হৃদয়ে রহো প্ৰিয় - পর্ব ০১ - রাই কথা - ধারাবাহিক গল্প

হৃদয়ে রহো প্ৰিয় - রাই কথা
          ছুটিতে বরযাত্রী হিসেবে অজপাড়া গাঁয়ে এসে মহাবিপদে পড়ে যাবে তা কস্মিনকালেও ভাবেনি মাহির। দাবী শুনে প্রবল শীতেও সে হু হু করে ঘামতে লাগল। সে হতভম্ব হয়ে বশিরের দিকে তাকাল। বশির নিজেও সবার মাঝে কাঁচুমাচু হয়ে এক কোণে দাড়িয়ে আছে।

মাধ্যমিক পরীক্ষার পরেই তাদের শহর ছেড়ে বশিরের পরিবার ঢাকায় চলে যায়। এরপর আর তার সাথে মাহিরের তেমন দেখা-সাক্ষাৎ হয়নি। শুধু বশির না, কোনো বন্ধুর সাথেই তার তেমন যোগাযোগ ছিল না। মগবাজারের মেইনরোডে মাহিরের অফিস। লাঞ্চ ব্রেকে দোকানে চা খেতে এসেই বহু বছর পর বশিরের সাথে দেখা হলো। সে প্রথমে চিনতে হিমশিম খায়, বশির-ই এগিয়ে এসে আন্তরিক ভঙ্গিতে তার সাথে কোলাকুলি করে। তারপর আড্ডা জমিয়ে দেয়।
এক পর্যায়ে সময় দেখে মাহির বলে, 
আজকে উঠতে হবে। আবার আরেকদিন আলাপ করব। আছিস তো কিছুদিন এইদিকে? 

-হ্যাঁ আছি। তোর নাম্বারটা দে, ফেসবুক আছে তো নাকি ছোটবেলার মতো গোবা-চোবা রয়ে গেছিস?

মাহির কথা না বাড়িয়ে নাম্বার দিল। চাকরিতে তার একবছর পূর্ণ হতে কয়েকমাস বাকি। এরমধ্যেই ফাঁকিবাজের মতো তকমা সে নামের পাশে জুড়তে চায় না।
মাহির ভেবেছিল বশির ভদ্রতা করে নম্বর নিয়ে রেখেছে, কিন্তু কয়েকদিন পর সে নিজেই তাকে বাড়িতে দাওয়াত করে নিয়ে যায়। মাহির কিছুটা চকিত হয় এতে, বশিরের বৈশিষ্ট্যের সাথে এতো ভালো ব্যবহার যায় না। 

বশিরও বোধহয় তার সংশয় বুঝতে পারল। বিব্রত হেসে বলল, আরে তুই কি ছোটবেলার কথা ধরে বসে আছিস নাকি? তখন তো মজায় মজায় তোকে প্যারা দিতাম। ব্যাটা-ছেলেরা কি মেয়েদের মতো সেসব ধরে বসে থাকে? আম্মা তোকে খাওয়াতে চেয়েছেন। তুই না আসলে কষ্ট পাবে।

অগত্যা মাহির গুরুজনের সম্মান রক্ষার্থে দাওয়াত গ্রহণ করল। ও বাড়ির সবাই তার বেশ খাতির-যত্ন করল। খাওয়া শেষে মিষ্টি দইয়ের বাটি নিয়ে আবার কিছুক্ষণ আড্ডা জমলো। কথা প্রসঙ্গে বশিরের আম্মা এসে বললেন, মাহিরকে বিয়ের জন্য দাওয়াত করেছিস তো? বাবা তুমি কিন্তু আমাদের সাথে থাকবে।

মাহির প্রশ্ন করল, কি ব্যাপার খালাম্মা? 

