রান্নাঘরে পচা-গলা একটা গন্ধ।
গন্ধটা গত এক সপ্তাহ ধরে অল্প অল্প টের পাচ্ছিলাম। কিন্তু আজ অফিসের আরেকটা জঘন্য দিনের পর একটু শান্ত হতে ফ্রিজ থেকে এক গ্লাস ঠান্ডা পানি নিতে রান্নাঘরে ঢুকতেই গন্ধটা এত তীব্রভাবে এসে লাগল যে হাত দিয়ে নাক চেপে ধরতে হলো।
প্রথমেই মনে হলো— এটা নিশ্চয়ই তানজিনার কাণ্ড।
মাঝরাতে ধপধপ শব্দ নিয়ে তানজিনার সঙ্গে আমার ঝগড়া হওয়ার দুই সপ্তাহ হয়ে গেছে। শব্দটা ঠিক এক সপ্তাহ পরে আরেকবার শুনেছিলাম। কিন্তু সিঁড়িতে পা রাখতেই শব্দটা থেমে যাওয়ায়, বিদ্রূপভরা হাসিমুখে দাঁড়িয়ে থাকা তানজিনার সঙ্গে আরেকটা বিরক্তিকর তর্কে না জড়িয়ে ড্রয়িংরুমে ঢুকে টিভি দেখতে দেখতে সোফাতেই ঘুমিয়ে পড়েছিলাম।
কষ্টের কথা হচ্ছে, ওটাই কিন্তু গত এক মাসে আমার সবচেয়ে খারাপ ঘুম ছিল না। আমার কী হয়েছে জানি না, কিন্তু ঘুম একেবারে আসতেই চায় না। চোখের নিচে স্থায়ী কালচে দাগ নিয়ে আয়নার সামনে দাঁড়ালে এখন নিজের কাছেই নিজেকে অচেনা লাগে।
তাই রান্নাঘরের এই রহস্যময় গন্ধ নিয়ে মাথা ঘামানোর মুড আমার একদমই নেই। তারপরও কিচেন কাউন্টারে চোখ বুলালাম, গন্ধটার উৎস খুঁজতে। ঠিক তখনই ছোট ছোট একরকমের মাছি (ফলের চারপাশে প্রায়ই দেখা যায় বলে ওগুলোকে আমি ফলমাছি বলে ডাকি) আমার মুখের চারপাশে ঘুরঘুর করতে লাগল। আরেক বিপদে পড়া গেল। রান্নাঘরে এসব ফলমাছি দেখলে আমার গা জ্বালা করে। মনে পড়ে গেল, কয়েকদিন আগে আমি নাবিলাকে যখন কুকিজ বানাতে বলেছিলাম, তখন ও বলেছিল— রান্নাঘরে মাছির যন্ত্রণায় দাঁড়ানো যায় না।
ভেতরে কোনো অপরাধী লুকিয়ে আছে কি না দেখতে সামনে দাঁড়ানো ফ্রিজটা এক টানে দিয়ে খুলে ফেললাম । ফ্রিজের ভেতরেও গন্ধ ছড়িয়ে পড়েছে। আমি নিচু হয়ে তাকালাম— সস-টস, সবজি, মাছ-মাংস, কিছু খাবার, আর ডিম— সবই স্বাভাবিক। কিন্তু তারপর নজরে পড়ল, ফ্রিজের পেছনের দিকে কয়েকটা ওয়ান-টাইম প্লাস্টিকের বাক্স, যা কিনা তানজিনা রেস্টুরেন্ট বা ক্যাফে থেকে নিয়ে আসে।
কোনো কিছু না ভেবে বাক্সগুলো বের করার জন্য হাত ঢুকালাম। হাতে নিতেই বুঝে গেলাম— এটাই গন্ধের আসল উৎস। ভয়ংকর দুর্গন্ধ। যেন ভেতরে কোনো ছোট্ট মৃতদেহ পচে আছে।
গ্লাভস ছাড়া এগুলো ধরতেও ঘেন্না করছে। তবু একটা অসুস্থ কৌতূহল আমাকে থামতে দিল না। ভেতরে কী আছে জানতে হবে। নিশ্চিত হতে হবে— গন্ধটা সত্যিই এখান থেকে আসছে কি না।
তাই প্রথম বাক্সটা খুলে ফেললাম।
খুলেই আফসোস! বাক্সের ভেতরের জিনিস দেখে পেট উল্টে আসার জোগাড় হলো। একসময় এটা ছিল চিকেন ফ্রাই আর বিরিয়ানি জাতীয় কিছু। কিন্তু বিরিয়ানি এখন পচে প্রায় সবুজ হয়ে গেছে। ফ্রাইয়ের ওপর হয়তো সস মাখানো ছিল— সেটা পচে গেছে, আর ফ্রাইও শেওলা রঙের হয়ে গেছে। গন্ধটা অসহ্য।
তানজিনাআআআ...!
