হৃদয়ে রহো প্ৰিয় - পর্ব ০৭ - রাই কথা - ধারাবাহিক গল্প

হৃদয়ে রহো প্ৰিয় - রাই কথা
          সূর্য ডোবার পর থেকেই নিশিখালি গ্রাম সনাতন প্রাকৃতিক রূপান্তরের মধ্য দিয়ে যায়। বিকেলের হলদেটে আভা মুছে গিয়ে চারপাশ ঘন, ধূসর কুয়াশার চাদরে ঢাকা পড়ে। গোধূলির আলো মিলিয়ে যেতে না যেতেই বিলের দিক থেকে ধেয়ে আসে হাড়কাঁপানো উত্তুরে হাওয়া। সেই হাওয়া যখন শুকনো পাতার ভেতর দিয়ে বয়ে যায়, তখন এক ধরণের গা ছমছমে শব্দ ওঠে, যা রাতের নিস্তব্ধতাকে আরও প্রকট করে তোলে।

এশার আজানের পর পরই পথগুলো প্রায় জনশূন্য হয়ে পড়ে। দূরে কোথাও সমবেতভাবে ডেকে ওঠে বুনো শেয়ালের দল। সরকার বাড়ি সহ আশেপাশের উঠানের বড় বড় মাটির ডেকচিতে ধান সেদ্ধ করার তোড়জোড় চলছে। লাকড়ির চুলার সেই আগুনের লালচে আভার কাছে আয়না বসেছিল বিধায় তাকে মোহনীয় লাগছিল। মাহিরের শাশুড়ির প্রবল জোরাজুরিতে সে উঠে ঘরের ভেতরে আসে। 

তা দেখা মাত্রই জানালার পাশ থেকে সরে মাহির খাটে উঠে বসল। শীতে তার মাথাব্যথার সমস্যা নতুন কিছু না, কিন্তু এবার বেশ ঘনঘন হচ্ছে। কয়েক ঘণ্টা ঘুমিয়ে উঠে কিছুটা ভালো লাগছে।

অন্ধকার হয়ে যায় হঠাৎ করে! আয়নার স্বর শোনা যায়, ভয় পেয়ো না। আলো নিয়ে আসছি।

মাহির বিরক্ত হয়। মেয়েটার কিছু কথা শুনলে মাথা গরম হয়ে যায়। কী ভাবে সে মাহিরকে!

 গুনগুন করতে করতে আয়না ঘরে আসে। মাহির দেখে আয়নার নিপুণ হাতের কর্মযজ্ঞ। সঙ্গে করে নিয়ে আসা হারিকেনের টিমটিমে আলোয় আয়নার ছায়া দেয়ালে দীর্ঘ হয়ে কাঁপছে। আয়না রান্নাঘরের চুলার ভেতর থেকে একটা মাটির সরায় লাল টকটকে কয়লা নিয়ে এল। চিমটা দিয়ে কয়লাগুলো সাজিয়ে তার ওপর খুব সাবধানে গরম ছাই আর কিছুটা ধানের তুষ ছিটিয়ে দিল সে। এরপর সেই গরম সরাটা একটা পুরনো চটের বস্তায় কয়েক ভাঁজ করে মুড়িয়ে খাটের নিচে লেপের পায়ের দিকে আলতো করে গুঁজে দিল। মাহির অবাক হয়ে দেখল, বরফ শীতল লেপটা মুহূর্তের মধ্যে একটা আরামদায়ক উষ্ণতায় ভরে উঠল।

সে মৃদু স্বরে বলল, মালসা এটা।

টেবিলে রাখা পিতলের বাটিতে মটরশুঁটি ও কলাই ভাজা। আয়না নিজের কাজ শেষ করে মাহিরের দিকে না তাকিয়েই শান্ত গলায় বলল, চা দিব আবার?

মাহির লেপের ওম নিতে নিতে আয়নার দিকে স্থির চোখে তাকাল। তার কানে এখনো বিকেলের সেই অমীমাংসিত প্রশ্নটা বাজছে। মাহির ধীরস্বরে ডাকল, না দিও না। কাসিফ কোথায়?

-বাইরে খেলছে বোধহয়। কিছু আনাতে হবে?

-না। আমারও তার সাথে খেলার কথা ছিল।

-আপাতত যেয়ে কাজ নেই।

-কেন তুমি কিছু বলবে?

আয়না চোখ তুলে বলল, কেন তুমি কিছু শুনতে চাও?

