এই টেম্প জবে আমার ‘অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ’ কাজগুলোর একটা হলো— মাসে একবার ব্যাংকে গিয়ে বিদ্যুৎ বিল পরিশোধ করা। অফিসের পাশের জনতা ব্যাংকে গিয়ে লাইনে দাঁড়িয়ে বিল পরিশোধ করা লাগে। আমি বলি, এখন বিদ্যুৎ বিল দেয়ার কত রকমের ডিজিটাল পদ্ধতি আছে। ওগুলোর একটা বেছে নিলেই তো সহজে অফিসে বসে বিল পরিশোধ করা যায়। কিন্তু আমাদের হিসাবরক্ষক হারুন সাহেব বয়স্ক হওয়ায় উনি এসব ডিজিটাল পদ্ধতি বিশ্বাস করেন না। তাই এখনো সেই মান্ধাতার আমলের মতোই ব্যাংকের লাইনে দাঁড়াতে হয় আমাকে। তাও করুনাময়ের অশেষ কৃপা যে, বিদ্যুৎ বিল মাসে মাত্র একবার দিতে হয়। প্রতিদিন দিতে হলে আমার যে কী অবস্থা হতো আল্লাহ মালুম।
লাইনে দাঁড়িয়ে আছি— আমার সামনে ছয়জন। ব্যাংকের এসি মনে হয় নষ্ট। তাই লোকজনের ঘামের গন্ধে দাঁড়িয়ে থাকা আমার পক্ষে অসহ্য হয়ে পড়ছে। তবু বাধ্য হয়ে অন্যমনস্ক হবার চেষ্টা করছি আর হাতের কনুই চুলকাচ্ছি। ওয়াশিং মেশিন ব্যবহার করার আগে ব্লিচ দিয়ে পরিষ্কার করা শুরু করায় র্যাশটা সেরে গিয়েছিল। কিন্তু গত কয়েকদিনে মনে হচ্ছে আবার ফিরে এসেছে। খুব বিরক্ত লাগছে।
তার ওপর রান্নাঘরে এখনো গন্ধ করছে। আগের মতো অসহ্য না হলে পচা খাবারের ভ্যাপসা গন্ধটা এখনও আছে। আর তার সঙ্গে মিশে গেছে নাবিলার রুম ফ্রেশনারের কড়া ফুলের গন্ধ। আমরা ইউটিউব দেখে মাছির জন্য একটা দারুণ ফাঁদ বানিয়েছি— আর ফাঁদটা কাজও করছে; প্লাস্টিকের কাপটা এখন মাছির কবরস্থান। কিন্তু তাও মাছিগুলো কমছে না। চারদিকে এখনও ভনভন করছে।
“আহসান ভাই না? ও মাই গড!”
মেয়ে-কণ্ঠে নিজের নাম শুনতে পেয়ে আঁতকে উঠলাম। এই অবস্থায় লাইনে দাঁড়িয়ে ঘামে ভিজতে ভিজতে চেনা মানুষের সামনে পড়ার কোনো ইচ্ছে আমার ছিল না। তবু ঘুরে তাকালাম।
বাহ! মিথিলা! আমার আগের অফিসের বস ওয়াহিদ স্যারের পিএ। আর ওকে আজও অসম্ভব স্মার্ট দেখাচ্ছে— স্টাইলিশ সালোয়ার কামিজ, হাতে দামী ঘড়ি... ডান হাতে ভাঁজ করা একটা রঙ-বেরঙের ছাতা।
“হাই, মিথিলা।” আমি জোর করে হাসলাম। “কেমন আছো?”
“ভালো!” সে হাসল। ওর দাঁতগুলো ঝকঝকে সাদা। “আর আপনি...”
সে আমার পোশাকের দিকে তাকাল। আমি পিঠ সোজা করলাম। ইশ! চোখের নিচের কালিগুলো ঢাকার কোনো উপায় যদি থাকত!
“আপনাকে দারুণ লাগছে! নতুন চাকরি পেয়েছেন দেখছি।”
“হ্যাঁ।” আমি বললাম না যে এটা টেম্পরারি বা আগের থেকে জুনিয়র পোস্টের জব। ও ফিরে গিয়ে অফিসে আমার অপমানের গল্প শোনাক— এটা আমি চাই না। “সবকিছু ভালোই চলছে।”
“আর নাবিলা ভাবি?” সে ইঙ্গিতপূর্ণ ভঙ্গিতে ভ্রু তুলল। “আপনাদের কি রিসি...?”
