ছবির মতোন সুন্দর একটি সকাল। রোদ পড়া জানালায় উদাস বসে পুচ্ছ নাড়ছে একটি চড়ুই। সাব্বিরের আটপৌরে বাসায় যে ঘর ঘর খুশবুটা ঘুরে বেড়ায় সর্বক্ষণ তার কিছুটা যেন ওম হয়ে ল্যাপটে আছে মিথির বিছানায়। মিথি আলস্য ভেঙে উঠে বসল। রান্নাঘর থেকে কর্কশ একটি শব্দ আসছে অনেকক্ষণ ধরে৷ মনে হচ্ছে কেউ শিলনোড়া নিয়ে যুদ্ধে নেমেছে। মিথি আলগা চুলগুলো হাত খোঁপা করে জানালার পাশে এসে দাঁড়াল। এই বাসায় বেশ কয়েকমাস থাকলেও এই ঘরটা তার জন্য নতুন। চলে যাওয়ার আগে মাত্র একবার এসেছিল এই ঘরে। সেদিন জানালাটা খোলা ছিল নাকি বন্ধ, খেয়াল নেই। মিথি জানালার পাশের দেওয়ালে ঠেস দিয়ে দাঁড়াল; উদাস চড়ুইটা উড়ে গেল তক্ষুনি। জানালার পাশে সাব্বিরের একটি পড়ার টেবিল। ওখানে নানান রকম বই– ডাক্তারি বইয়ের পাশাপাশি বেশ কিছু কবিতার বইও আছে। সাব্বিরের বুঝি কবিতা খুব পছন্দ? মিথি সেখান থেকে একটি কবিতার বই তুলে নিয়ে জানালার বাইরে তাকাল। এখান থেকে বাড়ির পেছন দিকটা চোখে পড়ে। একটা কমবয়সী পলাশ ফুল গাছ আর মস্ত একটা আকাশ। ভেজা গাছতলাটা ছেয়ে আছে ঝরে পড়া পলাশ ফুলে। ঢাকা শহরে পলাশ ফুল খুব একটা চোখে পড়ে না মিথির। অবশ্য, এই শহরে এমন দিঘি চোখের সাব্বিরই বা ক'টা আছে?
রান্নাঘরের শব্দটা ক্রমশ বাড়ছে। মিথি বইটা নামিয়ে রেখে শোবার ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। কমলার মা রান্নাঘরের মেঝেতে বসে বিশাল এক বাটি ভরে আদা-রসুন বাটছে। সাব্বির দরজার কাছে দাঁড়িয়ে আছে। মনে হচ্ছে কেবলই বাজার থেকে ফিরেছে। মিথি তাদের দিকে এগিয়ে এসে জিজ্ঞেস করল,
‘ কেমন আছেন, বুয়া?’
কমলার মা মিথির প্রশ্নে মুখ তুলে তাকাল। চোখের সামনে মিথিকে দেখে কয়েক মুহূর্ত স্থবির হয়ে থেকে আনন্দের আতিশয্যে চিৎকার করে বলল,
‘ ও মা গো! আপামণি আপনে? আপনে কখন আইছেন?’
মিথি হেসে বলল,
‘ কাল রাতে।’
কমলার মা খুশি হয়ে বলল,
‘ ভালো হইছে আইসেন। আমি আরও ভাবতেছিলাম আপনে বোধহয় আর আইবেন না। টিভিতে দেহি নায়িকাদের সংসার বেশিদিন টিকে না। তাদেরও দোষ দেওনের উপায় নাই। চোখের সামনে দিয়া সারাদিন ওমন সুন্দর সুন্দর নায়ক ঘুরলে কি আর সংসারে মন টেকে?’
মিথি হাসল। সাব্বিরকে পাশ কাটিয়ে রান্নাঘরে ঢুকে কেবিনেটের সঙ্গে ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়ে বলল,
‘ আপনার স্যার কী কোনো নায়কের চাইতে কম সুন্দর, বুয়া?’
মিথির এই অপ্রত্যাশিত প্রশ্নে দারুণ বিস্মিত হলো সাব্বির। বিব্রত, লজ্জাপীড়িত মুখ নিয়ে সে অবাক হয়ে তাকাল মিথির দিকে। বুয়া মশলা বাটায় সাময়িক বিরতি দিয়ে বলল,
‘ ঠিক কইছেন আপা। আমাদের স্যারও তো কোনো নায়কের থেইকা কম না! তাছাড়া, চেহারা দিয়া কী হইবো? আচার-ব্যবহারই সব। আমাদের স্যারের মতোন মাটির মানুষ আর দুটো হয়?’
