এ্যাজেলিয়া রাজ্যে সুরসুন্দরীর প্রবেশ ঘটে সুরসুন্দরীর ইচ্ছেতে। তার জীবনে সেই বোধহয় প্রথম সে নিজেদের অঞ্চল, নিজেদের রাজ্য ছেড়ে বের হয়। এর আগে বহু রাজা এসেছিলো, আকুতি করেছে, মিনতি করেছে, লোভ দেখিয়েছে কিন্তু সুরসুন্দরীর পদধূলি পায়নি। কখনোই সে বের হয়নি রাজ্য ছেড়ে। অথচ সেই প্রথম সে রাজ্য ছেড়ে বের হলো তা-ও কারো বিনা অনুনয়ে, বিনা মিনতিতে। হয়তো অনুনয় ছিলো না বলেই তার আগ্রহ বেড়েছিলো।
এ্যাজেলিয়া রাজ্যে তখন রাজপ্রাসাদ জুড়ে একজনের প্রতাপ। রাজা কেশবচন্দ্রের। তার পিতা গত হয়েছিলেন বেশ কিছু বর্ষ আগেই। মাতা ছিলেন কেবল।
সুরসুন্দরীকে প্রথম রাজ্য থেকে বের হতে দেখে হরিতকীর মনে প্রশ্ন অবশ্যই উদয় হয়েছিলো। হাস্যঠাট্টার ছলে তার সাথের মেয়েগুলোও বলেছিল, “তবে শেষ অব্দি পৃথিবী দেখার সাধ হলো সুরসুন্দরীর!”
“পৃথিবী দেখার সাধ না অন্যকিছু তা-ই তো ভাববার বিষয়!”
তাদের হাস্যঠাট্টার ছলে বলা কথা সুরসুন্দরী বুঝবে না তেমন বোকা সে ছিলো না। ঢের বুঝেছে কোন ইশারা করছিলো সকলে। কিন্তু সে তো বেপরোয়া। কারো ইশারাকে গুরুত্ব দেওয়ার রুচি তার ছিল না।
হরিতকী অবশ্য মেয়েদের শাসন করত, “সুরসুন্দরীকে নিয়ে কোনো বাজে ঠাট্টা নয়। ও এই অঞ্চলের লক্ষ্মী আনে ভুলে যেও না।”
হরিতকীর ধমকে ঠাট্টা কিছুক্ষণের জন্য মিইয়ে গেলেও হরিতকীর আড়ালে চলত ঠিকই।
সুরসুন্দরী এ্যাজেলিয়া রাজ্যে গেল পালকিতে করে। সে কি ভীড়! তার আসার খবরে যে রাজ্যবাসীরও ঘুম উবে গিয়েছিল। কিন্তু সেই রূপ-লাবণ্যের সান্নিধ্য কি আর এত সহজেই পাওয়া যায়? হাজারও পুরুষের কামনার নারী সে। পুরুষও তো যে-সে সাধারণ পুরুষ নয়। রাজা, মহারাজা। সেই কামনার নারীকে সাধারণ প্রজাদের দেখার কি আর সাধ্যি হয়?
যদিওবা সুরসুন্দরীকে তারা দেখতে পায়নি তবে দেখছিলো এক জোড়া মোলায়েম, মাখনের মতন পা। অতটুকুন দেখেই যেন ধন্য হয়ে গিয়েছিল কত মানুষের জীবন, যৌবন। সূর্যের আলো অব্দি এসে সরাসরি সেই ধবধবা পা-টিকে চুম্বন করে যাচ্ছিল।
উদ্যান জুড়ে সেই কী আকাঙ্ক্ষা! ভুল করে একটুও যদি সরে যেতো পালকির পর্দাটা! ভুল করে যদি একটু সরে যেত মুখের ঘোমটাখানি। কিন্তু তা আর হলো কোথায়? সব সুন্দর দেখার ভাগ্য কি আর সবার হয়?
সুরসুন্দরীর পুনরায় গর্বে বুক ফুল উঠে। কেবল রাজা নয়, সাধারণ প্রজাদের মনেও যে তাকে দেখার এই আকুতি এই বাসনা তা সে টের পায়নি। ভাগ্যিস রাজ্য ছেড়ে বের হয়েছিলো! নয়তো তার জানাই হতো না বিশ্বব্রহ্মাণ্ড তার রূপ দেখতে কতটা মরিয়া।
তবে সুরসুন্দরীর গর্ব আবারও চূর্ণ করল কেশবচন্দ্র। তাকে বিশেষ আপ্যায়ন না করে, তার দিকে বিশেষ দৃষ্টি না দিয়ে সুরসুন্দরীর সমস্ত অহংকারকে যেন বৃদ্ধাঙ্গুল দেখাল।
তার জন্য কি-না এই রাজা কোনো বিশেষ আয়োজন করেনি? তার জন্য এই রাজার মনে বিশেষ টান নেই? কেন?
