“নেক্সট উইকেন্ডে আমাকে বিপিএলের জন্য যেতে হবে। এদিকে বাড়ির সবাই আনিকার আকদ নিয়ে পড়ে আছে। হাউ ক্যান আই হ্যান্ডেল অল অফ দিস ইন সাচ আ শর্ট টাইম?”
“তুই প্রোপোজ না করে রিং পকেটে নিয়ে কেন ঘুরছিস সেটা আগে বল? তুই প্রোপোজ কর আর আনিকা অ্যাকসেপ্ট করে নিলেই সব ঝামেলা চুকে যাবে।”
“তুই যতটা সহজ ভাবছিস ততটাও সহজ নয়।”
“কঠিনটা কি ভাই? ওর সামনে হাঁটু গেড়ে বসে রিং বাড়িয়ে বলবি , ‘আনিকা আই কান্ট ব্রিথ উইদাউট ইয়্যু। ইয়্যু আর মায় সুইট হার্ট। আই লাভ ইয়্যু ইন এভরি ইউনিভার্স। উইল ইয়্যু বি মায় সানসাইন?’ তারপর ‘ইয়েস’ বলে খুশিতে আনিকা তোকে জাদুর ঝাপ্পি দিবে।”
অরুণাভ কল কাটে। শুনতে ইচ্ছে করছে না। সে জানে এমন কিছুই হবে না। কুটনি বুড়ি তার প্রোপোজ জীবনেও এক্সেপ্ট করবে না। উল্টো পঁচাবে। সে টাওজারের পকেট থেকে ক্ষুদ্র বক্সটা বের করে। ঢাকনা খুলে রিংটা হাতে নিয়ে মলিন চোখে দেখে। তাঁর অল্প অল্প করে জমানো সব পরিশ্রম এই প্লাটিনামের রিংটিতে ঢেলেছে। এই রিং তার মালকিনের আঙ্গুলে কবে যাবে? হঠাৎ কারো পদচারণার শব্দে অরুণাভ ঝটপট রিং লুকিয়ে নিলো।
দৌড়ে রুমে ঢুকে প্রহর সরকার। কোমড়ে দুই হাত রেখে ঈষৎ ঝুঁকে হাঁপাতে হাঁপাতে বলল, “ভাইটুস, তুমি বলেছিলে আমার জন্য বউ আনবে। আমার বউ কোথায়?”
অরুণাভের মলিন মুখে হাসিরা ঝলকায়। বড় বড় পা ফেলে এগিয়ে আসে। বগলদাবা করে প্রহরকে কয়েক পাক ঘুরিয়ে আনন্দিত হয়ে বলে, “মায় লিটল সুইট ব্রো ওলাফ, আই মিসড ইয়ু সোওও মাচ। ডিড ইয়্যু মিসড মি?”
প্রহর খিলখিল সুরে হেসে বলল, “লিটল লিটল মিসড ইয়্যু।”
“হুয়াই নট বেশি বেশি?”
প্রহর চোখ টিপটিপ করে বলল, “বেশি বেশি তো বউকে মিস করেছি। আমার বউ কোথায় ভাইটুস?”
অরুণাভ নরম তুলতুলে বিছানায় ছুঁড়ে মারে প্রহরকে। মুখে রাগী রাগী ভাব ফুটিয়ে বলল, “বউ আসার আগেই তাকে বেশি বেশি মিস করছো। ভাইটুসকে লিটল লিটল মিস করেছো। বউ আসলে তো ভাইটুসকে মিস-ই করবে না। ভাইটুস ডোন্ট লাভ ইয়্যু ওলাফ।”
“কি হচ্ছে কি এখানে?”
তৃতীয় ব্যাক্তির আওয়াজে অরুণাভ, প্রহর উভয়েই দরজার দিকে তাকায়। বাবাকে দেখেই প্রহর দৌড়ে এসে বাহুতে ঝুলে পড়ে। চোখ টিপে চোখে পানি আনার চেষ্টা করে বলল,
“পাপা, দেখেছো ভাইটুস আমাকে বউ দিচ্ছে না। তুমি একটু দিতে বলো না!”
অরুণাভ মাথায় শীতের টুপি গলিয়ে দেয়। লাগেজ খুলে একটা বউ পুতুল বের করে। প্রহর তা দেখেই চেঁচিয়ে বলল, “এটা তো চিটিং! আমি ডল বউ নেবো না। আমার মানুষ বউ চাই।”
অরুণাভ বাবার গম্ভীর মুখের দিকে আড়চোখে তাকিয়ে বলল, “আগে আমার মতো বড় হও। তারপর আব্বু তোমার জন্য লাল টুকটুকে মানুষ বউ এনে দিবে। তাই না আব্বু?”
অরুণ সরকারের কপালে সুক্ষ্ম ভাঁজ। প্রহর চোখ ছোট ছোট করে ভাবে কিছু সময়। তারপর প্রশ্ন করে, “পাপা তাহলে ভাইটুসের জন্য বউ আন…উমম”
অরুণাভের চোখ উজ্জ্বল হতে হতে নিভে যায়। অরুণ সরকার ছোট ছেলের মুখ চেপে ধরে বড় ছেলের উদ্দেশ্যে এক রাশ বিরক্তি প্রকাশ করে বলল, “দিন দিন বড় হচ্ছো আর লাজ লজ্জা গুলে খাচ্ছো! দুধের দাঁত পড়ে নি বিয়ে, বউ বলে মাথা খাচ্ছেন উনি।”
অরুণাভ তীব্র প্রতিবাদ জানালো, “আমি কখন বিয়ে করতে চাইলাম? আর বউ বউ তোমার ছোট ছেলে করছে, আমি না। তাকে তো চোখে পড়ে না তোমার!”
“ছোট ছেলের মাথায় বউয়ের ভূত কে নামিয়েছে শুনি?”
