সাবলেট - পর্ব ২৬ - কয়েস সামী - ধারাবাহিক গল্প

          ফোনের রিংটোন বেজে উঠতেই আমরা চমকে উঠলাম। শব্দটা ঠিক কোথা থেকে আসছে— এটা আমাদের দুজনেরই কাছে পরিষ্কার হয়ে গেছে।
নাবিলা আমার দিকে তাকিয়ে থাকে। “তোমার ফোন তানজিনার ঘরে কেন?” 
“আমি... আমি জানি না।”
আমি দ্রুত সিঁড়ি বেয়ে তানজিনার ঘরের দিকে গেলাম। দরজার নিচ থেকে আলো আসছে না। মানে, তানজিনা ঘরে নেই। অথচ আমি নিশ্চিত, একটু আগে ও বাসাতেই ছিল। আমি দরজার নবটা ধরলাম।
“ওর অনুমতি ছাড়া ভেতরে যাওয়া ঠিক হবে না,” নাবিলা উদ্বিগ্ন গলায় বলল।
“ধুর! রাখো তোমার অনুমতি!” আমি বললাম। “আমার ফোনটা ওর ঘরে কী করছে?”
নাবিলা আবার কিছু বলার আগেই আমি নব ঘুরিয়ে দরজাটা এমন জোরে ঠেলে খুলে দিলাম যে দরজাটা গিয়ে ওপাশের দেওয়ালে আছড়ে পড়ল। যেদিন আমি রাগের মাথায় পচা ফল ওর বিছানায় ছুঁড়ে দিয়েছিলাম, সেদিন যেমন দেখেছিলাম, আজও ঠিক সেরকম আছে। পার্থক্য শুধু একটাই, আজ ওর বিছানাটা গোছানো নেই।
আমি ঘরটা দ্রুত চোখ বুলিয়ে দেখলাম। রিংটোন থেমে গেছে।
“হয়তো আমরা ভুল বুঝেছি,” নাবিলা বলল। তানজিনা বাইরে থাকা অবস্থায় ওর ঘরে ঢুকে পড়ায় ওর নিশ্চয়ই আনইজি লাগছে। কিন্তু আমার এতে একদমই কিছু যায় আসে না। “হয়তো তুমি অন্য কোথাও রেখে এসেছ। সেটাই বেশি যুক্তিযুক্ত।”
“আবার কল করো,” আমি বললাম।
নাবিলা বাধ্য হয়ে আবার আমার নম্বরে ডায়াল করল। সাথে সাথে ফোনটা আবার বাজতে শুরু করল। এবার উৎসটা একদম পরিষ্কার। আমি তানজিনার বিছানার কুঁচকে থাকা চাদর টেনে সরিয়ে দিতেই চাদরের ভাঁজের মধ্য থেকে আমার ফোনটা বের হয়ে এলো। 

আমি চট করে ফোনটা তুলে নিলাম। নাবিলার দুটো মিসড কল। কিন্তু এতে তো একটুও বোঝা যাচ্ছে না যে, আমার ফোনটা এখানে এলো কীভাবে!

“আহসান?” পেছন থেকে নাবিলার গলা শোনা গেল। ওকে ভীষণ বিভ্রান্ত লাগছে। “এটা কী?”

আমি ঘুরে দাঁড়ালাম। আবার কী হলো? এক মুহূর্তের জন্য আমার মনে হলো, ভয়ংকর কিছু হলে ভালোই হবে। তাহলে অন্তত নাবিলা তানজিনাকে আমার মতো করে খরাপ চোখে দেখত। কিন্তু ওর হাতে একটা ছোট্ট গোল্ডেন টিউব। কী জিনিস বুঝতে পারলাম না, যতক্ষণ না ও ঢাকনাটা খুলল।
লিপস্টিক।
নাবিলা কাঁপা গলায় বলল, “এটা... এটা তো তোমার শার্টের কলারে যে রঙ ছিল, ঠিক সেই শেড।”
“কী?” আমি হালকা করে বললাম। “আমার তো ওরকমটা লাগছে না!”

