মিতার মৃত্যুর সঙ্গেসঙ্গে আচমকা বদলে গেল মির্জা বাড়ির আবহওয়া। শওকত মির্জা আবার নিজের কাজে ব্যস্ত হয়ে উঠল। অস্ত্রের অবৈধ ব্যবসা বেশ মজবুত হচ্ছে তার। দল হিসেবে বেশ বড় হয়েছে ডার্ক নাইট। সোলার সিস্টেমের সঙ্গে মিলিত ডিলগুলোতে অভাবনীয় লাভের মুখ দেখছে। সুতরাং সংসার জীবনে মনোযোগ দেওয়ার কোন কারণ-ই তার কাছে আর থাকেনা। যেহেতু পলাশ মির্জাও ডার্ক নাইটের সঙ্গে যুক্ত, তাই সেও ব্যস্ত থাকতো একই কাজে।
এদিকে সুমনার ঘোর কাটতে সময় লাগে বেশ কিছুদিন। সেই দিনগুলি নিজেকে ঘরবন্দি করে ফেলল ও। শত হলেও মায়ের পেটের বোন ছিল মিতা। নিজের আপন বোনের মৃত্যুর কারণ সে। একটা সুক্ষ্ম অপরাধবোধ ওকে স্বস্তি দিতোনা কিছুতেই। রাতে ঘুমোলে মিতার কান্নার শব্দ কানে বাজতো। মাঝেমাঝে মনে হতো মিতা ওকে ডাকছে, করুণ সুরে ডাকছে। কখনও কখনও বলছে, 'আমায় এভাবে মেরে ফেললে আপা? এভাবে মেরে ফেলতে পারলে?'
ঠিকভাবে ঘুমোতে পারতোনা সুমনা। রাতগুলো হয়ে উঠল ভয়ংকর, অসহ্য। আর দিনগুলো অস্বস্তিকর। বিষয়গুলি ধীরে ধীরে ফাঁসের মতো আটকে যেতে শুরু করল সুমনার গলায়। সহ্য হলোনা কিছুতেই। তাই পুনরায় বাহিরের জগতকেই আপন করে নেয় সুমনা। বাহিরের চাকচিক্যময় আর বিলাসী জীবনে নিজেকে ডুবিয়ে, ভুলে থাকতে শুরু করে নিজের জীবনের সবচেয়ে বড় পাপকর্মকে।
শানের পক্ষেও স্কুল ছেড়ে চট্টগ্রাম পড়ে থাকা সম্ভব ছিলোনা কোনভাবেই। তাই ওকেও চলে যেতে হয় ঢাকা। ফলসরূপ বেশিরভাগ সময় নীরব পড়ে থাকতো মীর্জা বাড়ি। ঠিক ভুতুড়ে কোন বাড়ির মতো। আর সেই দমবন্ধ করা একাকিত্বের মধ্যে একা পরে থাকতো ছোট্ট প্রিয়তা। যদিও তার দেখাশোনার জন্যে এক মহিলাকে রাখা হল।
কিন্তু মিতা যে মারা গেছে, সে আর কোনদিন ফিরবেনা। এই বিষয়টা কোনভাবেই বুঝতে পারছিলনা প্রিয়তা। যতক্ষণ জেগে থাকতো, মিতার কাছে যাওয়ার জন্যে কান্নাকাটি করতো। আবার কখনও কখনও দেখা করতে চাইতো বশিরের সঙ্গে। কিন্তু বশিরকে কোথায় পাবে? প্রিয়তাকে ভয়ংকর সেই অভিশাপ দিয়ে বশিরতো আবার ফিরে গেছে সেই অন্ধকার কুঠুরিতে। মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ভোগ করছে বিনা অপরাধের কারাদণ্ড। এসব ঐ পাঁচ বছরের শিশুকে কে বোঝাবে? দেখভালের জন্যে রাখা সেই মহিলা খাইয়ে দিলে খেতে চাইতোনা প্রিয়তা, গোসল করতে চাইতোনা। ধরতে এলেই চিৎকার করে বাড়ি মাথায় তুলতো। এসবে খুব দ্রুতই অতিষ্ঠ হয়ে উঠল সে। একদিন মেজাজ হারিয়ে ক্রোধান্বিত স্বরে প্রিয়তাকে অবগত করালো সেই রূঢ় সত্য। ছোট্ট শরীরটা ঝাঁকিয়ে বলল, 'বেঁচে নেই তোমার মিতা মা! মরে গেছে সে। মরে যাওয়া মানে বোঝ? মাটির নিচে চলে গেছে। আর কোনদিন আসবেনা সে। জীবনেও না।'
কিন্তু এতে বিপদ কমার বদলে বাড়ল। প্রিয়তা কোনভাবেই বিশ্বাস করলোনা সেই মহিলার কথা। উল্টে ঠোঁট ফুলিয়ে রাগান্বিত চোখে তাকিয়ে রইল মহিলার দিকে। চোখ টলমল করছে ওর। সে আরও কিছু বলতে গেলে প্রায় ঝাঁপিয়ে পড়ল প্রিয়তা তার ওপর। সজোরে কামড় বসিয়ে দিল হাতের বাহুতে। শুধু তাতেই থামলো না, সর্বশক্তি দিয়ে খামচে দিল যত্রতত্র। ঐটুকু মেয়ের হঠাৎ অমন হিংস্র আচরণে ভয় পেয়ে গেলেন মহিলা। প্রথমে সামলানোর চেষ্টা করলেও নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেল প্রিয়তা। ফলসরূপ বাধ্য হয়েই ওকে ঘরে আটকে রাখা হল। প্রিয়তা রাগে, ভয়ে চিৎকার করে কেঁদে চলল। কিন্তু দরজা আর খোলা হলোনা।
রাতে যখন সুমনা ফিরল, তখন তাকে জানানো হল প্রিয়তার ব্যবহার সম্পর্কে। সারাদিন কিছু খায়নি তাও জানাল। সুমনা এমনিই ক্লান্ত হয়ে ফিরেছে। মন-মেজাজ ভালো থাকেনা আজকাল। তারওপর বাসায় আবার এই মেয়ের ঝামেলা। প্রচণ্ড বিরক্ত হয়ে খাবার নিয়ে প্রিয়তার ঘরে গেল সে। গিয়ে দেখল, কাঁদতে কাঁদতে ঘুমিয়ে পড়েছে মেয়ে। অনেকটা অযত্নেই ওকে ঘুম থেকে টেনে তুলল সুমনা। খাবার সামনে রেখে বলল, 'চুপচাপ খেয়ে তারপর ঘুমাও।'
ছোট্ট মেয়েটা মাকে পেয়ে আল্হাদি হয়ে উঠল। এগিয়ে এসে গলা জড়িয়ে কেঁদে কেঁদে বলল, 'মিতা মার কাছে যাব।'
মেজাজ আরও বেশি বিগড়ে গেল সুমনার। মিতার ব্যপারটা এমনিতেই সারাদিন প্রচন্ড অস্বস্তিতে রাখে ওকে। তারওপর এই মেয়ের সারাদিন "মিতা মা, মিতা মা"; অসহ্য লাগছে ওর। ঝাঁকুনি দিয়ে নিজের থেকে ছাড়িয়ে নিল প্রিয়তাকে সুমনা। বাহু শক্ত করে চেপে ধরে প্রচন্ড জোরে ধমক দিয়ে বলল, 'একদম চুপ থাকো! এতো কীসের মিতা মা! মিতা মা! মরে গেছে বলেছে শুনতে পাওনি? আর আসবে না। কানে যায়নি সেকথা?'
প্রিয়তা ঠোঁট ফুলিয়ে জেদ ধরে বলল, ' না, না, না! যায়নি! মিতা মা বলেছে কোথাও যাবেনা।'
সুমনা কঠোর গলায় বলল, ' মিথ্যে বলেছে। চুপচাপ খাবার খাও রাণী! নয়তো মার খাবে আমার হাতে।'
কিন্তু প্রিয়তা আবার হিংস্র হয়ে উঠল। প্লেটটা ধাক্কা দিয়ে ফেলে বলল, 'খাবোনা!'
অতঃপর আরও বেশি আক্রমণাত্মক হয়ে উঠল প্রিয়তা। হাত-পা ছুড়ে কাঁদল, জেদ করল। ছুঁতে গেলে আঘাত করল হাত দিয়ে। এতে আরও রেগে গেল সুমনা। সপাটে চড় বসিয়ে দিল প্রিয়তার নাজুক গালে। ধাক্কা দিয়ে বিছানায় ফেলে রেখে বলল, 'খেতে হবেনা তোমাকে আজ আর। বেয়াদব মেয়ে।'
সে রাতে শওকতকে টেলিফোনে প্রিয়তার এই উগ্রতা আর বেয়াদবির কথা জানানো হলে সে বলল, 'বাচ্চা মানুষ, এমন করবেই। চিরকাল মিতাকে দেখে বড় হয়েছে। দুদিনেইতো সব ঠিক হয়ে যাবেনা। সেটা আবার আমায় কল করে জানাতে হয়? একটা পাঁচ বছরের বাচ্চাকে তোমরা দেখভাল করে রাখতে পারছোনাতো পারোটা কী? এসব ফালতু বিষয়ে আমাকে আর জ্বালাতন করবেনা। আমি ব্যস্ত থাকি।'
ফলসরূপ, সামলানোর কায়দাটা সুমনা, সুমনার মতো করেই করেছিল। বিগত পাঁচবছরে প্রিয়তা এতো মার খায়নি, যতটা মার সেই একমাসে ও খেয়েছে। মিতাকে হারানোর সঙ্গে সঙ্গে মমতার ছায়াও হারিয়ে ফেলেছিল প্রিয়তা। সেই মমতা যখন নিজের মায়ের কাছেও পেলোনা। তখন শেষ অবলম্বন হিসেবে বাবার দিকে ঝুঁকল ওর মন। প্রিয়তা শওকতের সঙ্গে কথা বলতে চাইতো। তাকে কাছে চাইতো। মাঝেমাঝে নিজেই টেলিফোনে কল করতো, কিন্তু শওকত সেভাবে কথা বলতে চাইতোনা প্রিয়তার সঙ্গে। মেয়ের প্রতি টান তার জন্মের সময় থেকেই কম। তাই চিরকালই এড়িয়ে চলতো মেয়েকে। অথচ প্রিয়তা উদাস চেয়ে থাকতো ঘরের টেলিফোনটার দিকে। বাবা কখন ফোন করবে সেই আশায়।
সম্পূর্ণ মমতাবঞ্চিত প্রিয়তা একাকিত্ব আর হতাশার মাঝে পিষ্ট হতে থাকল। সেই অনিরাপদ অনুভূতি থেকে মাঝেমাঝে বেশ উগ্র আচরণ করতো প্রিয়তা। যা আগে কখনও করেনি সে। ওর সেই অস্বাভাবিক ব্যবহারকে সুমনা জেদ বলে উড়িয়ে দিতো। শওকত থাকতোই না সেসব দেখার জন্যে। এতোকিছু দেখার সময় তার নেই। ধীরে ধীরে প্রিয়তা মেনে নিতে বাধ্য হল মিতা নেই, কোথাও নেই। সে আর আসবেনা কোনদিন।
সে বছর কেটে গিয়ে নতুন বছর এলো। যে একাকিত্বকে প্রচণ্ড ভয় পেতো, এরমধ্যে সেই একাকিত্ব-ই যেন গিলে খেল প্রিয়তাকে। অবুঝ প্রিয়তা অবাক হয়ে দেখল, ওর আশেপাশে কেউ নেই, কেউনা। স্কুলে যাওয়ার সময়টা ছাড়া বাকি পুরোটা সময় বিশাল ঐ বাড়িটাতে একা পড়ে থাকতো ও। রাতে একা ঘুমোতেও ভীষণ ভয় পেতো। প্রথম দুটো মাস নিজের ঘরে ঘুমোতে দিলেও পরে আবার মিতার সেই রুমেই ওকে পাঠিয়ে দিল সুমনা। প্রিয়তা আপত্তি করেছিল, কান্নাকাটি করেছিল, একপর্যায়ে ভীষণ জেদও ধরেছিল। কিন্তু কোন লাভ হয়নি। জেদের পরিবর্তে মারধর করে প্রিয়তাকে পাঠানো হয় সেইরুমে। ধমক দিয়ে বলা হয়, 'বড় হচ্ছো তুমি এখন! এধরণের ঢং একদম করবেনা। একা থাকার অভ্যেস করো।'
অথচ কেউ বোঝেনি। ঐ ঘরে ভয়ে প্রিয়তার দম আটকে আসতো। ওপরে তাকালে মনে হতো মিতা এখনো ঝুলে আছে সিলিংফ্যানে। মাঝরাতে চিৎকার করে কেঁদে ফেলতো ও। কিন্তু কেউ আসতোনা ওর কাছে। শুনতোনা ওর চিৎকার। মারাত্মক আতঙ্কে সিটিয়ে যেতো ও। মাথাটা প্রচণ্ড ব্যথা করতো। কিন্তু প্রিয়তা তখন আর কাউকে বলার সাহস পেতোনা। যদি মারে? মিতা খাইয়ে না দিলে খেতে পারতোনা প্রিয়তা। অথচ সে পর্যায়ে খাইয়ে দেওয়ার মতো মানুষও আশেপাশে খুঁজে পায়নি ও। খিদের জ্বালায় খেতে হতো নিজের হাতেই।
সেই ঘটনার পর শানকেও শওকত আর বাড়ি আসতে দিতোনা। মাঝেমাঝে কেবল নিয়ে আসতো নিজের সঙ্গে। যখন শওকত বাড়ি আসতো, প্রিয়তা দৌড়ে যেতো বাবার কাছে। ঐসময় ওর মনে হতো ঐ লোকটাই ওর একমাত্র নিরাপদ স্থল। একমাত্র সেই ওর কথা শুনবে, ওকে মারবেনা, জোর করবেনা, একা রাখবেনা। খাইয়ে দেবে নিজের হাতে। কিন্তু প্রিয়তা অবাক হয়ে দেখতো, ওর সেই একমাত্র নিরাপদ স্থল ভীষণ অবহেলায় পাশে সরিয়ে রাখে ওকে। শানের মতো করে প্রিয়তাকে ভালোবাসেনা শওকত। যত্ন করে বুকে জড়িয়ে নেয়না। ছোট প্রিয়তার মন তখন ভেঙ্গে চুড়মার হয়ে যেতো। অভিমানে শানের কাছ থেকেও নিজেকে দূরে সরিয়ে রাখতো ও। কেউ ওকে ভালোবাসেনা, কেউ ওর ভালো চায়না। এসব ঘটনায় মিইয়ে যাওয়া প্রিয়তা স্কুলেও চুপচাপ হয়ে গেল। ক্লাস মাতিয়ে রাখা সবচেয়ে চঞ্চল বাচ্চাটা ধীরে ধীরে নিশ্চুপ হয়ে গেল। নরম মাটিতে নাকি সবাই আচড় কাটে। প্রিয়তার ক্ষেত্রেও তাই হল। হঠাৎ অস্বাভাবিক শান্ত হয়ে যাওয়া প্রিয়তাকেও নিয়মিত বুলি করতে শুরু করল ওর সহপাঠীরা। বিশাল পৃথিবীতে নিজেকে ভীষণ একা অনুভব করে গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে যেতো ওর। ভয় লাগতে শুরু করল। মনে হতে শুরু করল, পৃথিবীতে সবাই ওকে অপছন্দ করে, ঘৃণা করে। সুতরাং সবাই ওকে কষ্ট দেবে, মারবে!
———
এদিকে এক বিরাট পরিবর্তন আসে ২০০১ সালের নির্বাচনে। বিরোধীদল সহ আরও কয়েকটি দল জোটবেঁধে নির্বাচনে অংশ নেওয়া, সঙ্গে নিজ দলের কিছু নড়বড়ে অবস্থানের কারণে কাশেম হকেরা বেশ দীর্ঘ ব্যবধানে পরাজিত হয় এবং ক্ষমতা হারায়। ব্যপারটা তাদের জন্যে বড়সর ধাক্কার ছিল বৈকি। সেই অবস্থায় কাদের হক ঢাকা গিয়ে মোটামুটি নিরাপদ এক অবস্থানে থাকলেও, কাশেম হকের জন্যে বাংলাদেশ নিরাপদ ছিলোনা কোনভাবেই। বেশ উল্লেখযোগ্য শত্রু বানিয়ে ফেলেছিল সে ইতিমধ্যে। সুতরাং নিরাপত্তার স্বার্থে, নির্বাচনের পরপরই আমেরিকায় চলে যায় সে।
নির্বাচনের প্রভাব বিস্তরভাবে পড়ে আন্ডারওয়ার্ল্ডের কিছু সিন্ডিকেটের মধ্যেও। তন্মধ্যে ডার্ক নাইট অন্যতম। কেননা, ডার্কনাইট অনেকটাই সাবেক সরকারপন্থি একটা গ্রুপ ছিল। সরকার বদলে সবচেয়ে বড় যে সমস্যা তাদের পোহাতে হয়েছে তা হচ্ছে শেল্টার। সেই সুযোগ কাজে লাগিয়ে ঢাকাতেই মাথা চাড়া দিয়ে উঠতে শুরু করেছিল আরও একটা দল, ব্লাকহোল। নামটা অনেকটা সোলার সিস্টেমের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করেই রাখা। দলটার উত্থানই হয়েছিল এ-চিন্তা করে যে একদিন না একদিন সোলার সিস্টেমকে গিলে খাবে তারা।
হঠাৎ ২০০২ এর অক্টোবরে তৎকালীন সরকার শুরু করে অপারেশন ক্লিনহার্ট। সেনাবাহিনী এবং বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা বাহিনী দ্বারা পরিচালিত হয়েছিল এই অপারেশন। যার লক্ষ্য ছিল ঢাকাসহ বড় শহরে রাজনৈতিক ক্যাডার, সন্ত্রাসী, আন্ডারওয়ার্ল্ড ডন ও মাফিয়া নেটওয়ার্ক ভেঙে দেওয়া। আসলে সবাই সেরকমটাই জানে। কিন্তু বস্তুতপক্ষ প্রধান টার্গেট ছিল কেবল বিরোধীদলমুখী গ্রুপ, সন্ত্রাসী এবং নেতা। এবং যেসব অপরাধীচক্র কেবল সরকারের পক্ষে ক্ষতিকর ছিল তাদেরই। ফলসরূপ ডার্ক নাইট ছিল এই অপারেশনের বেশ অন্যতম লক্ষ্য। একইভাবে তৎকালীন সরকারপন্থি হওয়ায় সবচেয়ে সুরক্ষিত দল ছিল ব্লাকহোল। তবে ২০০২-২০০৩ এর ঐ সময়টা আন্ডারওয়ার্ল্ডের জন্যে বিশাল বড় এক ধাক্কা ছিল, তা বলার কোন অপেক্ষা রাখেনা।
এহেন অবস্থায় শওকত মির্জা তথা ডার্ক নাইটের একমাত্র ভরসার জায়গা ছিল সোলার সিস্টেম। কারণ ঐসময় সোলার সিস্টেম-ই ছিল একমাত্র দল যারা কোন রাজনৈতিক দলের ধার ধারতো না। বরং প্রায় প্রত্যেকটা রাজনৈতিক দলই ওদের সমিহ করে চলতো নিজেদের ব্যক্তিগত স্বার্থে। সেসময়ে রাশেদ আমেরের কাছেই নিজের গ্রুপকে টিকিয়ে রাখার আর্জি নিয়ে যায় শওকত মির্জা। লীডার এবং কর্মি উভয়দিক দিয়েই ডার্ক নাইট শক্তিশালী এক দল ছিল। সুতরাং ব্যক্তিগত লাভের জন্যেই স্বাচ্ছন্দ্যে ডার্ক নাইটের দিকে সহযোগিতার হাত বাড়িয়েছিল সোলার সিস্টেম।
———
ফলসরূপ শওকত মির্জার কেন্দ্রীয় কার্যালয় হয়ে যায় তখন ঢাকাতেই। চট্টগ্রাম সে খুব কম ই আসতো। শওকত আর শান দুজনেই ঢাকায় থাকায় মির্জা বাড়িতে থাকতো কেবল সুমনা আর প্রিয়তা।
মিতা যে আর কোনদিন ফিরে আসবেনা ততদিনে প্রিয়তা বুঝেছে। পেটে খিদে পুষে রাখতে রাখতে হাত দিয়ে খাবার খাওয়াও শিখে গেছে। ও বুঝেছে, আর কেউ কখনও আসবেনা ওকে যত্ন করে খাইয়ে দিতে। ঐরুমে একা ঘুমোতেও আর ভয় লাগেনা এখন ওর। শুধু লাইটটা জ্বালিয়ে রাখে সর্বোক্ষণ। অন্ধকারে তখনও তার অনেক ভয়। মোটকথা, একা থাকার অস্বাভাবিক অভ্যেস ততদিনে হয়ে গেছে ওর। মানসিকভাবে বয়সের আগেই অনেকটা বড় হয়ে গেছে। কিন্তু শওকতকে নিয়মিত কল করার অভ্যেস ওর তখনও যায়নি। যদিও শওকত তেমন আগ্রহ নিয়ে কথা বলতোনা প্রিয়তার সঙ্গে। না পেরে দু-চার লাইন বলে রেখে দিতো কল। শানও আসতে পারতোনা চট্টগ্রাম।
কিন্তু এসবের মধ্যে ধীরে ধীরে বৃদ্ধি পেয়েছে প্রিয়তার উগ্র মেজাজ। ঐ বয়সেই ওর মনে আশেপাশের সবাই ওর শত্রু। সবাই ওর ক্ষতি করতে চায়। সকলেই যেন ওকে আঘাত করার জন্যে ওত পেতে আছে। তাই অল্পতেই ভীষণ রেগে যায় ও। ভায়োলেন্ট হয়ে যায়। সহপাঠীদের কামড়ে দেওয়া, খামচে চামড়া তুলে ফেলা, কলম দিয়ে আঘাত করা সবই করতো ও। এতে করে টিচারদের অভিযোগ, বাসায় মারধর কম খেতে হয়নি ওকে। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে প্রিয়তার আচরণের এই উগ্রতা কমার বদলে যেন বাড়ছিল।
******
সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে পেরে ওঠাটা বেশ মুশকিল হয়। দেখতে দেখতে চলে আসে ২০০৬। তৎকালীন সরকারের ক্ষমতার মেয়াদ শেষ হলে দেশে শুরু হয় নতুন দাঙ্গা। তত্ত্বাবধায়ক সরকার কে হবে? এই নিয়ে শুরু হয় বিরোধীদলের সঙ্গে, সরকারি দলের মতভেদ। সেই দাঙ্গার মধ্যেই দেশে ফিরে আসেন কাশেম হক। ততক্ষণে দুর্বলতা কাটিয়ে আবার শক্তপোক্ত অবস্থানে ফিরে আসতে শুরু করেছে ডার্কনাইট। অন্যদিকে দীর্ঘ পাঁচবছর বেশ দাপট নিয়ে থাকলেও টালমাটাল অবস্থান অনুভব করতে শুরু করেছে ব্লাক হোল।
প্রিয়তার বয়স তখন দশ পেরিয়ে এগারোতে গিয়ে পড়বে। শারিরীকভাবে বেশ দ্রুতই বেড়ে উঠেছিল ও। উচ্চতা, গঠন উভয়ক্ষেত্রেই সাধারণের চেয়ে বেশি উন্নত ছিল। ঐবয়সেই নারীসুলভ সৌন্দর্য তীব্রভাবে প্রকাশ পাচ্ছিল ওরমধ্যে। তারমধ্যে সবচেয়ে আকর্ষণীয় ছিল চোখদুটো। ঘনপাপড়ি দিয়ে ঘেরা দীঘল, গভীর চোখদুটোর দিকে স্থিরভাবে বেশিক্ষণ তাকিয়ে থাকতে পারতোনা কেউ। মনে হতো বশ করে ফেলবে। দিনে দিনে মেয়ের বাড়তে থাকা ঐ রূপ খুটিয়ে খুটিয়ে দেখতো সুমনা। পূর্ণবয়সে গিয়ে চোখ ধাধানো রূপ হবে সে নিয়ে সন্দেহ নেই। হিংসে কি-না জানেনা, তবে অদ্ভুত এক অনুভূতি ঠিকই হতো সুমনার।
তারচেয়েও বড় কথা, সুমনার মেয়ের স্বভাব-আচরণ মোটেও ভালো লাগেনা ম। এগারো বছর হতে চলেছে মাত্র, কিন্তু চালচলন ভয়ংকর উগ্র। এইবয়সেই কারো কথার ধার ধারেনা মেয়ে। নিজের ইচ্ছামতো চলে। কেউ কিছু বললে তার উল্টোটা করাই দৃঢ় স্বভাব হয়ে যাচ্ছে তার। ইদানিং সেচ্ছাচারীর মতো টাকাও ওড়ায়। প্রথমে দিতে চাইতোনা সুমনা, কিন্তু না দেওয়াতে বিপদ বাড়ল। চিৎকার চেঁচামেচি, জিনিসপত্র ভাঙচুর করা শুরু করল মেয়ে। মারধর করেও লাভ হয়নি, পরিবর্তে আরও বেশি জেদ ধরে বসতো। শওকতকে জানানো হলে সে বলে, 'যাই চাইছে দিয়ে দাও। এতো বাড়তি ক্যাচম্যাচ পছন্দ না আমার।'
অথচ বাহির দিয়ে চরম উশৃঙ্খল প্রিয়তা, ভেতরে ভেতরে ছিল ভীষণ ইনসিকিওর। ভয়ংকর নিরাপত্তাহীনতায় ভুগতো ও সর্বক্ষণ। আশেপাশের কাউকেই আপন বলে মনে করতে পারতোনা। গোটা পৃথিবী যেন ওর শত্রু, ওকে আক্রমণে আগ্রহী। যার কারণে কোন বন্ধু ছিলোনা প্রিয়তার। সে নিয়ে প্রিয়তার কোন মাথাব্যথাও ছিলোনা। একসময় শওকত আর শানের সান্নিধ্যের জন্যে ছটফট করলেও এখন ওদের প্রতিও কোন টান কাজ করেনা ওর আর। এই গোটা পৃথিবীতে কেউ না থাকলেও যেন কিছু যায় আসেনা তার।
তার ঠিক দুই-তিনমাস পরেই কাশেম হক নতুন এক ব্যবসার বিষয়ে আলোচনা করতে চাইল শওকত মির্জার সঙ্গে। সেই আলোচনার জন্যে তাকে জরুরিভিত্তিতে ডেকে পাঠানো হলো চট্টগ্রাম। কাশেমের ডাক পেয়ে শওকত পরেরদিনই চলে আসে মির্জা ম্যানশনে। দুপুরে লাঞ্চের দাওয়াত দেওয়া হয় কাশেম হককে। নিমন্ত্রণ পেয়ে আসে কাশেম। কিন্তু কিছুটা দেরী করে। কাশেম আসতে দেরী করে ফেলায় শওকত ঠিক করল, খাওয়াদাওয়ার পরেই আলোচনা হবে। পলাশ, সুমনা আর কাশেম মিলে বসেছিল ডাইনিং টেবিলে। প্রিয়তা তখনও স্কুলে। ওদের খাওয়ার সময়ের মধ্যে হঠাৎ হনহনে পায়ে বাড়ি ফেরে প্রিয়তা। স্কুল ড্রেসটা অগোছালো, চোখের খানিকটা নিচ দিয়ে গভীর খামচির দাগ।
সুমনা অবাক হলোনা। এসব দেখে সে অভ্যস্ত। কিন্তু শওকত বোকা বনে গেল। মেয়েকে সে শেষ দেখেছিল চার-পাঁচমাস আগে। তাও কেবল দুদিনের জন্যে। অল্প সময়ের আরও খানিকটা বড় হয়ে গেছে। সে বেশ অবাক হয়েই বলল, 'কী ব্যপার? তোমার না বিকেলে ছুটি হওয়ার কথা? আর এমন অবস্থা কেন তোমার?'
