একদম লাজুক, শান্তশিষ্ট, সরল ও লক্ষ্মী একটা মেয়ে। এমনটাই তো জানানো হয়েছিল আমাকে। হুম?
মাহির তাদের ঘরের দরজার কাছে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। আয়না তাকে দেখে অপ্রতিভ হয়। কিছুক্ষণ আগের সেই দৃঢ়তা, জেদ ও আত্মবিশ্বাস যেন কিছুটা দমে যায়। কোনো রকম প্রেক্ষাপট ছাড়া এমন আচরণ করা মেয়ের প্রতি নেতিবাচক ধারণা হওয়াই স্বাভাবিক। তবে আয়নার নিজে থেকে সাফাই গাইতে ইচ্ছে করল না।
সে খিটখিটে স্বরে বলল, তোমারও কপাল! আফজাল মেম্বারের মুখের কথার ওপর ভরসা করে বসে আছো।
-তাই বলে এমন আকাশ-পাতাল পার্থক্য!
-শান্তই তো আছি। চেঁচামেচি করলাম কখন! আর ইউ রিগ্রেটিং অলরেডি?
আয়না কোনো উত্তর পেল না। মাহিরের দিকে তাকাতেই সে বিস্মিত হলো। তার চোখে কোনো রাগ, বিতৃষ্ণা বা ভর্ৎসনা নেই; বরং একরাশ কৌতূহল ও চাপা কৌতুক ঝিলিক দিয়ে উঠেছে। সে মিটিমিটি করে হাসছে!
আয়না তা দেখে আড়ষ্ট হলো। মাহির সেভাবেই তাকিয়ে রইল, তারপর হাত বাড়িয়ে আয়নার হাতের দুধের মগের দিকে ইশারা করল। আয়না সেদিকে তাকিয়ে মৃদু স্বরে বলল, ঠান্ডা হয়ে গেছে।
মাহির উত্তর না দিয়ে তাকিয়ে রইল। আয়না বাধ্য হয়ে তার দিকে মগটা এগিয়ে দিল। পুরোটা সময় আয়নার দিকে তাকিয়ে মাহির আহমেদ ঠান্ডা দুধটুকু পান করে শেষ করল।
আয়না বলল, এখানেই দাঁড়িয়েছিলে?
মাহির উত্তর না দিয়ে মগটা টেবিলের ওপর রেখে আয়নার খুব কাছে এসে দাঁড়াল। তার দীর্ঘ ছায়াটা আয়নার ওপর পড়তেই দু'জনের মনের স্থিতি কেমন যেন বদলে গেল।
মাহির গভীর স্বরে জিজ্ঞেস করল,
তুমি কি মনে করো আমি তোমার ভরণপোষণ দিতে পারব না? কিংবা আমার আর্নিং দিয়ে তোমার লাইফস্টাইল মেইনটেইন করা সম্ভব হবে না? তাই কি আজ রাতে নিজের ঘরটাকে এমন কুরুক্ষেত্র বানালে?
