বিকেলের সূর্য হেলে রোদের ধার ম্লান হয়ে এসেছে। আইরিনের দক্ষিণা ঘরের জানালা থেকে দেখা যাওয়া আমগাছটার মগডাল চিরে আসা ছলকে পড়া আলো যখন তাদের উঠানে এসে থমকায়, তখনই পাশের বাড়ির মতি মিঞার বড় ছেলে এসে মাহিরকে এক প্রকার জোর করেই ধরে নিয়ে গেল।
কিছুক্ষণ আগেই মাহির বিশ্রাম নিতে বসেছিল, কিভাবে যেন তার চোখ লেগে যায়। মেয়েলি ঘরটায় মাহিরের অভ্যস্ত হতে সময় লেগেছে। পুরো ঘরটাতেই আইরিন নামের মেয়েটার নিঃশব্দ বিচরণ।
মাহির নিজের ঘরটার কথা চিন্তা করে। আদৌ নারী বাসের উপযুক্ত সেটা? কতকিছু বদলাতে হবে! পরিবর্তনগুলো মোটেই সহজ হবে না। এক মুহূর্তে কিভাবে তার প্ল্যানড লাইফটা এলোমেলো হয়ে গেল। একান্তে বসে যে দুদণ্ড চিন্তা করে বাড়িতে সব সহজ করার উপায় বের করবে সে সুযোগ নেই।
দু'মিনিট পরপর তাকে এটা-ওটা খাওয়ানোর প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে। ছোট থেকে বড় থেকে বৃদ্ধ কেউই বাদ যাচ্ছে না। দূরের প্রতিবেশীরাও এসে আইরিনের জামাই দেখে গেছে। তাদের চোখে বিস্ময় ও করুণা। বিস্ময় আইরিনের বর ভাগ্য দেখে আর করুণাটা কি তবে মাহিরের স্ত্রী ভাগ্য দেখে!
আইরিন নামের মেয়েটাকে সবাই খুব একটা পছন্দ যে করে না, তা বুঝতে মাহিরের সময় লাগে না। অবশ্য তা অস্বাভাবিক না। তার নবপরিণীতার মধ্যে সূক্ষ্ম বিদ্রোহভাব প্রবল। সে মাথা ঠান্ডা রেখে কথার তোপেই প্রতিপক্ষকে কুপোকাত করে দেয়। সোজা কথার সহজ উত্তর তার থেকে পাওয়া বিরল। তাই হয়তো পিতৃ স্নেহও তেমন কপালে নেই। মাহিরের শাশুড়ি ভদ্রমহিলা জানপ্রাণ দিয়ে মেয়ের গুণগান জামাতার সামনে করে যাচ্ছেন। এসবে মাহিরের শঙ্কা আরো দৃঢ় হলো। কঠিন রমণীর সাথে দাম্পত্যে বাঁধা পড়েছে সে!
এরমধ্যে নিশিখালি গ্রামের মানুষের আতিথেয়তা যেন মাহিরের জন্য এখন এক মধুর যন্ত্রণায় পরিণত হয়েছে। না বলা যায় না, আবার সইতেও কষ্ট হয়।
মতি মিঞার বাড়িতে শীতল পাটি বিছিয়ে খাবারের যে বাহারি আয়োজন সাজানো হয়েছে, তা দেখে মাহিরের কপালে দুশ্চিন্তার বিন্দু বিন্দু ঘাম জমতে শুরু করল। মাটির চওড়া বাসনে ধোঁয়া ওঠা আতপ চালের রুটি, রাজহাঁসের মাংসের কষা ভুনা আর তার ওপর ঘিয়ের এক পুরু আস্তরণ! সব মিলিয়ে দৃশ্যটা ভোজনরসিকের জন্য স্বর্গ হতে পারে, কিন্তু মাহিরের জন্য এই মুহূর্তে তা এক মূর্তিমান আতঙ্ক। পাশে মাটির সরায় ঘন করে জ্বাল দেওয়া নতুন গুড়ের পায়েস থেকে খেজুর গুড়ের এক তীব্র মিষ্টি ঘ্রাণ বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছে।
মতি মিঞা খুব উৎসাহ নিয়ে বললেন, জামাই বাবা, নিশিখালির রাজহাঁস আর চালের রুটি না খাইলে কি শীত চলে? একটুখানি মুখে দিয়া দেখেন, খোদ ঢাকা শহরেও এই স্বাদ খুঁজে পাবেন না।
