কামিনী - পর্ব ৭৪ - মম সাহা - ধারাবাহিক গল্প

কামিনী - মম সাহা
          হ্যাভেনেন দেহ অত্যাধিক শুভ্র ছিলো। সেই শুভ্র রঙটি আরও অধিক ফ্যাকাশে হলো তার পরপরই হ্যাভেন দরজার দিকে এ পলক তাকালো। তীব্র যন্ত্রণায় বুজে আসা চোখটি নিয়ে রানিকে দেখে মৃদু হাসলো। এরপরই তার শ্বাস-প্রশ্বাস থেমে গেলো। বার দুয়েক ছটফটিয়ে চোখগুলো বন্ধ করে নিলো। 
রানি দরজায় দাঁড়িয়েই সমস্ত দৃশ্যটি দেখলেন। তার মোটেও বিশ্বাস হলো না যে হ্যাভেন নামের লোকটি আর নেই। প্রাণ পায়রা তার উড়ে গিয়েছে এক পলকেই। 

 রাজমাতা প্রাচীর যখন বোধগম্য হলো পুত্র হারানোর শোকটি তখনই তিনি চিৎকার করে উঠলেন। মরমের সকল যন্ত্রণা যেন মিলেমিশে তার বুকে আ ন্দো ল ন চালালো। তার পুত্র, তার প্রাণে চেয়েও প্রিয় পুত্রটি আর নেই। কী এমন হলো তার প্রিয় পুত্রের সাথে। ভালোই তো ছিলো সে! 

হেমলক রাজমাতার চিৎকারের পরপরই ছুটে এলো। রানিকে দরজায় দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে তার উৎকণ্ঠা বাড়ল। হড়বড়িয়ে জিজ্ঞেস করল,
“কী হলো? এমন চিৎকার করলেন কেন রাজমাতা? বেশি অসুস্থ নাকি ও?”

 রানির মুখে কোনো ভাবাবেগ হলো না সেই প্রশ্নে। এক মুহূর্ত স্থির থেকে ধীরেই বললেন,
“শত্রু বিনা যুদ্ধে মারা গেলো কেন? এই মৃত্যু তো কাম্য ছিল না।”

 মৃত্যু শব্দটা হেমলকের কানে বাজতেই সে হতভম্ব হয়ে গেলো। রানি কী বলছেন তা তার মস্তিষ্কে বোধগম্য হলো না। রানিকে ডিঙিয়ে সে হন্তদন্ত হয়ে প্রবেশ করল কক্ষে। হ্যাভেনের নিথর দেহটি দেখে তার পা থেমে গেলো। যে ঘুমিয়ে আছে ও। 
ছুটে এলো একে একে সকলেই। মামীশ্রী, রাজকন্যা লিলি, পিতামহীসহ যোগ দিলেন রাজমাতার কান্নায়। অথচ রানি কামিনী দাঁড়িয়ে রইলেন সেই দোর ধরেই। না প্রবেশ করলেন, না কাঁদলেন। 

  রাজবৈদ্য সরে গেলো। পা পিছিয়ে গিয়ে দাঁড়াল রানির কাছে। রানির চোখে স্পষ্টই প্রশ্ন। হুট করে কী এমন হলো!
মুখ ফুটে সেই প্রশ্ন প্রকাশ করতে হলো না। তার আগেই রাজবৈদ্য উত্তর দিয়ে দিলো,
“উনার হুট করে মস্তিষ্কে কোনো কারণে চাপ লেগেছিল হয়তো। নয়তো নাক-মুখ দিয়ে এমন করে গলগল করে রক্ত বের হয়ে, প্রাণনাশ হওয়ার কারণ দেখছি না।”

  রানি রাজবৈদ্যর কথা মনোযোগ সহকারে শুনে সোজাসাপটা ভাবে জিজ্ঞেস করলেন,
“ঐ বন্দী দরজার বাহিরে থাকা শিকে হাত দেওয়ার পর আমারও তো এমন রক্ত বেরিয়ে ছিলো। তাহলে তো বিষক্রিয়াও হতে পারে হ্যাভেনের এটা!”

 রানির যুক্তিতে চমকে গেলেন রাজবৈদ্য। মাথা নাড়িয়ে বললেন, “হ্যাঁ, হ্যাঁ, সেটাও হতে পারে। তবে শরীরে তো তেমন চিহ্ন পেলাম না। কোনো বিষাক্ত পোকামাকড়ও কামড়াতে পারে!”