মাহির চুপ করে রইল। সে শুনতে চায় আয়নার কথা। কিন্তু দ্বিতীয়বার জিজ্ঞেস করতে ইচ্ছে করছে না। কী আশ্চর্য, এই মেয়েটা এত অদ্ভুত কেন!

আয়না বেশ আয়োজন করে কাপড় ভাঁজ করতে করতে কথা বলতে লাগল, তোমার জন্য দুঃসংবাদ হলো যে শার্লক হোমস বা ফেলুদা বা মিসির আলির মতো চমৎকার বা রসালো কোনো রহস্য তুমি খুঁজে পাওনি। ব্যাপারটা খুবই সরল। সেদিন রাজিব গোপনে আমার সাথে দেখা করার জন্য খবর পাঠায়। আমার ঘরের ফাজিলদের পীড়াপীড়িতে আমি সেখানে যাই। কোনো কারণ ছাড়াও ওখানে আমি বেশ সময় কাটাই, তাই কারো কাছে অদ্ভুত লাগেনি। লাগলেও আমাকে বলতে আসত না। তখন রাজিবের বদলে উপস্থিত হলে তুমি। আসলেই যদি তাড়া না থাকত অপরিচিত পুরুষকে নামধাম বলার প্রশ্ন উঠত না। কিন্তু আমিও হয়তো খানিক ঘোরেই ছিলাম। তা সে যাক। তুমি গেলে, রাজিব আসল। বাই দ্য ওয়ে, তুমি তাকে তখন দেখে ফেলেছিলে তাই না?

মাহির হ্যাঁ সূচক মাথা নাড়ে।

আয়না উত্তর পেয়ে বলতে থাকে, সে জানায় বিয়েতে তার কোনো মত নেই। তার এক জনম জনমের প্রেমিকা রয়েছে। যেকোনো কারণেই হোক তাদের আলাদা করা হচ্ছে। আমাকে দেখার পর হয়তো তার বিয়ে না করার সংকল্প আরও দৃঢ় হয়।

এই পর্যায়ে মাহির তাকে থামিয়ে দিয়ে জিজ্ঞেস করল, কেন এমন মনে হলো?

-প্রমাণস্বরূপ প্রেমিকার ছবি দেখিয়েছিল। অসামান্য দুধে-আলতা টাইপের রূপবতী নারী।

মাহিরের আয়নার নিজেকে তুচ্ছ করে বলা কথা বোধহয় পছন্দ হলো না। সে কিছু বলার আগেই আয়না বলল, আমার গায়ের রং নিয়ে মোটেও কোনো কমপ্লেক্স নেই। বাট ইট ইজ, ওয়াট ইট ইজ! তার আমাকে পছন্দ হয়নি। আগের কয়েকটা প্রস্তাবও সম্ভবত এর জন্যই আগায়নি। তো যাই হোক, ঝোঁকের মাথায় সে পরদিন সকালেই পালিয়ে যাবে জানিয়ে ক্ষমা-টমা চেয়ে চলে যায়।

-তোমার প্রতিক্রিয়া কী ছিল?

-কিছুই না। যদিও মনে হয়নি মেম্বার চাচার সামনে তার সাহসে কুলোবে একাজ করতে। কিন্তু গায়ে হলুদের সময় নিশ্চিত হই। ব্যাস আর কী! বিয়ে হচ্ছে না ভেবে বসেছিলাম আর তখনই—

মাহির থমথমে স্বরে বলল, আমি এসে হাজির হলাম। তুমি কেন ওর ব্যাপারটা কাউকে বললে না?

-প্রথমত ওর কথার কোনো নিশ্চয়তা ছিল না। দ্বিতীয়ত কেউ বিশ্বাস করত না আর তখন মেম্বার চাচা ঘটনার মোড় ঘুরিয়ে ফেলত। আর ফাইনালি বিয়েটা ভেঙে গেলে মন্দ হতো না।

মাহির বিস্মিত হয়ে বলল, তোমার বিয়ে শেষ মুহূর্তে এসে না হলে মন্দ হতো না বলছো! তোমার বাবার কী পরিমাণ ফেসলস হতো জানার পরেও?