মাহির অসহায় চোখে খাবারের এই পাহাড়ের দিকে তাকাল। তার মস্তিষ্ক বারংবার দুপুরের সেই রাজকীয় ভোজের কথা মনে করিয়ে দিচ্ছে। ডাইনিং টেবিলে কুলসুম বেগমের সেই জোর করে পাতে তুলে দেওয়া পোলাও মাংসের কথা মনে পড়তেই তার পেটটা যেন এক অসহ্য ভারে কুঁকড়ে গেল। দুপুরেই সে এতটা পেট পুরে খেয়েছিল যে, নিশ্বাস নেওয়াটাও কঠিন হয়ে পড়েছিল। আর এখন এই বিকেলের গুরুপাক খাবারগুলো সেই ভারের ওপর শেষ পেরেক ঠুকতে এসেছে।
সে বিনীতভাবে আমতা আমতা করে বলল, চাচা দুপুরে যা খেয়েছি, বিশ্বাস করেন এখনও গলার কাছে সব আটকে আছে। আপনারাই আনন্দ করে খান, আমি বরং একটু বসে আপনাদের গল্প শুনি।
কিন্তু মতি মিঞা নাছোড়বান্দা, তিনি রফিক সরকারের প্রিয় পাত্র হতে চান। তিনি অতিরিক্ত আহ্লাদ দেখিয়ে এক টুকরো নরম রুটি ছিঁড়ে ঝোলে টুবটুব করা মাংসের টুকরোসহ মাহিরের দিকে এগিয়ে দিলেন, আরে না না! মেহমানের প্লেট খালি থাকলে তো গৃহস্থের অমঙ্গল হয় বাবা। মানা করবেন না, অল্প একটুখানি মুখে দিয়ে আমাদের মান রাখেন।
এক কোণে আইরিন দাঁড়িয়ে ছিল। সে মাহিরের পেছন পেছনই এসেছে, হয়তো তার এই বিব্রত দশা উপভোগ করতেই। মাহিরের এই না বলতে না-পারা আর অনুরোধের চাপে পিষ্ট হওয়া দশা দেখে আইরিনের চোখে সেই পরিচিত বিদ্রূপ ফুটে উঠল। সে মাহিরের খুব কাছে ঝুঁকে নিচু স্বরে, কিন্তু স্পষ্ট গলায় ফিসফাস করে বলল,
বোধহয় এখনও শক্ত করে না বলতে শেখোনি। দুপুরে তো অনুরোধে ঢেঁকি গেলা দেখলাম। এখন কি মতি চাচার হাঁসকেও সম্মান দিয়ে নিজের হজমশক্তিকে চিরবিদায় জানাবে? নাকি আবারও সেই ভদ্রতা করবে?
মাহির আড়চোখে আইরিনের দিকে তাকাল। মেয়েটার ঠোঁটের কোণে সেই সূক্ষ্ম অথচ ধারালো হাসির রেখা। আইরিনের এই তাচ্ছিল্য মাহিরের ভেতরে হঠাতই এক ধরণের জেদ উসকে দিল। সে মতি মিঞার বাড়িয়ে দেওয়া রুটির টুকরোটা হাত বাড়িয়ে নিয়ে মুখে দিল,
দারুণ হয়েছে চাচা। তবে এর বেশি এক তিলও আর আমার পেটে যাবে না। শরীরটা ঠিক সায় দিচ্ছে না আমার।
মাহিরের গলার স্বরে এমন এক দৃঢ়তা ছিল যে মতি মিঞা আর দ্বিতীয়বার চাপ দেওয়ার সাহস পেলেন না।
বাড়ি ফেরার পথে মাহির গুমট স্বরে জবাব দিল, শিষ্টাচার আর দুর্বলতা এক জিনিস নয়।
-শি-ষ্টা-চা-র। শব্দটা বেশ ভারী।
-আমি কিন্তু সকালের বৈঠকঘরের কথার কোনো জবাব পাইনি। সিরিয়াসলি না নেওয়ার মতো বিষয়ও এটা না।
-সুটকেস বের করে গোছানো হচ্ছে দেখো নি? আমাকে যেভাবেই হোক তোমার সাথে পাঠাবেই। আমায় রেখে তোমাকে যেতে দিতে সে আশা রেখো না। আনলেস তুমি পালাচ্ছো।
মাহির বিরক্ত হয়ে বলল, উদ্ভট কথাবার্তা একদম বন্ধ। কে আমাকে কি করবে তা শুনতে চাচ্ছি না। আপনার মতামত কোথায়? আপনাকে যা করতে বলা হয় তাই করেন নাকি? তারা পাঠালেই আপনি বিনাবাক্যে সাথে চলবেন?
