কক্ষের ভেতর বিস্তর নীরবতা। ধরণীতে নেমেছে রাত্রির। আকাশে লক্ষ-কোটি নক্ষত্রের উঁকিঝুঁকি স্পষ্ট। বাতায়ন ভেদ করে আসা মৃদু বাতাসে রানির ক্লান্তিতে মূর্ছে যাওয়া শরীর আরাম পোহাচ্ছিলো। আলো মৃদুই আছে সেখানে। শীতলতায় ডুবে যাওয়া এক খণ্ড পৃথিবী লাগছে কক্ষটিকে।
রানির বন্ধ চোখের পাতা। গভীর নিদ্রায় নিমজ্জিত। তবে, খুব সামান্য থেকে সামান্য শব্দ হলেও তিনি টের পান ঘুমিয়ে থাকা অবস্থায়। জেগে যান মুহূর্তেই। এখনও তাই হলো। হেমলক খুব ধীরে প্রবেশ করেছিলো কক্ষে। শব্দ হয়নি বোধহয় তিল পরিমাণও। অথচ সে রানির একটি আঙুল সবে ছুঁতেই রানি জেগে গেলেন। তা-ও বেশ চমকেই উঠেছেন। তার চমক দেখে হেমলকও চমকে গিয়েছিলো খানিক। ব্যতিব্যস্ত স্বরে বলতে লাগল,
“আমি, আমি। ভয় পেও না।”
রানির ঘুমন্ত মস্তিষ্ক, অস্পষ্ট দৃষ্টি ভালো ভাবে খেয়াল করল হেমলককে কিছুটা সময় নিয়ে। ঘুম হয়নি বলে চোখগুলো ভীষণ লালচে হয়ে আছে। হেমলকের ভীষণ খারাপ লাগলো রানি সজাগ হওয়াতে। সে চায়নি রানির ঘুম ভাঙাতে।
যখন নিদ্রা সম্পূর্ণরূপে কাটল রানি ভাঙা ভাঙা স্বরে বললেন, “ভয় পাইনি। কিছু বলবেন?”
হেমলক এবার একটু ধাতস্থ হলো। রানির পাশটায় বসলো বিনা অনুমতিতেই। তার আঙুলটা এখনো রানির আঙুল জড়িয়েই আছে।
“ভয় পেলে, তা স্বীকার করা দোষের নয়। ভয়, হাসি, কান্না, ঘৃণা, রাগ.. এই সমস্তই আমাদের অনুভূতি। এবং সমস্ত অনুভূতিরই প্রকাশ প্রয়োজন। নয়তো একটা সময় পর সেই অনুভূতিগুলো আমাদের থেকে হারাতে আরম্ভ করে।”
“আমার ঘুম ভাঙিয়ে এগুলো বলার ছিলো?” বলে ভ্রু কুঁচকালেন রানি।
হেমলক সেই ভঙ্গি দেখে না হেসে পারল না। মেয়েটা সদা নাকের উঁচুতে রাগ নিয়ে ঘুরলেও, মাঝে মাঝে গাঢ় ভাবে মুখটার দিকে তাকালে মনে হয় শিশুর মতনই কোমল সেই মুখটি। এই যে এখন তাকিয়ে আছে, কেমন পবিত্র লাগছে সেই অভিব্যক্তি। চোখগুলো এত সুন্দর বড়ো পল্লব বিশিষ্ট যে হেমলকের মাঝে মাঝে মনে বড়ো ছুঁয়ে দেওয়ার বাসনা জাগে। কিন্তু তা আর সে করতে পারে না। ভয় পায় যদি তার রানি তাকে ভুল বুঝে! ভেবে নেয় হেমলকেরও বুঝি কামে মগ্ন মন তার রূপ দেখে আর আটকাতে পারছে না! আর যাই হোক পৃথিবীর সমগ্র পুরুষের প্রতি রানির যেই ঘৃণা, সেই একই ঘৃণা হেমলকের প্রতি জন্মালে সে যে সহ্য করতে পারবে না! তাই সে তার ইচ্ছেগুলোকে দমিয়ে নেয়। এখনও তা-ই করল।
হেমলককে নিজের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখে রানির অস্বস্তি হলো বেশ। এমন করে মুখের দিকে তাকিয়ে থাকলে রাগ দেখানো যায় না। কঠিন গলায় কথা বলা যায় না। চোখ নেমে যায়, কণ্ঠ থেমে যায় যে!