আয়না ঠান্ডা স্বরে বলল, তাই তো বললাম। একদম মন্দ হতো না।

মাহির কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে বলে, মানে তোমাদের পরিকল্পনা ঠিক ছিল। দু’জন রাজিও ছিলে। মধ্য দিয়ে আমার আগমনে সব ভেস্তে গেল।

আয়না বলল, বললাম না পরিকল্পনাটা আমার ছিল না, কিন্তু পরিণামে অসন্তুষ্ট হতাম না।

মাহির আর কিছু বলল না। আয়না জিজ্ঞেস করল, তোমার জামাকাপড় ভাঁজ করতে হবে না?

সে রুষ্ট স্বরে বলল, না। আমি নিজেই করে নেব।

আয়না হেসে বলল, তোমাকে কাজ করতে দেখলে যে আমার পিঠে মার পড়বে।

মাহির বলল, সৎ মা হওয়া সত্ত্বেও তিনি তোমাকে খুব ভালোবাসেন।

আয়না চমকাল। মাহিরের চোখে দুষ্টুমি ঝলক দেয়, কীভাবে বুঝলাম জানতে চাও?

-অত কঠিন কিছু না। আমি নিজেই তো বেশ কয়েকবার সৎ মা ডেকেছি তোমার সামনে।

-তা ডেকেছো। কিন্তু তা আহ্লাদের ছলেও হতে পারে। তোমাকে নিয়ে তিনি যতটা ভাবেন, চিন্তা করেন, অন্য সন্তানদের নিয়ে করেন না। গর্ভজাত সন্তানদের নিয়ে সাধারণত এই অতি সাবধানতা থাকে না।

আয়না চুপ থেকে বলল, আবারও স্বীকার করতে হচ্ছে, ইউ আর অবজারভেন্ট।

—————

উঠানে পায়ের শব্দ আর নিচু স্বরে কথা বলার আওয়াজ পাওয়া গেল। আফজাল মেম্বারের বাড়ি থেকে লোক এসেছে রাতের খাবারের নিমন্ত্রণের জন্য সবাইকে নিয়ে যেতে। একটু পরেই কুলসুম বেগম দরজায় কড়া নেড়ে ঘরে ঢুকলেন। তাঁর চোখেমুখে এক ধরণের শঙ্কা মেশানো উত্তেজনা। মেয়ে-জামাই যেন একান্ত কথাবার্তা বলতে পারে, সেজন্য অনেক চেষ্টা করছেন তিনি। ছেলেটাকে তাঁর বেশ শান্তশিষ্ট সুপুরুষ মনে হয়েছে। আয়নার সাথে থাকতে হলে ধৈর্য খুব প্রয়োজন।

তিনি বেশ নরম গলায় বললেন, বাবা মাহির, মেম্বার ভাই তো তার বাড়িতে তোমার জন্য মহা আয়োজন করে বসে আছে। সবার পাতে খাবার বেড়ে রাখা হয়েছে। তোমারে নিতে যেতে নিজে লোক পাঠিয়েছেন। চলো বাবা, রাত তো অনেক হলো।

মাহির খাটের ওপর স্থির হয়ে বসে রইল। সে খুব শান্ত কিন্তু অত্যন্ত দৃঢ় গলায় বলল, আম্মা আমি আজ ওবাড়িতে খেতে যাব না। আমি এখানেই খাব।

কুলসুম বেগম যেন আকাশ থেকে পড়লেন। তিনি মাহিরের কাছে এসে একটু অনুনয়ের সুরে বললেন, সে কী কথা বাবা! কেউ কি তোমাকে কিছু বলেছে? নতুন জামাই দাওয়াতে থাকব না এটা কেমন দেখায়? তোমার শ্বশুর খুব আশা করে আছেন। চলো বাবা, অল্প একটু খেয়ে আসবে।

মাহির এবার শাশুড়ির দিকে তাকিয়ে বিনীতভাবে হাসল। কিন্তু তার গলার স্বরে কোনো নমনীয়তা ছিল না, আপনি অনুরোধ করবেন না আম্মা। সকালে যা ঘটেছে তারপর ওই বাড়িতে গিয়ে আতিথেয়তা নেওয়ার মতো মানসিকতা আমার নেই। আমি এ বাড়িতেই আপনার হাতের রান্না খাব।

ঠিক এই সময় ঘরের দরজায় এসে দাঁড়ালেন রফিক সরকার। মেয়ে জামাইয়ের অস্বীকৃতির কথা তাঁর কানে পৌঁছেছে। তিনি গলা ঝেড়ে একবার গম্ভীর স্বরে বললেন, সবাই তো বসে আছে। খাওয়ার সময় হয়ে গেছে, চলো।