প্রিয়তা তখনও তাকিয়ে দেখেনি টেবিলে। প্রচণ্ড রাগে ফুঁসছে সে। কাঁধের ব্যাগটা ছুড়ে ফ্লোরে ফেলে দিয়ে বলল, 'হেডস্যার ডেকে পাঠিয়েছে তোমাকে।'
খাওয়া ছেড়ে বিস্ময় নিয়ে মেয়ের দিকে তাকাল শওকত, 'মানে!'
সুমনা এসব দেখে অভ্যস্ত। সে দাঁতে দাঁত চেপে বলল, 'মানে আর কী? যা বলি তোমাকে তাই। এগুলোতো রোজকার কাহিনী। তুমিতো থাকোনা, সহ্য করতে হয় আমাকে। দিনদিন চরম বেয়াদব হচ্ছে মেয়েটা! এর আগেও দুবার ওর টিচার কল করেছে আমাকে। এখন দেখো নিজ চোখে।'
শওকতের চোখে তখনও বিস্ময়। সুমনা উঠে গিয়ে হাত ঝাকিয়ে ধরে সপাটে একটা চড় বসাল প্রিয়তার গালে। দাঁতে দাঁত চেপে বলল, 'আজ আবার কী করেছো?'
চোখমুখ শক্ত করে সটান দাঁড়িয়ে রইল প্রিয়তা। নড়ল অবধি না। যেন এমন থাপ্পড় সে রোজই খায়। এগুলো দুধভাত। অথচ লাল হয়ে গেছে হলদে চকচকে গালটা। শওকতের বিস্ময় বাড়ল আরও। এইটুকু মেয়ের এমন উগ্র জেদ! প্রিয়তা চোখমুখ শক্ত রেখেই ফ্যাসফ্যাসে গলায় বলল, 'আমার নোটবুকের পাতা ছিড়ে ফেলেছিল। দুইদিন ধরে লিখেছিলাম কবিতটা। ছিড়ল কেন? তাই টেবিলে মাথা ঠুকে মাথা ফাটিয়ে দিয়েছি। ঠিক করেছি। আবার করব। আমার নোটবুক ওটা,ওর বাপের না।'
'রাণী!'
প্রচণ্ড জোরে ধমকে উঠল শওকত। প্রিয়তা এতক্ষণে চোখ ফিরিয়ে তাকাল। ক্রোধে বুক ওঠানামা করছিল ওর। কিন্তু ডাইনিং টেবিলে পুরোপুরি তাকাতেই স্থির হয়ে গেল ও। শওকতের ঠিক পাশের চেয়ারে বসে থাকা কাশেম হককে দেখামাত্র ওর চোখের ক্রোধ মিলেয়ে গেল খুব ধীরে ধীরে। সেখানে এসে ভর করল চাপা ভয়। থুতনির নিচে দুহাত রেখে ওর দিকে তাকিয়ে আছে কাশেম হক। চোখে কৌতুক। এরমধ্যেই দু'বার পা থেকে মাথা অবধি পরখ করে নিয়েছে প্রিয়তাকে।
প্রিয়তার চোখের সামনে ভেসে উঠল পাঁচ বছর আগের সেই দিনগুলো। সেই ভয়ংকর রাত। সেই রাতে কাশেমের সেই হিংস্র রূপ। মিতার গগনবিদারী সেসব চিৎকার। ভয়ে, ঘৃণায় ভেতরটা থরথরিয়ে কেঁপে উঠল ওর। দুহাতে খামচে ধরল নিজের স্কার্ট। শুকনো দুটো ঢোক গিলে ঝট করে উল্টো ঘুরল। দৌড়ে সিঁড়ি বেয়ে চলে গেল ওপরে। পেছন থেকে কয়েকবার চিৎকার করে ডাকল সুমনা। কিন্তু প্রিয়তা দাঁড়াল না। সুমনা শওকতের দিকে তাকিয়ে রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে বলল, 'দেখো মেয়ে কী করে বেড়ায়। এবার আমি আর যেতে পারব না স্কুলে।'
শওকত ভ্রু কুঁচকে খাওয়ায় মনোযোগ দিল। নির্বিকারভাবে বলল, ' আমি কলে কথা বলে নেব।'
সুমনা কথা বাড়াল না। তার প্রতি শওকতের কোন আগ্রহ নেই, সে অনেক বছর হল। ঠিক তেমনই তাদের মেয়ের প্রতিও যে শওকত কতটা অনগ্রহি তা বোঝাই যায়। শওকত আর পলাশের খাওয়া আগে শেষ হলে ওনারা বসার ঘরে চলে গেল। কাশেমকে বলে গেল, খাওয়া শেষ হলে ওখানেই আসতে। কফি খেতে খেতে আলোচনা হবে।
একা হতেই সুমনার হাত ধরে নিজের দিকে টেনে নিল কাশেম। হাতের উল্টোপিঠে চুমু খেল। সুমনা হকচকিয়ে আশেপাশে তাকিয়ে বলল, 'কী করছ? এটা হোটেল না।'
কাশেম হেসে ফেলল, ' জানিতো। তাইতো নিজেকে এতো কন্ট্রোল করছি বেবি। বাট একটা কথা মানতে হবে। তোমার মেয়ে কিন্তু তেজে তোমারও কয়েক কাঠি ওপরে। এই বয়সেই কী ঝাঁঝ। বয়স কত যেন ওর?'
সুমনা ভ্রুকুটি করে বলল, ' জানুয়ারিতে এগারো হবে। কেন?'
ভ্রু তুলল কাশেম, 'এগারো! বোঝা যায়না কিন্তু। এ বয়সেই_'
' কী?'
' হু? না মানে_ পূর্ণবয়সে সৌন্দর্যে তোমাকে ছাড়িয়ে যাবে। ইন ফ্যাক্ট মিতাকেও।'
আসলে কথা ঘোরালো কাশেম। সুমনা কপাল কুঁচকে বসে রইল। ভেতরে ভেতরে কেমন লাগল কথাটা। তবে সেই অনুভূতির নাম বুঝে উঠতে পারল না।
———
বসার ঘরের দীর্ঘ একঘন্টার মিটিংয়ের পরে থমথমে হয়ে উঠল পরিবেশ। শওকত এবং পলাশকে নিজের নতুন ব্যবসা সম্পর্কে পরিপূর্ণ ধারণা দিয়েছে এতক্ষণ কাশেম। এখন সিগারেট টানতে টানতে মৌন থেকে সময় দিচ্ছে বিবেচনা করার। কিছুক্ষণের নীরবতার পর শওকত বলে উঠল, 'এতোকিছু ছেড়ে হঠাৎ ড্রাগসের ব্যবসা কেন?'
সোফায় হ্যালান দেয় কাশেম। নাকভর্তি ধোঁয়া ছেড়ে বলে, 'বর্তমানে এর চাহিদা ব্যাপক শওকত ভাই। তালেবানের পতনের পর আফগানিস্তানে হেরোইনের উৎপাদন বেশ বেড়েছে। গোল্ডেন ক্রিসেন্ট থেকে ইন্ডিয়া, ইন্ডিয়া থেকে বাংলাদেশ। ভালো ট্রানজিট ওয়ে। আর কী চাই? বিশেষ করে বাচ্চা ছেলেপেলেগুলো খুব চায়। লাভ আছে। এতোদিন ঘাপটি মেরে থাকতে হয়েছে। এখন এক্সট্রা লাভজনক কিছুতো করতে হবে তাইনা?'
পলাশ জানাল, 'লাভ যেমন আছে রিস্কও আছে। বর্তমানে দেশের অবস্থাতো জানেনই।'
কাশেম চমৎকার হাসল, 'আরেহ্ রিস্ক নেই কীসে? তাই বলে বসে থাকলে হবে? ভুলে যেওনা ইতিহাস বসে বসে দেখা দর্শকদের কখনও মনে রাখেনা। মাটিতে মেশার সঙ্গে সঙ্গেই তারা অস্তিত্বহীন হয়ে যায়। ইতিহাস মনে রাখে নায়কদের, নয়তো খলনায়কদের। কারণ তারা রিস্ক নেয়। নায়ক আমরা হতে পারব না। তবে খলনায়ক হয়ে ইতিহাসে থেকে যেতে দোষ কোথায়?'
শওকত কিছুক্ষণ চিন্তা করে। প্রস্তাব বেশ লাভজনক। সেইসঙ্গে কাশেমের সঙ্গে বৈরিতা করা মানে ভবিষ্যতের জন্যে বিপদ ডেকে আনা। শওকত বলল, ' কিন্তু আমার বর্তমান বেশিরভাগ কাজের পার্টনার সোলার সিস্টেম। সেটাতো জানো?'
কাশেম মাথা নাড়ে, ' জানি। তবে আপনার সঙ্গে আমার সম্পর্কটাতো সোলার সিস্টেমের চেয়ে অনেক বেশি পুরোনো। তাইনা শওকত ভাই? মাসির জন্যে কী কেউ মা'কে ছাড়ে?'
শওকত শীতল দৃষ্টিতে তাকাল কাশেমের চোখে দিকে। এটাকে যে একপ্রকার বিনয়ের সঙ্গে হুমকি দেওয়া বলে তা জানে শওকত। সামনে যে নির্বাচন হবে, তাতে কাশেম হক রাজনৈতিক ক্ষমতা হাতে পেয়ে যাবে। সে নিয়ে সন্দেহের কোন অবকাশ নেই। সুতরাং তাকে এখন ঘাটানো মানে নিজ পায়ে কুড়োল মারা। কিছু করার নেই। হতাশা আর ক্রোধে এই জগতে সেচ্ছায় নিজেকে জড়িয়েছিল শওকত। এখন আর ফিরে আসার কোন উপায় নেই। নৈতিকতা বজায় রাখার অবস্থা তার আর নেই। একমাত্র মৃত্যু এই পাপ থেকে মুক্তির আর কোন উপায় তার কাছে নেই।
———
তারপরের সপ্তাহেই ঢাকা যায় শওকত। রাশেদ আমের সঙ্গে আলাপ করা প্রয়োজন। বর্তমানে সেইতো সোলার সিস্টেমের কর্ণধার। রফিক আমের মারা গেছেন কয়েক বছর আগে। শুলশানে সেই অফিসেই গোপন মিটিং বসে তাদের। উপস্থিত ছিল রাশেদ, জাফর এবং ইকবাল। ইকবাল তখন নতুন নতুন জয়েন করেছে সোলার সিস্টেমে। টগবগে যুবক সে তখন। ড্রাগসের নতুন সেই ব্যবসার বিষয়ে আলোচনা করে শওকত রাশেদের সঙ্গে। অতঃপর বলে, এই ব্যবসায় সোলার সিস্টেমের পার্টনারশিপ এবং সহযোগিতা পেলে দুপক্ষেরই ভালো। প্রস্তাবটা অবশ্য কাশেম হকেরই। শওকত কেবল পেশ করেছে। প্রস্তাব শুনে দীর্ঘক্ষণ চুপ ছিলেন সোলার সিস্টেমের কর্ণধার রাশেদ আমের। এক মনে কিছুক্ষণ সিগারেট টেনে গেলেন থমথমে নীরবতায়। অতঃপর জানালেন, 'বর্তমানে দেশের অবস্থা জটিল। সরকার তত্ত্বাবধায়ক হলেও পাওয়ার বেশিরভাগ মিলিটারিদের হাতে। বর্তমানে ইনপোর্ট, এক্সপোর্ট খুবই রিস্কি এবং টেকনিক্যাল কাজ।'
শওকত বলল, ' জানি। সেসব নিয়ে ভাবা আছে। এসব রিস্কের কথা ভেবেই আসলে আপনার সাহায্যটা আরও বেশি চাইছি।'
আবার কিছুক্ষণ কাটল স্তব্ধ নীরবতায়। অতঃপর রাশেদ জানালেন, ' সোলার সিস্টেম সবরকম অনৈতিক কাজ করলেও একটা কাজে কোনদিন হাত দেয়নি। ড্রাগ স্মাগলিং। ইউ নো হোয়্যাই? কারণ আমরা ঘৃণা করি এই ব্যবসাকে। চরম ঘৃণা করি। সুতরাং আমার উত্তর আপনার বুঝে যাওয়ার কথা।'
মাথা নাড়ল শওকত, ' আমি এমন কিছুই অনুমান করেছিলাম। এতোদিনে এইটুকু চিনেছি আপনাকে। তাহলে আর কী। আসি আমি তবে?'
রাশেদ মাথা নেড়ে অনুমতি দেয়। শওকত উঠে দরজা পর্যন্ত যেতেই রাশেদ বলে ওঠে, 'আমরা যে কেবল ড্রাগ স্মাগলিং ঘৃণা করি তা কিন্তু নয়। বরং আমাদের জানামতে কেউ করলে নিজ বলপ্রয়োগ করে তাতে পরিপূর্ণ বাঁধাও দেই।'
চমকে পেছন ফিরে তাকাল শওকত। নিজের চেয়ারে হেলান দিলেন রাশেদ আমের। তেজস্বী মুখমন্ডলে এক রহস্যময় হাসি ফুটিয়ে বললেন, 'সুতরাং আমায় জানানোটা, আপনার কিংবা আপনার পার্টনারের সবচেয়ে বড় ভুল ছিল বোধহয়।'
থম মেরে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকে শওকত। অতঃপর ধীরপায়ে বেরিয়ে যায় সেখান থেকে।
———
অন্যদিকে শওকত ঢাকা থাকার সুযোগে মির্জা বাড়িতে এসে উপস্থিত হয় কাশেম হক। সেদিনটা ছিল বন্ধের দিন, প্রিয়তা বাড়িতেই ছিল। আগেরদিন রাতটা কাশেম হক মির্জা বাড়িতেই কাটিয়েছে। প্রিয়তা তা জানতো। তাই ভুল করেও সে বের হয়নি নিজের ঘর থেকে। উল্টে বহুদিন পর আবার আশ্রয় নিয়েছিল বিছানার নিচে। নিসঙ্গ প্রিয়তার সঙ্গে ছিল সেই একই তীব্র ভয় আর কম্পন। সেইরাতে আবার মিতাকে হ্যালুসিনেট করল ও। কখনও মনে হল সিলিং ফ্যানে ঝুলে আছে, কখনও বা মনে হল যন্ত্রণায় চিৎকার করছে বিছানার ওপর থেকে। দুহাতে কান চেপে ধরে, চোখ বন্ধ করে সারারাত বিছানার নিচেই পড়ে রইল প্রিয়তা।
পরেরদিন সকালে প্রিয়তার চোখ ভীষণ দেরীতে খোলে। ও ভেবেছিল জানোয়ারটা বোধহয় নেই বাড়িতে আর। খিদেও পেয়েছিল ভীষণ। গতরাতে খায়নি। প্রেমিককে পেয়ে সেকথা হয়তো জানেও না সুমনা। প্রিয়তা বেড়ালের মতো নিঃশব্দ পায়ে বের হয় নিজের রুম থেকে। করিডর দিয়ে দুকদম এগিয়ে নিচে বসার ঘরে কে আছে দেখার চেষ্টা করছিল ও। হঠাৎ পেছন থেকে কেউ শক্ত করে ধরল ওর কাঁধ। প্রিয়তা শিওরে ওঠল। চমকে পেছনে তাকাতেই দম আটকে আসল কাশেম হককে দেখে। হুরমুর করে পেছাতে গেলে রেলিংয়ে সঙ্গে ধাক্কা খেল ও। ওকে বাঁচানোর নাম করে দু বাহু আকড়ে ধরল কাশেম। আতঙ্কে বড় হয়ে গেছে প্রিয়তার অপূর্ব সেই চোখদুটো। ঠোঁটদুটো থরথর কাঁপছে। কাশেম হক হেসে ফেলে বলল, ' কী ব্যপার? এতো ভয় পেলে কেন?'
প্রিয়তা নিরুত্তর রইল। ভয়ে আরও সংকোচিত হয়ে উঠল ওর কাঁধ। কাশেমের হাত গলে বাহু ছেড়ে ওর পিঠে চলে গেল। সমগ্র পিঠে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে সে বলল, ' সেই কত ছোট দেখে গিয়েছিলাম তোমাকে। কত বড় হয়ে গেছো?'
খারাপ স্পর্শ সম্পর্কে সেভাবে কেউ কখনও কিন্তু বোঝায়নি প্রিয়তাকে। তাও প্রিয়তা বুঝেছিল এই স্পর্শ খারাপ। খুব খারাপ। ও নিতে পারছেনা এই জঘন্য ছোঁয়া। প্রিয়তা ছিটকে দূরে সরতে চাইলে ওকে আরও শক্ত করে ধরল কাশেম। বলল, 'এতো ভয় পাচ্ছো কেন মামণি? আমিতো তোমার ভালো একটা আঙ্কেল। আঙ্কেলতো আদর করছে তোমাকে। আঙ্কেল আদর করলে ভয় পেতে হয়?'
কথাগুলো বলতে বলতে প্রিয়তার শরীরের যত্রতত্র ঘুরে বেড়াচ্ছিল কাশেমের হাত। প্রিয়তা শক্ত হয়ে জমে গেল এরমধ্যেই। পায়ের আওয়াজ পেয়েই হাত সরিয়ে নিল কাশেম। সুমনা আসছে। সুমনা এসে ভ্রুকুটি করে তাকাল প্রিয়তার দিকে। বলল, 'আজ এতো দেরী করে উঠলে কেন?স্কুল নেই?'
কাশেম হাসি মুখেই বলল, ' আরে আজ সরকারি ছুটি, ভুলে গেছো? বাচ্চা মেয়েটার সঙ্গে সবসময় এতো তেঁতে কথা বলো কেন?'
