‘ফাগুনেরও মোহনায়,
মন মাতানো মহুয়ায়,
রঙ্গীন এ বিহুর নেশা,
কোন আকাশে নিয়ে যায়।
ফাগুনেরও মহুয়ায়…’
মায়ের নীল রঙা শাড়িটি অঙ্গে পেঁচিয়েছে কিশোরী। প্রসাধনী বিনাও গোলগাল মুখটা থেকে চোখ ফেরানো দায়। ঘুঙুর পায়ে গানের তালে তালে নিজেকে সাজায় সে। ঠোঁটে ঈষৎ হাসির দেখা মিললো কি?”
অরুণিতা সরকারকে সচরাচর হাসতে দেখা যায় না। তাঁকে হাসতে দেখা সাপের সাত পা দেখার মতো। কিন্তু যখন সে নাচের মুদ্রা ফোঁটায় তখন তাঁর সুশ্রী মুখে আলাদা দ্যুতি ছড়িয়ে পড়ে। তাঁর আকুতি ভরা ছোট ছোট চোখ দু'টো হাসে। আজও ব্যতিক্রম নয়। পাতা মেয়ের দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসলো। রূপক আর অরুণিতা যুগলবন্দী হয়ে গানের তালে তালে নাচছে। সে দরজা ঠেলে ভেতরে প্রবেশ করে ট্রে হাতে। তাঁকে দেখেই রূপক নাচ থামিয়ে উচ্ছ্বসিত বদনে বলল,
“আ’মা তোমার বদরাগী মেয়ে আমাকেও ডান্স শিখিয়ে দিলো। দেখেছো কত সুন্দর করে নাচছিলাম আমি? দাঁড়াও আমি ক্যামেরা অন রেখেছিলাম। তোমাকে ভিডিও দেখাই।”
রূপক ফোনটা এনে পাতাকে ভিডিও দেখায়। পাতা মুচকি হেসে বলল, “ভালোই তো। এখন পাস্তা খা দু’জনে।”
রূপক দেরি করে না। একটা বাটি তুলে টেবিলের উপর বসে খাওয়া শুরু করে দেয়।
“সস আনো নি?”
“প্রহর আনছে।”
অরুণিতা গান বন্ধ করে কাউচে বসে। পাতা এগিয়ে এসে মেয়ের খোলা চুল গুলো বেঁধে দেয়। মাথায় হাত রেখে বলে, “কি মিষ্টি লাগছে রে তোকে! মাশাআল্লাহ মাশাআল্লাহ। কারো নজর না লাগুক। একদম বউ বউ। আম্মু, আমার ফোনে কয়েকটি ছবি তুলিস তো। তোর পাপাকে দেখাবো।”
অরুণিতা কিছু বললো না। গম্ভীর মুখে ঘুঙুর খুলে রাখলো। পাতা মেয়ের ফোলা গাল দিয়ে টেনে বলল,
“আম্মু, তোর মন খারাপ?”
গাল টানাটানিতে বিরক্ত বোধ করে অরুণিতা। বিমর্ষ মুখে বলল, “না।”
“মন খারাপ করাও উচিত না। তুই চিল থাক। তোর পাপা আছে তো সব চিন্তার পাহাড় নিজ মাথায় রাখার জন্য।”
পাতা হেসে বলল। পাস্তার বাটি এনে মেয়ের হাতে দেয়। অরুণিতা হাতে নিয়ে গুরুগম্ভীর গলায় শুধালো, “ওঁরা কি সত্যিই ব্রো’র নামে কেস করেছে?”
“তোকে কে বলল?”
“প্রশ্ন করলে উত্তর দিতে হয়; পাল্টা প্রশ্ন করতে হয় না। যেটা জিজ্ঞাসা করলাম সেটার জবাব দাও।”
পাতা নাক মুখ কুঁচকে নেয়। এই মেয়ে কথা বললেই নাক উঁচু ম্যানারলেস লোকটার গন্ধ পাওয়া যায়। পুরাই কাঠখোট্টা গোছের, এককথায় ম্যানার্সলেস। সে উত্তর দিলো না। অরুণিতাও দ্বিতীয়বার শুধালো না। এটা তাঁর বৈশিষ্ট্যের কাতারে পড়ে না। সে পাস্তা খায়। সস ছাড়া ঘাস ঘাস লাগে। এরমধ্যেই প্রহরকে সস হাতে আসতে দেখা যায়। রূপক তাকে দেখেই ডাকলো,
“ওলাফ, সসের বোতল দে?”
প্রহর মাথা নেড়ে মিষ্টি হেসে বললো,
“আপুনি আগে তারপর তুমি।”
"ফুটবল খেলতে নিয়ে যাবো না তোকে। আজ বিরাট ম্যাচ আছে বুঝলি?”
রূপক লোভ দেখায় কিন্তু প্রহর লোভী না। সে বোনের কাছে সস নিয়ে যায়। মিষ্টি হেসে বলল, “আপুনি, আমি দিচ্ছি কেমন?”
বলেই সসের ঢাকনা দাঁত দিয়ে কামড়ে খুলে ফেললো। সস পড়তে দেরি হয় বিধায় ঝাঁকায়। দূর্ঘটনা তখনই ঘটলো। সস ছিটকে অরুণিতার চোখে, মুখে ও গায়ে লাগে। প্রহর ভীতু চিত্তে বলল,
“স্যরি আপুনি। বেরুচ্ছিল না তাই…”
পাতা আঁচল দিয়ে মেয়ের চোখ মুছে দিতে চায়। অরুণিতা বাঁধা দেয়। পাস্তার বাটি মেঝেতে আঁছড়ে ফেলে। পাস্তা ফ্লোরে মাখামাখি। কড়ির প্লেট ভেঙ্গে চুরমার। প্রহরের হাত থেকে সস ছিনিয়ে ফিক্কে মারে অরুণিতা। বাজখাঁই গলায় ধমক দেয়, “ ডিড আই টোল্ড ইয়্যু টু অ্যাড দ্য সস? দেন হুয়াই ডিড ইয়্যু ওভারডু ইট?”
প্রহর ভয়ে মায়ের পেছনে লুকিয়ে যায়। পাতা মেয়েকে চোখ রাঙায়, “IELTS স্কোর ৮ বলে কথায় কথায় ইংরেজি ঝাড়া বন্ধ করো। আর এক্সিডেন্টলি হয়ে গেছে। তাই বলে এভাবে ধমকাবে? হাউ রুড ইয়্যু আর অরু! ভালোবেসে ঢেলে দিতে চেয়েছিল কিন্তু তোমার মতো খাড়ুশ কি আর ভালোবাসা বুঝবে? আর খাবার ফেললে কেন? বাপের রাজার ধন আছে বলে খাবারের মূল্য বোঝো না, না? ঘর থেকে বেরিয়ে দেখ হাজারো মানুষ অনাহারে দিন কাটাচ্ছে আর তুমি উপড়া উপড়া পাও বলে ফেলার সাহস দেখালে। খাবার নষ্ট করলে তো খাবারের অভাব পড়বে না, তাই না? ওকে আজ রাতের খাবার বন্ধ তোমার।”
অরুণিতা হনহনিয়ে চলে যায়। চোখ জ্বলছে, সাথে রাগে মাথা পুড়ছে। পাতা বিরক্ত মুখে মেয়ের প্রস্থান দেখে। এই মেয়ে কবে সুধরাবে? বাপে অতি লাট দিয়ে বিগড়েছে।
“আমি সত্যিই অনেক স্যরি, মাম্মাম।”
প্রহর কাঁদো কাঁদো মুখে বলল। পাতা ছেলেকে কোলে তুলে নেয়। গাল চেপে চুমু দেয়। প্রহরের কালো মুখখটার পরিবর্তন হয় না। তাঁর জন্য আপুনি কষ্ট পেলো। আপুনিকে আবারও স্যরি বলতে হবে।
—————
অরুণাভ উদাসী ভঙ্গিতে বাড়ির আঙিনায় মরিচা ধরা দোলনায় বসে আছে। হাতে সে-ই প্লাটিনামের রিং। ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখে সে। এটা তার পছন্দের কাজের মধ্যে একটি। দূর হতে কারো আগমন বার্তা টের পেতেই সন্তর্পণে রিং লুকিয়ে নেয়।
“এ্যাই ভোর দা বোর বয়! একা একা এখানে কি করছিস?”
দূর হতেই চেঁচিয়ে উঠলো আনিকা। অরুণাভ শুনেও না শোনার ভান করে বসে রইলো। সেন্টার ফ্রুট মুখে পুরে চিবোতে লাগলো। আনিকা সাড়া না পেয়ে নিজেই এগিয়ে আসে। শুরুতেই পিঠে কিল বসিয়ে দেয়। অরুণাভ কিছু বললো না। আনিকা কপালে ভাঁজ ফেলে বলল,
“কি হয়েছে রে? হুতুম পেঁচার মতো মুখ বানিয়ে আছিস কেন?”
অরুণাভ জবাব দেয় না। মুখটা বিষন্ন বানিয়ে রাখে। আনিকা ধপাস করে পাশে বসে। তাঁর আশেপাশে বয়ে বেড়ানো দমকা হাওয়া বেশ ফুরফুরে মেজাজে। লিপস্টিক রাঙা ঠোঁট থেকে হাসি সরছেই না। সে খানিকটা লাজুক হেসে বলল,
“তোর সাথে কথা আছে বুঝলি? দারুন কিছু ঘটে গেছে!”