বাকি দুইটা বাক্স খোলার দরকারই মনে করলাম না— ওগুলোর অবস্থাও নিশ্চয়ই একইরকম হবে। তিনটে বাক্সই সরাসরি ডাস্টবিনে ছুঁড়ে দিলাম। তারপর গারবেজ ব্যাগটা শক্ত করে বেঁধে বাইরে নিয়ে গিয়ে ফেললাম। আমার ঘরে এই আবর্জনা আর এক সেকেন্ডও রাখতে চাই না।
ফিরে এসে দেখি— রান্নাঘরের গন্ধ একদম যায়নি। কাউন্টারের ওপর ডজনখানেক মাছি বসে আছে। আমি খালি হাতে মাছিগুলো মারার চেষ্টা করলাম। কিন্তু এগুলো তাড়ানো এত সহজ হবে বলে মনে হয় না।
“কী করছ, আহসান?”
বাইরে যাবার জন্য তৈরি নাবিলা রান্নাঘরে এসে হাজির হয়েছে। ও নিশ্চয়ই আমাকে দেখতে পেয়েছে ফ্রিজের ওপর বসে থাকা একটা মাছিকে জোরে চাপড় মারতে। কাজটা মোটেও ঠিক হয়নি। কারণ, মাছিটা মারতে পারিনি।
আমি ঘুরে দাঁড়িয়ে নিজেকে শান্ত করার জন্য একটা লম্বা নিশ্বাস নিলাম। “জানো, তানজিনা কী করেছে? ফ্রিজে পচা খাবার রেখে দিয়েছে।”
নাবিলা নাক কুঁচকাল। “হুম, গন্ধ করছে। বাজে গন্ধ।”
“বাজে মানে! বমি আসার মতো।”
কোনোকিছু আবিষ্কার করেছে এমন ভাব করে ও হঠাৎ বলে উঠল, “বেডরুমে রুম ফ্রেশনার আছে না? রান্নাঘরে স্প্রে করে দিই?”
আমি জানি ও কোনটার কথা বলছে। ফ্রেশনারটা মাঝে মাঝে ও বাথরুমে স্প্রে করে। তখন গোলাপ ফুলের গন্ধে মাথা ধরে যায় আমার। ওটা আমি একদম সহ্য করতে পারি না, কিন্তু এই পচা গন্ধের চেয়ে অবশ্য গোলাপের গন্ধ অনেক ভালো। ইনফ্যাক্ট যেকোনো গন্ধই ভালো হবে। তবে আসল সমস্যা অন্য জায়গায়।
“আমি চাই না তানজিনা আর এখানে থাকুক,” আমি বললাম।
“ফ্রিজে বাসি খাবার রেখে ভুলে যাওয়ার জন্য? আহসান, তুমি তো প্রায়ই এমন করো। আচ্ছা! তুমি কি শিওর যে ওগুলো তুমি রাখোনি?”
“না! বিশ্বাস করো।” আমার চোয়াল শক্ত হয়ে গেল। “এত গন্ধের মধ্যেও তুমি এত স্বাভাবিক আছো কীভাবে? গন্ধটা তো একদম পচা লাশের মতো লাগছে!”