চাপা স্বভাবের মিথি নিজেকেই অবাক করে দিয়ে হুট করে বলে বসল,
‘ আপনার স্যারের মতো সুন্দর মানুষও দুটো হয় না বুয়া।’
বলে ফেলে নিজেই বেশ লজ্জায় পড়ে গেল মিথি। তবে তা প্রকাশ পেল না তার নির্লিপ্ত চেহারায়। দু’জন পরিণত নারীর আলোচনার বিষয়বস্তু হয়ে অস্বস্তিতে হাঁসফাঁস করে উঠল সাব্বির। কী করে এই দৃশ্যপট থেকে অদৃশ্য হয়ে যাওয়া যায় মনে মনে সম্ভবত সে কথাই ভাবছিল৷ তার বিহ্বলতার পরিমাণ আরেকটু বাড়িয়ে দিতেই যেন বুয়া ঠোঁট টিপে হাসল। টিপ্পনী কেটে বলল,
‘ নতুন বিয়া হইলে সব মাইয়া মানুষেরই সোয়ামীকে সালমান খানের মতোন লাগে, আপা। আমি যখন কমলার বাপের কাছে বিয়া বসলাম। দিনে রাইতে আচান্নক লাইগা যাইতাম। এমুন সুন্দর মানুষ হয়? তারপর কমলা হইলো। কমলার বাপের কামদাম কিছু নাই। সারাদিন জুয়া খেলে। মদ খায়। আমি সারাদিন মাইনষের বাড়ি কামলা খাডি। এহন কাম থাইকা বাড়ি গেলে মনে হয়, কীয়ের সুন্দর! চোরের মতোন চেহারা। কোন কপালের দোষে যে গোলামের পুতের কাছে বিয়া বসছিলাম!’
কমলার মায়ের কথায় অনেকদিন পর প্রাণখোলে হাসল মিথি। বলল,
‘ তার মানে পুরোনো হলে আপনার স্যারও ওরকম গোলামের পুত হয়ে যাবে বলছেন বুয়া?’
বুয়া দাঁতে জিভ কেটে বলল,
‘ ছিঃ! ছিঃ! আল্লাহ মাফ করুক। স্যার কী আর কমলার বাপের মতোন খারাপ মানুষ আপামণি? স্যার তো দেবতার লাহান মানুষ। আপনি দেবী, স্যার দেবা। আল্লাহ নিজের হাত দিয়া বানাইছে আপনাদের জুটি।’
মিথির সারামুখে কোমল একটা আলো ছড়িয়ে পড়ল এবার। চোখ ফিরিয়ে দরজার কাছে বিব্রতমুখে দাঁড়িয়ে থাকা তার অতি সাধারণ স্বামীর দিকে তাকাল। বৈচিত্র্যহীন শার্ট গায়ে শ্যামলা একটা মুখ। চশমার আড়ালে ঢাকা সরল দুটো চোখ। ওই চোখের দিকে তাকিয়ে মিথির মনে হলো, এই পৃথিবীর সকলেই বর্ণান্ধ। রূপ বিচারে অজ্ঞ। নয়তো এতো রূপকে তারা কী করে উপেক্ষা করে? বাকি সময়টা মিথি মুগ্ধ বিস্ময়ে অপলক তাকিয়ে রইল সাব্বিরের মুখের দিকে। না তাকিয়েও নিজের উপর মিথির নজর বুঝতে পেরে আরও সংকুচিত হয়ে পড়ল সাব্বির। বুয়া মশলা বাটা শেষ করে বাজার গুছিয়ে চলে গেলে মিথির দিকে তাকাল সে। চুলায় চায়ের জল বসিয়ে জানতে চাইল,
‘ আপনি চা খাবেন তো, মিথি?’
সাব্বিরের প্রশ্নে সম্বিত ফিরলেও মোহভঙ্গ হলো না মিথির। দীর্ঘ একটা শ্বাস ফেলে সে আরও আরাম করে দাঁড়াল। মাথাটা সামান্য হেলিয়ে সে দেখতে লাগল সাব্বিরের হাঁটা-চলা-কাজ-সৌন্দর্য। সাব্বির অনেকক্ষণ মিথির এই তাকিয়ে থাকা খেয়াল করে অবশেষে মুখ খুলল৷ বলল,
‘ কী এতো দেখেন আপনি?’