রাজার এই আলাদা আচরণই সুরসুন্দরীকে আরও টেনে ধরল রাজার দিকে।
এ্যাজেলিয়া রাজ্যের যেই বৈঠকখানাটি সেখানটায় আড্ডায় মগ্নরত হলো নর্তকীদের পুরো দল। তারা অবশ্য এসেছিল সবে পাঁচজন। সুরসুন্দরী ছাড়া বাকি চারজন রাজার আচরণ, কথাবার্তা, আপ্যায়নে আপ্লূত না হয়ে যেন পারল না। অবশ্য রাজার আরেকটি বিষয়ও তাদের প্রশংসার কেন্দ্রবিন্দু ছিলো। তা হলো, সুরসুন্দরীকে বাকিদের মতনই আপ্যায়ন করা। এই জীবনে কেউ এর আগে এটা করেনি। সবসময়ই তারা দেখেছে একই সঙ্গে থেকেও সুরসুন্দরী থেকে কতটা দূরত্বে তাদের অবস্থান ছিল। তারা কতটা হীন। রূপ তাদেরও কম ছিলো না তবুও এই বৈষম্য চোখে লাগার মতনই বিশ্রী ছিল। এই প্রথম কোনো রাজা সেই বৈষম্যের প্রাচীর ভেঙে দিল। এই প্রথম কেউতো সুরসুন্দরীর অহংকার ভেঙে স্তব্ধ করল।
রাজার এই বিশেষ গুণটি সকলের ভেতর নাড়া দিলো। নাড়া দিল সুরসুন্দরীর ভেতরও। কিন্তু সে কি আর দমে যাওয়ার পাত্রী! তার ভেতরে চলল রাজাকে শিক্ষা দেওয়ার অভিলাষ।
এ্যাজেলিয়া রাজ্যেরই নর্তকীশালায় একটি বিরাট আয়োজন করা হলো মনোরঞ্জনের নর্তকীদের আগমনের উদ্দেশ্যে। কাছে-পিঠের রাজ্যের রাজারা, রাজপুত্ররাও এলেন কেউ কেউ কেশবচন্দ্রের আমন্ত্রণে। কেউ কেউ তো সুরসুন্দরীকে দেখার বাসনায় বিনা আমন্ত্রণেও এলেন। নর্তকীশালায় বাদ্যযন্ত্রে মুখরিত। রাত বাড়ছিল ক্রমশ। নেশায় বুঁদ হয়ে যাচ্ছিলো সকলে। মন্ত্রমুগ্ধের মতন দেখছিলো একেকজনোর নৃত্য। হরিতকীর যেই কলাকৌশল তা মুগ্ধ হওয়ার মতনই ছিলো। কেবল তা ঢেকে যাচ্ছিল সুরসুন্দরীর আগমনে। নর্তকীশালায় সকলে উপস্থিত হলেও, অনুপস্থিত রইল সুরসুন্দরী। সে যে উপস্থিত হবেও না। বিভিন্ন রাজাদের নৃত্য দেখাতে হলে তো সে নিজের রাজ্যেই থাকত। এখানে তো আসত না। সে কি সামান্যটি! কেশবচন্দ্র ভেবেছেন কী নিজেকে? রাগে, ক্ষোভে লাল হয়ে আসে সুরসুন্দরীর মুখ।
রাত বাড়ে ক্রমশই। বাদ্যের শব্দ শোনা যায় তখনও। সুরসুন্দরী উপুড় হয়ে শুয়ে থাকে তার পালঙ্কে। নিদ্রা ধরা দেয় না দু'টি চোখে। তার কক্ষের সেই নিস্তব্ধতাকে নিপাত করে খট করে শব্দ হয় কপাটে। সুরসুন্দরী চমকে উঠে, তার সুরেলা কণ্ঠে জিজ্ঞেস করে,
“কে?”
“আমি, রাজা কেশবচন্দ্র।”
রাজার নামটি শুনতেই সুরসুন্দরীর বুকে তীব্র ঝড় উঠে। অবশেষে রাজা এলো! তাকে নিতেই কি এসেছে? যদি নিতে এসে থাকে তবে সুরসুন্দরী কড়া গলায় কিছু কথা বলে এই মুহূর্তেই প্রাসাদ ছেড়ে চলে যাবে। রাজাকে বোঝাবে সুরসুন্দরীর দম্ভ কতটুকু। কোনো রাজার কথায় সুরসুন্দরী চলে না।
মনে মনে অনেক ছলাকলা কষে কপাট খুলে সে। কপাটের সামনে ভারি পর্দা দেওয়া। রাজা পর্দার উপারেই। পর্দার খুবই সুক্ষ্ম ফাঁকা দিয়ে সে দেখে রাজা ফিরে আছে উল্টোদিকে। একটিবার তার দিকে তাকায়ওনি!