-রাজিবের বিয়ে ঠিক হয়েছে তোমাদের দোয়ায়। আগামী সপ্তাহে কবুল পড়িয়ে নিয়ে আসব, এখানে ভালো করে বৌভাত করানোর ইচ্ছে আছে। 

বশির বলল, তুই আবার ঢং শুরু করিস না। সামনের সপ্তাহে তো সবার বন্ধ। কি সুন্দর শুক্র-শনির আগে পরে সরকারি বন্ধ পড়ে একদম লম্বা ছুটি হয়ে গেছে সবার! চল আমাদের সঙ্গে। মেয়েপক্ষ হলো গাঁও গেরামের। ওখানেই কাজ সেরে মেয়ে দিয়ে দিতে চায়। দেনাপাওনায় ও তেমন আগ্রহ দেখলাম না। গরীব ছোটলোক আর কি! তাও যাক আমাদের তো শুধু মেয়ে দিয়ে কাজ। তাহলে তোর সিট কনফার্ম রাখলাম। বৃহস্পতিবার সকালে মাইক্রোবাসে করে যাব ইনশাআল্লাহ! 

মাহির তেমন মানা করার সুযোগ পেল না। ছুটি কাটানো নিয়ে তার বিশেষ আয়োজন ছিল না। হয়তো ঘরেই বিশ্রাম নিয়ে সময় কাটাতো। শেষ কবে ঘুরতে বেরিয়েছে তার খেয়াল নেই। সব জেনে মনটাও প্রকৃতির পরশ পেতে লোভী হয়। শহরের বিষাক্ত বাতাস থেকে কয়েকদিনর বিরতি নিতে আবেগ বিবেক দুটোই সায় দেয়। 

—————

গ্রামে যাওয়ার পুরোটা পথে সে বশিরের আত্মীয় স্বজনদের উদ্ভট কান্ড-কারখানা রেখে কানে হেডফোন গুঁজে জানালার বাইরের দৃশ্যে মনোযোগ দেয়। প্রায় পাঁচ-ছয় ঘন্টা পর তাদের মাইক্রোবাস গন্তব্যের কাছে এসে থামল।

গ্রামের নাম নিশিখালি। তার সবুজ বুক চিরে বয়ে গেছে কপতী নদী। ছলনাময়ী অর্থের নাম কেন এই শীর্ণকায়া, মন্থর নদীর হলো তা কেউ জানে না। 

মাইক্রোবাসগুলো গ্রামের মেঠোপথে বেশি এগোতে পারল না। সড়কের মাথায় কনে বাড়ির মানুষজন দাড়িয়ে ছিল। বাকিটা পথ পায়ে হেঁটে যেতে হলো। বশিরের ফুপুরা এতে বিরক্ত হলেন। 

-আজকালের যুগেও এমন গ্রাম আছে নাকি বাবা! এই কোন গর্তে বিয়ে ঠিক করেছে রাজীবের? বশিরের আম্মা তো সবসময় বেশি বুঝে গেছে। এরজন্যই তো পোলাপানদের এই অবস্থা।

মাটির কাঁচা রাস্তার দুপাশে আদিগন্ত বিস্তৃত ফসলের মাঠ। মেঠোপথটা কুয়াশা আর রোদের লুকোচুরি খেলায় এক অদ্ভুত ধূসর রূপ ধারণ করেছে। মাহির দেখল, পথের দুধারের ঘাসগুলো ভোরের শিশিরসিক্ত হয়ে নুয়ে আছে; যেন কেউ মুক্তোর দানা ছড়িয়ে রেখেছে সবুজ মখমল ঘাসের ওপর।
​একটু এগোতেই চোখে পড়ল দুধারে সরিষা ক্ষেত। মাইলের পর মাইল যেন কেউ তরল সোনা ঢেলে দিয়েছে। সেই তীব্র হলুদ আর তার ওপর হালকা কুয়াশার পাতলা চাদর মাহিরকে স্থাণু করে দিল। বাতাসের প্রতিটি ঝাপটায় সরিষা ফুলের সেই বুনো, মাদকতাময় ঘ্রাণ নাকে আসতেই তার মনে হলো শহরের বিষাক্ত ধোঁয়ার পর এই প্রথম তার ফুসফুসগুলো প্রাণভরে অক্সিজেন নিচ্ছে।