কথাটা বলে ঝুঁকে প্রিয়তার কপালের একপাশে চুমু খেল কাশেম। প্রিয়তা প্রায় ছুটেই চলে গেল সেখান থেকে। প্রিয়তা যেতেই সুমনা তীক্ষ্ম দৃষ্টিতে তাকাল কাশেম হকের দিকে। কিন্তু কাশেম তাকাল না।
———
সময় পেরিয়ে ২০০৭ এলো। সেই ড্রাগ স্মাগলিংয়ের ব্যবসায় ব্যাপক হারে লসের মুখ দেখতে হল কাশেম হককে। চাহিদার ওঠানামা, আনপ্রেডিক্টেবল এনফোর্সমেন্ট থাকা সত্ত্বেও সামলে নিতো তারা। কিন্তু সবচেয়ে বড় বাঁধা হয়ে দাঁড়ায় সোলার সিস্টেম। সরাসরি হস্তক্ষেপ না করেই তাদের প্রত্যেকটা ডিলিংয়ে পরোক্ষ হস্তক্ষেপ ঘটাচ্ছিল রাশেদ আমের। এমনভাবে অস্থিতিশীলতা তৈরী করেছিল যা ভেতর থেকেই ভেঙ্গে যাচ্ছিল চক্রগুলো। একের পর এক লসে দিশেহারা বোধ করতে শুরু করে কাশেম হক। শওকত মির্জার অবস্থাও এসে, ফেসেছে টাইপ। অবশেষে বন্ধ করতে বাধ্য হয় এই ব্যবসা। শুধু সেই অবধি হলেও মানিয়ে নেওয়া যেতো। কিন্তু বিপদ ছিল আরও ভয়ংকর। অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা পরিপূর্ণভাবে ভেঙ্গে পড়েছিল এসব কারণে। পুলিশ, র্যাবসহ বিভিন্ন ইন্টেলিজেন্স এর নজর পড়ে যায় তাদের ওপর। ডার্ক নাইটকে সামনে রেখে ব্যবসা চলার ফলে বলির পাঠা হতে হয় শওকতকেই। সেই নাজেহাল অবস্থায় একরাশ ক্ষোভ নিয়েই রাশেদকে ফোন করে শওকত। ক্রোধ চাপা গলায় বলে, 'এতোগুলো বছর একসঙ্গে কাজ করেছি আমরা। সাহায্যে করেননি তা মেনে নিয়েছিলাম। তাই বলে এভাবে ক্ষতি করবেন? ভরসা করেই সবটা বলেছিলাম আপনাকে।'
রাশেদ নির্বিকার গলায় বলেন, ' আমি আগেই বলেছিলাম মির্জা। ড্রাগস ছাড়া যেকোন কিছু সহ্য করে নেব আমি। আমার কথাটা আপনার এতো হালকাভাবে নেওয়া আপনার উচিত হয়নি।'
শওকত দাঁতে দাঁত চেপে বলে, ' বিশ্বাসভঙ্গ যখন একবার হয়েছেই, তখন আর একসঙ্গে কাজ করা আমাদের সাজেনা।'
' আমি জোরকরে আপনার সঙ্গে এলাইনস করিনি। জোর করে ধরেও রাখব না। সবটাই আপনার ইচ্ছা।'
' সোলার সিস্টেম আর ডার্ক নাইটের সংঘবদ্ধ যাত্রা তবে আজ এখানেই শেষ হল।'
শওকতের কথায় মৃদু হাসল রাশেদ। বিকারহীন গলায় বলল, 'শেষ হল।'
———
শওকতের ধারণা ছিল রাশেদ বাড়াবাড়ি করেছে। এভাবে তাদের পথের কাঁটা হওয়া তার উচিত হয়নি। কিন্তু শওকত জানতোনা, এই ড্রাগ ব্যবসার সঙ্গে অভ্যন্তরীণ কত ক্ষত জমে আছে রাশেদের মনে। রফিক আমেরের মৃত্যুর কারণ ছিল এই ব্যবসায় বাঁধা প্রদান। শুধু তাই না। সাত বছর আগে নিজের স্ত্রী তটিনিকেও হারিয়েছেন এই ড্রাগ ডিলিংয়ে বাঁধা দিতে গিয়েই। সেই ঘটনার পর প্রচন্ড ক্ষোভে নিজ হাতে পাঁচ পাঁচটা চক্রকে একা হাতে নিঃশেষ করে দিয়েছিলেন সোলার সিস্টেমের এই একরোখা কর্ণধার। সেবছর রাশেদের সবচেয়ে নির্মম রূপ দেখেছিল গোটা আন্ডারওয়ার্ল্ড।
এদিকে নিজ নিরাপত্তা রক্ষায় দেশে অবস্থান করা প্রায় অসম্ভব হয়ে উঠেছিল শওকত মির্জার কাছে। তাই কাশেম হক উপদেশ দেন, দেশের বাহিরে চলে যাওয়ার জন্যে। এই কয়েকবছরে বিট্রেনেও ছড়িয়েছে তার ব্যবসা। তখন আপাতত সেদিকেই মনোযোগ দিতে বলে। কাশেমের কাছে পলিটিক্যল শেলটার থাকলেও ঐমুহূর্তে শওকতের তাতেও কোন লাভ হতোনা। তাই এছাড়া অন্যকোন উপায়ও ছিলোনা। আর গেলে পরিবারসহই যেতে হবে। কিন্তু শানের পক্ষে ঐমুহূর্তে যাওয়া সম্ভব ছিলোনা। ইন্টার-মিডিয়েট দ্বিতীয় বর্ষে আছে সে। এইচএসসি না দিয়ে সে যাবেনা। তারপর অনার্সটা সে ব্রিটেনে করবে। নিজের এমন পরিকল্পনার কথাই জানায় সে শওকতকে।
সুতরাং যাচ্ছে তিনজন। শওকত, সুমনা আর প্রিয়তা। পলাশ এখানে সুমনার ব্যবসা দেখবে। কিন্তু প্রিয়তা ভীষণভাবে বেঁকে বসে। সে কিছুতেই যাবেনা। ঐটুকু বয়সেই যেন পরিবার নামক বিষয়টার ওপর তীব্র বিতৃষ্ণা জন্মে গেছে ওর। তারওপর ঐ ঘটনার পর, কাশেম হক নামক লোকটা প্রায়ই আসতো মির্জা বাড়িতে। সুযোগ পেলেই আদর করার নাম করে খারাপভাবে স্পর্শ করতো ওকে। ভয়, রাগ, জেদে সবকিছু ধ্বংস করে দিতে ইচ্ছা করতো প্রিয়তার। যখনতখন ভাঙচুর করে বাড়ি মাথায় তুলতো। প্রচণ্ড জোরে চিৎকার করতো। কখনও স্কুলে সহপাঠীদের আঘাত করে বসতো। অকারণেই এমন বেয়াদবি দেখে প্রতিবারই মেজাজ খারাপ হতো সুমনার। মারধর করে সামলানোর চেষ্টা করতো। কিন্তু তাতে হিতে বিপরীতই হতো। এইসব কিছুর মাঝে পরিবারের ছত্রছায়াকেই সবচেয়ে বেশি অনিরাপদ মনে হতো প্রিয়তার। শওকত নিজেও নানাভাবে চেষ্টা করল। কিন্তু লাভ হলোনা। মার, শাসন কোনভাবেই প্রিয়তাকে রাজি করানো গেলোনা বিদেশে। শেষমেশ বাধ্য হয়েই প্রিয়তাকে ওখানকার একটা বোর্ডিং স্কুলের ক্লাস সিক্সে ভর্তি করে দিয়ে শওকত এবং সুমনা পারি জমালো দেশের বাইরে।
******
বোর্ডিংয়ের জীবনটা সহজ হলোনা প্রিয়তার জন্যে। অবাধ্য, খোলা মেয়েটা হঠাৎ অমন বদ্ধ জায়গায় গিয়ে আরও বেশি বিরক্ত, আরও বেশি অস্থির হয়ে উঠল। অমন তীব্র নিয়মানুবর্তিতায় দমবন্ধ লাগতে শুরু করল ওর। নতুন মানুষগুলোর সঙ্গে কোন সম্পর্কও তৈরী হলোনা কোনভাবে। এমনকি নিজের রুমমেটদের সঙ্গেও কোনরকম কোন কথাবার্তা হতোনা ওর। কারণ সেই এক বন্ধমূল ধারণা; কেউ ওকে পছন্দ করেনা, সবাই ওর ক্ষতি করতে চায়। এককোণে, একঘেয়ে অবস্থায় বসে থাকা একটা মেয়ে ছিল ও। সেটা হোস্টেল রুম হোক বা ক্লাসরুম। সুতরাং এধরণের বাচ্চাদের সঙ্গে যা হওয়ার তাই হলো। ভয়ংকরভাবে বুলি হতে হতো ওকে সবসময়। প্রথম পর্যায়ে সবটা মেনে নিলেও, একপর্যায়ে গিয়ে তা আর মানলোনা প্রিয়তা। নিজের ভেতরে পুষে রাখা সেই ভয়, রাগ, জেদ ঠিকরে বেরিয়ে এলো আক্রমণাত্মকভাবে। কেউ লাগতে আসলে রেগে গিয়ে গায়ে কলম কিংবা কম্পাস গেঁথে দেওয়া, দেয়ালে মাথা ঠুকে দেওয়া, চুল টেনে ছিড়ে ফেলার মতো ভয়ংকর কাজ করে বসতো ও। টিচাররা বকতো, পানিশমেন্ট দিতো। কল করে শওকতকে নালিশ জানাতো। কিন্তু বিশেষ কোন লাভ হতোনা। প্রভাবশালী পিতার কন্যা বলে তারা বের করেও দিতে পারছিল না। একারণে না পেরে সহপাঠীরাই নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখতে শুরু করল এরপর থেকে।
এভাবেই দেখতে দেখতে প্রায় তিন বছর পেরিয়ে গেল। প্রিয়তা তখন ক্লাস এইটের শেষ অবস্থানে আছে। ততদিনে ও বুঝতে পেরেছে ওর মা নারী হিসেবে কেমন। ছোটবেলায় না বোঝা ঘটনাগুলোর সমীকরণ মিলে গিয়েছিল এক এক করে। বুঝেছিল, কেন কাশেম কিংবা অন্যপুরুষ রাতে তাদের বাসায় থাকতো। কেন তার বাবা কোনদিন আদর করে তাকে কাছে টেনে নেয়নি। সেই রাতে আসলে কী ঘটেছিল মিতার সঙ্গে। কেনই বা মিতা মরল। বশিরের সেই তিরস্কারের কারণ। কাশেমের সেই জঘন্য স্পর্শগুলোর মানে। এইসব উপলব্ধি যেন ওর জীবনটাকে আরও বেশি নরক করে তুলল। বিষিয়ে দিল ভেতরের অবশিষ্ট অনুভূতিগুলোকে। রাগ, জেদ, ভয়, নিরাপত্তাহীনতার অনুভব মিলিমিশে এক অদ্ভুত ব্যক্তিত্ব তৈরী করল ওর। যে কারো সঙ্গে মেশেনা, রেগে গেলে জঘন্য ভাষায় কথা বলে, মানুষকে আঘাত করে বসে। জগতের সবচেয়ে আকর্ষণীয় ঐ চোখজোড়াতে সারাক্ষণ চাপা এক ক্রোধ লেগেই থাকতো।
ওর রুমমেট তখন মীরা। এবং ক্লাস নাইন এবং টেইনের আরও দুজন সিনিয়র মেয়ে। নতুন শিফ্ট হয়েছে। তারা দুজনেই ছিল ড্রাগ অ্যাডিক্ট। আউটিং কিংবা ছুটিতে বাড়িতে গেলে সঙ্গে করে লুকিয়ে নিয়ে আসতো তারা। কোথায় পেতো, তা জানা নেই। প্রিয়তা এবং মীরার সামনেই লুকিয়ে ড্রাগ নিতো তারা। দুজনকে হুমকি দিতো যাতে কিছুতেই বাইর না বলে। মীরা ভয়ে বলতোনা কাউকে, আর প্রিয়তা বলতোনা অনাগ্রহে। মাঝে মীরা ছুটি নিয়ে নিজ বাড়ি গেলে, প্রিয়তা একা রইল সেই দুজনের সঙ্গে। রাত গভীর হতেই দুজন ড্রাগস্ নিতে শুরু করল। প্রিয়তা একদৃষ্টিতে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখল দুজনকে। একপর্যায়ে বলে বসল, 'এগুলো নিলে কী হয়?'
মেয়েদুটো তাকাল প্রিয়তার দিকে। অতঃপর দুজন দুজনের দিকে তাকিয়ে হেসে ফেলল। একজন বলল, 'শান্তি, কলিজা ঠান্ডা হয়ে যায় বুঝলি? একবার নিলে মনে হয় হাওয়ায় ভাসছি। আহ্ কী আরাম।'
বলতে বলতে নাক টেনে নিলো মেয়েটা। যেন কোন অমৃত নিচ্ছে। বয়সটা ছিল কৌতূহলের, প্রিয়তার মতো সবদিক শূণ্য দেখা মেয়ের জন্যেতো সেই কৌতূহল আরও প্রখর। কৌতূহলি কন্ঠে প্রিয়তা বলল, 'শান্তিতে ঘুমোনো যায়?'
অপর মেয়েটি বলল, 'ঘুম মানে? জীবনে দিসনি এমন ঘুম আসবে।'
ও বায়না করে বলল, 'আমায় দেবে?'
মেয়েদুটো আবার থমকায়। প্রথমজন প্রথমে রাজি হয়না। কিন্তু দ্বিতীয়জন বলে রাজি করায়। সেইরাতে প্রথমবারের মতো ড্রাগস্ নেয় প্রিয়তা। ওর কিশোরী মস্তিষ্কের মনে হয় বহুদিন পর এমন শান্তি পেয়েছে সে।
সেই রাত থেকেই ড্রাগ নেওয়ার যাত্রা শুরু হয় প্রিয়তার। মাঝেমাঝে সিগারেটও নিয়ে আসতো ঐ দুজন। তবে সৌভাগ্যের বিষয় ছিলযে বোর্ডিং হওয়ার খুবই সীমিত সংখ্যক নেশাদ্রব্য আনতে পারতো ওরা। তাই নিয়মিত এবং মাত্রাতিরিক্ত নেশা করার সুযোগ ছিলোনা। ভাগে ভাগে খুব সীমিত পরিমাণেই সেই সুযোগ হতো ওদের। তবে সেটাও প্রিয়তার অভ্যেসে পরিণত হল। মীরা এসে যখন দেখল প্রিয়তাও এই দলে, তখন অবাক হয়েছিল। কিন্তু ঐ জেদি, একগুঁয়ে মেয়েকে কিছু বলার সাহস ওর হয়নি। তবে এই অভ্যেস প্রিয়তার ব্যক্তিত্বকে আরও বেশি উগ্র, আরও বেশি বেপরোয়া করে তুলল ধীরে ধীরে।
দেখতে দেখতে কেটে গেল আরও ছ'টা বাস। প্রিয়তা তখন ক্লাস নাইনের মাঝামাঝি অবস্থাতে আছে। ঐসময় বোর্ডিং থেকে আউটিংয়ে নিয়ে যাওয়া হয় ওদের। প্রিয়তা একা থাকা মানুষ। মীরার সঙ্গে ভালো সম্পর্ক হলেও একসঙ্গে বসে আড্ডা দেওয়ার মেয়ে ও নয়। তাই সব ছাত্র-ছাত্রীদের হৈ-হুল্লোড়ের মাঝে একা বসেছিল ও নিজে। একপর্যায়ে যখন এতো আনন্দ, চেঁচামেচি ওর অসহ্য লাগল, তখন খানিকটা দূরে সরে ধীরে ধীরে সবার আড়ালে চলে এলো ও। পকেটে লুকিয়ে আনা সিগারেট আর লাইটার বের করে জ্বালাল। আশেপাশে চোখবুলিয়ে দেখে নিয়ে ধীরে ধীরে স্মোক করতে শুরু করল। সবাই অনেক দূরে থাকায় আপাতত ও নিশ্চিন্ত। কিন্তু হঠাৎ একটা মেয়ে এসে চেঁচিয়ে উঠল, 'এই মেয়ে! তুমি স্মোক করছো?'
প্রিয়তা চমকে উঠল। তাকিয়ে দেখল একজন সিনিয়র স্টুডেন্ট। পোশাক দেখে মনে হল কলেজের। প্রিয়তা দেখল আর কেউ নেই সাথে। তাই ভ্রুকুটি করে বলল, 'তাতে তোমার কী?'
'আমার কী মানে? দাঁড়াও স্যারদের জানাচ্ছি।'
প্রিয়তা রেগে গেল। মেয়েটা যেতে নিলেই একটা ইটের টুকরো নিয়ে ছুড়ে দিল মেয়েটার গায়ে। ব্যথা পেয়ে বসে পড়ল মেয়েটা। চেঁচিয়ে গালি দিল। প্রিয়তা আরও রেগে গেল। ইটের টুকরো আবার নিয়ে তেড়ে যেতেই নিচ্ছিল, ঠিক তখনই কলেজ ড্রেস পড়া একটা ছেলে এসে আটকে ফেলল ওকে। দুহাত শক্ত করে প্রিয়তাকে ধরে রেখে সহপাঠী মেয়েটাকে বলল, 'তুই যা। আর স্যারদের কিছু বলতে হবেনা। আমি দেখছি।'
মেয়েটা চলে গেল। প্রিয়তা এতক্ষণ থমকে গিয়েছিল এই ছেলের হঠাৎ আগমনে। কিন্তু এবার ছটফট নিজেকে ছাড়ানোর চেষ্টা করে বলল, 'কে তুমি হ্যাঁ? হাউ ডেয়ার ইউ টু টাচ মি?'
ছেলেটা ভ্রু কুঁচকে তাকাল প্রিয়তার ধরে রাখা সিগারেটের দিকে। টান দিয়ে সেটা নিজের হাতে নিয়ে বলল, 'বোর্ডিংয়ের আউটিংয়ে এসে সিগারেট টানছো তুমি, আর আমার ডেয়ার নিয়ে প্রশ্ন করছো? যদি টিচারকে বলে দেই?'
বলে সিগারেটটা নিচে ফেলে পায়ে পিসে ফেলল ছেলেটা। প্রিয়তা রাগে হিসহিসিয়ে বলল, ' তুমি জানো আমি কে?'
ছেলেটা বলল, ' কে আবার? বড়লোক বাপের বখে যাওয়া বেটি।'
প্রিয়তা রাগে অন্ধ হয়ে হাতে ধরা ইটে টুকরোটা মারতেই যাচ্ছিল ছেলেটার দিকে। ছেলেটা আবার ধরে ফেলল ওর হাত। হাতটা মুচড়ে দিয়ে বলল, 'একেতো সিগারেট খাচ্ছিলে। এরপর পরপর দুবার ইট দিয়ে দুটো স্টুডেন্টকে মারতে গেছিলে। অ্যাটেম টু মার্ডার কেস হয়ে যাবে কিন্তু। কী? বলে দেব স্যারকে?'
প্রিয়তা এপর্যায়ে দমে গেল। সত্যি সত্যি বলে দিলে অনেক ঝামেলা পোহাতে হবে ওকে। ও একটু ইতস্তত করে বলল, ' সত্যি সত্যিই বলে দেবে?'
একটু চিন্তা করার ভান করল ছেলেটা। তারপর বলল, 'বলবোনা। একটা শর্তে। '
' সেটা কী?'
' আমার সঙ্গে বসতে হবে ওখানে।'
একটু দূরে থাকা একটা বেঞ্চ দেখিয়ে বলল ছেলেটা। প্রিয়তা একপলক সেদিকে তাকিয়ে বলল, 'কেউ দেখে ফেললে?'
চমৎকার করে হাসল ছেলেটা। বলল, ' ওখানে খেলা হচ্ছে। তাই এখন এদিকে কেউ আসবেনা।'
অগত্যা প্রিয়তাকে গিয়ে বসতে হল সেই ছেলেটার সঙ্গে। ছেলেটা নিজের পরিচয় দিয়ে বলল, ' আমি শুভ। ইন্টার ফার্স্ট ইয়ার। সাইন্স, সেকশন বি। তুমি?'
প্রিয়তা তপ্ত শ্বাস ফেলে বলল, ' রাণী। ক্লাস নাইন। আর্টস, সেকশন এ।'
' তুমি কী রেগুলার স্মোক করো?'
' মাঝেমাঝে।'
' কেন?'
' ভালোলাগে তাই।'
' ধোয়া টানতে কার ভাল্লাগে?'
' আমার।'
' তেজপাতা কিনে দেব আমি তোমাকে। ওটায় আগুন জ্বালিয়ে টানবে। টানবে যখন উপকারি ধোয়াই টানো।'
প্রিয়তা এতক্ষণ নিরস গলায় জবাব দিলেও এবার ভ্রুকুটি করে তাকাল শুভর দিকে। ছেলেটা ছিপছিপে গড়নের, সাদা ফর্সা, লম্বা, চুলগুলো খুব সুন্দর সিল্কি। এককথায় দেখতে মারাত্মক কিউট। প্রিয়তাকে তাকাতে দেখে শুভ বলল, ' সত্যি বলছি। আমি ট্রায় করেছিলাম, ট্রাস্ট মি। শুধু বুকটা একটু জ্বলছিল।'
শেষের বাক্যটা হতাশ গলায় বলল শুভ। প্রিয়তা হেসে ফেলল। কতদিন পর মনখুলে হাসল ও নিজেও জানেনা। যেটা কেউ এতোবছরেও পারেনি, সেটা শুভ পেরেছিল সেদিন। নিরাপদ অনুভব করিয়েছিল ওকে। প্রিয়তার সেই হাসি দেখে শুভ বলল, ' যে এতো চমৎকার হাসতে পারে তার চোখে এতো রাগ কেন? তোমার চোখদুটো কিন্তু মারাত্মক সুন্দর। এমন সুন্দর চোখ দেখা যায়না।'
প্রিয়তা হাসি থামিয়ে তাকাল শুভর দিকে। শুভর মুখে এখনো সেই চমৎকার হাসি।
সেইদিনের পর থেকেই প্রিয়তার জীবনে যুক্ত হয় নতুন এক মানুষ। শুভ। প্রিয়তার জীবনে সত্যিই শুভ হয়েই এসেছিল শুভ। প্রথমবারের মতো প্রিয়তা কারো কাছে নিঃসংকোচ অনুভব করতে শুরু করল। মনে হল ঐ একটা ছেলে আছে, যে ওকে আঘাত করবেনা। যে ওকে ঘৃণা করবেনা। সে ওর বন্ধু হতে পারে। বোর্ডিংয়র কড়া রেস্ট্রিকশনের মাঝে দুজনের দেখা-সাক্ষাৎ হতো খুবই সীমিত। কখনও লাইব্রেরিতে, কখনও খেলার মাঠের দিকটার কোন আড়ালে, কখনও কম্পিউটার ল্যাবে। প্রিয়তাকে ওর জীবনের সবচেয়ে সেরা কম্ফোর্ট জোন দিল শুভ সেইকদিনেই। ওকে ওর মতো করে বোঝার অদ্ভুত গুন দেখালো ছেলেটা। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে প্রিয়তা শুভকে জানিয়েছে ওর ড্রাগ নেওয়ার কথা। অদ্ভুতভাবে শুভ ওকে তখনও জাজ্ করেনি। বরং উপায় বলেছে এইপথ থেকে বের হওয়ার। প্রিয়তা তখনও হার্ড অ্যাডিক্ট নয়। কিন্তু একবারে বন্ধ করলেও ও সহ্য করতে পারবেনা। তাই শুভ ওকে বলেছে নেওয়ার মাত্রা কমাতে। অর্ধেক করতে। প্রিয়তা নিজের অজান্তেই শুভকে নিজের অভিভাবকদের মতো দেখতে শুরু করল। কমাতে শুরু করল সেই সীমিত মাত্রাটুকুও। তারবদলে ঐসময় ও শুভর উপদেশমতো কবিতা লিখতো, বই পড়তো, ঘুমিয়ে পড়ার চেষ্টা করতো। এমন করে করে যখন সেই মাত্রা তিনভাগের একভাগে চলে এলো, তখন নিজের রুম শিফ্ট করে ফেলল প্রিয়তা। বুদ্ধিটা শুভরই ছিল। প্রথম প্রথম কষ্ট হলেও ধীরে ধীরে সেড়ে উঠছিল ও।
———
সালটা তখন ২০১১। সেইসময় দেশে ফিরে আসে শওকত- সুমনা। সঙ্গে ফিরে আসে শানও। যদিও সে শীঘ্রই ফিরে যাবে আবার মাস্টার্স করতে।
প্রিয়তা তখন দশম শ্রেণীর মাঝামাঝি অবস্থানে ছিল। শুভ তখন ইন্টার সেকেন্ড ইয়ারের স্টুডেন্ট। শুভর কাছে তখন প্রিয়তা এক খোলা বই। প্রিয়তার জীবনে ঘটে যাওয়া প্রত্যেকটা ঘটনা সে জানে। যার কাছে কেবলই কৌতূহল আর ভালোলাগা থেকে গিয়েছিল। তার প্রতি এখন গভীর মায়া আর ভালোবাসা অনুভব করে শুভ। মনে হয় মেয়েটাকে কোন দামি ফুলের মতো আগলে রাখতে পারলেই ওর জীবন ধন্য। প্রিয়তাকে ভালোবেসে ইয়্যলো কুইন ডাকতো ও।
প্রিয়তাও ততদিনে নেশা ছেড়ে দিয়েছে। এরমধ্যে মীরাও পুনরায় ওর রুমে শিফ্ট হয়ে গেছে পরবর্তীতে খালি সিট পেয়ে। তখন ওদের মধ্যেও সহজ স্বাভাবিক বন্ধুত্ব তৈরী হয়। প্রিয়তার মনের সেই হিলিং টাইমটাতেই ওর বন্ধু হওয়ার সুযোগ পেয়ে যায় মীরা।
সত্যি বলতে প্রিয়তার শুধু দরকার ছিল একজন ভরসযোগ্য মানুষ। যে ওকে বুঝবে, আঘাত করবে না, জাজ করবেনা। শুভর মধ্যে সে সবকিছু পেয়ে খড়কুটোর মতো আকড়ে ধরেছিল প্রিয়তা।
একদিন বিকেলে ক্লাস শেষে সাইন্স বিল্ডিংয়ের পেছনে বসে লুকিয়ে কথা বলছিল দুজন। কথায় কথায় শুভ বলল, 'তুমি আমায় ভালোবাসো, ইয়্যলো কুইন?'