মনের ছলাকলা নিভে যায় মনেই। ব্যথিত হয় তার হৃদয়। তবুও কণ্ঠ শক্ত রাখে,
“কী চাই?”
রাজার মাথা এবার ঘোরায়। সরাসরি পর্দার দিকে না তাকিয়ে তাকায় বাম দিকে, “আপনার স্বাস্থ্য ঠিকঠাক আছেতো? শুনলাম রাত্রের আহার করেননি! তাই খোঁজ নিতে এলাম। এত রাত্রে বিরক্ত করা যদিও উচিত হয়নি।”
তার খাবারের খোঁজ নিতে এসেছে তবে রাজা? নৃত্য করতে যাওয়ার কথা বলতে নয়? আর সে কি-না কত কলাকৌশল এঁটে নিয়েছিলো! এমনকি তার দিকে তাকাচ্ছেও না? কেন, তাকালে কি ক্ষয় হয়ে যাবে চোখ? যে সুরসুন্দরীকে পাওয়ার জন্য সকলের এত আকুলতা তার দিকে তাকানোর সুযোগ থাকা শর্তেও চোখ ঘুরিয়ে রাখছে রাজা? এত বড়ো দুঃসাহস রাজার?
সুরসুন্দরীর রাগ হলো ভীষণ। বলল, “হ্যাঁ আমি ঠিক আছি একদম। এতটুকুই বলার ছিল?”
“হ্যাঁ এটাই জানার ছিল। আমার রাজপ্রাসাদে অতিথি আহার ছাড়া থাকে না। কিছু যদি আহার করতেন..”
তাকে মাঝ পথে থামিয়ে দেয় মেয়েটা,
“আমি থাকব। আমার ইচ্ছেতে আমি চলব। আপনার রাজপ্রাসাদের ইচ্ছেতে আমাকে চলতে হবে? এই সুরসুন্দরীকে ভালো করে জেনে আসুন। আমার সম্পর্কে বোধহয় আপনি বড্ড কম অবগত।”
“আপনি রেগে যাচ্ছেন কি? কোনো অন্যায় হয়েছে!” কণ্ঠে বিনম্রতার যেন অঢেল ছড়াছড়ি সেই রাজার। এই বিনম্রতার বিনিময়ে ক্রোধ কতক্ষণ বের করা যায়? রাগে দুঃখে হটকারিতা করল সুরসুন্দরী। পর্দা গলিয়ে নিজের হাতটা বের করে রাজাকে টেনে নিলো নিজের কক্ষে।
আচমকা টান সামলাতে পারল না রাজা। এসে ছিটকে পড়ল সুরসুন্দরীর বুকের উপরটায়। তার খোলা পেটে হাত থামল গিয়ে আপনা-আপনি।
সুরসুন্দরীর চোখে তখন রাগে, অভিমানে অশ্রু চলে এসেছে, “আমার দিকে তাকিয়ে কথা বলছেন না কেন? আমাকে দেখলে কি চোখ জ্বলে যাবে? ধ্বংস হয়ে যাবেন? নাকি নিজেকে সামলাতে পারবেন না?”
রাজার বুকের কাছটার জামা খামচে ধরে রইল সে।
রাজা ছুটতে চেষ্টা করল,
“কী করছেন!”