বাবার প্রশ্নে অরুণাভের মুখটা নিভে গেল। থতমত খেয়ে মিছে হামি তুলে বলল, “ঝগড়া করিও না আব্বু। আমার ঘুম পাচ্ছে। ওলাফ আমার কাছে থাকবে। তুমি গুড নাইট।”
প্রহর কে টেনে নিজের কাছে নেয় অরুণাভ। অরুণ তাৎক্ষণিক প্রহরকে নিজের দিকে টেনে নেয়। প্রহর বাপ ভাইয়ের টানাটানিতে বিরক্ত হয়ে বলল, "ওহ্ হো তোমাদের জ্বালায় মন চায় শ্বশুরবাড়িতে চল…উমম।”
অরুণ সরকার আবারও ছেলের মুখ চেপে ধরে। এই ছেলে বউ, শ্বশুরবাড়ি কি সব লাগিয়ে দিয়েছে। একটা শক্ত করে ধমকে দিতে হবে। সে অরুণাভকে জিজ্ঞেস করে, “এ্যাঁই ছেলে ফরম ফিলাপ করো নি কেন?”
অরুণাভের চোখে মুখে ভয় পরিস্ফুটিত হয়। চাচ্চুর চামচিকা’টা নিশ্চয়ই সব বলে দিয়েছে! সে এখন সরকার সাহেবকে কি জবাব দিবে? সে মিনমিনে সুরে বলল, “আমি সমস্ত ফোকাসটা বিপিএলে দিতে চাইছি। এরপর এশিয়া কাপ আছে। বিপিএলে ভালো পারফরমেন্স হলে তবেই দলে টিকতে পারবো। এর মাঝে পরীক্ষা কিভাবে দেবো? রেজাল্ট খারাপ হলে তুমিই তো বকবে।”
অরুণ সরকার ক্লান্ত চোখে চেয়ে দেখে ছেলের সুশ্রী মুখটা। দাঁতে দাঁত চেপে রাগ সংবরণ করে বলল, “বাহ্ অসাধারণ! কথা হলো রেজাল্ট কবে ভালো হয়েছে তোমার? প্রতিবার টেনেটুনে পাশ নাম্বারটাই আসে। তাঁর ক্রেডিট পাতাবাহারের।"
“আমি তো আগেই বলে দিয়েছি। পড়াশোনা নিয়ে আমার কাছে এক্সপেক্টেশন রাখবে না। তারপরও যদি এক্সপেক্টেশন রাখো দ্যাটস ইয়্যুর প্রবলেম নট মাইন।”
অরুণাভের মুখটায় গাম্ভীর্যতা ফিরে এসেছে। সে ভাবলেশহীন ভাবে বিছানা ধপাস করে শুয়ে কম্বল মুড়িয়ে নিলো। প্রহরকে উদ্দেশ্য করে বলল, “ওলাফ, ভাইটুসের সাথে ঘুমোতে চাইলে এসে পড়ো।”
অরুণ বড় ছেলের কীর্তিকলাপে চরম মাত্রায় হতাশ। এই ছেলে তাঁর হাতের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে দিন কে দিন। সে প্রহরের হাত শক্ত করে ধরে বলল, “পাপার সাথে ঘুমোবে। পাপা তোমাকে আলি বাবা ও চল্লিশ চোরের গল্প শোনাবে।”
“ওলাফ, আমি তোমাকে পরি আর প্রিন্সের গল্প শোনাবো।”
প্রহর দিশেহারা। সে চট করে বুদ্ধি বের করে বলল, “আজ আমরা একসাথে ঘুমাই? পাপার গল্পও শুনতে পারবো ভাইটুসেরও। প্লিজ পাপা, আজ একসাথে ঘুমাই না?”
অরুণ সরকার মানা করতেই নিবে অরুণাভ নিজ বালিশ ঠিক মাঝখানটায় রেখে বলল, “আমি কিন্তু মাঝখানে।”
অরুণ সরকার আশা করে নি বড়ছেলে রাজি হবে। সে এই সুবর্ণ সুযোগটা হাতছাড়া করতে অনিচ্ছুক। সে প্রহরকে বলল, “আচ্ছা বাবা ঠিকাছে। আমি বালিশ আনছি।”
অরুণাভ উঠে আলমারি খুলে আরও একটা বালিশ বের করে দেয়। অরুণ আর গেলো না। প্রহরকে কোলে তুলে বিছানায় নামিয়ে বলল, “মাঝখানে প্রহর থাকবে।”
অরুণাভের কপালে ভাঁজ পড়ে, “বললাম তো মাঝখানে আমি থাকবো।”
ছেলের হিংসাত্মক মনোভাব টুকু উপভোগ করে অরুণ সরকার। জেদ ভরা কণ্ঠে ‘মাঝখানে আমি থাকবো’ বললেও অরুণ শুনতে পেলো ‘ভোর তার আব্বু কলিজার কাছে থাকব’। হাসি পেলেও সে গম্ভীর মুখে বালিশ ঠিকঠাক করে বিছানা গোছায়।
—————
পাতা নয়নের শিয়রে বসে মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়। নরম কণ্ঠে বলে, “নয়ন, একটু খানি মুখে দাও স্যুপটা। দেখো খেতে অনেক মজা হয়েছে। না খেলে ওষুধ কিভাবে খাবে? আর ওষুধ না খেলে জ্বর কমবে না। কাল এক্সাম দিতে চাও তো নাকি?”