‘ আপনাকে।’
সাব্বির পাশ ফিরে তাকিয়ে বলল,
‘ আমাকে এতো দেখার কী আছে?’
মিথি হতাশ একটা নিঃশ্বাস ফেলে সোজা হয়ে দাঁড়াল। এগিয়ে এসে সাব্বিরকে চা ঢালতে সাহায্য করতে করতে বলল,
‘ দেখার কিছু নেই। ছুঁতে ইচ্ছে করছে। ছুঁতে পারছি না বলে দেখছি।’
মিথির অপ্রত্যাশিত উত্তরে অত্যধিক হতবাক হয়ে গেল সাব্বির। গরম চা কাপের বদলে পড়ল তার হাতের ওপর। মিথি চিন্তিত গলায় বলল,
‘ একি! পুড়ল নাকি?’
সাব্বির হাতটা পানির কলের নিচে দিয়ে ঘাড় ফিরিয়ে একবার মিথির দিকে তাকাল। লজ্জায় কান গরম হয়ে গিয়েছে তার। কন্ঠরুদ্ধ। সে গলা খাঁকারি দিয়ে কণ্ঠটা সামান্য পরিষ্কার করে বলল,
‘ না, ঠিক আছি।’
প্রত্যুত্তরে মিথি অল্প হাসল। নিজের কাপে চিনি মেশাতে মেশাতে বলল,
‘ সবসময় কি মাসের বাজার, মশলা একসঙ্গে করা হয় নাকি?’
প্রসঙ্গের এই বদলে স্বস্তি পেল সাব্বির। এতোক্ষণের দমবন্ধকর অস্বস্তি থেকে বেরিয়ে প্রাণখোলে শ্বাস নিলো। একটু বেশিই প্রাণবন্ত গলায় বলল,
‘ না। কাল থেকে বুয়া আসবেন না। তাই একেবারেই তৈরি করে রাখতে হচ্ছে।’
সাব্বিরের আনন্দোচ্ছ্বাস দেখে মনে হলো, কাল থেকে বুয়া না আসা খুবই সুখের খবর। মিথি অবাক হয়ে বলল,
‘ আসবেন না কেন? বুয়া কী কাজ ছেড়ে দিচ্ছেন নাকি?’
সাব্বির আগের মতোই পুলকিত হয়ে বলল,
‘ না। কাজ ছাড়ছেন না। কালকে থেকে রোজা তো। রোজার মধ্যে বুয়া রান্নার কাজ করেন না। দিনে একবার এসে কেবল ঘরদোর ঝেড়ে দিয়ে যান। পুরো রমজান মাস উনার অর্ধছুটি৷’
বলে হাসল সাব্বির। মিথি অবশ্য তার বিপরীতে হাসি উপহার দিতে পারল না। কাল রোজা শুনে খুবই অবাক হয়েছে সে। দাদাজানের বাড়ি থেকে বেরিয়ে আসার পর থেকে আর কখনো সেভাবে রোজার হিসেব রাখেনি মিথি৷ এই পৃথিবীতে বৃক্ষের মতো একলা বেঁচে থাকা মিথির কাছে রোজার বিশেষ কোনো মহত্ত্বও নেই। সাব্বিরও তো মিথির মতোই একা। তাহলে তার এতো আনন্দ, এতো প্রস্তুতি কীসের? মিথি আনমনে চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে সাব্বিরের দিকে তাকাল। জিজ্ঞাসা করল,
‘ আপনি রোজা রাখেন সাব্বির?’
এমন অদ্ভুত জিজ্ঞাসায় বিস্মিত না হয়ে পারল না সাব্বির। অবাক গলায় বলল,
‘ রোজা রাখব না কেন?’