 “তাহলে তোমার কেন প্রথমে মনে হয়েছিলো ওর মস্তিষ্কের চাপের ফলেই মৃত্যু হয়েছে?”

রাজবৈদ্য রানির প্রশ্নে দমে গেলো। রানি তাকে রীতিমতো জেরা করতে শুরু করেছেন। 

“কারণ উনার তো মস্তিষ্কে একটু সমস্যা দেখা দিয়ে ছিলো।”

 “কিন্তু সেটা সত্যিই কি সমস্যা ছিলো? না ছল?”
প্রশ্ন করে সরাসরি দৃষ্টি রাখেন রানি রাজবৈদ্যর উপর। রাজবৈদ্য আর উত্তর দেয় না। হ্যাভেনের উন্মাদনা সকলের কাছে সত্যি মনে হলেও একমাত্র রানি যে বিশ্বাস করতেন না সেটা সে জানে। কিন্তু বিশ্বাস-অবিশ্বাসের কাছে কি আর রোগ আটকায়? 

 হ্যাভেনের আকস্মিক মৃত্যুর কথা ছড়িয়ে পড়ে নিমিষেই। দাসদাসী, প্রহরী, আত্মীয়, মন্ত্রীগণ, সেনাপতি সকলেই ছুটে ছুটে আসতে লাগলো। কিছু সময়ের ব্যবধানেই রাজপ্রাসাদ মানুষে গমগম করতে লাগল। অথচ রানি গিয়ে যে সেই নিজের কক্ষে বসলেন, আর বের হলেন না। তার চোখে ভাসতে লাগল কত কী!
 হ্যাভেনের সাথে তার যেদিন প্রথম দেখা হয় তিনি জানতেন না হ্যাভেন কোনো রাজ্যের রাজা। ভেবেছিলেন নিতান্তই স্বাভাবিক কোনো মানব, যে রানিকে প্রথম দেখাতেই মুগ্ধ করছিলো। 
এরপর রানি যেদিন প্রথম এই রাজ্যে এসে জানলেন হ্যাভেন এইখানের রাজা এবং তার একটি রানিও আছে তখন কি তিনি একটুও চমকাননি? চমকে ছিলেন অবশ্যই। সেটি অস্বীকার করার জো নেই। এবং সেই চমকই বোধহয় হ্যাভেনের প্রতি তার মনকে শক্ত করে দিয়েছিলো। তারপরও নানান ঘটনায় তিনি ঐ মুগ্ধতা কাটিয়ে ফেলতে চাইলেন। হয়তো পারলেনও! 
 তবুও কেন আজ হ্যাভেনের মৃত্যু তার পরাজয় মনে হচ্ছে? কেন? হ্যাভেনকে তিনি বাঁচিয়ে রেখে মুগ্ধতা ভাঙার, তার সাথে মিথ্যা বলার সেই কষ্ট ফিরিয়ে দিতে চেয়েছিলেন। তা পারেননি বলেই হয়তো কষ্ট হচ্ছে। কিংবা ঐ এক প্রহরের মুগ্ধতার জন্য হয়তো…

  আর বেশি কিছু ভাবেন না তিনি। তার শরীর ক্লান্ত লাগে। শুয়ে পড়েন বিছানায়। তিনি বলেই হয়তো এই অদ্ভুত কাজটি করতে পারছেন। প্রাসাদে প্রাক্তন রাজা সদ্য মৃত্যু নিয়ে গুঞ্জনের মাঝেও অনায়াসেই নিদ্রায় ডুবে যাচ্ছেন। 
জীবনের অদ্ভুত সময়গুলোতে তিনি নিদ্রাকেই বেছে নেন। যখন পরিস্থিতি বিপরীতে থাকে এবং মেনে নেওয়া ছাড়া কোনো গতি থাকে না তখন পরিস্থিতিকে তার নিজের হালে চলতে দেওয়াকেই তিনি সঠিক সিদ্ধান্ত হিসেবে মেনে নেন।