আয়না এক মুহূর্ত থমকে গেল। তবে মাহিরের এই সরাসরি আক্রমণে সে দমে যাওয়ার পাত্রী নয়। সে মাহিরের চোখের দিকে সরাসরি তাকিয়ে বলল, আমি এদেশের সবচেয়ে ধনী লোকটাকে বিয়ে করলেও ঠিক এই কাজটাই করতাম। ওনার কাছে আমার যে হক, তার কানাকড়ি পর্যন্ত আমি বুঝে নিতাম। এটা আমার লাইফস্টাইলের বিষয় না, এটা আমার প্রাপ্য। আর অনুগ্রহ করে আমাকে বারবার এই আগাম সতর্কবার্তা দিও না যে তোমার জীবনটা কত সাধারণ বা সাদামাটা।
মাহির ভ্রু কুঁচকে তাকাল।
আয়না থামল না। গড়গড় করে বলে চলল, তোমার কথা শুনে মনে হয় তুমি আমাকে উচ্চাকাঙ্ক্ষী বা বিলাসী কোনো মেয়ে ভাবছ, যে কি না অভাব বা স্ট্রাগল দেখেনি। তুমি কি সত্যিই তাই মনে করো? তবে শুনে রাখো, আমি যে কোনো পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে জানি এবং নিজেকে সেই অনুযায়ী মানিয়ে নেওয়ার ক্ষমতাও আমার আছে। আমি খুব রাজকীয় হালে বড় হইনি যে অন্য কিছুতে আমার কষ্ট হবে। তবে কষ্ট হলেও তা নিয়ে আমি কোনো অশান্তি করব না।
মাহির এবার একটু চমকাল। আয়নার গলার স্বরে এমন কাঠিন্য ছিল যা সচরাচর দেখা যায় না। সে তাকে আপাদমস্তক একবার দেখল। এই আয়নাকে এখন আর কোনোভাবেই সেই গ্রাম্য শান্ত মেয়েটি মনে হচ্ছে না।
মাহির একটু সময় নিয়ে বলল,
আমি তোমাকে বিলাসী ভাবিনি আয়না। কিন্তু তোমাকে মানতে হবে যে পরিস্থিতির পরিপ্রেক্ষিতে আমার মনে এমন প্রশ্ন জাগা খুব স্বাভাবিক, যেখানে তুমি নিজে থেকে আমাকে কোনো কিছু জানাও না।
-কোথায়! কত কিছুই তো বলে ফেলেছি ইতিমধ্যে।
-উঁহু! তুমি তোমার প্রয়োজনমতো জানাচ্ছ, নিজেকে রহস্যের আড়ালে রাখছ।
আয়না এক মুহূর্ত চুপ থাকল। তারপর খুব ধীর গলায় বলল, হয়েছে! তুমি বিশ্রাম করো, অনেক রাত হয়েছে। কাল আমাদের বেরোতে হবে।
আয়না আলমারি থেকে নিজের কিছু কাপড় গোছাতে শুরু করল। মাহির আর কোনো কথা বাড়াল না। সে দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে লেপের নিচে গিয়ে গা ঢাকা দিল।
—————
কামিনীর ঘরের দরজার একটা পাল্লা সামান্য ভেজানো ছিল। ভেতরে আলো খুব কমিয়ে রাখা হয়েছে, অন্ধকারে তারা ভয় পায়। খাটের ওপর কামিনী আর কাসিফ অঘোরে ঘুমাচ্ছে। আয়না চলে গেলে এই ঘরটা কামিনী নিয়ে নেবে। আট বছরের কাসিফ লেপটা একপাশে সরিয়ে দিয়ে কামিনীর গায়ের ওপর হাত তুলে দিয়ে অদ্ভুত ভঙ্গিতে শুয়ে আছে।
আয়না নিঃশব্দে বিছানার একপাশে বসল। কাসিফের কপালে লেপ্টে থাকা চুলগুলো আলতো করে সরিয়ে দিতেই সে আধোঘুমে চোখ মেলল। বড় বোনকে দেখে তার সারা মুখে হাসি ফুটে উঠল। সে এক ঝটকায় উঠে আয়নাকে জড়িয়ে ধরে বলল, আপা! আজকে আমাদের সাথে ঘুমাবে? ওই ঘরে যাবে না?
কামিনীও জেগে গেল। বোনকে এভাবে কাছে পেয়ে সে খুশিতে ডগমগ হয়ে লেপটা একটু সরিয়ে জায়গা করে দিল। সে ফিসফিস করে বলল, আসো আপা প্লিজ, তুমি মাঝখানে শোও। কাল তো চলেই যাবে, আজকে আমাদের সাথেই থাকো। দুলাভাই কিচ্ছু বলবে না দেখো, কেউ জানতেও পারবে না।
আয়না তাদের আবদার ফেলল না। যেকোনো সম্পর্কের আবেগ প্রকাশে সে বরাবরই কৃপণ, তাদের সাথে আহ্লাদও করেছে খুব কম। তবুও আজ সে মাঝখানে শুলে দুই পাশ থেকে দুই ভাইবোন তাকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরল।
সে কাসিফের দিকে তাকিয়ে কড়া গলায় বলল,
কাসিফ কাল থেকে কিন্তু আমাকে আর পাশে পাবি না। ফজরের আজান দিলে সাথে সাথে বিছানা ছাড়বি। সৎ মা যেন তোকে ডাকার জন্য লাঠি নিয়ে না আসে, মনে থাকবে?