-তিন কবুল বলেছি। তাইতো হওয়ার কথা। সংসার করতেই হতো, তা করবো। কোনো সমস্যা তো দেখছি না।
তার এমন ধারার কথাবার্তা মাহিরের পছন্দ হলো না, কিন্তু সে বাস্তবসম্মত কথায় কোনো দোষ ও খুঁজে পেল না।
বাড়ির উঠানে পা রাখতে সে দেখল, তার জন্য দলবল নিয়ে বিপদ অপেক্ষা করছে। কাসিফ, কামিনী, জুমা আর তাহেরাদের ছোট এক দল আগে থেকেই ওঁত পেতে ছিল। সকালবেলা দুলাভাইকে না পেয়ে তারা হতাশ হয়েছিল। মাহিরকে দেখামাত্রই তারা একযোগে ঘিরে ধরল। সবার চোখেমুখে জেদ আর অদম্য আনন্দের ঝিলিক।
কাসিফ মাহিরের পাঞ্জাবির হাতা ধরে হ্যাঁচকা টান দিয়ে বলল, দুলাভাই এখন ঘরে যাওয়ার কথা মুখেও আনবেন না। এখন আমাদের সাথে আসতে হবে। নিশিখালির তো আপনি এখনও কিছুই দেখেন নাই। ওই যে কপতী নদীর তীর, ওইটা দেইখা আসতে হবে।
জুমা সায় দিয়ে বলল, হ্যাঁ দুলাভাই বিকেলের মিঠে রোদে দেখতে সবচেয়ে সুন্দর লাগে।
মাহির হতাশ চোখে আইরিনের দিকে তাকাল। সে মনে মনে প্রার্থনা করছিল আইরিন হয়তো এই ছোটদের হাত থেকে তাকে উদ্ধার করার কোনো উপায় বের করবে। কিন্তু আইরিন তখন বাড়ির বারান্দার পিলারে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে নিজের গায়ের নীল শাড়ির আঁচলটা খুব নিপুণ হাতে ঠিক করছিল। মাহিরের সেই করুণ জিজ্ঞাসু দৃষ্টি দেখে সে ভ্রু জোড়া কিছুটা কুঁচকে নিল।
আইরিন খুব নির্লিপ্ত গলায় বলল, আমাকে দেখে উদ্ধার পাওয়ার আশা কোরো না। এই বিচ্ছুদের পাল্লায় যখন একবার পড়েছ তখন নিস্তার পাওয়া প্রায় অসম্ভব। যাও দুলাভাই ধর্ম পালন করো। এই শাড়ি সামলে মেঠো পথে আমার পক্ষে ঘুরে বেড়ানো সম্ভব না। আমি একদমই ইন্টারেস্টেড নই।
মাহির ভ্রু কুঁচকে বলল, আসলেই যাবেন না?
আইরিন মাহিরের চোখের দিকে সোজা তাকিয়ে বলল, আমার কাছে নিশিখালি নতুন কিছু নয়। এই পথ মাড়িয়েই আমি বড় হয়েছি। আর এই সময়ে ভারী শাড়ি পরে বিলের ধারে ঘোরার মতো বিলাসিতা করার ইচ্ছে আমার নেই। তুমি যাও।
কাসিফ এবার আরও জেদ ধরল, আপা না গেলে নাই, দুলাভাই চলেন। আমরাই আপনাকে পুরো গ্রাম ঘুরিয়ে দেখাব।
মাহির বুঝতে পারল আইরিন সাফ জানিয়ে দিয়েছে সে সঙ্গী হবে না। সে মাহিরকে একাই এই ছোটদের দলের মুখে ছুড়ে দিতে চায়। আইরিনের ওই অনমনীয় অনাগ্রহর কথা শোনার পর মাহির আর তাকে দ্বিতীয়বার বলল না। অগত্যা সে কাসিফদের সেই চঞ্চল দলের সাথে মেঠো পথের দিকে পা বাড়াল।
পেছন থেকে আইরিনের গম্ভীর কণ্ঠস্বর ভেসে এল, বেশি দূরে যেও না। আলো যাওয়ার আগেই ফিরে এসো।
মাহির একবার পেছন ফিরে তাকাল। দেখল, আইরিন নির্নিমেষ চোখে তার চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে আছে। হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা নীল শাড়ির ওই মানবীকে বড় রহস্যময়ী দেখায়।
—————
নিশিখালি শীতের শেষ বিকেলের আলোয় এক জীবন্ত জলরঙের ছবি। মেঠোপথ ধরে হাঁটতে হাঁটতে ওরা প্রথমে পৌঁছাল বিশাল এক বাঁশঝাড়ের নিচে। ঝিরঝিরে বাতাসে বাঁশপাতার মর্মর শব্দ আর ঘন পাতার ফাঁক গলে চুঁইয়ে আসা মিঠে রোদ মাটিতে লুকোচুরি খেলছে। বাঁশঝাড় পেরিয়ে ওরা যখন কপতী নদীর পাড়ে গিয়ে দাঁড়াল।
মাহির মন্ত্রমুগ্ধের মতো চেয়ে রইল। নদীটা খুব শান্ত আর স্বচ্ছ। পৌষের রোদে নদীর পানি রূপালি আয়নার মতো চকচক করছে। পাড় ঘেঁষে তামাটে বর্ণ ধারণ করা কাশফুলগুলো অলসভাবে দুলছে। দূরে নদীর নীল জলরাশির বুকে দুই-একটা ছোট ডিঙি নৌকা ভেসে যাচ্ছে। মাঝিদের দূর থেকে ভেসে আসা গান আর হিমেল হাওয়া মাহিরের বিকেলের ক্লান্তিটুকু যেন এক নিমেষেই কেড়ে নিল। নদীর ওপাড়ে ঘন সবুজ বনরেখা আর অন্যপাশে ধুধু বালুচর।
হরেকরকম গল্পের মাঝে মাহির কাসিফকে জিজ্ঞেস করল, তোমাদের আপা কি এসব জায়গায় বেশি আসে?