—————

 ক্যামিলাস রাজ্যের প্রাক্তন রাজার অকাল মৃত্যুর সংবাদটি খুব দ্রুতই ছড়িয়ে গেলো নিজ রাজ্য থেকে প্রতিবেশী রাজ্যগুলোতেও। রাত্রি কাটতে কাটতেই বিভিন্ন রাজ্যের রাজারা রাজনৈতিক সম্পর্কের খাতিরেও উপস্থিত হয়ে গেলেন। এলেন শুভাকাঙ্ক্ষী, আত্মীয়রা। 
হ্যাভেনের মৃতদেহ রাখা হলো প্রাসাদের সামনেই। সকলে আসছে, ফুল অর্পণ করছে, শোক প্রকাশ করছে। রাজমাতার কান্না ফুরিয়েছে বহুক্ষণ হলো। মাঝে মাঝে নাক টানছেন। চোখগুলো পাথর প্রায়। ছেলের এই মৃত্যু যে তিনি মেনে নিতে পারেননি তা তার চোখের শোকেই স্পষ্ট। 

   হেমলক যখন রানির কক্ষে প্রবেশ করল তখন সকাল পুরোপুরি হয়ে গিয়েছে। সূর্য মাথার উপর জ্বলছে সর্বোচ্চ আলোয়। পর্দা ভেদ করে সেই আলোর কিছুটা এসে রানির চোখে-মুখে বিস্তৃত হয়ে ছড়িয়ে পড়ছে। তিনি বসে আছেন কেদারায়। পরনে নরম, মৃদু পোশাক। অলঙ্কার যথেষ্ট, যা সবসময় পরেন। মুখ দেখে বোঝার উপায় নেই তার প্রাসাদের কেউ মারা গিয়েছে যে। সেই অঢেল জৌলুশ শরীর জুড়ে। 
 হেমলক স্নান সেরেই এসেছে একেবারে। শুদ্ধ, পবিত্র শরীর। চুলগুলো ভেজা তার এখনও৷ রানির দিকে ফিরে ফিরে দেখছে সে। রানির মুখটি দেখে মোটেও বোঝার উপায় নেই শোকে আছেন না সুখে। 

 হেমলক সেই প্রসঙ্গে গেলো না। আস্তে বলল কেবল, “ওকে নেওয়া হবে এখুনি। বিদায় দিতে আসো।”

“আমার বিদায়ের প্রয়োজন আছে বলে মনে হচ্ছে না। আমি উনার তেমন কেউ নই।”

 “কেউ হয়তো নও। কিন্তু প্রাসাদের ও রাজ্যের রানি তো! শেষবেলায় তাই তাকে সামান্য প্রজা হিসেবেই না-হয় বিদায় দিলে!”

“আমি? আমাকে বিদায় দিতে বলছেন? পরে আবার বুকে কষ্ট হচ্ছে বলে হাপিত্যেশ করবেন না তো?”
 কোনো ভণিতা ছাড়াই প্রশ্নটি ছুঁড়লেন রানি। হেমলক বুঝল গত রাতের কথাটি রানি তাকে ফিরিয়ে দিচ্ছেন ইঙ্গিতে। কিন্তু সে সেই সম্পর্কিত বাকবিতন্ডায় গেলো না। সহজ সরল স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিলো, 
“আমি বুঝতে পারিনি ওর এমনকিছু হয়ে গিয়েছে। ভেবেছিলাম হয়তো নতুন কোনো ছল আবারও!”

 “কিন্তু আমার তা মনে হচ্ছে না।” কথাটি বলে রানি সরাসরি এবার হেমলকের দিকে তাকালেন। যেন তার কথার ভেতরেই অন্য ইঙ্গিত। অন্য ইশারা। 
 সেই ইশারা হেমলক বুঝবে না তেমন অবুঝতো সে নয়। তবে রানির ইঙ্গিত করা দোষটি সে অস্বীকৃতি জানালো,
“ও আমার ভ্রাতা হয়! ওর দুঃসময়ে আমি থাকব না সেটা ভেবো না।”

 “আমার কেন মনে হচ্ছে এটা স্বাভাবিক নয়?”

“আমি ওর জন্য তোমাকে তুলে এনেছিলাম, তাই কিছু ভাবার আগে আমার ঐ অনুভূতিটুকুর মূল্যায়ন করো।”

 রানি আর কথার পিঠে কথা বাড়ালেন না। এই শোকের আবহাওয়ায় কিছু বলাটাও অশোভন ছিলো বলেই হয়তো চুপ করে গেলেন। 
হেমলক বেরিয়ে গেলো কক্ষ ছেড়ে। বের হতেই দেখল মৃন্ময়ী এসেছে। তাকে দেখেই মৃন্ময়ী এগিয়ে এলো। অনেক স্বান্তনা দিলো। বোঝালো। 

