সাবলেট - পর্ব ১৩ - কয়েস সামী - ধারাবাহিক গল্প

নাবিলা আর আমি সোফায় গা ঘেঁষাঘেঁষি করে বসে সিনেমা দেখছি।

নতুন কাজে জয়েন করার পর থেকে গত এক সপ্তাহে ও আমার প্রতি বেশ... ভালোবাসা দেখাচ্ছে। আমার বর্তমান কাজটা আসলে কম বেতনের জুনিয়র এক্সিকিউটিভের মতোই। তাতে অবশ্য কিছু যায় আসে না। অন্তত আমি এখন বেকার না, টাকা রোজগার করছি। আর এইচআর বলেছে, আমি ভালো পারফর্ম করলে এই পজিশনটা পার্মানেন্টও হয়ে যেতে পারে।

আজ সোফায় জড়িয়ে বসার জন্য আবহাওয়াটাও একদম পারফেক্ট। বাইরে ঝুম বৃষ্টি হচ্ছে, হঠাৎ বিদ্যুতের ঝলকানিতে ঘরটা আলোকিত হয়ে উঠল, তারপরই বিকট একটা বাজ পড়ার শব্দ। শব্দটা শুনে নাবিলা আরো গুটিসুটি মেরে আমার বুকের সাথে লেপ্টে গেল। আমি ওকে আরো শক্ত করে জড়িয়ে ধরলাম (লেভেল নাইন)। সে মুখ তুলে আমার দিকে তাকাল, টিভির আলোয় ওর ঠোঁট চকচক করছে। সিনেমা অর্ধেকও হয়নি, তবু আমি ঝুঁকে ওকে চুমু খেলাম।

“তোমার গা থেকে খুব সুন্দর গন্ধ আসছে, আহসান,” সে আমার কানে ফিসফিস করে বলল।

আমার গা থেকে এখন আমার নিজের কেনা মেনস বডিওয়াশের গন্ধ আসছে— তানজিনা আগের বডিওয়াশটা শেষ করে ফেলার পর যেটা আমাকে নতুন করে কিনতে হয়েছে। যতদূর দেখেছি, সে এরপর আর আমার কিছু ব্যবহার করেনি। ও নিজে একটা আলাদা বোতল কিনেছে। 

“তোমার গায়ের গন্ধ থেকে মিষ্টি আর কোনো গন্ধ হতে পারে না,” আমি ফিসফিস করে বললাম।

আমি আবারও নাবিলাকে চুমু খেলাম— এবার একটু গভীরভাবে। সোফার কুশনের ওপর ওকে আলতো করে শুইয়ে দিলাম, ওর আঙুল আমার পিঠের শার্ট খামচে ধরল। আমার হাত ও জায়গা মতো পৌঁছে গেল... উত্তেজনার পারদ যখন চরমে, ঠিক তখনই সামনের দরজার তালা খোলার খটখট শব্দ পেলাম— আর আমি ছিটকে নাবিলার ওপর থেকে সরে গেলাম।

ধুর ছাই! ফ্যামিলি বাসায় এই সাবলেট থাকার ব্যাপারটা আমি একদম সহ্য করতে পারি না। মনে হচ্ছে আমার যেন টিনএজার— গার্লফ্রেন্ডের বাবা-মা বাইরে থাকায় লুকিয়ে একটু রোমান্স করার চেষ্টা করছি... কিন্তু ব্যাপারটা মোটেও রোমাঞ্চকর না, বরং বিরক্তিকর।

যা ভেবেছি তাই। করিডরে তানজিনা দাঁড়িয়ে— দরজার বাইরের ম্যাটে জুতা ঘষে কাদা পরিষ্কার করছে। তারপর হাতের ভেজা ছাতাটা ভাঁজ করতে করতে একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল। এমন একটা ভাব— যেন এখনই সিঁড়ি বেয়ে নিজের ঘরে উঠে যেতে পারলেই বাঁচে।