“হ্যাঁ। অরু নিশ্চয়ই সব পড়ে শেষ করে দিয়েছে। অথচ আমি বই খুলতেই পারলাম না।”
বলতে বলতে উঠে বসে নয়ন। রুগ্ন দেহটা জ্বর কাবু করে ফেলেছে। পাতা স্যুপ খাইয়ে দিলে মিনু এসে ওষুধ খাইয়ে বলল, “পরীক্ষা দেওনের দরকার নাই আব্বা। শরীর চলে না উনি পরীক্ষা দিবো।”
নয়ন কাঁদো কাঁদো মুখে পাতার দিকে তাকিয়ে বলল, “চাচি মণি পরীক্ষা না দিলে আমি এবারও সেভেনে থেকে যাবো। অরু আমার ছোট হয়েও আমার থেকে এক ক্লাস এগিয়ে যাবে। তুমি বোঝাও না মা’কে!”
পাতা বেদেনার দানা এড়িয়ে দেয় নয়নের হাতে। চোখে চোখে আশ্বাস বানী দিয়ে বলল, “আগে সুস্থ হও। বারো মাসে তেরো বার জ্বরকে নেমন্তন্ন দিলে তো খুঁজে পাওয়া যাবে না। অরু কে দেখো? আল্লাহর রহমতে রোগ বালাই খুব একটা ছুঁতে পারে না।”
অরুণিতার কথা উঠতেই নয়ন ঈষৎ লজ্জা পায়। পাতা তার মাথায় হাত বুলিয়ে চলে যায়। নয়ন টেবিলের দিকে ইশারা করে মা'কে বলল, “আইসিটি বইটা দাও তো, মা।”
মিনু বই দেয় ছেলের হাতে। নয়ন বইয়ের পাতায় চোখ বুলায় টুকটাক। মিনুর চোখ ভিজে যায়। নয়ন তা খেয়াল করে বলল, “কাঁদছো কেন মা? তুমি শুধু শুধু কাঁদো। আমার কিছুই হয় নি।”
মিনু কমলার খোসা ছাড়িয়ে ছেলের হাতে দিয়ে বলল, “আব্বা, ওই ইস্কুলে না পড়লে হয় না? ওতো নামিদামি ইস্কুলে পড়ার কি দরকার?”
নয়ন বইয়ের পাতায় চোখ রেখেই বলল, “ওখানে পড়লে কি সমস্যা মা? অরু আর রূপ ভাইয়াও তো ওখানেই পড়ছে।”
“অরু মা আর রূপ আব্বার লগে তোমার তুলনা হয়? আব্বা, তুমিই কও? ওরা বাড়ির মালকিনের ছাওয়াল। আর তুমি এই বাড়ির কাজের লোকের ছাওয়াল। তোমার বাপের পয়সায় না, তুমি ওগোর দয়ায় ওইহানে পড়তেছো।”
নয়ন মায়ের দিকে তাকায়। মিনু ছেলে মাথায় হাত বুলিয়ে বলল, “আমি চাই না আমার আব্বা মানষের দয়ায় বড় হউক। বেশি পাইয়ে বড় হইলে কমে চোখ জুড়াইবে না।”
নয়ন বই ছুঁড়ে ফেলে রাগ দেখিয়ে বলল, “আমি চেয়েছিলাম ভর্তি হতে? অরুর বাবা ভর্তি করিয়ে দিয়েছে। আমি কবে ওদের কাছে হাত পেতেছি? সবসময় তোমার এক কথা ভালো লাগেনা। যাও আমার ঘর থেকে।”
মিনু মেঝেতে পড়ে থাকা বইটা তুলে দিয়ে বেরিয়ে যায় ঘর থেকে। আভারি দরজায় দাঁড়িয়ে ছিলো। মিনুকে দেখে বলল, “ওর ইস্কুলের বেতন ওহন আমিই দিমু নে। তাইলে তো তোমার সমিস্যা থাইকবে না?”
মিনু কিছু না বলে চলে যায় ঘরে। আভারি ছেলের ঘরের দরজা বন্ধ করে মিনুর পিছু যায়। মহিলার সবেতে সমস্যা। এতো বছর ধরে এবাড়িতে আছে। বাড়ির সব্বাই পরিবারের সদস্যই মনে করে। কোনো দিন ত্যাড়া বাঁকা কথা তো দূর, হেয় দৃষ্টিতে তাকায় নি অবদি। ভোর, রূপ, আনি, অরুর মতোই তাঁর ছেলেটাকেও বেশ স্নেহ করে। অথচ এনার চোখে সেই স্নেহ দয়া লাগে।
পাতা নিজ ঘরের দিকে যাচ্ছিলো। হঠাৎ পিছু ডাকে কেউ। সে-ই পুরনো ব্যঙ্গাত্নক ডাক। মাঝে মাঝে ইচ্ছে করে কান টেনে দিতে। অবশ্য দিলেও কেউ ভুল ধরতে পারবে না।
“আম পাতা জোড়া জোড়া একটা ফেবার চাই।”
পাতার একটিমাত্র ঝগরুটে দেবর আরিয়ান সরকার পাতার সামনে এসে দাঁড়ালো। পাতা দাঁত বের করে হেসে বলল, “ফেবার চাইলে গলার টোনটা একটু না অনেকটাই পরিবর্তন করতে হবে।”
“যেমন?”
“বড়ভাবী প্লিজ আমাকে সাহায্য করুন। এভাবে অনুরোধের সুরে বলুন।”
আরিয়ান হেসে উঠলো। হাত উঁচিয়ে পাতাকে নিজ উচ্চতা দেখায়। পাতার মাথা হতে হাত ঘুরিয়ে স্বীয় কাঁধের ইঞ্চি কয়েক নিচে মাপ দাঁড় করিয়ে বললো, “হাঁটু সমান মেয়েকে নাকি বড়ভাবী ডাকবো! হাউ ফানি-ই। বলি তেজপাতা চলবে? নাকি ধনেপাতা ডাকবো!”