ঢাক, ঢোল নিয়ে হ্যাভেনের শেষ যাত্রার শুভারম্ভ শুরু হলো। প্রজারা এসে সারিবদ্ধ হয়ে দাঁড়ালো পথের দুই ধারে। হ্যাভেন তাদের প্রাক্তন রাজা ছিলো এই কথাটি ভুলে গেলে যে চলবে না। 
 বিদায়ের আগ মুহূর্তে রানি এসে দাঁড়ালেন। হেমলক দেখলো তখনোর অলঙ্কারগুলো নেই রানির গায়ে। একেবারেই আর পাঁচটা সাধারণ মানুষের মতনই তার সাজসজ্জা। 
এসে সকলের মতন ফুল অর্পণ করলেন হ্যাভেনে উদ্দেশ্যে। রাজ পুরোহিতকে ডেকে সমস্ত দায়িত্ব বুঝিয়ে দিলেন। যেখানে যতটুকু প্রয়োজন সমস্ত যেন সঠিকভাবে পালিত হয় তা তিনি বার বার করে স্মরণ করিয়ে দিলেন। হ্যাভেন তার শত্রু হোক কিংবা বন্ধু সেটা এখানে একটুও প্রভাব ফেলবে না। এখানে সবচেয়ে বড়ো কথা হ্যাভেন এই রাজ্যের প্রাক্তন রাজা ছিলো। এবং তাকে সেই সম্মানেই শেষ বিদায়টুকু দেওয়া হবে। 

 হ্যাভেনের শবদেহ নিয়ে সকলে চলতে লাগলো। রাজ্যের সকল মানুষ যেন কার পেছনে ছুটল। কেবল দাঁড়িয়ে রইলেন রানি। দীর্ঘশ্বাস ফেলে বিড়বিড় করে বললেন,
“অনেককিছু জানার ছিলো আমার। অনেককিছু। তুমি মরে গিয়ে বেঁচে গেলে। তোমার সমস্ত দোষ ক্ষমা করে দিলাম। যাও, তুমি মুক্ত।”

 প্রাসাদ খালি হয়ে সমস্ত লোক বের হয়ে গেলো। রানি প্রাসাদে ফিরে যেতে নিলেই একটি পুরুষালি কণ্ঠ তাকে পিছু ডাকল,
“রানি, আপনি রাজ্যে ফিরলেন না কেন? আপনাকে যে পত্র পাঠানো হলো, দেখেননি?”

 রানি ভ্রু কুঁচকে পিছনে তাকাতেই দেখলেন হ্যাব্রো ঘোড়ায় বসা। তিনি অবাক হলেন পত্রের কথা শুনে। তার কাছে তো এখনও কোনো পত্র এসে পৌঁছায়নি!
 রানি যে পত্র পাননি তা হ্যাব্রে রানির অভিব্যক্তি দেখেই বুঝতে পারল। কথা বিশেষ না ঘুরিয়ে বলল,
“শশীপূর্ণাকে পাওয়া গিয়েছে। আপনি যদি রাজ্যতে যেতেন খুব ভালো হতো।”

  “তুমি কি তাকে পাওয়ার খোঁজই পত্রতে লিখে ছিলে?”

“হ্যাঁ।”

  “পত্রটি তাহলে আমার কাছে পৌঁছালো না কেন! তাহলে কি অন্য কারো হাতে পড়েছে? পড়লেও বা কী! এটা তো লুকানোর মতন কিছু ছিলো না। না-কি ছিলো আদৌ! পত্রতে তুমি কী লিখেছিলে বলবে?”

“শশীপূর্ণাকে পাওয়ার কথাই লিখে ছিলাম। আর লিখে ছিলাম আমাদের রাজ্যে হুট করে ছড়িয়ে পড়া ঐ ছোঁয়াচে রোগটি সম্পর্কে ও কিছু জানে। কিন্তু বলতে চাচ্ছে না।”

রানির কুঁচকানো ভ্রু আরও কুঁচকে আসে। 
 ছোঁয়াচে রোগটি তাহলে প্রাকৃতিক ছিলো না? আর সেই কথা এই প্রাসাদের কেউ জেনে পত্র লুকিয়েছে? কিন্তু কেন! রানির ষষ্ঠীয় ইন্দ্র যেন কেন'র উত্তরটা অকপটেই ধরতে পারল। তবে, তবে কি এই রাজ্যের কেউই…
·
·
·
চলবে……………………………………………………

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

WhatsApp