সে কথার উত্তর দিলো না মিথি। এতোদিন তার মনে হতো এই পৃথিবীতে একা বেঁচে থাকা একটা বিদ্রোহের মতো। সৃষ্টিকর্তা সবাইকেই পরিজন দিয়েছেন, তাকে দেননি। না দেওয়া সেই জিনিসের জন্য আক্ষেপ না করে, অপেক্ষা না করে, সকল আনন্দ উৎসবকে উপেক্ষা করে বেঁচে থাকাটা সৃষ্টিকর্তার প্রতি এক নীরব প্রতিবাদ। কিন্তু সাব্বিরের এই সরল প্রশ্ন তার এতোদিনকার সেই প্রতিবাদকে চূর্ণবিচূর্ণ করে দিল। সাব্বির এই পৃথিবীতে তার চাইতেও একা। গহীন রাতের মতোন নিষ্ঠুর একটা জীবন তাকে উপহার দিয়েছেন বিধাতা। অথচ তা নিয়ে সাব্বিরের কোনো ক্ষোভ নেই। আক্রোশ নেই। সৃষ্টিকর্তার প্রতি তার কী আশ্চর্য সমর্পণ! যেন এই জন্মটাই তার বড়ো পাওয়া। মিথি মনে মনে খুব লজ্জিত হলো। এই দীর্ঘ জীবনে তার সকল মানসিক যুদ্ধকে অহেতুক ছেলেমানুষি মনে হলো। অন্যমনস্ক গলায় বলল,
‘ ছেলেবেলায় আমরা রোজা রাখতাম। দাদাজানের কড়া নজরের সামনে বাধ্য হয়েই রোজা রাখতে হতো। সবাই মিলে তারাবীহ পড়তে হতো। প্রতি রমজানে দাদাজানের অন্তঃপুরে একজন মহিলা হাফিজার ব্যবস্থা করতেন দাদাজান। তার কাজ বাড়ির মহিলাদের জড়ো করে তারবীহ পড়ানো। ছেলেদের পড়তে হতো উঠোনে লম্বা করে চাদর বিছিয়ে। সাহারি আর ইফতারের পর সমস্ত ঘর নিঁখুতভাবে সার্চ করা হতো।’
সাব্বির অবাক হয়ে জানতে চাইল,
‘ ঘর সার্চ দেওয়া হতো কেন?’
মিথি হেসে বলল,
‘ কেউ কোনো খাবার লুকিয়ে রেখেছে কিনা সেটা পরীক্ষা করতে। রমজান মাসে সারাদিন বাড়িতে কোনো রান্না হতো না। সাত বছর বয়স থেকে আরম্ভ করে সকলকে বাধ্যতামূলক রোজা রাখতে হতো। কোনে অসুখ, দুর্বলতা দাদাজান বরদাস্ত করতেন না। দাদাজান যে কেবল ঘর চেইক করতেন তেমনও না। ইফতারের আগে সকলের মুখও চেইক করা হতো। মুখের ভেতর খাবারের আলামত দেখলেই ইফতার বন্ধ। মাগরিবের পর সকলের উপস্থিতিতে দশটা বেত্রাঘাত।’
সাব্বির বিস্মিত গলায় বলল,
‘ সাঙ্ঘাতিক ব্যাপার!’
মিথি হাসল। চোখ মুখ উজ্জ্বল করে বলল,
‘ আমার ভাই-বোনরাও কম সাঙ্ঘাতিক ছিল না। ওরা এতো নিরাপত্তা ব্যবস্থার মধ্যেও ঠিকঠিক ইফতারে খাবার সরাতো। ওগুলোকে রেখে আসতো দিঘি পাড়ে আমগাছের ঝোঁপের মধ্যে। তারপর পরেরদিন স্কুলে গিয়ে সেগুলো ভাগাভাগি করে খাওয়া হতো। যেদিন রোজা ভাঙা হতো সেদিন সবাই চোখে-মুখে একটু বেশিই বিমর্ষ ভাব ধরে রাখার চেষ্টা করতো। তাতে অবশ্য লাভ কিছু হতো না। দাদাজানের শকুনের চোখ। এতোকিছুর পরও তিনি ঠিক ধরে ফেলতেন। রোজার প্রতি সবচাইতে বেশি অনীহা ছিলো নাহিদের। মারও খেতো ও-ই বেশি। এতো দু্ষ্ট ছিলো তখন! এখনও অবশ্য ওরকমই আছে।’
বলে নিজেই হাসল মিথি। সাব্বির তার উজ্জ্বল মুখের দিকে তাকিয়ে থেকে বলল,
‘ আপনি আপনার ভাই-বোনদের খুব স্নেহ করেন তাই না?’
