তিশা আর জাহিদের বাসাটা খুব একটা দূরে না। তাই আমি শাওয়ার সেরে স্নিকার্স পরে বেরিয়ে পড়লাম।
সময়ের প্রায় দশ মিনিট আগেই ওদের অ্যাপার্টমেন্ট বিল্ডিংয়ের সামনে পৌঁছে গেলাম। বাইরে দাঁড়িয়ে ফুটপাথে এদিক-ওদিক হাঁটতে লাগলাম, আর লোকজন কেমন অদ্ভুত চোখে তাকাতে শুরু করল। ফোন বের করে ক্যামেরায় নিজের মুখটা দেখলাম। নিজেকে বেশ কিছুটা এলোমেলো লাগছে। শাওয়ার করে আঁচড়াইনি বলে চুলটা বেশ উসকোখুসকো হয়ে গেছে। আরও ভয়ানক বিষয় হলো, টি-শার্টটা উল্টো পরে চলে এসেছি। এজন্যই লোকজন আমার দিকে অমন করে তাকাচ্ছিল।
তড়িঘড়ি কিছু না ভেবেই টি-শার্টটা একটানে খুলে চোখের পলকে ওটা ঠিক করে পরে ফেললাম। ভাগ্যিস ব্যাপারটা আগেই খেয়াল করতে পেরেছি। নাবিলা এই উল্টো টি-শার্ট দেখতে পেলে কী থেকে কী ভেবে নিত কে জানে। এমনিতেই ও আমাকে হয়তো পাগল ভাবছে। শার্টটা পরার পরেই দেখতে পেলাম, কাছাকাছি কয়েক ফুট দূরে সালোয়ার-কামিজ পরা এক মহিলা দাঁড়িয়ে আমার দিকে তাকিয়ে আছে।
“আহসান?” মহিলাটা ডাকল আমাকে।
আর তারপরই আমি ওকে চিনতে পাারলাম। “মিথিলা?”
“আপনি!” মিথিলা অবাক হয়ে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। “আপনি এখানে কী করছেন?”
“আমার শার্টটা...” আমি অসহায়ভাবে নিজের টি-শার্টের দিকে ইশারা করলাম। “যাই হোক... উম... আপনি কেমন আছেন? মানে... সব ঠিকঠাক?”
সে পিঠটা টান টান করে দাঁড়াল। আমি দেখতে পেলাম ও জামাটা ঠিকমতোই পরেছে। আমার মতো উল্টো করে পরেনি। তার মানে ও বেশ ভালোই আছে।
“খুব ভালো আছি,” সে বলল। ওর কণ্ঠে এমন একটা ব্যাপার আছে, যা আমাকে চমকে দিল। “ প্রমোশন পেয়েছি। আর... গত সপ্তাহে বিয়ে ঠিক হয়েছে।”
তারপর ওর হাতের আংটিটা প্রায় আমার মুখের সামনে এনে ধরল।
কেন সে এমন করে নিজের সাকসেস স্টোরি আমার মুখে ঘষছে বুঝলাম না। ওয়াহিদ স্যার আমাকে ফায়ার করার পর এই মেয়েই তো কোনো কারণ ছাড়াই আমার সাথে যোগাযোগ বন্ধ করে দিয়েছিল। ও কি মনে করে দোষটা সত্যি সত্যি আমার ছিল? ওর দৃষ্টি আমাকে বুঝিয়ে দিল আমার প্রতি তার কোনো উষ্ণ অনুভূতি নেই।
“আমি সত্যিই খুশি হয়েছি, মিথিলা।” কথাটা মোটামুটি সত্যিই। আমি তো আর আমার ‘সাফল্য’ গুনে শোনাতে পারব না— যার গল্প হচ্ছে চাকরি থেকে বরখাস্ত হওয়া আর বউয়ের দ্বারা ছেড়ে যাওয়া। “ তোমাকে বেশ ভালো লাগছে।”
ও চোখ পিটপিট কওে আমাকে আপাদমস্তক একবার দেখে নিয়ে বলল, “আর আপনাকে দেখাচ্ছে...”