মাহির এবার উঠে দাঁড়াল। শ্বশুরের চোখের দিকে সরাসরি তাকিয়ে অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় বলল, ক্ষমা করবেন। আমি একবার না বলেছি। আপনি বরং উনাদের নিয়ে খেয়ে নিন। আমার জন্য চিন্তা করবেন না।

রফিক সরকার স্তম্ভিত হয়ে গেলেন। নিশিখালি গ্রামের কেউ তাঁর মুখের ওপর দু’বার কথা বলার সাহস রাখে না, আর আজ তাঁর নিজের জামাই জনসমক্ষে তাঁকে প্রত্যাখ্যান করল। তাঁর চোয়াল শক্ত হয়ে এল, রাগে কপাল কুঁচকে উঠল। তিনি আর একটি শব্দও উচ্চারণ করলেন না। গুমট এক নিঃশ্বাস ফেলে তপ্ত পায়ে উঠান মাড়িয়ে মেম্বার বাড়ির দিকে চলে গেলেন। তাঁর হাঁটার ভঙ্গি বলে দেয়, এই অপমান তিনি সহজে হজম করবেন না।

স্বামীর প্রস্থানে কুলসুম বেগম কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন। এত বছর সংসার করার ফলে তিনি জানেন রফিক সরকার রাগ করলে বাড়িতে তুফান বয়ে যায়। কিন্তু তিনি মেয়ে জামাইকে অভুক্ত রেখে আর ও বাড়িতে যাওয়ার প্রশ্নই ওঠে না। বিষণ্ণ মনে মাহিরের দিকে তাকিয়ে বললেন, না যাইতে চাইলে নাই। কোনো সমস্যা হবে না। আইরিনও যাবে না। আমিও তাইলে আর ওই বাড়িতে গিয়ে কী করব? আমি এখানেই তোমাদের জন্য কিছু রেঁধে দিই। একদম সময় লাগবে না।

মাহির এবার হাসল, কোনো আয়োজন লাগবে না আম্মা। আমার আসলে পেটে তিল পরিমাণ জায়গা নেই। যা আছে তাই আমি তৃপ্তি সহকারে খাব।

কুলসুম বেগম রান্নাঘরের দিকে দ্রুত পা বাড়ালেন। আয়না এতক্ষণ দরজার আড়ালে দাঁড়িয়ে দৃশ্যটা দেখছিল। চিন্তায় তাঁর বুকটা ধরফড় করছে। বাড়িতে চিতলের কোপ্তা, চুই ঝাল দিয়ে গরুর মাংস আর মাসকলাই ডাল ছিল, অথচ এই মুহূর্তে তাঁর হাতে কিছুই নেই। জামাইকে তো আরও দু-একটা পদ পরিবেশন করতে হয়! খুব দ্রুত হাতে তিনি চুলা ধরালেন। মনে মনে এক ধরণের অপরাধবোধ কাজ করছে। শেষ বেলায় এসে এমন মনমালিন্য না হলে হতো না!

খানিক বাদে কুলসুম বেগম ধোঁয়া ওঠা ঘি দেওয়া গরম ভাতের সাথে সব খাবার পরিবেশন করলেন ডাইনিং টেবিলে। সুঘ্রাণ ঘরটাকে মোহিত করে ফেলল। তিনি পাশে বসে সস্নেহে মাহিরের পাতে খাবার তুলে দিলেন। মাহির খুব শান্তভাবে ভাতের থালাটা টেনে নিল। প্রাণ দিয়ে চেষ্টা করেও তিনি মাহিরের মুখ থেকে পছন্দের খাবারের নাম বের করতে পারেননি।

কুলসুম বেগম তীক্ষ্ণ চোখে লক্ষ্য করতে লাগলেন। তিনি জীবনে অনেক জামাই-আদর দেখেছেন, যেখানে পাতের ওপর খাবারের পাহাড় না থাকলে মান-অভিমান শুরু হয়। কিন্তু মাহির অত্যন্ত নিভৃতে, কোনো প্রকার শব্দ না করে খেতে শুরু করল। ভাত মাখানোর ধরনে কোনো তাড়াহুড়ো নেই, পাতের চারপাশে ভাত ছিটিয়ে ফেলা নেই। অত্যন্ত পরিপাটি। 