প্রিয়তা কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল শুভর দিকে। অতঃপর মাথ নেড়ে বলল, ' তোমাকে আমি ভীষণ পছন্দ করি, শুভ। তোমার কাছে থাকতে আমার ভালোলাগে। ভীষণ কম্ফরটেবল লাগে। এইমুহূর্তে এই পৃথিবীতে একমাত্র তোমাকেই ভীষণ আপন মনে হয় আমার। কিন্তু অনেস্টলি, তোমার প্রতি এখনো অবধি কোন রোমান্টিক অনুভূতি কাজ করেনা আমার। আরও স্ট্রেইট ফরওয়ার্ড হয়ে বললে শারীরিক কোন মুগ্ধতাও নেই। তবে তোমাকে আমি ভালোবাসি। আমার খুব কাছের বন্ধু হিসেবে। আমার ভীষণ প্রিয় মানুষ হিসেবে।'
শুভ মুচকি হাসল। প্রিয়তার হাতটা নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে বলল, ' এটুকুই যথেষ্ট। তুমিতো জানো আমার বাবা নেই। আমার তিনবছর বয়সে একটা কার অ্যাক্সিডেন্টে সে মারা গেছে। একা হাতে অনেক কষ্টে আমায় বড় করেছে আম্মু। আমার মায়ের একমাত্র স্বপ্ন আমি ডাক্তার হব। ঠিক আমার বাবার মতো। আমার জীবনের সবকিছু ওনার জন্যেই। কারণ আমি ছাড়া আমার মায়ের কেউ নেই। আমার জীবনে ঐ একটা নারীই ছিল যাকে আমি ভালোবাসতাম। কিন্তু এখন, এখন আমি তোমাকেও ভালোবাসি। প্রথম যখন তোমাকে ঐ আউটিংয়ে দেখেছিলাম, সকল হৈ হুল্লোড় করতে থাকা মেয়েদের মধ্যে একা বিরক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা একটা মেয়ে। এরপর তোমার লুকিয়ে স্মোক করা। বাঘিনীর মতো তেড়ে আসা। আই নো ইটস্ উইয়ার্ড, বাট অন দ্যট মুমেন্ট আই ফেল সামথিং। আর তোমার সঙ্গে এভাবে মেশার পর, তোমাকে এতোভাবে জানার পর আই ক্যান ক্লিলিয়ারলি সে আই লাভ ইউ। আমার মায়ের পর আমি তোমাকে ভালোবাসি।'
প্রিয়তা উত্তরে মুচকি হাসল কেবল। কী অদ্ভুত! শুভর জীবনের সবকিছু তার মা। আর অন্যদিকে ওর জীবনের অভিশাপ ওর মা। শুভ তার মাকে প্রচন্ড ভালোবাসে। কিন্তু প্রিয়তা নিজের মাকে ঘৃণা করে, মনপ্রাণ দিয়ে ঘৃণা করে।
******
দেখতে দেখতে কেটে যায় আরও ছ'টা মাস। এরমধ্যে একদিন শানকে নিজের ঘরে ডেকে পাঠায় সুমনা মির্জা। বাড়িতে তখন শওকত নেই। দেশে ফেরামাত্র ডার্ক নাইটের হাল শক্ত করে ধরেছে সে। এখন সোলার সিস্টেমের কোনরকম সহযোগিতা ছাড়াই তাকে এগোতে হবে। তবে সেসব করতে সুমনার কাছ থেকে আর্থিক সাপোর্ট তার প্রয়োজন পড়ে। বর্তমানে বেশ সফল বিজনেস উইমেন সে। যদিও এই ব্যবসার আসল মালিক শওকত নিজেই, কিন্তু কাগজে-কলমে এই অধিকারতো সুমনারই। ব্যক্তিগত স্বার্থেই শওকত-সুমনার সম্পর্ক এখন স্বাভাবিক। তবে সেখানে কোন প্রেম, টান কিংবা সম্মান নেই।
শান তখনও পুরোপুরি ইনভল্ভড নয় এসবের কিছুতে। সুমনার হঠাৎ ডাকে সে একটুও বিভ্রান্ত হয়না। কারণ শান জানে তার মা তাকে কী বলবে। গত দুমা'স যাবতই বলছে। অনেকটা বিরক্তি নিয়েই সে উপস্থিত হয় সুমনা মির্জার ঘরে। শানকে দেখে সুমনা নির্দেশ দেয়, 'বসো।'
বিরক্ত শান বসে পড়ে মায়ের কথামতো। সুমনা বলল, 'তোমাকে আগেও বলেছি। বিয়ের বয়স হয়েছে তোমার। এমপি শরিফুল রহমানের মেয়ে রিমিকেতো দেখিয়েছি তোমাকে। আবার বিট্রেন যাওয়ার আগে ওকে বিয়ে করে যাবে তুমি। তোমার বাবারও একই মত। এ নিয়ে আর কোনরকম কোন কথা চলবেনা।
বিরক্তির ভ্রুকুটি বৃদ্ধি পায় শানের, 'আমিতো আগেও বলেছি মা, আমি এখন বিয়ে করব না। আর ঐ মেয়েকেও আমি বিয়ে করতে পারব না।'
' কেন? কী সমস্যা ঐ মেয়ের মধ্যে?:
' কোন সমস্যা নেই। কিন্তু আমার নিজস্ব পছন্দ বলেও কিছু আছে। আমি এখন বিয়ে করতে চাইছিনা। কতবার বলব এই এককথা।'
ছেলের একরোখা জবাবে রেগে গেল সুমনা। আগুন চোখে তাকিয়ে বলল, 'তোমার বাবা অলরেডি সব কথাবার্তা বলে এসছে শান। আমিও চাই এই সম্বন্ধ হোক। আমাদের সন্তানের পরিচয় নিয়ে বাঁচতে চাইলে তোমাকে এই বিয়ে করতে হবে।'
' মা!' হতবাক হয়ে গেল শান।
সুমনা একরোখা গলায় জবাব দিল, 'এটাই শেষ কথা। আর তোমার বাবার সঙ্গে আলাদা করে কথা বলে লাভ নেই। সেটা তুমি জানো। আজকের মধ্যে সিদ্ধান্ত জানাও।'
শান উঠে দাঁড়াল। চোখবন্ধ করে লম্বা শ্বাস ফেলে বলল, 'আমি ইতিমধ্যে বিবাহিত মা।'
চমকে উঠল সুমনা মির্জা। হতবাক হয়ে ছেলের দিকে তাকিয়ে বলল, ' কী!'
খানিকক্ষণ চুপ থাকল শান। অতঃপর নিজেকে ধাতস্থ করে বলল, ' তনুজা। আমাদের যে ড্রাইভার কাকা জলিল। তার মেয়ে। আই লাভ হার। গতমাসে, গতমাসে ওকে আমি বিয়ে করেছি। ভেবেছিলাম মাস্টার্সটা শেষ করে তোমাদেরকে বলব। কিন্তু _ আমার পক্ষে আর কাউকে বিয়ে করা সম্ভব না।'
সুমনা হতবাক হয়ে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকার পর ঠাটিয়ে একটা চড় মেরে বলল, 'এইজন্য তোমাকে এভাবে খাইয়ে-পড়িয়ে মানুষ করেছি আমরা? বিদেশে পড়িয়েছি এই দিন দেখতে? শেষে কি-না একটা ড্রাইভারের মেয়ের প্রেমে পড়েছো? তাও ঐ তনুজা! পড়েছো, পড়েছো। ভালো যখন লেগেছিল ক'দিন ফুর্তি করে ছেড়ে দিতে। বিয়ে কেন করতে হবে?'
শান হতভম্ব চোখে তাকাল নিজের মায়ের দিকে। বিস্ময়ে বিমূঢ় হয়ে বলল, 'মা! কী বলছো নিজে জানো?'
ধমকে উঠল সুমনা, 'চুপ করো! কে কে জানে বিয়ের কথা?'
শান মাথা নিচু করে বলল, ' আমাদের কজন বন্ধু জানে।'
দুহাতে মুখ ঢেকে বসল সুমনা। কিছুক্ষণ জোরে জোরে শ্বাস ফেলে নিজেকে ধাতস্থ করে বলল, 'ডিভোর্স দিয়ে দাও।'
শান আরও একবার চমকাল, 'কী?'
সুমনা ধমকে উঠল, ' শুনতে পেয়েছো তুমি আমায়। ডিভোর্সের ব্যবস্থা করছি আমি। ডিভোর্স দাও ওকে।'
শানের চোখমুখ শক্ত হল এবার, 'সম্ভব না।'
সুমনা তেঁতে গিয়ে বলল, ' কেন? একমাস আগে বিয়ে করেছো। এতদিনে নিশ্চয়ই যা করার তা করে ফেলেছো। আর কী চাই? ছেড়ে দাও এবার।'
শান আরও বেশি হতবাক হল নিজের মায়ের চিন্তাধারা দেখে। দাঁতে দাঁত চেপে বলল, ' পাগল হয়ে গেছো তোমরা।'
শান চলে যেতে নিলেই সুমনা মির্জা বলে উঠল, 'রিমিকে বিয়ে তোমায় করতে হবে শান। নয়তো শুধু আমার বিজনেস না, তোমার বাবার দলেরও ক্ষতি হয়ে যাবে। ঐ দুই টাকার ড্রাইভারের মেয়ের জন্যে আমি তা হতে দেবনা। ইউ হ্যাভ টু ডিভোর্স হার।'
শান দাঁড়িয়ে গিয়ে বলল, ' আমাকে ত্যাজ্য করলেও তা সম্ভব না।'
' আর তনুজাকে মেরে ফেললে?'
শান বিস্ফোরিত চোখে ফিরে তাকাল নিজের মায়ের দিকে। সুমনার চোখে তখন ভয়ংকর শীতলতা। শানের শরীর শিরশির করে উঠল। ও কোনমতে বলল, 'তোমরা এমন কিছু করবেনা।'
সুমনা শীতল স্বরেই বলল, ' করে দেখালে তারপর মানবে?'
ভেতরে ভয় ঢুকেছে শানের। তবে সে তা প্রকাশ করল না। শক্ত থেকে বলল, ' আমি তনুজাকে ছাড়ছিনা। আর না রিমিকে বিয়ে করছি। তোমরা যা খুশি করো।'
বলতে বলতে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেল শান। সেদিকে চেয়ে থেকেই ফোন কানে তুলল সুমনা। কলের ওপাড়ে থাকা শওকতকে বলল, 'শুনলে? আমার ধারণাই ঠিক ছিল। ঐ ড্রাইভারের মেয়েটাই।'
শওকত বলল, ' শুনলাম।'
' এখন কী করবে? ব্যবসা ডুবিয়ে বউমা বরণ করবে? শফিকের দেওয়া ডিলটা আমাদের কতটা দরকার সেটা নিশ্চয়ই জানো? তারওপর কাশেম ভাইয়ের ভাগ্নি রিমি। সবদিক দিয়েই আমাদের লাভ ছিল। তোমার ছেলে সব ডোবাল।'
' আমি চাইনা কিছু ডুবুক। ওকে রাজি করাও। যেকোন উপায়ে। এই মুহূর্তে ডার্ক নাইট ধরে রাখতে হবে আমাকে।'
' বলছো?' যেন এই ছাড়টুকুর অপেক্ষাই করছিল সুমনা।
শওকত নির্বিকারভাবে বলল, ' বলছি।'
———
শান আর তনুজায সম্পর্কের শুরুটা হয়েছিল চারবছর আগে। শান ব্রিটেন যাওয়ার আগে যে কটাদিন বাড়িতে একা ছিল। তখন শানের গাড়ির ড্রাইভার ছিল তনুজার বাবা। তনুজাকে শান প্রথমবার দেখে ওর গাড়িতেই। শানের অনুমতি নিয়েই ওর বাবা দু'বার ওকে স্কুলে ড্রপ করে দিয়েছিল। সেই দুইবারই হালকার ওপর চোখে পড়েছিল। তবে গুরুত্ব দেয়নি সেভাবে। কিন্তু শানের জন্যে যে রান্না করতে আসল, হঠাৎ ব্রেইন স্ট্রোক করে প্যারালাইজড হয়ে গেলেন। আচমকা ব্যবস্থা না থাকায় তনুজার বাবা তনুজাকেই পাঠালেন শানের রান্নার দায়িত্বে। সেদিন বেশ বেলা করে ঘুম ভাঙে শানের। চোখ ডলতে ডলতে নিচে আসতেই ওর চোখ যায় রান্নাঘরে। পঞ্চাদশী সেই কন্যাকে কোমরে ওড়না বেধে, অগোছালো খোপায় রান্না করতে দেখে থমকে যায় শান। ঘর্মাক্ত ঐ কিশোরী মুখ দেখেই প্রথমবার ঘায়েল হয় সদ্য আঠারোতে পা দেওয়া শান মির্জা। ওর সেই থমকানো দৃষ্টিতে দৃষ্টি মেলায় তনুজাও। খানিকটা সংকোচ নিয়ে চোখ সরিয়ে নেয় সঙ্গেসঙ্গে।
প্রেমটা হয়েছিল আরও পরে। প্রতিদিনই রান্না করতে মির্জা ম্যানশনে আসতো তনুজা। সে সুবাদে রোজ দেখা হতো ওদের। প্রথম প্রথম কেবল দৃষ্টি বিনিময়। এরপর টুকটাক কথা শুরু করল শান নিজেই। এখনো মনে পড়ে, অনেকটা ফ্লার্ট করার স্টাইলেই প্রশ্ন করেছিল শান, 'তোর নাম তনুজাতো নাকি? রান্না আসলেই পারিস নাকি না খাইয়ে কঙ্কাল বানাবি?'
শোনামাত্র কেমন রক্তিম হয়ে উঠেছিল তনুজার গাল। শুরুতে বেশ সংকোচ বোধ করলেও ধীরে ধীরে সাবলীল হতে শুরু করল তনুজাও। প্রথম দেখায় অনুভূত হওয়া সেই ভালোলাগা আর আকর্ষণ ধীরে গাঢ় হল। অল্প বয়সের তাজা, প্রবল অনুভূতিতে স্বয়ংক্রিয়ভাবেই বাঁধা পড়ে গেল ওরা। সেটা ছিল অল্পবয়সের আবেগময় প্রেম। সেই প্রেম তীব্র হতে হতে শানের ব্রিটেনে যাওয়ার সময় চলে আসে। শান ব্রিটেনে যাওয়ার সময় যখন শেষবার মির্জা ম্যানশনে আসে। তখন সযত্নে শানের পছন্দের রান্না করে সে। খাওয়াদাওয়া শেষে তনুজাকে নিয়ে নিজের শোয়ার ঘরে যায় শান। মেয়েটার মুখমন্ডল তখন অন্ধকারাচ্ছন্ন। টলমল করছে চোখজোড়া। বিছানায় বসিয়ে শান ওর হাতজোড়া ধরে বলেছিল, 'কাঁদছিস কেন? তোর এমন মুখ দেখে গেলে আমি শান্তি পাব?'
তনুজা ঠোঁট ফুলিয়ে বলেছিল, ' আপনি সত্যিই নিয়মিত যোগাযোগ রাখবেনতো, ছোট সাহেব?'
' তোর সঙ্গে যোগাযোগ না করলে আমি টিকব কীকরে?'
বলেই প্রগাঢ় এক চুমো খেল তনুজার ঠোঁটে। নীরবে কেঁদে ফেলে সাড়া দিল তনুজাও। দীর্ঘ এক চুম্বনের পর ঠোঁটে ঠোঁট রেখেই ফিসফিসিয়ে বলল, 'ফিরে এসেই আমি বিয়ে করব তোকে তনু। কথা দিচ্ছি।'
———
পরেরদিন কাশেমের সঙ্গে একটা হোটেলে দেখা করল সুমনা। নিজেদের নিত্য সে ঘনিষ্ঠ মুহূর্ত কাটানোর পর, কাশেমের বুকে মাথা রেখেই সবটা খুলে বলল। সবশুনে কাশেম বলল, 'তো এখন? ঐ মেয়েকে সরিয়ে ফেলতে হবে। এইতো?'
সুমনা সঙ্গে সঙ্গে মাথা তুলে বলল, ' একদমই না। তনুজাকে মেরে ফেললে শানের কোন ভয় থাকবেনা। পরে আর কোনভাবেই রিমিকে বিয়ে করতে রাজি হবেনা ও।'
' তাহলে?' উঠে বসে শার্ট পড়তে পড়তে বলল কাশেম।
সুমনাও পোশাক পড়তে পড়তে বলল, ' আমার মেয়ে.. খবর নিয়েছি সে নাকি বোর্ডিংয়ে একটা ছেলের সঙ্গে খুব মেলামেশা করছে দেড়বছর যাবত। শান কিছুটা জানে সেসম্পর্কে। আমার ছেলে এখনো বিশ্বাস করেনি আমি চাইলে তনুজাকে সরিয়ে দিতে পারি। তাই অন্যভাবে ওকে বিশ্বাস করাতে হবে ওকে। যে আমরা চাইলেই সরিয়ে ফেলতে পারি। বুঝেছো নিশ্চয়ই? ব্যবস্থা করো।'
হেসে ফেলল কাশেম। প্যান্টে বেল্ট লাগাতে লাগাতে বলল, 'তোমার জবাব নেই সুইটহার্ট। পাক্কা ক্রিমিনাল মাইন্ডেট হয়ে গেছো আজকাল। কে বলবে এই সেই ইডেনের ভোলাভালা সুমনা ছিল? প্রাউড অফ ইউ।'
কিন্তু সেদিন ক্লাস টিচারের সঙ্গে বোর্ডিয়ের বাইরে কিছু জিনিস কেনার কাজে বেরিয়েছিল প্রিয়তাসহ আরও কয়েকজন মেয়ে। কিনে ফেরার সময় দূর থেকে প্রিয়তা দেখতে পায় সুমনা আর কাশেমকে। একই গাড়িতে ছিল দুজন। দেখামাত্র চোখমুখ শক্ত হয়ে যায় ওর। শরীর জ্বলে ওঠে। চোখে জল চলে আসে। রাগে, ঘৃণায় থরথর করে কাঁপতে থাকতে পুরো শরীর। হোস্টেলে ফিরে এসে বমি করে দেয় ও। সারাদিন পাগলের মতো ছটফট করে। কিন্তু শান্তি পায়না কিছুতেই।
সেদিন রাতে সেই সিনিয়রদের রুমে যায় প্রিয়তা। ভেতরে উপচে পড়া রাগ-জেদ থেকে আবার সেদিন ড্রাগস্ নেয় নিজের শরীরে। নিজেকে স্বস্তি দেওয়ার আর কোন উপায় পায়না।
———
পরেরদিন ওদের আবার একটা আউটিংয়ে বাইরে নেওয়া হয়। প্রিয়তার মেজাজ খিটখিটে হয়ে ছিল সকাল থেকেই। সামনে প্রিয়তার এসএসসি, শুভর এইচএসসি। পড়াশোনা নিয়ে ভীষণ ডেডিকেটেড শুভ। মায়ের স্বপ্ন বলে কথা। তাই তখন দেখা কম হতো ওদের। কিন্তু ঐদিন প্রায় এক সপ্তাহ পর প্রিয়তাকে দেখে কপাল কুঁচকে ফেলে শুভ। প্রিয়তাকে দেখতে অদ্ভুত লাগছিল। চোখমুখ অদ্ভুত ফ্যাকাসে, অস্থির। প্রিয়তা এমনিতেই একা থাকতে পছন্দ করে। সেদিন আরও বেশি একা থাকছিল। হাঁটতে হাঁটতে রাস্তার ওপাড়ে গিয়ে একটা বেঞ্চে বসে ছিল চুপচাপ। এইপাশে তখন একটা প্রতিযোগিতা হচ্ছে। সবাই সেকাজে ব্যস্ত। শুভ কিছুক্ষণ অনেক দূরে, রাস্তার ওপাশে বসে থাকা প্রিয়তাকে দেখল। তারপর মীরাকে জিজ্ঞেস করল, ' কী হয়েছে ওর?'
মীরা অসহায় গলায় বলল, ' জানিনা ভাইয়া। কিন্তু কাল রাতে আবার_'
বলে মাথা নিচু করে ফেলল মীরা। শুভকে আর বলতে হলোনা। শুভ বুঝে গেল। মেজাজ প্রচন্ড চটে গেল ওর। হনহনে পায়ে রাস্তা পেরিয়ে চলে গেল ওপাড়ে। প্রিয়তার পাশে বসে বলল, 'কী হয়েছে?'
প্রিয়তার মেজাজ ভালো ছিলোনা। তবুও ঠান্ডা গলায় বলল, 'কিছুনা। লীভ মি এলোন।'
' কাল আবার ড্রাগস্ নিয়েছো তুমি?'
প্রিয়তা জবাব দিলোনা। শুভ দাঁতে দাঁত চেপে বলল, 'কিছু জিজ্ঞেস করেছি আমি তোমাকে।'
প্রিয়তা তাও চুপ। শুভ ওর হাত চেপে ধরে ধমকে উঠল, 'কথা বলো!'
প্রিয়তা রেগে গেল। ঝাড়া দিয়ে হাত ছাড়িয়ে বলল, ' হ্যাঁ নিয়েছি। আরও নেব। রোজ রোজ নেব। তোমার কী তাতে? হু দ্য হেল আর ইউ টু টেল মি?'
