কামিনী - পর্ব ৬৯ - মম সাহা - ধারাবাহিক গল্প

কামিনী - মম সাহা
          রানি যখন রাজ্যে ফিরলেন দিনের আলো ঝলমল করছে তখন রাজ্যে। ফিরেই দেখলেন এলাহি কাণ্ড। রাজ্য জুড়ে উৎসব। প্রাসাদ জুড়ে সাজগোজ। হুট করে কী হলো, কেন এত আয়োজন তা উনি জানেন না। তিনদিন আগে যখন রাজ্য ছেড়ে বেরিয়ে ছিলেন তখনও তো এত সাজসজ্জা ছিলো না! 
 প্রাসাদে প্রবেশ করে দেখলেন অতিথি আপ্যায়নে মুখরিত প্রাসাদ। চারপাশে কত অপরিচিত মুখ। রানিকে দেখতে পেয়েই প্রাসাদে অবস্থানরত তার নতুন খাসদাসীটি এগিয়ে এলো। মাথা কুর্নিশ করে জিজ্ঞেস করল,
“আপনার জন্য উষ্ণ, কুসুম জলের ব্যবস্থা করব কি?”

 নতুন দাসীটি ভীষণ কর্মঠ। ওর যখনই মুখ খুলে বের হয় কেবল কাজের কথা। 
রানি তার প্রশ্নাত্মক দৃষ্টিটি চারপাশ ঘুরিয়ে এনে স্থির করলেন দাসীটির দিকে, “কীসের আয়োজন হচ্ছে প্রাসাদে?”

“রাজা হিরণ্যকেশীর মৃত্যু বার্ষিকী উপলক্ষে এই আয়োজন।” খুব ধীরে উত্তর দিলো দাসীটি। রানি চমকালেন। তিনি তো ভুলেই বসেছিলেন হেমলকের পিতার মৃত্যুর দিবসটিকে। এত আয়োজন করলো কে? রাজামাতা প্রাচী?
 রানি মনের সংশয় প্রকাশ করলেন। শুধালেন, “এই আয়োজন কে করেছে?”

“রাজমাতা প্রাচীই তো করলেন সবটা।”

 রানি আর কথা বাড়ালেন না। দাসীটিকে স্নানাগার প্রস্তুত করতে বলেই নিজের কক্ষের দিকে এগিয়ে গেলেন। তাকে যার যার চোখে পড়ল সে সে কোলাহল ভুলে থম মেরে দাঁড়িয়ে গেলো। ফিসফিস করল কেউ কেউ। কারো চোখে বা দেখা দিলো ভয়। কারণ এখানের সবাই-ই রানির সবকিছু সম্পর্কে যথেষ্ট অবগত। রানি আঁড়চোখে সকলের অঙ্গভঙ্গি দেখলেন। নিজের পরিচিতি এত বিস্তৃতি পেয়েছে ভেবে মনে মনে তার হাসিও পেলো। এই ভয়টাকে তিনি উপভোগ করলেন বেশ। 

 স্নানাগার থেকে বের হতেই ক্লান্তিতে ভেঙে এলো রানির দেহ। চুলগুলো শুকোয়নি পুরোপুরি। সোনালি চুলগুলোতে জল যেন শোভাবর্ধন করেছে। কোনো প্রসাধনী নেই, অলঙ্কার নেই তবুও যেন মনে হচ্ছে স্বর্গের অপ্সরাও হার মানবে এই রূপের কাছে। কী ভুবনমোহিনী রূপ তার! মাখনের মতন ত্বকের আভা। মনে হয় মৃদু ছোঁয়াতেও গলে যাবে! অথচ এই মানুষটার মনই কি-না শক্ত, তীব্র!
 রানি যদিও ভেবেছিলেন খানিক বিশ্রাম নিবেন এবার কিন্তু তা আর হয়ে উঠল না। প্রহরী এসে খবর দিলো হ্যাব্রো এসেছে। হ্যাব্রো আসার খবরটাও রানির কাছে কিছুটা কৌতূহলের। হ্যাব্রোকে তিনি আসতে বলেননি কিংবা হ্যাব্রোও আগাম জানায়নি আসবে যে! তাহলে হঠাৎ কেনই-বা এলো? কিছু হলো কি রাজ্যে? 
নিজের রাজ্যের কথা মাথায় আসতে খানিক চিন্তিত হলেন। প্রহরীকে আদেশ করলেন হ্যাব্রোকে কক্ষে পাঠানোর। তার শরীরে তখন কেবলই শুভ্র রঙের একটি বস্ত্র। মাথায় রানির নিজস্ব মুকুটটি জ্বলজ্বল করা ব্যতীত শরীরে আর কোনো অতিরিক্ত কিছুই নেই। 

