আমি এখন একেবারে টালমাটাল অবস্থায় আছি।
বিয়ারের বোতলটা শেষ করলাম। না, আমি কখনো বিয়ার খাইনি। ‘ চৌধুরী এন্ড খান কোম্পানিতে কাজ করার সময় দেখেছি বড় বড় স্যাররা কিঞ্চিত বিয়ার পান করেন। তবে আমি এটা একদম পছন্দ করতাম না। এখনো করি না। কিন্তু রেস্টুরেন্ট থেকে ফেরার পর মনে হলো আমি যে করুন অবস্থায় আছি সেটা ভুলে থাকতে চাইলে আমার একটু বিয়ার দরকার। আর বিয়ার কোথায় পাওয়া যায় সেটাও আমার জানা ছিল। সত্যিই আজ রাতে আমার এমন কিছুই দরকার ছিল, যা বুকের ভেতরের চিনচিনে ব্যথাটাকে একটু অবশ করে দেবে।
আমার জীবনটা একদম ভেঙে গেছে। ভিপি হওয়ার স্বপ্ন শেষ, এখন আমি একটা টেম্পারারি জব করছি। সেভিংস প্রায় খালি হয়ে গেছে। আগামী মাসে লোনের কিন্তু কীভাবে দেব তা-ও বুঝতে পারছি না। তানজিনার ভাড়াটা এত সব ঘাটতি পূরণ করতে পারবে না। নাবিলাও চলে গেছে।
আর আমার সাবলেট ভাড়াটে... আমার সাথে এমন সব শত্রুতা করছে, যার কারণটাই আমি জানি না।
বিয়ারটা শেষ করে আমি হোঁচট খেতে খেতে রান্নাঘরের দিকে গেলাম বোতলটা রাখতে। গত কয়েক দিনে মাছিদেও সংখ্যা আবার বেড়েছে। কোথায় কোন পচা জিনিস তানজিনা আবার লুকিয়ে রেখেছে, ভাবতেই ইচ্ছে করছে না। এখন ওসব খুঁজে বের করার শক্তিও নেই।
বোতলটা রেখে ধুকতে ধুকতে ড্রয়িংরুমের দিকে ফিরলাম। ঠিক সোফার কাছে যেতেই কার্পেটের কোণায় পা আটকে গেল। কার্পেটের এক কোণা উঠে গেছে, আর আমি হাঁটু গেড়ে পড়ে গেলাম।
পড়ে গিয়ে খুব রাগ হলো। দাঁতে দাঁত চেপে কাকে জানি গালি দিতে থাকলাম। মনে হচ্ছে, আমি যতটা ভাবছিলাম তার চেয়েও বেশি নেশা করে ফেলেছি। ধুর ছাই! এই কার্পেটেইবা কীভাবে পা আটকাল বুঝলাম না। গালমন্দ করতে করতে কোণাটা ঠিক করতে গিয়ে দেখলাম পুরো কার্পেটটাই একটু সরে আছে। সোফার নিচে ঢোকার কথা যে কোণাটা, সেটা ঢোকেনি— আর এজন্যই আমি হোঁচট খেয়েছি।
এতক্ষণ খেয়াল না করলেও এখন বুঝতে পারছি, গত কয়েক সপ্তাহের কোনো এক সময় এই কার্পেটটা সরেছে। আগে এর বেশির ভাগটাই টি-টেবিলের নিচে থাকত, এখন অর্ধেকের বেশি টেবিলের পাশ দিয়ে সরে এসে সোফা থেকে রান্নাঘরে যাওয়ার পথ ঢেকে দিয়েছে। আর এজন্যই এই কদিন ড্রয়িংরুমটাকেও কেমন জানি অন্য রকম লাগছিল। এতদিন ব্যাপারটা বুঝতে না পারলেও এখন ধরতে পারলাম।
কিন্তু... কেইবা কার্পেটটা এভাবে সরাবে, কেনই বা সরাবে?
নেশার কারণেই হোক বা স্বাভাবিকভাবেই হোক, ইচ্ছে হলো কার্পেটটাকে এখনই আবার ঠিক জায়গায় বসাব। টি-টেবিলটা ঠেলে সরিয়ে দিলাম, তারপর কার্পেটটা টেনে তুলতে গেলাম। কিন্তু কার্পেটটা টানতেই দেখতে পেলাম, যেখানে কার্পেটটা ছিল, ওই টাইলসের ওপর একটা বড় লালচে-বাদামি দাগ।
এটা আবার কী?
মেঝেতে দাগ কেন? আমি চোখ কুঁচকে দেখলাম। এটা তো আগে কখনো দেখিনি। কিন্তু দাগটাকে দেখে মনে হচ্ছে অনেক পুরোনো। কার্পেটটাও তো পরিষ্কার। তাহলে কার্পেটের নিচে দাগ এলো কীভাবে?
কেউ কি দাগটা ঢাকতেই কার্পেটটা সরিয়েছে?