“না। এতটা খারাপ না।” নাবিলা কাঁধ ঝাঁকাল। “কয়েকটা জানালা খুলে দাও, স্প্রে করো— দুই ঘণ্টার মধ্যেই ঠিক হয়ে যাবে।”
“আরে নাবিলা, তুমি বুঝতে পারছো না। ও... ও আসলে একটা টক্সিক মেয়ে।” আমি একটু থেমে বললাম। “ও দু’বার মাঝরাতে জোরে জোরে শব্দ করে আমার ঘুম ভাঙিয়েছে। তারপর থেকে আমি আর ঘুমাতেই পারি না। কে জানে কী করছিল...”
“কই? আমি তো কিছুই শুনিনি।”
“কারণ তুমি ইয়ারপ্লাগ দিয়ে ঘুমাও!” আমি হাত ছুঁড়ে বললাম। “বিশ্বাস করো, এটা সে আমাকে জ্বালানোর জন্যই করছে। আর ও আমার দিকে এমনভাবে তাকায় মনে হয় যেন ঘুমের মধ্যে আমার গলা কেটে ফেলবে। ও এখানে থাকলে আমি একদম স্বাভাবিক হতে পারি না।”
“আমার তো ওকে খুব ভালোই লাগে।” নাবিলা চোখ পিটপিট করল। “আমি বুঝি না। তুমি ওর তাকানোটা পছন্দ করছ না?”
আমি দাঁত চেপে বললাম, “ও আমাকে ঘৃণা করে। তুমি যদি জানো যে কেউ তোমাকে ঘৃণা করে, তখন ওর সাথে এক ছাদের নিচে থাকতে কেমন লাগবে তোমার?”
“ও তোমাকে ঘৃণা করে না।”
“করে!” একটা মাছি আমার মুখের সামনে নাচতে শুরু করলে আমি বিরক্তিতে ওটাকে লক্ষ্য করে হাত ছুঁড়ে মারলাম। “আমাকে ও একশো ভাগ ঘৃণা করে। মনে হচ্ছে, আমাকে টর্চার করার জন্যই ও ইচ্ছে করে এই পচা খাবারগুলো ফ্রিজে রেখে দিয়েছে!”
মাছিটা শেষমেশ কাউন্টারের ওপর বসল। আমি হাত তুলে তালু দিয়ে ওটাকে চেপে ধরলাম। মাছিটা শেষ। মরে গেছে এটা বুঝতে পেরে আমার সামান্য তৃপ্তিবোধ হতে লাগল। শেষমেষ আমি পেরেছি। মাছিটাকে মারতে পেরেছি!
নাবিলা এক পা পিছিয়ে গেল। “আহসান... তুমি ঠিক আছ?”
“না, আমি ঠিক নেই!” আমি চেঁচিয়ে উঠলাম। “আমার ঘরে একটা সাইকোপ্যাথ থাকে, আর আমি চাই সে এখনই এ ঘর থেকে বের হয়ে যাক!”
“গত কয়েক মাস তোমার জন্য খুব স্ট্রেসফুল গেছে, আহসান” নাবিলা নরম গলায় বলল। “এভাবে চাকরি হারানোটা তোমার জন্য কঠিন ছিল। জানি, নতুন কাজটাও তোমার ভালো লাগছে না। আর তুমি ঠিকমতো ঘুমাতেও পারছ না। কিন্তু এটা ঠিক যে, তানজিনা তোমার সমস্যার মূল কারণ না। আমি শিওর।” আমি প্রতিবাদ করতে যাচ্ছিলাম, কিন্তু ও হাত তুলল। “আর তোমাকে মনে করিয়ে দিই— এই মুহূর্তে তানজিনা যে ভাড়া দিচ্ছে, সেটাই আমাদের টিকিয়ে রেখেছে।”
নাবিলা আসলে ঠিকই বলছে। আমাদের টাকার দরকার। আর এমনও না যে লাইনে দারুণ দারুণ ভদ্র ভাড়াটে দাঁড়িয়ে আছে।
“আচ্ছা,” আমি দাঁতে দাঁত চেপে বললাম। “অলরেডি পচা খাবারগুলো সরিয়ে ফেলেছি। কিন্তু ওকে অন্তত জানাতে হবে— এমন কাজ আর করা যাবে না।”
“আমি তানজিনার সঙ্গে খাবার নিয়ে কথা বলব,” নাবিলা বলল। “তুমি এর মধ্যে ঢুকবে না। তুমি ঢুকলে ব্যাপারটা আরও খারাপ হবে।”
এটা অবশ্য ভুল কথা বলেনি ও।
“আর মাছিও তাড়ানো যাবে,” সে যোগ করল। “আমি ইউটিউবে দেখেছি— ভিম লিকুইড আর ভিনেগার দিয়ে একটা ট্র্যাপ বানানো যায়!”