“না,” আমি তাড়াতাড়ি বললাম। “এখনো রিসিপশন হয়নি।”
“হুম।” সে মাথা কাত করল। “ সেটাই ভাবছিলাম... মাঝখানে তো অনেক কিছুই হলো।”
“হুম, তবে কিছুই বদলায়নি।”
“যাই হোক,” মিথিলা বলল, “আবার দেখা হয়ে ভালো লাগল, ভাইয়া। ওয়াহিদ স্যার আপনাকে ফায়ার করার পর আমি সত্যি সত্যি আপনার জন্য টেনশনে ছিলাম। কিন্তু আপনি তো দেখছি সব সামলে নিয়েছেন।”
“অবশ্যই,” আমি মিথ্যা করে বললাম বললাম। “আমি ওসব নিয়ে কখনোই চিন্তা করিনি। কারণ আমি সবসময় সবকিছু ম্যানেজ করে নিতে পারি।”
“হুম তা তো জানিই,” সে সম্মতি দিল।
মিথিলা ব্যাংক থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পরই আমি স্বস্তির নিঃশ্বাস ছাড়লাম। আগের কোম্পানির অনেককেই আমি এড়িয়ে চলতে চাই— কিন্তু মিথিলা সেই তালিকার শীর্ষে।
আধা ঘণ্টা পরে রাস্তায় নামতেই একজন বুড়ো লোক হাত পেতে দিল। হাতে একটা থালা। ভিক্ষার থালা। লোকটাকে দেখে বুকটা কেমন জানি করে উঠল। একদিন আমারও কি এই অবস্থা হবে? চাকরিটা সামলে রাখতে না পারলে হলেও হতে পারে। তখন তো নাবিলাও আমাকে ছেড়ে যাবে। হঠাৎ একটা প্রাইভেট কার ক্রসিংয়ে আমাকে প্রায় ধাক্কা দিতে গিয়েও দিল না। ব্রেক কষে দাঁড়িয়ে পড়ল। আমার মনে হলো গাড়িটা আমাকে ধাক্কা দিলেই ভালো করত। আমার সকল কষ্টের শেষ হতো।
কিন্তু কোনো অলৌকিকতায় গাড়িটা থেমে গেল আর আমিও ধীরে ধীরে অফিসে পৌঁছে গেলাম। ভেবেছিলাম এখানে স্থায়ী হওয়ার সম্ভাবনা শেষ। কিন্তু গতকাল মিটিংয়ে বড় একটা ক্লায়েন্ট ডিল নিয়ে আমি নিজের অজান্তেই একটা আইডিয়া বলে ফেলেছিলাম। কথাটা হঠাৎ মুখ ফসকে বেরিয়ে গিয়েছিল। আমার আইডিয়া আর অভিজ্ঞতা দেখে আসিফ বেশ ইমপ্রেসড হয়েছিল। মিটিং শেষে সে আমাকে আরও প্রশ্ন করেছিল— আমার স্ট্র্যাটেজিটা বোঝার জন্য। আমি যদি নিজের দক্ষতা প্রমাণ করতে পারি... হয়তো সত্যিই এখানে আমার চাকরিটা স্থায়ী হয়ে যাবে।
আসিফের চেম্বারে ঢুকলাম। সে ল্যাপটপে কাজ করছে। আমাকে দেখে তাকাল, কিন্তু হাসল না।
“এই নিন স্যার,” আমি বললাম, বিদ্যুৎ বিলের কপিটা ওর ডেস্কের ওপর এগিয়ে দিলাম। চেম্বারটা আমার আগের অফিসের মতো বিশাল না হলেও, আমার বর্তমান ডেস্কের চেয়ে হাজার গুণ ভালো।
“থ্যাংকস।” সে বিলটার দিকে কেমন জানি সন্দেহভরা চোখে তাকাল। “একাউন্টসে বাকি টাকাটা ফেরত দিয়েছ?”
“এখনো দেইনি।”
আসিফ হাসল। নাকি হাসল না? “কত টাকা নিয়ে গিয়েছিলে আর কত টাকা ফেরত আনলে?”
এটা আবার কেমন প্রশ্ন!