অরুণাভের বিষন্ন মুখটায় কৌতুহল। মনে পড়ে আনিকা ওই কৈতরের বাচ্চার সাথে দেখা করতে গিয়েছিল। এখন কত বাজে ঘড়িতে? আড়াইটার মতোন। সেই ভোরবেলায় বেরিয়েছিল, এখন ফিরছে। ছাই চাঁপা আগুন দাউদাউ করে জ্বলে ওঠে মন বাগিচায়। দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
“কি অঘটন ঘটেছে? কৈতরকে মনে ধরেছে নাকি আবার?”
আনিকা অরুণাভের মুখের দিকে ফেরে না। ফিরলে দেখতে পেতো মুখটায় রক্তজবার মতো হয়ে এসেছে। কপালে নীল শিরা উপশিরা দৃশ্যমান। আনিকা বুঝতে পারে কৈতর কাকে বলা হচ্ছে তবুও শুধায়,
“কৈতর কে রে?”
অরুণাভ চুপ থাকলো। আনিকা বলল, “সে বাদ দে। তুই কি জানতিস আজ আমি তৈমুর নেওয়াজের সাথে দেখা করতে গিয়েছিলাম?”
“সে জানি কিন্তু ভাগ্য আজ তোর ফেবারে ছিল।”
আনিকা বুঝলো না তাঁর কথার মানে। অরুণাভ জানতে চাইলো, “তো কেমন ছিলো ফার্স্ট মিটিং? পছন্দ হয়েছে গাধাটাকে?”
আনিকা মুচকি হেসে বলল, “খারাপ না।”
অরুণাভে গায়ে কেউ বুঝি বিচুটি পাতা ঘঁষে দিলো। আনিকা উৎসাহের সাথে বলল, “লোকটা অনেক ধৈর্য্যশীল। আমি এতো বিরক্ত করেছি তবুও মুচকি হেসে আমাকে এনকারেজ করে গেছে। একটু ব্যাকডেটেড হলেও চমৎকার মাইন্ডের। আর আমার সবচেয়ে ভালো লেগেছে হি রেসপেক্ট ওমেন। ওনার আচরণ গুলো চোখে ধরা পড়ার মতো। খুবই সাবলীল চলাফেরা আর নিতান্তই ভদ্রলোক।”
“একটু বেশি হয়ে যাচ্ছে না?”
“মানে?”
“মানে প্রথম মিটিংয়ে তুই আহাম্মকটার প্রশংসায় ভাসছিস। তুই গাধি জানতাম, কিন্তু গাধি জাতের সর্দার সে তো জানতাম না। ওই গাধা তোকে উল্লু বানিয়েছে। বেশি সাধু গিরি দেখানো মোটেই ভালো লক্ষণ না। আর ও তোকে ইমপ্রেস করার জন্য নিজেকে প্রস্তুত করেই এসেছে। সব চাল রে চাল। তোকে ফাঁদে ফেলার চাল ছিলো ওটা। আর তুই ফেসে গেছিস। মাথায় তো গোবরও নেই, পুরাই ফাঁকা।”
আনিকা ফুঁসে ওঠে। বেঞ্চ ছেড়ে অরুণাভের সামনে দাঁড়িয়ে যায়। রাগত স্বরে বলল, “আমি কিন্তু রেগে যাচ্ছি?”
“হুউ কেয়ার’স।”
ভাবলেশহীন ভাবে বলে অরুণাভ। আনিকা দাঁত কটমট করে বলল, “তুই জনিস তুই কতটা বিরক্তিকর মানুষ?”
“হ্যাঁ জানি।”
“তুই কি রেগে যাচ্ছিস?”
“আমি কেন রাগবো?”
“তোকে দেখে মনে হচ্ছে রেগে আছিস।”
“তাহলে রেগে আছি।”
“কেন রেগে আছিস?”
“আমি রেগে আছি সেটা যেহেতু বুঝতে পেরেছিস তাহলে এটাও বুঝে নে, কেন রেগে আছি।”
“আমার কিসের ঠ্যাকা?”
“তাহলে চুপ থাক। আর দূর হ চোখের সামনে থেকে।”
“সরবো না, কি করবি?”
“থাপড়ে গাল লাল করে দিবো।”
“হাত আমারও আছে।”
অরুণাভ উঠে দাঁড়ালো। ঠাস করে চড় মেরে দিলো গালে। বেশ জোরেই পড়ে চড়টা। আনিকা গালে হাত ধরে দাঁড়িয়ে। সে এখনো বিশ্বাস করতে পারছে না, চড়টা সত্যিই পড়েছে।
“এখন তোর হাত দেখা?”
অরুণাভের রাগ এখনো কমেনি। আনিকা গালে হাত রেখে স্বাভাবিকভাবেই বলল, “তোকে আমার একটুখানিও সহ্য হয় না।”
অরুণাভ রাগে মন্ত্রঃপুত ঘি ঢেলে দেয় বাক্যটি। আনিকার কাঁধ ঠেলে ধাক্কা দিয়ে চেঁচিয়ে বলে ওঠে, “তো যা কৈতরের কাছে। তাঁকে তো খুউব সহ্য হয়।”
আনিকা দুই কদম পিছিয়ে যায়। নিজেকে সামলে নিয়ে বলে, “চিল্লাচ্ছিস কেন তুই? আর তুই না বললেও আমি তৈমুরের কাছেই যাবো। শুনছিস তুই? এতো ভাব ভালো না। একদিন মুখ থুবড়ে পড়বি। পড়বি তো পড়বি আর ওঠার মতো অবস্থা থাকবে না।”
আকস্মিক অরুণাভের বিড়াল চোখে জলকনা জমতে চায়। সে অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে নিয়ে কাটকাট সুরে বলে, “আমাকে নিয়ে তোকে ভাবতে হবে না।”
“তোকে কে বলেছে আমি তোকে নিয়ে ভাবি?”
অরুণাভ আবারও আনিকার চোখে চোখ রাখে, “ভাবিস না?”
“কুকুরে কামড়ায় নি আমায় যে তোকে নিয়ে ভাববো।”
“তো কাকে নিয়ে ভাবিস? কৈতর নাকি তোর হোম টিউটর সুফিয়ানকে নিয়ে? কিংবা ওই সিনিয়র তমাল।”
“যাকে নিয়েই ভাবি সেটা তোর দেখার বিষয় না।”
“অবশ্যই আমার বিষয়।”
আনিকা থমকালো। মিনিটেরর মাঝে নিজেকে সামলে বলল, “কেন, তোর বিষয় কেন?”
অরুণাভের একহাত প্যান্টের পকেটে। হাতের আঙুলে রিং ঘুরছে। কথারা শ্বাসনালী বরাবর কুন্ডলী পাকিয়ে স্বররজ্জু বরাবর আসলেও পরিস্ফুটিত হতে পারে না। প্রত্যাখ্যাত হওয়ার ভয় হয়। সে আবারও রাগ দেখায়,
“আমার বিষয় কারণ আমি তোকে মোটেও পছন্দ করি না।”
“তোর পছন্দ করা, না করা নিয়ে আনিকা সরকারের কিছু যায় আসে না। তাঁকে পছন্দ করার লোকের অভাব নেই।”
আনিকা অরুণাভের চেয়ে দ্বিগুণ ঝাঁঝালো গলায় বলল। অরুণাভ চোখ পাকিয়ে বলল, “একদম তেজ দেখাবি না।”
আনিকা এককদম এগিয়ে এসে মাথা উঁচিয়ে বলল, “একশবার দেখাবো। কি করবি?”
“ওই পুকুরে চুবিয়ে ধরবো।”
“আম্মু তোকে এই কারণেই সহ্য করতে পারে না। তোর মাঝে ন্যূনতম ভদ্রতাবোধ নেই। তুই চরম মাত্রার অভদ্র। আম্মু ঠিকই বলে তুই বদরাগী, উগ্রমেজাজের বখে যাওয়া ছেলে।”
অরুণাভের শান্ত চোয়াল শক্ত হয়। আনিকা হাঁসফাঁস করে। কোমড়ে হাত রেখে আকাশের দিকে মাথা উঁচিয়ে হা হা করে শ্বাস নেয়। স্বাভাবিক হতেই খানিকটা নরম সুরে বলল,
“ভোর তুই এমন কেন? একটুও বোঝার চেষ্টা করিস না। মা এমনিতেই তোকে পছন্দ করে না। তার উপর আরো উল্টাপাল্টা কাজ করে বেড়াস। নিত্যদিন নিত্য ফ্যাসাদ টেনে আনিস। এভাবে চললে মা তোকে কক্ষনোই পছন্দ করবে না।”
“কারো পছন্দ অপছন্দ দিয়ে আমার কিছু যায় আসে না। কারো জন্য ভালো সাজার নাটক আমার দ্বারা হবে না। আমি যেমন আমি তেমনই থাকবো। ইয়্যু’ল হ্যাভ টু অ্যাকসেপ্ট মি অ্যাজ আই এম।”
আনিকা চোখ উল্টিয়ে বিরক্ত প্রকাশ করে বলল, “তাহলে গু খা।”
অরুণাভ ভ্রু কুঁচকালো। আনিকা চলে যেতে নিয়েও কি মনে করেন ফিরে আসে। অরুণাভের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে বলল,
“অরুর স্কুলে আবার কার সাথে লাগলি? শুনলাম থানা কেস অবদি চলে গেছে ঘটনা। এরকম হলে তো তোর ক্রিকেট ক্যারিয়ার শুরু হওয়ার আগেই খতম হয়ে যাবে ভোর। তখন শেষ আশা টুকুও হারিয়ে যাবে।”
অরুণাভ ছোট ছোট চোখে বলল, “ক্যারিয়ার আমার চিন্তাও আমার। তুই ব্যস্ত কেন হচ্ছিস কুটনি বুড়ি?”