কাসিফ মাথা নেড়ে বলল,
মনে থাকবে আপা। কিন্তু তুমি না থাকলে আমাকে অঙ্ক কে বুঝিয়ে দেবে?
আয়না একটু গাম্ভীর্য নিয়ে বলল, কেন! কামিনী আছে না? না হলে আব্বাকে বলবি হোম টিউটর এনে দিতে। অন্য সাবজেক্ট নিয়ে কিছু বলব না, কিন্তু অঙ্কে যদি এক নম্বরও কম ওঠে, তবে দেখিস তোর খবর আছে! আর কামিনী, আমি তোর নামে একটা অ্যাকাউন্ট খোলার ব্যবস্থা করেছি। তুই খুব সাবধানে থাকবি। তোর আব্বা বা মেম্বার যাই বলুক, পড়াশোনা ছাড়বি না। কেউ জোর করে বিয়ের কথা তুললে আমাকে সাথে সাথে জানাবি। দমে যাবি না একদম।
কামিনী ভয়ে আয়নার বুকে মুখ লুকিয়ে বলল,
আমি তোমার মতো শক্ত হতে পারব তো আপা? আমার তো খুব ভয় লাগে।
আয়না ইতস্তত করে কামিনীর মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে দৃঢ় স্বরে বলল,
ভয় পেলেই ওরা তোকে গিলে খাবে। আমি এতদিন যে লড়াইটা করলাম, সেটা কেবল আমার জন্য না, তোদের পথটা পরিষ্কার করার জন্য। তোদের যেন কখনো কারো কাছে হাত পাততে না হয়। আর শোন, প্রেম-টেমের দিকে মোটেও নজর দিবি না। ওসব কোনো কাজের জিনিস না। পড়াশোনা শেষ করে সব করিস, এখন না! আর তুই তো একদমই পড়াশোনা করিস না কাসিফ। ভালো ভার্সিটিতে চান্স পেতে হবে। মনে রাখবি, বিদ্যা না থাকলে এই সমাজে তোকে কেউ সম্মান করবে না।
কাসিফ ঘুম জড়ানো গলায় বলল, আপা, তুমি কি অনেকদিন পর পর আসবে? রোজা-ঈদ এখানে আমাদের সাথে করবে না?
কামিনী বলল, কই, আম্মা কি যায় তার বাড়িতে? বিয়ের পর মেয়েদের শিকড়টাই উপড়ে ফেলা হয়।
আয়না এক মুহূর্ত চুপ থাকল। তারপর অস্ফুট স্বরে বলল, আসব। তোরাও আসবি কয়েকদিন পর। ফোনে কথা হবে, মন খারাপ করার কিছু নেই।
কামিনী আর কাসিফ দুই পাশ থেকে আয়নাকে পরম নির্ভরতায় জাপটে ধরে রইল। তাদের জন্য সে এক ছায়া, যা আগলে রাখে সব ঝড় থেকে। আয়না অনুভব করল তার চোখের কোণটা ভিজে উঠছে, কিন্তু সে তা প্রকাশ করল না। দীর্ঘশ্বাস ফেলে অন্ধকারের দিকে চেয়ে রইল।
বাইরে কুয়াশা আরও ঘন হচ্ছে। তিন ভাইবোনের এই ছোট্ট জগতটা যেন এক পরম শান্তির দ্বীপ। কামিনী আর কাসিফ কখন ঘুমিয়ে পড়েছে আয়না জানে না। সে শুধু তাদের নিশ্বাসের শব্দ আর ছোট হাতগুলোর উষ্ণতা অনুভব করতে লাগল। এই মায়ার শিকড় ছিঁড়ে ফেলা কি আদৌ সম্ভব!