পাতার ইচ্ছে হয় লোকটাকে তুলে আছাড় মারতে। কিন্তু হাতিকে কি আর চুনোপুঁটি তুলতে পারবে? তাই সে হাত বাড়ায়, আজ কান টেনেই ছাড়বে। আরিয়ান হেসে বলল, “তেজাপাতাই ঠিক আছে। আর কিছু থাক বা না থাক, তেজ ঠিক-ই আছে।”
“আপনি একটা ইতর প্রাণী। বয়সে না হলেও সম্পর্কে আমি আপনার অনেক বড়! আই ডিজার্ভ সাম রেসপেক্ট।”
“বিশ্বাস করো আম পাতা, আমি পু্রো মার্কেট ঘুরেছি, শুধিয়েছি; কিন্তু কোনো দোকানি-ই কেজি খানেক রেসপেক্ট দিলো না।”
“দিবে কিভাবে আপনি একটা ঝগরুটে; তাঁর উপর ইতর। আপনার ফেবার আপনি চিবিয়ে চিবিয়ে খান!”
পাতা তাঁকে পাশ কাটিয়ে চলে যেতে নেয়। আরিয়ান হেসে আবারও ডাকলো। পাতা থামলো না বিধায় বড় বড় পা ফেলে সামনে দাঁড়িয়ে বাঁধা হয়। এবার মজা পাশে রেখে সরাসরি বললো,
“ভাইয়া তৈমুর আর আনিকার দেখাসাক্ষাতের কথা বললো। মানে পারিবারিকভাবে কথা আগানোর আগে বাচ্চারা একে অপরের সাথে কথা বলে নিক। তৈমুরকে ফোন করলে ও কাল সকালের কথা জানালো। রুবি মেয়েকে বলেছে। আমার জেদি মেয়েকে তো জানোই। তাকে আগে কেন এ বিষয়ে জানানো হয় নি। ব্যস মা মেয়ের লেগে গেল। তুমি একটু আনিকাকে বোঝালে ভালো হয়। তুমি বললে আনিকা মানা করবে না আমি জানি। প্লিজ ভাবী?”
পাতা মনোযোগ সহকারে শোনে। শেষে ‘ভাবী’ সম্বোধনে খোঁচা দিতে ভুললো না, “সরকার গুষ্টিটাই এমন। যখন প্রয়োজন পড়ে, মুখ দিয়ে তাদের মধু ঝড়ে।”
আরিয়ান চেতে গেলো, “একদম গুষ্টি তুলে কথা বলবে না আম পাতা জোড়া জোড়া।”
পাতা হেসে বলল, “ছেলে মানুষ এতোটা ঝগরুটে হয় আপনাকে না দেখলে বিশ্বাসই করতাম না।”
“আমি যেটা বললাম…”
“সকালে বুঝিয়ে পাঠিয়ে দিবো।”
আরিয়ান স্বস্তি পায়। পাতা নিজ ঘরে গিয়ে দেখে জনমানবশূন্য। পাতা মেয়ের ঘরে আসে। অরুণিতা বইয়ে ডুবে ছিলো। মাকে দেখে বললো,
“কিছু বলবে মাম্মাম?”
“আম্মু একটু কম কম পড়লে হয় না?”
পাতা মেয়ের ফুলো ফুলো গাল টেনে দিয়ে বললো। অরুণিতা বাবার মতো কপাল কুঁচকে বলল, “না হয় না। তুমি আমাকে ডিস্টার্ব করতে এসেছো?”
“না, আমার ঠোঁট তোর কপালে আদর দিতে এসেছে!” বলেই পাতা মেয়ের কপালে চুমু দিলো। অরুণিতা একটু মুচকি হেসে মায়ের কোমড় জড়িয়ে বলল,
“মাম্মাম, তুমি অনেক সুইট। বাট এখন যাও আমাকে পড়তে হবে।”
“থাকতে আসি নি তোর কাছে। আমার ফোন নিতে এসেছি। ফোন কই?”
অরুণিতা বইয়ের ভাঁজ থেকে ফোনটা বের করে বলল, “থাক না আমার কাছে?”
"দে ফোন?"
অরুণিতা গম্ভীর মুখে ফোন দিয়ে দেয়। সাথে বলে, “এবার বার্থডেতে আমার ফোন চাই। আমার সব ফ্রেন্ডদের ফোন আছে।”
“সেটা তোর পাপাকে বলিস। আমার কাছে ঘ্যান ঘ্যান করে লাভ নেই।”
পাতা তাঁর অভিমত জানিয়ে বেরিয়ে যায়। অরুণিতা রাগে বইটি ছুঁড়ে মারে উদ্দেশ্যহীন। টেবিলে মাথা এলিয়ে গোমড়া মুখে বসে রয়।
পাতা ছেলের ঘরে আসে। ঘরে ড্রিম লাইট জ্বলছে।বিছানার দিকে তাকায় সে। মুখ জুড়ে মিষ্টি হাসির সন্দেশ। বিছানার বাম পার্শ্বে নাক উঁচু ম্যানারলেস লোকটা চিৎ হয়ে, চোখের উপর এক হাত রেখে শুয়ে আছে। বড়জন মাঝ বিছানায় বাবার দিকে মুখ করে। এক হাত বাবার গলা জড়িয়ে নিয়েছে। আর ছোট ছোটজন ভাইয়ের পেট জড়িয়ে পা তুলে দিয়েছে। পাতা সাবধানে লাইট জ্বালালো। মধু মিশ্রিত মুহূর্তটাকে ফোনে বন্দি বানায়। অরুণের পাশে এসে কম্বল টেনে টুনে ঠিক করে দেয়। নিচু ঝুঁকে কাঁচা পাকা মেশালো দাঁড়িতে আচ্ছাদিত চোয়ালের একপাশে চুমু দেয়। ধনুকের মতো বেঁকে বড় ছেলের কপালের একপাশে স্নেহ ঢেলে দেয়। কপাল কোণের আঘাতে ছুঁয়ে দেয়। এপাশে ছোট জনকে টেনে কোলে তুলে নেয়। প্রহর মায়ের গলা জড়িয়ে কাঁধে মুখ লুকায়। পাতা সুইচ বোর্ডের দিকে এগোবে তখনই চিরচেনা সম্বোধন।ষ ভেসে আসে।
অরুণ চোখের উপর থেকে হাত সরিয়ে বলল, “পাতাবাহার, প্রহরকে কেন নিয়ে যাচ্ছো!”