সবচেয়ে অবাক করা বিষয় হলো, মাহির স্রেফ যা দেওয়া হয়েছে তাই পরম তৃপ্তিতে মুখে তুলছে। এমনকি কুলসুম বেগম যখন জোর করে আরও এক হাতা ডাল দিতে চাইলেন, মাহির খুব নম্রভাবে হাত দিয়ে থালা ঢেকে মৃদু হেসে বলল, না আম্মা, একদম পেট ভরে গেছে। অপচয় করা ঠিক হবে না।

কুলসুম বেগমের মনে হলো, এই ছেলেটার তেমন কোনো চাহিদা নেই, কোনো বাড়তি আবদার নেই। পাতের অবশিষ্ট অংশটুকুও সে পরিষ্কার করে খেল, যেন অন্ন নষ্ট করা তাঁর স্বভাবে নেই। এমন নির্ঝঞ্জাট আর মিতব্যয়ী পুরুষ তিনি কমই দেখেছেন। 

খাওয়া শেষে মাহির হাত ধুয়ে বসলে কুলসুম বেগম দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, তোমার আম্মার সাথে কথা বলতে খুব ইচ্ছে করে বাবা। এই বিয়েটা এত তাড়াহুড়ো আর হুটহাট করে হলো যে, ওনার সাথে ঠিকমতো আলাপই জমানো হলো না। আগে থেকে জানাশোনা থাকলে এমনটা মোটেও হতো না।

মাহিরের হাসিমাখা মুখটা ফ্যাকাশে হয়ে গেল। চোখের মণিটা হঠাৎই আর্দ্র দেখাল। সে কয়েক মুহূর্ত পাথরের মতো নিশ্চল থেকে খুব নিচু স্বরে বলল, আমার মা নেই আম্মা।

আয়না অবাক হয়ে তাকাল তার দিকে। এই ব্যাপারটা সে জানত না। শুধু এটা না, মাহিরের ব্যাপারে অধিকাংশ বিষয় সে জানে না। না সে জিজ্ঞেস করে, আর না মাহির নিজে থেকে জানায়। মুহূর্তেই পুরো ঘরটাতে নীরবতা নেমে এল। কুলসুম বেগম নিজের অজান্তেই শিউরে উঠলেন। মাতৃহীন এই ছেলেটার এই শান্ত স্বভাব, খাবারের প্রতি এই অনাগ্রহ আর এই একাকীত্বের কারণটা এক নিমিষেই তাঁর কাছে পরিষ্কার হয়ে গেল।

 এক অদ্ভুত মায়া আর করুণায় তাঁর বুকটা হাহাকার করে উঠল। তিনি অপরাধবোধে কিছুটা সংকুচিত হয়ে বললেন, ইশ! আমি আগে জানলে এমন কথা পাড়তাম না। মনে দুঃখ নিও না বাবা।

মাহির ম্লান হেসে বলল, কোনো ব্যাপার না। ঠিক আছে আম্মা। এটা এখন জীবনের অংশ হয়ে গেছে।

কুলসুম বেগম থালাবাসন নিয়ে বেরোনোর সময় আয়নাকে ইশারায় বাইরে ডেকে নিলেন। বারান্দার অন্ধকারে তিনি মেয়ের হাতটা খুব শক্ত করে ধরলেন। তাঁর কণ্ঠস্বর কাঁপছে। নিচু স্বরে বললেন, শোন আইরিন, এই ছেলেটার মা নেই রে। মা ছাড়া মানুষ কত একা থাকে তুই তা বুঝবি না।

আয়না ভ্রু কুঁচকে বলল, ওহ আচ্ছা?

কুলসুম বেগমের মেয়ের মশকরা পছন্দ হলো না। মেয়েটা মাঝে মাঝে অতিরিক্ত করে। আসলেই তো সে বুঝবে কী করে। সে তো কুলসুম বেগমেরই মেয়ে! তিনি বলতে থাকলেন, ওর খাওয়ার দিকে তাকালি? যা দিছি তাই মুখে তুলছে, কোনো আবদার নাই। মা নাই বইলাই হয়তো মুখ ফুটে চাইতে শেখে নাই। এই ত্যাড়ামি আর জেদ একটু কমা। মানুষটার যত্ন করিস। এমন পুরুষ মানুষ সাধনা করেও পাওয়া যায় না। ও যেন জীবনে আর এক ফোঁটাও একা বোধ না করে। ওর সবকিছুর খেয়াল রাখবি। যা বলে তা মেনে চলবি। মোটেও অবাধ্য হওয়া যাবে না।

