যেভাবেই হোক, পালানোর কোনো উপায় বের করতে পারিনি— তাই আজ রাতে নর্থ এন্ড কফি শপে জাহিদের সঙ্গে আড্ডা দিতে এসেছি।
তানজিনার বিছানায় পচা ফল ফেলে দেওয়ার ঘটনার পর বেশ কয়েকদিন কেটে গেছে। স্বীকার করতে লজ্জা লাগে. তবু বলছি, সেই রাতে বেশ ভয়ে ভয়ে ছিলাম। ঘুমাতে যাওয়ার আগে আমি নিশ্চিত হয়েছিলাম আমাদের বেডরুমের দরজাটা ভেতর থেকে লক করা আছে কি না। কেন জানি না বারবার মনে হচ্ছিল— প্রতিশোধ পরায়ন হয়ে তানজিনা হয়তো চুপিচুপি ঘরে ঢুকে ঘুমের মধ্যে আমার গলা কেটে ফেলতে পারে। অথবা, ফলের সেই পচা গলা অংশগুলো পাল্টা আমাদের ওপর ফেলে দিতে পারে— যেটা প্রায় একই রকমভাবে ভয়ংকর হতো।
কিন্তু অদ্ভুত ব্যাপার হলো, তানজিনা আমাকে ঘুমের মধ্যে খুন করতে আসেনি। আরো আশ্চর্যের ব্যাপার হলো, ঘটনাটা নিয়ে ও একটাও কথা বলেনি। বরং করিডরে বা ড্রয়িংরুমে যখনই ওর সাথে দেখা হয়েছে, ও এমন ভাব করে যেন কিছুই ঘটেনি। ব্যাপারটা আমার কাছে অস্বাভাবিক লাগছে। তাই আমি খুব টেনশনে আছি। কে জানে, ও ভেতরে ভেতরে কী প্ল্যান করছে।
আমি নর্থ এন্ডে পৌঁছাই দশ মিনিট দেরিতে। এটা ধানমন্ডির সেই শাখাটা, যেটা একটু নিরিবিলি— কাঠের চেয়ার-টেবিলগুলো দেখতে সুন্দর হলেও কেমন যেন পুরনো মনে হয়। এসি চলছে, তবু পুরো জায়গাটার বাতাসে কফি আর হালকা সিগারেটের গন্ধ মিশে আছে। আমার ধারণা, যারা বাইরে স্মোকিং জোন থেকে সিগারেট খেয়ে ঢোকে, তাদের গা থেকেই এই গন্ধটা আসে। নাবিলা সিগারেট বা তামাকের গন্ধ একদম সহ্য করতে পারে না— গন্ধটা আমাকে সেটা মনে করিয়ে দেয়, অস্বস্তি লাগে।
ক্যাফেতে ঢুকে দেখি জাহিদ নেই। ওকে না দেখে মনে হচ্ছে বেরিয়ে যাই। দেখা করার জন্য তো ও-ই আমাকে গোঁ ধরে টেনে এনেছে— এখন ও নিজেই আমার থেকে লেট? কিন্তু নাবিলা ব্যাপারটা নিয়ে ভীষণ এক্সাইটেড। ওর বান্ধবীর জামাইয়ের সাথে আমি আবার বন্ধুত্ব পাতাতে যাচ্ছি এটা ভেবে ও খুব খুশি। এই অবস্থায় আমি যদি এখনই ফিরে যাই, আর ও যদি ব্যাপারটা বুঝতে পারে তাহলে হয়তো মন খারাপ করবে। রাগও করতে পারে। সাম্প্রতিক ঝগড়াগুলোর পরে, ওকে আরও খারাপভাবে রাগিয়ে তোলার ঝুঁকি আমি নিতে চাই না।
তাই দুইজনের একটা টেবিল খুঁজে তাতে বসে পড়ি। পাশের টেবিলেই কম বয়েসী দুটো মেয়ে বসে আছে। ওদের পরনের পোশাক একটু বেশিই চটকদার। আমি খুব চেষ্টা করি ওদের দিকে না তাকানোর। একজন মনে হয় ব্যাপারটা টের পেয়ে গেছে। এখন ফিসফিস করে কী জানি বলছে আর দু’জন একসাথে হেসে উঠছে। হাসির খিলখিল শব্দ কানে এসে লাগছে। ওরা কি আমাকে নিয়েই হাসাহাসি করছে? জাহিদ কোথায়? আরও পাঁচ মিনিট অপেক্ষা করে এখান থেকে চলে যাব।
