কামিনী - পর্ব ৭৬ - মম সাহা - ধারাবাহিক গল্প

কামিনী - মম সাহা
          ঢিমে আলোয় জোনাকি উড়ছে মৃদু। ফুরফুরে বাতাস বইছে। রানি আশ্চর্য হয়ে দেখছেন তার সামনে দাঁড়ানো হেমলককে। ক্লান্ত, পরিশ্রান্ত মুখটি। সারাদিন ধরে ছোটাছুটি করেছে ভ্রাতার মৃত্যুর শোকে। এই সন্ধ্যা নামতেই ছুটে এসে পড়েছে এই রাজ্যে!
হেমলক লোক, সময় কিংবা পরিবেশের ধার ধারলো না। এসেই আলগোছে চেপে ধরল রানির হাতটি।
 হ্যাব্রো তাদের দু'জনকে একান্তে সময় কাটাতে দিয়ে সরে গেলো। মাথা নামিয়েই এগিয়ে গেলো প্রাসাদের দিকে। দাম্পত্যের ব্যক্তিগত সময়টা যেন সে গোপনেই করে দিয়েছে। 

 হ্যাব্রো যেতেই রানি চোখ রাঙালেন, 
“এখানে কী? কেমন অশোভনীয় কাজ আপনার! এসে হাত চেপে ধরছেন। পাশে যে আমার সেনাপতি দাঁড়ানো তা কি দেখেননি?”

 “দেখেছি। দাঁড়ানো ছিলো তো কী হয়েছে? আমি কি পরের স্ত্রীকে ধরেছি? তুমি আমার বিবাহিত স্ত্রী। আমার নারী। এখানে তো কোনো খারাপ নেই!”

 এমন করে অধিকার খাটালে আর কী বা বলা যায়?
রানি সেই প্রসঙ্গে আর কথা বাড়ালেন না। প্রসঙ্গ পাল্টে বললেন, “আপনার রাজ্যে শোক চলছে আর আপনি এখানে এসে নিজ স্ত্রী, পরের স্ত্রী নিয়ে গবেষণা করছেন? আপনাকে দেখে অবাক না হয়ে পারি না। আপনার না ভ্রাতা হারিয়েছে? শোক তো পালন করবেন একটি দিন না-কি?”

  রানি ভেবেছিলেন হেমলকের প্রসঙ্গ এলে দমে যাবে হেমলক। কিন্তু তা হলো আর না। সে রানির হাতটা আরও চেপে হাঁটতে আরম্ভ করল। আচমকা টানে তাল মেলাতে গিয়ে হাঁটতে হলো রানিকেও পায়ে পা মিলিয়ে। 
 হাঁটতে হাঁটতে বলল,
“ভ্রাতা হারানোর শোক তুমি আর উপভোগ করতে দিলে কোথায়? চলে এলে কিছু না জানিয়ে! তোমার উপস্থিতি, অনুপস্থিতি যে-কোনো মুহূর্তেই আমার স্মৃতিতে জুড়ে থাকে কেবল তোমার ভাবনা। আমি এখানে কী বা করতে পারি? দোষ তোমার তবুও অপরাধী বানাচ্ছো আমায়?”

 তারা দাঁড়িয়ে আছে একটি হ্রদের সামনে। 
জলগুলো ছোটো ছোটো ঢেউ তুলছে। চাঁদ পুরোপুরি দৃশ্যমান এখন। চাঁদের প্রতিচ্ছবি মুখিয়ে রেখেছে জলকে। বেনামি ফুলের ঘ্রাণ পরিবেশকে আরও মোহনীয় করে তুলেছে। 
“রাজ্য ছেড়ে আসা আপনার উচিত হয়নি। আপনার রাজ্যে সবকিছুই কেমন অস্বাভাবিক। আপনি কি তা অনুভব করেননি এত বছর?”

 হেমলক রানির মুখের দিকেই তাকিয়ে ছিলো। রানি প্রশ্ন করে তাকাতেই সে মাথা নাড়াল। ছোটো শ্বাসও ফেলল,
“পেরেছিলাম।”

 “তাহলে কখনো এগুলো থামানোর চেষ্টা করেননি কেন?”

“আমার যা হারানোর ছিলো আমি হারিয়ে ফেলেছিলাম তা। তারপর কার কী হলো তা দেখার প্রয়োজনবোধ করিনি।”

 “বড্ড স্বার্থপরের মতন কথা বলছেন।”

“আমি তো স্বার্থপরই।”

 “আমি ঠাট্টা করছি না।”

“আমিও বা কোথায় ঠাট্টা করলাম? তুমি আমার ঠাট্টার সম্পর্কের কিছু হও কি?”

