❝সুরসুন্দরীর পরিচয়নামা❞…
প্রখাণ্ড রাজ্যের একটি অঞ্চলের নাম- মনোরঞ্জন। সেই অঞ্চলটিতে ছিলো অগাধ রাজ-রাজাদের আনাগোনা। প্রখাণ্ড রাজ্যের মূলত সুবিধাই এটি ছিলো যে এখানে সত্যিকার অর্থে মনোরঞ্জনের জন্য একটি বিখ্যাত অঞ্চল ছিলো। এবং সকল রাজ্যের রাজারা সেই রাজ্যের সাথে এজন্যই ভাব বজায় রাখতেন যেন তাদের মনের আনন্দের কখনো খামতি না হয়।
মনোরঞ্জন অঞ্চলের মধ্যমণি ছিল হরিতকী। রূপে, গুণে, নৃত্যে তার মতন এর আগে দু'জন ছিলো না। বয়স তখন তার ত্রিশের ঘরের আশপাশে। প্রখাণ্ড রাজ্যের রাজা তামুলনাশ সেই রূপে মজে পুরো অঞ্চলটি তাকে দান করে ছিলেন।
তবে হরিতকীর নেই নৃত্য, সেই শৌখিন ঘুঙুরের ছন্দ, সেই রূপ ছাপিয়েও সেখানে আরেকটা কন্যা বেড়ে উঠতে লাগল। কিশোরী বয়স পেরুতেই যেই ঢেউ তার অঙ্গ জুড়ে শোভাবর্ধন করা শুরু করল তা আর কারো ভেতর দেখা গেলো না। প্রাপ্তবয়স্ক হরিতকীকে ছাড়িয়ে গেলো সেই চোখ জ্বলে যাওয়া শোভা। এমন রূপ ভবে আর পাওয়া যায়?
অদ্ভুত ভাবে মেয়েটি নৃত্যের সাথে সাথে তালিম করতে জানতো বেশ। কণ্ঠের সেই কি সুর! মনোরঞ্জনে তখন তাকে দেখতেই জমতো রাজাদের ভীড়। তার নাম রৌদ্রাণী হলেও ধীরে ধীরে তোর সৌন্দর্যতা এবং তার সুর তাকে ভিন্ন পরিচয় দিতে লাগল। তার নাম হয়ে উঠল সুরসুন্দরী। একুশ বর্ষীয়া সেই কন্যা ধীরে ধীরে রাজাদের কামনার নারী হতে আরম্ভ করল। তাকে একটিবার দেখার আশায় বিভিন্ন রাজ্যের রাজাদের পত্র আসতে লাগল। আসতে লাগল আকুতি, মিনতি, স্বর্ণ, হীরে, মাণিক্য…
কেউ কেউ পারে না পুরো রাজ্য লিখে দেয় তার নামে। এমন মোহে ডুবতে আরম্ভ করল সকলে।
সুরসুন্দরীর শরীর জুড়ে ছিলো অহংকার। সখীরা তাকে দেখে যখন হা করে তাকিয়ে থাকতো তখন সে এত আনন্দ পেতো! গাল ভরে হাসতে হাসতে তাকে দেখে যাদের ঈর্ষা হতো, তাদের উদ্দেশ্যে বলত,
“স্রষ্টা যারে সুরসুন্দরীর মতন রূপ দেয়নি তার কীসের এত দেমাগ? এমন দেমাগে সুরসুন্দরী থুতুও ফেলে না।”
নর্তকীদের মাঝে বেশ একাংশ সুরসুন্দরীর আগে পিছনে ঘুরত। সুরসুন্দরী কেমন করে নিজেকে সজ্জিত করে, কেমন করে হাঁটে, কেমন করে গায়, কেমন করে চোখ ঘুরিয়ে কৌশলে পুরুষদের মন ভোলায় তা অনুকরণ করাই ছিলো তাদের জীবনের লক্ষ্য।
আরেকদলও একই কাজ করত তবে তা দূর থাকে। ভেতরে ভেতরে তারা সুরসুন্দরীর এমন রূপে ঈর্ষায় পুড়ে যেতো। জ্বলে যেতো বাঁকা কথায়। কিন্তু মুখে কিচ্ছুটি বলতে পারত না। কারণ ততদিনে হরিতকীর পছন্দের পাত্রী হয়ে উঠেছিল সেই কন্যা। হরিতকীর মনোরঞ্জন অঞ্চলে তখন অর্থ-বিত্তের উপচে পড়া বাহার। তা-ও সেটা কার জন্য? এই সুরসুন্দরীর জন্য। তাকে কি অবহেলা করা যায় মোটেও? হাতের লক্ষ্মী পায়ে ঠেলে কেউ?