বাকিটা সে শেষ করল না। যাক, ভালোই হলো।
আমি ঘড়ির দিকে তাকালাম। নাবিলার কাছে যাবার সময় হয়ে গেছে।“যাই হোক, তোমাকে দেখে ভালো লাগছে, কিন্তু আমাকে এখন যেতে হবে।”
সে একটু অদ্ভুতভাবে তাকাল। কিন্তু আমি সেটার মানে বুঝতে খুব চেষ্টা করলাম না। “হ্যাঁ, আমাকেও যেতে হবে। আমি... উম... দেখা হবে, আহসান ভাই।”
পকেটে না থাকা হাজার টাকা বাজি ধরে বলতে পারি, ওকে আর কোনোদিন আমি দেখব না।
পুরানো সহকর্মীর সাথে এই দেখা হওয়া আমাকে নাবিলার সামনে যাওয়ার জন্য আরও খারাপ মানসিক অবস্থায় ফেলে দিল। আগে থেকেই টেনশনে ছিলাম। আর এখন আরও খারাপ লাগছে। যদি দুই বছর পরে রাস্তায় নাবিলার সাথে দেখা হয়, আর আমি তখন ওকে ঠিকমতো চিনতেই না পারি? ভাবনাটা মন খারাপ করে দিল।
আমি ভুলে গিয়েছিলাম তিশা-জাহিদের বিল্ডিংয়ে কড়া সিকিউরিটি আছে। অর্থাৎ জোর করে ঢোকার চেষ্টা করলে কোনো কাজ হবে না। তাই ভদ্রভাবে নাম বলতেই দারোয়ান ইন্টারকমে কথা বলে আমাকে ভেতরে ঢুকতে দিল। লিফটে পাঁচ তলা পর্যন্ত ওঠার সময় অনুভব করলাম, আমার বুকটা ঢিপঢিপ করছে আর হাত দুটো পুরোপুরি ঘেমে গেছে।
দরজার কাছে যেতেই পোলাওয়ের চাল আর ঘিয়ের গন্ধ নাকে এল। আসার কথা বলে কি আমি নাবিলাকে ভীষণ স্ট্রেসে ফেলে দিয়েছি। স্ট্রেস কাটাবার জন্য ও তাই এখন রান্নাবান্না করছে। গন্ধটা নস্টালজিয়ার ঢেউয়ের মতো আমার ওপর আছড়ে পড়ল। আমি ওকে আরো বেশি মিস করতে থাকলাম। আমার নিজের কাছেই নিজে প্রতিজ্ঞা করলাম, আমি ওকে ফেরত আনবই। কাঁধ সোজা করে ঠক ঠক করে দরজায় নক করলাম।
আমি ভেবেছিলাম তিশাই দরজা খুলে দেবে। তাই দরজায় নাবিলাকে দেখে একটু অবাক হলাম। চুলটা তার চিরচেনাভাবে খোঁপা করে বাঁধা, ঠোঁটে হালকা গোলাপি লিপস্টিক। আর সত্যি বলতে কী, ওকেও একটু ক্লান্ত ও এলোমেলো লাগছে। কিন্তু এতে ওকে আরও সুন্দর লাগছে।
মাত্র এক সপ্তাহের একটু বেশি সময় হয়েছে ওকে দেখিনি। কিন্তু আমার কাছে মনে হলো এক বছর হয়ে গেছে। আমার ইচ্ছে করছে হাত বাড়িয়ে ওকে জড়িয়ে ধরি।
“নাবিলা,” মনে হলো গলা থেকে কোনো শব্দ বের হতে চাচ্ছে না। ওর চোখটাও জলে ভরে উঠল। না, আমি কল্পনা করছি না। সত্যি বলছি। “আহসান!”
