মাথাটা ভনভন করছে। তানজিনা কি ইচ্ছে করেই আমার জীবনটা নরক বানানোর জন্য আমাদের সাবলেট হিসেবে উঠেছে?
স্বীকার করছি, সাবান ব্যবহার আর কর্নফ্লেক্স খাওয়া নিয়ে ওকে যে ধমক দিয়েছিলাম ওটা হয়তো একটু বাড়াবাড়ি হয়েছিল। এখন আমি তার জন্য অনুতপ্তও। কিন্তু ও যেভাবে আমার সাথে আচরণ করছে, তার যোগ্য আমি কোনোভাবেই না। শুরু থেকেই ও যেন আমাকে টার্গেট করে রেখেছে।
নাকি... তারও আগে থেকে?
এখন তো মনে হচ্ছে আমার চাকরি যাওয়ার পেছনেও ওর হাত আছে। কারণ চাকরি যাবার কারণেই না ওকে আমাদের বাসায় ভাড়াটে হিসেবে তুলতে বাধ্য হতে হয়েছে।
কিন্তু সেটা কীভাবে সম্ভব? ওর সাথে ওয়াহিদ স্যারের যোগাযোগ হবে কীভাবে? আর চিনলেও ওয়াহিদ স্যার ওর কথায় কেনই বা এমনটা করবেন? কেনই বা তানজিনা আমার সাথে এমন ফাঁদ পাতবে? ও কেন আমার ঘরে এসে ঢুকতে চাইবে? এইভাবে ধীরে ধীরে আমার সংসারে এসে ঢুকবে?
তানজিনা হকের কি আমার ওপর কোনো ক্ষোভ আছে— আমি যা জানি না?
না, কিছুতেই মাথায় ঢুকছে না। এটা সত্যি যে গত কিছুদিন আমি অস্বাভাবিক রকমের সন্দেহপ্রবণ হয়ে পড়েছি। কিন্তু পুরো ঘটনাটা একটু বেশিই সিনেমাটিক হয়ে যাচ্ছে। আর আমাদের বাসা দেখতে আসার আগে তো আমি ওকে জীবনে কখনো দেখিইনি।
আসলেই কি দেখিনি?
সাথে সাথে পকেট থেকে ফোন বের করে গুগলে তানজিনা হক লিখে সার্চ দিলাম। প্রথম দিন ওর নাম নিয়ে হালকা সার্চ করেছিলাম। কিন্তু তখন এত গুরুত্ব দেইনি। এবার একটু ভালো করে দেখা যাক।
প্রথম খুঁজে পেলাম একজন অধ্যাপককে— তানজিনা হক। কিন্তু উনি করোনার সময় মারা গেছেন। কাজেই এই মানুষটার সাথে আমার তানজিনার সম্পর্ক থাকার কথা না। এরপর আমি অন্তত ডজনখানেক পেজ এ ক্লিক করে দেখলাম— একটাও ‘আমার’ তানজিনা না। সোশ্যাল মিডিয়াতে ঢুঁ মারলাম— ফেসবুক বা ইনস্টাগ্রামে তানজিনা হক নামে হাজারটা প্রোফাইল আছে ঠিকই, কিন্তু কারো ছবির সাথেই তানজিনার ছবি একটুও মিলে না।
ব্যাপারটা খুব অদ্ভুত।
ওর বয়সী যে কারো এখন সাধারণত কিছু না কিছু অনলাইন উপস্থিতি থাকে। কিন্তু তানজিনার? কিছুই নেই। মেয়েটার একটাও ডিজিটাল ফুটপ্রিন্ট নেই।
কিছুটা ভয় হতে থাকল।
কেন ওর কোনো সোশ্যাল মিডিয়া নেই? ওর তো মনে হয় না টেকনোফোবিয়া আছে। সবসময়ই হাতে স্মার্টফোন থাকে। তাহলে কি ও নিজের অতীতের কিছু লুকাতে চাইছে?