চার মিনিট পরে, জাহিদ হুড়মুড় করে ঢুকল। ফরমাল শার্ট-প্যান্ট পরা, সাথে টাই— ওর মোটা শরীরে বেশ মানিয়েছে। আমার বেশ রাগ হয়। কারণ আমি অফিসের কাপড় ছেড়ে ক্যাজুয়াল জিন্স আর টি-শার্ট পরে এসেছি। ওর মুখে সেই চেনা ভাব— ক্লান্ত, কিন্তু ভেতর থেকে অদ্ভুতভাবে উৎফুল্ল। ‘চৌধুরী অ্যান্ড খান’-এ লম্বা দিনের শেষে আমিও এভাবেই ক্লান্ত হয়ে পড়তাম কিন্তু মনে মনে খুশি থাকতাম।
“আহসান ভাই! হাই ম্যান!” ও জোরে ডাক দেয়।
টেবিলের কাছে এসে হাত তোলে। আমি ভাবি হ্যান্ডশেক করবে, তাই হাত বাড়াই। কিন্তু ও আসলে হাই-ফাইভ দিতে চেয়েছে। শেষ মুহূর্তে হ্যান্ডশেকটাকে অদ্ভুতভাবে বদলে হাই-ফাইভে কনভার্ট করি। জঘন্যরকম অস্বস্তিকর। আমি চাই এই নাটকটা দ্রুত শেষ হোক।
জাহিদ চেয়ার টেনে বসে। “কিছু অর্ডার করেছেন ভাই?” আমি করিনি। ভেবেছিলাম হয়তো পালাতে পারব। “এখনও না।”
হাত নেড়ে জাহিদ ওয়েটারকে ডাকল। আমি কোল্ড কফি অর্ডার করলাম, আর ও নিল ব্ল্যাক কফি। ব্ল্যাক কফির কথা শুনেই বুকের ভেতর কেমন যেন করে উঠল, কারণ ওয়াহিদ স্যারের ফেভারিট ছিল এটা।
“তো, নতুন জব কেমন চলছে?” জাহিদ জিজ্ঞেস করল।
“দারুণ।”
“ভালো,” ও বলল। “ভালো ভালো ভালো ভালো ভালো।”
“হুম।”
তারপর গলা খাঁকারি দিয়ে বললাম, “আর... কোম্পানি কেমন চলছে?” ভবিষ্যতের কোনো একদিন হয়তো এই কথাটা বলার সময় গলা বসে যাবে না। কিন্তু আজ এটাই হলো।
ও কাঁধ ঝাঁকাল। “আরে, আগের মতোই। জানেনই তো।”
একবার ইচ্ছে হলো জানতে চাই— ওয়াহিদ স্যার কি কখনও আমার কথা বলেন? কিন্তু জেনেই বা কী হবে? তাই আরেকটা প্রশ্ন করি, যেটার উত্তরও শুনতে চাই না। “নতুন ভিপি কে হলো? সাজ্জাদ?”
“সাজ্জাদ হোসেন?” জাহিদ নাক সিঁটকাল। “প্রায় হয়েই যাচ্ছিল। কিন্তু পরে ওকে ওয়াশরুমে বসে গাঁজা খাওয়া অবস্থায় পাওয়া গেল।”
আমার চোখ কপালে উঠল। “কী! সিরিয়াস?”
“একদম।”
আমি অবাক, আবার পুরোপুরি অবাকও না। সাজ্জাদ কোম্পানিতে সবার থেকে বেশি সময় কাজ করত, কখনও ক্লান্ত দেখতাম না। প্রায় রোবটের মতো ছিল। কিন্তু নেশা করা ছেলেদের আমি চিনি, সাজ্জাদকে সেই ক্যাটাগরির মনে হয়নি। বউ-বাচ্চা ছিল, খুব গোছানো লাগত। কিন্তু চাপ মানুষকে কত কিছুই করতে বাধ্য করায় কে জানে!
“তাহলে শেষমেশ পজিশনটা কে পেল?” আমি জিজ্ঞেস করলাম।
জাহিদ বলল, “আসলে... আমি।”
“কী?”
কথাটা এত জোরে বেরিয়ে গেল যে দুই টেবিল দূরে বসা এক লোক ঘুরে আমার দিকে তাকাল। ঠিক তখনই ওয়েটার এসে আমাদের কফি টেবিলে রেখে গেল। জাহিদ কফিতে চুমুক দেয়া শুরু করল। আর আমি মগটা হাতে নিতেই ভুলে গেলাম। জাহিদ ‘চৌধুরী অ্যান্ড খান’-এর মার্কেটিং ভিপি? ও তো ঠিকঠাক করে একটা কাজও করতে পারত না। ছয় মাস আগে ও এসইও বলতে কী বোঝায় ওটাও জানত না। এটা কীভাবে সম্ভব?