তবে সুরসুন্দরীর দেখা পাওয়া কিংবা তার নৃত্য দেখার সৌভাগ্য সকলে পেতেন না। এমনকি নিজের রাজ্যের রাজাও পেতেন না। তার নৃত্য দেখতে হলে কিংবা তাকে একটিবার চোখ ভরে দেখতে চাইলে প্রথমে হরিতকীর কাছে সেই আবেদন পেশ করতে হতো। আবেদন কি আর যেমন-তেমন আবেদন?
স্বর্ণালঙ্কারে আবেদন ভেসে যাওয়ার মতন আবেদন হতে হতো। সুরসুন্দরী সেই রাজাদের তালিকা দেখত। কোন রাজা আবেদন পেশ করতে এসে কতটা দিয়েছেন সে সমস্তই যাচাই-বাছাই করে দেখত। যদি কোনো রাজ্যে তুলনামূলক স্বল্প কিছু দিতেন তাহলেই সুরসুন্দরী সেসব নিয়ে সখীদের সাথে হাসি-তামাশা করত। বাঁকা বাঁকা চোখে সেসব জিনিস বড়ো অবহেলায় ছুঁয়ে ছুঁয়ে দেখতে দেখতে বলত,
“এত কমে সুরসুন্দরীকে দেখার বাসনা কোন রাজার? তাকে বলে দিও তার রাজকোষের ভিখারিপনা কাটাতে সর্বপ্রথম। তারপর না-হয় মনোরঞ্জনে এসে এই সুরসুন্দরীকে দেখে মনোরঞ্জন করবে। যে রাজার রাজকোষে অর্থের অনটন সে প্রজাদের কথা না ভেবে নিজের মনের আকাঙ্ক্ষার কথা কেমন করে ভাবে? এমন স্বার্থপর রাজা যেন আমার চোখ দু'টোর সামনেও না আসে।”
সুরসুন্দরী কেবল অহংকার করে এসব বলেই ক্ষান্ত হতো না। কিছু কিছু ক্ষেত্রে এসব উপহার সে রাজাদের রাজ্যে ফিরিয়েও দিত। এতে অবশ্য কয়েকজন রাজা বেজায় রাগতেন। আত্মসম্মানেরও তো একটা কথা আছে না-কি?
কিন্তু সুরসুন্দরীর সেসব দেখার সময় ছিল আদৌ! সে সবসময় ব্যস্ত থাকত নিজেকে নিয়ে। নিজের ভাবনায়, নিজেকে ভালোবাসতে, নিজেকে নিয়ে আত্মঅহংকারে।
হরিতকীজি অবশ্য মাঝে মাঝে এসব নিয়ে সুরসুন্দরীকে ধমকাতো। রাজাদের সাথে শত্রুতা করে লাভ আছে? তার ভয় হতো। তারা যে সামান্য নর্তকী। রাজারা চাইলে নিমিষেই তাদের ধূলিসাৎ করে দিতে পারবেন।
সুরসুন্দরী সেসব কথা হেসেই উড়িয়ে দিত। বলত,
“সামান্য নর্তকীকে চোখ ভরে দেখার জন্য যে রাজাদের এত আয়োজন তারা কি-না আমাদের ধূলিসাৎ করবে? পুরুষ সব পারে কিন্তু সুন্দরী নারীর লোভ ছাড়তে পারে না।”
সুরসুন্দরী অল্প বয়সেই বেশি খ্যাতি লাভ করে ফেলে। তার বিশেষত্ব মূলত আকৃষ্ট করতে লাগে রাজাদের। সবাই তাকে দেখতে মরিয়া হয়। এ কোন নর্তকী যে রাজাদের বাছাই করার ক্ষমতা দেখায়!
