সাবলেট - পর্ব ২৫ - কয়েস সামী - ধারাবাহিক গল্প

          আমাদের ফ্ল্যাটের সঙ্গে একটা ছোট্ট বারান্দা আছে। বারান্দা বললে একটু বেশিই বলা হয়। গ্রিলের ফাঁক দিয়ে একচিলতে আকাশ দেখা যায়, আর কয়েকটা টব রাখা যায়— ব্যস এইটুকুই। তবে ঢাকায় যেখানে বেশিরভাগ মানুষের বাসায় এমন খোলামেলা জায়গা নেই, সেখানে এটুকুও স্বর্গ। আমি ভাবতাম, একদিন হয়তো নাবিলা আর আমি শীতকালে এখানে ছোট্ট একটা বেতের মোড়া পেতে চা খাব। কিন্তু এখনো সেটা করা হয়ে ওঠেনি। বরং আমাদের বারান্দার টবের মাটিই হবে... গোল্ডির শেষ ঠিকানা।

আমি গোল্ডিকে অ্যাকুরিয়াম থেকে তুলে একটা পলিব্যাগে ঢুকিয়ে ওপরে গিয়ে ঠিকঠাক জামাকাপড় পরে এসেছি। কারণ নাবিলার মতে, শুধু স্যান্ডো গেঞ্জি আর শর্টস পরে ‘গোল্ডফিশের জানাজায়’ থাকা নাকি শোভন না। জিন্স পরব ভাবছিলাম। কিন্তু নাবিলা আবার যেন মনে না করে আমি সিরিয়াসলি নিচ্ছি না। তাই ভালো একটা ট্রাউজার আর পাঞ্জাবি পরলাম। মাছের জন্য টুপি পরা পর্যন্ত আমি যাব না। বাড়াবাড়ি হয়ে যাবে। ভালো দিকটা হলো, নাবিলা আমার কাপড় ধোয়া শুরু করার পর থেকে ওই চুলকানির র‌্যাশটা একদমই নেই।

ড্রয়িংরুমে ফিরে দেখি, তানজিনা ক্যাফের মর্নিং শিফট শেষ করে বাসায় ফিরেছে। ওকে আর নাবিলাকে নিচু গলায় কথা বলতে দেখে আমার বুকটা ধক করে উঠল। নাবিলা চোখ মুছছে, আর তানজিনা নিশ্চয়ই আমার নামে ভালো কিছু বলছে না। আরও বিরক্ত লাগল যখন দেখলাম ওর চোখ দিয়ে আমার দিকে তানজিনা ইশারা করছে। পরের বার ওদের লাঞ্চে কী গল্প হবে ভাবতেই গা জ্বলে যাচ্ছে। তবে নাবিলা আমাকে দেখে হাত নেড়ে ডাকল। চোখে কোনো রাগ নেই। কেবল কষ্ট আর শোক।

“তানজিনা আমাদের সঙ্গে গোল্ডির জানাজায় থাকতে চায়,” নাবিলা বলল।

আমি ভাবছিলাম এই নাটকটা কখন শেষ হবে তা নিয়ে। কিন্তু এখন দেখছি অবস্থা আরো করুণ হচ্ছে। “দারুণ হবে,” আমি বললাম।

তানজিনার ঘন কালো চোখ আমার দিকে তাকিয়ে রইল। “গোল্ডির ব্যাপারটা খুবই দুঃখজনক। ও যেন পরিবারেরই একজন ছিল।”

“হ্যাঁ,” নাবিলা মাথা নেড়ে বলল, “ও সত্যিই আমাদের সন্তানের মতো ছিল।”

আমি তানজিনার দিকে চোখ কটমট করে তাকালাম। তুইই তো আমাদের মাছ মেরেছিস, শয়তান মেয়ে কোথাকার!