 “আমার মনে হচ্ছে আপনার ভ্রাতার মৃত্যুও স্বাভাবিক নয়।” এবার রানি কথা বলার সময় সরাসরি হেমলকের চোখের দিকে তাকালেন। বোঝার চেষ্টা করলেন হেমলকের মুখেচোখে কোনো পরিবর্তন হয় কি-না। কিন্তু রানির আশানুরূপ কোনো পরিবর্তন দেখা দিলো না হেমলকের মুখে। সে নিতান্তই স্বাভাবিক ভাবেই গ্রহণ করল কথাটি। 
 “হতেই পারে। ক্যামিলাস রাজ্যে স্বাভাবিক কিছু হয় না, তুমিই বলেছিলে একটু আগে।”

 “আমার মনে হয় এই অস্বাভাবিক মৃত্যুর পেছনে আপনারও কিছুটা অবদান আছে।” 

 এমন কথা শোনার পর যে-কেউ হয়তো ভড়কে যেতো। কিংবা আশ্চর্য হতো। কিন্তু হেমলকের ভেতরে সেসব কিছুই দেখা গেলো না। বরং সে হাসল। তার ঠোঁটে মুচকি হাসিটা এত মানায়!
 হাসি জুড়ে রেখেই বলল, 
“এই পৃথিবীতে সব খারাপ কাজের পেছনেই আমার অবদান আছে বলেই তুমি মনে করো, সে আর নতুন কী? তবে তুমি যেটা মনে করো না, ভাবো না, তা হলো- এই পৃথিবীর সবচেয়ে ভালো একটি কাজের পেছনেও আমার অবদান তা থাকা। তা হলো তোমায় ভালোবাসা। কেবল এটা তুমি মানলেই সব হতো।”

 “ছল জানা মানুষের এটাই মহা অস্ত্র জানেন তো? চতুরতার সাথে প্রেম দেখিয়ে মানুষ ভোলানো। কিন্তু আপনি ভুলে যাচ্ছেন আপনার সামনে আমি দাঁড়ানো। রানি কামিনীকাঞ্চন। তাকে ছলে ভোলানো বোধহয় যায় না।”

  হেমলকের হাসি এবার থেমে গেলে। চোখেমুখে থাকা এতক্ষণের নিস্তব্ধতা রূপান্তরিত হলো রাগের কোলাহলে। চেপে ধরল সে রানির বাহু। তার রাগের বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে সেই চেপে ধরাতেই। খুব শক্ত ভাবে রানির বাহুর নরম মাংসটা খামচে ধরেছে। কিছুটা দাঁত কিড়মিড় করেই বলল,
“কেন সবসময় আমাকে তোমার ছলচাতুরী করা মানুষ মনে হয়? কেন সবসময় আমাকে সন্দেহ করতেই হবে? ভালোবাসাটুকু চোখে পড়ে না? কী করলে চোখে পড়বে? এত বার পায়ে পড়ি, মরিয়া হয়ে থাকি, একটু প্রেম চাই এসব তো কখনো দেখো না। অথচ যে ছলচাতুরী করতো তাকে ঠিক প্রেম দিয়ে ফেলেছিলে। রানি কামিনীকাঞ্চন, তাকে প্রেম দিতে তোমার মনে বাঁধেনি? তোমারতো মানুষ চেনার খুব গর্ব। তাহলে হ্যাভেনকে চেনোনি কেন, হ্যাঁ?”

  রাগান্বিত হেমলকের দিকে রানি তাকিয়ে রইলেন। তার মুখের উপর হেমলক কখনো কথা বলেনি দেখেই হয়তো কিছুটা অবাক হলেন। তারচে বেশি অবাক হলেন হেমলকের মুখে এসব কথা শুনে। 

 “কথা বলছো না কেন? হ্যাভেনের জন্য তোমার মায়া হয়েছে। ণেকিতানের জন্য মায়া হয়। মৃন্ময়ীর জন্য মায়া হয়। এমনকি সবচেয়ে নিকৃষ্ট কাজ করা যামিনীর জন্য মায়া হয়। হয় না কেবল আমার জন্য? কী অপরাধ করেছি? ভালোবেসে অপরাধ করেছি? না-কি রানি কামিনীকাঞ্চন হওয়ার দম্ভে তুমি আমার সেই ভালোবাসা দেখছো না? তোমার দম্ভ চূর্ণ হয়ে যাবে একটু ভালোবাসলে?”