আনিকা ক্লান্ত বোধ করে চলে যায়। ধুপধাপ পা ফেলে কোনোমতে ঘর অবদি নিজেকে টেনে নিয়ে যায়। ধপাস করে বিছানায় শুইয়ে পড়ে। স্বস্তির শ্বাস টুকু নিতে পারে না, মায়ের ডাক শোনা যায়। আনিকা বিছানা ছাড়তে নিবে চুলে টান পড়ে। মাথায় হাত দিতেই চোখমুখ ফ্যাকাশে হয়ে যায়। চুল ছাড়িয়ে আয়নার সামনে দাঁড়ায়। দুঃখে কষ্টে চিৎকার করে কাঁদতে ইচ্ছে করে। চুলে সেন্টার ফ্রুট লেগে আছে। বুঝতে একটুও অসুবিধা হয় না কার কাজ! খচ্চর ছেলেটাকে আজ সে মেরেই ফেলবে!
অরুণাভ আবারও বেঞ্চে বসে। কি করবে বেচেইন মন ভেবে বের করতে পারে না। সব তো ঠিকই চলছিলো। হুট করে চাচিমনি আনিকার বিয়ে নিয়ে পড়লো কেন? উফ্ অসহ্য লাগছে সব।
“ভাউউ?”
অরুণাভ মুহুর্তের ব্যবধানে বিষন্ন মুখে হাসি ফুটিয়ে তুলে। পেছন ফিরে ভয় পাওয়ার ভান করে। ছোট্ট প্রহর পেট চেপে হেসে কুটিকুটি। হাসতে হাসতে কোটরে পানি জমেছে তার। অরুণাভ চোখ পাকিয়ে বলল,
“ভেরি ব্যাড বয়, ওলাফ। ভাইটুস তো ভয় পেয়ে গেলো।”
প্রহর হাসতে হাসতেই কান ধরে বলল, “ভেরি ভেরি স্যরি ভাইটুস।”
“স্যরি বলতে হবে না ওলাফ। বরং থ্যাংক ইয়ু সো মাচ ভাইটুসের মন ভালো করার জন্য।”
অরুণাভ প্রহরকে পাশে বসিয়ে দেয়। পরিপাটি চুল এলোমেলো করে দেয়, “আব্বু কি লাল টুকটুকে বউ এনে দিতে রাজি হলো?”
প্রহর বড় বড় চোখ বানায়, “না না আমার বউ চাই না। বউ খুব পঁচা জিনিস। ওরা বরদের রক্ত খায়।”
অরুণাভের কপালে ভাঁজ পড়লো, “এসব কে বলেছে?”
“পাপা বলেছে।”
“পাপা মিথ্যে বলেছে। বউ তো খুব ভালো হয়। সে তোমার সব কাজ করে দিবো। স্কুলের হোমওয়ার্ক থেকে শুরু করে, শুয়ের লেস বাঁধা। তোমার সাথে খেলবেও। বুঝলে?”
প্রহরকে চিন্তিত দেখলো, “ভাইটুস তোমার বউ নেই কেন তবে?”
অরুণাভ দুঃখি দুঃখি মুখ বানিয়ে বলল, “তোমার পাপা চায় না তাই। সে ভাবে এখনো তাঁর কলিজা এইটুকুন আছে। কিন্তু সেটা তো সত্যি না, তাই না?”
“আমি তাহলে পাপাকে বলবো ভাইটুসের জন্য সুন্দর একটা বউ আনতে।”
“সো সুইট ওফ ইয়্যু ওলাভ। ভাইটুস লাভস ইয়ু সো মাচ।”
অরুণাভ ঠোঁট চেপে হাসলো। প্রহরও হেসে বলল, “ওলাফ অলসো লাভ ইয়্যু ভাইটুস। ভাইটুস, একটু কাছে আসো না?”
অরুণাভ ঝুঁকে আসে। প্রহর তাঁর গালে চুমু দিলো। অরুণাভ হাসলো। ভাইকে কোলে নিয়ে সারা মুখে আদর করে। শক্ত করে জড়িয়ে ধরে বলল, “মায় লিটল ওলাফ, ভাইটুসের হ্যাপিনেস তুমি।”
—————
স্টাডি রুমে চিন্তিত মুখে বসে অরুণ সরকার। পাশেই আরিয়ান কালো ফ্রেমের চশমা পড়ে ল্যাপটপে টাইপ করে। চশমার উপর দিয়ে আড় চোখে ভাইয়ের দিকে চেয়ে বলল, “সোসাল মিডিয়ায় সিসিটিভি ফুটেজ ভাইরাল হয়েছে। এককথায় নেট দুনিয়ায় তোলপাড় চালাচ্ছে। পজিটিভের সাথে নেগেটিভ ইমপ্যাক্টও ফেলছে ভাই। আমি কেসটা হ্যান্ডেল করে নিবো কিন্তু ওর গায়ে যে মুজলিমের ট্যাগ লাগবে সেটা আর উঠবে না। তাই তুমি যদি বাদী পক্ষের সাথে সমঝোতা করে নাও তাহলে সব ঝামেলা চুকে যায়। ঠান্ডা মাথায় ভেবে দেখো নাহ হয়।”
অরুণ সরকার ভাবলো না। গুরুগম্ভীর গলায় বলল, “দোস টু সন্স অফ বি*চেস হ্যারাসড মাই গার্ল, অ্যান্ড ইয়্যু এক্সপেক্ট মি টু ক্রল টু দেম ফর আ সেটলমেন্ট? হাউ দ্য হে*ল ডিড দ্যাট থট ইভেন ক্রস ইয়্যুর মাইন্ড?”
“ডোন্ট গেট এংরি। আমাকে কি করতে হবে সেটা বলো?”
“ছেলে দু’টো সহ ওদের বাপের নামে কেস ফাইল কর।”
“ভাই, এতে তো অরুণিতার স্টেটমেন্ট লাগবে। ওকে নিয়ে কোর্ট কাচারি থানা পুলিশ না করলেই নয় কি?”
“কেসটা ওদের ভয় দেখানোর জন্য। যেন ওঁরা কেস তুলে নেয় আর আমাদের হাতেপায়ে পড়ে কেস উঠানোর জন্য। এরপরও বাড়াবাড়ি করলে অরুণ সরকার ওদের হাল বেহালের চেয়েও করুণ করে তুলবে।”
আরিয়ান খুক খুক করে কাঁশলো, “যাই বলো! ভোর ছেলে দুটোর অবস্থা নাজুক করে ছেড়েছে। মরতে মরতে বেঁচেছে কোনোরকম। কি রাগ তোমার ছেলের আল্লাহ! ভিডিও দেখে তো আমারই বুকটা ধ্বক করে উঠেছিল।”
অরুণ কিছু বললো না। তাঁর চিন্তা ভিন্ন জায়গায়। সামনের সপ্তাহে ছেলের বিপিএল শুরু। এরমধ্যে এতকিছু! আবার কোনো ঝামেলার উদয় না হয়।
রুবি কফি রাখে টেবিলের উপর। অরুণ ধোঁয়া ওড়ানো মগ তুলে চুমুক বসায়। রুবি আরিয়ানের পাশের চেয়ারে বসে বলল, “ভোরের এঙ্গার ইস্যু মারাত্মক। আমি বললে আপনাদের ভালো নাও লাগতে পারে বাট এরকম চলতে থাকলে একদিন বড় ঝামেলা ক্রিয়েট করবে। ছেলে দু’টো অপরাধ করেছে। কয়েকটা থাপ্পড় মেরে হুমকি ধামকি দিলে মানা যেতো। একেবারে আইসিইউতে! ভাবা যায়? অরুণিতা না থামালে মরে টরেও যেতে পারতো। হু নোজ? তখন কিরকম সিচুয়েশন ক্রিয়েট হতো!”