—————

রাত গভীর তাই বাড়ির কোলাহল থিতিয়ে এসেছে। আলো কমিয়ে দেওয়া হয়েছে। কুলসুম বেগম রান্নাঘরের চৌকাঠে দাঁড়িয়ে কিছুটা অবাক হয়ে আয়নার দিকে তাকালেন। হাতে ধরা দুধের গ্লাসটার দিকে ইঙ্গিত করে তিনি তাড়া দিলেন, এখনো দাঁড়িয়ে আছিস কেন? মাহিরের দুধটা তো ঠান্ডা হয়ে জল হয়ে গেল। যা দিয়ে শুয়ে পড়। তার আর কিছু লাগবে কি না দেখ।

আয়না নড়ল না। খুব শান্ত গলায় সে জবাব দিল, যাব। একটু অপেক্ষা করছি। আব্বার কাজটা শেষ হোক, ওনার সাথে আমার জরুরি একটা কথা আছে।

রফিক সরকার তখন টেবিলে বসে আছেন। সামনে তাঁর ব্যবসার খাতা ছড়ানো, কলমটা হিসেবের ঘরে দ্রুতগতিতে চলছে। আয়নার কথা শুনে তিনি একবার চোখ তুলে তাকালেন। বিরক্তির চেয়ে বিস্ময়টাই তাঁর চোখে বেশি ছিল। কারণ বহু বছর হলো এই মেয়ের সাথে তাঁর স্বাভাবিক কোনো আলাপ নেই। তিনি কর্কশ স্বরে জিজ্ঞেস করলেন, আমার সাথে আবার কী কথা?

আয়না মোটেও তাড়াহুড়ো করল না। সে ধীরপায়ে এগিয়ে এসে টেবিলের একপাশে বসল। অনেক আগে থেকেই এই মুহূর্তটার প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছিল সে। গলার স্বর না চড়িয়েই অত্যন্ত স্পষ্টভাবে সে জিজ্ঞেস করল, আমার হিসেবটা আপনি কীভাবে মিটিয়ে দেবেন আব্বা? ক্যাশে দেবেন নাকি চেকে?

প্রশ্নটা ঘরে এক ভারী পাথরের মতো আছড়ে পড়ল। মুহূর্তের জন্য চারপাশ স্তব্ধ হয়ে গেল। কুলসুম বেগম ঠিক ধরতে পারলেন না আয়না কী বলছে, আর রফিক সরকার নিজেও প্রশ্নটা হজম করতে কয়েক সেকেন্ড সময় নিলেন। পরক্ষণেই তাঁর প্রতিক্রিয়াটা এল আগ্নেয়গিরির মতো, হিসেব? কীসের হিসেব? এই মাঝরাতে পাগলামি শুরু করলে নাকি? সব মিটে যাওয়ার পর এখন আবার কীসের বায়না?

আয়না তাঁর মেজাজে দমে গেল না। সে শুধু বিষয়টি পরিষ্কার করে দিল, চড়া দামে জমি বিক্রি হচ্ছে শুনে ফুফুরা যেভাবে অংশ নিতে এসেছে। আমি সেই হিসাবের কথাই বলছি। আপনি বিয়ের আগেই না বলেছিলেন যা পাই ততটুকু দিয়ে আমার থেকে পিছু ছাড়াবেন। রাজিবের সাথে না হোক কারো সাথে তো বিয়ে হয়েছে। তবে দিবেন না কেন?

কুলসুম বেগম থমকে গেলেন। এই পাগল মেয়ে দেখা যাচ্ছে পুরোনো কথা ধরে বাপের কাছে ভাগ চাইছে! তাকে থামানোর চেষ্টা করলেন, আয়না চুপ কর। কী শুরু করলি—

আয়নাকে এইভাবে অনেকবার থামিয়ে দেওয়া হয়েছে। আজ না। সে ভাবলেশহীন হয়ে বলল, সৎ মা থামাতে আসলে তোমার দিকেও বিপদ আসবে। পরে দেখা যাবে কামিনীর জন্য রাখা তোমার গয়নাতেও ভাগ বসাবো। ওই সীতাটা কিন্তু-

-হ্যাঁ তো নিবি-

-বেয়াদব, নির্লজ্জ লোভী মেয়ে!