স্নেহ করে? কথাটা খুব নতুন শোনাল মিথির কানে। এই পৃথিবীতে মিথি কোনোদিন কাউকে স্নেহ করেনি। ভালোবাসেনি। ইচ্ছে যে করেছে তেমনও না। কিন্তু আজ, এই সকালে, চায়ের কাপ হাতে দাঁড়িয়ে সত্যিই ভাই-বোনের প্রতি সূক্ষ্ম একটা মমতা অনুভব করলো মিথি। উপলব্ধি করলো, মানুষ কেবল তখনই অন্যকে নিয়ে ভাবে যখন তার নিজের জীবনে টইটুম্বুর সুখ থাকে। সুখী মানুষ প্রাণ ভরে অন্যকে ভালোবাসতে পারে, স্নেহ করতে পারে। যারা নিজের জীবন নিয়েই অস্থির, তাদের হাতে অপরকে মায়া করবার ফুরসুত থাকে না।
তারমানে কী মিথি এখন সুখী? সাব্বিরের সঙ্গই কি তবে তার একমাত্র সুখ?
সকালের রোদটা চড়তে আরম্ভ করেছে। নাহিদ খোলা ছাদে টুল পেতে বসে বই পড়ছে। হাতে একটা সিগারেট। সিগারেটে আগুন নেই। হাতের বইটির নির্দিষ্ট একটা অংশ পড়ে শেষ করতে পারলে তবেই সিগারেটে আগুন ধরানো হবে। কালকে ডিপার্টমেন্টে একটা পরীক্ষা আছে। নাহিদ কোনোকালেই পরীক্ষাকে খুব একটা গুরুত্ব দেয়নি। কিন্তু এবার কী মনে করে সে পরীক্ষার প্রতি খুবই মনোযোগী হয়ে উঠেছে। সৌধ খাবারের ব্যাগ হাতে উপরে এসেই নাহিদকে ছাদে বসে থাকতে দেখল। জিজ্ঞেস করলো,
‘ তোর জ্বরের কী অবস্থা? কমেছে?’
নাহিদ মাথা তুলে তাকিয়ে বলল,
‘ মনে হয়। নাস্তা এনেছিস নাকি? কোথা থেকে আনলি?’
সৌধ এগিয়ে এসে বলল,
‘ কোথা থেকে আবার? নিচের হোটেল থেকে। আমার কী বউ আছে যে রেঁধে বেড়ে দেবে।’
নাহিদ এই পর্যায়ে একটু হাসল। ঠোঁট টিপে বলল,
‘ তোর বউ থাকবে কী করে? তুইই তো আমার বউ।’
সকাল সকাল মেজাজটা খিচড়ে গেল সৌধর। খাবারের প্যাকেটটা নাহিদের মুখের উপর ছুঁড়ে মারতে গিয়েও নিজেকে সংযত করলো। দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
‘ পেট কেটে বসে আছিস বলে বেঁচে গেলি। শালা বাই**দ।’
নাহিদ একটু হেসে আবার গম্ভীর মুখে বইয়ে ফিরে গেল। পরবর্তী আধাঘন্টা সে নীরবে বই পড়ল। তারপর বইটা বন্ধ করে সিগারেট ধরিয়ে জানতে চাইল অফিসের খবর। বলল,
‘ সুহানাকে যে আর্টিকেল পাঠিয়েছিস সেটার কোনো আপডেট দিয়েছে?’
সৌধ ঘরের ভেতর থেকে একটা চেয়ার এনে আরাম করে বসল। বলল,
‘ না।’
মেয়েদের বুদ্ধিমত্তায় সন্দেহ নেই নাহিদের। কিন্তু প্রথমবার হিসেবে সুহানা কাজটা ঠিক করে করতে পারবে কিনা এই নিয়ে সন্দেহ হচ্ছে। কর্ণেল সাহেবের মেয়ে, কিছু বলাও যাবে না৷ আরেক ফ্যাকড়া। এজন্যই ম্যাগাজিনের কাজে নিজের পছন্দই প্রাধান্য দিচ্ছিল নাহিদ। কর্ণেলের মুখের উপর মানা করতে না পেরেই…! নাহিদের চিন্তিত মুখের দিকে তাকিয়ে হঠাৎ প্রশ্ন করলো সৌধ,
‘ মেয়েটা কে?’
‘ মেয়েটা!’ অবাক হলো নাহিদ। প্রশ্ন চোখে তাকিয়ে বলল,
‘ কোন মেয়ে?’
