করার মতো কিছু না পেয়ে শেষমেশ ধানমন্ডি লেকের চারপাশে অনেকক্ষণ উদ্দেশ্যহীনভাবে হাঁটলাম।
সাধারণত আমি ঢাকার সেই ব্যস্ত মানুষদের একজন যাদের সবসময় কোথাও না কোথাও পৌঁছার একটা তাড়া থাকে। হাঁটার সময় সাধারণত ফুটপাতের লোকজনের চোখের দিকে না তাকিয়ে দ্রুত পা ফেলে গন্তব্যে পৌঁছে যাই। কিন্তু আজ আমার কোনো গন্তব্য নেই। সূর্য ধীরে ধীরে মেঘের আড়ালে লুকিয়ে গেল, গুঁড়িগুঁড়ি বৃষ্টি একসময় টানা ঝিরঝিরে বৃষ্টিতে পরিণত হলো, আর আমি উদ্দেশ্যহীনভাবেই হাঁটতে থাকলাম।
তবুও হাঁটতেই থাকলাম। আমার গায়ে তেমন কোনো ভারী কোনো কাপড় না থাকায় হিম হিম ঠান্ডা বাতাসটা বেশ লাগছে। অনেকক্ষণ হাঁটার কারণে পা দুটো ব্যথায় টনটন করছে, কিন্তু তাতে আমার কিছু যায় আসে না।
পুরোটা সময় আমার মাথায় শুধু নাবিলাই ঘুরছে। আমি কীভাবে সবকিছু নষ্ট করে ফেললাম, কীভাবে এতকিছু হয়ে গেল... আমি নিজেই বুঝতে পারছি না। আমার স্পষ্ট মনে আছে, তানজিনার ঘরে ফোনটা আমি রেখে আসিনি। আলমারির সেই ব্লিচিং পাউডারের বোতলটা আমার ছিল না। আমি কখনও গোল্ডির সাথে এমন করিনি। এটা একেবারেই সম্ভব না।
তানজিনা চাইত নাবিলা আর আমার সংসারটা ভেঙে যাক। শুরু থেকেই এটাই ছিল ওর লক্ষ্য। কিন্তু আমার আরো ভয় হচ্ছে। এটাই হয়তো ওর একমাত্র লক্ষ্য নয়। এটা তো কেবল শুরু।
প্রায় দুই ঘণ্টা হাঁটলাম। রাত আটটার পর বাড়ি ফিরলাম। পাঞ্জাবিটা ভিজে গায়ে লেপটে আছে, পা দুটো যেন আগুনের মতো জ্বলছে, চুল মাথার সাথে সেঁটে গেছে। তবু ভালোই লাগছে। নাবিলাকে ভাবলেই যে তীক্ষ্ণ কষ্টটা বুকের ভেতর ছ্যাঁৎ করে ওঠে, যেভাবেই হোক ওই অনুভূতিটা পেতে চাই না। অন্য কোনো অনুভূতি দিয়ে এটা রিপ্লেস করে যে কতক্ষণ থাকতে পারব তা-ও জানি না।
ওপরে অল্প একটু আলো জ্বলছে। আলো দেখে মুহূর্তের জন্য আমার ভেতর আশার ঝলক উঠল। নাবিলা কি ফিরে এসেছে? মন বদলেছে?
কিন্তু না। দরজার পাশে তানজিনার স্যান্ডেল পড়ে আছে। ওপরে তাহলে তানজিনাই আছে।
দোতলার দিকে তাকাতেই পেটের ভেতর থেকে একটা ভারী গুড়গুড় শব্দ উঠল। এতক্ষণে বুঝলাম, আমি কতটা ক্ষুধার্ত। আজকে তো নাবিলাকে ডিনারে নিয়ে যাওয়ার কথা ছিল... কিন্তু সেটা আর হচ্ছে না। তাহলে ফ্রিজ থেকে যা আছে খুঁজে খাই। মাছিগুলো নিশ্চয়ই এখন আর নেই।
ফ্রিজ খুলে গত রাতের বিরিয়ানির একটা প্যাকেট দেখতে পেলাম। নাবিলা আর আমি— দুজনে মিলে একটা প্যাকেট শেষ করেছিলাম। অন্যটা এখনো রয়ে গেছে। বেশ হলো। নষ্ট না হলে ওটাই খেয়ে ফেলা যাবে।
ফ্রিজে এক বোতল ঠান্ডা কোকও আছে।
বিরিয়ানি গরম না করেই খাওয়া যাবে। আমার ঠান্ডা বিরিয়ানিই বেশি পছন্দ। কোকের ক্যান খুলে এক চুমুকে প্রায় অর্ধেক শেষ করে ফেললাম, তারপর বিরিয়ানির প্যাকেট আর কোক নিয়ে ড্রয়িংরুমে চলে গেলাম।
আজ রাতে নাবিলার সাথে বাইরে যাওয়া হচ্ছে না। তাহলে একটু আরাম করেই খাই।
টিভি অন করে একটা টকশো চালালাম, তারপর সোফায় গা এলিয়ে দিলাম বিরিয়ানির প্যাকেট হাতে নিয়ে। প্যাকেট খুলতেই কাচ্চি বিরিয়ানির সুবাস নাকে লাগল। চামচ দিয়ে এক চামচ তুললাম। মুখে ঢুকিয়ে ভাবলাম পেটের ভেতরের কষ্টটা একটু কমবে। আয়েশ করে চিবোতে শুরু করলাম, আর তখনই...