কাসিফ মাথা নেড়ে বলল, হ্যাঁ, আপা তো সুযোগ পাইলেই নদীর ঘাটে আইসা বসে থাকে। সারাদিন তো বাইরেই কাটাতো। আম্মা কত বকা দিত, কিন্তু কাজ হইত না।
তাহেরা বলল, আইরিন আপার প্রিয় জায়গা এই নদীর পাড়ই। গ্রামের কোনো জায়গা তার অদেখা নাই।
নদীর পাড় ধরে হাঁটার সময় গ্রামের দুই-একজন বয়স্ক মানুষের সাথে মাহিরের দেখা হলো। তারা তার ব্যাপারে শুনেছে। একজন সাদা দাড়িওয়ালা মুরুব্বি এগিয়ে এসে স্নেহের স্বরে জিজ্ঞেস করলেন, বাবা কি সরকার বাড়ির মেয়ে জামাই? আমাদের গ্রাম কেমন দেখতেছেন?
মাহির বিনীতভাবে হাসল। সে খুব নম্রভাবে উত্তর দিল, জি চাচা। আপনাদের গ্রামটা সত্যিই অনেক সুন্দর, বিশেষ করে এই নদীটা। শহরে তো আর এমন শান্তি পাওয়া যায় না।
মুরুব্বি খুশি হয়ে বললেন, একদিন সময় কইরা আমাদের বাড়িতে ডাল-ভাত খাইয়া যাইয়েন।
তারা আরো কিছু সময় আলাপ করে বিদায় নিল। নদী থেকে ফেরার পথে ওরা পার হলো এক বিশাল আমবাগান। পুরনো গাছের শেকড়গুলো মাটির ওপর অজগর সাপের মতো ছড়িয়ে আছে। বাগানের ছায়ামাখা সরু পথ ধরে যেতে যেতে মাহির জানতে পারল গাছে উঠতেও তার স্ত্রী বেশ পারদর্শী। সন্ধ্যা পর্যন্ত গাছে উঠে থাকার কুখ্যাত রেকর্ড আছে তার।
কাসিফরা তাকে তালগাছের সারি আর গ্রামের ঐতিহ্যবাহী পুরনো শিব মন্দির দেখাচ্ছিল। প্রতিটি বাঁকে মাহির আইরিনের ফেলে আসা শৈশব আর কৈশোর দেখতে পেল। কয়েকদিনের ব্যবধানে জীবনযাত্রায় অনেক পরিবর্তন আসতে চলেছে তার। মেয়েটা কি আদৌ তা বুঝতে পারছে নাকি সবকিছু গায়ে না লাগিয়ে চলা তার স্বভাব কে জানে!
ঘুরতে ঘুরতে সূর্য যখন আরও কিছুটা দিগন্তের দিকে হেলে পড়েছে, ওরা এসে দাঁড়াল আলিবরের সেই বিস্তৃত সরিষা ক্ষেতের কিনারে।
কিছু সময় পর কাসিফ হঠাৎ আঙুল উঁচিয়ে বলল, ওইটা কে? আপা না?
কামিনী একটু ভয় পেয়ে উঠল, না তো! আপা হবে কেন? তুই তো একটা কানা, একদম চুপ থাক।
-তুই চুপ কর! আমার আপাকে আমি চিনব না?
কাসিফের জেদী স্বর বাতাসে মিলিয়ে যাওয়ার আগেই মাহির সেদিকে ঘুরে তাকাল।
সামনে দিগন্তজোড়া এক বিশাল সরিষা ক্ষেত। হলদে ফুলের সেই অবিরাম বিস্তার মাটির বুক চিরে উপচে পড়ছে। শীতের পড়ন্ত বিকেলের নরম রোদ তখন চারপাশের প্রকৃতিতে ম্লান সোনালি আভা ছড়িয়ে দিয়েছে। দিন ফুরিয়ে আসার এই সময়ে বাতাসে ত্বক স্পর্শ করলেই এক অদ্ভুত শিহরণ জাগিয়ে তোলে।
ক্ষেতটা রাস্তা থেকে বেশ খানিকটা নিচুতে। হলদে ফুলের সমুদ্র চিরে চলে গেছে এক চিলতে সরু আলপথ। মাহিরের দৃষ্টি সেই হলুদ প্রান্তরের একদম শেষ মাথায় গিয়ে স্থির হলো যেখানে ক্ষেতটা শেষ হয়ে জমিটা ধীরে ধীরে উঁচুতে উঠে পথের সাথে মিশেছে। সেখানেই কাসিফের দাবিকে সত্যি প্রমাণ করে দাঁড়িয়ে আছে তার আপা।
শীতের হাত থেকে বাঁচতে মেয়েটা কামিজের ওপর একটা জলপাই রঙের সোয়েটার জড়িয়ে নিয়েছে। কাঁধে ঝোলানো বর্ণিল নকশা করা ওড়না।
মাহিরের নজর আটকে গেল ওর চুলের বেনীতে। ঘন কালো লম্বা বেনী ওর পিঠের ঠিক মাঝখান দিয়ে নেমে এসেছে। যার ওপর আছড়ে পড়া সেই সোনাঝরা আলো বাদামী দেখাচ্ছে। ওর গায়ের তামাটে বর্ণ এই সোনালি আলোর ছোঁয়ায় গলানো সোনার মতো দ্যুতি ছড়াচ্ছে।
আইরিন যেখানে দাঁড়িয়ে আছে, সেখান থেকে ওপরের কাঁচা রাস্তায় ওঠার জন্য মাটির তৈরি দুই-তিনটি ছোট ধাপ রয়েছে। সে এখনও সেই ধাপগুলো বেয়ে ওপরে ওঠেনি, জমির শেষ সীমানায় দাঁড়িয়ে সে ওপরের রাস্তার দিকে তাকিয়ে আছে।
উঁচু রাস্তায় সাইকেল হাতে দাঁড়িয়ে আছে এক পুরুষ।
পুরো দৃশ্যটা মাহির নিঃশব্দে দেখল।
তাহেরা আফজাল মেম্বারের দ্বিতীয় পক্ষের ছোট মেয়ে। সে পাশ থেকে মুখ বেঁকিয়ে বলে উঠল, আইরিন আপার এতদিনেও কোনো আক্কেল হলো না। বিয়ে হওয়া মেয়েরা কি এইভাবে ঘোরাঘুরি করে নাকি! কী কাণ্ড!