​পথের বাঁকে বাঁকে পুরোনো সব গাছ। কোনোটার ডাল একদম রিক্ত, একটা পাতাও অবশিষ্ট নেই। কঙ্কালের মতো দাঁড়িয়ে থেকে শীতের হাহাকার প্রচার করছে। আবার কোনো গাছে বুনো লতার ঘন বসতি। গ্রামের বাড়িগুলোর চারপাশে বাঁশঝাড়ের নিবিড় ছায়া। সেই বাঁশঝাড়ের ভেতর দিয়ে যখন উত্তুরে হাওয়া বয়ে যাচ্ছে, তখন এক ধরণের শনশন শব্দ হচ্ছে, যা এই নিঝুম দুপুরেও শিরশিরে এক অনুভূতি জাগিয়ে তোলে।

মেঠোপথ থেকে কয়েক পা ডানে সরতেই আফজাল মেম্বারের বাড়ি। এটি কোনো বিশাল রাজপ্রাসাদ নয়, সাধারণ একতলা একটা পাকা দালান। আফজাল মেম্বার সাহেব অল্প সময়ে এই বিয়ের মূল ঘটকালি করেছেন, তাই বরযাত্রীদের আপ্যায়নের ভার নিজের কাঁধেই নিয়েছেন। গ্রামের কাঁচা বাড়িগুলোর ভিড়ে এই চুনকাম করা একতলা দালানটাই যা একটু শহুরে আধুনিকতার জানান দিচ্ছে।

​মেম্বার বাড়ির বৈঠকখানা ঘরটা মাহিরদের জন্য বরাদ্দ করা হয়েছে। ঘরটা মাঝারি আকারের, দেওয়ালে নীল রঙের আস্তর জায়গায় জায়গায় চটা ওঠা। কোণায় একটা পুরোনো আলমারি আর কয়েকটা প্লাস্টিকের চেয়ার ছড়ানো-ছিটানো। জানালার কাঁচগুলো কুয়াশায় একদম ঘোলাটে হয়ে আছে, বাইরে কে আছে তা চেনার উপায় নেই।

​মাহির খেয়াল করল, তার ঘরের কোণের টেবিলটায় একটা হারিকেন জ্বলছে, যদিও বিদ্যুৎ আছে। হয়তো লোডশেডিংয়ের আশঙ্কায় রাখা হয়েছে। হারিকেনের কাঁচের ওপর আগুনের শিখার কাঁপুনি ঘরটার ভেতর এক ধরণের ম্লান ছায়া তৈরি করেছে। মাহির জানালার পাল্লাটা একটু ফাঁক করতেই হু হু করে এক ঝলক উত্তুরে বাতাস ভেতরে ঢুকে তার গায়ে কাঁপুনি ধরিয়ে দিল।

​বাইরে তাকাতেই তার নজরে এল মেম্বার বাড়ির পেছনের দিকটা। সেখানে সারিবদ্ধ কয়েকটা নারকেল গাছ দাঁড়িয়ে আছে, যাদের পাতাগুলো বাতাসের তোড়ে খসখস শব্দে একে অপরের গায়ে আছড়ে পড়ছে। ঠিক নিচেই একটা ডোবা, যার স্থির কালো জলে কচুরিপানার জঙ্গল। একটু দূরেই গ্রামের আসল চেহারা বাঁশঝাড় আর খড়ের পালুইয়ের আবছা সারি।

​আফজাল মেম্বারকে দেখা গেল বারান্দায়। লুঙ্গির ওপর একটা সস্তা সোয়েটার পরা, মাথায় মাফলার জড়ানো। তিনি পান চিবোতে চিবোতে বশিরের সাথে নিচু গলায় কথা বলছেন।