এক মিনিট পর তানজিনা ড্রয়িংরুমে ঢুকল। ছাতা হাতে থাকা সত্ত্বেও বৃষ্টিতে ভিজে একাকার হয়ে গেছে। চুলগুলো মাথার সাথে লেপটে আছে। মুখে মেকআপ থাকলে নিশ্চয়ই এতক্ষণে গলে গলে পড়ত। চরম অস্বস্তি নিয়ে ও বসে থাকা আমাদের দুজনের দিকে তাকাল।

“আমি কি কোনো সিন ইন্টারাপ্ট করলাম?” সে খোঁচা দিয়ে বলল। তবে চোখে এক ফোঁটা হাসিও নেই।

ক্যাফেতে গিয়ে আমি যে কথা বলেছিলাম, তারপর থেকে তানজিনার সাথে আমার সম্পর্ক একদম তলানিতে ঠেকেছে। আমার সাথে প্রায় কথাই বলে না, আর বললেও গলায় স্পষ্ট তিক্ততা থাকে।

“আমরা তো শুধু মুভি দেখছিলাম,” নাবিলা বলে উঠল। আমাদের মধ্যে যে টানটান উত্তেজনা কাজ করছিল, বেচারি ওকে সেটা বুঝতেই দিচ্ছে না। “পপকর্ন খাবে? মাত্র বানিয়েছি।”

“ওহ না,” তানজিনার কণ্ঠে বিদ্রুপ। “সব পপকর্ন শেষ করে ফেলার সাহস আমার নেই।”

নাবিলা কিন্তু ওর কথার পেছনের খোঁচাটা ধরতে পারল না। “আরে চিন্তা করো না! যা ইচ্ছা নাও, অনেক আছে।”

তানজিনা উত্তরই দিল না। সে ঘুরে কিচেনের দিকে চলে গেল। পরমুহূর্তে মাইক্রোওয়েভ ওভেনের ঘুরঘুর শব্দ শুনতে পেলাম। নিশ্চয়ই রাতের খাবার গরম করছে।

আমি নাবিলার হাতটা আলতো করে চাপ দিলাম। “তুমি মুভি দেখতে থাক। আমি একটু পানি খেয়ে আসছি, ঠিক আছে?” 
“ঠিক আছে। তাড়াতাড়ি এসো।”

টি-টেবিল থেকে আমার গ্লাসটা তুলে নিলাম— যদিও সেটা অর্ধেক ভর্তি আছে। আমার আসলে পানি লাগবে না। কিন্তু কিচেনে গিয়ে তানজিনা হকের সাথে একা একটু কথা বলার দরকার আছে।

ওখানে গিয়ে দেখি, তানজিনা মাইক্রোওয়েভের দিকে তাকিয়ে আছে— একটা প্লাস্টিকের বক্স ভেতরে ধীরে ধীরে ঘুরছে। নিশ্চয়ই ক্যাফে থেকে বা বাইরে থেকে নিয়ে এসেছে। ওর কানের পাশে একটা মাছি ভনভন করছে, সে হাত নেড়ে ওটা তাড়াল— আমার দিকে তাকালও না।

“এক মিনিটের ভেতর চলে যাচ্ছি,” সে বলল। “তারপর আপনি আর নাবিলা ভাবি সোফায় আপনাদের রোমান্স কন্টিনিউ করতে পারবেন।”

“আমরা তো...”

“আমি বাচ্চা না, ভাইয়া।”

আমি এখানে এসেছিলাম পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে। কিন্তু এখন আমার ইচ্ছে করছে ওর দিকে কিছু একটা ছুঁড়ে মারি। “তো আমরা রোমান্স করলে তোমার সমস্যা কী? এটা আমার ফ্ল্যাট, তানজিনা। তুমি তো শুধু একটা রুম ভাড়া নিয়েছ।”

“হ্যাঁ।” সে ঠোঁট বাঁকাল। “সেটা আপনি খুব ভালো করেই বুঝিয়ে দিয়েছেন। চিন্তা করবেন না— আমি আপনাদের টিভিও ব্যবহার করব না, বিশেষ করে আগে পারমিশন না নিয়ে।”

আল্লাহ! ও এত রিয়েক্ট করছে কেন? “দেখো, তানজিনা,” আমি দীর্ঘশ্বাস ফেললাম। “আমাদের বেস্ট ফ্রেন্ড হতে হবে— এমন কোনো কথা নেই। কিন্তু তুমি এখানে থাকলে অন্তত আমাদের সাথে মিলেমিশে থাকতে হবে। আমি যদি এমন কিছু করে থাকি যাতে তুমি হার্ট হয়েছ...”

