সাবলেট - পর্ব ১৪ - কয়েস সামী - ধারাবাহিক গল্প

এই মিটিংয়ে আর এক সেকেন্ডও বসে থাকলে আমার মাথাটা ফেটে যাবে।

নতুন চাকরিতে আমি এক মাস হলো জয়েন করেছি, আর মিটিংয়ে আমার ‘কনট্রিবিউশন’ কী— সেটা একদম পরিষ্কার করে বলে দেওয়া হয়েছে: আমি মিনিটস লিখব। কোনো আইডিয়া দেব না, কথা বলব না, এমনকি ভাববও না। শুধু সবাই যা বলে, আর কখন বলে— সেটা লিখে রাখব। খুব ‘গুরুত্বপূর্ণ’ কাজ। (ঘোড়ার ডিম!)

আমার সামনে কাগজ-কলম রাখা— কারণ আমাকে ল্যাপটপ দেওয়া হয়নি। মিটিংয়ের প্রথম বিশ মিনিট আমি দারুণ নোট নিয়েছি— একেবারে বাধ্য ছাত্রের মতো। কিন্তু পরের বিশ মিনিটে সব এলোমেলো হয়ে গেছে। কারণ আমার বুক আর দুই হাতজুড়ে এক অদ্ভুত তীব্র চুলকানি শুরু হয়েছে। মাথা থেকে যাচ্ছে না। আমার পুরো মনোযোগটাই এখন কাপড়ের নিচে আটকে আছে।

সমস্যাটা আমি ইদানীং বেশ টের পাচ্ছি। গত কয়েক সপ্তাহ ধওে প্রতিদিন না হলেও প্রায়ই শরীর চুলকায়। আর আজ? আজ তো সবচেয়ে ভয়াবহ অবস্থা।

“আহসান সাহেব?”

আমি কনুইয়ের নিচে আঙুল বোলালাম, কিন্তু আসলে ইচ্ছে করছে শার্ট ছিঁড়ে বুকটা পাঁচ মিনিট ধরে আঁচড়াই। শার্টের নিচে কী আছে জানি না, কিন্তু হাতার ভেতর দিয়ে রাগী লালচে দাগ যেন ধীরে ধীরে বেরিয়ে আসতে চাইছে।

“আহসান সাহেব!”

আমি হুঁশ ফিরে মাথা তুললাম। আমার বসের নাম আসিফ। বয়স আমার চেয়েও কম হবে —বিরক্ত চোখে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। আমি কলমটা শক্ত করে ধরে এমন ভান করলাম যেন ‘মার্কেট অপটিমাইজেশন’ নিয়ে যে বোরিং আজগুবি কথাবার্তা চলছে, সেটা টুকে নিচ্ছি। মিটিংয়ে মিনিটস নেওয়া কী জঘন্য কাজ! বড় কোম্পানিগুলো যে এখনো এটা কওে, আমি আগে জানতামই না। “সরি স্যার,” আমি বিড়বিড় করলাম।

“তাহলে তুমি কীসের জন্য অপেক্ষা করছ?” আসিফ জিজ্ঞেস করল।

আমি তার ক্লিন-শেভড মুখের দিকে তাকালাম। নিশ্চয়ই সে আমাকে কিছু করতে বলেছে, কিন্তু আমি তো নিজের গা চুলকানো আটকাতে গিয়ে অর্ধেক সময় দাঁতে দাঁত চেপে বসেছিলাম। যার ফলে সে কী বলেছে আমার কোনো ধারণাই নেই। আমি কেবল হাঁ করে তাকিয়ে রইলাম।

“চা, আনুন,” সে দীর্ঘশ্বাস ফেলল। “অফিস পিওনকে বলেন এক পট ফ্রেশ চা দিয়ে যেতে। আর আপনি ওর সাথে থাকবেন।”

ওহ। মিটিংয়ে আমার আরেকটা ‘গুরুত্বপূর্ণ’ কাজ আছে: চা সার্ভ করা।

“ওকে স্যার।” আমি ঝট করে উঠে দাঁড়ালাম। “অবশ্যই। এখনই আনছি।”

কনফারেন্স রুমের টেবিল থেকে খালি টি-পটটা তুলে নিলাম। বেরিয়ে আসতে আসতে শুনলাম আসিফ আরেকজনকে বলছে, “কিছু লোক কখনোই প্রফেশনাল হতে পারে না, তাই না?”

বাহ! এই চাকরি পার্মানেন্ট হওয়ার স্বপ্নটা তাহলে এখানেই শেষ।

যেহেতু এখানে আমার স্থায়ী হওয়ার কোনো চান্সই নেই, তাই চা আনতে আমি আর তাড়াহুড়ো করলাম না। পটটা নিয়ে কিচেনে রেখে সোজা ওয়াশরুমের দিকে ছুটলাম।

ভাগ্য ভালো, ভেতরে কেউ নেই— সবাই মিটিংয়ে। আমি শার্টের ওপরের বোতামগুলো খুলতে থাকলাম। যদিও ছিঁড়ে ফেলতে ইচ্ছে হচ্ছে। তবু নিজেকে আটকালাম। সব বোতাম খুলে গেলে আমি শার্টটা দু’পাশে টেনে বুকটা আয়নায় দেখে আঁতকে উঠলাম।