 
  রানি জানালার পাশ ঘেঁষে দাঁড়ালেন হ্যাব্রোর অপেক্ষায়। চোখ তার প্রাসাদের বাহিরে। ভেতর ভেতর ঘুরপাক খাচ্ছে অনেক প্রশ্ন। হ্যাব্রো আসাতে ভালোই হয়েছে। তার অনেককিছু জানার ও জানানোর আছে। 
রানিকে বেশিক্ষণ অপেক্ষা না করিয়েই হ্যাব্রো এলো। অনুমতি নিয়ে প্রবেশ করল কক্ষে। রানি এক পলক হ্যাব্রোর দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলেন,
“বিশেষ কোনো সমস্যা হয়েছে? হুট করে এলে?”

 রানির প্রশ্নের সাথে সাথে উত্তর দেওয়ার অভ্যেস হ্যাব্রোর। তবে আজ সে সেটি করল না। একটু সময় নিলো। রয়েসয়ে বলল,
“কে যেন বেনামে অনেকগুলো অর্থ আর মোহর পাঠিয়েছেন রাজ্যে। না সাথে কোনো পত্র আর না কোনো বোঝার ব্যবস্থা রেখেছেন।”

  স্বর্ণমুদ্রার কথা শুনতেই রানির কপালে ভাঁজ পড়ল কয়েক, “কোনো ঠিকানা নেই?”

 “না। পুরোটাই বেনামি।”
রানির কপালের ভাঁজ আরেকটু গাঢ় হলো। তার মন গলানোর জন্য যদি কেউ উপহার পাঠিয়ে থাকে তবে লুকিয়ে পাঠাবে কেন? বরং প্রকাশ্যেই পাঠানোর কথা। কে এমন যে তাকে উপহার দিচ্ছে লুকিয়ে!

“আমাদের রাজ্যের জন্য যদিও ভালোই হয়েছে। রাজকোষ আরেকটু মজবুত হলো।”

 “মজবুত হলো না কারো কোন ষড়যন্ত্র তা বুঝতে হবে আগে, সেনাপতি হ্যাব্রো।”

“তা ঠিকই বলেছেন।”

 “আর কারাগার থেকে পালানো লোকটির খোঁজ পেলে কোনো?”

হ্যাব্রো ক্লান্তিকর ভঙ্গিতে বলল, “অনেক খোঁজাখুঁজি চলছে কিন্তু পাওয়া যাচ্ছে না। হয়তো কোথাও লুকিয়ে আছেন উনি নয়তো আমাদের রাজ্য ছেড়ে অন্য কোনো রাজ্যে আশ্রয় নিয়েছেন।”

“সেই লোকটিকে খুঁজে বের করতেই হবে, সেনাপতি হ্যাব্রো। তার শাস্তি সম্পূর্ণ হয়নি যে আদৌ।”

 রানির চোখগুলো ঈষৎ রক্তিম বর্ণ ধারণ করেছে। তিনি যখন ভেতর ভেতর চাপা রাগে থাকেন তখনই তার চোখগুলো এমন দেখা যায়। হ্যাব্রো তাই নিমিষেই বুঝল রানি রেগে আছেন। 

ওদের কথোপকথন সমাপ্ত হওয়ার আগেই প্রহরীর হাঁক ভেসে এলো, “রানি, রাজকন্যা লিলি উপস্থিত হয়েছেন। আপনার সাথে সাক্ষাৎ করতে চান।” বাক্যটি শেষ করলেন একটু লম্বা টানেই। 

রানি হ্যাব্রোকে দাঁড়াতে বলেই লিলিকে কক্ষে আসার অনুমতি দিলেন। 
 লিলি এলো শান্ত পায়ে। আজ একটু ভালো ভাবে তৈরি হয়েছে মেয়েটা তাই গা থেকে ঠিকড়ে পড়ছে সৌন্দর্যতা। অল্প বয়স্ক মুখশ্রীতে এখনো অবুঝপনার রঙ খেলানো যেন। লিলি এসে একপলক হ্যাব্রোকে দেখল। অত্যন্ত নরম স্বরে বলল, 
“পিতাশ্রীর আত্মার শান্তি কামনায় যজ্ঞ আরম্ভ হয়েছে। আপনাকে সেখানে উপস্থিত হওয়ার আদেশ দিয়েছেন পণ্ডিতগণেরা। দ্রুত আসুন।”
 