হঠাৎ আমার দম বন্ধ হয়ে যাবার উপক্রম হলো।
আপনার নিশ্চয়ই জানা আছে খাবারের সাথে কখনও যদি মুখের ভেতর চুল ঢুকে যায় তখন কেমন লাগে। মুখের ভেতওে জঘন্য একটা অনুভূতি হয়।
বুঝতে পারলাম, বিরিয়ানির সাথে সাথে আমার মুখের ভেতর এক গোছা চুল ঢুকে গেছে। প্যাচানো প্যাচানো চুল! মনে হচ্ছে চুলের কিছু অংশ গলার ভেতরেও ঢুকে গেছে!
ওয়াক থু বলে আমি হাতের প্যাকেটটা সোফার ওপর ছুঁড়ে ফেললাম। তারপর দৌড়ে বেসিনে গিয়ে বমি করার চেষ্টা করলাম। অনেক কসরত করার পরে মুখের ভেতরের সব খাবার বেসিনে ফেলে দিতে সক্ষম হলাম। খাবারের সাথে মেশানো চুলের গোছা দেখে আমি পেটের ভেতরটা আবার গুলিয়ে উঠল। মনে হচ্ছে এখনো গলার ভেতরে কিছু ছুললৈ আটকে আছে!
বিরিয়ানের প্যাকেটে এত চুল কীভাবে আসবে। তাও লম্বা লম্বা সব চুল!
হাঁপাতে হাঁপাতে একটা চুল হাত ঢুকিয়ে গলার ভেতর থেকে বের করে আনলাম। মনে হচ্ছে আমার দম বন্ধ হয়ে যাবে। মুখের ভেতর আবার আঙুল ঢুকালাম। টান দিতেই একটা চুল গলার স্বরযন্ত্রে ঘষা খেতে খেতে বের হয়ে এলো। প্রায় দশ ইঞ্চি লম্বা চুল! ওয়াক! এই চুলটা পেটের ভেতর ঢুকে গেলে আমি নিশ্চত অসুস্থ হয়ে পড়তাম।
এত লম্বা চুলটা কার হতে পারে এ নিয়ে আমার বিন্দুমাত্র সন্দেহ রইল না।
বুকের এতটা রাগ জমে উঠল যা আমি জীবনে আগে কখনও অনুভব করিনি। গ্লাসে পানি ঢেলে এক ঢুঁকে পুরোটা পানি গিলে ফেললাম। মাথার ভেতর ভোঁ ভোঁ করছে। যদি তানজিনা এই মুহূর্তে আমার সামনে থাকত, ছুরি রাখার স্ট্যান্ড থেকে একটা ছুরি তুলে নিয়ে...
না, আহসান, থামো। নিজেকে সামলাও।
আমি লম্বা করে একটা দম নিলাম। তবু শান্ত হতে পারছি না। তানজিনা আমার ফ্ল্যাটটাকে পোকা-মাকড়ে ভরিয়ে দিয়েছে, আমাকে ভয়ংকর র্যাশ দিয়েছে, আমার মাছটাকে মেরেছে, আর আমার জীবনের একমাত্র ভালো মানুষটার সাথে সম্পর্ক ধ্বংস করে দিয়েছে। কেন? কী জন্য? আমি আর এক সেকেন্ডও এটা সহ্য করতে পারছি না।
এই শেষ। একদম শেষ। ওর খেলা আজকেই শেষ।
আমি ঝড়ের বেগে সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠলাম, প্রতিটা ধাপে রাগ আরও বাড়তে থাকল। দোতলায় উঠতেই দেখলাম তানজিনার দরজার নিচে আলো জ্বলছে। আমি খুব, খুব খুশি। ও বাসাতেই আছে।
আমি দরজায় হাতের তালু দিয়ে ঠাস ঠাস করে আঘাত করতে থাকলাম। প্রতিবার শব্দটার তীব্রতা আরও বাড়তে থাকল।
প্রায় এক মিনিট পর তানজিনা ধীরেসুস্থে দরজা খুলল। মনে হচ্ছে ঘুমাবার জন্য তৈরি হয়ে গেছে— সালোয়ার আর হাতকাটা কামিজ পরে আছে, খোলা চুল। ওর পারনের পাতলা পোশাকটা এক মুহূর্তের জন্য আমাকে থামিয়ে দিলেও শেষমেশ নিজেকে সামলে নিলাম। মনে হচ্ছে ও শেষ না হওয়া পর্যন্ত ওর ফর্সা গলাটা দুহাত দিয়ে টিপে ধরে থাকি।
“আমি চাই তুমি এখনই এখান থেকে বেরিয়ে যাও,” আমি দাঁতে দাঁত চেপে বললাম।
“আপনাকেও শুভ সন্ধ্যা, আহসান ভাই।” ওর ঠোঁটে বাঁকা হাসি। “আজ নাবিলা ভাবি কোথায়?”