  রানি এবার মুখ-চোখ শক্ত করলেন, “ছাড়ুন। সীমায় থাকুন।”

“থাকবো না সীমাতে। কী করবে? গর্দান নিবে? নাও। পেতে রেখেছি তো মাথা। সঁপে দিয়েছি তো পুরোটাই তোমার কাছে। য়া ইচ্ছে করো। হয় ভালোবাসো নয় মারো। তবে বার বার প্রশ্নবিদ্ধ করো না। এই পৃথিবীতে আমি মায়ের পর ভালোবেসেছি কেবল তোমায়। শুদ্ধ হৃদয়ে। সেই ভালোবাসার উপর তুমি অনায়াসে প্রশ্নবিদ্ধ করতেই পারে কিন্তু আমি সহ্য করতে পারি না। পারব না। পৃথিবীতে সকলকেই তো ভালোবেসে জয় করা যায় তবে তোমাকে নয় কেন? কীসের এত অহংকার তোমার? কেন ঠেলছো পায়ে?”

  রানি কামিনী এবার হেমলকের বুকে ধাক্কা দিলেন। এতটাই জোরে ছিলো যে দু'কদম পিছিয়ে গেলো হেমলকের সুঠাম দেহটা। রানির টানা টানা চোখগুলোতে ক্রোধের উত্থান,
 “আমার অহংকার আমার নামে। আমার কাজে। আপনি কে আমাকে প্রশ্ন করার? আমি কাকে ভালোবাসবো, না বাসবো তা আমার সিদ্ধান্ত। আপনি কে জবাবদিহিতা চাওয়ার?”

 “এটাই তো দুঃখ, তুমি বারবার ভুলে যাও- আমি কে! অথচ তোমার দেহের প্রতিটা ভাঁজ জানে আমি কে। তোমার সতীত্ব জানে আমি কে। গোটা রাজ্য, দেশ থেকে দেশান্তরে সবাই জানে আমি কে। কী হই তোমার। কতটা কাছের মানুষ হই। কতটা কাছের হলে তোমার দেহের ভাঁজে আমার হাত, ঠোঁটের চিহ্ন থাকে। কেবল তুমি জানো না।”

 “কী বলছেন আপনি? উন্মাদ হলেন?” লাজে ভর করল রানির শরীর। কণ্ঠ চেপে এলো। লোকটা রাগে অন্ধ হয়ে গিয়েছে! কীসব বলছে? নিজেদের একান্ত, ঘনিষ্ঠ মুহূর্তের কথাও অবলীলায় বলে ফেলছে! রানি নিজের ক্রোধকে দমিয়ে ফেললেন। শান্ত থাকা মানুষ হুটহাট রেগে গেলে যেন হুঁশ থাকে না। হেমলকেরও হুঁশ নেই এখন।

 হেমলকের কণ্ঠ আগের মতনই রুক্ষ রইল, "আমি তোমার কাছে কিছু চেয়েছি কি? আমি কি বলেছি সব ছেড়ে ছুঁড়ে কেবল আমাকে বেছে নাও? চাইনি তো। এত বড়োসরো কিছুই চাইনি যা দিতে তোমার কষ্ট হবে। আমি কেবল চেয়েছি তুমি আমার জন্য সব না ছেড়ে শুধুমাত্র আমার সব হয়ে থেকে যাও। এটা কি বেশি চাওয়া হলো? খুব বেশিই?"

  হেমলকের পাগলামো আর বাড়তে দিতে চাননি রানি। তিনি উত্তর বিহীন সরে আসতে চাইলেন। কিন্তু পারলেন না। হেমলকের শক্ত হাত চেপে ধরল তার হাতটি। এক লহমায় টেনে মিশিয়ে নিলো বুকের মাঝে। দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
“আমি পৃথিবী ধ্বংস করে ফেলবো, রানি কামিনীকাঞ্চন। আমাকে ছেড়ে যাওয়ার কথা স্বপ্নেও ভেবো না। আমি তোমার সাম্রাজ্য জ্বালিয়ে পুড়িয়ে ছাড়খার করে ফেলবো। ভালোবাসায় না পেলে ঘৃণাতে জায়গা করে নেবো। চিত্রশিল্পী হেমলকের প্রতিজ্ঞা এটা। ধ্বংস করে ফেলবো সব। কোনো পুরুষের ছায়াকে আমি অনুমতি দিবো না তোমার আশেপাশে আসতে। আমার ছল তুমি দেখোনি। জানো না, আমি কী কী করতে জানি।”
·
·
·
চলবে……………………………………………………

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

WhatsApp