অথবা... হয়তো ও ইন্টারনেট পছন্দই করে না। ও সারাদিন কাজ করে, সময় না-ও পেতে পারে। আর এটা কোনো অপরাধ না।
যাই হোক, গুগলে মনে হচ্ছে ওকে নিয়ে আর কোনো চমকপ্রদ তথ্য পাওয়া যাবে না।
নাবিলা তিশার সঙ্গে ডিনার করে আসবে, তাই রাতের খাবারটা আমাকে একাই সামলাতে হবে। অত ঝামেলা করতে ইচ্ছে করছে না— পাউরুটির সাথে ডিম ভাজা হলেই হবে। আমি ফ্রিজ থেকে পাউরুটির প্যাকেট আর ডিম বের করে কিচেন কাউন্টারে রাখলাম।
ওই দুটো জিনিস কাউন্টারে রাখার সাথে সাথেই কয়েক ডজন মাছি হুড়মুড় করে উড়ে এলো। আমি অবাক হয়ে এক পা পিছিয়ে গেলাম। রান্নাঘরে মাছিদের দৌরাত্ম একেবারে হাতের বাইরে চলে গেছে। এতগুলো মাছি এল কোত্থেকে?
নাবিলা আর আমি কিচেন কাউন্টারে ভিনেগার দিয়ে দ্বিতীয় আরেকটা ফাঁদ পেতেছিলাম। ওটার দিকে তাকিয়ে হতাশ হলাম— দুটো গ্লাসেই অন্তত কয়েক ডজন মরা মাছি ভাসছে। আমরা অনবরত মাছি মেরে চলেছি, তবু মনে হচ্ছে— একটা মারলেই শূণ্য থেকে আরও দুটো জন্ম নিচ্ছে।
আমি পাউরুটির দিকে তাকালাম— ওটার ওপর এখন মাছি বসে একটা কালো আস্তরণ তৈরি করেছে। দৃশ্যটা দেখে আমার পেট গুলিয়ে এল। খিদে মরে গেল। আমরা কোথায় ভুল করছি বুঝতে পারছি না। নাবিলা আর আমি পালা করে প্রতিদিন কিচেন পরিষ্কার করছি, আমি তো রীতিমতো ভিম লিকুইড দিয়ে কাউন্টার ঘষে ঘষে পরিষ্কার করি। একটা আলগা টুকরোও পড়ে থাকে না, পচা ফল তো একদমই না। তাহলে এই শয়তান মাছিগুলো খাচ্ছেটা কী?
মাছির জন্য কি কোনো কীটনাশক আনা যায়? বিজ্ঞান এখন কত উন্নত। মাছি মারার জন্য নিশ্চয়ই অত্যাধুনিক কোনো না কোনো প্রযুক্তি বের হয়েছে। তবে এই মুহূর্তে সবচেয়ে বেস্ট বুদ্ধিটা হলো ওদের খাবারের উৎসটা খুঁজে বের করে ওটা ফেলে দেয়া।
কিন্তু উৎসটা কী? কিচেন তো একদম ঝকঝকে।
আমি চোখ তুলে দেখলাম, মাছির একটা বড় দল ওপরের একটা ক্যাবিনেটের চারপাশে জটলা পাকিয়েছে। কিন্তু কেন? ওখানে কী আছে? ওখানে তো শুধু পরিষ্কার সিরামিকের প্লেট আর বাটি রাখা।
আমি ক্যাবিনেট খুলতেই ভেতর থেকে মাছির ছোট একটা ঝাঁক ভনভন করে বেরিয়ে এল। কী হচ্ছে এসব? আমি গলা বাড়িয়ে ভেতরে তাকালাম— দেখতে তো পরিষ্কারই লাগছে। তাহলে এত মাছি কেন? ওরা সব জটলা পাকিয়েছে একদম ওপরের শেলফে যা আমি ঠিকমতো দেখতে পাচ্ছি না।
ওখানে কী আছে?