রানি তাও মিছিমিছি কণ্ঠের সেই গাম্ভীর্যতা ধরে রেখে শুধালেন,
“মুখের দিকে তাকিয়ে থাকার জন্য নিদ্রা ভাঙালেন আমার?”
হেমলক হাসে। রানির পুরো হাতটিকে এবার নিজের হাতের মুঠোয় চেপে ধরে। শান্ত, আদুরে স্বরে বলে,
“যদি বলি তা-ই?”
“তাহলে বলব, বেরিয়ে যান। আপনার এই অভিলাষের জন্য আমার নিদ্রাকে আমি ত্যাগ করতে পারছি না।” কথা বলতে বলতে রানি নিজের হাতটি আলগা করার চেষ্টা করেন।
তবে হেমলক হাতটি আলগা হতে দেয় না। আরেকটু উষ্ণ ছোঁয়ায় মুঠো চেপে রেখে বলে,
“কখনো তো একটু ভালোবেসে থাকতেও বলতে পারো? চলে যেতেই কেন বলতে হবে বারে বারে?”
রানি হেমলকের দিকে এবার ভালো করে তাকালেন। লোকটা এসব কী উদ্ভট বলছে! মাঝে মাঝে মানুষটার কী যে হয়! বুঝতে পারেন না তিনি।
এবার রানি রাগ দেখালেন। টেনে ছাড়িয়ে নিলেন হাতটি,
“আপনি যদি মধ্যাহ্নের অতীত শুনে আমায় করুণা করতে এসে থাকেন এখন, তাহলে বলব আপনি ভুল করছেন। রানি কামিনীকাঞ্চনের করুণার প্রয়োজন নেই। আমি অসংখ্য লোকের ঘৃণা আর অভিশাপে বাঁচা মানুষ। করুণা পাওয়া আমার ধাতে নেই।”
কথা বলতে বলতে সত্যিই এবার তার চোখ কণ্ঠস্বর শক্ত হয়ে উঠল। যেন নিজেই নিজেই ভেবে নিয়েছেন তিনি সবটা।
হেমলক সে ভাবনার খোঁজ পেয়ে আশাহত হলো। অভিমান যে হলো না তেমনটা নয়। তাই তো তৎক্ষণাৎ রানির হাতটি ছেঁড়ে দিলো। একদম আলোগোছেই। কষ্টটা বেশিই পেয়েছে বোধহয়। চোখের মণিগুলো কেমন কাঁপলোও যেন! রানি সেই কম্পনও ঠিক খেয়াল করে নিলেন।
হেমলক উঠে দাঁড়ালো ধীরে। মুখ নামিয়ে নরম স্বরে বলল, “আমার মতন নগন্য মানুষ তোমায় করুণা করবে? যেখানে তোমার করুণা পাওয়ার আশাতেই আমি সব ভুলেছি বহুকাল। থাক সেসব কথা। ঘুমিয়ে যাও। আমি আছি। আমি থাকতে কেউ তোমার আশেপাশে আসবে না। নিশ্চিন্তে ঘুমাও।”
হেমলকের অভিমানী কণ্ঠস্বর, চাপা মন খারাপ রানি বুঝলেন। কিন্তু তিনি অপারগ। চাইলেও তিনি বাহু জড়িয়ে কাউকে যে আগলে নিতে পারেন না! আঘাতে আঘাতে ক্ষত হয়ে গিয়েছে তার বুকটা। সেই ক্ষত থেকে প্রতিনিয়ত যেই রক্তক্ষরণ হয় তার যন্ত্রণা তিনি কাউকে বুঝাতে পারবেন না। হয়তো বুঝাতে চানও না আর!