আরিয়ান ভাইয়ের দিকে তাকায়। অরুণ ভাবান্তর দেখালো না। রুবি হাসলো, “আনিকার সাথে ভোরের একদন্ডি পড়ে না। সবসময় খ্যাট খ্যাট লেগেই থাকে। এতো বড় হয়েছে তারপরেও মারামারি চুলোচুলি লেগেই থাকে। অথচ ভাইয়া আপনি ওদের দুজনকে একসাথে জুড়তে চাইছেন। ওদের বনিবনা হবে? আমি গ্যারান্টি দিতে পারি কক্ষনো হবে না। আর আপনি বলছেন রিস্ক নিতে? নেওয়ার পর বনিবনা হলো না তখন আমার মেয়েটার কি হবে? তাছাড়াও ভোরের যে মাত্রার এঙ্গার ইস্যু আমার মেয়েটাকে মেরে বস্তাবন্দি করে ফেলে আসবে।”
আরিয়ান রুবিকে চাঁপা স্বরে সাবধান করে। রুবি শোনে না। অরুণ রুবির চোখে চোখ রেখে বলল, “আমি প্রস্তাব দিয়েছিলাম আরিয়ানের কাছে। আরিয়ানের যুতসই লাগে নি তাই ও রিজেক্ট করেছে। আই এক্সেপ্ট দ্যাট। আমি দ্বিতীয়বার বলেছি এ ব্যাপারে? আর তোমার সাথে তো এ বিষয়ে আমার কথাই হয় নি। প্লিজ স্টপ দিস রুবি। আমার কলিজা ভালো না। ভালো কারো হাতেই মেয়েকে তুলে দাও। আমি দোয়াই দেব। এই বিষয়টাকে আর বাড়াবে না। আমি চাই না বাচ্চাদের মধ্যে এ বিষয়টি যাক।”
রুবি থমথমে মুখে সায় জানালো। অরুণ ভাইয়া তো কথা বাড়াবে না। কিন্তু ভোর? ছেলেটা যে মাত্রাতিরিক্ত ঘারত্যাড়া! অরুণ এক চুমুকে গরম কফি গলাধঃকরণ করে মগ রাখলো।
“যেহেতু তোমাদের দুজনেরই পছন্দ তাই তৈমুরের সাথে কথা আগাও। আনিকা পজিটিভ সাইন দিয়েছে?”
রুবির সাথে এ বিষয়ে কথা হয় নি আনিকার। আরিয়ান স্বস্তি ফিরে পায়। ভাইয়ের প্রস্তাব ফিরিয়ে দিতে তাঁর অনেক কাঠখড় পোড়াতে হয়েছে। রুবির মতো সেও চায় না ভোরের সাথে আনিকার কিছুমিছু হোক। তাঁর সমস্যা ভোর বা ভোরের উগ্রপনা স্বভাব নয়। তার সমস্যা চোক্ষুলজ্জা। ছোট বেলা থেকে ভাই-বোনের মতো বড় হয়েছে দু’জন। তাদের মধ্যে বৈবাহিক সম্পর্ক কেমন একটা বিদঘুটে লাগবে না? তাছাড়াও নতুন সম্পর্কের জের ধরে যদি পুরনো সম্পর্কে ফাটল ধরে? তখন সব সম্পর্কের ফাটল আবশ্যক হয়ে পড়বে। আর এটাও ফেলে দেওয়ার মতো না যে দুজনের চুলোচুলি সম্পর্ক। তাদের মধ্যে ভাব কিভাবে হবে?
অরুণাভ ভোর সরকার স্টাডি রুমের দরজায় দাঁড়িয়ে সবটাই শোনে। সে বাবার ডাকে এসেছিল। এসে এমন একটা ধাক্কা খাবে ভাবে নি। আব্বু তাঁর মনের খবর সম্পর্কে অবগত। তাই প্রস্তাব রেখেছিল। কিন্তু আব্বু প্রোপোজাল দেওয়ার পরও চাচ্চু প্রত্যাখ্যান করেছে। ব্যপারটা হজম করতে পারলো না। সে কি এতটাই অযোগ্য? এতোটাই খারাপ ছেলে?
অরুণাভ থমথমে মুখে নিজ ঘরে ফিরে আসে। ধরাম করে দরজা লাগিয়ে একটা ফ্লাওয়ার ভাস হাতে তুলে নেয়। ড্রেসিং টেবিলের ঝকঝকে আয়না চুরমার করে দেয় নিমিষেই। একে একে ঘরের সবকটা ফ্লাওয়ার ভাস আঁছড়ে ফেলে। পুরো ঘরময় ভাঙা কাঁচ, ফ্লাওয়ার ভাসের টুকরো ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে আছে। তাদের ভিড়ে তাজা ফুলেরা পিষে যাচ্ছে। অরুণাভ ফুলগুলোর দিকে রক্তচক্ষু নিক্ষেপ করে।
দরজা ধাক্কাধাক্কির পর্ব শুরু। অথচ অরুণাভের রাগ বিন্দুমাত্র কমে নি। উল্টো তরতরিয়ে বাড়ছে। ইচ্ছে করছে ঘরে সহ নিজ গায়ে কেরোসিন ঢেলে আগুন জ্বালিয়ে দিতে। বাবড়ি চুল টেনে ধরে বিড়বিড় করে,
“কাম ডাউন অরুণাভ কাম ডাইন। ডোন্ট গেট এংরি। এভরিথিং উইল বি ফাইন।”
দুইহাতে চোখ মুখ ডলে দরজা খুলে দেয়। মা’কে দেখে অরুণাভ হাসার চেষ্টা করে। পাতা ভেতরে ঢুকে। অগাধ বিস্ময় নিয়ে পুরো ঘর দেখে নেয়। ক্লান্ত স্বরে বলল,
“আবার কি হলো?”
পাতা শান্ত চোখে ছেলের জবাব শোনার অপেক্ষায় থাকে। চোখ দু’টো লাল হয়ে আছে। একটু ধ্যান দিলেই জলকণা ধরা যায়। পাতা উদ্বিগ্ন হয়ে বলল, “আব্বু, কি হয়েছে তোমার?”
অরুণাভ চোখের পানি লুকাতে বড় বড় করে তাকালো। চোখের মনি অস্থির। ম্লান হেসে বলল, “আমি খুব বাজে ছেলে তাই না আম্মু?”
“কে বলে? আমার ছেলের মতো ছেলে দু’টো আছে নাকি? কি হয়েছে বাচ্চা?”
অরুণাভ আবারও হাসলো। দুহাত বাড়িয়ে মা’কে জড়িয়ে ধরে। মাথায় ছোট চুমু দিয়ে সেথায় থুতনি ঠেকিয়ে নীরব থাকে কিছু পল। আশ্চর্য, একটু আগেও রাগে মাথা ফেটে যাচ্ছিল অথচ এখন সব ঠান্ডা। মায়েদের ছোঁয়ায় সত্যিই জাদু আছে। যে জাদু সমস্ত ভয়, দুঃখ, গ্লানি কঠিন থেকে কঠিনতর মুহূর্তকে আসান করে দেয়। সব সমস্যার একক সমাধান মিলে। সে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, “কিছু না আম্মু। আমি একটু বেরুবো। আমার ম্যাচ আছে। তুমি প্লিজ আব্বুকে ম্যানেজ করো। ইটস্ ইম্পোর্টেন্ট।”
পাতার চিন্তা বাড়লো বৈ কি। বাচ্চারা বড় কেন হয়? ছোট ভোরটি হলে কেঁদেকেটে সব উগড়ে দিতো। পাতা জোর করে না। ভোর এখন ছোট বাচ্চাটি নেই। বিশ বছরের যুবক যার রগে রগে রাগ। খুব দ্রুতই রেগে যায় ছেলেটা। নিশ্চয়ই সকালের ঘটনা নিয়ে এখনও রেগে আছে। তাছাড়াও সোসাল মিডিয়ায় ভাইরাল সিসিটিভি ফুটেজে নানান মানুষের নানান মন্তব্য। সে শান্ত বোঝানোর সুরে বলল,
“বাইরে যাওয়ার অনুমতি তো আমিও দিচ্ছি না। সকালের ঘটনার জেরে যদি কেউ তোমার পিছু লাগে? না বাবা না। তুমি বরং প্রহরকে নিয়ে ছাদে খেলো।”
অরুণাভ বিরোধীতা করে। মা’কে ছেড়ে গায়ে হুডি জড়িয়ে নেয়। স্পোর্টস ব্যাগ তুলে কাঁধে নেয়। মায়ের উদ্দেশ্যে ভুবন ভোলানো হাসি উপহার দিয়ে বললো,
“আম্মু তুমিও আব্বুর সুর গাইছো। আমি কি ছোট বাচ্চা নাকি? আর এভাবে কতদিন আটক রাখবে? আমি যাচ্ছি মানে এক্ষুনি যাচ্ছি। তুমি চিন্তা করিও না। তোমার ছেলের কিছুই হবে না। যাস্ট টেইক ইট ইজি।”
পাতা বারণ করে। অরুণাভ শোনে না। হনহনিয়ে বেরিয়ে যায়। পাতার ভয় হয়। সকালের ঘটনার জের ধরে যদি ছেলেটার পেছনে লোক লাগিয়ে দেয়? কোনো ক্ষতি করে? পাতা কাল বিলম্ব না অরুণ সরকারের কাছে ছুটে যায়।
—————
ঘাসে আচ্ছাদিত খোলা মাঠ দামড়া ছেলেদের দখলে। বাঁশের কুঞ্চিতে লাল হলুদ নীল নদকাপড়ের ত্রিকোনাকার পতাকা দিয়ে বাউন্ডারির দাগ কষা হয়েছে। বাউন্ডারির চতুর্দিকে উঠতি বয়সী ছেলেদের ভীড়। মাঝে মাঝে উল্লাসে ভাসে তাঁরা। জোরদার হাত তালি ও সিটির আওয়াজ শোনা যায়। মাইক হাতে উপস্থাপক হাস্যরসাত্মক ভঙ্গিতে খেলার বিবরণ দিচ্ছে। পরপর বল শূন্যে ভেসে বাউন্ডারি ক্রস করে দিচ্ছে। আর উপস্থাপক বলছে,
“এই তো বল আবারও বাউন্ডারির দিকে ছুটছে। ওহ্ মাই গড ওহ্ মাই গড। বাউন্ডারির কাছে তো রামিসা ভাবীর একমাত্র জামাই আমাদের বড় ভাই, মামুন ভাই দাঁড়িয়ে। বল তাঁর কাছে যাচ্ছে যাচ্ছে যাচ্ছে…. আরে আরে একি হলো! বল তো তাঁর কাছে ভিড়লো না। সোজা বাউন্ডারির বাইরে। নিশ্চয়ই রামিসা ভাবী কালাজাদু করেছে। ভাইয়ের কাছে কোনো রমনী তো দূর বল অবদি ঘেষতে পারবে না। যাইহোক অরুণাভ নামক কচি করে ছেলেটা আবারও ছক্কা হাঁকিয়েছে! কি খেলে মাঈরি! বলে বলে ছক্কা। জিও ছোট ভাই। তুমিই আমাদের লাইট। আর এই লাইট দেশের নাম উজ্জ্বল করবে।”
পত্রলেখা কাঁধে ঝোলানো ব্যাগ হতে পেন্সিল আর একটা খাতা বের করে। গোটা অক্ষরে কিছু লিখে পাশের মানুষটিকে দেখায়। মানব পত্রলেখার পত্রে চোখ বুলিয়ে নেয়।
‘রবিন ভাইয়া, আমি খেলা দেখবো।’
~পত্র
রবিন কাগজের পত্র থেকে চোখ সরিয়ে পত্রলেখার দিকে তাকিয়ে বলল, “নেভার। দেখেছো কত ছেলেমানুষ ওখানে? পাগল তুমি পত্র? এ্যাই মেয়ে কোথায় যাচ্ছো?”
