সাবলেট - পর্ব ২২ - কয়েস সামী - ধারাবাহিক গল্প

আমি ঠিক আছি।

অবিশ্বাস্য হলেও সত্যি, এক ফুটের মতো উচ্চতা থেকে পড়েও আমার ঘাড় বা কোমর ভাঙেনি। তবে অল্প একটু ঘাবড়ে গিয়েছিলাম। কিছুক্ষণ মেঝেতেই পড়ে রইলাম। ধীরে ধীরে শরীরটা যাচাই করলাম— কোথায় ব্যথা, কোথায় আঘাত। কেবল কনুইটাতেই বেশ আঘাত পেয়েছি, অল্প একটু ব্যথা করছে। কিন্তু কোনো হাড় ভাঙেনি বলেই মনে হলো। এর মানে এখন আর কষ্ট করে হাসপাতালে বা পঙ্গু হাসপাতালে দৌড়ানোর দরকার নেই।

স্বস্তির আরেকটা ঘটনা হলো, কাগজের ঠোঙাটা এখনও ওপরের শেলফেই পড়ে আছে। আমি মাথা তুলে তাকাতেই দেখলাম ঠোঙাটা কিনারায় টলোমলো হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। গলায় জমে থাকা তেতো ভাবটা কোনোমতে গিলে ফেললাম।

ওটার ভেতরের দৃশ্যটা আমার মাথায় চিরকালের মতো গেঁথে গেছে। ঠোঙায় ভেতরে কী রাখা ছিল, ঠিক বুঝতে পারিনি। আপেল? পেয়ারা? আমার মনে হয়— আপেলই হবে। কিন্তু আসলে ব্যাপারটা আর গুরুত্বপূর্ণ না। যা ছিল, এতটাই পচে গেছে যে এখন সেটা কিলবিল করছে কালো কালো মাছিতে। আর বাতাসে ভাসছে গা-গোলানো মিষ্টি-চিটচিটে পচা একটা গন্ধ।

কিচেনে এমন কিছু পাওয়া আসলেই জঘন্য একটা ব্যাপার। কিন্তু সবচেয়ে ভয়ংকর হলো, ওটা এখানে এল কীভাবে? আমি ফল পছন্দ করি, নাবিলাও করে। কিন্তু আমি কখনও দুটো আপেল কাগজের ঠোঙায় ভরে এমন একটা ওপরের শেলফে লুকিয়ে রাখব, যেখানে সহজে কারো হাতই পৌঁছায় না— এটা অসম্ভব।

এর মানে, যে এটা করেছে, সে ইচ্ছা করেই করেছে। উদ্দেশ্য একটাই— কিচেনের পচা জিনিসটা যেন আমি সহজে টের না পাই। আর ততদিনে মাছিগুলো বেড়ে গিয়ে যেন আমাকে পাগল করে দেয়।

তানজিনা আসার পরপরই আমি এই মাছিদের আনাগোনা দেখছি। মনে হচ্ছে, অ্যাডভান্স দিয়ে এ বাড়িতে ওঠার পর ওর প্রথম উদ্দেশ্যই ছিল— আমাদের সংসারটা যেন আর নিরাপদ, পরিষ্কার, শান্ত না থাকে তা নিশ্চিত করা।

সবচেয়ে খারাপ ব্যাপার হলো— আমি যদি এ ব্যাপারে জিজ্ঞেস করি, ও নিশ্চিতভাবে অস্বীকার করবে। অভিজ্ঞতা থেকে বলছি, তখন ও আমাকে আরও বেশি ঘৃণা করবে।

অন্যদিকে নাবিলা বিশ্বাস করবে না যে তানজিনা এটা করেছে। ও এমনিতেই ভাবছে আমি ধীরে ধীরে মানসিকভাবে অসুস্থ হয়ে যাচ্ছি। আমাদের সম্পর্ক এমনিতেই একটা সুতোর ওপর ঝুলছে। আমি চাই না নাবিলাকে আবার এই ঝামেলায় টেনে আনতে।

আমি আবার ওপরের শেলফের দিকে তাকালাম। টুলটা না থাকলেও ঠোঙাটা এখন প্রায় হাতের নাগালেই আছে। 

আমি চুলার ওপর রাখা একটা উল্টানো হাঁড়ি তুলে নিলাম। মেঝেতে রেখে ওটার ওপর সাবধানে ভর দিলাম— দেখি ভাঙে কি না। ভাঙল না। কাউন্টারে বাম হাত রেখে ভারসাম্য রাখলাম, আর তখনই যে কনুইটা পড়ার সময় আঘাত পেয়েছিল ওটা যেন ব্যথায় চিৎকার করে উঠল।

তারপরও আমি হাল ছাড়লাম না। অনেক কষ্টে একসময় ঠোঙাটা নামাতে পারলাম। দুটো আঙুলের নিপুণ দক্ষতায় ঠোঙাটা কিচেন কাউন্টারে রাখলাম। এটার ভেতরের দৃশ্যটার কথা ভেবে গা গুলিয়ে উঠল। আর রাগও বেড়ে গেল চরম ভাবে।  

কিন্তু দুভাগা আমি। এতকিছুর পরেও আমি তানজিনার মুখোমুখি হতে পারছি না। ওকে বের করে দিতে পারছি না। তাহলে আমি কী করতে পারি?