মেম্বার সাহেব নিজে এবং গ্রামের কয়েকজন মুরুব্বি সাদা ধবধবে পাঞ্জাবি আর গায়ে দামী কাশ্মীরি শাল জড়িয়ে গেটে দাঁড়িয়ে ছিলেন।

​মাহির তার ট্রাভেল ব্যাগটা কাঁধ থেকে নামানোর সুযোগই পায় নি। সতেরো-আঠারো বছরের এক ছোকরা প্রায় জোর করেই সেটা কেড়ে নিয়েছিল। মাহির অপ্রস্তুত হয়ে তখন বলল, আরে থাক না, আমি নিয়ে যাচ্ছি।

 মেম্বার সাহেব হেসে মাহিরের কাঁধে হাত রাখলেন, রাখেন তো বাবাজি! আপনারা শহর থেকে কষ্ট করে এসেছেন, মেহমানের হাতে বোঝা দেখলে আমাদের গুনাহ হবে।

​বাড়ির বিশাল বারান্দায় বসার সাথে সাথেই কাঁসার মস্ত বড় গামলায় করে ধোঁয়া ওঠা কুসুম গরম পানি নিয়ে আসা হলো। গ্রামের হাড়কাঁপানো শীতে বরযাত্রীদের হাত-পা ধোয়ার জন্য এই বিশেষ ব্যবস্থা। মাহির যখন গামলায় হাত ডোবাল, তার মনে হলো সারা দিনের ক্লান্তি মুহূর্তেই উবে যাচ্ছে। পাশে দাঁড়িয়ে একজন লোক নতুন গামছা মেলে ধরল। মাহির লক্ষ করল, বশিরের ফুপু আর আম্মার চারপাশে কনেপক্ষের তিন-চারজন মহিলা সার্বক্ষণিক পাখা দিয়ে বাতাস করার মতো তটস্থ হয়ে আছেন। ছোটখাটো যেকোনো ইশারা পাওয়ামাত্রই তারা 'জি দিদি', 'জি খালাম্মা' বলে ঝাঁপিয়ে পড়ছে।

বিকেল ফুরিয়ে আসার আগেই আপ্যায়নের পর্ব শুরু হলো। গ্রামের বাড়ি বলে শহরতলীর মতো বিস্কুট বা চানাচুর এল না। মেম্বার বাড়ির ভেতর থেকে বড় বড় শ্বেতপাথরের থালায় করে সাজিয়ে আনা হলো নলেন গুড়ের ভাপা পিঠা, দুধে ভেজানো চিতই আর মচমচে শাহী নিমকি।
​বশিরের বড়ো ফুপু একটু শৌখিন মেজাজের। তিনি একটা পিঠায় কামড় দিয়ে মেমসাহেবদের মতো বললেন, গুড়টা কি আরেকটু কড়া হতে পারত না?

 মেম্বার সাহেব কথাটা শোনামাত্রই যেন আকাশ থেকে পড়লেন। তিনি তক্ষুণি হাঁক ছাড়লেন, আ্যই ভেতর বাড়িতে খবর দে, বেয়াইনের জন্য যেন আলাদা করে তালের গুড়ের পায়েস চাপানো হয়! কোনো যেন ত্রুটি না থাকে।

ঠিক হলো কাল শুক্রবার জুমার নামাজের পর বিয়ে পড়ানো হবে। কাবিনের বিষয়টা বিনা ঝামেলায়​ মিটে গেল। কনে বাড়ি থেকে একটু পরপর মানুষরা বর দেখতে আসছে আর গুরুজনরা ধমক দিয়ে পাঠিয়ে দিচ্ছে। 