তানজিনা অ্যাকুরিয়ামটার দিকে তাকাল। “আমি বরং এটা কোথাও সরিয়ে রাখি? এখন খালি বাক্সটা দেখতে আপনাদের কষ্ট লাগতে পারে।”

“হ্যাঁ,” নাবিলা বলল, “তুমি ঠিক বলেছ। অনেক ধন্যবাদ।”

আমি চাই না তানজিনা অ্যাকুরিয়ামটা আর ভেতরের পানিটা ফেলে দিক। আমি প্রমাণ করতে চাই ওটার মধ্যে ব্লিচ ছিল। ল্যাবে টেস্ট করালে অবশ্যই প্রমাণ পাওয়া যাবে। কিন্তু তানজিনা যদি ‘প্রমাণ’টাই সরিয়ে দেয়, তাহলে নাবিলা কখনোই আমাকে বিশ্বাস করবে না।

তাই তানজিনা অ্যাকুরিয়ামের দিকে যাওয়ার আগেই আমি নাবিলার হাতে হালকা করে ছুঁলাম। “এখনই সরাবার দরকার নেই। মানে... গোল্ডির স্মৃতিটা তো আর আমরা এভাবে ফেলে দিতে চাই না, তাই না? একটু... রেখে দিই, যতদিন সম্ভব...”

নাবিলা আমার দিকে এমনভাবে তাকাল, যেন আমি একেবারে পাগল হয়ে গেছি। “ওটা তো নোংরা পানি। ফেলে দিলেই ভালো হবে।”

আমি আবার কিছু একটা বলতে যাচ্ছিলাম, কিন্তু ততক্ষণে তানজিনা অ্যাকুরিয়ামটা তুলে নিয়েছে। আমি শুধু অসহায়ের মতো তাকিয়ে থাকলাম। তানজিনা ওটা বাথরুমের দিকে নিয়ে গেল। পানির ছপছপ শব্দ হলো, আর আমাদের মাছকে বিষ দেওয়ার প্রমাণটা একেবারে সত্যি সত্যি কমোডে ফ্লাশ হয়ে গেল।

তানজিনা খালি হাতে বাথরুম থেকে বেরিয়ে এল। অ্যাকুরিয়ামটা কোথায় রাখল জানি না, কিন্তু ওর মুখটা এখন খুব খুশি খুশি লাগছে। আমার দিকে তাকিয়ে এত দ্রুত চোখ টিপল যে, নাবিলা সম্ভবত খেয়ালই করল না।

তারপর আমরা তিনজনই বারান্দায় গেলাম। গোল্ডফিশের শেষকৃত্য করতে। নাবিলা একটা বড় টবের মাটি খুঁড়া শুরু করেছে, আর ওপরে রাখার জন্য একটা সুন্দর পাথর খুঁজে এনেছে। আমি রান্নাঘর থেকে একটা পুরোনো চামচ নিয়ে এসেছি কবর খুঁড়তে ওকে সাহায্য করার জন্য।

“কতটা গভীর করব?” আমি জিজ্ঞেস করলাম।

নাবিলা একটু চিন্তা করে বলল, “মানুষ মারা গেলে সাড়ে তিন হাত কবর দেওয়া হয়। আর মাছ তো দুই ইঞ্চি... তাই... কয়েক ইঞ্চিই যথেষ্ট হবে বলে মনে হয়।”

আলহামদুলিল্লাহ। চামচ দিয়ে আমি গভীর কোনো গর্ত করতে চাই না।

কয়েক ইঞ্চি মাটি সরাতেই নাবিলা খুব যত্ন করে গোল্ডিকে ভেতরে রাখল। আঙুলে চুমু খেয়ে সেই আঙুলটা পলিব্যাগের ওপর ছুঁইয়ে দিল। তারপর আমি চামচ দিয়ে মাটি চাপা দিলাম। আর নাবিলা ওপরে পাথরটা রাখল। নাবিলা যখন চোখের পানি নিয়ে টবের পাশে হাঁটু গেড়ে বসে আছে, তখন আমি তানজিনার দিকে তাকালাম। ওর ঠোঁটের কোণে হাসি দেখে আমার ইচ্ছে করল, ওকে গলা টিপে ধরি।