—————
ভোররাতের নিশিখালি। আকাশে সূর্যের দেখা মেলেনি এখনো। চারপাশ নিস্তব্ধ। মাহির জ্যাকেটের ওপর শাল জড়িয়ে উঠানে ধীরপায়ে পায়চারি করছে। হাতে তার ফোন, ওপাশের মানুষটার সাথে বেশ নিচু স্বরে কথা বলছে সে।
ফোনের ওপাশ থেকে এক চড়া হাসির শব্দ শোনা গেল। মাহিরের বন্ধু শাকিল, পেশায় সাংবাদিক।
শাকিল যেন নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারছে না। সে অবাক হয়ে বলল, মাহির! তুই শেষ পর্যন্ত বিয়ে করে ফেললি? তাও আবার হুট করে গ্রামে গিয়ে? ইয়ার্কি করছিস না তো?
মাহির শান্ত গলায় বলল, পরিস্থিতি এমন ছিল যে করার কিছু ছিল না শাকিল। বিয়েটা হয়ে গেছে।
শাকিল বিরক্তির স্বরে বলল, তুই কি কোনোদিন বদলাবি না মাহির? তোর এই 'না' বলতে না পারার ক্ষমতা তোকে একদিন বড় বিপদে ফেলবে। ব্যাটা মানুষকে আবার ধরেবেঁধে বিয়ে দেওয়া যায় নাকি! তোর এই অতিরিক্ত পরোপকার আর মানুষের ঝামেলা নিজের ঘাড়ে নেওয়ার স্বভাব তোকে আরও ভোগাবে দেখিস!
মাহির কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। শাকিল যা বলছে তা ভুল নয়, কিন্তু এই মুহূর্তে মাহিরের মাথায় অন্য কিছু ঘুরছে। শাকিল তার বন্ধুকে চেনে। মাহিরের এই রহস্যময় নীরবতা দেখে সে গলা নামিয়ে জিজ্ঞেস করল, তুই কি শুধু এই খবর দেওয়ার জন্যই আমাকে ফোন করেছিস? নাকি কিছু লাগবে তোর?
মাহির এবার আসল উদ্দেশ্যে এল। তার গলার স্বর আগের চেয়েও শীতল। সে বলল,
তোকে একটা বড় স্টোরি দিচ্ছি। এই নিশিখালি গ্রামে আফজাল মেম্বার নামে একজন লোক আছে। গ্রামের মানুষের নাভিশ্বাস তুলে ফেলেছে সে। ক্ষমতার দাপট আর অনৈতিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে সে এখানে একটা ছোটখাটো সাম্রাজ্য বানিয়ে ফেলেছে। মানুষের জমি দখল থেকে শুরু করে সরকারি অনুদান আত্মসাৎ সবকিছুতে তার হাত আছে।
শাকিল সতর্ক হয়ে উঠল। পেশাগত কৌতূহল থেকে জিজ্ঞেস করল, লিড কেমন আছে তোর কাছে?
মাহির অন্ধকার উঠানটার দিকে তাকিয়ে বলল, পর্যাপ্ত। স্থানীয়দের সাথে বিস্তারিত আলাপ হয়েছে।
-তুই দু'দিনে এত সব জেনে ফেললি!
-তুই যদি তোর ক্যামেরা নিয়ে আসিস, তবে তোর ক্যারিয়ারের সেরা ইনভেস্টিগেটিভ রিপোর্টগুলোর একটা হতে পারে এটা। গ্রামের সাধারণ মানুষ ওর অত্যাচারে অতিষ্ঠ, কিন্তু সাহস করে কেউ মুখ খোলে না। তুই আসলে এমনকি মেম্বারের বিরোধী পক্ষও তোকে সব ধরণের তথ্য দিয়ে সাহায্য করবে। আমি চাই এই লোকটার মুখোশ যেন শুধু দশ গ্রামের মানুষ না, সারা দেশের সামনে খুলে যায়।
শাকিল খানিকক্ষণ ভেবে হাসল। মাহিরের ভেতরের সেই দাহটা সে বুঝতে পারছে। শাকিল বলল, তার মানে তুই আফজাল মেম্বারকে ছাড়ছিস না? ওই পরিস্থিতির শোধ নিচ্ছিস তাহলে?