আমি দাগটার দিকে তাকিয়ে রইলাম। প্রায় আধ ফুট মতো ছড়ানো, আনিয়মতি আর বৃত্তাকার। দেখে মনে হচ্ছে এখানে কেউ হয়তো লাল রঙের কোনো তরল ফেলে দিয়েছে।
আমি পাশে ঝুঁকে হাত বোলালাম। অনেক আগেই দাগটা শুকিয়ে গেছে। তোলা যাবে তো?
আবার রান্নাঘরে গিয়ে ভেজা টিস্যু কয়েকটা আর বেসিনের নিচ থেকে ফ্লোর ক্লিনার স্প্রে নিয়ে এলাম। যদি তানজিনা আমার মেঝেতে কিছু ঢেলে দাগ বসিয়ে দিয়ে থাকে আর সেটা না ওঠে, আমি তাহলে আজ ওর খবর করে ছাড়ব! দাগ তুলতে যত টাকা খরচ হবে তার সবটাই ওর এডভান্সের টাকা থেকে কাটা হবে।
মেঝেতে ক্লিনারটা স্প্রে করে প্রায় এক মিনিট অপেক্ষা করলাম। এক মিনিট হয়তো কম হয়ে যাবে, কিন্তু সারারাত ধরে আমি বসে বসে মেঝে ঘষতে চাই না। যাক টিস্যু দিয়ে একবার ঘষা দিতেই কিছুটা দাগ উঠে টিস্যুতে চলে এল। কিন্তু—
শুকনা অবস্থায় ব্যাপারটা বুঝতে পারিনি। এ দাগ তো বাদামি না। গাঢ় লাল। ওয়াইন? না, বাংলাদেশে ওয়াইন খাওয়ার চল কম, আর তানজিনা তো এসব ছোঁয় না। রুহ আফজা? ওটার রংও তো লাল। যদিও... দাগটা ঠিক শরবতের দাগের মতো লাগছে না, দাগের মধ্যে রুহ আফজার হালকা গোলাপি আভাটা নেই। তাহলে আর কী হতে পারে? এমন কোন গাঢ় লাল রঙের তরল মেঝেতে এমনটা দাগের সৃষ্টি করে?
হুম... একটা জিনিস হতে পারে।
হুম, রংটা একদম রক্তের মতো। শরবতের চেয়ে এই রংটা রক্তের সাথেই বেশি মেলে। আর একটা অদ্ভুত লোহার মতো গন্ধও আছে। কিন্তু এটা রক্ত হতে পারে না। কারণ আমার ড্রয়িংরুমের মেঝেতে রক্তের দাগ আসবে কোথেকে?
আমি টিস্যুর দিকে তাকিয়ে আছি, মাথায় বিয়ারের ঘোর, কী করব ঠিক বুঝতে পারছি না। এমন সময় ডোরবেল বেজে উঠল। আমি লাফিয়ে উঠলাম। বুক ধড়ফড় করছে। নাবিলা নাকি? আমার সাথে কোনো যোগাযোগ হয়তো করেনি, কিন্তু ঠিকই হঠাৎ করে চলে এসেছে... আমাকে সারপ্রাইজ দেয়ার জন্য। সারপ্রাইজ না হোক, অন্তত কিছু জামা-কাপড় নিতেও তো আসতে পারে।
আমি চাই এটাই হোক।
এক সেকেন্ড ভেবে আমি দ্রুত কার্পেটটা টেনে দাগের ওপর আবার ঢেকে দিলাম। নাবিলা যেন এটা দেখতে না পায়।
কিন্তু দরজার ফুটো দিয়ে তাকিয়ে দেখলাম— না, নাবিলা নয়। দরজার সামনে একটা লোক, ফরমাল শার্ট-প্যান্ট পরা। আমি তাকে চিনি না। কয়েক সেকেন্ড আমি চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইলাম। রাত আটটায় আমার বাসায় কে এমন করে বেল বাজাতে আসে?
লোকটা আবার বেল বাজাল।
“কে?” আমি দরজার ভেতর থেকে বললাম।
“আমি সাব-ইন্সপেক্টর কবির, ধানমন্ডি থানা থেকে,” সে চেচিয়ে বলল। “একটু সময় দেবেন, আহসান সাহেব?”
ঈুলিশ কেন আমার দরজায় আসবে? আমি কাঁধের ওপর দিয়ে কার্পেটটার দিকে তাকালাম। ওটাই এখন একমাত্র বস্তু যা আমার ঘরের মেঝেতে থাকা সম্ভাব্য রক্তের দাগটা ঢেকে রেখেছে। কিন্তু... পুলিশ তো এজন্য আসেনি।
ধুর! এখনই কোনো পুলিশকে ঘরে ঢোকাতে মন চাইছে না। কিন্তু আমি কী করব? বলব কি, ‘প্লিজ চলে যান, পরে আসবেন’? এটা তো সম্ভব না।
অবশেষে আমি দরজা একটু ফাঁক করে খুললাম। বাইরের হালকা ঠান্ডা হাওয়া গায়ে লাগতেই মনে পড়ল— আমি শুধু ভেতরের স্যান্ডো গেঞ্জি আর ট্রাউজার পরে আছি। পুলিশের সাথে কথা বলার জন্য এটা নিশ্চয়ই খুবই বাজে পোশাক। তবে ইন্সপেক্টর সাহেব নিশ্চয়ই এর চেয়েও খারাপ পোশাক দেখে অভ্যস্ত আছেন।
ইন্সপেক্টও সাহেব দেখতে খুব সাধারণ। বয়স চল্লিশের কাছাকাছি, কালো চুল, চোখে চশমা। চেহারায় বিশেষ কিছু নেই— শুধু গালে দুটো ভাঁজ, যার জন্য তাকে বয়সের চেয়ে একটু বেশিই বয়স্ক দেখাচ্ছে। সবচেয়ে চোখে পড়ার মতো ব্যাপার হলো তার কণ্ঠ। উচ্চতা-গড়নের তুলনায় কণ্ঠটা অস্বাভাবিক গভীর।
“আহসান চৌধুরী?”