পত্রলেখা রবিন কে ফেলেই গুটি গুটি পায়ে এগিয়ে যায়। রবিন তপ্ত শ্বাস ফেলে তাঁর পিছু ছোটে। হাত ধরে ভিড় ঠেলে সবার সামনে দাঁড় করিয়ে দেয়। এই মেয়েকে বোঝানোর সাধ্যি কার! এখানটায় বাচ্চাদের ভিড় তাই পত্রলেখা অযাচিত পুরুষ স্পর্শ হতে নিরাপদে। সে বলল,
“এবার হ্যাপি?”
হ্যাপিনেস পত্রলেখার মুখে দেখা গেল না। সে এক ধ্যানে মাঠের কেন্দ্রস্থল পিচের দিকে তাকিয়ে আছে। তেজস্বী রোদে ভ্রু কুঁচকে নিয়েছে। এই শীতেও নাকের ডগায় ঘাম ছুটেছে। মেয়েটা কি স্বামী সোহাগী হবে? রবিন লাজুক হেসে বলল, “পত্র, ঝালমুড়ি খাবে? আনবো?”
পত্রলেখা শুনলো না বোধকরি। রবিন চলে গেলেও তার মাঝে ভাবান্তর দেখা গেলো না। তাঁর কৌতুহলি দৃষ্টি এখনও বাইশ গজের পিচে স্থির।
ব্যাট আর পিচের শক্ত মাটির সংঘর্ষে ঠক ঠক ঠক শব্দ ধ্বনিত হয়। হেলমেটের ভেতরে একজোড়া প্রতিক্ষিয়মান চোখ বোলারের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করে। বল নিক্ষেপ করলে তা ব্যাট ছুঁয়ে আবারও ছক্কা হাঁকায়। ত্রিশোর্ধ্ব লোকটার মুখে নাখোশতা। তাঁর বলে ব্যাট করতে এলাকার ছেলেপুলে ভয়ে প্যান্ট ভিজিয়ে দেয়। আর এই দুদিনের ছোকরা ক্রমাগত ছক্কা, ফোর হাঁকাচ্ছে। এই টুটুল কোত্থেকে একে ধরে আনলো। সে টুটুলের দিকে তাকায়। ব্যাট হাতে টুটুল বোলারের পাশেই দাঁড়িয়ে। কলার উঁচিয়ে বলে,
“অরুণাভ ওলি-গলির খেলোয়াড় না বুঝলে বড় ভাই? খুব শিঘ্রই ন্যাশনাল টিমে দেশের হয়ে খেলবে। বিপিএলেও থাকছে। তুমি তো ওর ধারের কাছেও যেতে পারবে না। ব্যাট করার কেরামতি তো দেখলেই। বল করলে সেটাও দেখে নিও। ও বল করলে বল কোনদিক দিয়ে স্ট্যাম্প উড়িয়ে নিয়ে যাবে টেরই পাবে না।”
বন্ধুর জন্য গর্ববোধ করে টুটুল। এগিয়ে গিয়ে বন্ধুকে বুকে জড়িয়ে বাহবাও দেয়। বোলার আক্রোশে ফুঁসে পরবর্তী বল করার প্রস্তুতি নেয়। অনেকটা রাগ পুষেই বল নিক্ষেপ করে। অরুণাভ দাগ পেরিয়ে এগিয়ে আসে। ফুল টাস করে বল আবারও বাউন্ডারির দিকে নিক্ষেপ করে। এবার আর তেমন উঁচুতে উঠে নি। তবে স্ট্রেট শূন্যপথে বাউন্ডারির দিকেই ভাসছে। অফ সাইট হওয়ায় ক্যাচের চান্স নেই। তাই স্বস্তি ফিরে পায় অরুণাভ। কিন্তু তা দীর্ঘস্থায়ী হলো না। বেপরোয়া বল বাউন্ডারি ঘেঁষে দাঁড়ানো এক রমনীর মুখে লেগেছে। অরুণাভের চোখ বড় বড় হয়ে আসে। খারাপ লাগে বেশ। গতিতে ছুটে গিয়ে বল মুখে লেগেছে দেন ইটস ঠ্যু মাচ হার্ট হার! সে ব্যাট হাতেই ছুটে যায় সেদিকে, সাথে অন্যান্য খেলোয়াড়।
পত্রলেখার চোখের সামনে পুরনো আমলের টিভির মতো ঝিরঝিরে চ্যানেল ভাসে। তাদের বাড়িতেও এমন একটা টিভি এখনো টিকে আছে। পত্রলেখা চোখ ঘুলি দিয়ে মাটিতে বসে পড়ে। বাচ্চা ছেলেরা ভয়ে পালিয়ে যায়। বড়রা এগিয়ে এসে ভিড় জমিয়েছে। সবাই সাহায্যের কথা বলছে কিন্তু কেউই সাহস করে এগিয়ে আসে না। যদি ঝামেলায় পড়ে? অরুণাভ ভিড় ঠেলে সামনে আসে। হেলমেট গ্লাভস খুলে পকেট থেকে রুমাল বের করে মেয়েটার নাকে চেপে ধরে। মুহূর্তেই সফেদ রুমাল রক্তে ভিজে যায়। অরুণাভের অপরাধবোধ বেড়ে গেলো। ভয়টাও পায় বেশ। বল নাকে লেগেছে। খুবই সেনসিটিভ এরিয়া। যা কিছু হতে পারে। নাক দিয়ে গলগলিয়ে রক্ত পড়া মোটেই স্বাভাবিক না। মেয়েটার সাথে যদি খারাপ কিছু হয়? অরুণাভ কৎ শব্দে ঢোঁক গিলে বলল,
“হেয় গার্ল, লুক এট মি? ডিড ইয়্যু লিসেন টু মি?”
কেউ এন্টেনা ঝাঁকিয়েছে কি? ঝিরিঝিরি টিভির চ্যানেল একটু একটু করে সিনেমা দেখাচ্ছে। পত্রলেখার বসে থাকার শক্তি লোপ পায় বিধায় গা ছেড়ে দেয়। অরুণাভ বাহু মেলে দিলে পত্রলেখার হালকা পাতলা দেহ তাঁর বাহুডোরে আঁটকে গেল। মাটিতে পড়লো না আর। পত্রলেখা হুট করে বুক ফুলিয়ে চোখ উল্টে দেয়। অরুণাভের হুঁশ হয়। মেয়েটা শ্বাস নিতে পারছে না! সে রুমাল সরিয়ে আবারও বলল,
“আ’ম সো স্যরি। এমনটা কক্ষনো হয় নি। আমার বল কখনো কাউকেই আঘাত করে নি। ইটস ফার্স্ট টাইম। তুমি কি শুনতে পাচ্ছো? এ্যাঁই?”