"ঘুমান নি?"
"উঁহু, প্রহরকে রেখে যাও।"
পাতা পিছু ফিরে বলল, “আমি একা থাকবো নাকি! তাছাড়াও বিছানা ভিজিয়ে দিবে।”
“আমি ডেকে তুলে ওয়াশ রুমে নিয়ে যাবো। রেখে যাও।”
“একা একা ঘুম হবে না আমার।”
পাতা লাইট নিভিয়ে দরজা বন্ধ করতে করতে বলল, “হ্যাভ আ সুইট স্লিপ ভোরের বাবা।”
—————
ঘন কুয়াশায় ঢেকে আছে রাস্তাঘাট। শীতটা ধীরে ধীরে জেঁকে বসছে। পার্কের শূন্য বেঞ্চিতে বসে এক মানব। দুয়েক মা কুকুর আর তার ছানা গুলো ছাড়া কাউকেই চোখে পড়ছে না। হাত পা বরফের কোনো অংশে কম অনুভূত হচ্ছে না। দুই হাত সমানতালে ঘঁষে হুডির পকেটে লুকিয়ে নেয়। হুউ শব্দে মুখ দিয়ে ধোঁয়া বের করে। সিগারেটের না; শীতের দরুন পেটের ভেতর আগুন ধরে নাক মুখ থেকে নিঃসৃত ধোঁয়া। হঠাৎ মেয়েলি মিষ্টি আওয়াজে নিজ নামটি কানে সুরসুরি দিলো।
“তৈমুর নেওয়াজ?”
খুবই স্বাভাবিক ভাবেই পাশ ফিরে তাকালো তৈমুর। ভদ্রতার খাতিরে উঠে দাঁড়ালো। স্বভাব সুলভ মৃদুমন্দ হেসে বলল, “জি আমিই তৈমুর নেওয়াজ।”
আনিকা হাঁফ ছাড়লো। ভেতরে পোষা ভয় টুকু সামনের মানবের উদ্দেশ্যে উগড়ে দিতে বলল, “এতো সকালে কে দেখা করে? মাথায় সমস্যা নেই তো আপনার?”
আনিকার মুখ নিঃসৃত ধোঁয়া তৈমুরকে ছুঁয়ে দেয়। ক্লোজআপে ঘ্রাণ আসছে। রমনীর তোপে তৈমুর নেওয়াজ বুকে হাত রেখে ঈষৎ মাথা নুইয়ে হেসে বলল, “ক্ষমা করবেন। আমি ভাবি নি হুট করেই এতো কুয়াশা জমে যাবে।”
আনিকা ঈষৎ ভ্যাবাচেকা খেয়ে গেলো। লোকটা পাগল টাগল নয়তো? সে গলা খাঁকারি দিয়ে বলল, “হয়েছে হয়েছে। আমাকে ফিরতে হবে যা করার জলদি করুন।”
তৈমুর আবারও হাসলো। মনে করার ভঙ্গিতে বেঞ্চে রাখা গোলাপ ফুলের তোড়া তুলে নিলো হাতে। আড়চোখে আনিকার দিকে তাকিয়ে বলল,
“ভেবেছিলাম আপনার আমার প্রথম সাক্ষাৎকারে আমার নিজ হাতে গড়া গোলাপ বাগানের লাল তাজা গোলাপ নিবেদন করে ভাব জমাবো। কিন্তু…”
আনিকার ভ্রু যুগলে ঢেউ খেলে যায়। তৈমুর স্বীয় ভ্রু যুগল আরেকটু বাঁকিয়ে নিয়ে বলল, “কিন্ত আপনি নামক ফুলের কাছে এই ফুলের সৌরভ লোপ পেয়েছে। ফিকে লাগছে দেখতে। আপনার স্নিগ্ধতায় ফুলগুলো সতেজতা হারিয়ে নেতিয়ে পড়ছে, দেখুন?”
আনিকা ফুলগুলোর দিকে তাকায়। লাল টকটকে পাপড়িতে শিশির বিন্দু হাসছে। সে নিজেও হেসে বলল, “ফ্লার্ট করছেন আমার সাথে?”
“ভাব জমানোর চেষ্টা করছি। আমার পুষ্প সজ্জিত তরীতে বসিয়ে ভাবের তরঙ্গে বৈঠা বিহীন ভাসবো আমরণ, যদি রাজি থাকেন।”
আনিকা কি বলবে ভেবে পায় না। চেনা নেই জানা নেই আমার সাথে ভাসবেন? যেন মামা বাড়ির আবদার। সে আঙুল তাক করে বলল,
“দেখুন তৈমুর, আমি এটা বলতে এসেছি যে, আমি আপনাকে বিয়ে টিয়ে করতে পারবো না। শুনেছেন? এখন ভদ্র বাচ্চার মতো বাড়ি গিয়ে আপনার বাবা মা’কে বলুন বাবাকে যেন বিরক্ত না করে।”
তৈমুর নেওয়াজের হাসিমুখে আঁধার ঘনিয়ে আসে। বেঞ্চের দিকে ইশারা করে বলল, “আমরা বসে কথা বলি, সুবাসিনী?”
“বললামই তো! আর কি বলার বাকি আছে? আপনি যদি ভেবে থাকেন মিষ্টি মিষ্টি প্রেমবাক্য পাঠ করে আনিকা সরকারকে পটাবেন তাহলে বলবো ওয়েস্ট ওফ টাইম।”
আনিকা ভাবের সাথে বললো। গায়ে জড়ানো চাদর ঠিক করে বুকে হাত ভাঁজ করে। তৈমুর অতি স্বাভাবিক ভাবেই বলল, “আমার সাথে পাঁচটা মিনিট বসুন, সুবাসিনী। অনুরোধ করছি?”