কিন্তু কথাটা মিথ্যে। একদম একই শেড। এটা ঠিক সেই লিপস্টিক যেটা সেদিন তানজিনা ঠোঁটে দিচ্ছিল। আর, ঠিক তার পরই আমি রান্নাঘরে পচা ফলের ব্যাপারটা ধরেছিলাম।

নাবিলার গলা কেঁপে উঠল। “এজন্যই বুঝি তুমি এতদিন ধরে তানজিনাকে নিয়ে এত অদ্ভুত আচরণ করছ? তুমি কি... ওর সাথে কোনো সম্পর্ক গড়ে তুলেছ?”

“না!” আমি চিৎকার করে উঠলাম। “ কেন আমি অমনটা করব! আমি তানজিনাকে ঘৃণা করি!”

নাবিলার নিচের ঠোঁট কাঁপছে। “তাহলে তোমার কলারে ওর লিপস্টিক কীভাবে এল? আর তোমার ফোন ওর বিছানায় কেন?”

“ও আমাকে ফাঁসাচ্ছে!” আমি হাত ছুঁড়দে থ্কালাম। “তুমি কি এখনো বুঝতে পারছ না, নাবিলা? ও এমন সব করছে যাতে তুমি ভাবো আমি তোমাকে ধোঁকা দিচ্ছি। কিন্তু আমি দিচ্ছি না!”

“কেন সে এমনটা চাইবে?” নাবিলা ফিসফিস করে বলল। আমি নিজেও কারণটা জানি না। ইশ, যদি জানতাম। যদি কারণটা বুঝতে পারতাম, তাহলে আমি ওকে থামাতে পারতাম।

“নাবিলা,” আমি বললাম। “আমি তোমাকে ভালোবাসি। আমি তোমার সাথে সারাজীবন কাটাতে চাই। আমি কখনোই—কখনোই—তোমাকে ঠকাব না। আল্লাহর কসম।”

নাবিলা আমার ডান হাতে ধরা ফোন আর নিজের বাম হাতে ধরা লিপস্টিকের দিকে তাকাল। “আমি... আমি বুঝতে পারছি না। কিচ্ছু বুঝতে পারছি না।”

“প্লিজ...” আমার মনে হলো আর পাঁচ সেকেন্ড পর আমি হাঁটু গেড়ে বসে পড়ব। “তোমাকে বিশ্বাস করতেই হবে। তুমি তো আমাকে চেনো, নাবিলা। আমি এমনটা করতে পারি না।”

ও লিপস্টিকটা আবার ড্রেসিং টেবিলের ওপর রেখে দিল। নখ কামড়াচ্ছে, মুখে অস্থির ভাব। “শুধু এটা না, আহসান। কয়েক মাস ধরে তুমি অদ্ভুত আচরণ করছ।”

“না, করছি না।” 
নাবিলা ভ্রু তুলল, ‘সত্যি করছ না?’

“ঠিক আছে,” আমি একটু নরম হলাম। “চাকরি হারানোর পর গত কয়েক মাস আমার জন্য খুব খারাপ গেছে। কিন্তু আমি ধীরে ধীরে ঠিক হয়ে যাচ্ছি। সত্যি বলছি, নাবিলা।”

নাবিলা খোঁপার চুল ঠিক করতে লাগল। “আমি জানি না... আমার মনে হয়... আমাদের একটু সময় আলাদা থাকলে ভালো হবে।”

না। না। ও এমনটা বলতে পারে না।

কিন্তু ও বলছে। আমি ওর পেছনে পেছনে নেমে আমাদের বেডরুমে চলে এলাম। রুমে ঢুকেই ও আলমারি থেকে ট্রলি ব্যাগটা টেনে বের করল।

“নাবিলা, না,” আমি মিনতি করলাম। আমি নাবিলাকে হারাতে পারি না। পারি না। আমার জীবনের ভালো অর্জন বলতে একমাত্র নাবিলা। আমি ওকে হারাতে পারি না। 

কিন্তু এখন মনে হচ্ছে, সেটাই হতে যাচ্ছে। কিছুক্ষণের মধ্যে নাবিলা আলমারি খুলে কাপড় বের করে ব্যাগে তুলতে লাগল। আমার ইচ্ছে করল ব্যাগটা টেনে নিয়ে ওকে থামিয়ে দিই। কিন্তু পারলাম না।