তাই তো এত চুলকানি হচ্ছে! বুকের প্রতিটা ইঞ্চি জুড়ে টকটকে লাল একটা র‌্যাশ। এক ঝটকায় পুরো শার্ট খুলে দেখতে পেলাম হাতে, পিঠে দু’জায়গাতেই আছে। উচিত না জেনেও আমি কয়েক মিনিট ধরে পাগলের মতো আঁচড়াতে থাকলাম। যতটুকু হাত পৌঁছায়, সব জায়গা এমনভাবে আঁচড়ালাম যে ত্বকে জ্বালা করতে থাকল, প্রায় রক্ত বেরোনোর মতো অবস্থা হয়ে গেল।

কিন্তু এমন র‌্যাশ হলো কেন? যেহেতু এটা মূলত শার্টের নিচে হয়েছে, ধরে নিতে হয় শার্টটাই কারণ। কিন্তু শার্টটা নতুন না— বহু বছর ধরে আছে, কোনোদিন সমস্যা করেনি। আর চুলকানি তো প্রায় প্রতিদিনই হচ্ছে— ভিন্ন ভিন্ন শার্ট বা পাঞ্জাবি পরলেও।

লন্ড্রি ডিটারজেন্ট? সেটা তো হওয়ার কথা না। আমি চাইলে সস্তা ডিটারজেন্ট কিনতে পারি। কিন্তু আমি সবসময় ‘সেনসিটিভ স্কিন’-এর জন্য উপযোগী দামী লিকুইড ডিটারজেন্ট কিনি। কারণ আমার স্কিন খুব সেনসিটিভ। তবে সাধারণ ডিটারজেন্টও কোনোদিন আমাকে এমন র‌্যাশ দেয়নি। যে জিনিসটা আমার শরীরে ঠিক এভাবে রিঅ্যাক্ট করে, সেটা হলো...

লেমন গ্রাস বা সাইট্রাস ফ্লেভার।

আমি লেবুর গন্ধে ভীষণ অ্যালার্জিক। এটা সাথে সাথে চামড়ায় কেমিক্যাল রিঅ্যাকশন করে। ছোটবেলায় বুঝেছিলাম— মা যখন লেবুর গন্ধযুক্ত ডিটারজেন্ট ব্যবহার করত, আমার বারবার র‌্যাশ উঠত। তাই আমি এটা এড়িয়ে চলি। নাবিলাও খুব ভালো করে জানে, যে সাবান বা ডিটারজেন্টে ‘লেমন’ লেখা আছে, সেটা ভুলেও কেনা যাবে না। এমনকি আমি ওকে বলেছি আমাদের ওয়াশিং মেশিনেও যেন ওসব ব্যবহার না করে। কারণ মেশিনে সামান্য রেসিডিউ থাকলেও আমার ত্বকে জ্বালা ধরতে পারে।

কিন্তু তানজিনা তো এটা জানে না।

হুম, এখন মনে পড়ছে। তানজিনা আমাদের বাসায় ওঠার ঠিক পর থেকেই, মানে এক মাসের একটু বেশি সময় হলো, আমি এই চুলকানি টের পাচ্ছি। টাইমলাইন মিলে যাচ্ছে। নিশ্চয়ই তানজিনা এমন ডিটারজেন্ট ব্যবহার করছে, যাতে লেবুর ফ্লেভার আছে। সে মেশিনে কাপড় ধুচ্ছে, তারপর আমি আমার কাপড় ধুলে সেগুলোতে রেসিডিউ লেগে যাচ্ছে। আর এখন আমাকে ওর সাথে এ নিয়ে কথা বলতে হবে— যা নিশ্চিতভাবেই ‘ভীষণ আনন্দদায়ক’ হবে।

হঠাৎ মনে হলো, এভাবে সারাদিন বাথরুমে দাঁড়িয়ে বুক আঁচড়ে কাটাতে পারব না। আর এতে আমারই ক্ষতি হচ্ছে। র‌্যাশের ওপর এখন নখের আঁচড়ের দাগও পড়েছে— ওপর থেকে নিচের দিকে লম্বা দাগ— সরলরেখার মতো, কোথাও বা বক্ররেখা। তাই আমাকে এখুনি শার্ট পরে নিতে হবে, চায়ের পট ভরতে হবে, আর আমার অসাধারণ ‘পিওনগিরি’ চালিয়ে যেতে হবে।

আমি নিজের গায়ে ঠান্ডা পানি ছিটালাম। এতে হয়তো জ্বালা-ধরা ত্বকটা একটু শান্ত হবে। একটু হলোও। তবে তার চেয়েও বেশি যা হলো— শার্টটা একটু ভিজে গেল। মিটিংয়ে ফিরে গেলে সবাই কী না কী ভাববে।

সত্যি কথা হলো, এখানে স্থায়ী চাকরির সম্ভাবনা আমি নিজেই উড়িয়ে দিয়েছি। আর যত দ্রুত সম্ভব নিজেকে সামলাতে হবে নইলে আমি সবকিছু হারাব।
·
·
·
চলবে……………………………………………………

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

WhatsApp