“আমি করুণাও করতে পারি না, হেমলক পিয়ার্স। আমার কাছে করুণা নেওয়া ও দেওয়া একই বিষয়। আপনি মিছে আশা করছেন। ভুল মানুষের কাছে আশা করতে নেই।”
রানির কণ্ঠের তেজ বদলে গিয়েছে। কঠিন থেকে নরম হয়ে এসেছে।
“করুণা না করলে মায়া করো। মায়া না করলে একটু কাছে থাকার অধিকার দাও। আমি তোমায় স্পর্শ করবো না। কেবল তোমার উপস্থিতিই আমার জন্য যথেষ্ট।”
রানি এ পর্যায়ে বিছানা থেকে উঠে দাঁড়ালের। হেমলকের এই আকুতি তার মন অস্থির করে তুলছে। তিনি পারছেন না এই লোকটার এত দরদে ভরা আকুতি ফিরিয়ে দিতে। তার রাগ নিভে যাচ্ছে লোকটার সামনে এসে। কেন? কেন? কেন?
তিনি তো সমস্ত পুরুষজাতিকে ঘৃণা করতেন। তিনি তো কোনো পুরুষকে ঘৃণা ছাড়া অন্য চোখে দেখতে পারেন না। কোনো পুরুষ কখনো তার কাছে অন্যরকম ভাবে উপস্থিতও হয়নি কেবল হ্যাব্রো ব্যতীত।
রানি নিজের সাথেই নিজের তর্কবিতর্কে হার মেনে নেন। দীর্ঘশ্বাস ফেলে কেবল বলেন,
“আপনি কক্ষ ছেড়ে বেরিয়ে যান। আমার একা থাকাটা প্রয়োজন।”
হেমলক আর জোর করে না। দুপুরের পর রানি তার অতীতের সেই স্মৃতিগুলো নিয়ে যে নিজের ভেতরই যুদ্ধ করছেন তা ওর বেশ জানা। তাই হেমলক রানিকে নতুন করে আর খারাপ অবস্থায় ফেলতে চায় না। বেরিয়ে যায় নীরবেই কক্ষ ছেড়ে।
রানি গিয়ে বসেন তার আরামকেদারায়। বহু বহু দিন পর তিনি আবারও মদ্য রসের পাত্রটি ঠোঁটে তুলে নেন৷ তার শান্তি প্রয়োজন। এই ভাবনা, এই যাতনা তাকে শান্তি দিচ্ছে না।
—————
নিশি গভীর থেকে গভীর হয়েছে। হেমলক তার অঙ্কন কক্ষে চিত্র আঁকছে বেশ মনোযোগ নিয়ে। রানির সেই চোখ দু'টি, সেই ঠোঁট সে মাথা থেকে বের করতে পারে না।
আর কেউ না জানলেও সে তো জানে, রানিকে সে কখনোই এতটা ভালোবাসার দৃষ্টিতে দেখেনি। দেখেছিলো কবে প্রথম সেই নজরে? যেদিন নেশার ঘোরে রানি নিজের শরীরে আঘাত করছিলো সেদিন? না যেদিন তার ভ্রাতার পরাজয় করিয়ে হাসছিলেন অসংখ্য মানুষের ভিড়ে তখন? নাকি তারও আগে? ইনান ণেকিতানের বর্ণনার পর?
প্রাসাদের নীরবতা ছিন্ন করে রানির কক্ষ থেকে ভারি বস্তু পড়ে যাওয়ার শব্দ ঝঙ্কার তুলল। বড্ড কানে এসে লাগলো সেই শব্দ। হেমলকের ভ্রু কুঁচকে এলো। দ্রুত ছুটে গেলো সে রানির কক্ষে। রানির কক্ষে এসে দাঁড়াতে তার চোখ দু'টি বিস্ময়ে হা হয়ে আছে। রানি আজ অতিরিক্ত ভারসাম্যহীন হয়ে গিয়েছেন। কক্ষের বিভিন্ন বস্তু ছুঁড়ে ছুঁড়ে ফেলতে লাগলেন এদিক-ওদিক।
আর চিৎকার করতে লাগলেন। যেন কেউ তাকে আঘাত করছে! উন্মাদের মতন সেই আচরণ।
হেমলক ছুটে গিয়ে দিক্বিদিক ভুলে রানিকে শান্ত করার চেষ্টা করল। কিন্তু রানি আরও অধিক বেপরোয়া হতে লাগলেন। বারংবার বলতে লাগলেন,
“আমাকে ওরা বার বার কষ্ট দিয়েছে। আমাকে এখানে কষ্ট দিয়েছে। এই যে এখানটাতেও..”