“এটা কোরো না...” কথাটা বলতে গিয়ে আমার চোখে জল চলে এলো। “প্লিজ, নাবিলা।”

“শুধু দুটো দিন একা থাকব,” ও বলল। ওর আঙুলে এখনও আমাদেও এনগেজমেন্ট রিংটা দেখা যাচ্ছে। বাম হাতের অনামিকায়। “আমি তিশার বাসায় থাকব।”

বাহ! তিশা আমাকে ঘৃণা করে, আর জাহিদও আমাদের সেই কফি আড্ডার বিপর্যয়ের পর থেকে আর আমার ভালো কিছু চাইবে না। আমি নিশ্চিত ওরা সারাক্ষণ আমাকে নিয়ে বাজে কথা বলবে।

কিন্তু ঠিক আছে। যদি নাবিলার কয়েকদিন দূরে থাকা দরকার হয়, থাক। হয়তো সত্যিই কয়েকটা দিন দূরে থাকলে দভালো হবে। আর তানজিনার সাথে আমি যদি একটু একা সময় পাই, তাহলে ও আমার কেন একটা ক্ষতি করতে চায় সেটা নিয়েও খোলামেলা কথা বলা যাবে। ওর সাথে ঝামেলটাও মিটিয়ে ফেলা যাবে। কিন্তু আমাকে তানজিনার সাথে এভাবে বাসায় একা রেখে নাবিলা কি যেতে পারবে? হয়তো পারবে। কে জানে! নারী মন বোঝা আসলেই আমার কাজ না।  
সব ঠিক হয়ে যাবে। যেভাবেই হোক, আমি সবসময়ই শেষমেশ নিজে নিজে সকল সমস্যার সমাধান করতে পারি।

তবুও মাথায় ঢুকছে না, তানজিনা আমার ফোনটা পেল কীভাবে। নিশ্চয়ই আমি যখন টিভি দেখতে দেখতে একটু ঝিমিয়ে পড়েছিলাম, তখন টি-টেবিল থেকে চুপিচুপি তুলে নিয়েছে। ওই শয়তানটা আশেপাশে থাকলে এক সেকেন্ডও চোখ বন্ধ করা যাবে না।  

“আহসান, এটা কী?” নাবিলা বলল। আবার কী হলো?

নাবিলা আলমারির ভেতর ঝুঁকে সম্ভবত ওর একগাদা জামদানির মধ্যে কোনটা নেবে সেটাই ঠিক করছিল। কিন্তু এখন আর প্যাক করছে না। আলমারির ভেতরে কিছু একটা দেখে একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে। কী দেখছে বুঝতে পারছি না।

“কী হয়েছে?” আমি জিজ্ঞেস করলাম।

নাবিলা সোজা হয়ে দাঁড়াল, হাতে নীল রঙের একটা প্লাস্টিকের বোতল। এক সেকেন্ডের ভেতর বুঝতে পারলাম জিনিসটা কী।

“ব্লিচিং পাউডার?” রীতিমতো একটা ধাক্কা খেলাম যেন। 

“এটা আমাদের আলমারিতে কী করছে?” নাবিলা বলল। 
“আমি জানি না।”
“জানো না?” ওর গলা চড়ে উঠেছে। “তুমিই তো এতদিন ধরে বলে যাচ্ছিলে গোল্ডিকে ব্লিচ দিয়ে মারা হয়েছে। আর এখন আমি আলমারিতে এটা পেলাম!”
“দাঁড়াও।” আমি চোখ পিটপিট করলাম। “তুমি ভাবছ আমি গোল্ডিকে মেরেছি? সিরিয়াসলি? তুমি তো তখন বলেছিলে অ্যাকুরিয়ামে কোনো গন্ধও নাকি পাওনি!”
ও এক মুহূর্ত থমকে গেল। “আমি নিশ্চিত ছিলাম না। আমার বিশ্বাস হয়নি তানজিনা এটা করতে পারে। কিন্তু... আচ্ছা... ওয়েইট। তখন একটু একটু কেমিক্যালের গন্ধ ছিল।” ও আমার দিকে সন্দেহের চোখে তাকাচ্ছে। “তুমি কি তানজিনাকে ফাঁসাবার জন্য গোল্ডিকে মেরেছ?”
“না! ধ্যাত, একদম না!” আমি বলে উঠলাম। “তুমি কীভাবে ভাবতে পারলে?”
“আমি আর কিছু বুঝতে পারছি না।” ও ব্লিচের বোতলটা ড্রেসিং টেবিলের ওপর ছুঁড়ে রাখতেই ধপাস করে একটা শব্দ হলো। “গত কয়েক মাস ধরে তুমি অদ্ভুত সব কাজ করছ, আহসান। এখন তোমার ফোন তানজিনার বিছানায় পাওয়া যাচ্ছে। আর এই ব্লিচটা আলমারিতে। তুমি নিজেই এতদিন ধরে বলছিলে তানজিনা ব্লিচ দিয়ে মাছটা মেরেছে।”