সুরসুন্দরী আরও ঘনিষ্ঠ হলো। রাজার গলা জড়িয়ে ধরল। মদ্যরসের নেশা ও নিজের অহংকারের নেশায় ডুবে গেল। রাজার সাথে ঘনিষ্ঠতা বাড়াতে বাড়াতে বলল,
“আমি আপনার নিকটে দাঁড়িয়ে। আমাকে প্রত্যাখ্যান করে কীভাবে যান আমিও দেখব।”
“এটা অন্যায় হচ্ছে। আপনি নিজের সাথে নিজে অন্যায় করছেন।”
“হোক অন্যায়।” বলেই নিজের পোশাকের একাংশ সরিয়ে ফেলল সুরসুন্দরী। জোর করে দখল করে রাখল রাজার গাল, চোয়াল, ঠোঁটের অংশগুলো। উন্মাদ পাগলের মতন করল। হিংস্র পশুর মতন ছিঁড়ে ফেলতে চাইল রাজাকে। তাকে গ্রহণ না করায় সে বোধহয় আরও পাগল হলো।
রাজা তাকে জোরপূর্বক ছাড়িয়ে বুকের কাপড়টি টেনে দিয়ে আর এক মুহূর্ত অপেক্ষা না করে বেরিয়ে গেলো কক্ষ ছেড়ে। সুরসুন্দরীর মতন এত সুন্দর নারীকে পেয়েও সংযত থাকল শেষমেশ। যা সুরসুন্দরীকে জ্বালিয়ে পুড়িয়ে দিল। তার রূপের দম্ভের এমন পরিণতিতে ভেঙেচুরে একাকার হয়ে গেলো ভেতরটা। সে কেমন বেহায়াপনা করল তা ভেবেও হয়রান হলো। নিজ ইচ্ছেতে কোনো পুরুষের কাছে নিজেকে সঁপে দিতে চাইল অথচ সেই পুরুষ কি-না তাকে গ্রহণ করল না? এই লজ্জায় তার ভেতরটা ফেঁটে গেল। হাউমাউ করে কাঁদল সে।
—————
সুরসুন্দরীর বদল ঘটল সেদিনের পর থেকে। এ্যাজেলিয়া রাজ্য ছেড়ে সে চলে এলো পরেরদিনই। এতটা তাড়া দিলো হরিতকীকে যে থাকার আর কোনো উপায় ছিল না। এরপর রাজ্য ছেড়ে চলে আসার পর থেকে সবাই আবিষ্কার করল সুরসুন্দরীর সেই রূপ, রূপের প্রভাব, দাপট, আত্ম অহংকার আর শোনা যাচ্ছে না। শোনা যাচ্ছে না কোনো কথার তীক্ষ্ণ বাণ। নিজের কক্ষের এক কিনারায় তার দিন কাটতে লাগল নীরবে, নিশ্চুপে। মূলত তার রূপের হার সে মানতে পারল না, না-কি রাজার প্রত্যাখ্যান? তার দ্বন্দ্ব থেকে গেল ঠিক।
সুরসুন্দরীর বদল নিয়ে চর্চা হতে লাগল সকলের ভেতর। সবার প্রথমে বদলটা বোধহয় হরিতকীই খেয়াল করল। প্রতিদিন সকালে উঠে সুরসুন্দরী সুর তুলত। নৃত্য করত তারি তালে তালে। এক ধ্যানে, মনে, প্রাণে আরাধনা করত নৃত্যের। অথচ সেই নিয়ম বদলে গেলো। গুনগুন করা ছেড়ে দিলো সে। সারাদিন তার মুখে দেখা গেলো বৈরাগ্য।
হরিতকী যদিও আকারে-ইঙ্গিতে বুঝিয়ে বলত,
“শোনো মেয়েরা, এই অঞ্চলে তোমরা সব করতে পারবে। রাজাদের মনোরঞ্জন, নিজেদের মনোরঞ্জন, হাস্যঠাট্টা… সব। করতে পারবে না কেবল সংসার, ভালোবাসা আর প্রেম।”
কেউ প্রশ্ন করত না, কেন তাদের সংসার করা মানা। কেন প্রেম করা বারণ তাদের!
সবাই বরং হাসত হরিতকীর কথায়। নর্তকীদের সাথে সংসার করতে আসবে কোন ঘাটের মরা? হরিতকীজিও না মাঝে মাঝে কেমন ভুলভাল বলে!
সুরসুন্দরী বুঝতে পারে। হরিতকী সবার সাথে সাথে তাকেও সাবধান করছে। কিন্তু সে কি আদতেও প্রেম, ভালোবাসায় ভুলেছে?
এক রাতে একটি বিস্ময়কর বিষয় ঘটল। সুরসুন্দরীকে খুঁজে পাওয়া গেল না আর। কোথাও তার খোঁজ নেই। টিকিটুকুও নেই। রাজ্য জুড়ে সাড়া পড়ল। যতই হোক, প্রখাণ্ড রাজ্যের রাজা কি মানতে পারে এই কাণ্ড? তার রাজ্যের সোনার পায়রা কোথায় উড়ল? সেই পায়রাই তো তার রাজ্যকে রেখেছিলো বেশ হালে। চারপাশে খোঁজ পড়ল। লোক লোকারণ্যে ছেয়ে গেলো।
অবশেষে খোঁজ মিলল সুরসুন্দরীর। সে কি-না শেষমেশ এ্যাজেলিয়া রাজ্যের রাজপ্রাসাদে ঘাঁটি গেঁড়েছে! রাজার পায়ে সঁপে দিয়েছে নিজেকে? বিনা সংসার, বিনা প্রেমে এ কেমন দণ্ড দিলো?