বলতে বলতে রানি তার শরীরের সবগুলো অঙ্গ ধরতে লাগলেন। চোখ দিয়ে অনর্গল ঝরতে লাগলো অশ্রু। যেন বহুদিন পর একটি শিশু অভিযোগ করার সুযোগ পেয়েছে।
হেমলক তাকে শান্ত করার চেষ্টা করল। বারংবার বুঝাতে লাগলো। রানি আবার বললেন, “ওরা আমাকে কেউ কখনো ভালোবাসেনি জানো? কখনো না।”
হেমলক তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে সান্ত্বনার ভঙ্গিতে বলল, “এই যে আমি বেসেছি তো। এমন করে না। তুমি তো ভীষণ লক্ষ্মী। এমন করতে হয় না।”
রানি এবার হেমলকের হাত ছাড়িয়ে নিলেন। মাথা নাড়িয়ে হাসতে হাসতে বললেন,
“না, না তুমিও বাসবে না। তুমিও বাসবে না। সব জেনে গেলে তুমিও আর বাসবে না।”
হেমলক এবার কপাল ভাঁজ করল। রানি আবোলতাবোল বলছেন ভেবে সে বুঝাতে গেলো, “না, আমি সব জানলোও ভালোবাসা ছাড়বো না।”
“ছাড়বে ছাড়বে… “ বলতে বলতেই রানি কিছুটা দূরে সরে গেলেন। দূরে গিয়েই আচমকা হেমলক বোঝার আগেই তিনি নিজের পোশাক টেনে টেনে খুলতে লাগলেন। বুক থেকে নামিয়ে ফেললেন সমস্ত পোশাক। হেমলকের সমস্ত পৃথিবী যেন সেখানেই ঘুরে উঠল নিমিষেই। সে নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছে না কী দেখেছে। তার দৈনিক মানচিত্রে যেন তীব্র পার্থক্য। এক পাশে নারীত্ব জ্বলজ্বল করলেও আরেকটা পাশ ফাঁকা। সেখানে মিশে গিয়েছে তার সমস্ত যন্ত্রণার চিহ্ন। নারীরের শরীরের স্বাভাবিক সৌন্দর্যতাও কেঁড়ে নিয়েছে কেউ! এতটা নিষ্ঠুর হয়েছে পুরুষজাত তার প্রতি! এতটা!
হেমলকের আর দেখার ধৈর্য হলো না। তার শরীর কাঁপছে। চোখ উপচে জল আসছে। সে নিজের চোখ ঢেকে নিলো। সে এই নৃশংস দৃশ্য আর দেখতে পারছে না। আর না।
রানি কেমন অদ্ভুত ভাবে হাসছেন। খিলখিলিয়ে হাসছেন। হাসতে হাসতে বললেন,
“আমার একটি স্তন নেই। আমার সৌন্দর্যতা অসমান আমার জীবনের মতনই। আমার শরীরটা দেখে এবার ভয় পাচ্ছো তো? ভয় পেও না। আমার দেহ কারো ক্ষতি করেনি। কেবল পৈচাশিক যৌনতার স্বীকার হয়েছে। তার ফলস্বরূপ আমার দেহের মানচিত্র বদলেছে। খুব যন্ত্রণা হয় জানো? খুব। আমি কত অপরিপূর্ণ দেখলে তো? দেখলে?”
হেমলক আর এক মুহূর্ত অপেক্ষা না করেই রানি উন্মুক্ত দেহটিকে জড়িয়ে ধরল নিজের সাথে। আষ্টেপৃষ্ঠে। উষ্ণতায়।
সেই রাতে চাঁদ আরও ঝলমলে হলো। রানি ডুবে গেলেন উষ্ণ আলিঙ্গনে। গভীর থেকে গভীর হলো সেই ডুবে যাওয়া। সকলের সকল হাতের চিহ্ন মলিন করতে লাগল হেমলকের ছোঁয়া। যেন এরপর থেকে রানির জীবসে একমাত্র এই পুরুষটির অস্তিত্ব থাকে। একমাত্র চিত্রশিল্পীর শৌখিন ছোঁয়ার।
·
·
·
চলবে……………………………………………………