মাহির সরাসরি উত্তর দিল না। তবে তার চোয়াল শক্ত হয়ে এল। সে শুধু বলল, বাট আই নিড রফিক সরকার আনহার্মড।
-শ্বশুরের প্রতি দেখি অলরেডি দরদ জমেছে! ওয়েট, নাকি সেটা শ্বশুরের মেয়ের বদৌলতে?
-তুই কবে আসতে পারবি সেটা জানা। আফজাল মেম্বারের পতনটা যেন এই নিশিখালি থেকেই শুরু হয়।
-তুই ঢাকা আসবি কবে?
-আজ রওনা হব। আমি যাওয়ার পরপরই তুই এসে কাজ শুরু করে দিস।
ফোনটা রাখার পর মাহির আকাশের দিকে তাকাল। কুয়াশার আড়াল থেকে দিনের প্রথম আলো আসার চেষ্টা করছে। আফজাল মেম্বার ভেবেছিল মাহিরকে একটা দায়বদ্ধতার শিকলে বেঁধে সে পার পেয়ে যাবে। কিন্তু সে জানত না, মাহির আহমেদ শান্ত থাকতে জানে, কিন্তু অপমান হজম করতে জানে না। বিয়ের আসরে যে আধিপত্য আফজাল মেম্বার দেখিয়েছিলেন, তার চরম মূল্য তাকে দিতেই হবে।
মাহির ধীরপায়ে ঘরের দিকে পা বাড়াল। মূল দরজার কাছেই রফিক সরকার দাঁড়িয়ে আছেন।
—————
মাহির ঘরে ফিরল। দেখল আয়না ব্যাগ গুছিয়ে তৈরি হয়ে আছে। বাইরের কোলাহল এখনো শুরু হয়নি, ঘরটা এক অদ্ভুত গাম্ভীর্যে থমথমে। সকাল থেকেই আয়নার শরীরটা কিছুটা গরম, এ নিয়ে কুলসুম বেগম বেশ চিন্তিত।
মাহিরকে দেখে আয়না হাত থামাল। কোনো ভূমিকা না করেই বলল, তোমার সাথে কথা বলছিলেন দেখলাম। কী বললেন?
মাহির ভণিতা না করে বলল, তোমার বাবা আমাকে কী বলেছেন তা তোমাকে বলব কেন?
আয়না চমকে বলল, বলবে না!
-মোটেও না। আই শ্যুড হ্যাভ সাম সিক্রেটস টু!
-তুমি জানো রফিক সরকার আসলে কেমন মানুষ?
মাহির খাটের এক কোণে বসল। আয়নার চোখে তীক্ষ্ণ বিশ্লেষণ। সে বলে চলল,
তিনি একজন কন্ট্রোল ফ্রিক মানুষ। তিনি তাদেরই ভালোবাসেন যারা তার অনুগত, যারা তাকে যমের মতো ভয় পায়। তাদের জন্য তিনি জীবন দিয়ে দিতে পারেন। কিন্তু যদি কেউ তাকে প্রশ্ন করে বা তার অবাধ্য হয়, তবে মুহূর্তেই সে তার চিরশত্রু হয়ে যায়।
মাহির শান্তভাবে জিজ্ঞেস করল, হঠাৎ এক কথা বলছ কেন?