শুভ হতবাক চোখে কিছুক্ষণ তাকিয়ে দেখল প্রিয়তাকে। অতঃপর দাঁতে দাঁত চেপে বলল, ' আমি কেউ নই। আর আজকের পর থেকে হতেও চাইনা। কারণ তুমি তার যোগ্যই না। অপাত্রে এতো অ্যাফর্ড দিচ্ছিলাম আমি এতোদিন। ভেবেছিলাম বদলে দিচ্ছি তোমাকে। কিন্তু সত্যিতো এটাই, তুমি কখনও বদলাবে না। তুমি এক্সাক্টলি তোমার মায়ের মতো হয়েছো। হ্যাঁ, ঠিক তোমার মায়ের মতো। তোমার মায়ের মতো তুমিও যার জীবনে যাবে, তার জীবনটাই হেল করে দেবে। তোমাকে ভালোবাসা মানে নিজেকে ধ্বংস করা। সে ভুল আমি আর করবোনা। থাকো তুমি তোমার মতো। আর আসবনা আমি তোমার কাছে। কোনদিনও না।'
বলে উঠে দাঁড়াল শুভ। রাগে জেদে পা বাড়াল সামনের দিকে। প্রিয়তা থম মেরে শুনছিল শুভর তিরস্কার। "তুমি ঠিক তোমার মায়ের মতো হয়েছো"। কথাটা ভেতর থেকে ফালাফালা করে দিল ওকে। যন্ত্রণায় সর্বাঙ্গ কামড়ে উঠল। ও উঠে দাঁড়িয়ে চিৎকার করে বলল, 'হ্যাঁ যাও। থাকতে হবেনা কাউকে আমার মতো খারাপ মেয়ের কাছে। যাও, তুমিও চলে যাও। জাহান্নামে যাও। আই ডোন্ট গিভ এনি ফা*।'
শুভ তখন জেদ নিয়ে পার হচ্ছিলো রাস্তাটা। প্রিয়তার কথাটা শেষ হওয়া মাত্রই কোথা থেকে একটা ট্রাক উগ্রগতিতে এসে ধাক্কা দিল শুভকে। প্রিয়তার শরীর ঝাঁকুনি দিয়ে উঠল। শুভর ছিপছিপে লম্বা শরীরটা ভারী ভারী চাকার তলে সবেগে পিষে দিয়ে চলে গেল বিশাল ভারী ট্রাকটা। প্রিয়তা থমকে দাঁড়িয়ে রইল নিজ জায়গায়। চোখ দুটো পাথরের মতো স্থির হয়ে গেল, কেঁপে উঠল ঠোঁটজোড়া। সকলে হৈচৈ করে ছুটে আসছে। অথচ প্রিয়তা কিছু শুনতে পাচ্ছেনা। চারপাশটা ঝিম ধরে আছে ওর। পাথরের মতো দাঁড়িয়ে আছে একইভাবে। স্তব্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে দেখছে র*ক্তে ভেসে যাওয়া রাস্তায় থেতলে ছিন্নভিন্ন হয়ে পড়ে থাকা শুভর লাশটাকে।
শুভকে হাসপাতালে নিয়ে যেতে হলো না। দূর থেকে দেখেই যে কেউ বলে দিতে পেরেছে, স্পট ডেড। শরীরের এক তৃতীয়াংশ থেতলে প্রায় মিশে গেছে রাস্তার সঙ্গে। বাকি অংশটুকুও অক্ষত ছিলোনা। পুলিশের এসে বেশ বিড়ম্বনা পোহাতে হয়েছে সে লাশ তুলতে। অন্যকারো ক্ষমতা ছিলোনা, ঐ লাশের দিকে বেশিক্ষণ তাকিয়ে থাকার।
অথচ প্রিয়তা এক সেকেন্ডের জন্যেও দৃষ্টি সরালোনা শুভর বিভৎসভাবে পিষে দেওয়া শরীরটা থেকে। দেখল; ঐ লম্বা, ছিপছিপে, ঝকঝকে ফর্সা শরীরটা ভারী চাকার পিষ্টনে কীভাবে বিনষ্ট হয়ে গেছে। চঞ্চল ঐ শরীরটা কীভাবে স্থির হয়ে গেছে চিরকালের মতো। মীরা ঠিক পাশেই দাঁড়িয়ে ছিল ওর। একবার শুভর লাশের দিকে তাকানো মাত্রই ভেতর থেকে সবকিছু উল্টে আসছিল। দ্বিতীয়বার সেই দিকে তাকানোর সাহস হয়নি আর। না সাহস হয়েছে পাশেই স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েটাকে কিছু বলার।
এক্সিডেন্টের সময় থেকে শুরু করে, লাশ তুলে নেওয়ার সময় পর্যন্ত সেই একই জায়গায় স্থির পাথরের মতো দাঁড়িয়ে ছিল প্রিয়তা। শরীর স্থির, মস্তিষ্ক সম্পূর্ণ শূণ্য। পলকহীন চোখে তাকিয়ে ছিল শুভর দিকে। যে আর পৃথিবীতে নেই। অথচ কিছুক্ষণ আগেও সে ছিল, প্রিয়তার পাশেই বসেছিল। ওর দিকে অভিমানমাখা একঝুলি তিক্ত বাণী ছুড়ছিল। কোনদিন না ফেরার হুমকি দিয়ে চলে যাচ্ছিল।
সেদিন বাকি সবার সঙ্গে নির্জীব কোন বস্তুর মতোই বোর্ডিংয়ে ফিরে আসতে হল প্রিয়তাকে। কোনদিকে না তাকিয়ে যন্ত্রের মতো ফিরে এলো নিজের রুমে। ঘটে যাওয়া ব্যপারটা তখনও মেনে নিতে পারেনি ওর মন-মস্তিষ্ক। নিজের বরাদ্দকৃত বিছানার এককোণে ঘাপটি মেরে বসে ছিল ও। শরীরের ওপর চাপিয়ে নিয়েছিল ভারি এক কম্বল।
দীর্ঘক্ষণ ওর অমন স্তম্ভিত অবস্থা লক্ষ্য করেছে মীরা। বাকি রুমমেটরা ছিলোনা কেউ সেসময়। ভীষণ মায়া হল ওর মেয়েটার জন্যে। অমন উগ্র, বদমেজাজি, অহংকারি মেয়েটার জীবনে সবে খানিকটা নমনীয়তা আসছিল। শুভ ভাই তার আশ্চর্য গুণে কেমন বদল আনছিল মেয়েটার মধ্যে। অথচ সব যেন কয়েক সেকেন্ডেই শেষ হয়ে গেল। মীরা অনেকটা সাহস জুগিয়েই গিয়ে বসল প্রিয়তার বিছানায়। ভয়ে ভয়ে প্রিয়তার কাঁধে হাত রাখল। যদি রেগে যায়? কিন্তু যখন দেখল, প্রিয়তা প্রতিক্রিয়াহীন; তখন চিন্তিত হয়ে বলল, 'এভাবে থম মেরে থাকিসনা। একটু কেঁদে নে। অসুস্থ হয়ে যাবি তুই।'
কিন্তু প্রিয়তা একদমই কাঁদল না সেদিন। কাঁদবে কীকরে? ওর মস্তিষ্ক তখনও মেনে নিতে পারেনি যে শুভ নেই। ও আর কোনদিন দেখতে পাবেনা শুভকে। কিন্তু যত সময় পার হল, সেই অনুভূতিতে প্রবলভাবে তলিয়ে যেতে শুরু করল ও। তখন; যখন কম্পিউটার ল্যাবে আর সেই কাঙ্ক্ষিত চেহারার সন্ধান পেলোনা, সাইন্স বিল্ডিংয়ের পেছনে কেউ লুকিয়ে ওর সঙ্গে দেখা করতে আসল না, কেউ আর গ্রাউন্ডে ডাকল না। কেউ শাসিয়ে বললনা রাগের ওপর নিয়ন্ত্রণ করতে, হাঁটাচলা সভ্য করতে, পড়াশোনায় মনোযোগ দিতে। যখন পুরোপুরি উপলব্ধি হল, শুভ সত্যিই আর কোনদিন আসবেনা। জগতটা বিষিয়ে উঠল ওর। মনে হল চারপাশের সবকিছু চেপে বসে দম বন্ধ করে রেখেছে। সেই যন্ত্রণাকে আরও বাড়িয়ে দিল শুভর সঙ্গে কাটানো ওর শেষ মুহূর্তটা। কতটা আঘাত করেছিল ও শুভকে শেষ মুহুর্তে। কতটা কষ্ট পেয়েছিল ছেলেটা ওর কথায়, কাজে, আচরণে। কতটা অভিমান নিয়ে চলে যাচ্ছিল সে। প্রিয়তা জানে, কদিন পর আবার ফিরে আসতো শুভ। শুভ না আসলে প্রিয়তা নিজেই যেতো। শুভও আবার আগের মতোই আগলে রাখতো ওকে সব খারাপ দিক থেকে। অথচ এখন আর সে ফিরবে না, প্রিয়তাও তার কাছে যেতে পারবেনা। প্রিয়তার একমাত্র নিজেকেই দায়ী মনে হল এর জন্যে। ও যদি ওভাবে শুভকে কষ্ট না দিতো, নিশ্চয়ই শুভ দেখেশুনে রাস্তা পাড় হতো। সে খুবই সাবধানী ছেলে ছিল। ওর ওপর রাগ করেইতো ওভাবে বেপরোয়া হয়ে রাস্তা পেড়োচ্ছিল শুভ।
নিজের ভেতরের তীব্র সেই শোক, অনুতাপ মনখুলে প্রকাশ করার সুযোগটাও প্রিয়তা পেলোনা তখন। কারণ পৃথিবীর চোখে শুভ ওর কেউ হয় না। কেবলই সেইম বোর্ডিং। এছাড়া আর কোন সংযোগ নেই ওদের মাঝে। কেবলই একই বোর্ডিংয়ে পড়া, ভিন্ন ক্লাসের এক সিনিয়র ছেলের মৃত্যুতে কাতর হওয়া অসংলগ্ন, ভিত্তিহীন, অনেকের চোখে হাস্যকর। অথচ একমাত্র প্রিয়তাই জানতো শুভ ওর কতটা কাছের ছিল। প্রিয়তার একমাত্র ভরসা, ভালোলাগা, নিরাপত্তার জায়গা ছিল ঐ ছেলেটা। যে একনিমিষেই ওরই চোখের সামনে ছিন্নবিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। তার কারণও ও নিজেই। ওই অমন বিভৎস মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিয়েছে শুভকে। ওর সেই শোক, যন্ত্রণা, অনুতাপের নীরব আর্তনাদ বোঝার মতো কেউ ছিলোনা ওর কাছে। মীরা সবটা জানলেও প্রিয়তা পারছিলনা ওর সামনে নিজেকে মেলে ধরতে। ছোটবেলা থেকেই নিজের মনের অনুভূতিগুলো চেপে রাখতে রাখতে প্রকাশের ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছে ও বহু আগেই। ও কাউকে বলতে পারেনা নিজের মনের কথা। ব্যাখ্যা করতে পারেনা নিজেকে। সে বলয় কেবল শুভই ভেদ করতে পেরেছিল নিজ গুণে। কিন্তু সেতো নেই আর!
******
অন্যদিকে মির্জা ম্যানশনের পরিবেশ তখন থমথমে। সন্ধ্যা হয়েছে মাত্রই। দিনের সবটুকু আলো ফুরিয়ে এপ্রান্তে তখন কেবলই কৃত্রিম আলোয় মোড়া। সুমনা মির্জা উষ্ণ জলের একটা রিল্যাক্সড শাওয়ার নিয়ে বের হয়েছে মাত্র। গুনগুনিয়ে গান গাইতে গাইতে মাথায় তোয়ালে পেঁচিয়ে আরাম করে সোফায় গা এলিয়ে দিল সে। হাতে তুলে নিল নেইল ফাইলার। আজ মনটা ফুরফুরে। ঠিকঠাক একটা ডিল ফাইনাল হয়েছে আজ। ইদানিং সবকিছুই তার মনমতো হচ্ছে। সময়টা ভালো যাচ্ছে খুব। এবার শুধু এমপির সঙ্গে সই-সাবুত হয়ে গেলেই ব্যস। আর পেছনে ফিরে তাকাতে হবেনা। কিন্তু তারজন্যে তার ঐ ঘাড়বাঁকা ছেলের ঘাড়টা সোজা করতে হবে। এতোদিনেতো খবরটা পৌঁছে যাওয়ার কথা শানের কানে। এখনো এলোনা যে? কথাটা ভাবতে ভাবতেই কেবলমাত্র ফাইনালটা নখে লাগিয়েছে সুমনা। তখনই সশব্দে খুলে গেল তার ঘরের দরজা। ক্ষীপ্র পায়ে ভেতরে প্রবেশ করল শান। এসে দাঁড়াল সুমনার ঠিক সামনে। চোখদুটোতে আগুন জ্বলছে ওর। শীতল গলায় শান বলে উঠল, 'তুমিই করিয়েছো এটা। তাইনা?'
সুমনার ঠোঁটে ছোট্ট এক টুকরো হাসি ফুটল। তীর ঠিক জায়গাতেই লেগেছে। তবুও নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে উঠে দাঁড়িয়ে বলল, 'কীসের কথা বলছো?'
' নাটক করবেনা। ইউ নো হোয়াট আই অ্যাম ট্যকিং অ্যাবাউট।' উত্তেজিত হয়ে উঠছে শানের গলা।
এইবার ভনিতা ছাড়ল সুমনা। অকপটে বলল, 'আমিতো আগেই বলেছিলাম শান। বারবার বলেছিলাম। আমি কী করতে বা করাতে পারি সেটা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করোনা। পস্তাবে। তোমার সন্দেহ দূর করতে বাচ্চা একটা ছেলেকে ওভাবে মরতে হল। শুনেছি ডেডবডিটাও নাকি ঠিকঠাক কালেক্ট করা যায়নি। চিন্তা করোতো, কালকে ঐ সেইম অবস্থা তনুজার হলে কেমন_'
বাক্যটা শেষ করতে পারল না সুমনা। তার আগেই খপ করে সুমনার গলাটা চেপে ধরল শান। চোখদুটো লাল হয়ে গেছে ওর, দৃষ্টিতে তখনও অবিশ্বাস। অবিন্যস্ত শ্বাস ফেলতে ফেলতে বলল, ' এতোটা জঘন্য কাজ করতে পারলে কীকরে তোমরা! খু-খন! তাও একটা নির্দোষ বাচ্চা ছেলেকে! হু ডাজেন্ট ইভেন নো ইউ্য। হাও, ইউ বিচ!'
ফ্যাঁসফ্যাঁসে গলায় ধমকে উঠল সুমনা, 'শান! বিহেভ ইওর সেলফ। এ কেমন ভাষা! মা হই আমি তোমার! ছাড়ো!'
' মা মাই ফুট! ব্লাডি কিলার ইউ আর! এই ডাক শোনারও যোগ্য নও তুমি। মা হওয়ার কোন দায়িত্ব পালন করেছো তুমি এখানো অবধি? ছোট থেকে কটা দিন ছিলে তুমি আমাদের কাছে? আমাকেতো তাও বছরখানেক হলেও নিজের কোলে রেখেছিলে, ফিডিং করিয়েছিলে। রাণীর জন্যেতো তাও করোনি। তোমার মনে আছে শেষ কবে আমাদের কাউকে খাইয়ে দিয়েছিলে তুমি? মাথায় হাত রেখে জিজ্ঞেস করেছিলে, কেমন আছি? পাঁচবছর যাবততো নিজের মেয়ের মুখটাও দেখোনি। একটা জন্তুও তার সন্তানকে নিজে চলতে শেখার আগ অবধি আগলে রাখে। তুমি কেমন মা? আমাকেতো তাও মিতা মা বড় করে তুলেছিল। রাণীর ক্ষেত্রেতো সেটাও ঠিকঠাক হয়নি। তার আগেই_ রাণীর একমাত্র ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিল ও। একটু নরমাল হচ্ছিলো মেয়েটা। সবটা স্পয়েল করে দিয়েছো তুমি। আরও বেশি ড্যামেজ করে দিয়েছো ওর।'
ধাক্কা দিয়ে নিজের থেকে দূরে সরাল সুমনা শানকে। শাসিয়ে বলল, 'কে বলেছিল একটা ফকিন্নির বাচ্চার সাথে মিশে ওকে নরমাল হতে? সারাজীবন উল্টোপাল্টা কাজ করে জ্বালিয়ে মেরেছে। যে নিজে আমার সাথে দেখা করতে চায়না তার সঙ্গে দেখা করে কী করব আমি?'
শান স্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে রইল। সুমনা একই ঝাঁঝ নিয়ে বলে চলল, 'আর তুমি! কী খুনি খুনি যপছো? এই বাড়ির লোকজনকে খু*ন-খারাবি করতে প্রথম দেখছো মনে হয়? তোমার বাপ কী করে, সেখানে কী হয়, জানা নেই তোমার? দুটো ডিলে নিজে পার্টিসিপেট করোনি?'
শানও সমান তেজ নিয়ে বলল, 'করেছিলাম। কিন্তু কাউকে খু*ন করিনি।'
' হাহ্! তুমি যেই বাড়িতে দাঁড়িয়ে আছো, সেই বাড়ির প্রত্যেকটা ইটে অন্যের রক্ত লেগে আছে। সে কথা তোমার জানা। সব জেনেও সেই টাকাতেই এতো আয়েশ-ফুর্তি করছো। আজ নিজের স্বার্থে লেগেছে বলে জ্বলছে না? সাধু সাজবেনা। রাক্ষসবংশে জন্ম নিয়ে কেউ বেশিদিন নিরামিষাশী হয়ে থাকতে পারেনা। মির্জা বংশের ছেলে তুমি। বি আ ম্যান। একটা মেয়ের জন্যে এতো গলে যাওয়ার কী আছে?'
' শী ইজ মাই ওয়াইফ!'
তাচ্ছিল্য করে হাসল সুমনা মির্জা। পুনরায় সোফায় বসল। ফাইলার দিয়ে নখ শার্প করতে করতে বলল, 'ওয়াইফ! এ বিয়ে কোন বিয়ে না। এখন আমার কথা মন দিয়ে শোন। আশাকরি আর কোনভাবে আমায় তোমাকে বোঝাতে হবেনা যে রিমির সঙ্গে তোমার বিয়েটা দেওয়া আমার জন্যে, ইভেন তোমার বাবার জন্যেও কতটা জরুরি। কোনরকম ঝামেলা না করে চুপচাপ রাজি হয়ে যাও। আর ঐ মেয়ের সঙ্গে তোমার ডিভোর্সের ব্যবস্থা করছি আমি।'
' আমি ওকে ডিভোর্স দেবনা।' এখন আর তেজ নেই শানের গলায়।
ভ্রু তুলে তাকাল সুমনা. ' আমার ধৈর্যের পরীক্ষা নিওনা শান। আমি চাইছিনা আরেকজন নির্দোষ মরুক।'
এপর্যায়ে অসহায় বোধ করল শান। একটা শুকনো ঢোক গিলে এলোমেলো দৃষ্টি ফেলল চারপাশে। প্রায় ভেঙ্গে আসা গলায় বলল, 'আই লাভ হার।'
হাত দিয়ে মাছি তাড়ানো ভঙ্গি করল সুমনা, 'ওসব লাভশাফ দুদিনের বিষয়। রিমির ধারেকাছেও নেই ঐ মেয়ে। রিমির সঙ্গে কদিন সংসার করলে এমনিই ভুলে যাবে ঐ মেয়েকে।'
মায়ের সামনে গিয়ে এবার হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল শান। হেরে যাওয়া অসহায়, ভাঙা গলায় বলল, 'ডোন্ট ডু দিস্। আই বেগ অফ ইউ, প্লিজ। ওকে ছাড়া থাকবে পারব না আমি। মরে যাব, ট্রাস্ট মি। জাস্ট একটা ডিলের জন্যে আমার লাইফটাকে এভাবে হেল করে দিওনা। জ্যান্ত কবর দিওনা আমাকে।'
কিন্তু সুমনা তার সিদ্ধান্তে অনড়। শানের হাজারটা আকুতিমিনতিতেও বিন্দুমাত্র টলল না সে। শান স্তব্ধ হয়ে গেল। অশ্রুসিক্ত চোখে তাকিয়ে রইল বিভৎস নারীটির দিকে। জন্মদাত্রির প্রতি টান ওর ছোটবেলাতেই কমে গিয়েছিল। বড় হতে হতে তার বাস্তবিকতা দেখে সেই বিচ্ছিন্নতা রূপ নিয়েছিল বিতৃষ্ণায়। তবে আজ ঘৃণা হচ্ছে ওর। ঘৃণায় রি রি করছে সর্বাঙ্গ। এই জঘন্য নারীর গর্ভে কিনা ও বেড়ে উঠেছিল! ছিঃ! শওকতের কাছে এখানে আসার আগেই সাহায্য চেয়েছিল শান। কিন্তু তার জবাব ছিল, 'তোমার মা কোনকালেই আমার নিয়ন্ত্রণে ছিলোনা। আজ থাকবে সে আসা করোনা। সবটা মেনে নেওয়াই তোমার জন্যে ভালো।'
সর্বস্বজুড়ে ঘৃণা নিয়েই শান শীতল স্বরে বলে উঠল, 'ফাইন! করব বিয়ে। রিমিকে বিয়ে করব আমি। কিন্তু তনুজাকে ডিভোর্স দেব কী দেবনা, সেটা আমি আর তনুজা ঠিক করব। সেটা আমাদের নিজস্ব সিদ্ধান্ত হবে। তবে হ্যাঁ, আমার প্রথম বিয়ের কথা কেউ কোনদিন জানবে না। তনুজার সঙ্গে আমার সম্পর্কটা চিরকাল সবার আড়ালেই থাকবে। আই হোপ, এইটুকু কনসিডার তুমি আমাকে করতে পারবে।'
সুমনা খানিকটা ভেবে বলল, 'বেশ! তবে আড়ালেই যেন থাকে। বিয়ের পর ওর সঙ্গে কোনরকম যোগাযোগ রাখবেনা তুমি। যদি কোনদিনও কোনভাবে এই সত্যি সামনে আসে। সেটা ওর জন্যে ভালো হবেনা। আর ঠিক কতটা ভালো হবেনা। সেটা তুমি জানো নিশ্চয়ই?'
শান কিছু বলল না আর। দুর্বল পায়ে উঠে দাঁড়াল। অনেকটা বিদ্ধস্ত অবস্থায় ফিরে গেল নিজ কক্ষে। এলোমেলো ভঙ্গিতে ফ্লোরে বসে পড়ল বিছানার পায়ার সঙ্গে হেলান দিয়ে। সবদিক দিয়ে অসহায় শানের তখন ভীষণভাবে মনে পড়ল ওর মিতা মায়ের কথা। আজ মিতা মা বেঁচে থাকলে বোধহয় ওকে এতোটা অসহায় হতে দিতোনা। সে নিশ্চয়ই দু-হাত দিয়ে আগলে রাখতো ওকে সবরকম দুঃখ যন্ত্রণা থেকে।
নিজের ফোন স্ক্রিনটা অন করে ওর সঙ্গে তনুজার একটা ছবি বের করল শান। ছবিটা ওদের বিয়ের দিনকার। তনুজাকে দেওয়া কথার খেলাপ করেনি শান। ব্রিটেন থেকে ফেরার দু সপ্তাহের মাথায় বিয়ে করেছে তনুজাকে। যদিও বিয়েটা হয়েছিল গোপনে। শানের তিনজন বন্ধু আর তনুজার দুজন বান্ধবী ছাড়া আর কেউ জানতোনা এ ব্যপারে। বিয়ের দিন অনেক বেশি নার্ভাস ছিল তনুজা। ভয়, সংশয়ে, দোটটানায় অস্থির হয়ে উঠছিল। সেইসঙ্গে প্রিয় মানুষটিকে বৈধভাবে পাওয়ার আনন্দও ছিল চোখেমুখে। বিয়ের দিন রাতে তনুজাকে নিয়ে এক বন্ধুর ফ্লাটে থেকেছিল ও। ভোরের দিকে শানের বুকে মাথা রেখে তনুজা ভেজা স্বরে বলেছিল, 'আমার খুব ভয় করছে ছোট সাহেব। সবাই যখন জানবে, তখন কী হবে?'
শান বলেছিল, ' আমি সবটা সামলে নেব।'
' আর যদি সামলাতে না পারেন? ছেড়ে দেবেন আমায়?'
তনুজার ব্যকুল প্রশ্নে মৃদু হেসে শান জানিয়েছিল, 'যত যাই হোক, তোকে আমি কোনদিনও ছাড়বনা। মাস্টার্সটা শেষ হতে দে। সব ঠিক করে দেব আমি। আর হ্যাঁ, এখন থেকে আর ছোটসাহেব না, শান ডাকবি। সাথে তুই করে বলবি। মনে থাকবে?'