পত্রলেখা ধীরে ধীরে চোখ বুজে নেয়। টুটুল মাঝখান থেকে ফোড়ন কাটলো, “মরে গেলো নাকি অরুণাভ? জলদি ডাক্তারের কাছে নিয়ে যেতে হবে।”
অরুণাভ বারংবার পত্রলেখার নাক গলিয়ে আসা রক্ত মুছে দেয়। অসহায় চোখে চায় বন্ধুর দিকে। টুটুল নিজেও ভয় পেয়ে আছে। আগে কি হবে? ছেলেটা সকালে দুটোকে আইসিইউতে পাঠিয়েছে। এখন এই মেয়ে! এই ছেলে সবসময় ঝামেলাকে নেমন্তন্ন করে আনে।
বাকি সব খেলোয়াড়দের মাঝেই ভয় ছড়িয়ে পড়ে। মেয়েটার কিছু হলে তাঁরাও ফাঁসবে। তাই অধিকাংশই মুখ লুকিয়ে কেটে পড়ে। আবার কেউ কেউ সাহায্যের হাত বাড়ায়। অরুণাভ পাঁজাকোলা করে তুলে নিয়ে গাড়িতে বসায়। গাড়ি শা শা করে ছুটে যায় নিকটাস্থ হাসপাতালে।
রবিন ঝালমুড়ি আর পানির বোতল নিয়ে উপস্থিত হলেই সব ঘটনা জানতে পারে। হাসপাতালের ঠিকানা জানতে চাইলে কেউ বলতে পারে না। সে কালবিলম্ব না করে নিকটাস্থ হাসপাতালে উপস্থিত হয় কিন্তু পত্রলেখার খোঁজ পেলো না। কোন হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে ওকে?
—————
প্রহর সরকার খাবারের প্লেট হাতে বোনের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে। দরজা নক করার জন্য তো হাতের প্রয়োজন। আর তাঁর দুই হাত প্লেট ধরে রেখেছে। তাহলে নক করবে কিভাবে? প্রহর উপরের দিকে তাকিয়ে বলল,
“ও আল্লাহ? তুমি আমাকে কিছুক্ষণের জন্য আরেকটা হাত দিতে পারবে? আমি জানি তুমি সব পারো। তাই দাও না আরেকটা হাত? আমি নক নক করেই তোমাকে ফিরিয়ে দিবো। দিবে?”
আল্লাহ পাক প্রহরকে হাত দিলো না। তবে দরজা খোলার শব্দ শোনা গেলো। প্রহর আবারও উপরের দিকে তাকিয়ে,
“আল্লাহ তুমি অনেক ভালো।”
অরুণিতা দরজা খুলে গম্ভীর মুখে দাঁড়িয়ে। প্রহর মিষ্টি করে হাসলো। অরুণিতা কপালে ভাঁজ ফেলে ভ্রু উঁচায়। প্রহরের হাসি নিভে গেলো। সে পাশ কাটিয়ে ঘরে প্রবেশ করে। টেবিলের উপর প্লেট রেখে হাত ঝাঁকায়। হাত ব্যথা হয়ে গেছে ইশ্। অরুণিতা বিরক্ত মুখে বলল,
“কি চাই?”
প্রহর আমতা আমতা করে বলল, “কিছু না। আমি মিনু খালাকে চুপিচুপি বলে তোমার জন্য খাবার এনেছি। আম্মু জানতেই পারবে না। আপুনি তুমি খেয়ে নাও কেমন? না খেলে তো তোমার কষ্ট হবে। তোমার কষ্ট হলে আমারও কষ্ট হবে।”
অরুণিতা প্লেটের দিকে তাকায়। নিশ্চয়ই আম্মু পাঠিয়েছে ওকে। সাথে পড়িয়েছেন এমনটা বলবে। আর তাই আওড়িয়েছে।
“আমার জন্য তোমাকে ভাবতে হবে না। প্লেট নাও আর গেট আউট।”
প্রহর কষ্ট পায়। সে লুকিয়ে আপুনির জন্য খাবার এনেছে আর আপুনি তাঁকে বকছে। সে প্যান্টের পকেট থেকে কিট্টি ললিপপ বের করে বলল,
“আমি স্যরি আপুনি। আমি ইচ্ছে করে করিনি। আমি তো তোমাকে হেল্প করছিলাম। তুমি আর রাগ করে থেকো না আপুনি।”
অরুণিতা ললিপপের দিকে তাকায়। বিড়াল আকৃতির, গোলাপী রঙের। সে কি মনে করে হাতে নিলো। ঘুরেফিরে দেখে নিজের কাছেই রেখে বলল,
“আমিও স্যরি। ওভাবে বকা উচিত হয় নি।”
প্রহর খুশি হয়ে যায়। খুশিতে জড়িয়ে ধরে বোনকে। অরুণিতাকে বিভ্রান্ত দেখায়। সে আশাকরে নি প্রহর তাঁকে জড়িয়ে ধরবে। সে নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে বলল,
“হয়েছে। প্লেট নিয়ে যাও। আমি খাবো না।”
প্রহরের খুশিতে ভাটা পড়ে, “তোমার রাগ কমে নি?”
“না।”
“কি করলে কমবে?”
“তুমি এখান থেকে চলে গেলে। যাও বলছি?”
প্রহর ভোঁতা মুখে বলল, “আমি তো তোমার সাথে থাকবো বলে এসেছি। একটু থাকি না আপুনি? প্লিজ?”
“যাবে তুমি?”
প্রহর মাথা নাড়ে, যাবে না। অরুণিতা চোগ রাঙায় তবুও প্রহর যায় না। কাঁদো কাঁদো মুখে বলে, “আপুনি, থাকি না ইট্টু? আমি একটুও বিরক্ত করবো না তোমাকে।”
অরুণিতা আর কিছুই বললো না। প্রহর চোখ পিটপিট করে বিছানায় উঠে বসে। বিছানায় হেলান দিয়ে রাখা ইয়া বড় টেডি ছুঁয়ে দিতে নিয়েও থেমে যায়। বোনের কাছে আবদার জুড়লো,
“আমি কি ওকে নিতে পারি?”
“হুঁ” অরুণিতা ছোট্ট করে সম্মতি দিয়ে টেবিলে গিয়ে বসলো। খাবার দেখে পেটের ভেতর চু চু করে ওঠে। ক্ষুধা সহ্য করার ক্ষমতা উপর ওয়ালা তাকে দেয় নি। নিজ হেভি ওয়েটের জন্য কত চেষ্টা করেছে কম কম খাবে কিন্তু খাবার দেখলে নিজেকে সামলে রাখতে পারে না। অরুণিতা হাত ধুয়ে খাবার খেয়ে নিল। কিন্তু পেটটা ভরলো না। এটুকুতে পেট ভরে? সে প্রহরের দিকে তাকায়। টেডির সাথে বিড়বিড় করে কথা বলছে। ঠুস ঠাস করে মারছে। ওকে কি বলবে আরেকটু খাবার আনতে?
“প্রহর?”
“হ্যাঁ আপুনি?”
অরুণিতা ঠোঁট বাঁকিয়ে বললো, “কিছু না।”
প্রহর বোনের হাতে থাকা শূন্য প্লেটের দিকে তাকিয়ে বলল, “তোমার টাম্মি ভরে নি, না? দাও আমি আবারও আনছি।”
অরুণিতাকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়েই প্রহর প্লেট ছিনিয়ে বেরিয়ে যায়। অরুণিতা ফ্যালফ্যাল করে তাঁর প্রস্থান দেখে। একটু পরেই প্রহর প্লেট ভরে খাবার নিয়ে উপস্থিত। বোনের হাতে প্লেট ধরিয়ে আবারও খেলায় মত্ত হয়। অরুণিতা হাসলো কি? সবটুকু খাবার চেটেপুটে খায় অরুণিতা। আজকের খাবারের স্বাদটাই অন্যরকম ছিলো। খাওয়া শেষে ওয়াশ রুমে যায় অরুণিতা। মিনিট পাঁচেক পর ফিরে এসে দেখে প্রহর তাঁর টেডি জড়িয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে। অরুণিতা চোখ পিটপিট করে। মিনিট পাঁচেক রুম জুড়ে পায়চারি করে। কেউ অন্তত আসুক আর নিয়ে যাক প্রহরকে। কিন্তু কেউ আসলো না। সে কি রেখে আসবে? অরুণিতা কিছু সময় ভেবে দরজা বন্ধ করে বিছানায় গা এলিয়ে দেয়। কম্বল টেনে ঢেকে দেয় প্রহরকে। নিজেও শুয়ে পড়ে একপাশে। কেমন অদ্ভুত লাগে। পাশ ফিরে প্রহরের দিকে তাকায়। নিমিষেই সন্দেহ হানা দেয়। বন্ধ চোখের পাতা পিট পিট করছে। ঠোঁটটাও মনে হয় হাসছে।
“প্রহর তুমি কি ঘুমিয়ে পড়েছো?”
“হ্যাঁ আপুনি।”
অরুণিতা ছোট ছোট চোখ বানালো, “ওহ্ আচ্ছা। ঘুমিয়ে পড়লে মানুষ প্রশ্নের উত্তর দিতে পারে জানা ছিলো না।”
প্রহর নিজ বোকামিতে জিভে কামড় বসায়। পিটপিট করে চোখ মেলে তাকাল। বোনের গোমড়া মুখের দিকে তাকিয়ে আদুরে ভঙ্গিতে বলল, “তুমি কি রাগ করলে?”
অরুণিতা তার কথার জবাব দিলো না। পাল্টা প্রশ্ন করলো, “এখানে ভাব জমানোর মানে কি?”
প্রহরের মুখটা কালো হয়ে আসে। কেঁদে দেওয়ার প্রথম ধাপ। সে ঠোঁট উল্টিয়ে বলল, “আমি কি চলে যাবো?”