  রানিকে আদেশ করেছেন কথাটি শুনতে কেমন যেন অদ্ভুত শোনালো। রানিকে স্বয়ং রানিই আদেশ করেন না অথচ তাকে কি-না পণ্ডিতেরা আদেশ করেছে! 
হ্যাব্রোর মনে বেশ খচখচে লাগলো কথাটা। তাই সে সঙ্গে সঙ্গেই বলল,
“রানিকে উনারা বড়োজোর অনুরোধ করতে পারেন, আদেশ নয়, রাজকন্যা লিলি।”

 “উনারা হয়তো এতকিছু ভেবে বলেননি।” লিলির স্বীকারোক্তিতে রানি থামিয়ে দিলেন হ্যাব্রোকে। দু'জনকে কক্ষের বাহিরে যেতে বলেই মাথায় সুন্দর করে বিছিয়ে নিলেন লাল রঙের পাতলা আবেষ্টনী। অলংকার বলতে নাকের নোলকটি ছাড়া কিছুই লাগালেন না। হাত-পায়ের আলতাগুলো তখনও রঙিন। 

 —————

  খোলা উদ্যানে বহু পণ্ডিতের সমাগাম। যজ্ঞের অগ্নি তখনো তার সমস্ত মস্তক উঁচিয়ে দাঁড়ায়নি। রানি এসে দাঁড়াতেই তার প্রহরী, দেহরক্ষী, দাঁড়িয়ে গেলো। তার পেছন পেছন অবশ্য হ্যাব্রোও এসেছে। 
রানিকে দেখতেই এগিয়ে এলেন মন্ত্রী ত্রিপাদ কুমার। পথ দেখিয়ে নিয়ে গেলেন তার আসনের সামনে। সেখানেই দাঁড়ানো রাজমাতা। 
পণ্ডিতদের সাথে বিশেষ আলাপে মত্ত ছিলেন তিনি। কীভাবে, কতটুকু কাজ করা হবে তা-ই বুঝে নিচ্ছিলেন। রানি এসে পাশে দাঁড়াতেই তার কথা থেমে গেলো। এ পলক তাকালেন রানির দিকে। 
 রানিকে আপাদমস্তক পর্যবেক্ষণ করে কৈফিয়তের সুরে জিজ্ঞেস করলেন, “কোথায় ছিলেন এ ক'দিন? রাজ্যের দায়িত্ব পালন করা এতই সহজ? হুটহাট নিরুদ্দেশ হওয়া কোনো রানিকে কি শোভা পায়?”
 যদিও কথাগুলো একান্তই ব্যক্তিগত কথা। প্রাসাদের বাহিরের লোকেদের সামনে বললে প্রাসাদেরই মান ক্ষুণ্ণ হয় তবুও রাজমাতা ইচ্ছেকৃত প্রশ্নগুলো করলেন। যেন পণ্ডিতগণের কানে পৌঁছায়। তারা একটু নাক কুঁচকান। অস্বস্তিতে দাবিয়ে দেন রানিকে। অথচ রানিকে কি দাবানো যায়? রাজমাতা এখনো রানিকে চিনতে পারেননি ভেবেই রানি মনে মনে হাসলেন। রাজমাতা ব্যক্তিগত কথা বাহিরে আনলেও রানি তো আর অশোভন আচরণ করতে পারেন না তাই তিনি যথেষ্ট সামাজিকতা বজায় রেখেই প্রত্যুত্তরে বললেন কেবল, “কাজ ছিলো।”

 “রাজ্যের কার্যের সঙ্গে সংসার কার্যেরও ধ্যান দিতে হবে। আধিপত্য পেলেই হয় না তা বজায় রাখারও দায়িত্ব থাকা চাই।” রাজমাতা কৌশলে রানি কামিনীকে কথায় ছোটো করতে চাইলেন। রানি অবুঝ নন। সবকিছুই বুঝতে পেরেও জবাবে নিজের সৌর্হাদ্য, সম্মান ধরে রাখলেন, “ঠিক আছে।”

 রাজমাতা যখন দেখলেন রানিকে এসব ছোটো ছোটো চালে দাবিয়ে রাখা দায় তখন হাল ছেড়ে দিলেন। পণ্ডিতদের উদ্দেশ্য করে বললেন,
“ইনিই আমার পুত্র হেমলকের বধু- রানি কামিনীকাঞ্চন। পুত্রের পরিবর্তে যজ্ঞে তাকেই বসানো হোক। পুত্র আমার দূরে গিয়েছে।” মুখে কী মধু তার। যেন কত স্নেহের পুত্রের কথা বলছেন! দুষ্ট লোকের যে কত ছলচাতুরী থাকে তা এই রাজমাতাকে দেখে বোঝা যায়।