“যদি?” সে নাক সিঁটকালো। “আপনি কি সত্যিই এতটা ন্যাকা?”

“আমি দুঃখিত,” আমি মৃদু কণ্ঠে বললাম। “সত্যি সত্যি সরি। আর... হয়তো আমরা নতুন করে শুরু করতে পারি।”

ঠিক তখন মাইক্রোওয়েভ ‘ডিং’ করে উঠল। তানজিনা বক্সটা বের করল— ভেতরে মনে হলো বার্গার আর ফ্রাই জাতীয় কিছু। ওভেনে গরম করা বার্গার মোটেও লোভনীয় না, কিন্তু তানজিনার তাতে বোধহয় কিছু যায় আসে না।

“আপনার কি মনে আছে,” আমার দিকে ঘুরে দাঁড়িয়ে বলল, “আপনি যখন আপনার নতুন চাকরি নিয়ে টেনশনে ছিলেন, আর আমি আপনাকে সান্ত্বনা দিচ্ছিলাম? বলেছিলাম আপনি ভালো করবেন— কারণ আপনি স্মার্ট, চার্মিং, হ্যান্ডসাম... এসব?”

“আ... হ্যাঁ...”

“ওগুলোর কিছুই সত্যি না।” ওর কঠিন দৃষ্টিতে আমি এক কদম পিছিয়ে গেলাম। “আপনি সফল হবেন— আপনি সফল হয়েছেন— কারণ আপনি আত্মকেন্দ্রিক একটা ছোটলোক। আপনি নিজেকে ‘ভালো মানুষ’ ভাবার অভিনয় করতে ভালোবাসেন। কিন্তু ভেতরে ভেতরে আপনি জানেন— আপনি ভয়ংকর খারাপ একটা মানুষ।”

আমি হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে রইলাম। শুধু শ্যাম্পু ব্যবহার করতে না বলায় ও এতটা ক্ষেপে গেছে? এই মেয়ে তো পুরোই সাইকো। “তানজিনা...”

“আপনার স্ত্রীর সাথে মুভি এনজয় করুন।” সে আমাকে ধাক্কা দিয়ে পাশ কাটিয়ে গেল। “আপনি শুধু দোয়া করেন— ভাবি যেন কোনোদিন আপনার আসল রূপটা ধরতে না পারে। কিন্তু উনার ভালোর জন্য আমি মনেপ্রাণে চাই উনি যেন আপনাকে চিনতে পারেন।”

আমি কিচেনেই দাঁড়িয়ে থেকে নিজেকে সামলে নিতে চেষ্টা করলাম। তানজিনার পায়ের শব্দ সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠে গেল, তারপর শুনতে পেলাম ধাম করে দরজা বন্ধ হওয়ার শব্দ।

এটা কী হলো? ঠিক আছে, স্বীকার করছি, ক্যাফেতে গিয়ে ওর কলিগদের সামনে কথা শোনানোটা খুব একটা ভদ্র কাজ ছিল না। কিন্তু তাই বলে এমন অপমান?

আমি কোনো ছোটলোক না। হ্যাঁ, কর্পোরেট লাইফে টিকে থাকার জন্য জীবনে দু-একটা কঠোর সিদ্ধান্ত নিয়েছি। বড় পজিশনে যেতে গেলে সবসময় ‘ভালো মানুষ’ সেজে থাকা যায় না। কিন্তু আমার চেয়েও খারাপ মানুষ এই দুনিয়ায় কম নেই।

যাই হোক— এখন থেকে তানজিনার ওপর কড়া নজর রাখতে হবে। মেয়েটা সুবিধার না।
·
·
·
চলবে……………………………………………………

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

WhatsApp