আনিকা বিরক্ত মুখে বসে। হঠাৎ মাথায় খেলতেই বলে ওঠে, “আপনি আমাকে সুবাসিনী ডাকছেন কেন? আমার নাম তো আনিকা সরকার। আপনি সত্যিই তৈমুর নেওয়াজ তো?”
“জি আমিই তৈমুর নেওয়াজ। আপনার হবু স্বামী। তবে আশা রাখছি শিঘ্রই 'হবু' গায়েব হয়ে যাবে।”
তৈমুর নিজ মনোভাব ব্যক্ত করে আনিকার পাশেই দূরত্ব মেপে বসে। আনিকা বিস্ময়কর চোখে তাকিয়ে দেখে পাশে বসা মানুষটির দিকে।
—————
ভোরের কমলা রঙা রোদের সমাহার ধরনীর বুকে স্বপ্ন বুনছে। সবুজ ঘাসের বুকে সমাহিত শিশির কণা সেই স্বপ্নের এক ঝলক দেখাচ্ছে। বিহঙ্গের দল সুরে সুরে স্বপ্নের ডানা মেলে সর্বত্র ছড়িয়ে দিচ্ছে এক নতুন সূচনার সমাচার।
নেট প্র্যাকটিস এরিয়ায় ব্যাট হাতে বিশ বছর বয়সী এক যুবক গভীর মনোযোগের সাথে কোচের নির্দেশনা শুনছে। পরণে সফেত টিশার্ট আর ট্রাউজারের সাথে সেফটির জন্য হেলমেট , গ্লাভস, প্যাডস! হেলমেট বাম হাতে ঠিকঠাক করে পজিশন নেয় ব্যাট করার জন্য। ব্যাট মাটিতে আঘাত করে বলের অপেক্ষায় প্রহর গুনছে এক , দুই, তিন …! তাঁর ডাগর আঁখি যুগলে এক দৃঢ় প্রত্যয়। মননে বুনন করা স্বপ্নের শেষ বিন্দুতে নিজেকে আবিষ্কার করার এক আত্মবিশ্বাসী প্রত্যয়। কোচ বল ঘুরিয়ে বল করলে যুবক অতি দক্ষতার সাথে নিজ প্রতিভার পরিচয় দেয়। গম্ভীর রাগী গোছের কোচ মুগ্ধ হলেও তা প্রকাশ না করে আরো ভালো করে শেখার তাগিদ দিয়ে চলে যায়। যুবক তারই এক বন্ধুর বলের তোপে কতক্ষণ ব্যাট চালনা করে। বন্ধু সাগর বল করার ফাঁকে টুকিটাকি কথা বলে।
“বিপিএলে কোন দলে খেলবে অরুণাভ?”
“সম্ভবত রংপুর রাইডার্স।”
“বেস্ট অফ লাক। আশাকরি ভালো কিছু হবে। আমাদের ভুলে যেও না যেন।”
অরুণাভ ভদ্রসুলভ হাসলো। হঠাৎ সারফেস এরিয়া হতে পরিচিত ডাক ভেসে আসলে অরুণাভের মনোযোগ ভ্রষ্ট হয়। ফলাফল উইকেট হারিয়ে ফেলে। সাগর মৃদুমন্দ উল্লাসে ফেটে পড়ে বলে,
“ অরুণাভ বোল্ড আউট। মনোযোগ কোথায় তোমার?”
অরুণাভ সরকার হেলমেট খুলে মুচকি হাসলো। দাঁতের সাহায্যে হাতের গ্লাভস খুলে বলল,
“আই নীড আ ব্রেক। ইয়্যু ক্যারি অন সাগর!”
নেট প্র্যাকটিস এরিয়া হতে অরুণাভ সারফেস এরিয়ার দিকে চলে যায়। বাল্যকালের প্রাণপ্রিয় বন্ধু টুটুল অ্যানাকে কোলে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। অরুণাভ সরকার বন্ধুর কোল থেকে অ্যানাকে নিয়ে বুকে জড়ায়।
“অ্যানা’কে কোথায় পেলি?”
অ্যানা এতক্ষণ ছটফট করলেও মালিকের আদরে শান্ত হয়ে এসেছে। পেটে হাতের থাবা বসিয়ে ‘মিউ মিউ’ ডেকে আদর চায়। অরুণাভ গা বুলিয়ে দিতেই গুটিয়ে গেলো প্রাণীটি। টুটুল বিড়ালের কান টেনে দিয়ে বলল,
“তোর খোঁজে তোর বাড়িতে গিয়েছিলাম। তোকে না পেয়ে তোর সো কল্ড গার্লফ্রেন্ডকে তুলে এনেছি। কিন্তু তোর গার্লফ্রেন্ড খুব লয়্যাল! দেখ খামচে রক্ত এনে দিয়েছে?”
অরুণাভ বন্ধুর রক্তকে গুরুত্ব দিলো না। ভ্রু যুগল কুঞ্চন করে বলল, “বাড়িতে কেন গিয়েছিলি?”
“বন্ধুর বোনকে খুব মিস করছিলাম তো…”
কথা শেষ করতে পারলো না অরুণাভের ব্যাট পশ্চাতে ঠিকই থাবা মেরে দিয়েছে। টুটুল কটমট চোখে তাকিয়ে বলে,
“শালা হারামী, টুটুল সিঙ্গেল মরবে তবুও তোর বদরাগী গোমড়া মুখো বোনের দিকে ফিরে ফুচ্চি দিবে না। ভাই মেয়ে মানুষ হবে সফট মাইন্ডের, কিউটি পাই। আর তোর বোন পারমাণবিক মিসাইল, আস্ত আতংক।”
অরুণাভের শান্ত মুখে হাসির সম্ভার। টুটুল থেমে নেই। বন্ধুর বোনের প্রতি তার ক্ষোভের সীমানা আকাশ ছাড়িয়ে মহাকাশে চলে গেছে। বন্ধুর আগমনে প্র্যাকটিস আজকের জন্য স্থগিত রেখে গায়ে হুডি জড়িয়ে স্পোর্টস ব্যাগ কাঁধে ফেলে বেরিয়ে পরে।
“বড়লোক্স বাপের বড়লোক্স ছেলে গাড়ি এনেছিস নাকি?”