অরুণিতা হাত বাড়িয়ে তাঁর গাল চেপে ধরে বলল, “থাক আর ভাব ধরতে হবে না। তবে বিছানা ভেজাবে না। আমাকে ডেকে দিবে হুঁ?”
প্রহর খুশিতে আত্মহারা হয়ে যায়, “থ্যাংক ইয়ু আপুনি। তুমি অনেক সুইট। তোমার মিষ্টি একটা বর হবে দেখে নিও।”
অরুণিতা সুক্ষ্ম দৃষ্টি ফেলে বলল, “বর?”
“হ্যাঁ বর। মানে হাসবেন্ড।”
“বাজে না বকে ঘুমাও প্রহর। লাইট নিভিয়ে দিবো? ভয় পাবে না তো?”
“তুমি তো আছোই। ভয় পাবো কেন?”
“শুধু পাকা পাকা কথা!”
অরুণিতা লাইট নিভিয়ে দিয়ে বিছানায় গা এলিয়ে দেয়। মিনিট দুয়েক পড়ে প্রহরের ডাক শোনা যায়। মিনমিনে গলায় ডাকছে। অরুণিতা পাশ ফিরে বলল, “কি হয়েছে?”
প্রহর ভীতু সুরে বলল, “আমার ভয় লাগছে। তোমাকে একটু জড়িয়ে ধরি? প্লিজ আপুনি?
“একদম না। ভয় লাগলে বেরিয়ে যাও ঘর থেকে।”
প্রহরের মুখটা কালো হয়ে আসে। অরুণিতা বিরক্ত মুখে বলল, “আচ্ছা ঠিকাছে।”
প্রহর খুশি হয়ে জড়িয়ে ধরে। অরুণিতা ঈষৎ বিরক্ত হলেও কিছু বললো না। পিঠে হাত বুলিয়ে ঘুমাতে বললো। প্রহর আহ্লাদ পেয়ে আরও আবারও আবদার করলো, “মাথায় হাত বুলিয়ে দাও না আপুনি?”
এভাবে বললে মানা করা যায়? অরুণিতা চুলের ভাঁজে ভাঁজে আঙুল গলিয়ে হালকা করে টেনে দেয়। প্রহর আরাম পেয়ে চোখ বুজে। ঘুম নামতে সময় নেয় না। অরুণিতার হাত থেমে নেই। ছোট ভাইয়ের মাথায় সযত্নে বিলি কাটছে। তারপর কি হলো হুট করেই কপালে পড়ে থাকা চুল সরিয়ে চুমু দিলো। অরুণিতা চুমু খেয়ে ইতস্তত বোধ করে। ভাগ্যিস প্রহর ঘুমিয়ে আছে।
—————
“মনটা ফুরফুরে যে?”
পাতা হাসিমুখে পাশে বসে। বাহুতে মাথা ঠেকিয়ে হাসিমুখে বলল, “এমনিই।”
অরুণ সরকার পাতার দিকে তাকায়। পাতা টুপ করে চুমু বসায় গালে। অরুণ গম্ভীর মুখে বলল, “হঠাৎ এতো ভালোবাসা দেখাচ্ছো? কাহিনী কি?”
“কাহিনী হচ্ছে ঘটনা। প্রহর ওর আপুনির সাথে ঘুমিয়েছে।”
“তো?”
পাতা অদ্ভুত চোখে চায়, “তো কিছুই না। দিন দিন বুড়ো হয়ে যাচ্ছেন ভোরের বাবা।”
অরুণ গম্ভীর মুখে ল্যাপটপের কি বোর্ড চাপে আর বলে, “এখনও মেয়েরা অরুণ সরকার বলতে জ্ঞান হারিয়ে ফেলে। আর তুমি বলছো বুড়িয়ে যাচ্ছি। এই তো সেদিন ব্রাইডার গহনার ফটোশুটের জন্য এক মডেল এসেছিল। স্যার স্যার বলে মুখের ফ্যানা তুলে দিচ্ছিল। একসময় কফির অফার দিয়ে বসলো। আমি মানা করলেও পেছনে পড়ে ছিলো। ভাবলাম যাই দেখি কি বলে! জানতে চাইবে না কি বলেছিল?”
পাতার মনটা বিষিয়ে ওঠে। সে কিছু বললো না। অরুণ নিজেই বলল, “সোজাসাপ্টা নোংরা প্রস্তাব। লাজ লজ্জা কিছুই নেই। ইচ্ছে তো করছিলো জুতো পিটা করে তাড়িয়ে দিতে। টাকার জন্য মানুষ কতটা নিচে নামতে পারে মেয়েটা তারই এক উদাহরণ। প্রায়শই আসে এমন প্রস্তাব।”
পাতা ছোট্ট করে 'হুঁ' বলে। অরুণ আড়চোখে পাতাকে দেখে। মেয়েটার আচ্ছা খাসা মুডের বারোটা না বাজালেই হতো। মেয়েটা এখন মনমরা হয়ে থাকবে। সে ল্যাপটপ বন্ধ করে পাতার কাঁধ জড়িয়ে বলল, “আরে পাতাবাহার! মন খারাপ করছো কেন? তোমার তো সোনায় মোড়ানো কপাল। অরুণ সরকার আগা গোড়া শুদ্ধ পুরুষ। কোনো নোংরামি তাঁকে ছুঁতে পারে নি।”
পাতা মুচকি হাসলো শুধু। অরুণ কপালে ঠোঁট ছুঁইয়ে বলল, “প্রহরকে নিয়ে আসো। ওকে ছাড়া ঘুম হবে না আমার।”
পাতা নাক মুখ কুঁচকে নিয়ে বলল, “সবসময় বাচ্চা বাচ্চা! আমার দিকে তাকানোর ফুরসৎ কই আপনার? আনছি আপনার ছেলেকে তারপর নাক ডেকে ঘুমিয়েন।”
পাতার রাগ হয়। বেলকনি থেকে ঘরে চলে যায়। অরুণ পিছু ডাকলেও শোনে না। অগত্যা উঠে আসতে হয়। ঘরে এসে দেখে পাতা যায় নি। ফোনে কথা বলছে কারো সাথে।
“এতো টাকা দিয়ে কি করবে ভোর? কোনো সমস্যা হয়েছে?”
পাতার কথায় অরুণের কপালে ভাঁজ পড়ে। ইশারা করে ফোন লাউডে দিতে। পাতা স্পিকারে দিতেই অরুণাভের গলা শোনা গেলো।
“আছে দরকার। তুমি আমার অ্যাকাউন্টে টাকা পাঠিয়ে দাও আম্মু। আর আব্বুকে জানিও না কিন্তু?”
“ফর ইয়্যুর কাইন্ড ইনফরমেশন তোমার আব্বু জেনে গেছে। আবার কি কান্ড ঘটিয়েছো তুমি? টাকা দিয়ে কি করবে? তুমি না বললে টুটুলের বাড়ি থাকবে আজ। এ্যাই ছেলে, কথা বলছো না কেন?”
অরুণাভ কপাল চুলকে খুবই সাবধানতার সাথে বলল, “বললাম না টুটুলের বাবা মায়ের ম্যারেজ এনিভার্সারি কাল? তাই টুটুল সারপ্রাইজ প্ল্যান করেছে। আমি ভাবলাম আমিও আঙ্কেল আন্টিদের জন্য কিছু করি। তাই আমার কিছু টাকা লাগবে।”
অরুণ বিশ্বাস করলো না। বলল, “টুটুলের কাছে ফোন দাও!”
“কেন? আমার কথা বিশ্বাস হচ্ছে না?”
“না, টুটুলের সাথে কথা বলবো আমি।”
অরুণাভের মুখটা থমথমে হয়ে আসে। টুটুলের দিকে ফোন ছুঁড়ে মারে। টুটুল হাসি মুখে কথা বলে অরুণ সরকারের সাথে। অরুণাভ অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে রাখে। হঠাৎ কি মনে করে ফোনটা কেড়ে নিয়ে বলল, “দিতে হবে না কোনো টাকা। ফোন রাখো।”
বলেই কল কাট করে। অরুণ গম্ভীর গলায় পাতাকে বলল, “দেখেছো তোমার ছেলের বিহেভিয়ার? আমি পইপই করে বারণ করেছিলাম রাত বিরেতে বন্ধুবান্ধবের সাথে ঘোরাঘুরি আমি এলাও করবো না। কারো বাসায় থাকা তো আরও না। কিন্তু ঘারত্যাড়ামি করে বলল থাকবেই। এখন টাকা চাইছে! এই রাত বিরেতে টাকা দিয়ে কি করবে ও?”
“বললো তো কি করবে! আপনি অহেতুক রাগ দেখাচ্ছেন। শুনুন ভোরের বাবা, ভোর এখন বড় হয়েছে। ওকে ফ্রিডম দিতে হবে। আপনি সবসময় ওঁর সবেতে বা হাত ঢুকিয়ে দেন। এটা করবে না, ওটা করবে না, ওটা করো, বাড়ির বাইরে যাবে না, বাইক নিবে না, বন্ধুদের সাথে যাবে না, লাল শার্ট পড়বে না, স্যান্ডেল পড়ে বাইরে যাবে না, হ্যান ত্যান। মানে ওর সবকিছুতেই আপনি নিজ ইচ্ছে ঠেলে দেন!”
“আমি কি ওর খারাপের জন্য বলি?”