ওপরের শেলফে কী আছে সেটা দেখতে হলে আমাকে কিছু একটা দিয়ে ওপরে উঠতে হবে। স্টোররুমে একটা প্লাস্টিকের টুল আছে— এক ফুটের মতো উঁচু— ওটা হলে হয়তো শেলফটা নাগাল পাব। যদিও টুলটার একটা পায়া একটু নড়বড়ে। শেষবার যখন এটা দিয়ে বাল্ব বদলাতে উঠেছিলাম, নাবিলা বলেছিল— পড়ে গিয়ে নাকি আমার ঘাড় মটকে যাবে।
কিন্তু মনে হয় না কিছু হবে। আর পড়ে গেলেও আমার ঘাড় যে ভাঙবে না, এটা নিশ্চিত। কারণ আমি ছোটবেলা ফুটবল খেলতাম। বিপক্ষের খেলোয়াড়রা কতবার যে আমাকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিয়েছে। কিন্তু কখনো কিছু হয়নি।
টুলটা টেনে কিচেনে এনে ক্যাবিনেটের নিচে বসালাম। উঠে দাঁড়াতেই টুলটা ক্যাঁচক্যাঁচ করে উঠল, একটু নড়ে উঠল। কিন্তু ভাঙল না।
ক্যাবিনেটটা খোলা। ওপরের শেলফটা দেখা যাচ্ছে। তবে ভেতরে আলো কম থাকায় খুব ভালো করে দেখা যাচ্ছে না। এখানে মাছি এত ঘন যে শেলফটা যেন জীবন্ত মনে হচ্ছে। এমন মাছির কি কোনো শব্দ হয়? জানি না। কিন্তু এই ঝাঁকটা যেন গুঞ্জন তুলছে। আর একটা গন্ধ... কিচেনে ঢোকার পর থেকেই গন্ধটা পাচ্ছিলাম। কিন্তু নানা রকম গন্ধে ইদানিং বেশ অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছিলাম। ক্যাবিনেট খোলার পর এখানে গন্ধটা আরও তীব্র লাগছে।
মাথাটা একটু ভেতরের দিকে বাড়িয়ে মাছির আড়ালে আসল জিনিসটা দেখার চেষ্টা করলাম। ওরা কিসের ওপর ভর করে বেঁচে আছে? এতদিন ধরে খাবার পাচ্ছে কোথা থেকে?
কিছুক্ষণের মধ্যেই আমি জিনিসটা দেখতে পেলাম।
একটা ছোট কাগজের ঠোঙা। ঠোঙাটাই যে গন্ধের উৎস— এটা একদম পরিষ্কার, কারণ অসংখ্য মাছি ব্যাগটার ওপর কিলবিল করছে। একবার মনে করলাম টিস্যু দিয়ে ব্যাগটা ধরব, যাতে ওটা হাতে না লাগে। কিন্তু টুল থেকে নামা, টিস্যু আনা, আবার ওঠা— এত ঝামেলা করতে ইচ্ছে করছে না। না, খালি হাতেই তুলব। এখনই এটা ফেলে দেয়া দরকার।
আমি বুড়ো আঙুল আর তর্জনীর দিয়ে ব্যাগটা ধরলাম। মাছিগুলো সামান্য ছিটকে গেল, কিন্তু ব্যাগের ভেতরের জিনিসটার প্রতি লোভ এত বেশি যে ওরা আবারও গাদাগাদি করে ব্যাগের ওপর বসল। গন্ধে আমি মুখ দিয়ে শ্বাস নিতে থাকলাম। ধীরে ধীরে ব্যাগটাকে নিজের দিকে টেনে আনলাম। এখন এতটাই কাছে যে আমি ভেতরে উঁকি দিতে পারি। ব্যাগের মুখটা একটু কাত করে নিজের চোখের লেভেলে এনে আমি ভেতরে তাকালাম।
আমার পেটের নাড়িভুঁড়ি সব বের হয়ে এল যেন। হে আল্লাহ! ইয়া মাবুদ...
ঠিক তখনই কিচেনে একটা বিকট ‘ধপ’ শব্দ হলো, আর টুলের পায়াটা হঠাৎ করে ভেঙে গেল। আমি মেঝেতে পড়ে গেলাম। ব্যথা কতটা লাগল টের পেলাম না। কারণ মাথার ভেতর কেবল একটা কথাই ঘুরছে—
আই হেইট তানজিনা হক।
·
·
·
চলবে……………………………………………………