আর ঠিক তখনই মাথায় একটা শয়তানি বুদ্ধি এল। তানজিনাকে আমি ওর মতো করেই ট্রিটমেন্ট দেব। অ্যান আই ফর অ্যান আই। 

ড্রয়ার থেকে একটা পলিথিনের ব্যাগ বের করলাম। কাগজের ঠোঙাটা যাতে গলে গিয়ে ভেতরের জঘন্য জিনিসগুলো মেঝেতে পড়ে না যায় তার জন্য ঠোঙাটা সাবধানে পলিথিনে ঢুকিয়ে নিলাম। তারপর কিচেন ছেড়ে সোজা দোতলার সিঁড়ি বেয়ে উঠতে থাকলাম। কনুইটা টনটন করে জানান দিচ্ছে তার ব্যথার কথা। তবু পাত্তা দিলাম না।

তানজিনার ঘরটা সিঁড়ির কাছেই। ওর দরজায় ছিটকিনি আছে, কিন্তু সেটা ভেতর থেকে। বাইরে থেকে তালার হুক লাগানো থাকলেও তালা দেওয়া নেই। ও আসলে বাইরে গেলেও তালা দেয় না। দরজটা ভেজানো থাকে। টান দিতেই দরজাটা খুলে গেল।

তানজিনা এখানে ওঠার পর থেকে আমি ওর ঘরে কখনো ঢুকিনি। দরজার কাছে দাঁড়িয়ে দু-একবার তর্ক করেছি কেবল। এবারই প্রথম ওর ঘরে ঢুকে একবার চারপাশ ঘুরে ঘুরে দেখলাম।

না, খারাপ না। জানি না, কী আশা করেছিলাম। ব্ল্যাক ম্যাজিকের সরঞ্জাম? কোনো শয়তানি আলামত? দেওয়ালে রক্ত দিয়ে লেখা ‘আমি আহসানকে ঘৃণা করি’? কিন্তু এমন কিছুই নেই ভেতরে। ঘরটা পরিপাটি। কাপড়গুলো আলমারিতে গুছিয়ে রাখা। এমনকি বিছানাটাও টানটান করে গোছানো। আমার মতোই পরিপাটি দেখে অনিচ্ছা সত্ত্বেও ওর প্রতি মনের ভেতর কিছু শ্রদ্ধা জন্মাতে চাইল। কিন্তু তখনই ওর বিছানার পাশে থাকা ছোট ডাস্টবিনটা খালি না করায় বিরক্ত লাগল। কিছু মোচড়ানো টিস্যু আর চিপসের প্যাকেটে বিনটা ভর্তি।

কৌতূহলবশত আমি ওর আলমারির পাল্লাটা একটু খুলে দেখলাম। ভেতরে ভয়ংকর বোরিং ব্যাপার। সারি সারি সালোয়ার-কামিজ আর কুর্তি ঝোলানো। নিচে একটা অতিরিক্ত স্যান্ডেল, আর একজোড়া হাই হিল।

ঠিক আছে— যথেষ্ট গোয়েন্দাগিরি হয়েছে। যা করতে এসেছি, সেটাই করা যাক।

আমি তানজিনার বিছানার পাশে স্থিও হয়ে দাঁড়ালাম। পলিথিন ব্যাগটার ভেতর একবার শেষবারের মতো তাকালাম, তারপর ওটা একদম উপুড় করে দিলাম।

কাগজের ঠোঙাটা বিছানায় পড়তেই ওটার ভিজে যাওয়া নিচটা ছিঁড়ে গেল, আর সবকিছু ছড়িয়ে পড়ল। পচা ফল আর কিলবিল করা মাছি ওর পরিষ্কার ধবধবে চাদরের ওপর ছড়িয়ে পড়ল।

এই তো। এবার শোধবোধ হলো।

আগে কখনও এমন জঘন্য কাজ করিনি। তবে কাজটা করে বেশ মজা পেলাম। উচিৎ শিক্ষা হয়েছে। এরপর থেকে আমার সাথে কিছু করতে গেলে একশ একবার ভাবতে হবে ওকে। সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামতে নামতে ভাবলাম এবার গোসল করে ফ্রেশ হয়ে তারপর এক মগ কফি খেয়ে ব্যাপারটা সেলিব্রেশন করব। আমি যে ঘরটাকে এতটা ভালোবাসি, তানজিনা তাকে একটা জীবন্ত নরক বানিয়ে ফেলেছে। আজ আমি তাকে একটু হলেও ফিরিয়ে দিলাম।

কিন্তু... আমার ধারণা, তানজিনা এটাকে নিখাদ ‘প্রতিশোধ’ হিসেবে দেখবে না।

প্রতিশোধটা নিয়ে যতই ভালো লাগুক, আমার মনে হচ্ছে— আমি এইমাত্র একটা মারাত্মক ভুল করে ফেললাম।
·
·
·
চলবে……………………………………………………

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

WhatsApp