“বাহ!”
আমি মনে মনে ভাবলাম— এখন ও অন্তত একটা শক্ত হাগ দেবে। আমার খুব দরকার। কমপক্ষে লেভেল সেভেন বা তার বেশি। কিন্তু না— নাবিলা বরং স্প্রে আনতে ওপরে উঠে গেল। এই বাজে গন্ধ দূর করার জন্য ওটা আসলে কতটা কাজ করবে জানি না, তবু চেষ্টা করা যায়। রান্নাঘরে একটা মাত্র জানালা আছে— আমি ওটা টান দিয়ে খুলে দিলাম। তারপর ড্রয়িংরুমে গিয়ে আরও জানালা খুলতে থাকলাম, কারণ পুরো ঘরেই গন্ধ ঢুকে পড়ছে। এমনকি গোল্ডিকেও মনে হচ্ছে নিজের কাঁচের ঘরে একটু ফ্যাকাশে হয়ে গেছে।
মাছটার অবস্থা দেখে মায়া লাগল। ওটাও হয়তো পচা গন্ধটা পেয়েছে। আচ্ছা? মাছেরা কি গন্ধ পায়? গন্ধ পাক আর না পাক— ওতে আমার কিছু যায় আসে না। যেহেতু ওর জন্য এই মুহূর্তে আমার মায়া লাগছে, ওকে দু’টো দানা ছুঁড়ে দিলাম। মনে হয় ক্ষুধা পেয়েছিল। সঙ্গে সঙ্গেই ওপরে উঠে গিলে ফেলল। খাওয়া-ই যেন ওর জীবনের একমাত্র বিনোদন। ব্যাপারটা অদ্ভুতভাবে কিউট লাগছে। ছোট্ট প্রাণীটার প্রতি হঠাৎ করে একটা টান কাজ করছে। কোনো প্রাণীর যত্ন নেওয়ার মধ্যে সত্যিই একটা শান্তি আছে।
আমি আনমনে বুক চুলকালাম— হঠাৎ আবার চুলকাতে শুরু করেছে। ঠিক তখনই সিঁড়িতে ভারী পায়ের শব্দ ধপধপ করে নামছে। আমি মাছের অ্যাকুরিয়ামের দিক থেকে চোখ তুলে সিঁড়িঘরের দিকে তাকালাম। ওপরে কেউ দাঁড়িয়ে আছে। প্রথমে মনে হলো নাবিলা, হাতে স্প্রে নিয়ে এসেছে। কিন্তু না। নাবিলা না।
ওটা তানজিনা।
আমি কিছু বললাম না। সে-ও কিছু বলল না। শুধু দাঁড়িয়ে থেকে আমার দিকে কপাাল ভাঁজ করে তাকিয়ে রইল। ও কি আমার আর নাবিলার সব কথা শুনে ফেলেছে?
তারপর সে কানের দু’পাশে চুল গুঁজে ঠোঁট বাঁকিয়ে হাসল।
ওহ বুঝেছি। ও সব শুনে ফেলেছে।
·
·
·
চলবে……………………………………………………