“তা বলেন না কিন্তু সব সময় এরকম ক্যাট ক্যাট করা, কথায় কথায় খুঁত ধরা, ধমক দেওয়া, বিধিনিষেধ আরোপ করা ভোর পছন্দ করে না। ও নিজের মতো চলতে চায়। এই বয়সে সব ছেলেরাই এমনটা চায়। আপনি নিশ্চয়ই আপনার টিনেজের ভুলেন নি? কি কি করে বেরিয়েছেন ভাবুন তো একবার?”
অরুণ কপাল চুলকায়। টিনেজে কাটানো প্রতিটি মুহূর্ত তাঁর মনে আছে। আর সেজন্যই তো ভয় জেঁকে হয়।
“ভোরের বাবা, এই বয়সটা খুবই সেনসিটিভি। আপনি ছেড়ে দিবেন তো বিগড়ে যাবে। আবার খুব বেশি কঠোর হবেন তো জেদ করেই আপনি যা বলবেন তার উল্টোটা করবে। ভোর যা করে তাতেই যেন আপনার সমস্যা। আপনি চান ভোর আপনার মতো করে চলুক। কিন্তু ভোর চায় না আপনার মতো করে চলতে। আপনি ভোরকে ভোরের দৃষ্টিকোণ থেকে বোঝার চেষ্টা করুন। দেখবেন আপনাদের পাকানো জটিল সম্পর্ক আবারও সহজ হয়ে গেছে।”
অরুণ দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, “ও কখন আমার কথা শোনে? ও তো ওর মতোই চলে। আর কিছুদিন পরপর একটা করে তামাশা খাঁড়া করবে। যাইহোক আমি আর কিছুই বলবো না তোমার ছেলেকে। ভালোমন্দ কোনোটাই। যা খুশি করুক। এখন বড় হয়েছে বাবাকে তো আর লাগবে না। কত টাকা চেয়েছে পাঠিয়ে দাও।”
পাতা ম্লান হেসে অরুণের কাঁধে হাত রাখলো। ভোর না জানুক সে তো জানে লোকটা ভোরকে কতটা মিস করে।
—————
অরুণাভ চিন্তিত মুখে হাসপাতালের বিল হাতে বসে আছে। এতো টাকা কিভাবে পে করবে এখন? তাঁর কাছে পঞ্চাশ টাকাও নেই। পঞ্চাশ হাজার কোত্থেকে দিবে। এরচেয়ে ভালো ছিলো সরকারি হাসপাতালে ভর্তি করানো। এখন ঢের আফসোস হচ্ছে।
“আপনার ভাবীর জ্ঞান ফিরেছে!”
অরুণাভ সামনে তাকায়। মাঝবয়সী মহিলা নার্স দাঁড়িয়ে আছে। সে আশেপাশে চোখ বুলিয়ে বলল, “আন্টি আপনার ভুল হচ্ছে আমার কোনো ভাবী নেই।”
ভদ্রমহিলা বিরক্তের সাথে বললেন, “১৪৩ নম্বর কেবিনের মেয়েটা আপনার আত্নীয় না?”
“সাম কাইন্ড ওফ বাট…”
“ওনার জ্ঞান ফিরেছে জলদি চলে যান।”
বলেই হাওয়া। অরুণাভ ভাবনা ফেলে ১৪৩ নম্বর কেবিনের সামনে এসে দাঁড়ালো। ভেতরে প্রবেশ করবে এর মাঝেই ফোন বেজে উঠলো। অরুণাভ ফোন বের করে দেখে বাবার নাম্বার। ভ্রু কুঁচকে রিসিভ করে কানে ঠেকায়। কিন্তু কথা বলে না।
“কত টাকা পাঠাবো?”
ওপাশ থেকে প্রথম কথা। অরুণাভ গম্ভীর গলায় বলল, “লাগবে না।”
“দশ হাজারে হবে? নাকি আরও বেশি?”
“আমার কারো টাকার দরকার নেই।”
“একাউন্টে টাকা পাঠিয়েছি। যত লাগে তুলে নিও।”
অরুণাভ কিছু বলে না। অরুণ বলল, “এ্যাঁই ছেলে কথা বলছো না কেন? এ্যাই কলিজা?”
অরুণাভ গলা খাঁকারি দিয়ে বলল, “আমি ব্যস্ত আছি রাখলাম।”
“শোনো?”
“হুঁ?”
“আমি ভিডিও কল করি লাইনে আসবে?”
অরুণাভের মুখটা আবারও থমথমে হয়ে আসে। আব্বু এখনো তাকে সন্দেহ করছে। সে ব্যঙ্গাত্মক সুরে বললো, “সোজাসাপ্টা বললেই পারো যে তুমি এনশিউর হবে আমি টুটুলদের বাড়িতে আছি নাকি অন্য কোথাও!”
“আসতে হবে না লাইনে। রাখছি।”
অরুণ কল কেটে দিলো। অরুণাভ স্বস্তি পায়। ফোনের ইনবক্স চেক করে। অ্যাকাউন্টে তিনলাখ টাকা এসেছে। যাক চিন্তার অবসান হলো তবে।সে দরজায় কড়া নেড়ে ভেতরে প্রবেশ করে।
বেডে বসে পত্রলেখা। নাকে সফেদ ব্যান্ডেজ। সুশ্রী নজরকাড়া মুখটা ফুলে আছে। এক চোখে ঈষৎ রক্ত জমাট বেঁধে আছে। কারো আগমন খবর টের পেতেই মুখ তুলে তাকায় সে। অরুণাভ এগিয়ে এসে বেডের পাশে টুল টেনে বসে। অপরাধবোধের সাথে বলে,
“আ’ম সো স্যরি। আমার জন্য আপনাকে এতটা সহ্য করতে হলো। আমি খুবই দুঃখিত। আপনি কি শুনছেন আমার কথা? হেয় গার্ল?”
হাত নাড়ে অরুণাভ। পত্রলেখা সাঁড়া দিলো না কোনো প্রকার। চুপচাপ বেডে হেলান দিয়ে বসে থাকে। দৃষ্টিতে উদাসী ভাব। অরুণাভ ঠোঁট বাঁকিয়ে ভাবনায় বুঁদ হয়। এই মেয়ে কথা বলছে না কেন? সে আবারও বললো,
“আপনি কষ্ট করে আপনার ফ্যামিলির কারো নাম্বারটা দিন। আমি তাদের কল করে আসতে বলছি। ওঁরা এসে আপনাকে নিয়ে যাবে। ডাক্তার এখনি আপনাকে ছেড়ে দিবে বলেছে। জানিয়েছে কয়েকদিনের মধ্যেই পুরোপুরি সুস্থ হয়ে যাবেন আপনি। তবুও আমি এক্সরে আর সিটিস্ক্যান করেছি। এক্সরে রিপোর্ট পেলেও সিটিস্ক্যানের রিপোর্ট আসে নি। আপনি অনুগ্রহ পূর্বক কালেক্ট করে নিবেন কেমন? আচ্ছা আপনার নাম কি?”
তবুও সাঁড়া পেল না। অরুণাভের মনে হলো মেয়েটা কাঠপুতুল। কেমন যান্ত্রিক কায়দায় বসে আছে। না কান্নাকাটি, না মুখে বেদনার ছাপ। খুবই স্বাভাবিক ভাবেই বসে যেন কিছুই হয় নি। আচরণ গুলো বেশ অদ্ভুত। অন্যকেউ হলে কেঁদেকেটে অস্থির হয়ে পড়তো। অথচ মেয়েটা এপর্যন্ত একফোঁটা অশ্রু বিসর্জন দিলো না। না তাকে বিচলিত দেখালো। সে ফোন করে টুটুলকে ডেকে আনে। টুটুলও ভাব জমানোর চেষ্টা করে পত্রলেখার সাথে। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় মেয়েটা টু শব্দটি করছে না। সে হার মেনে বলল,
“অরুণাভ মনে হচ্ছে তোর ভাবীর ঘোর কাটে নি। নয়তো স্মৃতিশক্তি হারিয়ে ফেলেছে…”
“এক মিনিট থাম আগে। কে ভাবী, কার ভাবী?”
টুটুল পত্রলেখার দিকে তাকালো। সে-ই সিগন্যালে দেখা পুতুলের মতো দেখতে মেয়েটা এখন তাঁর সামনে। সাদা কুর্তি, সাদা দোপাট্টা, সাদা সালোয়ারে পুরাই শুভ্র পরি! যদিও কুর্তি, ওড়নায় রক্ত লেগে আছে। নাকের ব্যান্ডেজের জন্য মোটেও অদ্ভুত লাগছে না; বরঞ্চ কিউট লাগছে। সে লাজুক হেসে বললো,
“এই তোর ভাবী। সেদিন সিগন্যালে দেখালাম না? আমি তো ভেবেছিলাম আর দেখাই পাবো না। কিন্তু ভাগ্যের লীলাখেলা দেখ?”
অরুণাভ পত্রলেখার দিকে তাকালো। পত্রলেখাও তার দিকে তাকিয়েছে বিধায় চোখাচোখি হয়। অরুণাভ কয়েক মুহূর্তের জন্য বোধগম্য হারালো। মনে হলো চোখ দু’টো তাঁর বড্ড চেনা। কে এই মেয়ে?
·
·
·
চলবে……………………………………………………