“নোপ! আব্বুর সাথে হাঁটতে হাঁটতে পৌঁছে গিয়েছিলাম। তুই বাইক এনেছিস?”
বলেই অরুণাভ হাত পাতে। টুটুল ভোঁতা মুখে বাইকের চাবি বন্ধুর হাতে রেখে বলে,
“আস্তে ধীরে মানুষের মতো বাইক চালাবি! এখনো সিঙ্গেল আমি। একটা গার্লফ্রেন্ডও নেই। অকালে মরতে চাই না।”
অরুণাভ অ্যানাকে বন্ধুর কোলে হস্তান্তর করে পার্কিং জোনে পৌঁছায়। বাইক নিয়ে বেরিয়ে পরে ব্যস্ত শহরে। বাইকের গতি যেন রকেট ছুটছে। টুটুল ঈষৎ ভয়ে পেছন থেকে বন্ধুর কাঁধে হাত রাখলো। মরলে একসাথেই মরবে। সে একা মরতে পারবে না।
“কাঁধ থেকে হাত সরা। এত চিপকাস ক্যান?”
অরুণাভের ধমকে টুটুল হাত সরিয়ে নেয়। ফোনের টুংটাং শব্দে অরুণাভ বাইকের স্পীড কমায়। টুটুলকে বলে, “ফোনটা রিসিভ করে কানে ধর। আব্বু কল করেছে।”
টুটুল হুডির পকেট থেকে ফোনটা বের করে। তবে রিসিভ করে না। কল কাট করে ফোন সুইচ অফ করে রেখে দেয়।
“ভাই, একজন গার্লফ্রেন্ডও তার বয়ফ্রেন্ডকে এতোবার কল দেয় না যতবার আঙ্কেল তোকে দেয়! ঘন্টায় ঘন্টায় কল আসে তোর ফোনে। মাঝে মাঝে আমিই তো বিরক্ত হই। তোর বিরক্ত লাগে না?”
হেলমেটের ভেতর থেকে উঁকি দেওয়া আঁখি যুগল হাসছে। অরুণাভের পক্ষ থেকে জবাব আসে, “কক্ষনো না।”
টুটুল মুখ ভেঙায়। কল কাটা নিয়ে দু’জনের লেগে যায় গুঁতোগুতি। বেচারি অ্যানা দু’জনের ঠোকরাঠুকরিতে বিরক্ত হয়। সিগন্যালে বাইক থামলে টুটুল স্বল্প দূরের প্রাইভেট কারের খোলা জানালার দিকে তাকায়। দৃশ্যমান এক রমনীর দিকে ইশারা করে লাজুক ভঙ্গিতে বলে,
“তোর ভাবীর মতোন লাগে। মানে ধরে নে ওইটাই তোর একমাত্র ভাবী। কি প্রিটি দেখতে! একদম পুতুলের মতো, তাই না?”
অরুণাভ হেলমেটের গ্লাস তুলে গাড়ির দিকে দৃষ্টি ফেলে। কোণা চোখে বন্ধুকে ইশারা করে শুধায়,
“পছন্দ হয়েছে?”
“তা আর বলতে! ভাই কি কিউট দেখছোস? তোর অ্যানা ফ্যানার থেকেও বেশি কিউট। কোনো কিছুর কমতি নেই। সাথে বাপের টাকারও।”
অরুণাভ তড়িৎ গতিতে ঘার বাঁকিয়ে বন্ধুর দিকে তাকায়। টুটুল মাথা চুলকে হেসে উঠলো, “তুই তো বড়লোক্স। তোর ছকিনা বিবি হলেও চলবে। আমি গরীবস আমারে তো বড়লোক্স ‘পাপা কি পারি-ই পটাতে হবে। বড়লোক হওয়ার এটাই শেষ রাস্তা।”
অরুণাভ বন্ধুর মাথায় চাটা মারলো। টুটুল আবারও গাড়ির দিকে ইশারা করলো, “ভাই দেখ, মেয়েটা সত্যিই গুড লুকিং। শুধু মুখে হাসিটা নেই। হাসি থাকলে বেশ লাগতো কিন্তু।”
অরুণাভ আর তাকালো না। তবে তাঁর হিংসুটে মন কুট কুট করে ওঠে।
“বেশি সুন্দরী মেয়েরা খচ্চর হয়। ওদিকে তাকাস না টুটুল। মেয়েটাকে সুবিধার লাগছে না।”
টুটুলের মুখে নাখোশতা। সে গাড়ির মেয়েটার দিকে এখনো তাকিয়ে। কোলে থাকা বিড়াল ছানা হুট করেই টুটুলের কোল থেকে লাফিয়ে রাস্তায় নেমে পড়ে। সেই গাড়িটির কাছে ছুটে যায়। ধারালো নখ দিয়ে আঁচড় কাটে গাড়ির গায়ে। অরুণাভ ডাকে তাকে,
“অ্যানা, মায় লিটল বেইবি কাম ব্যাক টু মি?”
গাড়ির খোলা জানালায় কনুই ঠেকিয়ে উদাসী স্বপ্ন বোনা মেয়েটির উদাসী ধ্যান ভঙ্গ হলো। সে কৌতুহলী দৃষ্টিতে পাশে তাকায়। পরপর-ই জানালা দিয়ে মাথা বের করে নিচের দিকে তাকায়। বিড়াল ছানা দেখে তাঁর কপালে বিরক্তিকর ভাঁজ পড়ে।
“হোয়াট হ্যাপেন্ড, পত্র? ব্রিং ইয়্যুর হেড ইনসাইড। রাইট নাও?”