আমার মুঠো আরও শক্ত হলো। “আমি চাই তুমি এখনই বেরিয়ে যাও।”
ও চোখ পিটপিট করল। “কী বললেন?”
“শুনতে পাচ্ছো না? এখনই আমার বাড়ি থেকে বের হয়ে যাও। এখনই।”
“এখন তো রাত,” ও বলল। “আপনি কি সত্যি আশা করছেন আমি এই মুহূর্তে জিনিসপত্র গুছিয়ে রাস্তায় নেমে পড়ব?”
“রাত না দিন, ওটা আমার মাথাব্যথা না,” আমি ওর মুখের দিকে থুথু ছিটিয়ে বললাম। “এটা আমার বাড়ি। আমি চাই তুমি চলে যাও। আমার সহ্যসীমা শেষ হয়ে গেছে। শেষ। বুঝতে পারছো?”
ওর নাক-মুখ শক্ত হয়ে গেল। “তাহলে দুর্ভাগ্য, ভাইয়া। চাইলেই মাঝরাতে কোনো নোটিশ ছাড়া আমাকে বের করে দিতে পারবেন না। আমি এখানে ভাড়া দিয়ে থাকছি। আমার আইনগত অধিকার আছে।”
“হ্যাঁ, কিন্তু...” আমি এমন দৃষ্টিতে তাকালাম যাতে ওর শরীরের চামড়া পুড়ে খসে পড়ে। আমি খুব ধীরে পরিষ্কার করে বললাম,“নিজের নিরাপত্তার জন্যই তুমি এখন এখান থেকে চলে যাবে।”
ও ভ্রু নাচাল। “তাই নাকি? কী করবেন আপনি?”
ও কি মজা করছে? আমি ওর চেয়ে অন্তত ছয় ইঞ্চি লম্বা, আর শক্তিতে অনেক এগিয়ে। আমি অনেক কিছু করতে পারি। আমি ওকে গুঁড়িয়ে দিতে পারি।
আমি কল্পনা করলাম, আমার হাত ওর ঐ হাসিমাখা মুখে দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। কল্পনা করলাম, ওর চিকন গলায় আমার আঙুল পেঁচিয়ে চেপে ধরে আছি যতক্ষণ না দম বন্ধ হয়ে যায়। ভীষণ শান্তি লাগছে।
বাস্তবেও আমি এক ধাপ এগিয়ে গেলাম, মুঠো এখনো শক্ত। কিন্তু তানজিনা একটুও কাঁপল না।
ও আমার ব্লাফ ধরে ফেলেছে। আমি যতই রাগে ফুঁসি, আমি ওকে আঘাত করতে পারব না। ও হয়তো জানে, আমি জীবনে কখনও কোনো নারীর গায়ে হাত দিইনি। ও হয়তো বুঝে ফেলেছে, চাইলেও আমি ওটা করতে পারব না। চাইলেও... আমার ভেতরে সেই পশুটা নেই।
আমি দাঁত চেপে বললাম, “তাহলে ধরে নাও এটা তোমার এক মাসের নোটিশ।”
এক মাসের মধ্যে ও চলে না গেলে, আমি ওর সব জিনিসপত্র তুলে রাস্তায় ছুঁড়ে ফেলব। জিডি করলে করুক। আমি এমনিতেই সব হারিয়েছি।
“ওহ, চিন্তা করবেন না,” তানজিনা হাসতে হাসতে বলল, “আমি এর অনেক আগেই চলে যাব।”
এই বলে ও দরজাটা আমার মুখের ওপর ধাম করে বন্ধ করে দিল। এরপর একটা ক্লিক শব্দ। ও দরজাটা লক করে ফেলেছে।
ওর শেষ কথাটা শুনে আমার স্বস্তি পাওয়ার কথা। শেষমেশ আমি তো ওকে বিদায় করতেই চাই। কিন্তু ওর কথা বলাটার ধরন আমাকে অস্বস্তিতে ফেলে দিল।
আমার মনে হলো ও আমাকে স্বস্তি দিতে চায়নি। ও আমাকে হুমকি দিচ্ছে।
·
·
·
চলবে……………………………………………………