজবৈদ্য আগ বাড়িয়ে নিষেধ করার আগেই লিলি চোখমুখ শক্ত করে বলল,
“এসব করবেন না। আমার হাত গিয়েছে আপনার গর্দানই নিয়ে নিবেন ঐ রানি।”
“তুমি আমাকে ভয় দেখাচ্ছো?” রাজমাতার চোখে-মুখে বিস্ময়।
লিলি মুখ ঘুরিয়ে নিলো, “সাবধান করছি। তাছাড়া আপনি যতটা সহজ ভাবছেন তাকে ছাড়ানো ততটা সহজও নয় কিন্তু বিষয়টা। পারবেন না করতে।”
“পারবো না? কে আটকাবে আমাকে? রানি তো এখনও আসেনি!”
“রানি না আসুক, রানির উপস্থিতি সব জায়গায় আছে। এই ক্যামিলাস রাজ্যের প্রতিটা মানুষ উনার হাতের মুঠোয়। আপনি তাদের দিয়ে কোনো অবৈধ কাজ করাতে পারবেন না।”
রাজমাতা বিস্মিত না হয়ে পারলেন না। এ যেন ভিন্ন সুরের লিলিকে দেখছেন তিনি।
তার এবার খটকা হলো মনে। রানি ইথুন যে যুদ্ধের ময়দানে যাবে সে কথা তো তারা গুটি কয়েকজন জানতেন। তাহলে সে কথা হেমলক অব্দি পৌঁছালো কীভাবে? তবে কী…
·
·
·
চলবে……………………………………………………