“আমাদেও এখন গোল্ডি সম্পর্কে দু-একটা কথা বলা উচিত,” তানজিনা বলল।

নাবিলা উঠে দাঁড়িয়ে চোখ মুছল। “ওহ! তাহলে তো খুব ভালো হয়।” 
“আহসান ভাই,” তানজিনা বলল, “আপনি শুরু করবেন?”
আমি তানজিনাকে প্রাণপণে ঘৃণা করি। কিন্তু আমি এখন নাবিলার মনটা নষ্ট করতে পারি না। নাবিলা যাতে আমাকে ‘ভালো স্বামী’ ভাবতে পারে এজন্য এই ট্র্যাজেডির সময় আমাকে একটু সিরিয়াস থাকতে হবে।

“আজ আমরা এখানে জড়ো হয়েছি গোল্ডিকে বিদায় জানাতে।” আমি মাথা নিচু করলাম। “কাটাবন থেকে আমরা ওকে এনেছিলাম, আর... ও ছিল ওখানকার সকল গোল্ডফিশের মধ্যে সবচেয়ে চঞ্চল। ছোট ছোট দানা খেতে ভালোবাসত... আর গোল গোল করে সাঁতার কাটত... আর...” আমি চুপিচুপি নাবিলার দিকে তাকালাম। ও আমার দিকে মন্ত্রমুগ্ধের মতো তাকিয়ে আছে। “আর... ও একটা ভালো মাছ ছিল।”

এতে কি চলবে? বুঝতে পারলাম না। নাবিলাকে মনে হলো একটু হতাশ হয়ে গেছে। ও হয়তো আরো ভালো ভালো কথা শুনতে চাচ্ছিল। আরে ভাই, একটা কাঁচের বাক্সের ভেতর থাকা মাছ নিয়ে আর কতই বা বলা যায়?

“আমি গোল্ডিকে মিস করব,” তানজিনা বলল। “ড্রয়িংরুমে যখনই থাকতাম, মনে হতো গোল্ডি আমাকে সঙ্গ দিচ্ছে। অনেক সময় মনে হতো ও আমার দিকে তাকিয়ে হাসছে। ডিউটি শেষে যখন ফিরতাম, সাঁতার কেটে আমাকে ও বিনোদন দিত। আর যে রাতগুলোতে আমার ঘুম আসত না, ও তখনও আমার সঙ্গে ছিল। ও চলে গেলেও মনে হয়... ওর আত্মা এখনো এখানে আছে। আমাদের সঙ্গে আছে।” তানজিনা একটা দীর্ঘশ্বাস নিল। “আর আমরা ওকে কখনোই, কখনোই ভুলব না।”

নাবিলার চোখ আবার ভিজে উঠল। “কথাগুলো এত সুন্দর, তানজিনা। আমারও মনে হচ্ছে... ওর আত্মা এখনো আমাদের সঙ্গে আছে।”

কী বলছে এসব! ‘কখনোই ভুলব না’? আমিও তো গোল্ডিকে পছন্দ করতাম, কিন্তু ওটা তো একটা মাছ! তানজিনা বক্তৃতায় আমাকে ছাপিয়ে গেল, এটা ভেবে আমি ভেতরে ভেতরে ফুঁসতে থাকলাম। বিশেষ করে, ওই মাছটাকে তো ও-ই মেরেছে। নাবিলা বিশ্বাস না করলেও, আমি জানি এটাই সত্যি।

নাবিলা তানজিনার দিকে তাকিয়ে বলল, “আমার ঠিক এই কথাটাই দরকার ছিল। গোল্ডি সম্পর্কে এত সুন্দর কথা বলার জন্য তোমাকে অনেক ধন্যবাদ। তুমি সত্যিই খুব ভালো বোন আমার। জানি, ব্যাপারগুলো হয়তো একটু বোকামি মনে হতে পারে...” ও ইচ্ছে করে আমার দিকে তাকাল। “কিন্তু... সত্যি সত্যি এসব কথা কষ্টের সময় মানুষকে অনেক সাহায্য করে।”

তানজিনা হাত বাড়িয়ে নাবিলার হাত ধরল। আর কেন জানি না, আমার কপালের শিরা টনটন করে উঠল। মাথাব্যথা শুরু হলো বলে। নাবিলা আবার কাঁদতে কাঁদতে তানজিনাকে জড়িয়ে ধরলে মাথা ব্যথাটা ক্রমশ বাড়তে থাকল। আমি আর পারছি না। একদম পারছি না।

“হয়েছে, নাটক অনেক হয়েছে,” আমি হঠাৎ করে বলে উঠলাম। “আমি জানি গোল্ডিকে তুমিই খুন করেছো, তানজিনা।”

তানজিনা আর নাবিলা একসাথে ঘুরে আমার দিকে তাকাল। তানজিনা কী ভাবল জানি না, কিন্তু নাবিলা রেগে আগুন হয়ে গেল।

“আহসান!” নাবিলা ধমকে উঠল। “তোমার কী হয়েছে বলো তো?”