ওর হীরের আংটিটা আমার প্যান্টের পকেটে। আমি প্রস্তুত ওটা ওকে ফেরত দিতে।
“আমি কি ভেতরে আসতে পারি?” আমি জিজ্ঞেস করলাম। সে লম্বা করে একটা দম নিল। “ঠিক আছে... কিন্তু শুধু এক মিনিটের জন্য।”
অ্যাপার্টমেন্টে ঢুকতেই ফিরনির গন্ধ আরও তীব্র হলো। আমি নাবিলার পিছু পিছু ডাইনিংয়ে গেলাম। সে রান্নাঘর থেেেক একটা বাটি নিয়ে এসে টেবিলে রাখল। ওকে দেখেই বুঝা যাচ্ছে ও এখানে ভীষণ কষ্টে আছে।
“গন্ধটা দারুণ,” আমি বললাম। “ঠিক আগের মতোই।” সে ছোট্ট একটা হাসি দিল, কিন্তু আমাকে খেতে বলল না।
“থ্যাংক ইউ।”
“তোমার হাতের ফিরনি মিস করি।”
“থ্যাংক ইউ।”
“আমি তোমাকেও মিস করি, নাবিলা।”
সে মুখ ঘুরিয়ে নিল। গালটা গোলাপি হয়ে গেছে। “আহসান...”
“প্লিজ আমাকে আরেকটা সুযোগ দাও।” আমি ওর হাত ধরতে চাইলাম, কিন্তু ও সরে গেল। “তানজিনা আর আমার মধ্যে কিছুই হয়নি। তোমার কসম। আমার ভালোবাসার কসম।”
“আমিও বিশ্বাস করি, কিছু হয়নি,” সে দীর্ঘশ্বাস ফেলল, “কিন্তু তবুও তুমি ওই মেয়েটার ব্যাপারে ভয়াবহরকম অবসেসড। সবসময় শুধু ওর কথাই বলো, আহসান!”
“না, সত্যি না।”
“একদম সত্যি! তুমি ওকে এমনভাবে দেখাতে চাও যেন সে শয়তানের অবতার। অথচ সে তো সাধারণ একটা মেয়ে। ভালো মেয়ে।”
আমি দাঁতে দাঁত চেপে ধরলাম। “তানজিনা অনেক কিছু হতে পারে। কিন্তু সে মোটেও ‘ভালো’ না। বরং...”
বরং আমার মনে হয়, হক সাহেবকে হয়তো তানজিনাই মেরেছে। আমার মনে হচ্ছে, আমাদের ড্রয়িংরুমে ভয়ংকর কিছু ঘটেছে। আমার মনে হচ্ছে, তানজিনা আমাকে খুনের ফাঁদে ফেলতে চাইছে।
মাথার ভেতর এসব কথা ঘুরতেই বুঝলাম, কথাগুলো আর সবার কাছে পাগলামি বলেই মনে হবে। তানজিনা আমাকে খুনের ফাঁদে ফেলছে? কথাটা নিজের কাছেই এখন হাস্যকর শোনাচ্ছে। এই কথাটা নাবিলাকে বলাই যাবে না। নাবিলা যদি ভেবে থাকে আমি তানজিনাকে নিয়ে অবসেসড। সত্যি কথাটা বলে ফেললে পরিস্থিতি আরও খারাপ হবে। যদিও কথাটা সত্য।
“আমি তোমাকে নিয়ে চিন্তিত, আহসান।” সে ভ্রু কুঁচকে বলল।
“ভয় লাগে যে তুমি... তুমি বাস্তবতা থেকে সরে যাচ্ছ। তুমি এত প্যারানয়েড হয়ে যাচ্ছ, আর আমার কথা তো শুনতেই চাও না।”
ঠিক আছে, আমি এখন একদম বলতে পারব না যে আমার মনে হচ্ছে তানজিনা হক সাহেবকে মেরেছে।
“আমি ঠিক আছি, নাবিলা,” আমি জোর দিয়ে বললাম। “সত্যি ঠিক আছি। তবে যদি মনে করো আমি ঠিক নেই এটআ শুধু তুমি আমার সাথে নেই বলে।”
“আমাকে চলে আসতে হয়েছে।” সে কপাল কুঁচকে বলল। “এজন্য আমারো খারাপ লাগছে। কিন্তু তুমি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছিলে। আমি আর সামলাতে পারছিলাম না।”
“কী সামলাতে?” আমি পাল্টা তেড়ে উঠলাম।
“আহসান...”
“আমি সিরিয়াস! তুমি এসব কী বলছ?”