“জি।”
“এসআই কবির,” সে বলল। যদিও নামটা সে আগেই বলেছিল। “আপনাকে কয়েকটা প্রশ্ন করতে চাইছিলাম। আপনার পাশের ফ্ল্যাটের ভদ্রলোককে নিয়ে।”
আমার ফ্ল্যাটে পুলিশ ঢুকে কার্পেটের নিচে সন্দেহজনক রক্তের দাগ নিয়ে কথা বলার চাইতে হক সাহেবের মৃত্যু নিয়ে কথা বলতে চাওয়ায় আমি বেশ স্বস্তি পেলাম। পুলিশ তো আর নিশ্চয়ই কোনো খুনের তদন্ত করতে আসেনি। তবে হক সাহেবকে নিয়ে কথা বলতে চাচ্ছে কেন এটাও বুঝতে পারছি না। ব্যাপারটা হয়তো রুটিন ইনকুইরি। নব্বই ছুঁইছুঁই এক লোক বাথরুমে পড়ে মাথা ফাটিয়ে মারা গেছে— এতে আর এমন কী রহস্য?
“ঠিক আছে।” আমি এক পা পিছিয়ে গেলাম, ডান হাতে থাকা ভেজা টিস্যুটা পকেটে লুকালাম। “ভেতরে আসুন।”
এসআই ভেতরে ঢুকলে আমি দরজা বন্ধ করলাম। খালি গায়ে দাঁড়িয়ে আছি বলে অস্বস্তি বোধ করলাম। অন্তত একটা টি-শার্ট তো পরা উচিত ছিল!
“ফ্ল্যাটটা সুন্দর,” এসআই বলল।
“থ্যাংকস।” আমি হাসতে চেষ্টা করলাম, কিন্তু হাসিটা খানিকটা বেঁকে গেল। “তো... কী ব্যাপার? সব ঠিক আছে? হক আংকেল তো... এখনও মৃত, তাই তো?”
আমি নিজেই কুঁকড়ে গেলাম। ধুর, একটা বাজে জোক হয়ে গেল! এসআই-এর মুখ দেখে বোঝা গেল সেও তাই ভাবছে।
“জি, উনি এখনও মৃত,” এসআই কবির নিশ্চিত করল।
“আমার খারাপ লাগছে,” আমি নিজেকে একটু স্বাভাবিক দেখাতে চাইলাম।
“তাই?” সে ভুরু তুলল। “কেন খারাপ লাগছে আপনার?”
“কারণ... উনি পড়ে গিয়ে মাথায় আঘাত পেয়েছিলেন।” আমি পকেটের ভেতর হাত ঢুকিয়ে টিস্যুটা চেপে ধরলাম। “আমি যদি আরও একটু আগে ঢুকতাম... তাহলে... হয়তো বাঁচানো যেত।”
“আমি সেটা মনে করছি না।”
“হয়তো না। কিন্তু একটা চান্স তো থাকত।”
এসআই স্থির দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকাল। “আসলে পোস্টমর্টেম রিপোর্ট অনুযায়ী, আপনার প্রতিবেশী পড়ে যাওয়ার কারণে মারা যাননি।”
কী?
“বুঝলাম না।” আমি মাথা নাড়লাম। “নব্বই পেরোনো একজন মানুষের পোস্টমর্টেম কেন করবে? এটা তো স্বাভাবিক মৃত্যু মনে হয়েছিল।”
“মৃত্যুটাকে প্রথমে ‘অ্যাক্সিডেন্টাল’ ধরা হয়েছিল। কিন্তু ওনার ছেলে পওে ওর সন্দেহের কথা জানানোয় আমরা পোস্টমর্টেম করেছি। আর ভালোই হয়েছে। কারণ রিপোর্ট অনুযায়ী মাথার আঘাতটা বেসিন বা মেঝেতে মাথা ঠুকে হওয়ার মতো নয়। ওটা ছিল— ভোঁতা কিছু দিয়ে আঘাত করার কারণে।”
আমি হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে রইলাম। “কী? আপনি কী বলতে চাইছেন?”
“আমি বলছি, কেউ আপনার প্রতিবেশীর মাথায় আঘাত করেছে।” এসআই কপাল কুঁচকাল। “উনি খুন হয়েছেন।”
·
·
·
চলবে……………………………………………………