তাহেরার কথায় মাহিরের ঘোর কাটল। কামিণী ভয়ে ভয়ে নতুন দুলাভাইয়ের মুখের দিকে তাকাল। সে কিছু বুঝে ওঠার আগেই তিনি দ্রুত ও দৃঢ় কদমে সেদিকে এগিয়ে গেল।
—————
মাহির যখন দ্রুত পায়ে এগিয়ে আসছিল, তার অবয়বে থমথমে গাম্ভীর্য ছিল। সে যত এগোচ্ছে, তার তীক্ষ্ণ দৃষ্টি ততই স্থির হচ্ছে ঢিবির ওপর দাঁড়িয়ে থাকা ওই যুগলের দিকে।
সাইকেল হাতে থাকা যুবকটির নাম রাহাত। সে সাইকেলের হ্যান্ডেলে আয়েশ করে ভর দিয়ে আইরিনের সাথে কথা বলছে। হঠাৎ তার নজর গেল দূরে এগিয়ে আসতে থাকা সুঠামদেহী পুরুষটির দিকে। রাহাতের চোখে এক মুহূর্তের জন্য বিস্ময় খেলে গেল।
লোকটার হাঁটার ভঙ্গি আর চোয়ালের কঠোরতা দেখে রাহাতের মনে হলো, কোনো রুষ্ট জমিদার নিজের সীমানায় অন্য কারও অনধিকার প্রবেশ দেখে তেড়ে আসছে।
মাহির যখন একদম কাছাকাছি চলে এলো, আইরিন ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাল। মাহিরকে এই সময়ে এই পথে দেখবে তা সে ভাবেনি। ওর শান্ত গভীর চোখে এক পলকের জন্য তীব্র বিস্ময় ফুটে উঠল। কিন্তু সেই চমকে যাওয়ার ভাবটা খুব দ্রুত সামলে নিয়ে সে পুনরায় তার সেই চিরচেনা শীতলতা ফিরিয়ে আনল।
মাহির আইরিনের সেই সাময়িক বিমূঢ়তাকে গ্রাহ্যই করল না। সে তার পাশে দাঁড়াল ঠিকই কিন্তু দৃষ্টি রাখল পুরুষটির দিকে।
রাহাত কিছুটা হকচকিয়ে গিয়ে আইরিনের দিকে তাকিয়ে নিচু স্বরে জিজ্ঞেস করল, কে রে আয়না? উনি কে?
আইরিন জবাব দেওয়ার সুযোগ ও পেল না। মাহির সরাসরি রাহাতের চোখের দিকে তাকিয়ে রাশভারী স্বরে নিজের পরিচয় দিল, আমি মাহির আহমেদ। ওনার স্বামী।
মাহিরের কর্কশ আত্মপরিচয়ে রাহাতের চেহারার ভাব এক নিমিষেই পাল্টে গেল। বিস্ময় কেটে গিয়ে তার মুখে একগাল অকৃত্রিম হাসি দেখা যায় । সে বেশ উৎসাহ নিয়ে মাহিরের দিকে হাত বাড়িয়ে দিল। তার চোখেমুখে কোনো আড়ষ্টতা নেই, বরং আন্তরিকতা আর আতিথেয়তা উপচে পড়ছে।
-আরে! আমাদের আয়নার বর? ভাইসাব ভালো আছেন তো? এই বিচ্ছু মেয়ে তুই তারাতাড়ি পরিচয় করিয়ে দিবি না! ভাইসাব আমি রাহাত। আয়নার আপন মামাতো ভাই।
রাহাতের এই অমায়িক আচরণে মাহির একটু থমকে গেল। কিন্তু মামাতো ভাই পরিচয়টা মাহিরের ভেতরের অস্বস্তিকে পুরোপুরি নিভিয়ে দিতে পারল না। সে জানে, কাজিনদের মধ্যে প্রীতিকর সম্পর্ক নতুন কিছু না। আয়নার তার দিকে তাকিয়ে আছে। শাড়ির বদলে কামিজ পড়ায় মেয়েটার কিশোরী ভাব কিছুটা ফুটে উঠেছে। পুরোপুরি সম্ভব হচ্ছে না চোখের দৃঢ়তার জন্য। দৃষ্টি দিয়েই সে মাহিরের অন্তরটা জেনে নিতে চাইছে।
রাহাতের সাথে কিছুক্ষণ কথা বলার পর মাহিরের ভেতরের তপ্ত অস্বস্তিটুকু কর্পূরের মতো উবে গেল। সে বুঝতে পারল এই লোকটার ভেতরে কোনো কুটিলতা নেই। রাহাতের কথা বলার ধরন, সাদাসিধে হাসি আর অকৃত্রিম আন্তরিকতার মাঝে গ্রামের সেই চিরায়ত সারল্য বিদ্যমান। মাহির নিজের মনেই কিছুটা লজ্জিত হলো। অযথাই লোকটাকে নিয়ে কেন সে এমন সংকীর্ণ চিন্তা করল!