সৌধ উদাস মুখে বলল,
‘ অসুখ করলেই যাকে পাওয়ার পিনিক উঠে তোর, সেই মেয়ে।’
উত্তরটা শুনে নাহিদ এমনভাবে তাকাল যেন এমন আশ্চর্য আর উদ্ভট কথা সে তার ইহজীবনে শুনেনি। বিরক্ত হয়ে বলল,
‘ বালের প্যাচাল পারিস না তো। কাজের অভাব হইলে বল, কাজ বাড়িয়ে দেই। তাহলে আর এই সকল ভাবনা আসবে না৷’
তারপর সিগারেটটা পায়ের নিচে পিষে ফেলে বলল,
‘ কালকে ইউনিভার্সিটিতে যেতে হবে পরীক্ষা দিতে। কালকেই আবার আর্টিকেল পাবলিশের ডেট। এদিকে ফাইনাল ফাইলটা হাতে আসেনি। সুহানা আমাদের কাজের ধরন বুঝেছে কিনা কে জানে! মেয়েটা সম্পর্কে আমরা কিছুই জানি না। এভাবে দুশ্চিন্তা করার চাইতে নিজে করার চেষ্টা করলেই ভালো হতো। এদিকে প্রেসের চাপ। পরবর্তী আর্টিকেলের টেনশন। মনমতো কার্টুনিস্ট হায়ার করার যন্ত্রণা। আর তুই আছিস মাইয়া নিয়া।’
নাহিদ প্রসঙ্গটাকে কৌশলে ঘুরিয়ে ফেলার চেষ্টা করলেও লাভ বিশেষ হলো না। সৌধ সেখানেই এঁটে বসে থেকে বলল,
‘ মাইয়া না, তোকে নিয়ে ভাবছি। প্রতিবার অসুখে পড়লেই কার জন্য এতো ব্যাকুল হয়ে যাস জানার দরকার আছে আমার। মেয়েটা কে? কার প্রেমে একেবারে দেবদাস হয়ে আছিস? এখন বলিস না, মেয়েটা মিষ্টি। ওই শালীরে আমি…’
ছাপার অযোগ্য এক গালি বেরিয়ে এলো সৌধর মুখ থেকে। নাহিদ চোখ বন্ধ করে দীর্ঘ একটা শ্বাস ফেলে গালিটা হজম করে নিয়ে বিরক্ত গলায় বলল,
‘ গালি দিস না তো। বিরক্ত লাগে।’
সৌধ ক্ষেপে গিয়ে বলল,
‘ গালি দিবো না মানে! ওকে পেলে আমি আরও অনেক কিছু করবো। তোর এতো লাগছে কেন? এখনও তুই ভাবিস ওকে? ওই…’
আবারও অঝোর ধারায় গালির বর্ষন করে গেল সৌধ। নাহিদ ত্যক্ত হয়ে বলল,
‘ কতদিন বলেছি তোকে সৌধ। মেয়েদের এরকম অপমান করে কথা বলবি না। ওরা অপমান না, আদর করে কথা বলার জিনিস।’
সৌধ বিরক্ত হয়ে বলল,
‘ বালের জিনিস। তুই ওই মা*র পক্ষ নিয়ে কথা বললে আমার মাথায় আগুন ধরে যায়। এমন একটা ধোঁকা দেওয়ার পরও তোর ছ্যাবলামো যায় না।’
নাহিদ দীর্ঘ একটা শ্বাস ফেলে বলল,
‘ নিজের সুখের জন্য কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া খারাপ কিছু না সৌধ। ওর যদি মনে হয়ে থাকে সে অন্যকারো সঙ্গে ভালো থাকবে তাহলে থাকুক। আমাদের সমস্যা কোথায়?’
সৌধ রাগে অন্ধ হয়ে বলল,
‘ তারমানে মেয়েটা মিষ্টি?’
নাহিদ কিছু বলল না। নীরবতাকে সম্মতি ভেবে অসম্ভব ক্রোধে চেয়ারটা উল্টে ফেলে ঘরের দিকে চলে গেল সৌধ। নাহিদের মধ্যে তেমন কোনো ভাবাবেগ হলো না। সেখানেই স্থির হয়ে বসে থেকে আরেকটা সিগারেট ধরালো। সকালটা ততক্ষণে দুপুরে গড়িয়েছে। পিঠে চামড়া পোড়া রোদ আর কোমরে টনটনে ব্যথা নিয়ে নাহিদ আনন্দ চিত্তে গুনগুন করলো,
‘ I met this little girlie, her hair was kind of curly….’