আমি বুঝতেই পারিনি কোন ফাঁকে আমার কণ্ঠস্বর চড়ে গেছে। আর ঠিক এই মুহূর্তেই তিশা আমার পিছনে এসে দাঁড়িয়েছে। বুকের ওপর হাত বাঁধা। সে গলা খাঁকারি দিয়ে আমার মনোযোগ আকর্ষণের চেষ্টা করছে।
“আমার মনে হয়, এখন আপনার চলে যাওয়ার সময় হয়েছে, ভাইয়া,” তিশা বলল।
আমি পালা করে দু’জনের দিকে তাকালাম। তিশা আমাকে তীক্ষ্ণভাবে দেখছে, আর নাবিলাকে বেশ কষ্ট পাচ্ছে বলে মনে হচ্ছে। না, এটা ন্যায্য কোনো কথা হল না। আমি কিচ্ছু করিনি। আমি নাবিলার সাথে চিট করিনি, আর আমি কল্পনাও করছি না যে তানজিনা গোপনে গোপনে কিছু একটা করছে। নাবিলা বিশ্বাস না করলেও, আমি জানি ওই মেয়েটা সাবলেট হিসেবে আসার পর থেকেই আমাকে সত্যি সত্যি নিশানা করেছে।
আমি নাবিলার দিকে তাকিয়ে মিনতি করে বললাম, “আমরা কি আর একটু কথা বলতে পারি? প্লিজ?”
“না।” তিশার গলা কঠিন। আমি বুঝতে পারছি না ও কেন আমাদের ভেতর এসে নাক গলাবে।
“এখনই বের হয়ে যান। আর...” তিশা আমাকে ওপর-নিচ দেখে বলল, “আপনার টি-শার্টটা উল্টো।”
আমি নিজের দিকে তাকালাম, গলার কাছে ট্যাগটা বেরিয়ে আছে। ধুর ছাই! উল্টো পরা ঠিক করতে গিয়ে আবার উল্টো করে ফেলেছি। একটা শার্ট ঠিকভাবে পরা কি এত কঠিন?
“ঠিক আছে,” আমি বললাম। “যাচ্ছি।”
টেবিলে ঠান্ডা হতে থাকা ফিরনির বাটির দিকে একবার তাকালাম। আমি কি আর কোনোদিন নাবিলার হাতের কিছু খেতে পারব?
“থামো।” সম্ভবত আমার মুখের ভাব দেখে নাবিলা একটা ওয়ান-টাইম বক্স তুলে নিল। “আমি তোমাকে কিছু ফিরনি দিই, বাসায় নিয়ে যেও।”
আমি নিশ্চিত, এই ফিরনি আমি কখনও খেতে পারব না। কারণ এগুলো ওর থেকে পাওয়া শেষ উপহারের মতো। তবুও তাকে ফিরনিটা প্যাক করতে দিলাম। মুহূর্তটা মনে গেঁথে রাখার চেষ্টা করছি। তার আঙুলগুলো সাবধানে বক্সের মুখ লাগাচ্ছে। ওর নখগুলো হালকা গোলাপি রঙে রাঙানো। সে বক্সটা একটা পলিথিনে ভরে আমার হাতে দিল।
এটা খুব ব্যক্তিগত একটা স্পর্শ। আর তাতে আমার মনে হলো, সবকিছুর পরও, একদিন আমরা আবার ঠিক হয়ে যেতে পারি।
যদি আমি শুধু তানজিনাকে আমাদের বাসা থেকে সরাতে পারি।
“গুডবাই, আহসান,” সে বলল।
“বাই, নাবিলা,” আমি কোনোভাবে বললাম।
সে এগিয়ে এসে আলতো করে একটা হাগ দিল। যদিও বেশিক্ষণ না, তবু আমার ভেতরে আবার একটু আশা জেগে উঠল। আমি তাকে একটু বেশি সময় ধরে রাখলাম। ওদিকে তিশা বিরক্ত চোখে তাকিয়ে আছে। কিন্তু তিশা যা খুশি ভাবতে চায়, ভাবুক। হু কেয়ারস। যেভাবেই হোক, আমি নাবিলাকে ফিরিয়ে আনবই।
·
·
·
চলবে……………………………………………………