আয়না একটু হাসল। বলল,
আমার একটা পর্যবেক্ষণ আছে। আমার মনে হয় তিনি প্রথম দেখাতেই তোমাকে আমার চেয়েও বেশি পছন্দ করতে চেয়েছিলেন।
মাহির অবাক হয়ে ভ্রু কুঁচকাল। বলল, কেন? এমনটা মনে হওয়ার তো কোনোই কারণ দেখছি না।
আয়না সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে মাহিরের চোখের দিকে তাকাল। সে বলল, কারণ তিনি বিয়েটাকে আমার ওপর কর্তৃত্ব করার একটা অস্ত্র হিসেবে দেখেছিলেন। তিনি এমন কাউকে চেয়েছিলেন যে আমাকে ভেঙে চুরমার করবে, আমাকে তার বশ্যতা স্বীকার করতে বাধ্য করবে। রাজিব হয়তো তেমনই একজন ছিল, অথবা আব্বা তাকে সেভাবেই গড়ে নিতেন। কিন্তু তোমাকে দেখার পর তিনি ভেবেছিলেন তুমিও হয়তো সেই প্রথাগত, সাধারণ ঘরানার কোনো একজন যাকে তিনি নিজের ছত্রছায়ায় রেখে নিয়ন্ত্রণ করতে পারবেন।
আয়না এক পা এগিয়ে এসে মাহিরের কাছাকাছি দাঁড়াল। সে অবলীলায় বলে চলল,
কিন্তু তুমি তাকে ভুল প্রমাণ করেছো। তুমি তার ছায়া চাওনি, তার নিরাপত্তা চাওনি, এমনকি তার টাকা বা প্রতিপত্তিকেও তুমি ভিক্ষা মনে করে প্রত্যাখ্যান করেছো। তুমি যে তার নিয়ন্ত্রণের বাইরে, এই সত্যটা আব্বা এখনো হজম করতে পারছেন না। তুমি তার সেই সাজানো ছকটা নষ্ট করে দিয়েছো মাহির আহমেদ।
মাহির কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে রইল। আয়নার কথাগুলো তার কানে সীসার মতো বিঁধল। রফিক সরকারের সেই অদ্ভুত ব্যবহার আর জেদের পেছনের মনস্তত্ত্বটা এখন তার কাছে পরিষ্কার।
আয়না আবার প্যাকিংয়ে মন দিল। আফজাল মেম্বার তাদের জন্য প্রাইভেট কার ভাড়া করে রেখেছে। মাহির স্পষ্ট বলল, না, গাড়িতে যাব না। বাসে যেতে তোমার আপত্তি আছে?
আয়না কিছুক্ষণ ভেবে বলল, জানালার পাশের সিট দিলে নেই।
মাহির বলল, তথাস্তু।
—————
নিশিখালি গ্রাম পেছনে ফেলে বাস যখন হাইওয়েতে উঠল, তখন বেশ ভালো রোদ উঠেছে। বাসের জানালার পাশে আয়না বসেছে, তার পাশে মাহির। দীর্ঘ যাত্রায় দু'জনেই অনেকটা নীরব।
জানালার বাইরে দিগন্তজোড়া সবুজ ধানক্ষেত, সরষে ফুলের হলুদ আভা আর দ্রুতবেগে ছুটে চলা গাছপালাগুলো আয়নার চোখে ঘোর তৈরি করছে।
বাসের মৃদু ঝাঁকুনিতে আয়নার শরীর ক্লান্তিতে ভেঙে আসছে।
এক পর্যায়ে বাসটি একটি হাইওয়ে রেস্টুরেন্টে থামল। দশ মিনিটের বিরতি। আয়না আর মাহির বাস থেকে নেমে হাত-মুখ ধুয়ে নিল। রাস্তার পাশের টং দোকানে ধোঁয়া ওঠা লাল চা। মাহির মগটা এগিয়ে দিয়ে বলল, এই চা খেলে ক্লান্তিটা একটু কমবে। আর কিছু আনব?
-না।
-ওষুধ খেয়েছিলে তো?
-হুম।
আয়না চায়ে চুমুক দিয়ে চারপাশটা দেখল। অপরিচিত মানুষের ভিড়, হকারদের হাঁকডাক সব মিলিয়ে একটা অস্থির পরিবেশ।
সে বলল, আর কতদূর?
-আরও ৬-৭ ঘণ্টা তো মিনিমাম।
মাহির শান্তভাবে নিজের চা শেষ করল। তারা দুজন খুব বেশি কথা বলল না, শুধু একবার মাহির জিজ্ঞেস করল, তোমার খারাপ লাগছে না তো?
