সাবলেট - পর্ব ১২ - কয়েস সামী - ধারাবাহিক গল্প

          টেম্প জবের প্রথম দিনটা যতটা ভালো হওয়া সম্ভব, ততটাই ভালো গেল। মানে— আমার কাজটা তো দেখছি মূলত ফাইল সাজানো, রিপোর্ট তৈরি আর ডেটা এন্ট্রি করা… এ-ও সেই লোকদের জন্য যারা আমার চেয়ে পাঁচ বছরের জুনিয়র।

সারাদিন অফিসে মাথা গুঁজে কাজ করার পর আমি ঠিক করলাম, বাস থেকে একটু আগেই নেমে শেষ এক কিলোমিটার হেঁটেই বাড়ি ফিরব। ধানমন্ডি লেকের পাড়ে একটু হাঁটলে ভালো লাগত— কিন্তু ফরমাল পোশাক আর জুতা পরে সেটা সম্ভব না। তাছাড়া গরমটাও একটু কমেছে। বিকেলের আবহাওয়াটা বেশ মনোরম। ধানমন্ডির রাস্তাগুলো অবশ্য আমার ভার্সিটি লাইফের মতো এতটা রঙিন না, তবু হাঁটাটা মাথা হালকা করে দেয়। হাঁটা শুরু করতেই মুড এত ভালো হয়ে গেল যে ফুটপাতে বসা এক ভিক্ষুককে দশ টাকার একটা নোট দিয়ে দিলাম।

হাঁটতে হাঁটতে প্রায় পনেরো মিনিট যাওয়ার পর খেয়াল হলো, আমি তো ‘ক্যাফে ম্যাঙ্গো’-র একেবারে কাছাকাছি চলে এসেছি। তানজিনা তো এখানেই কাজ করে। বেশি ভাবার আগেই আমি রিকশার জট এড়িয়ে ক্যাফেটার দিকে এগোতে থাকলাম। সাড়ে পাঁচটা বাজে। মানে ক্যাফেতে খুব বেশি ভিড় হবে না। তানজিনার সাথে দু’মিনিট কথা বলতে চাইলে এটাই পারফেক্ট সময়।

ক্যাফে ম্যাঙ্গো ঢাকার অনেক কফি শপের মতোই—ছিমছাম ডেকোরেশন, একপাশে কাঁচের দেয়াল, ভেতরে এসি চলছে। বাতাসে কফি আর পেস্ট্রির গন্ধ মৌ মৌ করছে। কাউন্টারের ওপরের মেনু বোর্ডে—ক্যাপুচিনো আর তার পাশে চিজকেক আর মাফিনের কথা লেখা আছে। কিন্তু স্পষ্ট জানি যে, এখানে বেশির ভাগ মানুষ আসে আড্ডা দিতে আর ফ্রি ওয়াইফাই চালাতে!

আমি ক্যাফেতে ঢুকে চোখ বুলিয়ে তানজিনাকে কাউন্টারের ভেতরে খুঁজে পেলাম । সে ক্যাফের ইউনিফর্ম— একটা কালো অ্যাপ্রন আর সাদা শার্ট পরে আছে, বুকের ওপর ক্যাফের লোগো— চুলটা গুছিয়ে একটা সাদামাটা খোঁপা করেছে।

অর দিকে তাকাতেই আমাকে দেখে ফেলল। আর সাথে সাথেই তার মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল। হাসিমুখে হাত নেড়ে আমাকে ইশারা করল। তারপর তাড়াতাড়ি কাউন্টারের এক কোণায় আমার কাছে চলে এল। ও যে আমাকে দেখে এতটা খুশি হবে ভাবিনি।

“আহসান ভাই!”

“হেই, তানজিনা।”

সে হাত তুলে আমাকে সালাম দিল। আমি মাথা নুইয়ে সালাম গ্রহণ করলাম। 

“কেমন আছেন?” সে জিজ্ঞেস করল। “অফিসের প্রথম দিন কেমন গেল?”

“খুব খারাপ না।”

আমি হাতের হাতা গুটিয়ে কনুইয়ের নিচে চুলকালাম। দিনের শেষের দিকে হঠাৎ আবার চুলকানি শুরু হল কেন বুঝলাম না। ঠিক এমন করেই চুলকেছিল সেদিন জাহিদদের বাসায় যাবার পর। শার্টের কাপড়ে থেকে কি এলার্জি শুরু হল? এমন হয় নাকি? নাকি টেনশন? গত কয়েক মাসে টেনশন তো কম যায়নি।

“আপনি দারুণ করবেন,” তানজিনা বলল। ও এখন আমার অনেক কাছে চলে এসেছে। “আপনার ওপর আমার আস্থা আছে।”

“আহ… থ্যাংকস।”

সে ক্যাফের ভেতরের দিকে তাকাল। কাস্টমার তেমন একটা নেই। “দেখছেন তো, এখন একদম ফাঁকা। আপনি কি বসবেন? আমাদের ব্লুবেরি চিজকেক রীতিমতো অসাধারণ খেতে!”

“আসলে,” আমি বললাম, “আমি তোমার সাথে এক মিনিট কথা বলতে চাই। ঠিক আছে?”