বাধ্য মেয়েটি মাথা ভেতরে নেয়। ধীরে ধীরে জানালার কাচ উপরে উঠে গেল। পত্র মেয়েটি এখনও সেদিকেই তাকিয়ে। তন্মধ্যে সবুজ বাতি জ্বলে ওঠে। সব গাড়ি ছুট লাগানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে ক্রমান্বয়ে। টুটুল নেমে অ্যানাকে কোলে তুলে ফিরে আসে। ভীড়ে বিএমডাব্লিউও গাড়িটি হারিয়ে যায়। টুটুলের হায়হুতাশ শুরু। অরুণাভ বিরক্ত হয় বটে। ধমক দিলে টুটুলের হায়হুতাশ আরও বেড়ে যায়।
“তুই হচ্ছিস আমার লাভ লাইনের একমাত্র ভিলেন। তোর জন্যই আমি আজও সিঙ্গেল। রাতভর জেগে গার্লফ্রেন্ডের সাথে কথা বলার বয়সে ইনস্ট্রায় রিলস দেখে দেখে রাত্রি পার করি।”
অরুণাভ বাইক স্টার্ট দিয়ে বলল, “আগে আমার লাইফ লাইন ঠিক হোক তারপর তোকে একটা খুঁজে দিবো।”
টুটুল গোমড়া মুখে বলল, “তোদের মধ্যে তো ভাব’টাই হলো না। ভাব তরঙ্গ কবে হবে?”
“হবে হবে।”
“হ্যাঁ আনিকা আর ওই তৈমুর নেওয়াজের আকদের পর।”
অরুণাভ বাইকের ব্রেক কষে। ব্যস্ত রাস্তাতেই নেমে আসে। মাথার হেলমেট খুলে ছুঁড়ে ফেলে কংক্রিটের রাস্তায়। স্পোর্টস ব্যাগ সহ অ্যানাকে ছিনিয়ে নিয়ে হনহনিয়ে চলে যায়। টুটুল না হলেও শতবার ডাকলো, বান্দা পিছু ফিরলো না। টুটুলের রাগ হয়। হেলমেট তুলে দেখে গ্লাস ভেঙ্গেছে। আবারও বাবার ঝাড়ি খেতে হবে। খোঁটা শুনতে হবে। এই ধনীর দুলাল কি বুঝবে বাবার খোঁটার ধার!
অরুণাভ বেশ খানিকটা হেঁটে এসে রিক্সা ডেকে বাড়ি ফিরে। থমথমে মুখে ড্রয়িং রুমে এসেই ‘আম্মু’ বলে হাঁক ছাড়লো। মিনিট গড়ালো আম্মু এলো না। অরুণাভ স্পোর্টস ব্যাগ, সোফায় ছুঁড়ে অ্যানাকে নামিয়ে দেয়। অ্যানা ছুটে যায়। কোথায় যাচ্ছে? পাতা কে ডাকতে কি? অরুণাভ হাত পা ছড়িয়ে বসতেই রূপক সরকারের দেখা মিলে। ফুরফুরে মেজাজে কোথাও যাচ্ছিলো। তার ফুরফুরে মেজাজ অরুণাভের সহ্য হলো না। সে ইশারায় কাছে ডাকে। রূপক ভোঁতা মুখে এগিয়ে আসে। অরুণাভ হুকুম তামিল করলো,
“আমার জন্য এক গ্লাস পানি আন তো।”
রূপক সরকার দাঁত কটমট করে। অনিচ্ছা সত্ত্বেও পানি এনে টি টেবিলে রাখলো। অরুণাভের পছন্দ হলো না। ভ্রু কুটিতে ভাঁজ ফেলে বলল, “হাতে দে।”
“তোমার হাত নেই?”
“আছে দেখবি?”
রূপ গালে হাত রেখে না বোঝায়। পানির গ্লাস তুলে ভর্ৎসনার সাথে বলল, “মুখে তুলে খাইয়ে দিই, ভাইয়া?”
অরুণাভ ছিনিয়ে নেয় গ্লাস। জিজ্ঞাসা করে,
“আম্মু কোথায়?”
“আ’মা তো প্রহরকে গোসল করিয়ে দিচ্ছে।”
“কুটনি বুড়ি?”
“আপু তৈমুর ভাইয়ার সাথে দেখা করতে গেছে।”
অরুণাভ সদ্যই গ্লাসে চুমুক দিয়েছিল। রূপকের কথায় নাকে মুখে পানি উঠে বিষম খেয়ে বসে। রূপক তার মাথায় চাপড় মেরে বলল, “ বালাই ষাট। কি হলো? কে বকছে আমার ভোর ভাইয়াকে হ্যাঁ। সামনে আসুক গর্দান নিবো।”
রূপকের মিছে দরদে বিরক্ত হয় অরুণাভ। তবে আনিকা কৈতর নাকি তৈমুর অপদার্থটার সাথে আছে ভাবতেই গা জ্বালা করে। রীতিমতো রাগে কাঁপছে দেহখানা। সে ঠাস করে আধ খাওয়া পানির গ্লাস রেখে বলল, “কোথায় দেখা করবে ওঁরা?”
রূপক সাদাসিধে মনে জানিয়ে দেয়। অরুণাভ গাড়ির চাবি এনে বেরিয়ে পড়ে তৎক্ষণাৎ। কুটনি বুড়ির সাহস কত বড়! অচেনা লোকের সাথে দেখা করতে যায়। আজ মেয়েটার একদিন তো তার কয় দিন দেখা যাক।
·
·
·
চলবে……………………………………………………