“হায় আল্লাহ, তুমি কি সত্যিই ভাবছ আমি আমাদের মাছকে বিষ দিয়ে মেরেছি?”
“আমি জানি না। হয়তো।” ও চোখ নামিয়ে ফেলল। “সত্যি বলতে এখন তোমার ব্যাপারে আমি কিছুই বাদ দিতে পারছি না। আর... তাছাড়া... তুমি তো নিজের কোম্পানি থেকেও চুরি করেছিলে।”

বুকে একটা তীব্র কষ্টের ঝাঁকুনি লাগল। বিশ্বাসই হচ্ছে না, ও আমাকে এটা বলতে পারল। ‘চৌধুরী অ্যান্ড খান’-এ যখন সবকিছু উল্টাপাল্টা ঘটনা ঘটেছিল, তখন নাবিলা এক মুহূর্তের জন্যও আমার পাশ ছাড়েনি। তাহলে এখন হঠাৎ এমন করছে কেন?
তানজিনা কি ওকে কিছু বলেছে?
“আমি কোম্পানি থেকে চুরি করিনি!” কথাটা অনেক বেশি জোরে বেরিয়ে বলে ফেললাম। “তুমি কীভাবে এটা ভাবতে পারলে?”

“ইদানীং মনে হয় আমি তোমাকে ঠিক চিনতে পারি না।” নাবিলা ভ্রু কুঁচকে তাকাল। “তানজিনাকে নিয়ে আজগুবি ষড়যন্ত্রের কথা বলে তুমি সারাক্ষণ রাগারাগি করো। রাতে ঘুম না হলে পুরো বাসা জুড়ে হাঁটাহাঁটি করো। আর যখন ঘুমিয়ে পড়ো, তখন ঘুমের মধ্যে কথা বলো—”

“আমি ঘুমের মধ্যে কথা বলি?” কথাটা শুনে আমি কেঁপে উঠলাম। “কী... কী বলি আমি?”
“বেশির ভাগই অস্পষ্ট।” ও মাথা নাড়ল। “কখনও কখনও তানজিনার নামও বলো— যা আমার কাছে খুবই অদ্ভুত লাগে।”

বাহ। এটা তো... ভয় লাগার মতো ঘটনা।

“আমার মনে হয় মিতুজা খালা ঠিকই বলেছিলেন,” নাবিলা বলল। “আমি যদি এখানে বেশি দিন থাকি, কে জানে তুমি কী করে বসবে।”