এবং মানুষের আকুতিই সুরসুন্দরীকে বিশেষ করে তুলে। কারণ অল্প বয়সেই সে বেশ ভালো করেই জানত, সে যদি এই সমস্ত রাজাদের আকুতি মিটিয়ে ফেলে তাহলে তাকে দেখার জন্য যেই হাহাকার সকলের তা থেমে যাবে। সুরসুন্দরী নামের যেই জপ তা বন্ধ হয়ে যাবে। কারণ মানুষ না পাওয়ার আগ অব্দিই হাহাকার করে, পেয়ে গেলে ভাবে, সে কী আর এমন! পেয়েই তো গিয়েছি। তার নিজেকে আলাদা করে রাখাই যেন তাকে খ্যাতি দিতে শুরু করল।
নর্তকীদের রাজ্যে একটি বিধিনিষেধ ছিল। তারা নৃত্য দেখাতে পারবে, তারা রাজাদের চিত্তাকর্ষণ করবে কিন্তু রাজাদের সাথে তাদের কোনো প্রেম কিংবা বিবাহ সম্পর্কিত কিছু ঘটবে না। এবং বছরের পর বছর এভাবেই কেটেছে সেই স্থান। তবে সেই বিধিনিষেধে প্রথম অনিয়ম ঘটল সেদিন, যেদিন সেই অঞ্চলে উপস্থিত হলো তরুণ রাজা- কেশবচন্দ্র।
সুরসুন্দরী যথারীতি ব্যস্ত ছিল নিজের সুরে। কণ্ঠে তার সুর, ঘুঙুরে ঝঙ্কার। মগ্ন হয়ে সে যখন নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত বাহিরে তখন শোরগোল শোনা গেলো। ঘোড়ার শব্দ শোনা গেলো অনবরত। সুরসুন্দরীর নৃত্য থামে। থামে কণ্ঠের গুনগুনও। সে কৌতূহলী হয়ে পর্দার আড়ালে গিয়ে দাঁড়ায়। তার কক্ষ থেকে বৈঠকখানা স্পষ্টই দেখা যায়।
সে দেখল অনবরত উপহার নিয়ে জনবল আসছেই, আসছে। পাত্র ভরে ভরে স্বর্ণমুদ্রা, হরেক রকমের নাম না জানা মিষ্টি, ফল দিয়ে নিমিষেই যেন ভরে গিয়েছে বৈঠকখানা। হরিতকীজি তখন দাঁড়িয়ে বৈঠকখানার মাঝখানটায়। যেন অপেক্ষা করছে কাউকে স্বাগতম জানানোর জন্য। সুরসুন্দরীর মনে খটকা লাগল। এমন কেউ আসার আগে তাকে তো সবসময় জানানো হতো! তাহলে আজ কেন জানালো হলো না? নাকি হরিতকীজি নিজেই জানত না? যদি না-ই জেনে থাকে তবে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছে কেন?
মনের ভেতর হরেক রকম প্রশ্ন নিয়েই সুরসুন্দরী দেখল একটি পুরুষ বীরবেশে প্রাসাদে ঢুকছে। এসেই হাত জোড় করে নম্রতা বিনিময় করল হরিতকীর সাথে।
হরিতকী ব্যস্ত হয়ে তাকে বসতে দিল। রান্নাশাল থেকে দ্রুত পানীয় ও বিভিন্ন খাবার আনার হুকুম দিলো। এ যেন হুলস্থুল কাণ্ড। কী হচ্ছে এসব! সুরসুন্দরী দেখল রাজা ও হরিতকী মজে গিয়েছে কথায়। বেশ হেসে হেসে কথা বলছে। আলোচনা যেন মধুরতম হচ্ছে ধীরে ধীরে। সুরসুন্দরী ভেবে পাচ্ছে না কী এমন আলোচনা চলছে! এখানে তো আজকাল তাকে দেখতেই রাজাদের ভীড় জমে এবং তখন হরিতকী এক পলক ছুটে এসে জানায়ও তাকে সেসব। আজ যে আসছে না!
সুরসুন্দরী এত ভাবনাগুলো নিয়ে আর বেশি না ভেবে নিজের মতন নৃত্য করতে আরম্ভ করল। সে বরাবরই একটু নিজেকে নিয়ে ডুবে থাকতে পছন্দ করত কি-না। তার নৃত্য চলল বহু বহু সময়। কেউ এলো না, কেউ ডাকল না এমনকি সখীরাও তামাশা ঠাট্টা করতে ছুটে এলো না। এসকল ভাবনায় তার নৃত্যের তাল বাড়তেই লাগল ক্রমশ। একটা সময় পর তাল কাটল। ঘুঙুর ছিটকে পড়ল দূরে। সে ঘুঙুর না তুলেই স্নানাগারে ঢুকল। স্নান করল বহু সময় ধরে। তাকে অদেখা করার যে চেষ্টা তা মানতে নারাজ হলো তার মন। তার আত্মঅহংকারে বারংবার আঘাত করল সেই দৃশ্যগুলো, যেই দৃশ্যগুলোতে তাকে ছাড়া কারো গল্প জমেছে।
সুরসুন্দরী যখন স্নানগার থেকে বের হয়ে উঁকি দিলো বৈঠকখানায় দেখল সেই স্থান ফাঁকা। রাজা চলে গিয়েছে তার দলবল নিয়ে। কী আশ্চর্যজনক বিষয়! একটাবার সুরসুন্দরীকে না দেখতে চেয়েও কেউ চলে যায়? যেতে পারে?
