সাবলেট - পর্ব ৩৩ - কয়েস সামী - ধারাবাহিক গল্প

সকালটা ভয়ংকর হ্যাংওভার নিয়ে শুরু হয়েছে।

বুকটা খুব ধড়ফড় করছে, যেমনটা করত চাকরির ইন্টারভিউ খুব ভালোভাবে দেয়ার পরেও যখন চাকরিটা হতো না তখন। ইন্টারভিউ দিতে দিতে যখন একদম আশা ছেড়ে দিয়েছিলাম তখনই আগের কোম্পানিটাতে চাকরি পেয়ে যাই। আর তারপরই নাবিলার সাথে পরিচয়। 

আমি চাই, ও যেন তাড়াতাড়ি ফিরে আসে।

নাবিলার কথা মনে পড়তে না পড়তেই ডোরবেল বেজে উঠল। পাশের বালিশটা টেনে মুখের ওপর চাপা দিলাম— ভাবলাম, যে-ই হোক, একটু পরেই চলে যাবে। কিন্তু ডোরবেল দ্বিতীয়বার বাজতেই বুঝলাম, এভাবে হবে না। তার ওপর আজ আবার অফিস আছে। আসিফের পছন্দের তালিকায় আমি এমনিতেই নেই।

কষ্ট করে বিছানা ছাড়লাম। উঠতেই মাথাব্যথা আরও বেড়ে গেল। মুখটা এমন শুকনো, যেন আঠা দিয়ে বন্ধ করে রাখা। আজ কীভাবে অফিসে যাব, ভেবে পাচ্ছি না। হয়তো অসুস্থতার কথা বলে ছুটি নিতে হবে, যা আমি একদমই পছন্দ করি না। একসময় নিজের কাজের প্রতি এমন দায়িত্ববোধ দেখে নিজেকে নিয়েই গর্ব করতাম।

রুম থেকে বেরোতেই ড্রয়িংরুম থেকে কথাবার্তার আওয়াজ ভেসে এল। মনে হচ্ছে তানজিনা দরজা খুলে দিয়েছে, আর তার পরিচিত কেউ এসেছে। যেহেতু আমাকে দরজা খুলতে হয়নি, তাই বাথরুমে গিয়ে পাঁচ মিনিট সময় নিয়ে ফ্রেশ হলাম।

এবার নিচে নামার আগে ট্রাউজার আর টিশার্ট পরে নিলাম। তানজিনার অতিথির সামনে অন্তত স্যান্ডো গেঞ্জি পরে ওদের সামনে পড়তে চাই না। তবে ব্যাপারটা কিন্তু অদ্ভুত। ওর তো কখনও কোনো অতিথি আসে না। কয়েকবার বাইরে গেছে ঠিকই, কিন্তু কাউকে কখনও বাসায় ডাকে না। একবারও না। আমার তো মনে হয় ওর কোনো বন্ধুই নেই। অন্তত আমি কাউকে দেখিনি। এটাই তো সাইকোপ্যাথদের একটা নমুনা, তাই না?

সিঁড়ির অর্ধেক নামতেই দেখলাম, তানজিনা ড্রয়িংরুমে কারও সাথে নিচু গলায় কথা বলছে। কার সাথে ও কথা বলছে সেটা বুঝতে আমার এক সেকেন্ড লাগল। চোখ দুটো কয়েকবার পিটপিট করলাম, কারণ আমি নিশ্চিত হতে পারছিলাম না আমি ঠিক দেখছি কি না।

জাহিদ।

ফরমাল শার্ট-প্যান্ট পরে আছে। এত ফিটফাট হয়ে সম্ভবত ‘চৌধুরী অ্যান্ড খান’-এ ভিপি পদবীর চেয়ারে বসতে যাচ্ছে। ঐ চেয়ারটায় তো আমার বসার কথা ছিল। বুকটা ধড়ফড় করতে থাকলেও আমি বাকি সিঁড়ি দৌড়ে নামলাম। ও এখানে কেন? নাবিলার কথা বলতে এসেছে? নাকি অফিসের কোনো ব্যাপার? আর তানজিনার সাথে এমনভাবে কথা বলছে যেন বহুদিনের পরিচয়। কীভাবে সম্ভব?

ওরা আমাকে দেখার আগে আমি সিঁড়ির বাঁকটাতে লুকিয়ে দাঁড়িয়ে কান খাড়া করে ওদের কথা শুনতে চেষ্টা করলাম। কিন্তু কথাগুলো পরিষ্কার বুঝতে পারছি না। আমি আরও পা টিপে টিপে এক পা এগোলাম। 

“আহসান ভাই!” জাহিদ চেঁচিয়ে উঠল। 
বাহ! ধরা পড়ে গেলাম।
“আরে জাহিদ যে!” মুখে মেকি হাসি নিয়ে বললাম, “কী খবর?”

জাহিদ আর তানজিনা চোখাচোখি করল। ব্যাপারটা আমার কাছে খুবই অদ্ভুত লাগল। তানজিনা ওড়নাটা ঠিক করে জাহিদের দিকে তাকিয়ে মিষ্টি করে এক ঝলক হাসল, তারপর দরজার দিকে এগোল। “আমাকে ডিউটিতে যেতে হবে,” সে বলল। “আপনারা কথা বলেন।”

ব্যাপারটা কী?

“তুমি তানজিনাকে চেনো কীভাবে?” যতটা সম্ভব স্বাভাবিক গলায় জিজ্ঞেস করলাম।

এক মুহূর্ত ও থমকে গেল। “ও ‘নর্থ এন্ড’-এ কাজ করে। জায়গাটা আমার ভীষণ পছন্দ, প্রায়ই যাই।”

কথাটা অবশ্য বেশ যুক্তিযুক্ত। কিন্তু এতক্ষণ কী নিয়ে কথা বলছিল ওরা? তবে ওটা তো আর আমি জিজ্ঞেস করতে পারব না। “তো... তুমি কেন এসেছ?”