পরক্ষণেই মাহির নিজেকে সামলে নিয়ে রাহাতের সাথে বেশ হৃষ্টচিত্তে আলাপ জমাল। মাহিরের আচরণে হঠাতই একটা পরিবর্তন এল। সে অবচেতনভাবেই গৃহকর্তার ভূমিকাটা নিজের কাঁধে তুলে নিল।
সে রাহাতের কাঁধে হাত রেখে আন্তরিক গলায় বলল, দাঁড়িয়ে আর কতক্ষণ গল্প করবেন রাহাত ভাই? চলুন বাড়িতে, এক কাপ চা খেয়ে যাবেন।
রাহাত খুব বিনয়ের সাথে হাসল। সাইকেলের ক্যারিয়ারে রাখা একটা ব্যাগ দেখিয়ে বলল, আজ আর না ভাইসাব। আম্মা-আব্বা সামান্য উপহার পাঠিয়েছে আপনাদের জন্য। আমি আসলে ওগুলো দিতেই আসছিলাম। আজ তাড়া আছে। অন্য একদিন সময় করে অবশ্যই আসব, তখন প্রাণভরে গল্প হবে। আর আপনাদের তো একদিন আসতেই হবে। আয়নার মামার বাড়ি কিন্তু পাশের গ্রামেই। একদম সময় লাগবে না।
-পরেরবার ইনশাআল্লাহ ভাই! এবার হাতে একদম সময় নেই।
রাহাত বিদায় নিতেই তাদের মাঝে নীরবতা ছেয়ে গেল। দিবাকর দিগন্তের একদম নিচে নেমে গেছে। আকাশজুড়ে এখন সিঁদুরে মেঘের ছড়াছড়ি। মাহির নিচে নেমে এলো। পিছনে ফিরে দেখল এখনো মেয়েটা পথের ঢিবিটার ওপর দাঁড়িয়ে আছে। দৃষ্টি সামনের পথে স্থির । উঁচু জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকায় তাকে এই গোধূলি আলোয় অপার্থিব কোনো মায়ার মতো দেখাচ্ছে।
মাহির তার দিকে হাত বাড়িয়ে গম্ভীর স্বরে বলল, নেমে এসো আয়না। নাকি আরো কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকতে চাও?
আয়না ভ্রু কুঁচকে প্রসারিত হাতের দিকে তাকিয়ে থাকল। মানুষটা কি ভাবছে গ্রামে বড়ো হওয়া আয়নার এইটুক পথের জন্য সাহায্য প্রয়োজন! তবে তার চেয়ে বেশি মানসিক বিঘ্ন ঘটে আয়না নামের সম্বোধনে। সেই সন্ধ্যাবেলায় পুকুরপাড়ে কি মনে করে যেন নিজের আয়না নামটা বলেছিল সে।
তখন একবার বিড়বিড় করে তার নামটা উচ্চারণ করেছিল এই মানুষটা। আর তারপর আজকে।
আয়না কিছুক্ষণ স্থির হয়ে মাহিরের হাতের দিকে তাকিয়ে অতি সন্তর্পণে নিজের হাত মাহিরের শক্ত হাতের ওপর রাখল। উঁচু ঢিবি থেকে নিচে নামার সময় ওর ভার সামলাতে মাহির হাতটা আরও একটু শক্ত করে ধরল। নেমে আসার পর আয়না হাতটা সরিয়ে নিতে চাইল, কিন্তু মাহির ছাড়ল না। সে সেই অবস্থাতেই বাড়ির দিকে হাঁটা শুরু করল।
আয়না কিছুটা অস্বস্তি নিয়েই সরু আলপথে মাহিরের পেছন পেছন হাঁটতে লাগল। তার জন্মস্থানের চেনা মেঠোপথ, চেনা আকাশ, চেনা বাতাস কিন্তু এই নতুন স্পর্শটা তাকে দোলাচলে ফেলে দিয়েছে। সে নিজেকে স্বাভাবিক দেখানোর চেষ্টা করে নিচু স্বরে বলল,
আমি একা হাঁটতে পারি জানো তো? হাত ধরে টেনে নিয়ে যাওয়ার প্রয়োজন নেই।
মাহির হাত তো ছাড়লই না। সামনের দিকে তাকিয়েই বিড়বিড় করে উত্তর দিল,
তা তো পারোই। আরো তো অনেক কিছুই করতে পারো! সবই তো তোমার নখদর্পণে।
আয়না ওর ক্ষিপ্র গতি লক্ষ্য করে আলতো করে জিজ্ঞেস করল, তুমি কি রেগে আছো?
মাহির গলার স্বরে উদাসীনতা নিয়ে বলল, না! কেন? রেগে থাকার মতো কিছু হয়েছে নাকি?