“নাবিলা...!” এখন সত্যিই আমার ভেতরটা কাঁপতে শুরু করেছে। ও চলে যাচ্ছে... হয়তো একেবারে। “আমি কখনও তোমাকে ঠকাব না, আর কখনও তোমার ক্ষতি করব না।”
নাবিলা ব্যাগের চেইন টেনে বন্ধ করে দিল। অথচ অর্ধেকটা কাপড় ভরেনি। এমনকি একটা স্যান্ডেলও ঢুকায়নি। মানে ও এখান থেকে বেরিয়ে যাবার জন্য মরিয়া হয়ে আছে। “আমার যাওয়াই ভালো।”
“নাবিলা।” আমি দরজার সামনে দাঁড়িয়ে পথ আটকালাম। “আমাকে বিশ্বাস করতেই হবে। তানজিনা এসব করছে। আমাকে ফাঁসাতে চাইছে। রাতভর অদ্ভুত শব্দ করে আমাকে ঘুমাতে দেয় না। ক্যাবিনেটে পচা ফল ও-ই রেখেছিল। আর গোল্ডিকে ব্লিচ দিয়ে মেরেছে, তারপর আমাকে ফাঁসাতে এই ব্লিচটা আলমারিতে রেখেছে।”
“আহসান, তুমি নিজের কথা নিজেই শুনছ?”
ওর চোখ দেখে বুঝতে পাারলাম ও আমার একটা কথাও বিশ্বাস করছে না। ও ভাবছে আমি পাগল বা তার থেকেও খারাপ কিছু হয়ে গেছি।
“আমি যাচ্ছি,” নাবিলা বলল। “বলেছি তো, আমার মাথা ঠান্ডা করতে কয়েকদিন দরকার।”
আমি চাই না ও চলে যাক। এক মুহূর্তের জন্য মাথায় একটা ভয়ানক চিন্তা এল। আমি তো নাবিলার তুলনায় অনেক বড় আর শক্তিশালী।আমি তো চাইলেই ওকে জোর কওে আটকে রেখে দিতে পারি।

“আহসান!” ওর চোখে হঠাৎ ভয়ের ঝলক।

আমি তৎক্ষণাৎ সরে দাঁড়ালাম, নিজের চিন্তায় নিজেই আতঙ্কিত হলাম। আমি কী ভাবছি? আমি কখনও কোনো নারীকে জোর করে আটকাব না। এই ভাবনা আমার মাথায় এলই বা কীভাবে? আমি তো সেরকম লোক নই। আমার মা আমাকে শিখিয়েছেন নারীদের সম্মান করতে।
তানজিনা আমার সাথে এসব কী করছে?
তবুও আমি নাবিলার পেছনে পেছনে নিচে নামলাম। দেখলাম ও ওড়নাটা ঠিক করে নিচ্ছে, স্যান্ডেলে পা ঢুকাচ্ছে। সত্যিই চলে যাচ্ছে। আর আমি জানি না ও কবে ফিরবে। আদৌ ফিরবে কি না, সেটাও জানি না।
“আমি তোমাকে ভালোবাসি, নাবিলা,” আমি বললাম। কথাটা বলতে গিয়ে গলা ভেঙে গেল।
ও ঘুরে আমার দিকে তাকাল। ওর মুখের অভিব্যক্তি আমাকে প্রায় ভেঙে দিল। ওর মুখে রাগ নয়, প্রচণ্ড বিরক্তি।
“আমি দুঃখিত, আহসান,” ওর গলা কেঁপে উঠল। “এমনটা হওয়ার কথা ছিল না।”
জানি উচিত হচ্ছে না, তবু আমি ওর পেছনে পেছনে সামনের গেট পর্যন্ত চলে গেলাম। কী আশা করছি আমি নিজেও জানি না। কিন্তু থামতে পারছি না।
“নাবিলা,” আবার বললাম। “আমরা কি আরেকটু কথা বলতে পারি? প্লিজ?”
এবারও ও কিছু বলল না। গেট খুলে বেরিয়ে গেল। এখানকার রাস্তায় শনিবারে জ্যাম থাকে না তেমন, রিকশা পাওয়া সহজ।
“নাবিলা!” আমি ডাক দিলাম।
ও ফিরেও তাকাল না। একটা খালি রিকশা পেয়ে উঠে পড়ল।
পরের সেকেন্ডেই রিকশাটা চলে গেল। আমি ঠিকভাবে ওকে বিদায়ও বলতে পারলাম না। আমি দাঁড়িয়ে দেখলাম, রিকশাটা দূরে মিলিয়ে যাচ্ছে। এটাই কি শেষবারের মতো নাবিলাকে দেখছি? পরেরবার ও নিশ্চয়ই আমি অফিসে থাকা অবস্থায় এখানে আসবে। যাতে বাকি জিনিসপত্র নিয়ে চলে যেতে পারে, আর আমি ওকে বিরক্ত করতে না পারি।
না। সেটা হতে দেব না। আমি নাবিলাকে ফিরিয়ে আনব। যেভাবেই হোক।
“আহসান!”
পেছন থেকে কর্কশ বয়স্ক কণ্ঠের ডাকটা শুনতেই আমার স্নায়ু টানটান হয়ে গেল। এই মুহূর্তে ঐ কণ্ঠটা আমি একদম আশা করছি না। তবু ঘুরে দাঁড়ালাম। হাত দুটো আগেই মুঠো হয়ে গেছে। হক সাহেবের ঝামেলা নেওয়ার মুড আমার নেই।