“অবশ্যই।” সে কপাল কুঁচকে ফেলল। ওকে হঠাৎ করে বেশ চিন্তিত লাগছে। “সব ঠিক আছে তো ভাইয়া?”

“হ্যাঁ।” আমি একটু থেমে গেলাম। ও ডিউটিতে আছে, এখন এসব কথা তোলা ঠিক হবে তো? কিন্তু আমি তো এসেই পড়েছি, তাই বলেই ফেলি। “মানে… না, পুরোপুরি ঠিক না। দেখো, আমি যখন বলেছিলাম তুমি আমাদের জিনিস ব্যবহার করতে পারো—শ্যাম্পু, সাবান, কর্নফ্লেক্স…”

সে চোখ সরু করে একটুখানি দূরে সরে গেল। “হুম…”

“আমি আসলে মনে করি না আমাদের পার্সোনাল জিনিসপত্র আর শেয়ার করা উচিত,” আমি বললাম। “তুমি যে সবকিছু শেষ করে ফেলবে— এটা আমি ভাবিনি। সত্যি বলতে আমি একটু শকড। আমার মনে হয়, এখন থেকে সবকিছু আলাদা করে রাখাই ভালো।”

তানজিনা চোখ পিটপিট করল। “আপনি আমার কাজের জায়গায় এসে আমাকে ডিস্টার্ব করে এটা বলতে এসেছেন?”

আমি আবার হাত চুলকালাম। “আসলে বিষয়টা মাথায় ঘুরছিল, আর এদিক দিয়েই যাচ্ছিলাম।”

“ওয়েল,” সে কড়া গলায় বলল, “ভালোই হলো—আপনি মনের কথা বলে হালকা হলেন।”

যতটা আশা করেছিলাম, সে ততটা সহজভাবে নিচ্ছে না। এখন বুঝতে পারছি, ওর কাজের জায়গায় এসে তুচ্ছ বিষয় নিয়ে কমপ্লেইন করা সত্যি সত্যি বাজে কাজ হয়েছে। তবে আমারও একটা যুক্তি আছে— ও প্রায়ই ডাবল শিফট করে বা ভার্সিটিতে যায়, তাই এটা জানা আমার পক্ষে সম্ভব না যে ও কখন বাসায় ফিরবে। আর তাছাড়া নিজের ঘরের ভেতর এসব সাংসারিক ক্যাচাল শুরু করতে চাইনি।

“শোনো,” আমি বললাম, “হয়তো সহজ হবে যদি আমরা আমাদের জিনিসগুলোতে নাম লিখে লেবেল লাগিয়ে রাখি।"

“আপনার কর্নফ্লেক্সে লেবেল লাগানোর দরকার নেই, আহসান ভাই।” সে ঠোঁট উল্টে বলল। “আমি আর ওসব ছুঁব না। কথা দিলাম।”

“আমি শুধু বলছি, আলাদা লেবেল থাকলে ঝামেলা হয় না,” আমি পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করলাম। “মানে, তুমি তো আমাদের বাসায় সাবলেট থাকো। এমন তো না আমরা ক্লোজ ফ্রেন্ড বা রিলেটিভ…”

তানজিনা মাথাটা একটু পেছনের দিকে ঝাকাল, যেন আমি ওকে থাপ্পড় মেরেছি। সে হাতের নোটপ্যাডটা কাউন্টারে রাখল। এক মুহূর্তের জন্য সত্যিই মনে হলো সে রেগে কিছু একটা করে বসবে। তারপর সে একটা গভীর শ্বাস নিল।

“আপনি ঠিক বলেছেন,” সে ধীরে বলল। “আমরা বন্ধু বা আত্মীয় না। ভালো পয়েন্ট।”

আমি ভালো উদ্দেশ্য নিয়ে এসেছিলাম, কিন্তু কথাটা একদম তালগোল পাকিয়ে ফেলেছি। কী বললে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে এখন? মাথায় কিছু আসছে না। ঠিক তখনই ক্যাফের দরজা দিয়ে একদল কলেজ স্টুডেন্ট হইচই করতে করতে ঢুকে পড়ল।

“এক্সকিউজ মি,” তানজিনা বলল। কণ্ঠ হিম শীতল । “আমাকে কাস্টমার দেখতে হবে।”

চমৎকার! পুরো ব্যাপারটা একটা ডিজাস্টার হয়ে গেল। তবে এর উল্টো দিকও আছে৷ যা বলার ছিল, আমি বলে ফেলেছি। তানজিনা হয়তো অপমানিত হয়েছে। কিন্তু এটাও তো সত্যি যে, ও আমার বন্ধু না।ও শুধু একটা মেয়ে, যাকে আমরা একটা রুম ভাড়া দিয়েছি। আর আমি আবার নিজের পায়ে দাঁড়ালে, ওকে চলে যেতে বলব। 

যাই হোক, আজ রাতে আমার চাকরির প্রথম দিন ‘সেলিব্রেশন’ করতে ও যে পিয়ানো কেক নিয়ে বাড়ি ফিরবে বলেছিল— সে আশা আর নেই।
·
·
·
চলবে……………………………………………………

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

WhatsApp