রফিক সরকার হুংকার দিলেন। ছোটবেলায় কুলসুম বেগমকে বিয়ে করার পর আয়না একদম কোনো কথা বলত না। একদিন রাগের মাথায় মারতে মারতে রফিক সরকার সৎ মাকে মেনে নেওয়ার কথা বললেন। সেইদিনের পর রফিক সরকার তার মুখে সৎ মা ব্যতীত আর কোনো সম্বোধন শুনতে পারেননি। আয়নার ভয়ংকর জিদ সম্পর্কে সবার তখন থেকেই ধারণা হয়।

আয়না হেসে বলল, ওহ আচ্ছা সৎ মায়েরটা আপাতত হোল্ডিংয়ে রাখলাম। সম্পত্তির ভাগ আমি ছাড়ব না। আমার অংশ ছোট ফুফুকে জবান দেওয়ার আগে আপনার ভাবা উচিত ছিল।

-খাইয়ে দাইয়ে বড় করেছি, বিয়ে দিয়েছি আর কী চাও? আর কীসের যোগ্যতা আছে তোমার? সারা জীবন আমার রক্ত চুষে খেয়েছো। তুমি এমন কোনো বাধ্য সন্তান নও যে এসব দাবি করতে পারে।

-আপনার মেয়ে হওয়ায় শাস্তি সারা জীবন ভোগ করেছি। হক ছাড়ার প্রশ্নই ওঠে না!

-আইরিন ধীরে কথা বল! জামাই কী ভাববে?

-কী আর ভাববে। বেচারা ফেঁসে গিয়েছে অমানুষদের মাঝে।

রফিক সরকার দাঁতে দাঁত চেপে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন, তোর এত বড় সাহস! তোমার স্বামী আগে ভরা মজলিশে দাঁড়িয়ে বলল সে আমার একটা সুতোও ছোঁবে না, কিচ্ছু নেবে না। আর তুমি এখন সম্পত্তির ভাগ চাও? লজ্জা করে না?

আয়না মাথা তুলে তাকাল। তার চোখের মণি এখন পাথরের মতো শক্ত, উনি যৌতুক নেবেন না বলেছেন আব্বা, সেটা উনার সিদ্ধান্ত। উনার আত্মসম্মান অনেক উঁচুতে, তাই উনার কাছে ওটা ভিক্ষা মনে হয়েছে। কিন্তু আমার প্রাপ্য আমি নেব না? সেখানে ওনার কোনো হস্তক্ষেপ নেই। আর শুধু শুধু আমার মুখ খোলাবেন না। কয়েক বছর থেকেই আমি ইনকাম করি। বিয়েতেও আপনি তেমন খরচ করেননি। তাহলে আমার পিছনে আপনার বাড়তি খরচটা কোথায়?

-এক কানাকড়িও পাবি না তুই! যা করার করিস গে যা। দেখি কে তোকে আমার থেকে জমি ছিনিয়ে দেয়!

আয়না এক মুহূর্তও দেরি করল না। সে গলার স্বর এক বিন্দু না চড়িয়ে অত্যন্ত ধীরস্থিরভাবে বলল, 
সহজে দেবেন না আমি জানতাম। আপনার স্ত্রী, ভাইবোন, ছেলেমেয়ে সবার নাম থাকবে আমাকে ছাড়া - এই বুদ্ধিটা আফজাল মেম্বার দিয়েছে তো? কাল যদি আমি মহকুমা রেজিস্ট্রি অফিসে একটা দরখাস্ত দিয়ে আসি যে এই জমির আমি একজন বৈধ ওয়ারিশ এবং আমাকে না জানিয়ে এই জমি বিক্রি করা হচ্ছে, তখন? ইস্টার্ন হাউজিং কি আপনার এই ঝামেলাপূর্ণ জমি ৫ গুণ দাম দিয়ে আর কিনবে? আর আপনার ছোটলোকির কথা ১০ গ্রামে জানাজানি হবে তা তো ভিন্ন। আমার ভাগ না বুঝিয়ে দিলে আমি এই জমি কাউকে হাত দিতে দেব না।

-তোকে আমি ত্যাজ্য-

-ফালতু কথা বলে সময় নষ্ট করবেন না। করার হলে আপনি আরও আগেই করতেন। যতবার আমি চলে যেতে চেয়েছি আমাকে ধরে বেঁধে ফিরিয়ে আনতেন না।

রফিক সরকার রাগে কাঁপতে কাঁপতে বললেন, কুলসুম এই বেয়াদবটাকে আমার সামনে থেকে চলে যেতে বল। ওর ভাগের টাকা ওকে পৌঁছে দেওয়া হবে।