সেকথা শুনে লালচে হয়ে উঠেছিল তনুজার গাল। অথচ এখন? কীভাবে ঠিক করবে শান? তনুজাকে ছেড়ে অন্যকাউকে বিয়ে করতে হবে ওকে। তনুজা কী বুঝবে ওর অবস্থা? সহ্য করতে পারবে? মেনে নিতে পারবে, নাকি ডিভোর্স চাইবে? মুক্তি চাইবে? কিন্তু শানতো মুক্তি দেবেনা ওকে। কোনভাবেই দেবেনা। তনুজা ও ছাড়া অন্যকারো হবে, সেটা কোনভাবেই সম্ভব না। শান সম্ভব হতে দেবেনা। আপন মনেই বিড়বিড় করল শান, ' স্যরি তনু, স্যরি। বাট আই হ্যাভ টু বি সেলফিশ।'
******
এরমধ্যে হঠাৎই একদম শান্ত হয়ে গেল প্রিয়তা। উগ্র, বদমেজাজি, সদা ঝামেলা লাগিয়ে রাখা মেয়েটা কেমন নিষ্প্রভ হয়ে গেল। একদম চুপচাপ। মির্জা ম্যানশনেও আর কোন অভিযোগ এলোনা বোর্ডিং থেকে। যেটাকে শওকত মির্জা মেয়ের শুধরে যাওয়া ভেবে ভুল করলেন।
সাপ্তাহিক এক ছুটিতে প্রিয়তা গিয়েছিল শুভর বাড়িতে, শুভর মাকে দেখতে। মীরাও ছিল সঙ্গে। গিয়ে দেখল কেমন নিষ্প্রাণ আর বিদ্ধস্ত অবস্থা শুভর মায়ের। বিধমা এক মা একমাত্র অবলম্বন হারিয়ে মৃতপ্রায়। অদ্ভুতভাবে প্রিয়তাকে দেখামাত্র চিনে ফেলল সে। শুভর মুখে এতোবার তার ইয়্যোলো কুইনের নাম আর বর্ণনা শুনেছে যে, মেয়েটা তার মুখস্থ। প্রিয়তার দুহাত ধরে কাঁদতে কাঁদতে অবিন্যস্ত অনর্গল কথা বলে গেলেন তিনি। সবকথাই শুভকে ঘিরে। বললেন, 'আমার শুভটা অল্প বয়সেই অনেক বুঝদার হয়ে গেছিল। ছোটবেলা থেকে দেখা আসা কঠিন সময় আর অদৃশ্য দায়িত্বগুলো ওকে সময়ের আগেই বড় করে দিয়েছে। জানো মা, শুভ সারাক্ষণ তোমাকে নিয়ে কথা বলতো। ও মাঝেমাঝেই আমায় বলতো, "বুঝেছো আম্মু বিয়ের বয়স হলে আমি ঐ পাগলিটাকেই বিয়ে করব। ও ভীষণ এলোমেলো জানো? শুধু বাইরে দিয়ে নয়, ভেতর দিয়েও।ওকে গোছানোর কেউ নেই। কেউ জানেইনা মেয়েটা গোছানো অবস্থায় কতটা সুন্দর। এতোটাই সুন্দরযে পাথরও গলে যাবে। ও মুখে স্বীকার করেনা, কিন্তু একটু ভালোবাসার জন্যে ও ভীষণ ছটফট করে জানো? একটু ভালোবাসা পেলেই ও মোমের মতো গলে যায়। আমি ওকে ভালোবাসব আম্মু, ভীষণ ভালোবাসব।" আমার ঐটুকু ছেলের মুখে এমন সব কথা শুনে আমি অবাক হয়ে যেতাম। মাঝেমাঝে মজা করতাম। ও বলতো, "হেসোনা আম্মু। আমি খুবই সিরিয়াস।" চলে গেল। অকালে চলে গেল আমার বাচ্চাটা।'
বলতে বলতে হু হু করে কেঁদে ফেলল শুভর মা। ক্লান্ত, শুকনো মুখটা ভীষণ করুণ ঠেকল। মীরার চোখ দিয়েও ঝরঝর করে জল পড়ছিল। ঝাপসা হয়ে যাচ্ছিল গোল ফ্রেমের চশমাটা। প্রিয়তা কেবল নিষ্পলক তাকিয়ে ছিল শুভর মায়ের দিকে। একটা শব্দও উচ্চারণ করেনি। কিছুক্ষণ বসে থেকে বিনাবাক্যে ফিরে এসেছে সেখান থেকে।
দিনদিন প্রিয়তার রাতগুলো বিভীষিকাময় হয়ে উঠল। প্রবল শীতের রাতেও গরমে হাঁসফাঁস করে উঠতো ও। দমবন্ধকর সেই অবস্থা যখন অসহনীয় হয়ে উঠল। তখন আবার সেই সিনিয়রদের কাছ থেকে ড্রাগস আনল ও। মাঝরাতে যখন আবার সেই দহন শুরু হল। ড্রাগসের একটা প্যাকেট নিয়ে ওয়াশরুমে ঢুকে পড়ল রাণী মির্জা। দেয়ালে হেলান দিয়ে বসে পড়ল ফ্লোরে। অস্থির হাতে প্যাকেটা দাঁত দিয়ে ছিঁড়তেই নিচ্ছিল তখনই কেউ ধরে ফেলল ওর হাত। ঠিক যেভাবে শুভ ধরেছিল ওদের প্রথম সাক্ষাতে। রাণী ঘাড় ঘুরিয়ে দেখল এটা শুভই। ঠিক ওর পাশেই এসে বসে আছে। শেষ যে পোশাকে ও শুভকে দেখেছিল, সেই পোশাকেই। রাণী বিস্ময় নিয়ে তাকিয়ে বলল, ' তুমি!'
শুভ বলল, 'যেকারণে শেষ সময়ও আমি তোমার ওপর অসন্তুষ্ট ছিলাম। সেটাই আবার করছো? এই আমি তোমার বন্ধু ছিলাম, ইয়্যোলো কুইন?'
কিছুক্ষণ স্তম্ভিত হয়ে চেয়ে রইল রাণী। অতঃপর চোয়াল শক্ত করে মুখ ফিরিয়ে ফেলল, 'বন্ধুরা কখনও ছেড়ে যায়না।'
' চিরকাল কে থাকে?'
শুভর নির্লিপ্ত প্রশ্নে এবার ঠোঁট ভেঙে কান্না পেল প্রিয়তার। ফুঁপিতে উঠে ভাঙা গলায় বলল, ' কিন্তু আমার কাছেতো কেউ থাকেনা। কেউনা। আমি যাকেই ভালোবেসে ফেলি, সেই চলে যায় আমার জীবন থেকে। একা করে দেয় আমাকে। যাওয়ার আগে একবারও আমার কথা ভাবেনা। ভাবেনা আমার কী হবে। মিতা মা, বশির কাকা, ভাইয়া, তুমি। কেউ তোমরা আমার কথা ভাবোনি।'
কথাগুলো বলে ফিরে তাকিয়ে দেখে শুভ নেই কোথাও। ও ওখানে একা। ওটা ভ্রম ছিল। হতশায় মনটা বিষিয়ে ওঠল ওর। লম্বা শ্বাস নিয়ে আবার প্যাকেটটা ছিড়তে যায় রাণী। তখনই মনে পড়ে শুভকে যখন প্রথমবার বলেছিল নিজের অ্যাডিকশনের কথা। শুভ দীর্ঘ একটা সময় চুপ ছিল। তারপর লম্বা শ্বাস ফেলে বলেছিল, ' আমি তোমার অবস্থাটা বুঝতে পারছি। আ'ম গ্লাড তুমি সৎভাবে স্বীকার করেছো। সবাই পারেনা এটা। কিন্তু তুমি কী জানো এটা ঠিক কতটা ভয়ংকর? ভেতরে ভেতরে কতটা ড্যামেজ করবে তোমার?'
' জানি।'
' তাহলে? সেচ্ছাধ্বংসের এতো সাধ কেন?'
' আমি ধ্বংস হলে কারো কিছু যাবে আসবেনা।'
শুভ সেদিন প্রিয়তার হাতজোড়া দুহাতের মাঝে নিয়ে বলেছিল, ' কারো যাওয়া আসায় তোমার কী কাজ? অন্যকারো প্রতিক্রিয়া তোমার জীবনকে কেন প্রভাবিত করবে? তুমি বাঁচবে তোমার জন্যে, ভালো থাকবে তোমার জন্যে। তোমার নিজের জন্যে। অন্যকারো প্রসঙ্গ আসবে কেন? আজ থেকেই তুমি একটু একটু করে ছেড়ে দেব ড্রাগ নেওয়া। অন্যকারো জন্যে নয়। আমার জন্যেও নয়, শুধুমাত্র নিজের জন্যে। প্রমিজ মি?'
প্রিয়তা কথা দিয়েছিল সেদিন। কথার খেলাপও করেছে। প্যাকেকটা আবার পাশে ছুড়ে ফেলল প্রিয়তা। ভেতর থেকে ঠিকরে বেরিয়ে এলো এতোদিনের পুষে রাখা কান্নাগুলো। হাঁটুতে মুখ গুজে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদল ও। ইচ্ছে হল কাউকে নিজের ভেতরের যন্ত্রণার কথাগুলো বলতে। কারো কোলে মাথা রেখে কাঁদতে। একটু সান্ত্বনা, একটু ভালোবাসা, একটু স্নেহের জন্যে হৃদয় ব্যাকুল হয়ে উঠল। চোখের সামনে ভেসে উঠল শাড়ি পরিহিতা লম্বা চুলের এক সুন্দরী রমনী। চমৎকার এক মাতৃঘ্রাণ এসে ঠেকল নাকে। ফোঁপাতে ফোঁপাতে প্রিয়তা বলল, 'এভাবে কেন চলে গেলে মিতা মা? একবারও আমার কথা ভাবলেনা। আর কেউ না জানলেও তুমিতো জানতে আমার তুমি ছাড়া কেউ নেই। তাও এভাবে চলে গেলে? আর কারো জন্যে না হোক, আমার জন্যে থেকে গেলেনা কেন মা?'
******
' তু-তুমি, তুমি সত্যি সত্যিই আবার বিয়ে করবেন?'
শেষবারের মতো প্রশ্নটা করল তনুজা। এই কদিনে বহুবার, বহুভাবে করেছে। অনেক ঝগড়া, তর্ক, অনুরোধ ছিল সেসবে। এবার গলায় আটকানো কান্না চিড়ে বেরিয়ে এলো সেই ক্ষীণ স্বর। সেই স্বর যেন চিপে ধরল শানের ভেতরটাও। আপাতত বন্ধুর সেই ফাঁকা বাসাটাতেই আছে ও। শুকনো এক ঢোক গিলে শান বলল, 'আমার আর কিছু করার নেই তনু। আমি চেষ্টা করেছিলাম বিশ্বাস কর। ওরা মেরে ফেলবে তোকে, যদি আমি_ '
তনুজা শানে দুহাতে টেনে ধরল। কাতর গলায় বলল, 'চলোনা পালিয়ে যাই?'
' সম্ভব হল কী আমি তা করতাম না? সম্ভব না। যাই হয়ে যাক, বিয়ে আমাকে করতেই হবে।' শানের কন্ঠস্বর মিইয়ে পড়ছে অসহায়ত্ত্বে।
শানের অন্তিম ঘোষণায় তনুজার পুরো পৃথিবীটাই যেন ধ্বসে পড়ল, ' তাহলে? আমার কী হবে? আমাদের বিয়ের কী হবে? আমি তোমার স্ত্রী। আমাদের সম্পর্কের ভবিষ্যৎ কী?'
অসহায় হয়ে হাঁটুতে কুনুইয়ের ভর দিয়ে ঝুঁকে গেল শান। দুহাতে মুখ ঢেকে দীর্ঘশ্বাস ফেলল। এর উত্তর নেই ওর কাছে। শানের নিস্তব্ধায় ধসে পড়া পাহারের মতোই চূর্ণবিচূর্ণ করে দিল তনুজাকে। সদ্য আঠারোতে পা রাখা রঙিন মনের সব রঙ ফ্যাকাশে হয়ে গেল। হু হু করে কেঁদে উঠে তনুজা বলল, 'তাহলে কেন বিয়ে করেছিলে আমায়? আমিতো_ আমিতো চাইনি এভাবে বিয়ে করতে শান। তুমিই জোর করেছিলে আমায়। আশ্বাস দিয়েছিলে সব সামলে নেবে। এই তোমার সামলানোর নমুনা। বিবাহিত স্ত্রী রেখে তুমি আরেকজনকে বিয়ে করবে? সে মেয়েকে ঠকানো হবেনা? আর আমার? আমার কী হবে? সারাজীবন তোমার গোপন বউ হয়ে থাকব? আমাদের এই বৈধ সম্পর্কটাকে কোন অবৈধ পাপের মতো লুকিয়ে রাখব?'
শান এবার অস্থির হয়ি বলল, ' আমার আর কী করার আছে বলতে পারিস? কী করব আমি?'
তনুজা চুপ থাকল কিছুক্ষণ। ভারী বর্ষণ আনা মেঘের মতো থমকে রইল। ভুল হয়ে গেছে। এমন এক সম্পর্কে জড়ানো মারাত্মক ভুল হয়ে গেছে। যে বয়সে রঙবেরঙের স্বপ্নে উড়ে বেড়ানোর কথা, সে বয়সে এমন এক ধাক্কা যেন কঠোর এক সিদ্ধান্তের মুখে ঠেলে দিল ওকে। একহাতে নিজের অশ্রু মুছে বলল, 'তোমার কিছু করার নেই। কিন্তু আমার আছে। এই অনিশ্চিত, অস্বীকৃত সম্পর্ক আমি বয়ে বেড়াতে পারব না। আমার নারীসত্তা এমন অপমান নিয়ে বাঁচতে পারবেনা। যদি তুমি আমাকে নিজের স্ত্রী হিসেবে স্বীকৃতি দিতে না পারো, তবে _ তবে মুক্তি দাও। এই বন্ধন থেকে মুক্তি দাও আমায়।'
শান ঝট করে তাকাল তনুজার দিকে। বিষ্ময়ে বিমূঢ় হয়ে বলল, 'হোয়াট?'
' আমি ডিভোর্স চাইছি, ছোটসাহেব। যদি আপনাকে এই বিয়ে করতেই হয় দেন ডিভোর্স মি।' শক্ত কন্ঠে সম্বোধন বদলে ফেলল তনুজা।
শান ঘনঘন শ্বাস ফেলতে ফেলতে মাথা নাড়িয়ে বলল, 'অসম্ভব!'
তনুজা ভ্রুকুটি করে ফেলল, ' মানে?'
' আমি কোনভাবেই তোকে ডিভোর্স দিতে পারবনা। নো ওয়ে। তুই আর আমার থাকবিনা, সেটা মেনে নেওয়া আমার পক্ষে সম্ভব না। কোনভাবেই না।'
' মানতে হবে। দুই নৌকায় পা দিয়ে চলা যায়না শান। হয় তুমি আমাকে ডিভোর্স দেবে, নয়তো সকলের সামনে স্বীকার করবে আমি তোমার বউ। আর যদি তা না করো তাহলে আমি নিজেই সবাইকে বলে দেব যে...'
' তাতে বিপদ তোরই হবে। শুধু তোরই না তোর গোটা পরিবারের। ইউ ডোন্ট নো মাই ফ্যামলি তনু। নিজেদের স্বার্থে ওরা সব করতে পারে। একরাতের মধ্যে তোদের অস্তিত্ব বিলীন করে দেবে ওরা।'
শিড়দাঁড়া দিয়ে শীতল স্রোত বয়ে গেল তনুজার। ভয়ার্ত চোখে শানের দিকে তাকাল ও। একী ভয়ানক খেলায় নিজেকে জড়িয়ে ফেলেছে সে। ও কেঁপে ওঠা গলায় বলল, 'এগুলো আগে কেন বলোনি আমায়?'
শান চুপ করে গেল। শরীর থরথর করে কাঁপতে শুরু করল তনুজার। ও কাতর চোখে শানের দিকে তাকিয়ে বলল, 'আমায়_ আমায় এসব থেকে মুক্তি দাও শান। আমি খুব সাধারণ মানুষ। আমি পারবনা এতো ভয়াবহতা, এতো জটিলতা সহ্য করতে। আমি একটা সুস্থ জীবন চাই। প্লিজ আমায় মুক্তি দাও।'
চোখমুখ শক্ত হয়ে উঠল শানের, ' আমি পারব না।'
তনুজা এবার রেগে উঠল, 'পারবেনা মানে? নিজে বিয়ে করে সংসার করবে। আর আমি? আমি সারাজীবন এভাবে গুমরে মরব। আমারও অধিকার আছে নতুর করে_'
কথাটা সম্পূর্ণ করার আগেই শান ক্ষীপ্রবেগে তনুজার ঘাড়ের পেছনে ধরে ঘোরাল নিজের দিকে। অপরহাতে ওর গলাটা চেপে ধরে বলল, ' মেরে ফেলব একদম। যদি কখনও অন্যকারো হওয়ার কথা মাথাতেও আনিস।'
তনুজা টলমলে চোখে তাকাল, 'তুমি হচ্ছোনা অন্যকারো?'
শানের চোয়াল শক্ত হল, 'জোর করে একটা পেপারে সই করালেই কেউ কারো হয়ে যায় না। মরার আগ অবধি আমি তোরই থাকব, আই প্রমিস।'
তনুজা দিশেহারা অবস্থায় চারপাশে চাইল। শান কী সত্যিই পাগল হয়ে গেছে? কী বিভৎস কথাবার্তা বলছে সে? শানের সঙ্গে নিজেকে বোধহয় জীবনের সবচেয়ে বড় ভুলটা করেছিল ও। ভুলে গিয়েছিল নিজের অবস্থান। কিন্তু এই বুল এখনই না বের হলে ভয়ংকর বিপদ হবে। ও শক্ত কন্ঠে বলে উঠল, ' আপনি না করলে আমিই ফাইল করব ডিভোর্স। এভাবে সম্পর্ক হয়না, এভাবে সম্ভব না।'
শানের চোখেমুখে যেন অদ্ভুত কিছু খেলে গেল। শীতল কন্ঠে বলল, ' আমার বাবা-মার ক্ষমতাকে কাজে লাগানোর ক্ষমতা আমারও আছে। ইউ্য নো হোয়াট আই মিন।'
তনুজা হতভম্ব হয়ে চাইল শানের দিকে। অস্থির হয়ে বলল, 'তুমি পাগল হয়ে গেছো। নিজেও জানোনা কী ভয়ংকর কথা বলছ। এভাবে হয় না শান। বোঝার চেষ্টা করো। এমন মরণ ফাঁস পরিওনা আমাকে। মুক্তি দাও আমায় এসব থেকে।'
' পারব না আমি।' শানের শক্ত কন্ঠস্বরেও অদ্ভুত এক নিস্তব্ধ বিষন্নতা।
হাল ছেড়ে নেতিয়ে পড়ল তনুজা। দুহাতে মুখ চেপে হু হু করে কেঁদে ফেলল। শান দ্রুত তনুজাকে টেনে নিল নিজের বুকে। তনুজা ছটফট করল, সরে আসতে চাইল। কিন্তু শান ছাড়ল না। শক্ত করে ধরে রাখল নিজের সঙ্গে। তনুজা আকুতি করে বলল, ' প্লিজ আমায় মুক্তি দিন। প্লিজ।'
শান তনুজার মাথায় ঠোঁট ছুঁইয়ে ওভাবেই বসে রইল চুপচাপ। শরীরের কম্পনকে অবজ্ঞা করে অস্ফুট স্বরে বলল, 'স্যরি।'
তনুজার করুণ কান্নায় ভারী হয়ে উঠল রুমটা। ও কেঁদেই চলল শানের জোরপূর্বক বাহুবন্ধনে। অল্প বয়সের আবেগে জড়িয়ে আগেপিছু না ভেবেই জ্বলন্ত লাভায় ঝাপ দিয়ে ফেলেছে ও। সেই আগুনযে ওকে চিরকাল পুরিয়ে ছাই দেব তা বুঝতে বাকি নেই তনুজার।
******
শানের সঙ্গে রিমির বিয়ের আয়োজন হল খুব সল্প আয়োজনে, ঘরোয়াভাবে। জেদটা শানেরই ছিল। বিয়ে করতে রাজি হয়েছে তাই অনেক। কোনরকম জাকজমক আয়োজন সে করতে দেবেনা। পরিস্থিতি বিচারে সে শর্তও মানা হয়েছে। যদিও এমপির বাড়ি থেকে একটু ঝামেলা করছিল। কিন্তু শেষমেশ মানানো গেছে সবাইকে।
বিয়ের দুদিন আগে শান গেল প্রিয়তার বোর্ডিংয়ে। ওকে আনতে। প্রিয়তা জানে শান আর তনুজার ব্যপারে। এ বিয়ের খবর শুনে তার কী প্রতিক্রিয়া হবে, তা নিয়ে ভাবনায় ছিল শান। প্রতিক্রিয়া ছিল ঠান্ডা। রাণী বলেছে, 'বিয়ে তোমার। মনে ফুর্তিও তোমার। অসব বা*লছালে আমার যাওয়ার শখ নেই।'
' ভাষা ঠিক কর।'
' করব না। বাই দ্য ওয়ে, তনুজার কী হবে?'
' ভাবি ডাকবি। বয়সেও তিন বছরের বড় তোর।'
' পারব না। মেয়েতো সেই ড্রাইভারেরই। তোমার বাপ-মায়ের মতো বড়লোকের বেটি হলেতো আর তুমি ছাড়তে না।'
' ছাড়ছি না।'
' মানে?'
' মানে, ডিভোর্স দিচ্ছিনা আমি ওকে।'
হেসে ফেলল প্রিয়তা। মাথা দুলিয়ে বলল, ' সুমনা মির্জার যোগ্য ছেলে তুমি। হ্যাভ টু গিভ ইউ্য দ্যাট।'
শান হতাশ হয়ে বলল, ' আমি বাধ্য হয়ে করছি এই বিয়ে।'
প্রিয়তা নিরস স্বরে জবাব দিল, ' এমন কোন পরিস্থিতি নেই যা নিজের ভালোবাসার মানুষকে ঠকাতে বাধ্য করতে পারে।'
শান উত্তরে শুধু বলেছে, ' বলা সহজ। যতক্ষণ না অমন কোন পরিস্থিতি সামনে এসে দাঁড়ায়।'
প্রিয়তা সত্যিই গেলনা শানের দ্বিতীয় বিয়েতে। ভাইবোনের মানসিক দূরত্ব সেদিন আরও খানিকটা বাড়ল।
শেষমেশ ঘরোয়া আয়োজনে শান আর রিমির বিয়ে হল। অনুষ্ঠানে কাশেম হক চোখ দিয়ে খুঁজল প্রিয়তাকে। সেই এগারো বছর বয়সে দেখেছে। কী অদ্ভুত সৌন্দর্য! এখনতো ষোল! না জানি কী চোখ ধাঁধানো যৌবন নিয়ে ঘুরছে ঐ মেয়ে! সচক্ষে তা দেখার জন্যে উশখুশ করল লম্পট লোকটা। না পেরে শেষমেশ সুমনাকে জিজ্ঞেস করে জানতে পারল, সে আসেনি।
শানের সেদিন মনে হল বুকের ওপর বিশাল এক পাথর দিয়ে সজোরে আঘাত করেছে কেউ। মানুষ হিসেবে সম্পূর্ণ পাপহীন না হলেও ওর প্রেমিক মনে কোন কপটতা ছিলনা। সেই প্রেমের ভারেই নুইয়ে পড়ল ওর ভেতরের সত্ত্বা। এদিকে ঐদিনটা ছিল তনুজার মৃত্যুদিন। নিজেরই স্বামীকে অন্যকাউকে বিয়ে করতে দেখে ভেতর থেকে নিষ্প্রাণ হয়ে গেল সদ্য তরুণ মনটা। প্রাণচ্ছ্বল জীবনের সব প্রাণ সেদিন শুকিয়ে গেল।
মাস দুয়েকের মধ্যেই শান আর রিমি চলে ব্রিটেন। এরমধ্যে লুকিয়ে দুতিনবার তনুজার সঙ্গে দেখা করেছিল শান। কিন্তু আগের তনুজা যেন শানের বিয়ের দিনই মরে গেছে। তাই শানের সঙ্গে খুবই শীতল ব্যবহার করেছে ও। শান কাছাকাছি আসতে চাইলে যখন ও বাঁধা দিতে চাইল। তখন তনুজার গলা চেপে ধরে শান বলেছে, 'খবরদার! আমার কাছ থেকে দূরে থাকার চেষ্টাও করবিনা। শেষ করে দেব সব আমি। বউ তুই আমার। তোকে ছোঁয়ার অধিকার এই পৃথিবীতে শুধু আমার আছে। গট ইট?'