আয়না ঠোঁটের কোণে একটা বাঁকা হাসি ফুটিয়ে বলল, না। ভাবলাম হয়তো ভুল জায়গায় চোর ধরতে এসে মেজাজটা বিগড়ে গেছে।
আয়নার এই সূক্ষ্ম খোঁচায় মাহির মুহূর্তেই হকচকিয়ে গেল। সে যে মনে মনে হাতেনাতে ধরার মানসিকতা নিয়ে এসেছিল এবং এই মেয়ে যে সেটা ধরে ফেলেছে, তাতে মাহির বেশ অপ্রস্তুত বোধ করল। নিজের ওপর রাগ আর লজ্জার এক মিশ্র অনুভূতিতে সে অবচেতনভাবেই আয়নার হাতের ওপর তার ধরা হাতটার চাপ বাড়িয়ে দিল।
মাহির নিজের অস্বস্তি ঢাকতে গলার স্বর একটু চড়িয়ে বলল,
চোর-টোর দেখার সময় আমার নেই। আমি শুধু ভাবছিলাম, যে ভদ্রমহিলা একটু আগে খুব ক্লান্ত ছিল এবং শাড়ি সামলানোর ভয়ে বাড়ির বাইরে পা রাখতেই রাজি ছিল না। সে হঠাৎ এই নির্জন সরিষা ক্ষেতে উড়ে এল কীভাবে?
আয়না কিছুক্ষণ মাহিরের কথার উত্তর দিল না। সে নিজের পরনের কামিজের দিকে একবার তাকিয়ে বলল,
আমি তো এখন আর শাড়ি পরে নেই, দেখছোই তো। শাড়ি সামলানোর ঝামেলা নেই বলেই হয়তো চলে আসতে পেরেছি।
মাহির লক্ষ্য করল আয়না মূল প্রশ্নটা বুঝেও এড়িয়ে গেল। মাহির সেদিকে আর কথা না বাড়িয়ে জিজ্ঞেস করল,
রাহাত ভাইকে তোমার বাড়িতে নিয়ে গেলে পারতো। পথে দাঁড়িয়ে কথা না বলে বাড়ির বৈঠকখানায় বসে তো চা খাওয়ানো যেত এটলিস্ট।
আয়নার সহজ ভঙ্গিতে হঠাতই একটা ছায়া নামল। ওর কণ্ঠস্বর কিছুটা বিষণ্ণ হয়ে এল। সে নিচু স্বরে বলল, ওরা সরকার বাড়িতে আসে না।
মাহির একটু অবাক হলো, কেন? আত্মীয় তো, তোমাদের তো যাতায়াত থাকার কথা। তুমি কি ওদের বাড়িতে যাও না?
-মাঝে-সাঝে।
-কে কে আছে সেখানে?
-নানা-নানী নেই। মামা মামী আর রাহাত ভাইয়া।
-কোনো বোন নেই এই রাহাত ভাইয়ার?
-না, সিঙ্গেল চাইল্ড।
-বিয়েও তো মনে হয় করেনি?
-না।
-তাহলে তো সেখানে গেলে এই এক কাজিনের সাথেই সময় কাটাতে হতো।
আয়না মৃদু স্বরে বলল, হুম।
স্বল্প উত্তরে মাহির দমবার পাত্র নয়। তার মনে রাহাত আর আয়নাকে নিয়ে এখনো সুপ্ত কৌতূহল কাজ করছে। সে জিজ্ঞেস করল, তোমাদের সম্পর্কটা কি বেশ ভালো? মনে হলো বেশ পুরনো কোনো বন্ধুত্ব।
আয়না এবার ভ্রু কুঁচকে মাহিরের দিকে তাকাল,
হঠাৎ এমন মনে হওয়ার কারণ?
মাহির ঘাড় ঘুরিয়ে আড়চোখে একবার আয়নার শান্ত মুখটা দেখে নিল। তারপর শক্ত করে বলল, কারণ ও তোমাকে আয়না বলে ডাকছে। আমি এখানে আসার পর দেখলাম সবাই আইরিন বলে ডাকে। এই আয়না নামটা খুব ব্যক্তিগত মনে হলো আমার কাছে।
আয়না কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল, তেমন কিছুই।
মাহিরকে নিশ্চুপ দেখে আয়না কি মনে করে যেন ম্লান হেসে বলল, আয়না নামটা আমার মার দেওয়া। রাহাত ভাইয়া আমার ছোটবেলা দেখেছে। যে মানুষটা আমার বেড়ে ওঠা দেখেছে, সে আমাকে কী নামে ডাকল তাতে কি খুব বেশি কিছু এসে যায়?