পড়ন্ত বিকেলে কিছুক্ষণ হাঁটাহাঁটি করে বাগানে এসে বসেছেন কর্ণেল ফতেহ সিদ্দিকী। অন্যান্য দিন এই সময়ে এখানে বসে বাবার জন্য অপেক্ষা করে সুহানা। আজ তার কোনো সন্ধান না পেয়ে কিছুটা অবাক হলেন তিনি। বাড়ির কাজের ছেলেটি বিকেলের চা দিয়ে গেলে সুহানার কথা জানতে চাইলেন৷ তারপর যা শুনলেন তা মোটামুটি বিস্ময়কর৷ সুহানা আজ সকাল থেকে একবারও তার ঘর থেকে বেরোয়নি। তার ঘরের দরজা বন্ধ। খবর শুনে কর্ণেল সাহেব চায়ের কাপ হাতেই মেয়ের ঘরের দিকে গেলেন৷ সুহানার ঘরের দরজা যথারীতি বন্ধ। বাবার ডাকে সে কঠিন মুখে দরজা খুলল। কপালে গাঢ় চিন্তার বলিরেখা নিয়ে বলল,
‘ কিছু বলবে বাবা?’
এক রাতের মধ্যেই তার চমৎকার দেখতে মেয়েটির চেহারার এই বিস্ময়কর পরিবর্তনে হতবাক হলেন কর্ণেল। চোখের কোণে রাতজাগার ছাপ, শুষ্ক ঠোঁট, এলোমেলো চুল – এসব সুহানার সঙ্গে বেমানান৷ তিনি নিজের বিস্ময়ভাব গোপন করে বললেন,
‘ তোর সঙ্গে গল্প করতে এলাম৷ প্রতিদিন এই সময়টাতে আমরা একসঙ্গে চা খাই।’
সুহানা ছোট্ট একটা শ্বাস ফেলে বলল,
‘ আই অ্যাম রিয়েলি সরি, বাবা। আজকে আমি তোমাকে সঙ্গ দিতে পারছি না। আমার হাতে অনেক কাজ। কিন্তু সময় খুব অল্প।’
কর্ণেল সাহেব জানতে চাইলেন,
‘ ম্যাগাজিনের কাজটা করছিস নাকি?’
সুহানা মাথা নাড়ল৷
‘ কেমন লাগছে?’
সুহানা চিন্তিত মুখে বাবার দিকে তাকাল। কিছুক্ষণ অন্যমনস্ক থেকে বলল,
‘ ভালো।’
একটু থেমে বলল,
‘ খুব খাটতে হচ্ছে বাবা। আমি আসলে এতোটা এক্সপেক্ট করিনি। ওরা তৃণমূল নিয়ে কাজ করছে। ওদের কাজ বেশ সূক্ষ্ম। ওদের কেস স্টাডি করে সেই ক্রাইমের পেছনের মনস্তাত্ত্ব নিয়ে রিসার্চ করে রিপোর্ট তৈরি করা একদিনের কাজ নয়। ওরা আমাকে একদিনের সময় দিয়েছে। আমি সারারাত ঘুমাইনি। আজ সারাদিন কাজ করেছি। ইট ওয়াজ সো টাফ!’
কর্ণেল সাহেব মেয়ের ক্লান্ত চোখের দিকে তাকিয়ে তার পরিশ্রমের পরিমাণ বুঝলেন। মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বললেন,
‘ তুই ওদেরকে একদম চুনোপুঁটি ভাবছিলি। মনে মনে খুব অবহেলা করছিলি৷ ওরা তোকে তোর সমপর্যায়ের চ্যালেঞ্জ দিয়ে সেই অবহেলার যোগ্য জবাব দিয়েছে। এবার তুই সেই চ্যালেঞ্জ একসেপ্ট করে তাদের সঙ্গে সখ্যতা তৈরি কর। তুই তো এরকম অপরিচিত, টাফ চ্যালেঞ্জই চাচ্ছিলি নিজের জন্য।’
সুহানা মাথা নাড়ল। কিছুটা করুণ গলায় বলল,
‘ আমি আমার সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি বাবা। তুমি আমার জন্য দোয়া করো। আমার কাজটা ওদের সঙ্গে তাল মেলাতে না পারলে সেই অপমান মেনে নিতে খুব কষ্ট হবে আমার।’
কর্ণেল সাহেব হেসে বললেন,