“শোনেন, আহসান ভাই।” সে পকেটে হাত ঢুকিয়ে বলল। “সেদিনকার ব্যবহারের জন্য আমি সত্যি দুঃখিত। জানি, আপনি অনেক কিছুর মধ্যে দিয়ে যাচ্ছেন, আর আমি সেদিন একটু বাড়াবাড়ি করে ফেলেছিলাম।”

“আচ্ছা...” ওর দুঃখ প্রকাশটা সত্যি বলে মনে হচ্ছে। কিন্তু এই অসময়ে এ কথা বলতে আসবে? “এজন্য এসেছো বুঝি? শুধু সরি বলতে?”

জাহিদ তার পকেটে হাতড়াচ্ছে। প্রথমে ভাবলাম ঠিক কী বলবে সেটা গুছিয়ে নিচ্ছে। কিন্তু কয়েক সেকেন্ড পর বুঝলাম, সে কিছু একটা খুঁজছে। তারপর পাকেট থেকে একটা নীল ভেলভেটের আংটির বাক্স বের করল, আর আমার বুকটা ধক করে উঠল।

“না,” আমি ফিসফিস করে বললাম। “না।” 
“আমি খুব দুঃখিত, ভাই,” সে বলল।
“না।” আমি এক পা পিছিয়ে গেলাম। “এটা আমি তোমার কাছ থেকে নেব না। এভাবে আমাদের সম্পর্ক শেষ হতে পারে না।”
“শেষ হয়নি তো।” জাহিদ আমার কাঁধে হাত রাখতে গেলে আমি ঝট করে সরে দিলাম। “ও বলেছে শুধু একটু স্পেস দরকার। আর ও এটা আপনাকে দিয়েছে বিক্রি করার জন্য। বলেছে, এটা বিক্রি করলে যে টাকা পাওয়া যাবে, তা হয়তো কিছুদিনের জন্য আপনার খরচ মেটাতে সাহায্য করবে।”
ভালো না লাগলেও কথাটা সত্য। যুক্তি আছে। আংটিটা বিক্রি করলে অন্তত দুই-এক মাস টিকতে পারব। কিন্তু তারপর? শেষ পর্যন্ত তো সবই হারাতে হবে।

“আহসান ভাই...” জাহিদেও চোখে করুণ দৃষ্টি। “ওর এখনও আপনার প্রতি ফিলিংস আছে। কিছুটা সময় দিন।”

আমি ঢোক গিললাম। গলা শুকিয়ে গেল। “তুমি চলে যাও।” 
“ভাইয়া...” 
“চলে যাও। এখনই।”

গত দশ বছরের ভেতর আমি একবারই কেঁদেছি। মা মারা যাওয়ার সময়। কিন্তু এখন... এখন আমি সত্যি সত্যিই ভেঙে পড়ছি। তবে ব্যাপারটা জাহিদের সামনে ঘটতে দিতে চাই না।

সে ভেলভেটের বাক্সটা আলতো করে টি-টেবিলের ওপর রেখে দিল।শেষবারের মতো আমার দিকে তাকাল, তারপর দরজা ঘর থেকে বের হয়ে গেল।

দরজার লকটা ‘ক্লিক’ করে শব্দ করতেই আমি ধপ করে সোফায় বসে দু’হাতে মুখ ঢেকে ফেললাম। না। না। এভাবে শেষ হতে পারে না। আমার ওর সাথে দেখা করতে হবে। ওর সাথে কথা বলতে হবে।

পকেট থেকে ফোন বের করলাম। বেশি কিছু না ভেবেই লিখে পাঠালাম, ‘আমি তোমার সাথে দেখা করতে চাই, নাবিলা।’

স্ক্রিনে আবারো সেই টাইপিং বাবল উঠল। আমার নিশ্বাস আটকে রইল। মনে হলো, ও উত্তর দেবে। বলবে, ঠিক আছে।

‘আমার মনে হয় না এটা ভালো কোনো আইডিয়া।’

মিথ্যা কথা। জাহিদের মাধ্যমে আংটি পাঠিয়ে যদি ভাবে সে আমাদের ব্রেকআপ হয়ে গেছে— তাহলে ও ভুল করছে। ঘড়ির দিকে তাকালাম। অফিস শুরু হতে এখনও দেরি আছে। নিশ্চিতভাবেই ও এখনও তিশার বাসাতেই আছে। তাই দ্রুত হাতে আমি পরের মেসেজটা লিখলাম—

‘আমি এখনই তিশার বাসায় আসছি। আমি তোমাকে দেখতে চাই।’

আমি স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থেকে ভাবলাম, এবার হয়তো ও পুলিশ ডাকবে বলে হুমকি দেবে আমাকে। যদি সত্যি সত্যি পুলিশ ডাকার কথা বলে তাহলে কী করব? আমি গ্রেফতার হতে চাই না। এমনিতেই গতকাল থেকে পুলিশ আমাকে হক সাহেবের ব্যাপারে সন্দেহ করছে। তবু আবারো লিখলাম,

‘প্লিজ।’

ফোনটা শক্ত করে ধরে রইলাম। কয়েক সেকেন্ড পর উত্তর এল—

‘ঠিক আছে। আধা ঘণ্টা পরে চলে এসো।’

 গ্রেট! তবে আমার হাতে সময় বেশি নেই। আমাকে তাড়াতাড়ি তৈরি হতে হবে।
·
·
·
চলবে……………………………………………………

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

WhatsApp