আসিফ আমার দিকে তাকিয়ে আছে। ওর চোখের ভাবটা একদম পড়তে পারছি না। আমার অস্বস্তি লাগছে। আমি এক পা থেকে আরেক পায়ে ভর দিলাম। আর হাত চুলকানোর ইচ্ছেটা কোনোমতে দমন করলাম। সে কেন আমাকে বিলের হিসান জিজ্ঞেস করছে?
“কোনো সমস্যা স্যার?” বাধ্য হয়ে কথাটা জিজ্ঞেস করতেই হলো।
সে কিছুক্ষণ আমার দিকে তাকিয়ে থেকে মাথা নাড়ল। “হ্যাঁ, আছে। গতকাল মিটিংয়ে আপনার ইনসাইট দেখে আমি সত্যি ইমপ্রেসড হয়েছিলাম। আর তখনই মনে পড়েছিল আপনার সিভিতে ‘চৌধুরী অ্যান্ড খান’ দেখেছিলাম। আপনি তো আগে ওখানেই কাজ করতেন। তাই আমি ওখানে ফোন করেছিলাম...”
শিট! আমি বুঝে গেলাম কথা কোন দিকে যাচ্ছে। স্থায়ী হওয়ার স্বপ্নটা শেষ হয়ে গেল।
“আমি বিশ্বাসই করতে পারছি না আপনি নিজের কোম্পানিকে ঠকিয়ে এসেছেন।” আসিফ মাথা নাড়ল। “তাই তো আপনার মতো অভিজ্ঞ লোককে এখন এই বয়সে টেম্প হিসেবে কাজ করতে হচ্ছে।”
“আমি কোম্পানিকে ঠকাইনি,” আমি শক্ত গলায় বললাম। “সবটা ভুল বোঝাবুঝি ছিল।”
“ওয়াহিদ সাহেব কিন্তু এটা বলেননি।” আসিফ ঠোঁট বাঁকাল। “আমি বাজি ধরতে পারি, ওই ইনফো লিক করে তুমি ভালোই টাকা কামিয়েছিলে।”
আমি কেঁপে উঠলাম। বুকের চুলকানিটা হঠাৎ খুব বেড়ে গেছে বলে মনে হচ্ছে। কিন্তু চুলকাতে পারছি না। এখন না। “আইনের কথাটা কী স্যার? প্রমাণ না হওয়া পর্যন্ত সবাই নির্দোষ— এটা কি এখন আর খাটে না?”
“ওটা কোর্টে খাটে, আহসান সাহেব।” আসিফ সামনে রাখা কফির মগটা হাতে নিয়ে একটা চুমুক দিল। তারপর মুখ কুঁচকে ফেলল। “কফিটা জঘন্য হয়েছে। আপনি কি নতুন আসা পিয়নটাকে বলে দিননি যে আমি সুগার ফ্রি কফি খাই?”
“বলেছি তো! সুগার দিয়েছে?”
“ভালো করে আসলে বলতেই পারেননি আপনি।” সে কফিটা আমার দিকে ঠেলে দিল। “যান এটা নিয়ে যান। আর ওকে বলুন ভালো করে কফি বানাতে।”
একটা পঁচিশ-তিরিশ বছরের অ্যারোগেন্ট ম্যানেজারের পাওয়ার-ট্রিপের জন্য আমি কফির মগটা নিয়ে যেতে পারি না। এটা পিয়নের কাজ। আমার না। কিন্তু এই চাকরিটা আমি ছাড়তেও পারব না। জবটা ছেড়ে দিলে কী হবে আমি জানি না। আর কবে চাকরি পাব, সেটাও নিশ্চিত না।
“আমি আপনার ওপর নজর রাখছি, আহসান সাহেব।” আসিফ চোখ সরু করে বলল। “আমার কোম্পানি থেকে কিছু চুরি করার চেষ্টা করলে এই শহরে আপনি আর কোনোদিন কাজ পাবেন না। শুধু এই শহরে কেন? এই বাংলাদেশের কোথাও পাবেন না।”
ওর সত্যিই এত ক্ষমতা আছে কি না জানি না। কিন্তু সেটা যাচাই করার ঝুঁকিও আমি নিতে চাই না। তাই মগটা নিয়ে এসে ক্যান্টিনের টেবিলে রেখে দৌড়ে ওয়াশরুমে ঢুকলাম। শার্টের বোতাম খুলে একটানা বুক আঁচড়াতে থাকলাম যতক্ষণ না চামড়া ছিঁড়ে রক্ত বের হলো।
·
·
·
চলবে……………………………………………………