কুলসুম বেগম ভয়ে জড়সড় হয়ে আয়নার হাত ধরতে গেলেন, চল মা, চল। অনেক হয়েছে। তোর আব্বা তো রাজি হয়েছে। এবার ঘরে যা…


আয়না এক চুল নড়ল না। সে মায়ের হাতটা আলতো করে সরিয়ে দিয়ে রফিক সরকারের দিকে স্থির চোখে তাকাল। তাঁর মুখে একটা রহস্যময় হাসি ফুটে উঠল, যা দেখে রফিক সরকারের বুকটা অজানা আশঙ্কায় কেঁপে উঠল।

-আরও একটা জিনিস অমীমাংসিত রয়ে গেছে আব্বা।

আয়না সরাসরি রফিক সরকারের চোখের দিকে তাকিয়ে বলল, আমি আমার নিজের মায়ের সম্পত্তির কথা বলছি। আমার জন্মদাত্রী মা যে সম্পত্তি রেখে গিয়েছিলেন, যা আজ পর্যন্ত আমার নামে হস্তান্তর করা হয়নি, যা আপনি নিজের দখলেই রেখে দিয়েছেন। অথচ তা ভোগদখল করার আপনার বিন্দুমাত্র অধিকার নেই।

আয়না অটল ভঙ্গিতে বলল, বাপের একাধিক ওয়ারিশযুক্ত সম্পত্তি ছাড়লাম না। আর আমার মা, যার একমাত্র উত্তরাধিকারী আমি, তারটা ছেড়ে দেব! অবাক হওয়ার কিছুই নেই। আফজাল মেম্বারের চোখ যে এদিকে তা আমি জানি। তাই যত দূরে, যেভাবে পারে আমাকে নিশিখালি থেকে বিদায় করতে চেয়েছেন। ওটা আমার নানার দেওয়া। বিক্রি বা ব্যবহার করা কোনোভাবেই সম্ভব না। আইনত ওটা এখন আমার। আপনি যদি কোনো জমি বিক্রি করতে চান, তবে নিজের ভাগ থেকে বিক্রি করুন। কিন্তু আমার মায়ের সম্পত্তি নিয়ে আপনি কাউকে কোনো কথা দিতে পারেন না, কোনো ডিল করতে পারেন না।

রফিক সরকারের কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমতে শুরু করল। ওই তিন বিঘা জমিই মূলত ইস্টার্ন হাউজিংয়ের রাস্তার সংযোগস্থল। ওই জমিটুকু ছাড়া পুরো প্রজেক্টের নকশা অচল। আফজাল মেম্বারের সাথে তাঁর অলিখিত ডিলটা এই জমির ওপরই দাঁড়িয়ে।

-এত বছর আমি দেখভাল করেছি, না হলে কবেই মানুষ হাতিয়ে নিত আর কার বুদ্ধিতে এসব করছো? ওই ছেলে শিখিয়ে দিয়েছে?

-তিনি জানেনও না আমি এখানে কী নিয়ে কথা বলছি। আর আপনি আমাকে চেনেন না আব্বা? কীভাবে ভাবলেন মৃত্যুর পরেও আমার মাকে ব্যবহার করতে পারবেন? যার জীবনটাকে জাহান্নাম বানিয়ে দিয়েছিলেন। মৃত্যু ছাড়া আর কোনো পথ খোলা রাখেননি। তার সম্পত্তি ব্যবহার করতে লজ্জা করবে না? দরকার হলে আমি কোর্টে যাব। ঢাকা যাওয়ার আগে আমি ওই জমির মিউটেশন পেপার আর দলিল নিজের হাতে দেখতে চাই।

রফিক সরকার স্তম্ভিত হয়ে বসে রইলেন। তাঁর চোখের সামনে ছোট থেকে বড় হওয়া মেয়েটি আজ যেন এক অচেনা প্রতিপক্ষ।

আয়না টেবিল থেকে দুধের গ্লাসটা তুলে নিয়ে ধীর পায়ে দরজার দিকে এগিয়ে গেল। যাওয়ার আগে একবার ঘুরে দাঁড়িয়ে বলল, 
রাত শেষ হতে সময় আছে আব্বা। হিসেবটা মিলাতে সুবিধা হবে আপনার। শুভ রাত্রি।
·
·
·
চলবে……………………………………………………

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

WhatsApp