তন্মধ্যেই সুরসুন্দরীর কক্ষে এলো তার সখী উর্বশী। এসেই ঠাট্টা জুড়ে দিল। সুরসুন্দরীর মনোযোগ নেই সেই ঠাট্টায়। তার কেবল রাজার বিষয়ে জানার আকাঙ্ক্ষায় ভেতরটা ছটফট করছে। এক পর্যায়ে সে তার ছটফটানি দমিয়ে রাখতে না পেরে জিজ্ঞেস করেই বসল,
“কে এসেছিলো? কোন রাজা আবার হাত-পা ধরতে এলো এই সুরসুন্দরীর জন্য?”
কথাটা বলতে বলতে একবার নিজের সৌন্দর্যতার গর্বে নাকের পাটা ফুলে উঠছিলো সুরসুন্দরীর।
উর্বশীর কপাল কুঁচকে আসে,
“তোমার কথা কেন বলতে আসবে, ভাই? উনি রাজা কেশবচন্দ্র। নর্তকীশালার জন্য উপহার দিতে এসেছিলেন। আর হরিতকীজিকে আমন্ত্রণ করে গেলেন তার রাজ্যে যাওয়ার। তোমার কথাতো একটিবারও বলেনি।”
সুরসুন্দরীর গর্বিত নয়নে যেন এক অদ্ভুত লজ্জা ও বিস্ময় এসে বসল, “আমার জন্য আসেননি?”
“না।”
সখীর উত্তরে সুরসুন্দরীর সমস্ত জীবনের অহংকার ঝরঝর করে যেন ভেঙে পড়তে লাগল। পৃথিবীতে এমন কেউও আছে যে তাকে দেখতে চায়নি? তার কথা বলেনি? এমন কেউ আদৌ আছে?
সুরসুন্দরীর সমগ্র জীবনের অহংকার যেন সেই রাজা এক নিমিষেই ভেঙেচুরে শেষ করে দিলো। নিজের আত্ম অহংকার হারিয়ে সুরসুন্দরী উন্মাদ হয়ে গেলো। মনে মনে প্রতিজ্ঞা করল, এই রাজাকে সে নিজের পায়ের তলায় এনে ছাড়বেই। যেভাবে হোক, যেকোনো মূল্যেই হোক। সুরসুন্দরীর সৌন্দর্যতা অদেখা করার ক্ষমতা কারো নেই তা সে প্রমাণ করে দিবে।
উর্বশী তাকে খাবারের স্থানে নিয়ে গেলো।
নর্তকীশালায় এই একটি নিয়মও ছিলো। প্রতিটা মানুষ একত্রে খেতে বসবে। খেতে বসে নানান কথায় হাস্যমুখর থাকবে সবাই। হরিতকীজির আবার তেমন বাধা-নিষেধ ছিলো না কখনো।
সুরসুন্দরীর মনের ভেতর থাকা সেই বিস্ময়, রাগ চেপেই সে খেতে বসল। সে ভাবল প্রাসাদের মানুষ বোধহয় তেমন খেয়াল করেনি তাকে রাজার অদেখা করার বিষয়টি। কিন্তু তার দুর্ভাগ্য যে তার বাঁকা কথা সহ্য করা প্রতিটি মেয়েই সে বিষয়ে হাসি-তামাশা করছে যথারীতি।
একজন বলল, “আমি তো ভাবলাম রাজাটি বোধহয় সবার মতোই সুরসুন্দরীর দেখা পেতে এসেছেন। ওমা, পরে দেখি হরিতকীজির কাছে এসেছেন!”
আরেকজন সে কথায় তাল মিলিয়ে বলল,
“তাই তো ভাই! আমি ভীষণ অবাক হলাম। এমন কোনো পুরুষও আছে যে সুরসুন্দরীর দেখা না চায়!”
সুরসুন্দরীর ভেতর ফেটে গেলো তীব্র রাগে। হরিতকীজি বার বার চোখের ইশারায় তাদের ঠাট্টা থামানোর ইশারা করলেও সুরসুন্দরী স্পষ্ট খেয়াল করল সেই মানুষটাও চাপা হাসছে। মনে মনে যে সকলই তার রূপের ঈর্ষায় পুড়ে ছাই হয় তা যেন পরিষ্কারই। নয়তো তাকে নিয়ে করা তামাশায় এই মানুষগুলো হাসতে পারতো না। সুরসুন্দরীর মনে এবার তীব্র জেদ চাপল। সেই রাজাকে সে এমন ভাবে তড়পাবে যেন রাজাসহ তার নর্তকীশালার প্রতিটি নর্তকীও এই তামাশা করার আর সাহস না পায়।
সে সুরসুন্দরী, তার রূপের কাছে পৃথিবী নত। পৃথিবী ছোটো।
·
·
·
চলবে……………………………………………………