আয়না মাথা নেড়ে জানাল, না।
আবার যাত্রা শুরু হলো। তবে কিন্তু কিছুদূর যেতেই বিপত্তি। কয়েক কিলোমিটার দীর্ঘ যানজট। রাস্তা বন্ধ করে কারা যেন আন্দোলন করছে, পুলিশ এসেও কোনো সুবিধা করতে পারছে না। চার লেনের রাস্তা যেন একটা নিশ্চল পার্কিং লট হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
বাসের ভেতরে ভ্যাপসা গরম আর মানুষের বিরক্তি বাড়ছে। দুই-তিন ঘণ্টা কেটে গেল একই জায়গায়। আয়না এক সময় জানালার ফ্রেমে মাথা রেখে ঘুমিয়ে পড়ল।
দীর্ঘ ঘুম শেষে আয়না যখন জাগল, তখন তার গলাটা শুকিয়ে কাঠ হয়ে আছে। সে কয়েকবার খুকখুক করে কাশল। শরীরটা বড্ড দুর্বল লাগছে। পাশে তাকিয়ে দেখল মাহির বাসের সিটে মাথা দিয়ে ঝিমোচ্ছে। আয়না অস্ফুট স্বরে বলল, আমাদের পানি আছে?
মাহির হাত বাড়িয়ে ব্যাগের ভেতরটা খুঁজল। তারপর হতাশ হয়ে বলল, না তো, পানির বোতলটা সেই রেস্টুরেন্টেই ফেলে এসেছি বোধহয়।
আয়না বলল, আচ্ছা থাক, সমস্যা নেই। জ্যাম ছাড়লে দেখা যাবে।
সে আবার চোখ বুজল। ক্লান্তিতে শরীরটা এলিয়ে পড়ল সিটের ওপর। জ্যামের মাঝেই বাসটি আবার একটি জায়গায় মিনিট পাঁচেকের জন্য থামল।
সম্ভবত যাত্রীদের জন্য ছোট একটা বিরতি দেওয়া হয়েছে। আধোঘুমে আয়না টের পেল মাহির তাকে ওয়াশরুমে যাবে কি না জিজ্ঞেস করছে। আয়না মানা করতেই সে সিট ছেড়ে উঠল। আয়না ভাবল মাহির হয়তো একটু হাত-পা সোজা করতে নিচে নামছে।
আরও কতক্ষণ কেটে গেছে আয়না জানে না। হঠাৎ এক তীব্র ঝাঁকুনিতে তার ঘুম ভেঙে গেল। সে চোখ মেলে দেখল জ্যাম কেটে গেছে, বাস এখন ঝড়ের বেগে ছুটে চলছে।
আয়না স্বাভাবিক হতে একটু সময় নিল। গলার তৃষ্ণাটা এখনো আছে। সে পাশে তাকাল পানি চাইতে। কিন্তু তার পাশের সিটটা একদম শূন্য! মাহির নেই।
প্রথমে সে ভাবল হয়তো মাহির অন্য কোনো পরিচিত যাত্রীর সাথে কথা বলছে। সে ঘাড় ঘুরিয়ে বাসের ভেতরটা ভালো করে দেখল। কিন্তু কোথাও মাহিরের দেখা নেই। আয়নার বুকের ভেতরটা হঠাৎ ধক করে উঠল। সে পাশের যাত্রীকে জিজ্ঞেস করল, আমার পাশে যিনি ছিলেন তাকে দেখেছেন?
সহযাত্রী অবাক হয়ে বলল, আরে! উনি তো সেই যে বিরতির সময় নামলেন, আর তো উঠতে দেখলাম না। বাস তো সেই কখন টান দিয়েছে।
আয়নার শরীর হিম হয়ে এল। তার মানে মাহির নিচে নেমেছিল কোনো প্রয়োজনে, আর এরই মাঝে জ্যাম ছেড়ে বাস চলে এসেছে। নাকি সে ইচ্ছে করেই বাসে ওঠেনি! মাহিরকে ছাড়াই বাস এখন ঢাকার পথে দৌড়াচ্ছে। বাসের কনডাক্টর বলল,
কী যে করেন আপনারা! দেন আপা, একটা কল দেন উনারে।
আয়না নিচু স্বরে বলল, নম্বর তো নেই।
আয়না জানালার বাইরে তাকাল। মাইলের পর মাইল শুধু ফাঁকা রাস্তা। তার গলার তৃষ্ণাটা এবার আতঙ্কে রূপ নিল।
·
·
·
চলবে……………………………………………………