তনুজা পেরে ওঠেনি শানের সঙ্গে গায়ের জোরে। শুধু গায়ের জোর নয়, টাকার জোর কিংবা ক্ষমতার জোর। কোন জোরেই পেরে ওঠার অবস্থা ছিলনা তনুজার। ফলে শানের সঙ্গে এই অনিশ্চয়তার জীবনকেই বেছে নিতে হয়েছে ওর।
******
এসএসসি পরীক্ষা শেষ হওয়ার পর আর বোর্ডিংয়ে থাকা সম্ভব হলোনা প্রিয়তার পক্ষে। অনেকটা বাধ্য হয়েই মীর্জা ম্যানশনে ফিরে আসতে হল ওকে। মির্জা ম্যানশন থেকে যে বিগড়ে যাওয়া, বদমেজাজি, উগ্র মেয়ে বেরিয়েছিল; সে ফিরে এলো শান্ত, নীরব হয়ে। গম্ভীর, সারাদিন নিজ রুমের দরজা বন্ধ করে রাখতো। খাওয়ার সময়টাতে দেখা পাওয়া যেতো তার। তাও খাবারের প্লেট নিয়ে চলে যেতো রুমে। এছাড়া দেখা পাওয়া যেতো বাইরে কিছু কিনতে বের হলে। তাও ভীষণ কম। শওকত কিংবা সুমনার সঙ্গেও কোনরকম আগ বাড়ানো কথাবার্তা বলতোনা। কেবল প্রশ্নের উত্তর দিতো যথাসম্ভব ছোট বাক্যে। তাদেরও বিশেষ মাথাব্যথা ছিলোনা এ বিষয়ে। ভাবতো মেয়ে ভদ্র হয়েছে, শান্ত হয়েছে। থাক নিজের মতো। তখনও ড্রাগ না নিলেও রুমে বসে প্রায়ই স্মোক করতো ও। শুরুতে টের না পেলেও ঘর পরিস্কার করতে করতে ব্যপারটা বুঝতে পারে মহিলা সার্ভেন্ট। সুমনার কানে সেখবর পৌঁছয়। সুমনা সে খবর তুলল শওকতের কানে। একদিন সন্ধ্যায় প্রিয়তাকে বসার ঘরে ডেকে পাঠানো হল। স্মোক করা নিয়ে যখন শওকত প্রশ্ন করল, তখন প্রিয়তা নির্বিকারভাবে ভাবে জবাব দিল যে সে স্মোক করে। তাতে রেগে গেল শওকত। বলল, ' আমার বাড়িতে থেকে এসব করতে পারবেনা তুমি। আর যেন না শুনি। মনে থাকবে?'
রাণী জবাব দিল, 'তুমি আর তোমার বউ করোনা? এ বাড়িতে? আমিতো তাও সিগারেট খাই। তোমরতো মদও খাও।'
' রাণী!'
শওকতের ধমককেও পাত্তা দিলোনা প্রিয়তা। হেলতে দুলতে ফিরে গিয়েছিল নিজের রুমে। যেন কোন পাগল প্রলাপ বকছে ওর সামনে। সুমনা কেবল রাগে ফোঁসফোঁস করছিল, নিজেরই জন্ম দেওয়া ঐ পুঁচকে মেয়ের ঔদ্ধত্ব দেখে। তাছাড়াও বয়স হওয়ায় ধীরে ধীরে খুব সামান্য ভাটা পরছে সুমনার মোহনীয় সৌন্দর্য্যে। অপরদিকে কৈশর পেরিয়ে তারুণ্যে যাত্রা করতে থাকা প্রিয়তার রূপ খুলছে ভয়ংকরভাবে। হলদে ফর্সা চকচকে ত্বক, ঘনপল্লবে ঘেরা দীঘল কালো ঐ চোখজোড়া। অমন সুন্দর চোখ আজ অবধি সুমনা দেখেনি। মেয়ের সেই রূপ ফ্রাস্টেটেড করে দিচ্ছে ওকে। সুমনা নিজেরই গর্ভজাত কন্যাকে হিংসে করছে। চেয়েও নিয়ন্ত্রণ করতে পারছেনা সেই অনুভূতি। শওকত যদিও তেমন গুরুত্ব দেয়নি মেয়ের ব্যবহারের ব্যপারে। বহুবছর হল সে পারিবারিক ব্যপারে উদাসীন।
এদিকে প্রিয়তা বাড়ি ফিরেছে সে খবর কাশেম হক পেয়েছে আরও আগেই। দুবার মির্জা ম্যানশন ঘুরেও গেছে এরমধ্যে, কিন্তু প্রিয়তার দেখা পায়নি। শওকতরা ফিরে আসার পর থেকেই প্রিয়তার দেখা পাওয়ার লোভ তার। অথচ তা পূরণ হচ্ছেনা কোনভাবেই। বিষয়টা বিরক্ত করছিল কাশেমকে। বিরক্তি কেটে সে ইচ্ছা পূরণ হল তৃতীয়বারে। সময়টা সন্ধ্যা ছিল। কাশেম হক নিজের কাজের আলোচনার জন্যে এলো শওকতের সঙ্গে দেখা করতে। কাশেম, শওকত, সুমনা তিনজন বসে অপেক্ষা করছিল পলাশ মির্জার। সে বিয়ে করে ভিন্ন সংসার পেতেছে। এখানে এসে থাকে মাঝেমাঝে।
এরমধ্যেই ওপর থেকে সিঁড়িতে শব্দ করে নামছিল প্রিয়তা। পরনে একটা লুজ ওভার সাইজ টিশার্ট আর থ্রি কোয়ার্টার প্যান্ট। একটা মেসি পনিটেল করা। ছোট চুলগুলো পড়ে আছে মুখের সামনে। হাতে ওয়াটার পট নিয়ে নিচে নামছে ও। সকলের সঙ্গে কাশেমের চোখ পড়তেই থমকে গেল সে। এটাইযে সুমনার মেয়ে তা বুঝতে দেরী হলোনা। ধারণার চেয়েও আকর্ষণীয় দেখতে হয়েছে রাণী মির্জা। সুমনা কিংবা মিতার চেয়েও বহুগুণ বেশি। প্রিয়তা চোখ বসার ঘরে বাড়তি মানুষটার ওপর পরা মাত্রই ওর পা থেমে গেল। খানিকটা বৃহৎ হল জগতের সবচেয়ে আকর্ষণীয় ঐ চোখদুটো। ঠোঁটজোড়া মৃদু কেঁপেই হাত ফসকে পড়ে গেল কাঁচের বোতলটা। ঝনঝন শব্দে টুকরোগুলো ছড়িয়ে পড়ল চারপাশে। উঠে দাঁড়াল সুমনা। প্রচণ্ড রেগে বলল, 'ঝামেলা ছাড়া কী তুমি কোন কাজ করতে পারোনা রাণী? কী করলে এটা?'
একটা ঢোক গিলে এলোমেলোভাবে চারপালে তাকাল প্রিয়তা। এয়ার কন্ডিশনড রুমেও ঘামে ভিজে উঠল ও। ঘনঘন শ্বাস ফেলল। মাথার মধ্যে তীব্র যন্ত্রণাদায়ক শব্দে ভেসে আসল সেই রাতে মিতার একেকটা চিৎকার, কাশেমের বিভৎস হাসি, বিছানার তলে সেই অন্ধকারের ভয়। শওকত ভ্রুকুটি করে বলল, ' আচ্ছা, ঠিক আছে। যাও, রুমে যাও। কাউকে দিয়ে নতুন বোতলে পানি পাঠিয়ে দিচ্ছি।'
দুহাতে মুখ মুছে উল্টো ঘুরে চলে গেল প্রিয়তা। যেন দৌড়ে পালাল। কাশেমের সম্মুখে এলেই ব্যক্তিত্বে পরিবর্তন ঘটে ওর। ভয়, অস্থিরতা গ্রাস করে বসে ওকে। প্যানিক করে যায়।
এদিকে সেদিন আর ঘোরমুক্ত হতে পারেনা কাশেম। মিনিট খানেকের মধ্যেই প্রিয়তার শরীরের একেকটা বাঁক মুখস্থ করে ফেলেছে সে। নিজের চেয়ে পঁচিশ বছরের ছোট এক কিশোরী মেয়ের দেহের সৌন্দর্যও উন্মাদ করে দিল তাকে। মনে জন্ম নিল অনৈতিক, পাপ বাসনা। প্রায় দশ বছর আগেও যে বাসনা ধ্বংস করে দিয়েছিল তিনটে নির্দোষ জীবনকে।
———
দিন যত যেতে থাকল, কাশেমের আনাগোনাও মির্জা ম্যানশনে প্রায় নিয়মিত হল। তবে তেমন কোন সুবিধা সে করে উঠতে পারছিল না সে। প্রিয়তাকে সামনে পেতোই না। এমনিতেই ঘরবন্দি কন্যা। কাশেম এলে আরও ঘাপটি মেরে থাকতো রুমে। যাও একবার হাতের কাছে পেয়েছিল, ছোটবেলার মতো চুপচাপ সহ্য করেনি। বরং হাতের নখ দিয়ে বিভৎস এক আচর কেটে দিয়েছিল হাতের মধ্যে। ছুটে চলে গিয়েছিল নাগালের বাইরে। দেখলেই ভয় পায়, অস্থির হয়ে পালতে চায়। একদিন সুমনার সঙ্গে একান্ত সময়েই কাশেম বলে বসল, 'তোমার মেয়েটা কিন্তু ভয়ংকর সুন্দরী হয়েছে সুমনা। তাকালে চোখ ধাঁধিয়ে যায়।'
সুমনা হতবাক হয়ে চাইল। এমনিতেই মেয়ের বাড়তে থাকা রূপ নিয়ে সে ইনসিকিওর। তারওপর একথা। ও দাঁতে দাঁত চেপে বলল, 'মাথার তার কেটেছে? তোমার মেয়ের বয়সী ও।'
ফিক করে হেসে ফেলল কাশেম, ' মেয়ের বয়সী, মেয়ে না। তাছাড়া বয়স চল্লিশ পাড় হলেও আমাকে দেখতে ত্রিশের বেশি লাগেনা।'
' মানেহ্!'
কাশেম আর সুমনার সম্পর্ক কেবলই শরীরের। কাশেম কখনই সুমনার সামনে ভালো সাজেনা বা নিজের বাস্তবতা আড়াল করেনা। প্রয়োজন মনে করেনা সে। তাই গা ছাড়া ভাবেই বলল, 'মানে মায়ের বেড পার্ফরমেন্সতো অনবদ্য। মেয়েরটা কেমন, সেটাওতো জানা দরকার। তাইনা?'
সুমনা বিস্ফোরিত চোখে তাকাল। কেমন গুলিয়ে উঠল গা। বিস্ময়ে কথা বলতে পারল না অনেকক্ষণ। যখন পারল তখন কোনমতে বলল, ' ছিঃ। বিন্দুমাত্র লজ্জা করছেনা এমন কথা বলতে? মানছি সুন্দরী কিন্তু তাই বলে _। যেমন মা-ই হই। মা আমি ওর। সেকথা ভুলে যেওনা। মিতার বেলায় যা করেছি, ওর বেলায়ও তা করব সে ধারণা করলে কীকরে? তখন শওকতের ভয় ছিল। এখন আমার সম্পর্কে যে ওর কিছু অজানা নেই, তা আমি বুঝে গেছি। সুতরাং, ব্লাকমেইল করেও লাভ হবেনা।'
কাশেম নানাভাবে সুমনাকে ম্যানুউপুলেট করার চেষ্টা করেও ব্যার্থ হল সেবার।
———
কাশেম বুঝে যায় এভাবে হবেনা। বাঁকা পথেই হাঁটতে হবে তাকে। সেকারণেই কোন ধূর্ত শিকারি পশুর মতো স্থির হয়ে সুযোগের অপেক্ষা করতে থাকে সে। সে সুযোগ আসে, যখন ডার্ক নাইটের এক গুরুত্বপূর্ণ মিশনের সময় আসে। সেই মিশনে তাদের প্রতিদ্বন্দ্বি স্বয়ং সোলার সিস্টেম। সবচেয়ে ভয়ংকর কথা সোলার সিস্টেমের গুরুত্বপূর্ণ ফিল্ড মিশনগুলো লীড করে রাশেদ আমেরের ছেলে রুদ্র আমের। একুশ বছরের ঐ তরুণ রীতিমতো দুঃস্বপ্নে পরিণত হচ্ছে আন্ডারওয়ার্ল্ডের বাকি দলগুলোর জন্যে। মিশনে নাকি হিংস্র কোন জানোয়ারের মতো হত্যাযজ্ঞ করে ঐ ছেলে। সঙ্গে একই বয়সী এক আশ্রিতও জুটেছে। কম যায়না সেও। সুতরাং শওকতের ফিল্ডে থাকা গুরুত্বপূর্ণ। সে উদ্দেশ্যেই দুইদিনের জন্যে মির্জা ম্যানশন ছাড়লেন শওকত।
যেদিন শওকত বের হল, সেদিন সুমনাকে ফাইভস্টার এক হোটেলে ডিনার ডেইটে ডাকল কাশেম। বহুদিন পর ভালো সময় কাটানোর জন্যে সুমনাও গেল। ডিনার শেষে রুমে যাওয়ার পর কাশেম সুমনাকে নিয়ে বিছানায় গেল। বুকে টেনে নিয়ে বলল, ' দেখ, তোমাকে কিছু কথা বলব ভালোয় ভালোয় চুপচাপ শুনবে।'
' কী কথা?'
' মিতার বেলায় যেভাবে ব্যবস্থা করে দিয়েছো। তোমার মেয়ের বেলায়ও সেরকম এক ব্যবস্থা করে দাও। শওকত ভাই বাড়ি নেই। এটাই সুযোগ।'
জ্বলে উঠল সুমনা। ছিটকে দূরে সরে গিয়ে বলল, 'এখনো তোমার মাথা থেকে এসব সরেনি তোমার? তোমাকে যা বলার বলে দেইনি আমি? ভুলে যাও এসব কাশেম। এসব সম্ভব না। তাছাড়া ও এখনো ছোট। ভাবলেও গা ঘিনঘিন করছে আমার।'
কাশেম ঠোঁট বাকিয়ে হেসে বলল, 'বোনের সময় করেনি?'
' তখন বিষয়টা ভিন্ন ছিল কাশেম। তাছাড়া ব্লাকমেইলও করেছিলে আমাকে তুমি। সেকথা ভুলে যেওনা।'
' যদি এখনো করি?'
সুমনা অবাক হল, ' এখন? কী নিয়ে করবে শুনি?'
উঠে বসল কাশেম। আয়েশ করে হেলান দিয়ে একটা সিগারেট জ্বালিয়ে বলল, ' তোমার ব্যবসা পুরোটা গিলে খাওয়ার ক্ষমতা আছে আমার। এক মাসের মধ্যে তোমার কম্পানি নিলামে তুলে দিতে পারি আমি। আর তোমার জীবনে তোমার যতটুকু জোর, তোমার এই ব্যবসার জন্যেই আছে। চিন্তা করোতো, এই ব্যবসা না থাকলে তোমার কী হবে। শওকত ভাই তোমাকে কোন দাম দেবে আর? এতো লাক্সারি, আনন্দ, ফুর্তি সব কোথায় যাবে? আর তাছাড়াও _
' তাছাড়াও?' সুমনা ঘামছে।
' তোমার আর আমার অনেক প্রেমে ভরপুর বিছানার ভিডিও আছে আমার কাছে। ইউ নো দ্যট। আমার মুখটা ব্লার হয়ে ভিডিওগুলি ইন্টারনেটে ঘোরাফেরা করলে তোমার রেপুটেশন আর ইজ্জতের কী হবে? মিতার মতো তোমাকেও_'
আতকে উঠল সুমনা, ' তুমি শুধুমাত্র রাণীর সঙ্গে শোয়ার জন্যে এমন নোংরামো করবে?'
' করব।'
ঢোক গিলল সুমনা। জোরে জোরে শ্বাস নিয়ে সামলাতে চাইল নিজেকে। কাশেম ভ্রু তুলে বলল, ' সো? হোয়াট ইট উড বি?'
সুমনা চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে রইল। তখনও জোরে জোরে শ্বাস নিচ্ছে ও। ভিজে যাচ্ছে ঘামে। কাশেম হেসে সিগারেটটা ফেলে দিল অ্যাশট্রেতে। এগিয়ে এসে চুমু খেল ওকে। ডুবে গেল সুমনার মধ্যে। প্রথমবার ঘৃণ্য সুমনারও কাশেমের স্পর্শ ভয়ংকর ঘৃণ্য লাগল।
———
রাত তখন অনেক হয়েছে। মে মাসের শেষ সময়। বাতাস ছেড়েছে জোরে। ঝড় আসবে বোধহয়। প্রিয়তা ল্যাম্প জ্বালিয়ে নিজের টেবিলে বসে ডায়েরি লিখছে। নতুন একটা কবিতা লেখার চেষ্টা করছে। এই একটাই ভালো গুন আছে, যা ও চর্চা করে। বরাবরের মতোই লিখতে লিখতে পুরোপুরি হারিয়ে গিয়েছে লেখার মধ্যে। তখনই সশব্দে রুমের দরজা খোলার শব্দে চমকে উঠল ও। হাত থেকে কলম খসে গেল। তাকিয়ে দেখল এক পুরুষ অবয়ব। হুরমুর করে উঠে গেল ও, 'কে-কে?'
বলতে বলতে ল্যাম্পটা সামনে ধরতেই কাশেমকে দেখতে পেল ও। বিকৃত এক হাসি ঝুলে আছে তার মুখে। দেখামাত্র প্রিয়তার হাত থেকে ল্যাম্পটা পরে গেল নিচে। অজান্তেই বিভৎস চিৎকার করে পিছিয়ে গেল ও। দরজার কাছেই সুইচ টিপে আলো জ্বালল কাশেম। ঠোঁটে এখনো সেই ভয়ংকর হাসি। প্রিয়তার শ্বাস রোধ হয়ে এলো। থরথর করে কাঁপতে শুরু করল গোটা শরীর। বিস্ফোরিত চোখে তাকিয়ে দেখল কাশেম এগিয়ে আসছে ওর দিকে। ও মগজে পুনরায় আঘাত করছে সেই ঝড়ের রাত, মিতা, চিৎকার, অন্ধকার, দানবীয় হাসি। সেই ভয়ংকর আঘাত ওকে জায়গাতেই জমিয়ে দিল। পেছাতে চেয়েও নড়তে পারল না জায়গা থেকে। ও কোনমতে মাথা নাড়িয়ে প্রশ্ন করল, ' আ- আপনি.. কেন_?'
কাশেম এগিয়ে আসতে থেকেই বলল, ' সময় কাটাতে এলাম একটু তোমার সঙ্গে। তুমিতো আসোইনা আমার সামনে মামণি?'
কাশেমের শীতল স্বর বুকে হাতুরির আঘাতের মতো লাগল মেয়েটার। কাশেম ছুঁতে এলেই ছিটকে দূরে সরে গেল প্রিয়তা। টেবিলের কোণায় লেগে ব্যথা পেল ভীষণ। কিন্তু লাভ হলোনা। ওর মোলায়েম হাত ওরে টেনে নিজের দিকে নিয়ে এলো কাশেম। জোরপূর্বক নিজের বাহুবন্ধনে আবদ্ধ করল অপমানজনক স্পর্শে। প্রিয়তা ছটফট করে সরে আসতে চাইল। এ কীকরে ঢুকল বন্ধ রুমে? বাড়িতেতো কেবল সুমনা আছে। সে কোথায়? সে-কী শুনছেনা প্রিয়তার চিৎকার? এদিকে সুমনা প্রিয়তার প্রথম চিৎকার শোনার পরেই ঘরের দরজা বন্ধ করে গুটিশুটি মেরে বিছানায় শুয়ে পড়েছে। মন শায় না দিলেও কিছু করার নেই তার।
এদিকে ধস্তাধস্তিতে আচড় লেগে ক্ষত তৈরী হয়ে গেল প্রিয়তার শরীরে। টেনে বিছানা অবধি নিতে গিয়ে কয়েকটি আসবাবপত্রের সঙ্গে ধাক্কা দিয়ে ভীষণ ব্যথাও দিল ওকে কাশেম। যাতে দমে যায়। কিন্তু দমল না মেয়েটা। শরীরের সব শক্তি দিয়ে ছটফট করে, চিৎকার করে বাঁধা দিল কাশেমকে। তেঁতে গিয়ে কাশেম সোজা ওর শর্টসের ভেতরে হাত ঢোকাতে উদ্ধত হল। প্রিয়তার পেটের ভেতর মোচড় দিয়ে উঠল, শরীরে বিদ্যুৎ খেলে গেল। ভয়ে, ঘেন্নায়, আতঙ্কে জীবনে প্রথম ও শেষবারের মতো মন থেকে চিৎকার করে সুমনাকে ডেকে উঠল, 'মাআআআ!'
সেই ছিন্নভিন্ন প্রবল চিৎকার সুমনার ঘর অবধিও গেল। সুমনা সঙ্গে সঙ্গে বালিশ দিয়ে কান চেপে ধরে ফুপিয়ে উঠল। কাঁদছে না, কিন্তু কীযেন হচ্ছে ভেতরে।
শরীরের সবটুকু শক্তি দিয়ে কাশেমকে দূরে ঠেলে দিল প্রিয়তা। দৌড়ে বেরিয়ে এলো রুম থেকে। ওকে ধরতে চেষ্টা করল কাশেম। কিন্তু তাতে কেবল ওর পাতলা টিশার্টের হাতার অংশটুকুই ছিড়ল। সুমনার ঘরে গিয়ে দরজা ধাক্কাল প্রিয়তা কিন্তু সে খুলল না। উপায় না পেয়ে প্রচন্ড গতিতে উদ্ব্রান্তের মতো সিঁড়ি দিয়ে দৌড়ে নামতে চাইল ও। তা করতে গিয়ে স্লিপ করে গেল ওর পা। গড়িয়ে পড়ে মাথায় আঘাত পেয়ে জ্ঞান হারাল ও। পেছনে আসা কাশেম হকও থমকে দাঁড়াল সিঁড়ির মাথায়।
বিকট শব্দ পেয়ে আর স্থির থাকতে পারল না সুমনা। দৌড়ে সিঁড়ি বেয়ে বেরিয়ে এসে দেখল এই অবস্থা। কাশেম আর সুমনা ধরাধরি করে নিয়ে এলো ওকে রুমে। প্রিয়তাকে শুইয়ে দিয়ে লাইট অফ করল সুমনা। কাশেমের হাত ধরে বলল, 'কাশেম, ছেড়ে দাও আজকে ওকে।'
' কিন্তু...'