যাই হোক, নিজেকে কোনো রকমে সামলে নিয়ে আমি কফিতে চুমুক দিলাম। নিজেকে আরো বেশি সামলে রাখার চেষ্টা করতে থাকলাম যাতে এমন কিছু বলে না ফেলি যার জন্য পরে আফসোস করতে হয়। “বাহ্... শুনে খুব খুশি হলাম,” মিথ্যে কথাটা শেষমেশ বলতেই হলো। ওয়াহিদ স্যার এত বড় একটা ভুল সিদ্ধান্ত নিতে পারেন ভাবতেই পারছি না।
“আমি খুব হার্ড ওয়ার্ক করেছি ভাই। ওয়াহিদ স্যার বলেন আমি নাকি ওনার রাইট-হ্যান্ড ম্যান।”
“ওয়াহিদ স্যার বলেছেন?”
“হ্যাঁ।” ওর মুখ লালচে হয়ে উঠল। “যাই হোক, অন্তত আমি নেশাও করি না, আর কোম্পানি থেকে ইনফোও চুরি করি না।”
এবার আমার কান গরম হয়ে উঠল। “আমি চুরি করিনি। কখনও চিন্তাও করিনি। আর তুমিও সেটা ভালো করেই জানো।”
“জানি?” ও ভ্রু নাচাল। “অফিসে আপনি তো একদম ধোয়া তুলসী পাতা ছিলেন না ভাই। অনেকেই আপনাকে নিয়ে অনেক কথা বলত। আমি অর্ধেক সময় আপনাকে ডিফেন্ড করেই কাটিয়েছি। সাজ্জাদও বলেছিল, আপনি নাকি ওর আইডিয়া চুরি করে নিজের বলে চালান।”
আমি টেবিল থেকে কফির মগটা তুলে নিলাম আর এক টানে পুরোটা শেষ করে ফেললাম। তারপর ওটা ধপ করে নামিয়ে উঠে দাঁড়ালাম। “আমি যাচ্ছি।”
জাহিদের মুখ নরম হয়ে গেল— ওর স্বভাবই এমন, কেউ চড়া হলে গলে যায়। ভিপি পজিশনের জন্য ও ভীষণ দুর্বল। পাঁচ দিনেই সবাই ওকে চিবিয়ে খেয়ে ফেলবে। আর ওয়াহিদ স্যার তখন বুঝবেন আমাকে ছেড়ে ভুল করেছেন। “আরে, দাঁড়ান ভাই। সরি। আমি ওইভাবে বলতে চাইনি।”
“চেয়েছিলে।” আমি পকেট থেকে মানিব্যাগ বের করলাম, আমার কফির বিলটা টেবিলে রাখলাম। “এখানেই শেষ।”
ও তড়িঘড়ি উঠে সামনে এসে দাঁড়াল। “কিন্তু তিশা আর নাবিলা ভাবি তো চেয়েছিলের আমরা বসে একটু আড্ডা দেই,” ওর কথা শুনে আমার সন্দেহ আরও পাকা হলো।
“দিলাম তো,” আমি বললাম। “এখন বাড়ি যাওয়ার আগে একটু হাঁটব। তুমি তিশাকে বলো দারুণ আড্ডা হয়েছে। আমরা এখন জিগরি দোস্ত।” আমি কাঁধ ঝাঁকালাম। “না, তোমার যা খুশি বলে দিও, কিন্তু আমি আর এক সেকেন্ডও এখানে বসছি না।”
আমি জাহিদকে পাশ কাটিয়ে বেরিয়ে এলাম, আর ক্যাফে থেকে পুরোপুরি না বেরোনো পর্যন্ত থামলাম না। জাহিদ অল্প চেষ্টা করেছিল থামাতে, তারপর হয়তো ঠিক করেছে নিজের কফিটা শেষ করবে। মাথায় ঢুকছে না— ও কীভাবে আমার পদবীটা পেয়ে গেল? ও তো ভয়ংকর রকমের আনকোয়ালিফাইড। নিশ্চয়ই ওয়াহিদ স্যারকে কোনোভাবে পটিয়েছে।
রাস্তায় বেরিয়ে যাওয়ার আগে, আমি ক্যাফের কাঁচের দেয়াল ভেদ করে ভেতরে তাকালাম। জাহিদ কি আমাকে ফলো করছে? বা আরও খারাপ কিছু? এই যেমন, তিশাকে ফোন করে বলবে আমি রেগে বেরিয়ে গেছি, আর তিশা সেটা নাবিলাকে জানিয়ে দেবে? কিন্তু না। ও আমাকে ফলো করছে না, ফোনেও নেই। বরং সে ওই দুই মেয়ের সঙ্গে কথা বলছে, যারা একটু আগে আমার দিকে তাকিয়ে হেসেছিল। ভালো, ভালো, ভালো। আশা করি বলদটা এই মুহূর্তটা দারুণ ‘এনজয়’ করছে।
·
·
·
চলবে……………………………………………………