“কতবার বলব, তোমাদের গেটের সামনে ময়লার ড্রামটা এখনো পড়ে আছে কেন?” হক সাহেব চেঁচিয়ে উঠলেন।

কথা বলতে বলতে উনার মুখ থেকে পানের পিক ছিটকে এল।

“সরি,” আমি বললাম। “আজ দিনটা খারাপ গেছে, তাই...”

“দুই দিন হয়েছে,” তিনি কটাক্ষ করলেন। দুই দিন? ধুর।

“গতকালও তো বলেছিলাম। তুমি দুই দিন এটা বাইরে ফেলে রেখেছো। ” তিনি একটা বাজে শব্দ করলেন। “রাস্তাটা কি তোমার বাপের সম্পত্তি নাকি?”
“এখনই নিয়ে যাচ্ছি,” আমি দাঁত চেপে বললাম।
“আহা, বাহ!” তিনি গজগজ করলেন। “একদিন দেরি করে, তাও শুধু আমি বললে। এই পাড়ায় তুমি একাই কেন ঠিক করতে পারো না? তোমার দামী অফিসে সময়ানুবর্তিতা শেখায় না নাকি?”
উফ! হক সাহেবের সাথে ধৈর্য ধরে কথা বলার সামর্থ্য আমার শেষ। আমি এই এলাকায় আসার পর থেকে প্রায় প্রতি সপ্তাহেই লোকটার ঝামেলা সহ্য করছি। আর এখন? আমি শেষ।
একদমই শেষ।
“আপনি চান আমি ড্রামটা সরিয়ে রাখি?” আমি একজোড়া কেডস তুলে ধরলাম। “নিন, এই নিন!”

এই বলে আমি ড্রামটা দু’হাত দিয়ে তোলে যত জোরে পারি হক সাহেবের দিকে ছুঁড়ে মারলাম। লোকটা সত্তরের কাছাকাছি। লাগলে হয়তো হার্ট অ্যাটাকই করে ফেলতেন। কিন্তু ড্রামটা উনাকে মিস করে রাস্তার এক পাশে গিয়ে পড়ল। উনি বড় বড় চোখ করে আমার দিকে তাকালেন।

“তোমার সমস্যা কী, পাগল!” তিনি চেঁচিয়ে উঠলেন। “আমাকে তো দেখছি মেরেই ফেলতে!”

আমি ড্রামটা থেকে আবার তুলে নিলাম। “তাহলে... আরেকবার চেষ্টা করব নাকি?”

এবার হক সাহেব বুঝে গেলেন। তিনি দ্রুত নিজের বাসার দিকে ছুট লাগালেন। এত দ্রুত গেলেন যে আমি ভয় পেলাম উনি আবার হার্ট অ্যাটাক না করে বসেন।

কয়েকজন প্রতিবেশী হইচই শুনে দরজা খুলে উঁকি দিল। এই পাড়ায় যতসব ফালতু নাকগলানো লোক বাস করে। মনে হয়, এখান থেকে দূরে কোথাও চলে যাওয়াই ভালো হবে।

বিরক্ত চোখে উৎসাহী মুখগুলোর দিকে তাকিয়ে বাসার ভেতর ঢুকে পড়লাম। অবশ্যই আমি ড্রামটা হক সাহেবের গায়ে লাগাতে চাইনি, ইচ্ছা করেই মিস করেছি। আমি ওনাকে আঘাত করতে চাই না। আমি এখনো পুরোপুরি পাগল হয়ে যাইনি।
কিন্তু তানজিনা যদি এখন আমার সামনে থাকত! ওর সাথে কী করতাম— তা নিয়ে আমি একদমই নিশ্চিত নই।
·
·
·
চলবে……………………………………………………

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

WhatsApp