মাহির দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, না। এখন এসবে আর কিছুই যায় আসে না আয়না।
আয়না লক্ষ্য করল খুব সূক্ষ্মভাবে মাহির তার আচরণে দুটো পরিবর্তন এনেছে। সে আপনি থেকে তুমিতে নেমে এসেছে ও খুব স্বাভাবিকভাবেই তাকে আয়না বলে ডাকছে।
-আমরা কিন্তু কাল ঢাকার জন্য রওনা হবো।
-হ্যাঁ জানি তো। আমি সব গুছিয়ে নিয়েছি আর-
-হুশ! আমাকে একটু বলতে দাও। সব পরিস্থিতির জন্যই তোমার পূর্ব প্রস্তুতি থাকে তা জানা হয়েছে। এবার আমি বলি। যে পরিস্থিতিতেই হোক না কেন আমাদের বিয়ে হয়েছে। সজ্ঞানে আমরা একে অপরকে স্বীকৃতি দিয়েছি। সুতরাং দাম্পত্য জীবন অনেস্টি ও লয়ালটির সাথে শুরু করা উচিত। তোমার যদি অন্য কোথাও কোনো-
আয়না শক্ত গলায় বলল, নেই।
মাহির তাকে একদম কোনো সুযোগ না দিয়ে নিজের কথা বলতে লাগল,
তোমার ঘরে বেশ কিছু উপন্যাস দেখলাম। জীবন তো আর উপন্যাস বা নাটক-সিনেমা নয় যেখানে বিয়েকে একটা সময়সীমায় বেঁধে ফেলা হয়। সেসব আদতে সম্ভব নয়। তোমার যদি সেরকম টেম্পোরারি ম্যারেজ লাইফ লিড করার ইচ্ছে থাকে আগেই বলে দাও। আমি নিজের মতো করে ব্যাপারটা সামলে দিব। তোমার নিজস্ব মনোভাব বলবে, বাপ-চাচারটা নয়। কারণ সংসার তোমার করতে হবে। এন্ড ইট ওন্ট অলওয়েজ বি সানশাইন! তখন যাতে রিগ্রেট না থাকে।
-থাকবে না। খুব প্রতিকূল পরিস্থিতি ছাড়া আমার কথায় পরিবর্তন আসবে না।
মাহির সামান্য হেসে বলল, বেশ। খুব প্রতিকূল পরিস্থিতিতে তোমার পড়তে হবে না, আমি থাকতে ইনশাআল্লাহ। তুমি আমার দায়িত্ব।
আয়না বলল, দায়িত্ব?
মাহির থমকে ভাবল দায়িত্ব শব্দে কি মেয়েটি মন খারাপ করেছে? সে আবার বলল,
দায়িত্ব থেকেই তো সব সম্পর্কের সূচনা হয় তাই না?
আয়না কোন বিষন্নতা না দেখিয়ে বলল,
রেসপনসেবলিটি উইথ অনেস্টি এন্ড লয়ালটি ইজ আ গুড এন্ড সেইফ কম্বিনেশন। উই বোথ আর অন দ্যা সেম পেইজ।
মাহির বলল, তাহলে অনেস্টি থেকে শুরু করি?
আয়না অবাক হয়ে বলল, মানে?
মাহির তাকে ধরে হাঁটতে হাঁটতেই বলল,
ভেবেছিলাম পরে এ নিয়ে কথা বলব। কিন্তু যেহেতু প্রসঙ্গ উঠেছে তাই বলি, সেদিন সন্ধ্যায় পুকুর পাড়ে আমি যাওয়ার পর তুমি রাজিবের সাথে দেখা করেছিলে তাই না? তুমি আসলে সেখানে তার অপেক্ষায় ছিলে। আমাকে দ্রুত সেখান থেকে সরানোর জন্যই, বাধ্য হয়ে তুমি তোমার নাম বলেছিলে। তাহলে হয়তো আমার জানাও হত না।
এটা হচ্ছে আমার প্রথম অনুমান, আর দ্বিতীয় টা হলো তুমিই তাকে পালাতে সাহায্য করেছিলে।
আই’ম ফেয়ারলি সারটেইন এবাউট ইট। তোমার যদি অন্য কোনো ব্যাখ্যা থাকে তাহলে আমি তা শুনবো আয়না।
আয়না কোনো উত্তর করল না। তার মনে হলো এই দু-তিন দিনে সে তার শান্তশিষ্ট স্বামীকে খুব চিনেছে বা পড়ে ফেলেছে ভেবে বসেছিল তা আসলে অনেক বড় একটা ভুল। এই পুরুষটির আরো অনেক রুপ তার অজানা, ধরা ছোঁয়ার বাইরে।
মাহির খুব সাবলীলভাবে তাকে ডান থেকে বাম দিকে সরিয়ে দিতেই আয়নার চিন্তার ঘোর ভাঙে। ডান পাশে পানি জমে শুকনো মাটি কাঁদা হয়ে গেছে।
-এদিকে কাদা আছে। বাম পাশ দিয়ে হাঁটো আয়না।
মাহির শরীরের চাপে আয়নাকে আলতো করে বাম দিকে সরিয়ে নিজে ডান পাশের ওই কর্দমাক্ত অংশের দিয়ে হাঁটতে থাকল। এক মুহূর্তের জন্যও হাত না ছেড়ে সামনের দিকে তাকিয়ে খুব শান্ত গলায় সাবধান করে বলল,
নিচে তাকিয়ে হাঁটো আয়না! প্রায় অন্ধকার হয়ে গিয়েছে। এখানের মাটি সমান নয়। এর মধ্যে পা পড়লে পিছলে যেতে পারো, সাবধান!
·
·
·
চলবে……………………………………………………