' প্লিজ। অবস্থা দেখেছো ওর? মরে যাবে। ভেবোনা মিতার বিষয়টা সামলাতে পেরেছো বলে এটাও পারবে। বশিরের মতো ওর কোন প্রেমিকও নেই যে সকালবেলা ছুটে আসবে আর সব দায় তার ঘাড়ে তুমি চাপিয়ে দেবে। ঐদিন একটু এদিকওদিক হলে তোমার সঙ্গে আমিও ফেঁসে যেতাম। তারওপর ঐ ছেলেটা। শুভ। ওর পরিবার কেস করলে কী নতুন ঝামেলায় পড়তাম তাতো জানোই। ট্রাকটাতো তোমার ঠিক করাই। তাই এখন আর ঝামেলা বাড়িওনা প্লিজ। অন্যকোনদিন আবার দেখব। আজ যাও।'
একটু দ্বিধান্বিত হলেও সুমনার কথা মেনে চলে গেল কাশেম। সুমনাও লম্বা শ্বাস ফেলে চলে গেল রুম থেকে। এদিকে ওরা জানল না, প্রিয়তার জ্ঞান অনেক আগেই ফিরেছে। ওকে শোয়ানোর সময়ই। এতক্ষণ ওদের সব কথাই শুনেছে ও। ওরা চলে যেতেই দীর্ঘক্ষণ থম মেরে সিলিংয়ের দিকে তাকিয়ে ছিল ও। কোন স্থির মূর্তির। এরপর হঠাৎই একপাশে কাত হয়ে নিজেই নিজেকে আকরে ধরল প্রিয়তা। কিছুক্ষণ থরথর করে কেঁপে ডুকরে কেঁদে উঠল, 'একটু এসে আমায় বুকে জড়িয়ে ধরোনা মিতা মা। একটু ধরো। আমার খুব কষ্ট হচ্ছে। দম আটকে আসছে। প্লিজ একটু এসে ধরো আমাকে। একটু মাথায় হাত বুলিয়ে দাও। আমি মরে যাচ্ছি। আমায় বাঁচাও মা। প্লিজ আমাকে বাঁচাও।'
******
রাতের প্রবল ঝড়ের পর দিনটা কেমন শান্ত স্থির লাগল সেদিন। শওকত এলো দুপুরবেলা। এদিকে সুমনা দিনভর এই চিন্তাতে অস্থির হল প্রিয়তা না আবার সব বলে দেয় শওকতকে। কোন না কোনভাবে বিষয়টা ঘোরাতে হবে।
সে সুযোগ পেল সুমনা বিকেলবেলা। যখন প্রিয়তার ঘরে উঁকি দিয়ে দেখল, মেয়ে তার নেশা করছে। আসলে সারারাতের অসহ্য মানসিক কষ্ট ভোগার পর, মানসিকভাবে অস্থিতিশীল হয়ে গেছে প্রিয়তা। ভেতরে গুমোট অবস্থায় জমাট বেঁধে আছে তীব্র এক আক্রোশ, ক্ষোভ, ঘৃণা। সে অনুভূতি থেকেই ব্যাগে পড়ে থাকা নেশাদ্রব্যটুকু গ্রহন করছিল ও। ব্যস্ সুমনা পেয়ে গেল সংযোগ। চিৎকার চেঁচামেচি করে বাড়ি মাথা তুলল সে। শওকত স্ত্রীর চিৎকারে ওপরে গেল। সুমনা দেখাল, কেমন বাড়িতে বসে, বাবামায়ের উপস্থিতিতে নেশা করছে তার বিগড়ে যাওয়া, অবাধ্য, নষ্ট মেয়ে। সে অযুহাতে মনভরে প্রিয়তাকে মারল সুমনা। বস্তুত ভেতরের সেই অপরাধবোধ পিষে মারতে চাইল উল্টো উপায়ে। অথচ প্রিয়তা কোন প্রতিবাদ করল না। চুপচাপ হজম করল প্রতিটা আঘাত। শওকতও কিছু বলল না মেয়ের এমন অপকর্ম দেখে।
———
পরেরদিন এলো সেই বিভৎস দিনটা। গতদিনের সেই মারের পর আর রুম থেকে বের হয়নি প্রিয়তা। কোন এক বিভৎস প্রেতাত্মার মতো সারাদিন থম মেরে বসে ছিল নিজের রুমে এক কোণে। কী যেন ভেবে গেছে বিরতিহীনভাবে। মনে হচ্ছিলো কোন প্রলয় তার ধ্বংসে উপায় সাজাচ্ছে।
রাতের খাওয়াদাওয়া শেষ করে সুমনা কেবল রুমে গিয়ে বসেছে। শওকত তখনও ফেরেনি। তার ফেরার জন্যেই অপেক্ষা করতে করতে ফোন দেখছিল সে। মনের ভেতর কেমন খচখচ করছে তার। দুদিন যাবত সবকিছু শান্ত-স্থির। কাশেমের সঙ্গেও যোগাযোগ হচ্ছেনা। কী যেন ঠিক নেই।
হঠাৎই রুমের দরজা লকের শব্দে চোখ তুলল সুমনা। ভেবেছিল শওকত এসেছে। কিন্তু তার বদলে প্রিয়তাকে দেখে থমকে গেল ও। অবাকও হল। প্রিয়তা কখনও এই রুমে আসেনা। সাদা পোশাকে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। চুলগুলো সম্পূর্ণ খোলা, এলোমেলো। হাত দুটো পেছনে। চোখদুটো সুমনার দিকে স্থির। পলকও ফেলছেনা আজ ও। সুমনার শরীরে শিরশির করে উঠল। কেঁপে যাওয়া গলায় বলল, 'তুমি এখানে?'
খুব ধীরে দু'কদম এগোলো প্রিয়তা। প্রাণহীন শীতল গলায় বলল, 'আপনাকে কিছু দেওয়ার ছিল আমার।'
ভেতরে ভেতরে ভয়ে পেলেও উঠে দাঁড়াল ও ' কী?'
প্রিয়তা ধীর পায়ে, একই ছন্দে এগিয়ে এলো সুমনার সামনে। চোখে চোখ রেখে দাঁড়িয়ে রইল কিছু সেকেন্ড। তারপর উচ্চারণ করল, 'মুক্তি।'
শব্দটা শেষ হওয়া মাত্রই। এক ঝটকায় পেছন থেকে হাত সামনে এনে সুমনার পেটের ঠিক মাঝ বরাবর আড়াআড়ি ছু*রি দিয়ে আঘাত করল রাণি। যন্ত্রণায় সুমনা চেঁচিয়ে উঠে পিছিয়ে গেল। প্রিয়তা শীতল কন্ঠে জানাল, ' যার আরেক নাম মৃত্যু।'
বলে পুনরায় অপরপাশ দিয়ে একইভাবে ছো*রা চালাল সুমনার পেটে। সুমনা আর্তনাদ করে বাঁকা হয়ে গেল। মনে হল যেন জান কবজ করে নিল কেউ। বিস্ফোরিত চোখে অবিশ্বাস নিয়ে মেয়ের দিকে তাকিয়ে বলল, 'কী করছো তুমি!'
প্রিয়তা ভাবলেশহীনভাবে জানাল, 'ঐযে বললাম। মুক্তি দিচ্ছি।'
চরম অবিশ্বাস আর আতঙ্কে চোখ কোটর ছেড়ে বেরিয়ে আসতে চাইল সুমনার। কী ঘটছে বুঝতে পেরে সুমনা ছুটে পালাতে চাইল দরজার দিকে। কিন্তু তার আগেই ছু*রিটা সোজা ওর পেটে ঢুকিয়ে দিল প্রিয়তা। সুমনা 'গোত' শব্দ করে বিস্ফোরিত চোখে তাকাল নিজের সন্তানের দিকে। অথচ প্রিয়তার চোখদুটো আজ অদ্ভুত শীতল, ঠোঁটেজোড়া নিষ্ঠুর স্থির। ও কন্ঠে শীতলতা বজায় রেখেই ফিসফিসিয়ে বলল, 'মৃত্যু থেকে পালানো যায়না, মিসেস মির্জা। '
বলে ছু*রিটা মুচড়ে দিয়ে বের করে ধাক্কা দিয়ে ফেলল সুমনাকে সাদা বিছানায়। সুমনা পেটের যন্ত্রণায় চারপাশ অন্ধকার দেখছে। গলগল করে র*ক্ত বের হচ্ছে পেটের তিন জায়গা দিয়ে। বাড়িতে কেউ নেই যে তার চিৎকার শুনবে। গতপরশুর পরিকল্পনা সফলের জন্যেই সব চাকরদের সন্ধ্যার পর ছুটি দিয়ে দিয়েছিল সে তিনদিনের জন্যে। সেটাই তার কাল হল। কেউ নেই তাকে বাঁচানোর। সেতো কল্পণাতেও কখনও আনেনি, রাণী এমন কিছু করবে। ষোল বছরের নিজ সন্তান তার। সুমনা পেট ধরে আর্তনাদ করে পিছিয়ে যেতে যেতে বলল, ' ওমাগো...রা-রাণী.. মা হই আ-আমি তোমার। তোমার নিজের মা।'
সুমনার কথায় হেসে উঠল রাণি মির্জা, ' মা? ঠিক! আমার দুর্ভাগ্য আপনি আমার মা। মা, যে নিজের মেয়ের বেডরুমে তার প্রেমিককে পাঠিয়েছে। মা, যে তার নিজের বোনকে ধ*র্ষ*ণ করিয়ে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিয়েছে। একটা নির্দোষ লোককে যাবদ্দজীবন কারাদণ্ড দিয়েছে। মা, যে একটা নিরপরাধ বাবাহীন ছেলেকে, তার মায়ের কোল থেকে কেড়ে নিয়েছে। মা আপনি!'
বলতে বলতে প্রচন্ড আক্রোশে সুমনার দিকে ছুরির কোপ দিল প্রিয়তা। কিন্তু সুমনা গড়িয়ে সরে গেল। কোপটা লাগল সাদা বিছানার মেট্রেক্সে। আতঙ্কে, যন্ত্রণায় চোখ বড় বড় হয়ে গেল সুমনার। জোরে শ্বাস নিতে নিতে চেঁচাতে চাইল, 'বাঁচাও। কেউ আমায় বাঁচাও। আহহহ্, বাবাগো। রাণীহ্। রা-ণী শোন মাআআ।'
বলে উল্টো ঘুরে হামাগুড়ি দিয়ে নামতে চাইল বিছানা থেকে। প্রিয়তা সোজা পায়ের রগের ওখানে ছু*রি চালিয়ে দিল। ফিনকি দিয়ে বেরিয়ে এলো টকটকে লাল র*ক্ত। 'ওমাআআ' বিকট চিৎকারের কাত হয়ে পড়ল সুমনা। প্রিয়তা কোন হিংস্র জানোয়ারের মতোই হামাগুড়ি দিয়ে এগিয়ে গিয়ে অপর পায়ের রগের অংশটায়ও একই গতিতে ছু*রি চালাল। র*ক্তে লাল হয়ে গেল ওর হাত। আরও জোরে চেঁচিয়ে উঠল সুমনা। চিৎকারটাও এবার অনেক ভাঙা, ছিন্নভিন্ন লাগল। সুমনাকে নড়ার সুযোগ না দিয়েই ওর পিঠ, নিতম্ব, পা সেখানে হাত গেল সেখানেই এলোপাথাড়ি ছু*রির আঘাত করে গেল প্রিয়তা। টাটকা লাল র*ক্ত ছিটে ছিটে এসে পড়ল প্রিয়তা সাদা পোশাকে, মসৃণ মুখে-গলায়। সুমনা চিৎকারেরও সুযোগ পলোনা। কয়েকদফা কেবল গো*ত গো*ত আওয়াজ করল।
সুমনাকে টেনে পুনরায় বিছানায় চিৎ করে শোয়াল প্রিয়তা। অতঃপর চড়ে বসল তার ওপর যাতে নড়তে না পারে। তীব্র যন্ত্রণায় কাতর হয়ে সুমনা তাকাল প্রিয়তার দিকে। মিনতি করে বলল, ' আ- আমারে আমারেহ্ মারিস না মা। মা হই আমি তোর। তোরে জন্ম... জন্ম দিছি। মাফ কইরা_ আল্লগো.. মাফ কইরা দে মারে। মারে মারিস না।'
সুমনার কথা উপেক্ষা করে তার হাতের শিরা কা*টায় ব্যস্ত হয়ে উঠল রাণি মির্জা। চোখেমুখে অদ্ভুত কিছু ছড়িয়ে আছে ওর। ইতিমধ্যে ওর সাদা জামা আর ছলদে ফর্সা মুখ রক্তের ছিটায় রঞ্জিত। তারওপর চোখের সেই আক্রোশে পিশাচিনী লাগল ওকে। শিরা কাটা রক্ত গড়গড় করে ছড়িয়ে পরতে থাকল শ্বেত বিছানায়। সুমনার ভারী চিৎকারকে ছাপিয়ে ও বলে উঠল, 'সন্তান কুসন্তান হলেও, মা কুমাতা কখনও হয়না। আপনি সেকথাকে ভুল প্রমাণ করে দিয়েছেন। মা শুধু কুমাতা না, ডাইনীও হয়।'
মিতার মৃত্যু, বশিরের আর্তনাদ, শুভর সেই পিষে দেওয়া লাশ সবকিছু যেন একযোগে ঠেলে দিল প্রিয়তার হাত। ও চিৎকার করে একের পর এক ছোরাঘাত করে চলল সুমনার শরীরে। সুমনার ভারী চিৎকার ধীরে ধীরে গোঙানীতে রূপ নিল। তার বহু অহংকারের সেই সুন্দর শরীরটা ছিন্নভিন্ন হয়ে গেল তারই মেয়ের হাতে। সহ্য করতে না পেরে চোখ উল্টে রক্তবমি করল সে। হাঁপিয়ে গিয়ে থামল প্রিয়তা। সুমনার রক্তাক্ত, বিদ্ধস্ত চেহারার দিকে তাকিয়ে বলল,
'ছোটবেলায় আপনি যখন আমাকে ধমকাতেন, মারতেন। তখন আমি কাঁদতে কাঁদতে বলতাম, আপনি খুব খারাপ। সেটা শুনে মিতা মা কী বলতো জানেন?বলতো, এভাবে বলতে নেই মা। মায়ের পায়ের নিচে সন্তানের জান্নাত। মা যেমনি হোক, তাকে নিয়ে খারাপ কথা বলতে হয়না। মিসেস মির্জা! জান্নাত যদি আপনার মতো মহিলার পায়ের নিচে থাকে; তবে আজ থেকে আমি, রাণী মির্জা, স্বেচ্ছায় জাহান্নামের দিকে অগ্রসর হলাম।'
সুমনা পিটপিটে চোখে তাকিয়ে দেখছে কেবল রাণীর রক্তাক্ত মুখটা। যা ওর নিজের রক্তেই রঙিন হয়েছে। গোটা জীবনটা ভাসছে চোখের সামনে। জীবনে করা সব পাপের বোধ হচ্ছে কী?
হঠাৎই রাণী সবেগে ছুরিটা ঢুকিয়ে দিল সুমনার বা চোখে। তীব্র যন্ত্রণায় ঝাঁকি খেয়ে উঠল সুমনার শরীর কিন্তু আর্তনাদ করার শক্তি আর তার মধ্যে নেই। ছুরিটা ঘুরিয়ে বার করে একই কাজ করল ও ডান চোখের সঙ্গে। সেভাবেই ঝাঁকি খেল সুমনার শরীর। ঘনঘন শ্বাস নিচ্ছে প্রিয়তা। কী করছে যেন নিজেই জানেনা ও। মন হচ্ছে কোন র*ক্তপিপাসু প্রেতাত্মা ভর করেছে ওর ওপর। সেই রক্ত পিপাসাই থামতে দিচ্ছেনা ওকে। সুমনার বুকে পরপর পাঁচটা ছুরির গভীর কোপ দিল কোন নেশাগ্রস্ত উন্মাদিনীর মতোই। এবার আর ঝাঁকি খাওয়ার মতো দশাও রইল না সুমনার। কেবল নড়ে উঠল খানিকটা। শেষমেশ সুমনার দিকে ঝুঁকে এলো প্রিয়তা। নেশাক্ত শীতল কন্ঠে বলল, 'জান্নাতকে আজ নিজ হাতে জাহান্নামে পাঠালাম আমি। আপনার সঙ্গে পরবর্তী দেখা আমার সেখানেই হবে।'
কথাটা শেষ করেই সুমনার গলায় পরপর তিনটে টান মার শীতল আক্রশে। ফিনকি দিয়ে দিয়ে রক্ত ছিটকে বেরিয়ে এলো। শরীরটা থরথর করে কাঁপতে কাঁপতে স্থির হয়ে গেল চিরকালের মতো। যেই মুখ আর শরীর কাজে লাগিয়ে সে এতো পাপ করল। তা আর তাকিয়ে দেখার যোগ্য নেই।
প্রিয়তার রক্তে স্নান করা শরীরে যেন ঢিল পড়ল। জীবনের অর্ধেক বোঝা নেমে গেল, নাকি অর্ধেক জীবন ফাঁকা হয়ে গেল বুঝল না ও। শুধু জানল, হালকা হয়েছে ও।
সাদা বিছানা তখন সুমনার রক্তে লাল চুবচুবে। প্রিয়তা টলমল পায়ে গিয়ে বন্ধ করে দিল লাইটা। অতঃপর ছোরা হাতে বসে বসে অপেক্ষা করল শওকত মির্জার আসার।
সে রাতটা ছিল শওকত মির্জার জীবনের অন্যতম ভয়ংকর রাত। বাড়ি ফিরে সে যা দেখেছে তা সে মরার আগ অবধি ভুলবেনা। অমন বিভৎস লাশ, নিজের মেয়ের অমন পিশাচিনী রূপ। বিছানার ওপর পা ঝুলিয়ে, রক্তাক্ত সাদা টপ এবং রক্তে স্নান করা মুখ আর শরীর শিউরে উঠেছিল তার সর্বাঙ্গ। মুখের সামনে থেকে চুল সরে যাওয়ার সময়কার সেই বিভৎস বাঁকা হাসি শওকতের জন্যে দুঃস্বপ্ন। প্রিয়তা চুপচাপ তার সামনে দিয়ে চলে এসেছিল নিজ রুমে। ওয়াশরুমে ঢুকে দাঁড়িয়েছিল শাওয়ারের নিচে। প্রিয়তার সাদা টাইলসের ফ্লোর সে রাতে লাল হয়ে গিয়েছিল সুমনারক্তে।
সে ব্যপারটা ধামাচাপা দিতে কম হ্যাপা পোহাতে হয়নি শওকতকে। সুমনার লাশ আর সেই বেডশীট, ছুরি। সব মির্জা বাড়ির পেছনে পুতে দেওয়া হয়েছে। ভয়ংকর কথা হল, প্রিয়তা বারান্দায় দাঁড়িয়ে শীতল চোখে দেখিল সবকিছু। যেন কোন সিনেমার দৃশ্য।
নিজের রেপুটেশন, পলিটিক্স সবকিছুর কথা ভেবেই সুমনা কারো হাত ধরে পালিয়েছে এমন ব্যপার সাজানো হল। তীব্র ঘৃণা নিয়েও যে কাজ সে বহুবছরেও করতে পারেনি সে কাজ তার মেয়ে করে দিয়েছিল একরাতে। বছরের পর বছর তার ভেতরে চেপে থাকা বোঝাটাও হালকা হয়েছিল সুমনার বিভৎস মৃত্যুতে। শান অবশ্য জেনেছিল আসল ঘটনা। স্তম্ভিত, হতবাক হয়ে ছিল প্রায় অনকটা সময়। কিন্তু তেমন দুঃখ পায়নি। আর না রাণীর ওপর রাগ এসেছে। সুমনার মৃত্যুতে দুঃখ পাওয়ার মতো আসলে কিছু ছিলোনা কারো কাছে। বিষাক্ত কোন বোঝা নামার মতোই এক স্বস্তি দিয়েছিল সেই মৃত্যু সবাইকে।
তবে সে ঘটনার পর রাণীকে ভয় পেতো শওকত। ভীষণ ভয় পেতো। সেই রাতের ঐ দৃশ্য শওকত ভুলতে পারতোনা। কিন্তু রাণী ছিল অদ্ভুত নির্বিকার। যেন বিশেষ কিছুই ঘটেনি। যা শওকতের ভয়কে আরও বাড়িয়ে দিতো। সুমনার মৃত্যুর খবর কাশেম তখনও জানেনি। সে তখন লন্ডন চলে গিয়েছিল নিজস্ব কাজে। জানার পর স্তম্ভিত হলেও বেশি ভাবেনি। সুমনা এপর্যায়ে তার কাছে অনেকটা গলার কাটার মতোই হয়ে গিয়েছিল। নেমেছে ভালোই হয়েছে। তবে রাণীর কাছাকাছি যাওয়ার সুযোগটা তার আর হয়নি।
এদিকে রাণী বহু আগে টের পেয়েছে তার পরিবার ঠিক কোন অনৈতিক কাজের সঙ্গে জড়িত। নীরব, শান্ত থেকেও সে নিজেকে প্রস্তুত করছিল ভিন্ন লক্ষ্যে। কাশেম হক!
কলেজে পড়াকালীন অবস্থাতেই ক্যারাটেসহ আরও কিছু ফাইটিং স্কিল ও শিখেছিল সবার অলক্ষ্যেই। সেইসঙ্গে ফানশনাল অ্যডিক্টও ছিল ও।
এরমধ্যেই প্রিয়তার দ্বিতীয় বর্ষে সে শওকতকে জানায় সে এইচএসসির পর গ্রাজুয়েশন ব্রিটেনে করবে। শানের কাছে। শওকত ভেবেছিল রাজি হবেনা। এড়িয়ে যাবে কোনভাবে।
কিন্তু এরমধ্যেই ঘটল ভিন্ন ঘটনা। প্রিয়তাকে ইংরেজি পড়াতে একজন শিক্ষক আসতো বাড়িতে। কয়েকবার একা পেয়ে প্রিয়তাকে মলেস্ট করার চেষ্টা করেছে সেই লোক। একদিন প্রিয়তা নিজের ধারাল কলমটা সজোরে গেঁথে দেয় সোজা লোকটার গলায়। সেখানেই কাত হয়ে মরে পরে থাকে সে। শওকত এ দৃশ্য দেখে দম আটকে দাঁড়িয়ে থাকে। অথচ মেয়ে তার নির্বিকার। যেন খেলনা ভেঙেছে। সে ঘটনাও শওকত এবং কাশেম উভয়কে একসঙ্গে ধামাচাপা দিতে হয়। শওকতের আর সাহস হয়না প্রিয়তাকে কোনকিছুতে না করার।
এরপর ব্রিটেন যাওয়া। সবকিছু দেখেবুঝে একবছর পর ডার্কনাইটে যুক্ত হওয়া। আনআর্মড ফাইটিং এর ট্রেনিং, বিভিন্ন রকম অস্ত্রশিক্ষা, নিখুঁত নাইফ থ্রোয়িং, বাইক রাইডিং সবটাই আয়ত্ব করে নেয় ও সময় নিয়ে। বিশাল দখলদারিত্ব নিয়ে নেয় আন্ডারওয়ার্ল্ডে। ফানশনাল অ্যডিকশন, খুন, রক্তের পিপাপা, জেদ সব মিলিয়ে মিতার সেই আদুরে প্রিয়তা থেকে হয়ে ওঠে এই বিষাক্ত পৃথিবীর রাণী মির্জা।
মিতা তখন এইসব দেখলে হাহাকার করে এই পৃথিবীকে জানাতো,
বিশ্বাস করো আমার খুকি এমন ছিলোনা,
ছায়া দেখলেই ভয় পেতো, মানুষ মারার প্রশ্নেই ওঠে না।
·
·
·
চলবে……………………………………………………