‘ তুই ওদের খুব তুচ্ছ করে দেখছিস বলে ওদের কাছে ছোট হতে, শিখতে তোর আত্ম অহংকারে লাগছে৷ কিন্তু ওদেরকে কোনো মাপকাঠির মধ্যে না ফেলে চ্যালেঞ্জটাকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়ে কাজটাকে তোর ইন্টার্নশিপ মনে করে কর। দেখবি আর অপমান মনে হচ্ছে না। যতক্ষণ মান-অপমানের ব্যাপারটা মাথায় রাখবি, আত্ম অহংকার ধরে রাখবি ততক্ষণ তুই ওদের একজন হয়ে কাজ করতে পারবি না। সবাই সবকিছু জানে না সুহানা। ওরা তোর থেকে শিখবে, তুই ওদের থেকে শিখবি এটাই তো নিয়ম।’
সুহানা কিছু বলল না। চিন্তিত মুখে সে ফের ফিরে গেল নিজের কাজে। সন্ধ্যা ছয়টা বাজার সঙ্গে সঙ্গে সৌধর মেইল এলো৷ সুহানা লম্বা একটা শ্বাস ফেলে ফাইলটা সেন্ড করে দিলো। সেন্ড করার পর লক্ষ্য করল, উত্তেজনায় তার হাত-পা কাঁপছে। অবচেতন মনে সে নাহিদের থেকে কোনো ফিডব্যাক প্রত্যাশা করছে। এই কাজের জন্য তাকে ভয়ংকর খাটতে হয়েছে। নাহিদ কি তার এই পরিশ্রমের কাজটা পড়বে? পড়ে তার সম্পর্কে তার ইম্প্রেশন কেমন হবে? দুশ্চিন্তা আর উত্তেজনায় রাতের খাবারও খেলো না সুহানা। ঠিক রাত দশটায় আর্টিকেলটা অনলাইনে পাবলিশ করা হবে। সুহানা দমবন্ধ করা উত্তেজনা নিয়ে অপেক্ষা করতে লাগল। আর্টিকেল প্রকাশের ঘন্টাখানেক পর সৌধ ইমেইল করে জানাল,
‘ আপনার কাজটা খুব ভালো হয়েছে সুহানা। অভিনন্দন।’
সৌধর এই শুষ্ক অভিবাদনে কোনো এক অজানা কারণে মন খারাপ হয়ে গেল সুহানার। জানতে চাইল,
‘ আমার রিপোর্টটা এডিট কে করেছে?’
সৌধ জানাল,
‘ নাহিদ।’
‘ অনেক জায়গায় এডিট করেছেন মনে হলো।’
সুহানা এডিটের ব্যাপারটাতে মন খারাপ করেছে ভেবে সৌধ একটু ইতস্তত করে লিখল,
‘ আপনার তথ্যের হেরফের করেনি। আর্টিকেলটাকে শ্রুতিমধুর করতে কিছুটা এডিট করতে তো হয়ই।’
সুহানা কিছুক্ষণ চুপ থেকে একটু দ্বিধা করে জিজ্ঞাসা করেই ফেলল,
‘ উনি রিপোর্ট পড়ে কোনো মন্তব্য করেননি?’
সৌধ এবার ভ্রু কুঁচকাল। ঘটনা তাহলে এই? বলল,
‘ না, তেমন কিছু তো বলেনি।’
‘ কিছুই না?’
সৌধ এবার নাহিদের কথাটাই হুবহু নকল করে লিখল,
‘ বলেছে, Good for a first attempt. ভবিষ্যতে আরও ভালো করতে হবে।’
কথাটা শুনে কিছুক্ষণ মুখ গম্ভীর করে বসে রইল সুহানা। তারপর উত্তর দিল,
‘ ওহ!’
সৌধ কিছু লিখল না। সুহানা একটু পর আবার লিখল,
‘ আমি যে জিজ্ঞেস করেছি এই ব্যাপারে উনাকে কিছু বলবেন না।’
লিখে নিজের উপরই ভয়ানক বিরক্ত হলো সুহানা। কী দরকার ছিলো, যেচে পড়ে জিজ্ঞেস করার? আবার মানা করারই বা কী দরকার ছিলো? সৌধ উত্তর দিল,
‘ আচ্ছা।’
সুহানা ভাবল, এ কেবলই সৌধর সৌজন্যতার কথা। নাহিদকে এই ব্যাপারটা সে নিশ্চয়ই বলবে। দুই বন্ধু মিলে মজা নিবে। হাসবে। কিন্তু তার চিন্তাকে মিথ্যা করে দিয়ে সৌধ সত্যি সত্যিই নাহিদকে এই ব্যাপারে কিছুই জানাল না।
·
·
·
চলবে……………………………………………………