সেই সংবাদে আঁতকে উঠল হরিতকী। সখীরা বলল,
“নিশ্চয় রাজা কোনো ছল করেছেন। সুরসুন্দরীকে নিয়ে আসতে হবে আমাদের।”
যারা পছন্দ করত না সুরসুন্দরীকে তারা সখীদের কথায় প্রতিবাদ করত,
“সুরসুন্দরীতো ছোটো শিশুটি নয়! ও গিয়েছে নিজ ইচ্ছেয়। তাছাড়া এই অঞ্চল ছেড়ে ও বেরিয়েছে মানে ও এখানে আর ফিরবে না বলেই নিশ্চয় বের হয়েছে? নিয়ম ভঙ্গ করে কেন ওকে আনতে হবে?”
“কিন্তু ও এই অঞ্চলের মোক্ষ নারী।”
“আমরাও কম কীসে? সৌন্দর্যতা আমাদেরও কি কম আছে? নিজেকে দেখো, আমাদের দেখো। আমরা সবাই সুন্দর। ওর জন্য আমাদের সেই সৌন্দর্যতা এতদিন কেউ দেখেনি।”
সেই তর্ক-বিবাদ থামিয়ে দেয় হরিতকী। এরপর নিজেই সিদ্ধান্ত নেয় সুরসুন্দরীর সাথে একবার দেখা করার। এমন দম্ভ যে মেয়ের সে শেষমেশ এহেন কাণ্ড কেন ঘটাল? কেন নিজের রূপ, লাবণ্য ছেড়ে সঁপে দিল কারো পায়ে?
নিজের মনের সংশয় নিয়ে হরিতকী একবার দেখা করতে যায়ও। কিন্তু সুরসুন্দরী আর দেখা করে না তার সাথে। হয়তো লজ্জায়! চোখে চোখ পড়ল কী উত্তর দিতো সে? যে মেয়েটি নিজের রূপ নিয়ে সবসময় বড়াই করত সে কিনা আরেকটি পুরুষের পায়ে লুটিয়ে পড়ছে এই লজ্জা নিয়ে সামনে যাওয়া যেত? এমনকি পুরুষটি তাকে গ্রহণও করেনি অবলীলায়। কী বলত সে? নিজের ভুল কাজটিকে কীভাবে সঠিক বলত?
হরিতকীজি ফিরে এসেছিল তারপরেই। এরপর সুরসুন্দরীর সাথে তাদের আর কখনো কথা হয়নি, দেখা হয়নি। শোনা কথায় কত চাপা গুঞ্জন পাওয়া যেত। রাজা কেশবচন্দ্রের রাজ্যেও তখন নাকি রাজাদের আনাগোনা বেড়ে গিয়েছিল। লোকে বলত সুরসুন্দরীকে নাকি প্রায় বিভিন্ন রাজাদের সাথে থাকতেও হতো! হরিতকী আঁতকে উঠত সেসব কথায়। মনে মনে বলত— এজন্যই আমি বলছিলাম নর্তকীদের সব করা যায় কেবল সংসার নয়। কারণ এই সংসার তাকে কখনো বধূর মর্যাদা দিতে পারবে না। কখনো আগলে নিতে পারবে না।
বছর কিছু পেরুতে সুরসুন্দরীর একটি কন্যা সন্তানও হয়। কোনো বৈধ সম্পর্ক রাজার সাথে তার হয়ে উঠেছিল কি-না তার প্রকাশ্যে কোনো দলিল উপস্থাপিত হয় না যদিও। তবে কন্যা সন্তান হওয়ার পর সুরসুন্দরীর গল্প থেমে যায়। বাকিটা আর জানা হয়নি কারো। সে প্রেমে পড়েই সব হারিয়ে ছিলো না রূপের দম্ভচূর্ণ হওয়ার ক্ষোভে তা নিয়ে আর কখনো কেউ আলাপ করেনি।
তার গল্প মিলিয়ে যায় বছর পরিবর্তনে হাওয়ায়।
—————
রানি কামিনীকাঞ্চন রক্তিম চোখজোড়া নিয়ে তাকিয়ে আছেন হরিতকীজির মুখ পানে। আবছা আলো অন্ধকার কক্ষে বহুক্ষণ পর তিনি একটি প্রশ্নই করলেন,
“সুরসুন্দরীর সেই সংসার বিহীন কন্যাটি কে? আমি তাই না?”
·
·
·
চলবে……………………………………………………