মাহির দেখল রাজিব একদম চুপচাপ ঘর আটকে একটা চেয়ারে বসে আছে। তার সামনে তিন-চার রকমের পিঠা সাজানো, অথচ সেদিকে তার নজর নেই। এক ঘরে থাকার ব্যবস্থা হওয়ায় রাজিবের ব্যবহার চোখে লাগছে। অবশ্য বিয়ের আগে কিছুটা অস্থিরতা কাজ করা অস্বাভাবিক না।
কনেপক্ষের যুবকরা বারবার এসে রাজিবকে না পেয়ে তাকে জিজ্ঞেস করছে, 
ভাইজান, লেবু চা দেব নাকি কড়া দুধ চা? সিগারেট লাগবে? এই নেন লাইটার।

এই অতি-খাতিরের ভিড়ে মাহিরের মনে হলো সম্পর্কের চেয়ে বেশি গুরুত্ব সে এখানে পেয়ে যাচ্ছে। বশির এসে বলল, দেখেছিস কি তোয়াজ করছে? এমন ছেলে পেয়ে মাথা খারাপ হয়ে গেছে। হা হা! মেয়ে দেখেছিস?

মাহির হকচকিত হয়ে বলল, কোন মেয়ে? কার মেয়ে?
-আরে বলদ, আইরিন। যার সাথে বিয়ে রাজিবের। দেখবি না? অতো সুন্দরী না যদিও, চলনসই আর কি!

মাহির বিরক্ত হলো। ছোট ভাইয়ের হবু স্ত্রীর আলোচনা করতে বশিরের আগ্রহের কমতি নেই। সে বলল, না দেখার ইচ্ছে নেই। বিয়ের পর সৌজন্য সাক্ষাৎ হবে। 

-তুই হাবা রয়ে গেলি রে।

মাহির শান্ত দৃষ্টিতে তাকাতেই বশির হেসে বলল, আরে মজা করেছি। কুল কুল!

—————

আফজাল মেম্বারের বাড়ি থেকে মাত্র কয়েকশ গজ দূরেই কনে বাড়ির সীমানা। সন্ধ্যার আবছা অন্ধকারে পুরো বাড়িটা যেন একটা মৌমাছির চাকের মতো গিজগিজ করছে। চারদিকে হ্যারিকেন আর হ্যাজাক লাইটের তীব্র সাদা আলো।

​উঠানের একপাশে বিশাল তিন-চারটি গর্ত করে বানানো হয়েছে মাটির উনুন। সেখানে বড় বড় অ্যালুমিনিয়ামের ডেকচি চড়ানো হয়েছে। নিচে তালের গুঁড়ি আর শুকনো বাঁশের চ্যালা দিয়ে আগুন জ্বালানো হয়েছে। বাবুর্চিরা কাঠের বিশাল খুন্তি দিয়ে পোলাওয়ের চাল নাড়ছে। রাতের রান্না চলছে আর একই সাথে আগামী দিনের মহাভোজের প্রস্তুতি। 

 যখনই ঢাকনা তোলা হচ্ছে তখনই এলাচ, দারুচিনি আর ঘিয়ের সেই সুবাস ছড়িয়ে পড়ছে পুরো পাড়ায়। বারান্দার এক কোণে চার-পাঁচজন মহিলা গোল হয়ে বসে বড় বড় শিল-পাটায় মশলা বাটছেন। সেখানে আদা, রসুন আর শুকনো লঙ্কার সেই ঝাঁঝালো গন্ধ নাকে আসতেই দূরে দাড়িয়ে থাকা মাহিরের হাঁচিতে পাগল হওয়ার মতো অবস্থা।

সে একটু নির্জনতা খুঁজতে লাগল। সূর্য ডোবার সাথে সাথে কুয়াশা এতটাই ঘন হয়েছে যে হাতের টর্চের আলোও কয়েক ফুটের বেশি পথ দেখাচ্ছে না, যেন চারপাশটা সাদা তুলোয় মোড়ানো হয়েছে। ​সে সাবধানে পা ফেলে পেছনের পুকুরপাড়ের দিকে এগোচ্ছিল। হঠাৎ তার কানে এল এক ক্ষীণ সুর। বাঁশঝাড়ের শনশন আওয়াজ আর শীতের রাতের ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক ভেদ করে কেউ একজন যেন খুব নিচু স্বরে গান শুনছে। মাহির কান খাড়া করে শুনল, রবীন্দ্রসংগীত।
​মাঝে মাঝে তব দেখা পাই, চিরকাল কেন পাই না...