  রাজমাতা পরিচয় করিয়ে দিতেই রানি হাত জোর করলেন। সম্মানের সাথে মাথা সামান্য নাড়ালেন। পণ্ডিতেরা তার প্রণাম গ্রহণ করলেন। 
ঠিক সে সময়েই পণ্ডিতদের সবচেয়ে বয়োজ্যেষ্ঠ ও সম্মানে সবচেয়ে বড়ো পদস্থ পণ্ডিতটি এগিয়ে এলেন। কাছাকাছি আসতেই তার চোখ থেমে গেলো। ভ্রু কুঞ্চিত করে ফেলল নিমিষেই। রানিকে আগাগোড়া হতবিহ্বলের মতন পরখ করে অস্ফুটস্বরে বলে উঠল, “তুমি! তুমি এখানে?”

 পণ্ডিতের বাক্যে রানির সমস্ত ধ্যান যায় পণ্ডিতের দিকে। ক্ষণকাল তিনিও যেন স্তম্ভিত হয়ে যান। অতীত তার সামনে এসে এমন করে দাঁড়িয়ে যাবে এই অবেলায় তা বোধহয় তিনি ভুল করেও আঁচ করেননি।

  বাকিরাও পণ্ডিতের প্রশ্নে কিছুটা মূক হয়ে তাকিয়ে থাকে। রানি ও পণ্ডিত যে পূর্ব পরিচিত তা তার বাক্যেই বেশ বুঝে গিয়েছে সকলে। রানির চোখের সামনে তার আবছা অতীত ক্রমে ক্রমেই স্পষ্ট হতে লাগলো। খোলা উদ্যানে সেই অতীত নিয়ে যে আজ সভা বসবে তা আর বুঝতে বাকি নেই। সমস্তটাই আজ নিয়ন্ত্রণের বাহিরে যাবে বোধহয়। রানি নিজেকে সামলে নেওয়ার চেষ্টা করতে করতে বললেন,
“জি, আমিই। এ রাজ্যের রানি এবং রাজপুত্র হেমলকের বধূ।”

হ্যাব্রো খেয়াল করল রানির কণ্ঠ চাপা শোনাচ্ছে। এমনটা কখনোই শোনায় না। 
 পণ্ডিত নরেশ থতমত খায় বোধহয় রানির পরিচয় পেয়ে। সাথে তাকে দ্বিধান্বিতও দেখায়। রাজমাতা আগ বাড়িয়ে প্রশ্ন ছুঁড়েন,
“আপনারা কি পূর্ব পরিচিত?”

 রানি নিজেকে শান্ত করে। যেখানে পরিস্থিতি হাতের বাহিরে, নিয়ন্ত্রণের উর্ধ্বে সেখানে তিনি নিজেকে নীরব রাখাটাই বেশি উপযুক্ত মনে করলেন। 
কিন্তু পণ্ডিত নরেশ তা হতে দিলো না। অতীতের রাগের জের ধরেই হয়তো বেশ উচ্চকণ্ঠে বলে উঠল,
“অবশ্যই পূর্বপরিচিত। এই ব্যাভিচারীনি আপনার পুত্রবধূ হয় কী করে? এ নিজের পতির প্রাণ নিয়েছিলো এবং তার অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া অব্দি করতে অস্বীকার করেছিলো। বৈধব্যদশায় থাকা একটি নারী পুনরায় কী করে আবার বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হতে পারে? এই কথাটিই তো আমি বুঝে উঠতে পারছি না!”

  পণ্ডিতের কথাটি যেন দৃঢ় বজ্রপাতের মতন একেক জনের মাথায় ভেঙে পড়ল। বাতাসের বেগেই উদ্যান জুড়ে ছড়িয়ে গেলো কথাটি। রানি কামিনীকাঞ্চনের পূর্বে বিবাহ হয়েছিলো এবং তিনি একজন বিধবা তা যেন সবচেয়ে মুখরোচক সংবাদ হয়ে গেলো নিমিষেই। 
 হ্যাব্রো ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে আছে রানির দিকে। রানির নীরবতাতেই যেন সে উত্তর খুঁজে পাচ্ছে।
রাজমাতা প্রাচীর তো চক্ষুচড়ক গাছ। তিনি ভাবতেও পারেননি রানির অতীত এত ভয়ঙ্কর। এ নারী কি-না নিজের পতিরও প্রাণ নিয়েছিলো? এ-ও সম্ভব! 
·
·
·
চলবে……………………………………………………

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

WhatsApp