“সত্যি কথা বলছি,” আমি পাল্টা বললাম। “ও গোল্ডিকে মেরেছে, আর এখন এখানে দুঃখী সেজে অভিনয় করতে এসেছে। ওর দিকে তাকালেই বুঝা যাচ্ছে ওর সবকিছু ভণিতা!”

নাবিলা তানজিনার দিকে তাকাল। কী আশ্চর্য! তানজিনার চোখ পানিতে ভরে উঠেছে। যেন সত্যিই ওই বোকা গোল্ডফিশটার জন্য ওর কলিজা ফেটে যাচ্ছে। আহা! অস্কারজয়ী অভিনয়!

“গোল্ডির মৃত্যুতে ভাইয়া আসলে খুব ভেঙে পড়েছেন,” তানজিনা নরম গলায় বলল। “উনি এখন কী বলছেন নিজেও বুঝতে পারছেন না।”

“ ও ভেঙে পড়েছে?!” নাবিলা কান্নায় ফেটে পড়ল। “ও তো ওকে টয়লেটে ফ্লাশ করে দিতে চাচ্ছিল!”

“আহসান ভাই!” তানজিনা হাঁ করে বলল। “আপনি কীভাবে এমনটা ভাবতে পারলেন!”

আবারও ওর চোখে সেই হাসি। আমি স্পষ্ট বুঝতে পারছি ও মজা পাচ্ছে। নাবিলা আমাকে বিশ্বাস না করে ওকে যে বিশ্বাস করছে এতে ও ভীষণ খুশি। 

এটাই তো ও চেয়েছিল। আমি ওর ফাঁদেই পা দিয়েছি।

“ঠিক আছে, হ্যাঁ, আমি মাছটা ফ্লাশ করতে চেয়েছিলাম। কিন্তু আমি তো গোল্ডিকে আঘাত করিনি! আমি অন্তত সেই সাইকোপ্যাথ না, যে ব্লিচিং পাউডার ঢেলে আমাদের মাছকে বিষ দিয়ে মেরে ফেলতে পারে! নাবিলা, এতটা বোকা হয়ো না, প্লিজ!”

নাবিলা আমার কথায় একেবারে থমকে গেল। যেন ট্রমাটাইজড হয়ে গেছে। আর তানজিনা হাসি আটকে রাখছে। নাবিলা কেন বুঝতে পারছে না?

নাবিলা আহত চোখে আমার দিকে তাকাল। “আমি... আমি এখন একটু একা থাকতে চাই। একটু হাঁটতে বের হবো, লেকের ধারে গিয়ে একা একা হাঁটব।”

আজ বিকেলে আমাদের সিনেমা দেখার কথা ছিল। কিন্তু ধরে নিচ্ছি সেটা বাদ। এখন তো আমরা শোকে আছি। নাবিলা আর তানজিনা একসাথে যার যার রুমের দিকে রওনা দিল। আর আমি পড়ে থাকলাম এই নতুন নামকরণ হওয়া ‘বারান্দা কবরস্থানে’। কিন্তু ওরা ঘরের ভেতর ঢুকে যাওয়ার ঠিক আগে, তানজিনা পেছনে ঘুরে আমার দিকে তাকাল। ওর মুখের পৈশাচিক হাসিটা দেখে আমার ইচ্ছে করছে, ও আমাদের মাছের সাথে যা করেছে, আমিও ওর সাথে ঠিক তাই করি। আমার ইচ্ছে করছে, ওকে এই টবের মাটির নিচে পুঁতে ফেলি।
·
·
·
চলবে……………………………………………………

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

WhatsApp