​পুরোনো কোনো রেডিওর নব ঘোরালে যেমন হালকা একটা ঝিরঝির শব্দ হয়, সেই যান্ত্রিক শব্দের সাথে ম্লান সুরটা কুয়াশা চিরে ভেসে আসছে। মাহির কৌতূহলী হয়ে সুরটা অনুসরণ করে পুকুরপাড়ের জরাজীর্ণ সিঁড়িতে এসে থমকে দাঁড়াল। কুয়াশার ভেতর দিয়ে সে দেখতে পেল পুকুরঘাটের এক কোণে শ্যাওলাধরা সিঁড়িতে বসে আছে একটি অবয়ব। লাল একটা চাদর জড়ানো মেয়েটি একলা বসে পুকুরের নিথর জলের দিকে তাকিয়ে আছে। রীতিনীতি অমান্য করে এসময়ে কোমড় সমান চুল খুলে রেখেছে।

মাহির টর্চটা জ্বালাল না। বরং অন্ধকারের সাথে চোখ সয়ে আসতেই দেখল, ঘাটের একদম শেষ ধাপে একটা নিভু নিভু হ্যারিকেন রাখা। হ্যারিকেনের চিমনিটা কুয়াশায় ঝাপসা হয়ে আছে, তাই আলোটা চারদিকে না ছড়িয়ে শুধু নিচের এক চিলতে জায়গাকে আলোকিত করছে।
মন্ত্রমুগ্ধ ​মাহির ঘাটের ওপরের ধাপে এসে থামল। ঠিক এই স্থান থেকে সে দেখল, হ্যারিকেনের সেই ম্লান হলুদ আলোটা পুকুরের স্থির কালো জলের ওপর আছড়ে পড়ছে। পুকুরের ওই অংশটুকু কুয়াশার চাদরের নিচেও একটা মসৃণ কালো কাঁচের মতো স্থির হয়ে আছে। সেখানে সে দেখতে পেল একটি সাদা প্রতিচ্ছবি। চাদর মুড়ি দেওয়া একটি মেয়ের অস্পষ্ট অবয়ব জলে কাঁপছে। সরাসরি মেয়েটিকে দেখার আগেই সেই প্রকম্পিত প্রতিচ্ছবিটা মাহিরকে এক মুহূর্তের জন্য স্থবির করে দিল।

​সে কৌতূহলে আচ্ছন্ন হয়ে স্বভাবের সম্পূর্ণ বিপরীতে গিয়ে আরেক ধাপ নিচে নামতেই তার পায়ের নিচে একটা শুকনো ডাল মড়াত করে ভেঙে গেল।

​জলের সেই প্রতিচ্ছবিটা মুহূর্তেই চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে গেল। মেয়েটি দ্রুত মাথা ঘুরিয়ে ওপরের দিকে তাকাল। মাহির এবার সরাসরি তাকে দেখল। হ্যারিকেনের আলো নিচ থেকে তার চিবুক আর গালে এসে লাগছে। মেয়েটি চুড়ান্ত বিরক্ত হলো আর মাহির হলো বিব্রত। 
মেয়েটি বোধহয় রেগেই জল থেকে পা তুলে উঠে দাড়াল। শব্দ করে রেডিও বন্ধ করে দিল।

বাকিটা রাত মাহির এই ক্ষনিকের সাক্ষাৎ চিন্তা করতে করতে একদম ঘুমোতে পারল না।
·
·
·
চলবে……………………………………………………

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

WhatsApp